রোজই অফিস থেকে ফেরবার সময়ে এক বুক আনন্দ নিয়ে ফেরে শুভেন্দু। সে জানে যতই কলিগের সঙ্গে মনোমালিন্য হোক, ডিরেক্টর যতই বাঁকা চোখে তাকাক, গুচ্ছের নীরস অর্থহীন কাজের জন্যে তাকে যতই ছোটাছুটি করাক এরা, বাড়িতে তার জন্যে অসাধারণ কিছু অপেক্ষা করে আছে। দরজা খুললেই চমকে উঠবে হলুদ শাড়ি, শ্যাওলা সবুজ চুলের সেই মেয়ে কাজলবিহীন কাজলা চোখে এমন চাওয়া চাইবে, দাঁত ঝিকিয়ে এমন হাসি হাসবে যে সহস্র রকম দুর্ব্যবহার, হাজারখানা সমস্যার উদ্যত মুখ সব বাঁশির নাচনে সাপের ফণার মতো নুয়ে পড়বে। তারপর বেতের হালকা চেয়ারে মুখোমুখি বসে চা খাওয়া, ঝুপঝুপ সন্ধে নামছে, আলো জ্বলছে। সারাদিনের জমা কথা ফুটছে টুকটাক, দু একটা গানের কলি, একটা ধূপ জ্বেলে দেওয়া। ঘাড় ফিরিয়ে একটু ভঙ্গি—শুনতে এইটুকু কিন্তু এরই মধ্যে যে কী অসামান্য রস ভরা থাকে তা শুভেন্দু ছাড়া কেউ কি জানবে?
কিন্তু কোনো একদিন ওইরকম প্রত্যাশার সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে যদি হাসির চমক দেখে? সারা শরীরে শোকের ছাপ, যেমন-তেমন মলিন শাড়ি, বিকীর্ণমূর্ধজা, মেঘে-ভরা আকাশের মতো বর্ষণোন্মুখ চোখ।
কী হয়েছে নন্দিতা?
কিছু না। এসো।
চা খাওয়া হয়, চায়ের সুগন্ধের সঙ্গে ফিলটার-সিগারেটের গন্ধ মিশতে থাকে। সন্ধে উত্তীর্ণ হয়ে যায়। যন্ত্রচালিত দুটো হাত ধূপ জ্বেলে দেয়। হাতের মধ্যে যেন কোনো আগ্রহ নেই। রাত্তির হয়, খাবার বাড়া হয়। কথাবার্তা, হাসিঠাট্টা, চোখের আঙুলের-ঠোঁটের আদর ছাড়া খাবার বিস্বাদ মনে হয়, কিন্তু বারবার জিজ্ঞেস করে করেও উত্তর পাওয়া যায় না।
কী আবার হবে? কিছু না।
রাত্রে বোঝে নন্দিতা জেগে আছে। কিন্তু কোনো গভীর শোকে সে অনমনীয়, তাকে এখন ছোঁয়া যাবে না।
পরদিন খবর জানল রাস্তায় বেরিয়ে। দু-তিন বাড়ি পরে থাকে অভিলাষদা, তার স্কুল-পড়য়া ন-দশ বছরের ছেলেটি মারা গেছে। একেবারে হঠাৎ। স্কুলেই অসুস্থ হয়ে পড়ে, বাবাকে তার অফিসে খবর দেওয়া হয়েছিল, বাবা আসতে আসতেই সব শেষ। কেন, কী বৃত্তান্ত ভালো বোঝাই যাচ্ছে না।
কদিন পরে শুভেন্দু বলে, চলো নন্দিতা, উট্রাম ঘাট থেকে ঘুরে আসি। উট্রাম ঘাটে যেতে, জেটির ওপর দাঁড়িয়ে আঁচল ওড়াতে, গোল রেস্তোরাঁয় খেতে নন্দিতা ভীষণ ভালোবাসে।
কিন্তু নন্দিতা শূন্য চোখে চেয়ে বলে, কী লাভ?
কীসের কী লাভ?
এভাবে কোথাও বেড়াতে গিয়ে? বা কিছু সে যাই হোক না কেন, করে? কী লাভ? টুবলুর মতো একটা কচি ছেলে যদি এভাবে বিনা বাক্যব্যয়ে … তো কী লাভ? তুমিই বলো?
রাত্তিরে নন্দিতা গভীর শোকে গুমরে গুমরে কাঁদতে থাকে, যেন তার নিজেরই সন্তান গেছে।
আস্তে আস্তে মেঘ কাটতে থাকে, নন্দিতা স্বাভাবিক হয়, যদিও বৎসহারা জননীর এক গভীর, গভীরতর অসুখ সে যেন তার জীবনযাপনের ভেতরে চিরকালই বহন করে যাবে বলে মনে হয়। সবচেয়ে ভয় এবং আশ্চর্যের কথা এরও বেশ কয়েক মাস পরে শুভেন্দুর মাসতুতো বোনের বিয়েতে নেমন্তন্নে গিয়ে, খাওয়াদাওয়া হবার আগেই সে শুভেন্দুর হাত ধরে এসে, চলো এক্ষুনি চলে যাব।
কেন? কী হল? সুন্দর সিল্কের শাড়ি-পরা অলংকৃত বউয়ের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে শুভেন্দু।
শুনতে পাচ্ছ না সানাই বাজছে?
বিয়েবাড়িতে তো সানাই বাজবেই।
আমি সইতে পারি না যে! টুবলু যেদিন চলে গেল, সেদিন সারাদিন সারারাত দূর থেকে সানাইয়ের সুর ভেসে এসেছিল। আমার … আমি সইতে পারি না।
টুবলুর মৃত্যু খুবই মর্মান্তিক। একশোবার। কিন্তু টুবলুদের সঙ্গে নন্দিতার কোনো যাওয়া-আসাই ছিল না। টুবলুর সঙ্গে সে জীবনে দুবার কথা বলেছে কি না সন্দেহ।
অনেক চেষ্টাচরিত্র করে, নন্দিতাকে আগে থেকে কিছু না বলে বাড়ি পালটে ফেলার ব্যবস্থা করে শুভেন্দু। একটু শহরতলির দিকে। মস্তানি-ফস্তানি আছে নাকি একটু আধটু। কিন্তু চার ফ্ল্যাটের নতুন দোতলা বাড়ি। গেটে নন্দিতার পছন্দের মাধবীলতা থোকা থোকা দুলছে। নির্মল আকাশ দেখা যায়। রেললাইনের ধারে সাঁঝের বাজার বসে। সেখানে হরেক রকম টাটকা মাছ, সবজি পাওয়া যায়। একেবারে হাতের কাছে।
নন্দিতা প্রথমে গুইগাঁই করেছিল। তার আবার পুরোনো বাড়ি, উঁচু উঁচু সিলিং, রাশি রাশি জানলা-দরজা, এসব ভাল লাগে। সে ছাদে উঠে গনগনে রোদে কাপড় শুকোতে দেবে, আবার কালবৈশাখী এলে ঝড়ের হাওয়ায় উথালপাথাল হতে হতে কাপড় তুলে আনবে। দুমদাম দরজা জানলার আওয়াজ, ঘুলঘুলিতে চড়ুইপাখির বাসা, পাঁচিলের ফাটলে অশ্বত্থাগাছ এ সবই তার ভারি পছন্দের জিনিস। কিন্তু শুভেন্দুর এক গোঁ। সে এ বাড়ি ছাড়বেই। বউয়ের খামখেয়ালের জন্যে নতুন বাড়িতে থাকতে পাবে না নাকি সে তাই বলে? আচ্ছা বউ তো তার! তখন নন্দিতা অগত্যা হেসে ফেলে। দৌড়োদৌড়ি করে সব গুছিয়ে তুলতে থাকে। কী ফেলে যাবে, কী নেবে, কী নতুন কিনবে তার হিসেবনিকেশ করতে করতে একটা শালিখনি কি চড়ইনির মতোই মহা ব্যস্তসমস্ত হয়ে ওঠে। দেখতে দেখতে শুভেন্দুর বুকের ভেতরটা আনন্দে শিরশির করতে থাকে। নন্দিতা, আ-নন্দিতা অ-নন্দিতা সে গলা ছেড়ে ডেকে ওঠে।
আগেকার পছন্দটাকে আঁকড়ে ধরে নতুনের সব কিছু বরবাদ করে দেবে এমন মেয়েই নয় নন্দিতা। নতুন বাড়িটা তার ভারী ভালো লেগে যায়। ফিকে লাইল্যাক রঙের দেওয়ালে যামিনী রায়ের গণেশজননী টাঙাতে টাঙাতে সে দুদ্দাড় কয়ে ছোটে প্লেনের আওয়াজ শুনে, জানলার গ্রিল ধরে চেয়ে চেয়ে দ্যাখে, বলে, ভালোই হল বলো। আজকাল এয়ারপোর্ট ঢুকতে যা খরচ, এত কাছ থেকে বেশ নিখরচায় প্লেন দেখা যাবে। কী আওয়াজ! যেন আমাদের বাড়িতেই নেমে পড়বে মনে হয়! শুভেন্দু পায়ের ওপর পা তুলে মৃদু মৃদু হাসে। বিজয়ীর মতো।
