তুমি আর বড়ো বড়ো কথা বলো না! আসতেই তো চাইছিলে না!
তা অবশ্য সত্যি গো! নন্দিতা কাঁচুমাচু মুখে অকপটে স্বীকার করে, আগের বাড়িটা আমার ভীষণ মায়াবী বাড়ি ছিল! পুরোনো বলে আমি কেমন খারাপ বাসতে পারি না। অন্যে পছন্দ করছে না দেখলে আমার যেন আরও মায়া বসে। যায়! এ বাড়িটা একটু নীচুও। কিন্তু দেয়ালগুলো? সাটিনের মতো! আর জানলা দিয়ে মাধবীলতার ভিউটা দারুণ। অতএব সে খুব চটপট নতুন বাড়ি মনের মতো করে গুছিয়ে ফেলে। লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে, হেসে কুটোপাটি হয়ে, বরের গাল চটকে, কান কামড়ে। খুব তাড়াতাড়ি বাকি তিন প্রতিবেশীর সঙ্গে আলাপ-টালাপও সেরে ফেলে। সন্ধেবেলায় উৎসাহের চোখে দু চার সিঁড়ি টপকে টপকে উঠতে উঠতে শুভেন্দু আহ্লাদে আটখানা হয়ে শোনে তার বাড়ির জানালা দিয়ে নির্ভুল ভাবে গান ভেসে আসছে, পিয়া বিন রয়না নহী জায়। সে বেল বাজিয়ে দরজা খুলতে না খুলতেই বলে ওঠে, পিয়া বিন রয়না যাবার কোনো সম্ভাবনা আপাতত নেই। পিয়া হাজির।
কিন্তু সবচেয়ে বিপজ্জনক নন্দিতামিটা তার বউ এখানেই করে ফেলল। এগুলোকে আজকাল শুভেন্দু নন্দিতামি বলে, আর কোনো নাম বা সংজ্ঞা খুঁজে না পেয়ে। সন্ধের শোয়ে এসপ্লানেড পাড়ায় ছবি দেখতে গিয়েছিল। একেবারে খেয়ে বাড়ি ফিরছে। দুজনেরই খুব মেজাজ খুশ। সারা রাস্তা বাসে বসে বসে ফিলমটার পিণ্ডি চটকেছে দুজনে আর হেসে খুন হয়েছে। তাদের বাড়ি যেতে হলে একটা পাক-খাওয়া গলি পড়ে। গলিটা এড়িয়ে যাওয়া যায়, তবে তাতে ভীষণ ঘুর হয়ে যায়। গলিপথে কিছুটা এগোবার পর একটা চাপা বচসার আওয়াজ শুনতে পেল ওরা, তারপরেই সামনে যেখানে মোড়, গলিটা দু-ভাগ হয়ে ডাইনে বাঁয়ে চলে গেছে সেইখানে টিমটিমে আলোয় একটা জটলা, কয়েকটা তীক্ষ্ণ গালাগাল তারপর একটা ছোরা ঝলসাতে দেখল ওরা। শুভেন্দু কিছু বুঝে ওঠার আগেই জ্যা-মুক্ত তির কিংবা বলা উচিত বুলেটের মতো বেগে নন্দিতা তার পাশ থেকে ছুটে বেরিয়ে গেল। শুভেন্দু দেখতে পেল উদ্যত ছোরা হাতে এক বিশাল চেহারার ঝাঁকড়াচুলো মস্তান, তার পেছনে আরও কিছু দলা-পাকানো লোক, অপরদিকে মাথা নীচু করে এক হাত ওপরে তুলে আঘাত এড়াবার ভঙ্গিতে এক ছোকরা। উভয়ের মাঝখানে লাল শাড়ি পরা নন্দিতা একটা ছোট্ট হাইফেনের মতো, কিংবা ছোট্ট একটা ফুলকির মতো। না, না খবরদার না সে চিৎকার করে বলছে, খবরদার মারতে পারবেন না। নিমেষের মধ্যে ছোকরা ডানদিকের গলি দিয়ে দৌড়োতে দৌড়োতে বেরিয়ে গেল, মস্তানের চোখে আগুন, ছোরা নেমে আসছে।
ব্যস, শুভেন্দু আর কিছু দেখেনি, জানে না। তার সামনে নিকষ আঁধার। যখন আবার দেখল, দেখতে পেল গলির মোড় শূন্য, সে বসে পড়েছে, নন্দিতা বলছে, কী হল তোমার? ওঠো! শিগগির বাড়ি চলো। শুভেন্দু অবাক হয়ে দেখল তার বউ অক্ষত আছে।
কোনোক্রমে বাড়ি ফিরে, দরজায় ভেতর থেকে একটা তালা লাগাল শুভেন্দু। ভারী একটা কৌচ এনে দরজায় ঠেস দিয়ে রাখল। নন্দিতা বলল, কী করছ?
শুভেন্দু গম্ভীরভাবে বলল, এতে কিসুই হবে না। দু-চারখানা লাথিতেই ভেঙে পড়বে। তবু ডুবন্ত মানুষ তো কুটোগাছটাও আঁকড়ে ধরে।
তার মানে? কে লাথি মারবে?
কেন? ওই যাদের নোংরা কাজিয়ার মধ্যে তুমি তোমার নির্বোধ নাকটি গলিয়েছিলে? খুব ভাগ্য ভালো যে তোমাকেই খুন করেনি বা…
নন্দিতা বলল, তাই বলে, আমার চোখের সামনে মানুষ মানুষকে খুন করবে আর আমি কিছু বলব না তা তো হয় না, হতে পারে না!
আর যদি আক্রোশে তোমাকেই খুন করত?
খুন হয়ে যেতাম, কেউ না বাঁচালে।
আর যদি রেপ করত?
রেপই হয়ে যেতাম। নিজেকে রক্ষা করতে না পারলে বা কেউ না রক্ষা করলে! তবে এসব ভাবিনি তখন, দেখেছিলাম দুটো মানুষ, একজনের হাতের ছুরি অন্যজনের ওপরে নেমে আসছে, মাঝখানে দু-আড়াই ফুটের মতো ফাঁকা জায়গা, ওইটুকু ছাড়া আর কিছু দেখিনি, কিছু ভাবিওনি।
কী ভয়ানক! কী ভয়ংকর ভয়ানক! এ মেয়েটা ভাবে না পর্যন্ত! শুভেন্দু ভাবল, এবং ভাবতেই থাকল, ভাবতেই থাকল। অফিস যাবার সময়ে বেরোতে বেরোতে ভাবে, বাড়ি ফেরবার সময়ে ফিরতে ফিরতে ভাবে। গলিতে কদাচ নয়। তথাপি ভয়। আর কিছু না হোক বাড়ি গিয়ে কী দেখবে এই ভেবে ভয়। যার জন্য এত ভয় ভাবনা সেই নন্দিতা কিন্তু একদম স্বাভাবিক। দোকান-বাজার যাচ্ছে, দরজা হাট করে খোলা রেখে বাসনওয়ালির সঙ্গে গল্প জুড়ে দিয়েছে, হাসি গান গল্প। দিব্যি আছে।
কদিন পরে শ্যামবাজারের মোড় থেকে বাসে উঠছে, হঠাৎ কাঁধের ওপর একটা ভারী হাত পড়ল। একেবারে চমকে উঠেছে শুভেন্দু।
কী রে শুভ?
মুখ ফিরিয়ে চেয়ে শুভেন্দু খুশিতে ফেটে পড়ল, আরে রমেন না?
চিনতে পেরেছিস তাহলে?
ভিড়ের মধ্যে থেকে সন্তর্পণে তাকে বার করে আনতে আনতে রমেন বলল।
তোকে কখন থেকে ডাকছি গাড়ির মধ্যে থেকে শুনতেই পাচ্ছিস না। অনেকক্ষণ থেকে তোকে ফলো করতে করতে আসছি। চল ওইদিকে গাড়িটা পার্ক করেছি। শুভেন্দু একমুখ হেসে বলল, কবে ফিরলি?
বছর খানেক। যতীন্দ্রমোহন অ্যাভেনিউয়ের মুখে চেম্বার করেছি। আয় না, দেখে যাবি। আমি অবশ্য এখন চেম্বার বন্ধ করে বেরোচ্ছি।
শুভেন্দু বলল, ঠিকানাটা দে, অন্য একদিন যাব। আজ না। বউ বাড়িতে একা রয়েছে। জায়গাটা ভালো না।
