এমনকি, অফিস যাওয়ার সময়ে খেতে বসে অনেক সময়ে শুভেন্দু টুটুর তীক্ষ্ণ চিৎকার শুনতে পায়। ডাক্তার বলে দিয়েছে, ওর মস্তিষ্ক অপরিণত, ও পারবে না। তবু ওর মা ওকে ঠ্যাঙাচ্ছে। শুভেন্দু উত্তর্ণ হয়ে থাকে। টুটুর জন্যে ততটা নয় যতটা নন্দিতার জন্যে। তার ভাব লক্ষ করে নন্দিতা নিঃশব্দে পাতে আর একটু ভাত তুলে দেয়, বলে, খেয়ে নাও। শুনে কী করবে? করতে তো পারবে না কিছু। ওদের ছেলে ওরা বুঝবে।
কাছেই কারও বাড়ি বিয়ে, সকাল থেকে সানাই বাজছে, ভয়ে ভয়ে অফিস যায়, অফিস থেকে ফেরে শুভেন্দু। চোখের সামনে সেই সুন্দরী মেয়েটির ছবি ভাসছে। বিষাদপ্রতিমা, নয়ন ভরা জল। ভয়ে ভয়ে দরজায় বেল দেয়। সর্বনাশ, কেদারা ধরেছে এবার! কেদারা! কেদারা সইতে পারে না নন্দিতা! ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে, বলে, টুবলু, আমার টুবলু চলে গেল, উঃ, ওকে তোমরা নিয়ে যেয়ো না, নিয়ে যেয়ো না! ফিরিয়ে দাও। দরজা খুলে যায়। নন্দিতা শুভেন্দুর মুখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলে, কী হল তোমার? শরীর খারাপ করছে? ভেতরে এসো। যা গুমোট চলছে।
শরবত এনে দেয়। ভিজে গামছা দিয়ে কপাল, ঘাড়, হাত-পা সব মুছিয়ে দেয়। ফ্যানটা পুরোদমে চালিয়ে দিয়ে সামনে বসে থাকে। কী গো? ঠিক আছ তো? না
বলব!
ওদিকে মন প্রাণ নিংড়িয়ে কেদারের সুর ওঠে নামে। নন্দিতা যেন বধির হয়ে গেছে।
রমেন ফোন ধরেছে, হালো, হালো। শুভ? বউ ঠিক আছে তো?
একদম ঠিক ভাই, একদম।
তো এইবার একটা … বুঝলি তো? শুধুই দুজন করিব কূজন আর নয় …
হ্যাঁ হ্যাঁ, সে ঠিক আছে, বুঝেছি, বুঝেছি।
চাঁদনি রাত। শ্রাবণের চাঁদ। যদি দেখা গেল না তো গেলই না। কিন্তু যদি দেখা গেল তো সে তার রুপোলি মদ দিয়ে তোমাকে মাতাল করে দেবে একেবারে। তখনই বোঝা যাবে এ চাঁদ নীল আর্মস্ট্রং-এর নয়, এ চাঁদ সুকান্ত ভট্টাচার্যেরও নয়। এ সেই আদি অকৃত্রিম কবি মহা-কবিদের রাকা শশী। চাঁদনি। হেনার উগ্র সুবাস সঙ্গে নিয়ে সেই চাঁদনি ঘরের মধ্যে ঢুকছে। একটা ফিকে রঙের ফ্রিল দেওয়া দেওয়া রাত-জামা, যেন ওই চাঁদেরই ফেনা। নন্দিতা ঘুমোচ্ছে। মাতোয়ালা শুভেন্দু মৃদু মথিত মন্দ্র স্বরে ডাকছে, নন্দিতা, নন্দিতা, কই এসো।
নন্দিতা কি জাগবে না? এমন ডাকেও জাগবে না? আবার ডাকে শুভেন্দু, আবার, আবার।
নন্দিতা জাগছে। খুলে গেছে তার চোখের পাপড়ি।
নন্দিতা আসছে। কিন্তু ও কী?
আসছে আহত জন্তুর মতো। গুঁড়ি মেয়ে। নিজেকে টেনে টেনে।
শিঙালের রাত-চেরা আকাঙক্ষার ডাকে হরিণীর ঠ্যাঙের তুরুকে নয়। নিযে গেল বুঝি পৃথিবীর কোটরের সৃজনী আগুন। বাঁধের মধ্যে ঘুমিয়ে গেছে দুর্দান্ত নদী। না চাইতেই দু কূল ভরে আর দেবে না। তার পুরুষের বুকের তলায় নন্দিতা যান্ত্রিক, উদাস, অসাড় হয়ে থাকে। অবিকল এই পৃথিবীর মতো।
নাগিনা
সনাতনের বউটার চটক আছে। কথাটা সবাই বলছে। টিভি-তে ফিলিমের মেয়েছেলে দেখে-দেখে শালার চোখ আজকাল এমনি বিগড়ে বসে আছে যে কাউকে আর সহজে চোখে ধরতে চায় না। যদি বা চোখ-কান বুজে হাজার দশ বারো ঝেপে একটার সঙ্গে ঝুলে পড়া যায় ক-দিনের পরই নেশা ফুট। তারপরে আছে আবার কাঁথাকানি, গু-মুত, চ্যাঁ-ভ্যাঁ। শুকনো মুখ, ঝোলা বুক, ফোলা পেট। দুশ শালা। মঙ্গা, নটে, যতীন সব একধার থেকে ঝেটিয়ে বিদায় করে দিয়েছে। ঘরের মেয়েছেলে। মঙ্গা আজকাল যাচ্ছে বাঁধাঘাটের সোহাগির কাছে আর নটে পটেছে বিকাশ এন্টারপ্রাইজের বিড়ালচোখো সেলস-ছুকরিটার সঙ্গে। নটের। চেহারাটা আসলে এমন সাহেবমার্কা যে নটে বললে যেন ঠিক মানায় না। নটরাজ সিং বললে তবে খাপে বসে। তার গোরা মলাট, মাখুনে কথাবার্তা শুনে কেউ বলবে না সে একটা দাগি তোলাবাজ। সেলস-ছুকরি জানে মি. সিং ব্যাবসা করেন। কী ব্যাবসা? না সাপ্লাই। এখন, তা কীসের সাপ্লাই, ছোরাছুরি না ছোঁড়াছুঁড়ি সে খবরটা মহববতের এই পয়লা ইস্টেজে কি কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করে? সবচেয়ে শেয়ানা কিন্তু যতীন। সে চার ফেলে বসে আছে। দাঁও পেলেই গাঁথবে। নটেকে সে বলে থাকে, গোরা রং নিয়ে কি ধুয়ে খাব? ধুস! মাল চাই। বহোৎ মাল। রাধুদিদি রাধুদিদি করে সে এখন এক রাঁধুনিমাগির পেছনে পড়ে আছে। রাধুদিদির একটা ভালোমানুষ মেয়ে আছে। সাত চড়ে রা নেই। দু-বার ক্লাস এইট ফেল করে এখন ঘরে সেলাইপাতি শিখছে। করে-কষ্মে খেতে হবে তো! একটা না একটা কিছু আজকাল সব গোত্তরের মেয়েছেলেদেরই দরকার হচ্ছে। তা এই রাধুদিদি লোকের বাড়ি রান্না করে বলে নেহাত হেঁজিপেঁজি নয়, বর রেলের চাকুরে ছিল। ইনশিয়ারের টাকা, পেনশন, পি. এফ—এ সব মিলিয়ে রাধু বেশ মালদার। তার সাধ কালো মেয়ে এই বেলা চকোসা হয়েছে, তার একটা ভালো বিয়ে দেয়। যতীন বলেছে, তোমার ছায়ার পাত্তর দেখার ভার আমার রাধুদিদি। ইতিমধ্যে নিজের ঘরের বউটাকে সে দুটো বাচ্চাসুদ্ধ স্রেফ গুম খুনের ভয় দেখিয়ে তাড়িয়েছে। সে যে নিজেই আদর্শ পাত্তর তা যতীন মুখে বলে নয়, কাজে প্রমাণ করতে চায়।
এরই মধ্যে সনাতন ফট করে বিয়ে বসে গেল। কত ঝেড়েছে শ্বশুরবাড়ি থেকে কিছুতেই ভাঙছে না। জিজ্ঞেস করলেই বলছে, এই বউয়ের গায়ে হাতে যা দেখচিস– তা তোর বউয়ের গা হাত কি তুই দেখতে দিবি হারামখোর?
