মারবেন না, প্লিজ, অমন করে মারবেন না! আকুলিবিকুলি করতে থাকে নন্দিতা। চোখের কোলে টলটলে জল। অতশত হয়তো দেখতে পাচ্ছেন না মেসো, কিন্তু কেমন হতবুদ্ধি হয়েই হাতের বেতটা ফেলে দিয়ে উঠে যাচ্ছেন। উঠোন ছেড়ে ভেতরে। ঘরের আশ্রয়ে।
সেই অবাধ্য ডালমেশিয়ানেরই এখন এই দুর্গতি হয়েছে। দোতলার ছাদে উপঝুরন্ত বৃষ্টির তলায় আশ্রয়হীন। কোথাও ছুটে পালিয়ে যাবে তার উপায় নেই। বাঁধা। নন্দিতা অনেক কষ্টে চোখের জল চাপতে চাপতে বলল, তুমি তো কদিন ছিলে না, জানো না। রোদে জলে ওকে একভাবে বেঁধে রেখে দ্যায়। নিজেরা নিশ্চিন্তে খাচ্ছে, দাচ্ছে, ঘুমোচ্ছে। আমরা ঘুমোতে পারছি না! খাবার মুখে রুচছে না! ওদের দেখো হেলদোল নেই! কেউ কেউ কেউ আবার বৃষ্টি ছাপিয়ে কুকুরের ডাক ভেসে এল! নন্দিতা বলল, ওর নিশ্চয় অসুখ করেছে, খুব কষ্ট হচ্ছে, যাও না একবার প্লিজ।
শুভেন্দু অবাক হয়ে বলল, তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে? ওদের পাড়ায় সবাই ভয় পায়, এড়িয়ে চলে, আমি মাঝখান থেকে কুকুর ডাকছে বলে এই রাত্তিরে গিয়ে কমপ্লেন করব?
ওহ, বুঝতে পারছ না, কুকুর ডাকছে বলে নয়! নন্দিতার গলা যেন রুদ্ধ হয়ে যাবে কুকুরটা কষ্ট পাচ্ছে বলে। বৃষ্টিতে! রোগে! … সে আর কিছু বলতে পারে না, ঝরঝর করে কাঁদতে থাকে।
শুভেন্দু বলে, একটা কুকুর কষ্ট পাচ্ছে বলে, এই দুর্যোগের রাত্তিরে তুমি আমাকে বাড়ি-ছাড়া করবে? জানো কত জন্তু-জানোয়ার, কত মানুষ নিরাশ্রয় ঠিক এখন, এই মুহূর্তে। বৃষ্টিতে উড়ে গেছে কার খোড়ো চাল, জল জমে ভেসে গেছে গেরস্থালি…।
শুভেন্দুর কথা শেষ হল না, হঠাৎ নন্দিতা দড়াম করে এক লাফ দিল বিছানা থেকে মাটিতে। ছুটতে ছুটতে গিয়ে দরজার খিল নামাল। তারপর বাইরে বেরিয়ে গেল।
অগত্যা শুভেন্দুকে উঠতেই হয়। খোঁজো কোথায় টর্চ, কোথায় বর্ষাতি, কোথায় ছাতা! নীচে নেমে সে অবাক হয়ে দেখল সদর দরজা খোলা। হু হু করে বৃষ্টির ছাট ঢুকছে। নন্দিতা এই রাত্তির দেড়টায় জলের মধ্যে একাই বেরিয়ে গেছে।
কোনোক্রমে বর্ষাতি টর্চ আর ছাতা সামলাতে সামলাতে প্রতিবেশীর বাড়ির দরজায় সে যখন পৌছোল ততক্ষণে সে-বাড়ির দরজাও খুলে গেছে। চৌকাঠের এপারে সোঁপাটে ভিজে নন্দিতা, ওপারে টর্চ হাতে লুঙ্গি-পরিহিত ভঁড়িয়াল দারোগা, দোহাই আপনারা কিছু করুন, কিছু করুন মেলোমশায়, কুকুরটা যন্ত্রণায় কতরাচ্ছে, ভয়ানক কষ্ট হচ্ছে ওর, কিছু করুন!
দারোগা বললেন, আপনি তো আচ্ছা জাহাঁবাজ মহিলা দেখছি। আমার স্ত্রী বলেন বটে জানলা থেকে যখন তখন স্পাইং করেন, আমার কুকুর আমি মারি কাটি আপনার কী? ইয়ার্কি পেয়েছেন? শেষ কথাটা উনি শুভেন্দুর দিকে চেয়ে বললেন।
শুভেন্দুর ভেতরটা রাগে জ্বলে যাচ্ছে নন্দিতার ওপরও, দারোগার ওপরও। সে যথাসাধ্য মোলায়েম করে বলল, আসলে কী জানেন, আমার স্ত্রী কুকুর ভীষণ ভালবাসে, একটু দেখুনই না! এত করে বলছে যখন!
কড়া চোখে তার দিকে তাকিয়ে দারোগা হাঁক দিলেন, হারু, হারু, ঢ্যাপলা! ছাতা নিয়ে একবার ওপরে যা দিকিনি, দ্যাখ তো টমিটা কেন এত চেঁচাচ্ছে!
দুটো ছায়ামূর্তি ছাতা নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছে দেখা গেল। দারোগা বললেন, দেখুন মশাই, এক পাড়াতে থাকি, বিপদে আপদে নিশ্চয় একে অপরের সহায়। কিন্তু পরের ব্যাপারে খামোখা এভাবে নাক গলালে মেয়েছেলে বলে মান রাখতে পারব না। আসুন আপনারা। আসুন এবার …। গলাটা শেষের দিকে আরও কড়া।
এই সময় একটি ছায়ামূর্তি টর্চের আলোর বৃত্তের মধ্যে দৃশ্যমান হয়ে পরম সন্তোষের সঙ্গে বলল, বাবা, টমি আর চ্যাঁচাচ্ছে না, কেমন দাপাচ্ছিল, কাটা পাঁঠার মতো, এখন চুপ করে শুয়ে পড়েছে।
নন্দিতা ফিসফিস করে বলল, মরে গেছে। সে স্থলিত পায়ে পিছন ফিরে বাড়ির দিকে চলতে লাগল। বৃষ্টিতে ভিজে শাড়ি পায়ের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। দড়াম করে আছাড় খেল একটা। শুভেন্দু তাকে তুলে ধরে, কোনোমতে বাড়ি নিয়ে আসে, সেই রাতে গরম জল করে ব্রান্ডি দিয়ে খাওয়ায়, পরদিন সকাল না হতেই টেটভ্যাকের খোঁজে ছোটে। হাঁটুর কাছে বেশ খানিকটা কেটে গেছে। দুটো স্টিচ। সে এক কাণ্ড!
নন্দিতা ডাকসাইটে কুকুর-প্রেমিক বলেই যে এমনটা ঘটল তা কিন্তু নয়। নন্দিতা কুকুর দেখতে ভালোবাসে, পুষতে মোটেই নয়। সে কোনো জন্তু-জানোয়ার পাখি-টাখি পোষবার আদৌ পক্ষপাতী নয়। ওসব আবদার তার নেই। বলতে গেলে কোনও আবদারই তার নেই। আপন খেয়ালে বইপত্তর, ক্যাসেট-ফিলম নিয়ে থাকে, ভালো ভালো রান্না করে, করে দু পক্ষের বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজনকে খাওয়ায়। খুব মিশুকে। যেখানে যায় হেসে গল্প করে, মজা করে একগাদা বন্ধু বানিয়ে ফেলবে। এরকম একটা স্টিমার পার্টির জমায়েতে হাসি-খুশি উচ্ছল স্বভাবের প্রাণবন্ত মেয়েটিকে মাস্তুল ধরে পাক খেতে খেতে একটার পর একটা কবিতা আবৃত্তি করতে দেখেই একেবারে ঘাড়মোড় ভেঙে প্রেমে পড়ে গিয়েছিল শুভেন্দু। আর বিয়ের পর তো নন্দিতা একটা অভিজ্ঞতা। এত স্বতঃস্ফূর্ত তার আবেগ! ভালোবাসা ও আকাঙক্ষার প্রকাশ এমন জমকালো! এমন হৃদয়ের দু কূল ভাসিয়ে নেওয়া প্লাবনের মতো উত্তাল! যে শুভেন্দু মনে মনে গোপনে জানে এমনটা বোধ হয় আর হয় না। এবং সে অতি ভাগ্যবান! বিশেষত সে বাপ-মা মরা, মামার বাড়িতে এবং পরে হস্টেলে মানুষ। স্নেহ-ভালোবাসা-আদরের জন্য কতটা কাঙাল সে ছিল, বিয়ের পর নন্দিতার প্রবল স্রোতে ভেসে যেতে যেতে ভালো করেই বুঝতে পারে। ওই এক দোষ, একে কী বলবে শুভেন্দু বুঝতে পারে না। খামখেয়ালি না সেন্টিমেন্টাল! না ওই পরের ব্যাপারে নাক-গলানোর আদিখ্যেতা! কী বলবে একে সে সত্যিই জানে না।
