যেমন চোতা ট্রেন, তার তেমনই চোতা ফার্স্ট ক্লাস। বাথরুমে বেসিনটা ফটাস করে খুলে এল। মানে কোনও শ্রীমান তাকে সরাবেন শিগগিরই। কাজ এগিয়ে রেখেছেন। সপ্তম সিগারেটটা ধরালেন অরিজিৎ। রাত বাড়ছে। রাত। আহা রাত? রাত বড়ো ভালো মাল। ঝিকমিক আলো। চেনা মুখ অচেনা। অচেনা মুখ যেন বড়ো চেনা চেনা ঠেকে হে। খাও দাও বেপাত্তা হয়ে যাও। কে তোমায় চ্যাং-দোলা করে তুলে নিয়ে গেল, কার সঙ্গে কী বোঝাপড়া হল, কাকে কাকে চুমু খেলে, সব রঙিন বুদবুদের মতো ফেটে যায়, আবার গজায়, আবার ফাটে, আবার গজায়। আর সকাল? সকাল হল শালা ঘেয়ো কুকুরের বাচ্চা। ছাল চামড়া সুদু উঠে গেছে। ছ্যাঃ। খোঁয়ারি ভাঙার সকাল। অন্য সময়। অন্য সময়ে মেজাজে থাকলে তুমি সকাল, দুপুর, বিকেল কিছুর পরোয়া করো না অরি বিশ্বেস। করো না কি? নাঃ, করি না। কাজ করি। কা-জ। এমন কাজ যে হোল ওয়ার্ল্ডের তাক লেগে যায়। এই পাঁচ ফুট সাড়ে এগারো ইঞ্চির খোলে ডিনামাইট ঠাসা আছে হে সামন্ত। পাল্লা দিতে চেষ্টা কর। পারবি না।
আরেকটু পরেই এরা ডিনার দেবে বলেছে। ইংলিশ ডিনার আবার। হাঃ হাঃ। পায়রার ঠ্যাং, বেমালুম পায়রার ঠ্যাং চালাবে মোরগার ঠ্যাং বলে। ঘোড়ার পেচ্ছাপের মতো চা খাইয়েছে কয়েকবার। এবারে পায়রার ঠ্যাং। রাসকেল সব, স্কাউন্ট্রেল। গোটা রেলওয়েজ, রেলওয়ে মিনিস্ট্রি। এদের চাকরিতে যে যেখানে আছে, সব, সব। পয়সা নেবে, গলায় গামছা দিয়ে, দেবার বেলায় লবডঙ্কা। এদিক থেকে হিন্দি ফিলমও সৎ। পাবলিক রেপ চায়, রেপ দেয়, মারদাঙ্গা চায়, মারদাঙ্গা দেয়। আধ ন্যাংটো মেয়েছেলে দেখতে চায়, তো তাই দেয়।
সুটকেসটা খুললেন অরিজিৎ। মাল বার করতে হবে। নইলে পায়রার ঠ্যাং গলা দিয়ে নামবে না। সামনে আবার তিনটি পুঙ্গব বসে। বহুক্ষণ থেকে গবাদি পশুর মতো চেয়ে আছে। হয় বাইরের দিকে, নয় তাঁর মুখের দিকে। চিনতে পেরে থাকবে। চেনো বাবা, চেনো। খালি ভাব জমাতে যেয়ো না। আর চরণামেত্তোও আশা কোরো না। যারা একা একা মাল এনজয় করতে পারে না, অরিজিৎ তাদের দলে নয়। তা কয়েক ঢোঁক খাবার পরে দেখলেন পুঙ্গবগুলি প্রকৃতি দেখছে। অদূর ভবিষ্যতে যখন গপ্পো ফাঁদবে তখন কিন্তু ব্যাপারটা অন্যরকম হয়ে যাবে, জানিস ফটিক, অরিজিৎ বিশ্বাসের সঙ্গে সেবার ট্রাভল করছিলুম। কী সদাশয় ভদ্রলোক খুব গপ্পে। যা জমেছিল না। শেষ কালটা মানিক-অরিজিন্দা, অরিজিন্দা-মানিক … ইত্যাদি ইত্যাদি।
ট্রেনটা হঠাৎ হেঁচকি তুলে থেমে গেল। এতক্ষণ বেশ আমি যাব না, তুমি যাবে, তুমি যাবে না আমি যাব না করে যে করে হোক চলছিল। এখন যেন গোঁত্তা খেয়ে ঘুড়ি লাট খেয়ে পড়েছে। বোতলটা ঢুকিয়ে সুটকেসের ডালা বন্ধ করে দিলেন অরিজিৎ। বাইরে পৃথিবীর আদি রং, নিকষ কালো। বন-জঙ্গলের মতো মনে হচ্ছে জায়গাটা। উঠে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। উলটো দিকের সিট থেকে একটি যুবক চেঁচিয়ে উঠল, স্যার, এখানে নামতে যাবেন না, অন্ধকার, অনেক নীচু, তা ছাড়া ভীষণ ডাকাতি হয় এ লাইনে। দরজা একদম খুলবেন না, কাইন্ডলি।
অপাঙ্গে একবার চেয়ে দেখলেন অরিজিৎ। ডাকাত। মানে দস্যু। মানে গুন্ডা? অর্থাৎ মাফিয়া? সর্বনাশ। তিনি ফিরে এসে অষ্টম সিগারেটটা ধরালেন। হঠাৎ মনে হল পকেটে বিছে কামড়াচ্ছে। টেলিগ্রাম। টেলিগ্রাম। হোটেলের কাউন্টারে খোঁয়ারি ভাঙার সকালে আকাট টেলিগ্রাম একখানা। পাঁচ দিন না সাড়ে ছ দিন পার হয়ে গেছে। পোস্টাল সার্ভিস কী তোর বাপের? যে টেলিগ্রাম করলেই সঙ্গে সঙ্গে দিতে হবে। কী আছে ওতে জানেন অরিজিৎ, তবু আরেকবার খুলে পড়তে লাগলেন। তিনটে শব্দ। ব্যাস আর কিছু না। এখন তাহলে আমি কী করব। হাততালি কুড়োতে পারি, কনট্র্যাক্ট সই করতে পারি। মাল খেতে পারি। কিন্তু হনুমানের মতো লম্ফ তো দিতে পারি না। আর সব স্পোর্টস ছেড়ে এখন পশ্চিমবঙ্গে এই লম্ফ দেওয়ার খেলাটিই প্রোমোট করা উচিত। ট্রেন ধরবে? পাথর পাতা স্ট্র্যান্ড রোড দিয়ে রে রে করে আসছ! জ্যাম। কুছ পরোয়া নেই। গুনে গুনে দশ পা পিছিয়ে যাও তারপর রই রই করে স্পিড় নিয়ে লাফ ঝাড়ো, এক লম্ফে হাওড়ার পুল, দুই লম্ফে হাওড়ার নতুন অ্যানেক্স। হাজরা মোড় থেকে ঠনঠনে পর্যন্ত জলে ভাসছে? পঁচিশ মিনিটের প্রবল বর্ষণে কলকাতার জনজীবন বিপর্যস্ত? আবারও ওই উল্লম্ফন ভরসা। লাফ দাও বঙ্গ সন্তান, লাফ দাও। লাফ দিতে দিতে শিরদাঁড়ার তলার হাড়টি বাড়তে পারে। কার্টিলেজ, শক্ত হাড় নয়। এর নাম অভিযোজন। সোজা বাংলায় অ্যাডাপ্টেশন। এয়ার পিলো মাথায় দিয়ে শুয়ে পড়লেন অরিজিৎ।
***
আমি এবার যাই খোকা, আমার কেমন সব ত্যাগ হয়ে যাচ্ছে।
সে কী? রাগ করেছ? এত অভিমান করে না মায়ি। বিহার শরিফে ট্রাক নিয়ে গেছি। ন দিনের জায়গায় পনেরো দিন। এরকম একটু আধটু হয়েই থাকে মাগো। অপরাধই যদি হয়ে থাকে এবারের মতো মাফ করে দে মা। আর কখনও এমন হবে না।
না রে, অভিমান-টান নয়। একটুও উদ্বেগ হয়নি আমার। সেটাই আশ্চর্য। জানিসই তো আগে তোর ফিরতে দেরি হলে কেমন মুখ শুকিয়ে আমসি করে থাকতুম। এখন, এবার এসব কিছু হল না খোকা। তুই সাবালক হয়ে গেছিস। নিজের পথে চলবি।
