মা, মা, মা, তুমি বেঁচে আছ তো? কথা আছে। কথা ছিল। অনেক। মা তুমি চুপ করে থেকো না। একটু কথা বলো। একটু।
স্যার, স্যার আপনার কি কোনও কষ্ট হচ্ছে?
ধড়ফড় করে উঠে বসলেন অরিজিৎ।
ঘুমের মধ্যে খুব যন্ত্রণার শব্দ করছিলেন।
ওহ সরি। সরি টু হ্যাভ ডিসটার্ব ইউ।
অরিজিৎ মাথার এলোমেলো চুলের মধ্যে দিয়ে আঙুল চালালেন। ঢক ঢক করে জল খেলেন খানিকটা। নবম সিগারেটটা ধরালেন। ভোর হয়ে আসছে। ঘুমজড়ানো প্ল্যাটফর্ম সব পার হয়ে যাচ্ছে। আধো আধো গলায় চা-গ্রম।
এই এদিকে দেখি, দু গ্লাস, হ্যাঁ। যাক পৌঁছোনো গেল। তাহলে পৌঁছোনো যায়।
ফাঁকা ফাঁকা জায়গাটা। যখন মাকে রাখতে এসেছিলেন, তখন আরও ফাঁকা ছিল। এখন অনেক বাড়ি ঘর। দোকানপাট। চায়ের স্টল। ধাবা। টেম্পো, অটো, সাইকেল রিকশা। কিন্তু বাগান-ঘেরা ছোট্ট বাড়িটিতে বসে মনে হল কিছুই নেই। যা কিছু আপাত পরিচিত, জীবন-যাপনের যন্ত্রাংশ, কিছুই নেই। মা-ও তো নেই। মা সেবা-ভবনে। অথচ এই ছোটো বাড়িটাতে মা যেন আছে। সেই গর্ভধারিণী যিনি এক হাতে বড়ো করে তুলেছিলেন একটি শিশুকে, একটি বালককে। একটি কিশোরের, একটি যুবকের যিনি সব বুঝতেন। এক সময়ে তিনি মা বাবা-দাদা দিদি-বন্ধু-সবই ছিলেন। সেই মা-ই তো? না, মা তো নয়। যেন জননী-জননী মনে হয়।
অল্প বয়সি ডাক্তারটি বললেন, সংকটটা কেটে গেছে। হার্ট ডাইলেটেড। এদিকে প্রেশার বড্ড ফ্লাকচুয়েট করছিল। ভাবিনি বাঁচাতে পারব।
মা ক্ষীণকণ্ঠে বলে, হ্যাঁ, ওকে ভালো করে বলো। নইলে ও ভাববে…
ভৎসনার দৃষ্টিতে মার দিকে চেয়ে অরিজিৎ বললেন, থামো তো তুমি …!
মা বিছানা ছাড়ল। ধীরে ধীরে বাগানে বেড়াচ্ছে আজকাল। ভোরে একবার, সন্ধ্যায় একবার। সঙ্গে অরিজিৎ, মা তুমি বল পাচ্ছ তো শরীরে?
পাচ্ছি। কিন্তু খোকা কত দীর্ঘদিন আমাকে দেখিস না। আমি থাকলেই বা কী? গেলেই বা কী! যুক্তি দিয়ে বোঝ। বোঝবার চেষ্টা করো।
ঠিক আছে। যুক্তি দিয়েই বুঝি। মা, তুমি আছ, কোথাও আছ, এই জ্ঞানটা আমার বেঁচে থাকার পক্ষে কাজ-কর্ম করার পক্ষে দরকার। তুমি দূরে থাকলেও আছ তো! ইচ্ছে করলেই দেখতে পাব। না হলে আমার সব গোলমাল হয়ে যায়।
মা খুব মৃদু কণ্ঠে বলল, আমি থাকলেও কি গোলমাল আটকাতে পারি খোকা?
অরিজিৎ অনেকক্ষণ ধরে ভাবলেন, তারপর বললেন, হয়তো পারো। ইচ্ছে করলে। তাঁর মাথার মধ্যে একটা স্তব্ধতা, আশরীর কেমন একটা শৈথিল্য, আলস্য। প্রবল ঝঞ্ঝাবাত্যা থেকে কোনো গতিকে রক্ষা পেয়ে যদি তার নৌকো পায় সবাতাস, শান্ত জল, সবজ দ্বীপ, তাহলে নাবিক যেমন ডাঙা আর ছাড়তে চায় না, তেমনই।
হঠাৎ একদিন খেয়াল হল। জিজ্ঞেস করলেন, মা, তাই তো! তোমায় গুরু কই?
মা হাসল, বলল, কই? গুরু নেই তো!
তবে? তোমার ঠাকুর? যার জন্য তোমার নাকি সব ত্যাগ হয়ে গেল?
মা সন্তর্পণে ফুলের গাছগুলোতে হাত বোলাতে লাগল, এখানে তোর ভালো লাগছে।
না?
ভালো লাগছে বইকি! এত সুন্দর জায়গা! এমন নিঃশব্দ। আমার ভিতরটা জুড়িয়ে যাচ্ছে।
মা নীচু হয়ে একটা গোলাপ গাছের ফুল সুষ্ঠু ডাল সাবধানে তার দিকে ফিরিয়ে বলল, দ্যাখ।
অদ্ভুত উজ্জ্বল মভ রঙের গোলাপ। আকারে প্রায় একটা মাঝারি চন্দ্রমল্লিকার মতো। মভ গোলাপ অরিজিৎ কখনও দেখেননি। শিশিরে ভেজা। অদ্ভুত কোমল, মসৃণ স্পর্শ।
আরও আছে, মা বলল।
গাছে গাছে যেন তারা ফুটে রয়েছে। সাদা তারা, নীল তারা, আলতা রঙের তারা। বিশাল সাদা ক্যাকটাসের ফুল ফুটেছে। তার বাইরেটা সাদা, ভিতরটা হলুদ।
একদিন আবিষ্কার করলেন খুব ভোরবেলায় মেয়েরা সব ঝুড়ি ঝুড়ি ফুল আনে। আর একটা বেদির উপর মা তাদের সঙ্গে মিলে ফুলের নকশা বানায়। ঘন ঠাসবুনুনি সব নকশা! গন্ধে-বর্ণে যেন নন্দন-কানন।
এই বেদিটাই তাহলে তোমার ঠাকুর! মা কিছুই বলল না। সব উত্তরই যেন তাঁকে নিজেকে খুঁজে পেতে হবে। কিন্তু রোজই ভোরে এসে তিনি দেখতে থাকেন শ্বেতজবা, মভ গোলাপ, কদম্ব, শিরীষ, কুমুদ, জুই, ফুলের পরে ফুল, ফুলের পাশে ফুল। অখণ্ড মনোযোগে নকশা তৈরি হচ্ছে।
মেয়েদের জিজ্ঞেস করেন, কী করিস তোরা? যে যার জীবনের নকশাখানা ফুটিয়ে তোলবার চেষ্টা করছিস নাকি?
যা বলেন, মেয়েরা দুলে দুলে হাসে, তারপর আবার ফুলের মধ্যে ডুবে যায়। দেখতে দেখতে একদিন কেমন জেদ চেপে গেল। অরিজিৎ বললেন, ঠিক আছে। আমিও সাজাব। অনেক নির্মাণ তত করলাম জীবনে, দেখি এটা কেমন পারি। দে আমাকে ফুল দে।
মায়ের বাড়ির মেয়েগুলি হাসে, নিজের ফুল আপনাকে নিজেকেই বেছে নিতে হবে, এটাই নিয়ম।
অরিজিৎ হাত বাড়িয়ে তুলে নিলেন। বিচিত্র বর্ণের সব বোগেনভিলিয়ার মতো পত্রালি।
মেয়েরা বলল, বাঃ, আরক্ষা নিয়েছেন দাদা। ভালো। ভাগ্যবান আপনি। তখন তিনি তুলে নিলেন লাল রঙের, সাদা রঙের, হলুদ রঙের গোলাপ। মেয়েরা যেন রুদ্ধশ্বাসে চেঁচিয়ে উঠল, শরণাগতি। শরণাগতি। আপনি কিন্তু শরণ নিয়ে নিলেন দাদা মনে রাখবেন।
কীসের শরণ? কার শরণ? সব কিছু উড়িয়ে দেবার হাসি হাসতে হাসতে অরিজিৎ ডবল রজনিগন্ধার ছড়িতে হাত রাখলেন। মেয়েরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করল, অ্যাসপিরেশন। অভীপ্সা বাছলেন দাদা। অরিজিৎ তুলে নিলেন আকন্দ। ওরা উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, সাহস, সাহস! ঠিক আছে তবে সাজান এবার। বেদির নৈঋত কোণটুকু আপনার জন্যে ছেড়ে রাখলাম।
