সেই থেকে অরিজিৎ সাজান। কখনও অভীপ্সার গুচ্ছ মাঝখানে লম্বা ফুলদানে উল্লম্ব রেখায় বসিয়ে তার চারদিক ঘিরে শরণাগতির চক্র রচনা করেন। সাহসের রেখা, চক্রের অরের মতো চারদিক থেকে গিয়ে ছুঁয়ে থাকে শরণের গোলাপগুলোকে। আরক্ষার পত্রালি দিয়ে দুর্ভেদ্য বৃত্ত রচনা করেন তারপরে। কখনও রজনিগন্ধা দিয়েই শুরু করেন। তার কেন্দ্র নেই। সব সোপান। তাদের দুপাশ ঘিরে জমাট হয়ে থাকে রক্তগোলাপ। তারপরে আকন্দ, হলুদ গোলাপ। এইভাবে নানা নকশা বুনতে থাকেন অরিজিৎ। সাজাতে সাজাতে একদিন নিজেই বললেন, বাঃ। নানা রঙের বোগেনভিলিয়ার পাপড়ি পুরো নকশার উপর ছড়িয়ে দিতে থাকেন অরিজিৎ। পত্ৰং পুস্পম। পত্রং পুস্পম। কানে আসে বাড়ির দিক থেকে একটা তুরীয় উল্লাস, একটা কোলাহল যেন ভেসে আসছে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ে।
উঠতে উঠতে অরিজিৎ একটা আলোর ঝলক দেখতে পেয়ে ভেবেছিলেন বিদ্যুৎ চমকাল। কিন্তু মুসাণ্ডার ঝাড়ের ওপার থেকে সুদেব সরকার উঠে দাঁড়াল। পাশে সমীর। সে-ই ফটোটা তুলেছিল।
কী দাদা। চিনতে পারছেন? অনেকগুলো দিনের অনভ্যাস, অরিজিৎ ভুলে গিয়েছিলেন। এখন সমস্ত ব্যাপারটা ফ্ল্যাশ-গানের ঝলকের মতোই ঝট করে বুঝে ফেললেন। সুদেব তো একজন সাংবাদিক, খুব ভালো করেই ওকে চেনেন অরিজিৎ। ও-ই তাঁর সব কাজকর্মকে সবচেয়ে ভালো কভারেজ দ্যায়। আরে চলো, চলো। বিষ্টি পড়ছে। খোলা আকাশের নীচে কথা হয়? কীভাবে যে আপনার ঠিকানা বার করেছি। চিন্তা করতে পারবেন না অরিজিৎদা।
তাই না কি? কীভাবে করলে? উৎসুক গলায় অরিজিৎ বললেন।
সে সব ট্রেড-সিক্রেট বলা হবে না। সুদেব সমীরের দিকে চোখ রেখে হাসল। ঘরে পৌঁছে অরিজিৎ পা তুলে বসলেন তাঁর তক্তাপোশে। সুদেব বসল সামনের চেয়ারে। অরিজিৎ দেখলেন সুদেব টেপ-রেকর্ডারের সুইচটা অন করছে। চমৎকার ব্যাটারি সেটটা ওর। ঘুরে ঘুরে ছবি নিতে থাকল সমীর। সুদেব ষড়যন্ত্রীর হাসি হাসছে, হঠাৎ অজ্ঞাতবাসের কারণটা কী অরিজিৎদা?
প্রয়োজন ছিল নিশ্চয়ই! গলা গাঢ় করে বললেন অরিজিৎ।
প্রেশার না কি? খুব চিন্তা?
হ্যাঁ। তবে আমার না। মায়ের। চিন্তা তাঁর জন্য?
তা একটা খবর দিলেন না কেন?
খবর? …তাই তো। ভীষণ রকমের অবাক হয়ে অরিজিৎ বললেন, ভুলে গিয়েছিলাম… একেবারে ভুলে…
আমাকেও ঠিক কথাটা বলবেন না দাদা! সাউজি আর সামন্তর সঙ্গে টার্মস নিয়ে গণ্ডগোল তো আপনার গোড়া থেকেই! আপনাকে দিয়েই লাভ তুলবে, অথচ আপনি যা চেয়েছেন তার অর্ধেকও দেবে না…
তাই তো … তুমি জানলে কোথা থেকে?
আরে দাদা, আমাদের সব জানতে হয়, আমরা অবিকল জাগ্রত ঠাকুরের মতো।
তা বটে। কিন্তু সে জন্যে তো আমি চলে আসিনি সুদেব!
জানি দাদা, শর্মিলি সেন… প্লিজ কিছু মনে করবেন না, ওকে এড়ানো ভগবানের বাবারই সাধ্য নেই, তো আপনি!
শর্মি-লি সেন? ও হ্যাঁ। শর্মিলি! একটু নাছোড়বান্দা টাইপের বটে। কিন্তু ওকে এড়ানোর জন্যে আমি চলে আসতে যাব কেন? একেবারে পিয়োর অ্যান্ড সিম্পল কারণটা। মা মরণাপন্ন শুনে মাথার মধ্যে সব কেমন হয়ে গিয়েছিল।
টেপ-রেকর্ডারের নব খটাশ করে বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল সুদেব। মুখে হতাশা।
ঠিক আছে দাদা, আজ বিশ্রাম করি।
এঁদের গেস্ট-হাউসটা ভারি সুন্দর। শান্ত। আরে আমাদের তো স্বস্তি-শান্তি দরকার। যেভাবে বেঁচে থাকি ওকে কি আর বাঁচা বলে? বলে কোনোমতে টিকে থাকা। প্রচণ্ড ঝড় চারদিকে, এলোমেলো বাতাস, তার মধ্যে দৌড়োতে হচ্ছে। এখন, পায়ের ব্যালান্স কে কতটা ঠিক রাখতে পারে। এই তো কথা। দু হাত ছড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙল সুদেব। গেস্ট-হাউজে ফিরতে ফিরতে সমীর বলল, অরিজিৎদাকে কেমন নার্ভাস লাগছিল, খেয়াল করেছিলি?
সুদেব আড়চোখে তাকিয়ে বলল, উনি একজন নট, মনে রাখিস।
তুই বলছিস, সবটাই অভিনয়?
অফ কোর্স। মায়ের অসুখ! লাখ লাখ টাকার প্রজেক্ট, বন্ধু-বান্ধবী, এত্তো জানাশুনো কাউকে কোথাও কোনো খবর দেওয়া নেই। ইয়ার্কি নাকি?
অন্য কিছু বলছিস?
আই বেট।
অগাথা ক্রিস্টির কেসটা মনে আছে? স্বামী আর বান্ধবীর বিশ্বাসঘাতকতার শকে স্মৃতিভ্রংশ হয়ে গিয়েছিল। শর্মিলির সঙ্গে… সে রকম কিছু…
শর্মিলি নয়। শর্মিলি নয়। যবনিকার অন্তরালে কেউ আছে… কেউ… উঃ সুদেব নিজের বাঁ হাতের পাতার ওপর ডান হাত দিয়ে ঘুসি মারল।
মায়ের অসুখ দিয়ে স্মৃতিভ্রংশ হয় না। স্টোরিও হয় না। ঠিকই। তারের পাপোশে জুতোর কাদা তুলতে তুলতে সমীর মন্তব্য করল।
কাল আবার…
উঁহু। কাল নয়। দুটো দিন সময় দে। আমরাও চারদিকটা একটু দেখে নিই। কে জানে সেই শ্ৰীমতী এখানেই কি না!
ইতিমধ্যে আর কেউ গন্ধে গন্ধে এসে পড়লে?
সম্ভব নয়। তবু যদি আসে, আসবে! ঘাবড়াচ্ছিস কেন?
ও কী তুললেন দাদা? মায়ের বাড়ির মেয়েগুলি শিউরে উঠল।
মুঠো ভরা বড়ো বড়ো নীল অপরাজিতা নিয়ে অরিজিৎ, কেন? কী হল? তিনি তুললেন রক্তকরবী। মেয়েগুলি কাঁপছে। অরিজিৎ বললেন, রোজ রোজ একই ফুল দিয়ে কত আর নকশা করা যায়। আজ নতুন কিছু বানাব। এই করবীকে তোরা কী বলিস?
সংগ্রাম।
আর এই নীল অপরাজিতা?
মেয়েদের দলে কাজের ধুম পড়ে গেল। ভীষণ ব্যস্ত। কেউ দীপ সাজাচ্ছে, কেউ ধূপ জ্বালাচ্ছে। কেউ রাশীকৃত পাতা ঝাঁট দিচ্ছে। কেউ ঝরিতে করে জল আনছে। অরিজিৎ শেষ উত্তরটা পেলেন না।
