অথচ প্রতিক্রিয়ায় তোর বউটা একটা পাগলি! এ কথা কেন বললি রমেন? ভেবে বললি? হঠাৎ বিদ্যচ্চমকের মতো শুভেন্দুর মনে পড়ে যায় নন্দিতার ডান হাতের সেই চওড়া কালশিটের দাগ, কদিন আগে যা লাল ছিল, মনে পড়ে যায় বৃষ্টির রাতে ছুটে যাওয়া, কুকুরটা কী ভয়ানক কাঁদছে গো! মনে পড়ে যায় মস্তানের উদ্যত ছুরির তলায় লাল শাড়ি পরা স্ফুলিঙ্গের মতো নন্দিতাকে, সানাই ভাল লাগে না যায়, সানাই শুনলে যে বিষাদের অতলান্তে তুলিয়া যায় সেই নন্দিতাকে। শুভেন্দু আর দেরি করে না।
অফিসে আজ খুবই দেরি হয়ে গেছে। তবু সে শ্যামবাজারের মোড় থেকে চট করে বাস ধরে না। চলে যায় যতীন্দ্রমোহন অ্যাভেনিউ। ডক্টর রমেন বাগচির চেম্বারে।
নিজের নাম পাঠিয়ে দিয়ে ওয়েটিং রুমে বসে শুভেন্দু। চারদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক একটি লাল-চোখ তরুণকে নিয়ে বসে আছেন। ছেলেটি যেন ঘুমঘোরে রয়েছে। ঘোর ভাঙলেই সে ভয়ংকর কিছু একটা করে ফেলবে। আরও দুজন সঙ্গী রয়েছেন ভদ্রলোকের। বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। মাঝে মাঝে এসে চুপি চুপি কথা বলে যাচ্ছেন। শুভেন্দুর পাশেই বসে আরেক জন, শুভেন্দুর থেকে বড়ো হলেও যুবকই। তাঁর সঙ্গে একটি খুব সুন্দরী বউ। এতো সুন্দর, কিন্তু যেন বিষাদপ্রতিমা। দেখলে মনে হয় নৈরাশ্যের সিন্ধু থেকে উঠে এল বুঝি। শুভেন্দুর বাঁ পাশে একটি অল্পবয়সি ছেলে। চোখে চশমা। ধারালো মুখ। সে শুভেন্দুর সঙ্গে যেচে আলাপ করল। কিছু মনে করবেন না দাদা, আপনি কার জন্য এসেছেন?
শুভেন্দু কী বলবে ভেবে পেল না। সে কি সত্যি-সত্যিই নন্দিতার জন্যে এসেছে? নন্দিতা কী …
এসেছি এক নিকট আত্মীয়ার ব্যাপারে, ধরি মাছ না ছুঁই পানি করে বলল শুভেন্দু।
আপনি?
আমার নিজের জন্যে। ছেলেটি খুব সুন্দর হেসে বলল, অনেকের ধারণা সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে খালি মনোরোগীরাই আসে। ধারণাটা ঠিক নয়। অনেক রকম ডিজঅর্ডার আছে জানেন তো? আমার কথাই ধরুন না কেন। দুবার ডাবলু বি সি এস দিয়েছি। র্যাঙ্ক ভাল আসেনি তাই আবার দিচ্ছি। এবার বুঝলেন … হয়। এসপার নয় ওসপার। তো যা-ই পড়তে যাই মনের মধ্যে ঝমঝম করে কবিতা বাজে, এখান থেকে এক লাইন ওখান থেকে এক লাইন, ধরুন দাওয়ায় বসে জটলা করে পূর্বপুরুষেরা কি তোমায় আমি রেখে এলেম ঈশ্বরের হাতে কি অবর্তমান তোমার হাসি ঝাউয়ের ফাঁকেআমায় গভীর রাত্রে ডাকে—ও নিরুপম, ও নিরুপম ও নিরুপম বলতে বলতে ছেলেটি উত্তেজিত হয়ে উঠল। সটান উঠে দাঁড়িয়ে ভাবগম্ভীর গলায় আবৃত্তি করতে শুরু করে দিল যেন এটা মঞ্চ—
মন্দ ভালো নেইকো কিছুই, আকাশ মাথায়
বাউল-বাউলি দাঁড়িয়ে থাকায়,
নিম ঘোড়ানিম আকাশ ছুঁড়ে কৃষ্ণ-কিরিচ ফাঁসিয়ে রাখায়,
থই থই থই সমুদ্র জল তাথৈ তাথায়,
ওপর নীচে ডাইনে বামে আমার থেকেই আমার ভাগায় … আমার
ভাগায় … আমার ভাগায়।
শুভেন্দু আশেপাশে তাকাল। সবাই ভয়ের চোখে ছেলেটির দিকে তাকাচ্ছে। সুন্দরী মেয়েটির চোখ ভরতি জল। লালচোখ ছেলেটি লম্বা সিটের ওপর শুয়ে পড়ছে। রমেনের অ্যাসিস্ট্যান্ট মেয়েটি এসে ডাকল, কৌস্তুভ সেনগুপ্ত। কবি ছেলেটি তাড়াতাড়ি চেম্বারে ঢুকে গেল। শুভেন্দুর হঠাৎ ভয় করতে লাগল। ভীষণ ভয়। এসব যেন তার চেনা। এ লাল চোখ সে দেখেছে খবর্দার মারতে পারবেন। বলে যখন ঝলসে উঠেছিল। ওই বিষাদপ্রতিমা নয়ন-ভরা জল, দিনে রাতে দেখতে দেখতে এক সময় সে মরিয়া হয়ে গিয়েছিল। আর এই রকম মিঠে হাসি, চোখ দুটো হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়া, এই রকম … ঠিক এই রকম … ঠিক! ভয়ে অধীর হয়ে উঠল সে। উঃ। কখন তাকে ডাকবে রমেন?
অ্যাসিস্ট্যান্ট মেয়েটি একটা ছোট্ট নোট পেপারে লেখা একটা চিঠি এনে দিল।
শুভ, একটু বোস ভাই। পেশেন্টদের ছেড়ে দিয়েই তোর সঙ্গে বেরোব।
রমেন, রমেন তুই জানিস না, শুভ তোর সঙ্গে মজা মারতে, ইয়ার্কি দিতে আসেনি। তার বাড়িতে ভীষণ বিপদ। খুব বিপন্ন একজনের জন্যেই আজ সে তোর কাছে ছুটে এসেছে।
ঠিক এক ঘন্টা বারো মিনিটের মাথায় শেষ রোগীটি বেরিয়ে গেলে, শুভেন্দুর ডাক পড়ল।
কী ব্যাপার বল? চা খাবি তো? না কফি, মায়া একটু কফি বানাও ভাই। অ্যাসিস্ট্যান্ট মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রমেন বলল।
আরে দূর তোর কফি শুভেন্দু বলল, আমি ভীষণ সমস্যায় পড়ে এসেছি।
তোর আবার কী সমস্যা? ফার্স্ট ক্লাস আছিস! রমেন পাত্তাই দিল না।
শুভেন্দু বলল, তোকে পষ্টাপষ্টি জিজ্ঞেস করছি রমেন, নন্দিতা আমার বউ কি অস্বাভাবিক, মানে অ্যাবনর্মাল?
রমেন ঝুঁকে বসে আশ্চর্য হয়ে বলল, সে কী? একথা কেন বলছিস?
শুভেন্দু বলল, সেদিন ওর ডান হাতে একটা লাল দাগ দেখেছিলি, মনে আছে? সেটা কি জানিস? স্কেলের বাড়ি। আমাদের নীচের ফ্ল্যাটের ভদ্রমহিলা মেরেছেন।
বলিস কী রে? এফ, আই, আর, কর, এফ, আই, আর, কর। ডেঞ্জারাস মহিলা তো!
আরে, আগে সবটা তো শোন!
বল, আয়্যাম অল ইয়ার্স।
নীচের ফ্ল্যাটের ভদ্রমহিলার একটি হাবাগোবা ছেলে আছে। বছর বছর ক্লাসে। ফেল করে। তা করবে না তো কী?
পেনসিল-পেন-খাতা-বই এ সবেরও শ্রাদ্ধ করে ছেলেটা!
করবেই! তার কি সেন্স আছে!
সেটাই। তো ভদ্রমহিলা ছেলেটাকে এরকম কিছু ঘটলেই আচ্ছা করে পেটান। তুই যেদিন গেলি সেদিন সকালে নাকি নন্দিতার ভাষায় অমানুষিক পেটাচ্ছিলেন। ছেলেটার চিৎকার শুনতে পেয়ে ও ছুটে যায়, দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে প্রহারে বাধা দেবার চেষ্টা করে, স্কেলের বাড়িটা ছেলের ওপরই নামছিল, নন্দিতার হাতের ওপর পড়ে।
