বিয়ে করেছিস? কবে? রমেন উৎসাহিত হয়ে উঠল।
বছর তিনেক হল।
তো চল, তোর বউ দেখে আসি। নেমতন্নটা তো একেবারেই মিস করে গেছি দেখছি।
যাবি? খুব ভালো হয় তাহলে।
রমেন তার ক্রিম রঙের মারুতি ভ্যানের দরজা সরিয়ে দিল। তারপর বলল, আমি পিঠে হাত রাখতে ওরকম ঘাবড়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেলি কেন রে?
ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিলুম বুঝি?
হ্যাঁ, একেবারে চমকে উঠলি।
আর বলিস না, এই বউটা আমার মাথা খারাপ করে ছাড়বে।
কী ব্যাপার?
গাড়িতে যেতে যেতে শুভেন্দু তখন ব্যাপারটা বলল! শুনে রমেন হাসতে লাগল।
অন্যদিন শুভেন্দুর ফিরতে ফিরতে সন্ধে হয়ে যায়। আজ রমেনের গাড়িতে অনেক তাড়াতাড়ি হয়ে গেল। দরজা খুলে দিল বাসনমাজার মেয়েটি। কে রে? নন্দিতার গলা শোনা গেল। মেয়েটি চেঁচিয়ে বললে, দাদাবাবু।
ওমা, তুমি এত সকালে! বলতে বলতে শোঁ-ও-ও করে নন্দিতা এসে হাজির হল। পরনে চুড়িদার-কুর্তা। ওড়নাটা কষে কোমরের সঙ্গে বাঁধা আঁটসাঁট করে একটা বিনুনি বেঁধেছে। পায়ে রোলার স্কেট। এ বাড়িতে কোথাও চৌকাঠ নেই। রোলার স্কেট পায়ে চড়িয়ে নন্দিতা ঘর থেকে ঘরান্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
একবার শোঁ করে পেছনে গড়িয়ে আরেকবার দ্বিগুণ শোঁ করে সামনে গড়িয়ে এসে নন্দিতা রাজকীয় সালাম জানাল রোলার স্কেটের ওপর থেকে আইয়ে জনাব। পরক্ষণেই পিছনে অপরিচিত মুখ দেখে ভড়কে গিয়ে পড়তে পড়তে টাল সামলে নিতে নিতে তার পশ্চাদপসরণ। একেবারে রান্নাঘরের মধ্যে ককী কাণ্ড! একটু পরে খালি পায়ে ওড়না দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে ঘরে ঢুকে সে বলল। মুখে লাজুক-লাজুক হাসি।
রমেন বলল, কেন, বেশ তো ছিলেন, বাহনের ওপর থেকে নেমে এলেন কেন?
নন্দিতা মুখ ঢেকে হেসে উঠল।
শুভেন্দু বলল, এই হল আমাদের রমেন। রমেন দা গ্রেট।
বাস? ওইটুকুতেই ইনট্রোডাকশন হয়ে গেল? রমেন বলল।
এর চেয়ে বেশি বলতে হবে না, বুঝলেন? নন্দিতার হাসি-হাসি মুখ, আপনি প্রায়ই আমাদের দুজনের মাঝখানে বসে থাকেন, তা জানেন?
সুদূর লন্ডনে বাস করে আপনাদের মাঝখানে … আমি কি ভূত-টুত নাকি?
আরে, ও বলতে চাইছে তোকে নিয়ে আমাদের মধ্যে গল্পসল্প হয়। এই আর কি!
তাই নাকি, বাঃ। রমেন খুব খুশি হল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই নন্দিতা দশভুজা হয়ে উঠল। প্রথমেই একদফা চা-বিস্কুট দিয়ে গেল। চা টা শেষ হতে না হতেই কীসের বড়া গরম গরম ভেজে এনেছে, তার সঙ্গে আবার চা। তার পরে ছানার পুডিং হাজির করল, সেটা শেষ হলে বলল, মুখটা মিষ্টিয়ে গেল না কি? কুচো নিমকি খাবেন?
রমেন বলল, তাই বলি শুভটা রোগাপ্যাংলা ছিল বরাবর, এমন গায়েগতরে হয়ে উঠল কী করে? এই-ই তার সিক্রেট?
নন্দিতা বলল, ওসব বললে শুনছি না, আপনি আজ খেয়ে যাচ্ছেন।
রমেনের সমস্ত আপত্তি হাওয়ায় উড়িয়ে দিল নন্দিতা। তারপর সে এই সদর দরজা খুলে ছুটে যাচ্ছে সম্ভবত বাজারে, এই আবার প্রতিবেশীর ফ্ল্যাটে, রান্নাঘরে যাচ্ছে একবার, পরক্ষণেই সে এসে বসছে, গল্পে যোগ দিচ্ছে। এমনি করে রাত নটা নাগাদ সে গা ফা ধুয়ে একটা জমকালো পোশাকি শাড়ি পরে, কপালে টিপ, পুরো চুল খোলা খেতে ডাকল ওদের। হাত বাড়িয়ে বিরিয়ানি দিচ্ছে ওদের প্লেটে, তখনই শুভেন্দু এবং রমেনও লক্ষ্য করল জিনিসটা। ডান হাতের তলার দিকে আড়াআড়ি একটা চওড়া লালচে দাগ।
ওটা কী? কী হয়েছে? শুভেন্দু শিউরে উঠে জিজ্ঞেস করল।
হাত উলটে নন্দিতা দাগটা দেখল, একটু অবাক হয়ে বলল, তাই জ্বালা-জ্বালা করছিল। ও কিছু না।
কিছুতেই সে আর কিছু বলল না।
দারুণ খেলাম রমেন হাত ধুতে ধুতে বলল।
আবার যাতে আসেন তাই চেষ্টাচরিত্র করে ভালো খাওয়ালাম। নন্দিতার জবাব, বিরিয়ানি রাঁধলাম, জামদানি পরলাম আপনার অনারে, আর এই নিন।
সে মুঠোভরতি কাঁটালিচাপা ফুল রমেনের দুহাতে উপুড় করে দিল। ফুলগুলো নিয়ে যাবার জন্যে একটা পলিথিনের প্যাকেটও এনে দিল রাবার ব্যান্ড সুন্ধু।
রমেন বলল, রোলার স্কেট না পরেই তো আপনি হানড্রেড মাইল স্পিডে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন দেখলুম। ওটার দরকার হয়েছিল কেন?
নন্দিতা চারদিকে কেমন বিহবল চোখে চেয়ে মৃদু হাসল, বলল, কেন জানেন? শোনেন নি, সেই :
জলের কলে টিপ, টিপ
টিপ টিপ
আমরা বলেছিলাম যাব
সমুদ্রে।
নদী বলেছিল যাবে
সমুদ্রে।
আমরা বলেছিলাম যাবো
সমুদ্রে।
আমরা যাব।
বলতে বলতে মুখটা উলসে উঠল তার।
নীচে গিয়ে গাড়িতে উঠতে উঠতে রমেন বলল, দারুণ কাটল রে সন্ধেটা। চলি। আবার দেখা হবে। তারপর স্টিয়ারিঙে হাত রেখে হেসে বলল, তোর বউটা একটা পাগলি!
কী বলতে চাইল রমেন? শুভেন্দু ওপরে উঠতে উঠতে ভাবতে লাগল। তারপর থেকে প্রতিদিনই কাজের ফাঁকে ফাঁকে মাথার মধ্যে কথাটা তাকে আঘাত করে যায়, পাগলি, তোর বউ একটা পাগলি। কেন এ কথা বলল রমেন? পাগলি কথাটা লোকে আদর করে বলে আপনজনকে। দূর পাগলি! আবার বিরক্ত হলে বলে, কী পাগলামি করছ? কিন্তু তোর বউটা একটা পাগলি। কী প্রকৃত মানে এই কথার? শুভেন্দু তার বউ নিয়ে গর্বিত। তিন ঘন্টার মধ্যে লাফঝাঁপ করে বানিয়ে দিল বিরিয়ানি, ফিশ তন্দুর, ফ্রায়েড চিকেন। নিজেই বাজার গেল, এ বাড়ি ও বাড়ি থেকে কী মালমশলা সংগ্রহ করল কে জানে, বানিয়ে তো দিল। অরেঞ্জ চকোলেট রঙের ওই শাড়িটা পরে কপালে লম্বা টিপ, আধ-কোঁকড়া চুল খুলে যখন খাবার টেবিলে পরিবেশন করছিল? সম্রাজ্ঞীর মতো। ম্যাজিশিয়ানের মতো যখন হাতের মুঠো থেকে কাঁটালিচাঁপাগুলো বার করল? কিংবা সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা ঠিক কথা বলার মতো করে বলে উঠে একটা চমৎকার ছোটো গল্পের মতো শেষ করল শুভেন্দুর বাড়িতে রমেনের প্রথম আসার দিনটা!
