তাই বল! স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে রমেন বলল।
শুভেন্দু বলল, ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলা আমার কাছে গম্ভীর মুখে নালিশ করে গেলেন, আমার স্ত্রী ওঁদের পারিবারিক ব্যাপারে নাক গলাচ্ছে বলে। যখন নালিশ জানাচ্ছিলেন, তখন নন্দিতা বাজার গেছিল। ফিরে এসেছে, ওঁরা দেখতে পাননি। নন্দিতা চোখ গরম করে বলল, আপনারা যদি টুটুকে পেটানো বন্ধ না করেন আমি পুলিশে খবর দেব, হাতে হাতকড়া পরিয়ে ছাড়ব, জেনে রাখবেন। সে কী চেহারা রে, যেন বাঘিনি!
রমেন হাসতে হাসতে বলল, তো কী। ভালোই করেছে তো! সন্তানের দ্বারা বাবা-মাকে ডিভোর্স করার আইনটা পাস হয়ে গেলে ভালোই হয়।
শুভেন্দু বলল, আরও শোন, সে পূর্বাপর আজ অবধি যা ঘটে গেছে সবগুলো বলে গেল, তারপর অভিযোগের স্বরে বলল, তুইও তো প্রথম আলাপেই আমার বউটাকে পাগলি বললি। বলিসনি!
বলেছিলুম বুঝি! রমেন হাসতে লাগল। তারপর হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলল, তা তোর কী বলার আছে বল!
বলবার আর কী আছে? আমি তোর কাছ থেকে প্রফেশন্যাল ওপিনিয়ন চাইছি। অ্যাডভাইসও।
রমেন হাতের আঙুলগুলো মন্দিরের মত চুড়ো করতে করতে বলল, দ্যাখ শুভ, আমাদের শাস্ত্রে বলে সেন্ট পার্সেন্ট নর্মাল লোক খুব কম। আসল হল ব্যালান্স। মানে ভারসাম্য। এই ভারসাম্যটা যদি এদিক ওদিক হেলে একটু কম বেশি হয়ে যায় তো … মানে বুঝেছিস? এক চুলের তফাত!
আতঙ্কিত চোখে তার দিকে চেয়ে শুভেন্দু বলল, তা হলে?
ধুর—ঘাবড়াচ্ছিস কেন? হালকা গলায় হেসে উঠল রমেন, ঘাবড়াবার আছেটা কী? মেডিক্যাল সায়েন্স যে এত উন্নতি করল, প্রযুক্তি বিজ্ঞান যে আজ কোন চুড়োয় উঠে গেছে, এসব কি ঘাবড়াবার জন্যে? ম্যান ইজ অলমোস্ট গড নাউ। সামান্য … খুব সামান্য একটু মেডিকেট করলেই নন্দিতা ঠিক হয়ে যাবে। আমি তোকে বেস্ট ওষুধ দিচ্ছি আমার স্যাম্পল থেকে। সে খসখস করে একটা প্রেসক্রিপশন লিখল, তারপর ড্রয়ার খুলে বেছে বেছে কয়েক পাতা ওষুধ বার করে দিল। দু রকম ওষুধ। খাওয়াবার নিয়মটা বলে দিল। তারপর বলল, তিন বছর বিয়ে হয়েছে বললি, না? এবার একটা বাচ্চা বানিয়ে ফ্যাল। দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে।
অবাক চোখে চেয়ে নন্দিতা বলল, ওষুধ? ওষুধ খাব কেন?
আরে খাওই না! আমি তো তোমার স্বামী, না শত্রু? বিষ ফিষ দেব?
না, তা নয়। তবে কনট্রাসেপটিভ পিল ফিল আমি আর খাচ্ছি না।
সে তো নয়ই। এবার মেটার্নিটি হোম, কাঁথা, ভ্যাকসিনেশন, ওঁয়া ওঁয়া শুরু হয়ে যাবে, আমার দুঃখের দিন এল বলে।
নন্দিতা হেসে ফেলে—বাব বাঃ, কী হিংসুটে!
এবার লক্ষ্মী মেয়ের মতো ওষুধটা খেয়ে নাও দিকি!
কীসের ওষুধ বলবে তো?
নার্ভের, বাবা নার্ভের, নার্ভ শান্ত রাখবে। মন ঠান্ডা থাকবে, হবু জননীর আদর্শ মানসিক অবস্থার সূচনা হবে।
সত্যি? কই দাও! অনাবিল বিশ্বাসে নন্দিতা হাত বাড়ায়। সকালে, বিকেলে, রাত্রে। সকালে, বিকেলে, রাত্রে। সকালে, বিকেলে, রাত্রে।
তৃতীয় দিন অফিস থেকে সে ফোন করল রমেনকে।
কেমন আছে রে, নন্দিতা?
পার্ফেক্ট। থ্যাংকিউ থ্যাংকিউ ভেরি মাচ।
নিজেকেই থ্যাংকসটা দে। তোর ডায়গনোসিস, আমার প্রেসক্রিপশন, রমেন বলে, ঠিক আছে, চালিয়ে যা এখন কিছু দিন।
সন্ধেবেলায় অফিস থেকে ফিরলে দরজা খুলে দেয় পরিষ্কার ফিটফাট নন্দিতা।
দুজনে চা আর ডালমুট নিয়ে গল্প করে।
জানো, আজকে নন্দিনীকে খুব দিয়েছি।
তাই?
সোজা বললুম, আপনি ভদ্রভাবে কথা বলতে জানেন না, আগে শিখুন, তার পরে বলবেন।
ওমা!
একেবারে চুপসে গেল, জানো? প্রোমোশনের চিঠি আমার হাতে। কী বলবে আর!
ঠিকই।
এবার বোসকেও ধরব। যত রদ্দি মার্কা টুর সব আমাকেই করতে হবে। বললেই বলবে ঠেসে টি. এ বিল দেবেন কোম্পানিকে। ভালোই তো। যেন আমি ফলস টি. এ বিলের এক্সপার্ট। আমার ফ্যামিলি লাইফ বলে প্রাইভেট লাইফ বলে কিছু থাকতে নেই। সব অপমানের শোধ এবার তুলব।
দাঁড়াও, প্রেশারের তিনটে হুইশল হয়ে গেল নন্দিতা চলে যায়। অনেকক্ষণ আসে না আর।
সান্ধ্য চান সারতে সারতে শুভেন্দুর হঠাৎ মনে হয় নন্দিতা তো কই নন্দিনীকে খুব দেওয়ার প্রসঙ্গে উত্তেজিত হয়ে উঠল না। বলল না তো, আহা, ওরকম রূঢ়ভাবে বললে কেন? জিজ্ঞেসও তো করল না কীসের প্রোমোশন। কেন প্রমোশন!
কাজের মেয়েটি চলে গেলেই গোটা ফ্ল্যাটটাতে তারা একা। সেই সময়ে নন্দিতা কোনো কোনোদিন এসে তার কোলের ওপর ঝুপ করে বসে পড়ে, গলা ধরে দোল খায়। বলে, জানো, তোমার ঘামে একটা কাটা ফলের মতো গন্ধ বেরোয়। প্লিজ, আরেকটু পরে চান কোরো। কাঁধের ওপর মুখ রাখে নন্দিতা। দেখো, ভিড় বাসে মেয়েদের সিটের সামনে দাঁড়ালেও, কখনও কোনো মেয়ে তোমার দিকে নাক কুঁচকে তাকাবে না। মেয়েদের আসলে নাকটাই খুব, বোধ হয় সবচেয়ে জোরালো। বুঝলে? তারপর শুভেন্দুর নাকে নিজের নাকটা ঠেকিয়ে বলে, তাই বলে যেন তুমি আবার বাসে মেয়েদের কাছে এটা পরীক্ষা করতে যেয়ো না। খবরদার। চোখ পাকিয়ে তর্জনী তোলে নন্দিতা।
তা সেসব তো কই কিছুই হয় না! শুভেন্দু পত্র-পত্রিকা নিয়ে স্পোর্টস চ্যানেল খুলে বসে থাকে। সাহেবরা অক্লান্ত গলফ খেলে যায়। গলফ খেলে যায়। সামনে দিয়ে নানা কাজে যাতায়াত করে নন্দিতা। কখনও কুশনের ওয়াড় পালটাচ্ছে, কখনও টেবিল মুছছে। টি.ভি.-র গায়ে চুম্বক লাগানো ছোট্ট মূর্তিটা ওপরের দিকে ছিল, নীচে সরিয়ে দিল। হেঁকে বলল একবার, গান শুনবে? চালাব কিছু? কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে নটার সময়ে টেবিলে ধোঁয়া ওঠা গরম খাবার। তারপর একটু টিভি দেখা। নিবিড় ঘুম। রাতে কোনো দিন হয়তো বলো হরি, হরিবোল যায়। বাড়ি কেঁপে ওঠে হরিধবনির চোটে। শুভেন্দু জেগে যায়। এই বুঝি নন্দিতা ঝপাং করে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল। নাঃ। নন্দিতা নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। কোনোদিন মাঝরাত্তিরে রেললাইনের ধারে দু-দলের বোমাবাজির শব্দে রাত যেন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। নন্দিতা কাছে এসে কাতর গলায় বলে না, ইসসস দেশটা দিন দিন কী হয়ে যাচ্ছে, কতগুলো টাটকা তাজা ছেলে এভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। নন্দিতার স্নায়ু। খুব শক্ত হয়ে গেছে। সে নিবিড় ঘুম ঘুমোচ্ছে।
