নীল অপরাজিতা আর রক্তকরবী, ডগডগে গাঢ় সব রং। তবু বড়ো সুন্দর মানিয়েছে। মাঝখানে উঁচিয়ে আছে মুদিতকলি রজনিগন্ধা। গোলাপের পাপড়ি দিয়ে বৃত্তের পরিধি শেষ করলেন অরিজিৎ।
… প্রচণ্ড ঝড় দিচ্ছে চারদিকে। তারই মধ্য দিয়ে দৌড়োতে হচ্ছে। এখন পায়ের ব্যালেন্স কে কতটা ঠিক রাখতে পারে। … কোন নাটকে ছিল সংলাপটা। কে কাকে বলেছিল? মাথার মধ্যে বোলতা ঘুরছে, ভোঁ ভোঁ। এলোমেলো বাতাস। প্রচণ্ড ঝড়। পা রাখা যাচ্ছে না। কিন্তু রাখতে হবে। কোথায়? কোথায় এমন পরিস্থিতি? বোলতাটা এখনও বেরল না। আরও যেন ডেকে আনছে। বোলতার ঝাঁক এখন। আলগা হয়ে যাওয়া মোটা তামার তারের ভ্যাঁ ভ্যাঁ শব্দ করে ঘুরপাক খাচ্ছে।
ডাক্তার বললেন, এত জ্বর! সামলাতে পারছি না। অ্যান্টিবায়টিক দিই মা!
দাও।
জ্বর কমেছে। কিন্তু অরিজিৎ নিস্তেজ, নিথর, প্রেশার নেমে যাচ্ছে। আচ্ছন্ন ভাব।
ডাক্তার বললেন, সেবা-ভবনে নিয়ে যাই মা?
যাও।
নৈঋত কোণে কী রচনা করেছে অরিজিৎ। মা এসে দাঁড়ায়। নীল, নীল, ঘন নীল। কেন এত নীল? কেন খোকা? পাশে পাশে লালের বুনট। সংগ্রামী লাল। রজনিগন্ধাগুলি খুলে গেছে। আকাশের দিকে মুখ। মৃদু সুগন্ধে সবাইকে যেন হারিয়ে দিতে চায়। গোলাপের পাপড়িগুলো মাটি কামড়ে পড়ে থাকে। জমাট। মা দেখতে থাকে। দেখতে থাকে।
সুদেব, সমীর সেবা-ভবনে রোজ আসে, যায়। ক্যামেরা খাপে বন্ধ। টেপ রেকর্ডার চুপ। পাঁচ দিনের দিন অবস্থা সঙিন হয়ে উঠল। ডাক্তার গম্ভীর। কোনো কথাই বলতে চান না। ছ-দিনের দিন সমীরকে চলে যেতেই হয়। মা বললেন, সুদেব, তুমিও যাও। কাজের ক্ষতি হচ্ছে।
আমরা ওদিকের একটা ব্যবস্থা করেই আবার… তা ছাড়া বড়ো ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করি। এতবড়ো একটা প্রতিভা… এভাবে…।
না, আসতে হবে না। অন্য ব্যবস্থার দরকার হলে করা হবে। তেমন কিছু হলে তোমরাই আগে খবর পাবে। ঠিকানা, ফোন নম্বর সব রেখে যাও। চমকে মুখ তুলে তাকায় সুদেব, তাকায় সমীর। মার মুখের একটি পেশিও কাঁপছে না। ভাবান্তর নেই।
নীল ফুলগুলি সব শুকিয়ে, হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে। করবীর লাল নিশান উড়ছে ঠিক। প্রস্ফুটিত রজনীগন্ধার দণ্ডগুলি ঊর্ধ্বমুখ, সমান সতেজ। গোলাপের পাপড়ি মাটি কামড়ে আছে।
ড্রিপের ছুঁচ যেখানটায় ফোঁটানো ছিল ইঙ্গিতে সেখানে আঙুল দেখিয়ে অরিজিৎ মাকে জিজ্ঞেস করল, কী?।
মা হাত বুলিয়ে দেয়। আস্তে আস্তে সব তুলে নেওয়া হয়। নাড়ি স্বাভাবিক। প্রেশার স্বাভাবিক। বিছানায় আজ প্রথম উঠে বসেছে অরিজিৎ বিশ্বাস। হাতে ছোটো কাচের গ্লাসে কমলালেবুর রস। মাথার দিকে মা, পায়ের কাছে মা। অরিজিৎ দেখতে পাচ্ছে খানিকটা। বুঝতে পারছে বাকিটা।
কী হয়েছিল বলো তো ডাক্তার?
অপ্রতিভ মুখে ডাক্তার বলে, যখন কিছুতেই কিছু ধরা যায় না, তখন সত্যি কথা বলতে কি আমাদের একটা স্টক ডায়াগনোসিস আছে।
কী? কী সেটা?
আমতা আমতা করে লজ্জিত ডাক্তার বলে, ভাইরাস। কোনো অচেনা ভাইরাস।
বাঃ, তাহলে বাঁচালে কেমন করে?
আমি বাঁচাইনি তো? মেডিকাল টার্মসে বলতে গেলে… আসল কথা, আপনি নিজেই নিজেকে বাঁচিয়েছেন।
বেদির চারধারে মায়ের বাড়ির মেয়েগুলি অখণ্ড মনোযোগে ফুল সাজাচ্ছে। নানা রকম ফুল, নানারকম নকশা। সাজাতে থাকে। সাজাতে থাকে।
নন্দিতা
শুনছ? শুনছ? ওঠো না গো একবার!! মাঝরাত্তিরে নন্দিতার ঠেলাঠেলিতে ঘুমটা একেবারে কাচের বাসনের মতো খানখান হয়ে গেল।
হলটা কী? ধড়ফড় করে উঠে বসল শুভেন্দু। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। জানালাগুলো বেশিরভাগই বন্ধ। তা সত্ত্বেও ধারাবর্ষণের তুমুল শব্দ কাচ কাঠ সমস্ত অনায়াসে ভেদ করে ফেলছে।
ভোঁতা, ভারী শব্দ একটা! ভরা শ্রাবণের মধ্যরাত। জ্বালাময় মাঝ-বর্ষার দিনাবসান। ধরিত্রীরও। তার বুকে অবিরাম জীবনধারণের লড়াইয়ে ক্ষতবিক্ষত মানুষগুলিরও। অন্ততপক্ষে শুভেন্দুশেখরের তো বটেই। গতকাল সকালে ট্রেনেই ফিরেছে তিনদিনের ঝটিকা ট্যুর সেরে, তারপর গেছে অফিস। সেখানে ট্যুর-ক্লান্ত বলে কোনো বিশেষ বিবেচনা স্বভাবতই মেলেনি। সন্ধেয় বাড়ি ফেরার লগ্ন থেকেই ঘুমটা আসছিল নেশার মতো। একটা চমৎকার আমেজ, তাকে আরও চমৎকারভাবে জমিয়ে দিল বেশি-করে গাওয়া ঘি-ঢালা নাতিগাঢ় মুগের ডালের খিচুড়ি আর পাটিসাপটার মতো কি জানি কীসের পুর ভরা দুর্দান্ত ওমলেট। বর্ষারাতের সেই জমজমাট ঘুম এইভাবে কেউ ভাঙায়? ঠেলে ঠেলে! অল্প ঠেলায় হল না দেখে ধাঁই ধাঁই করে রাম ধাক্কা মেয়ে?
শুনতে পাচ্ছ না? নন্দিতা কাঁদো-কাঁদো গলায় বলল।
কী শুনতে পাবো? ঘুমে ভারী, বিরক্ত গলায় শুভেন্দু বলল।
কুকুরটা কী ভীষণ কাঁদছে! অন্ধকারে মনে হল নন্দিতাও কাঁদছে। গলার স্বরটা যেন আধা-বিকৃত।
অবিরাম বর্ষণের ভারী আওয়াজ ভেদ করে এই সময়ে কোনো চতুষ্পদ প্রাণীর ডাক শুনতে পাওয়া গেল। করুণ সাইরেনের মতো ধাপে ধাপে সুরে চড়ল ডাকটা, তারপর আবার খাদে নেমে এল। কেউ কেউ কেউ কেউ কেউ, অতঃপর ভিন্ন রাগিণীতে শুরু হল আলাপ।
ঘুমোতে না পারো, একটা কাম্পোজ খেয়ে শুয়ে পড়ো, শুভেন্দু আবার ঝুপ করে শুয়ে পড়ল।
ঘুমোতে না পারার কথা হচ্ছে না-নন্দিতা আর্তগলায় বলে উঠল, কুকুরটা যে ভয়ানক কাঁদছে। ওকে এই দারুণ বৃষ্টির মধ্যে ছাদে বেঁধে রেখে দিয়েছে। তা ছাড়া … নন্দিতার কথা শেষ হল না, শুভেন্দু প্রায় খেকিয়ে উঠল তো আমি কী করব? কথাগুলো কেটে কেটে প্রত্যেকটাতে বেশ খানিকটা রাগ ভরে ভরে সে বলল। কদিন ধরে এ এক মহা উৎপাত শুরু হয়েছে। তাদের দোতলা বাড়ির পরেই একটা ছোটো জমি ঘেরা পড়ে আছে। তারপর এক পুলিশ ইনসপেক্টরের বাড়ি। ভদ্রলোকের খুব জন্তু-জানোয়ারের শখ। খরগোশ, গিনিপিগ থেকে আরম্ভ করে ছাগল, গোরু, এমনকি বাঁদর পর্যন্ত পোষা হয়ে গেছে। তা পুষুন, কেউ আপত্তি করছে না। কিন্তু পোষা প্রাণীগুলোর কোনও যত্নই ওঁরা করেন না। খরগোশ, গিনিপিগগুলোকে গুন্ডাহুলো এসে এসে খতম করে গেল। ছাগলিটা যে কদিন দুধ দিল, দিল। তারপর ভদ্রলোক স্বহস্তে তাকে কেটে খেয়ে ফেললেন। গোরুটা বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে দিবারাত্র হাম্বা হাম্বা করত, গলার দড়ি কখনও খোলা হত না, তার কী গতি হল তাদের কারুরই জানা নেই। আর বাদরটার লক্ষ্য ছিল এ পাড়ার যতেক গৃহস্থবাড়ি। নিজের মালিকের কাছ থেকে যথেষ্ট খেতে পেত না কিনা কে জানে, কিন্তু পাড়ায় হেন বাড়ি নেই যেখান থেকে সে দাঁত মুখ খিচিয়ে ভোজ্য সংগ্রহ না করেছে। ক্লাইম্যাক্স হল শুভেন্দুর শার্ট পাঞ্জাবির বোতাম ভক্ষণ। কেউ কিছু বলতে সাহস পায় না। পুলিশের দারোগা, ওরে বাবা, বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা। তবে ইদানীং ভদ্রলোক যা শুরু করেছেন সত্যিই সহ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে। একটার পর একটা দারুণ সুন্দর দামি কুকুর আনছেন আর অযত্ন অবহেলা দিয়ে কয়েক মাসের মধ্যেই মেয়ে ফেলছেন। শুভেন্দু আর অতশত জানবে কোত্থেকে, নন্দিতাই জানায়। জানালায় দাঁড়িয়ে প্রাণপণে ইশারা করে শুভেন্দুকে ডাকে, দেখো দেখো দেখে যাও। দারোগার বাড়ির উঠোনে একটা ছোটো ডোল, তাতে গিন্নি এঁটো কাঁটা সব এনে ফেলে দিলেন, তারপরেই ডাক দিলেন, আঃ আঃ টমি, আঃ আঃ! আপাদমস্তক টানটান চব্বিশ-পঁচিশ ইঞ্চি উঁচু একটা গ্ৰেহাউন্ড অপরূপ ভঙ্গিতে এগিয়ে এল। ভদ্রমহিলা তাকে এঁটোকাঁটাগুলো খাওয়াবার জন্যে ক্রমাগত তাড়না করছেন, আর অভিজাত বংশীয় গ্ৰেহাউন্ডটা ক্রমাগত তার লম্বা সরু চকচকে মুখটা ফিরিয়ে নিচ্ছে। গ্রে-হাউন্ডটা বোধহয় মরে গেল তবু পাত-কুড়োনো মুখে দিল না এবং কুকুরটা মরে গেল তবু তার মালিকরা তাকে তার যোগ্য খাদ্য দিলেন না। একটা চমৎকার স্প্যানিয়েল মরে গেল আপাদমস্তক ঘা হয়ে। চুলকোতে চুলকোতে কুকুরটা যেন খেপে যেত একেক সময়ে। সারা শরীর থেকে খাবলা খাবলা লোম উঠে, দগদগে ঘা নিয়ে প্রচণ্ড লাফিয়ে উঠে সামনের থাবায় মুখ দিয়ে শুয়ে পড়ল, উঠল না আর। কোথা থেকে ভদ্রলোক এত সুন্দর সুন্দর পেডিগ্রি-ডগ জোগাড় করেন কে জানে। পুলিশের লোক, কোথা থেকে আর! মিনি-মাগনা পায় বলেই বোধহয় আরও এত অছো। কী জিনিস পেয়েছে জানেই না। লেটেস্ট হচ্ছে একটা ডালমেশিয়ান। অপরূপ কুকুর। নন্দিতা জানলার কাছ থেকে নড়েই না, দ্যাখো দ্যাখো, কী সুন্দর ঘুরে বেড়াচ্ছে! সাদার ওপর কালো কালো গোল গোল ছিট, আবার ভালো চামড়ার কলার, এবার বোধহয় দারোগার মক্কল কলার সুষ্ঠুই উপহার দিয়েছে। কুকুরটা খুব সম্ভব পূর্ণবয়স্ক। পোয মানতে চাইছে না। পোয মানাবার উপায় হিসেবে দারোগাবাবু থার্ড-ডিগ্রি প্রয়োগ করেছেন। টমি—কাম হিয়ার। ভদ্রলোকের সব কুকুরই টমি! টমি আসছে না, লম্বা হিলহিলে চাবুকের বাতাস কাটার শব্দ সুইশশশ। নন্দিতা কানে আঙুল চেপে বসে পড়ে। টমি সিট ডাউন। এবারও টমি আসছে না, আবারও চাবুক নামছে। এবার নন্দিতা জ্ঞানশূন্য হয়ে জানলার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে, অ মেলোমশাই, মেসোমশাই। তার তীক্ষ্ণ সরু গলাও ভদ্রলোকের মোটা কানে পৌঁছতে দেরি হচ্ছে! অবশেষে অবাক হয়ে দারোগা মেলোমশাই মুখ তুলে তাকিয়েছেন। কস্মিনকালেও নন্দিতা তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে মাসি বোনঝি সম্পর্ক পাতায়নি। অতএব অবাক।
