অরিজিৎ বিশ্বাসকে শেষ দেখা গিয়েছিল শর্মিলি সেনের গাড়িতে। শর্মিলি সেন মানে শ্যামলী তরফদার। প্রচারের প্রয়োজনে পালটে ফেলা হয়েছে নামটা। প্রাচীন শ্যামলী হয়েছে মডার্ন শর্মিলি। তরফদারটা সেতারে ছাড়া চলে না এ বিষয়ে সবাই এক মত। এবং পদবি খুঁজতে খুঁজতে স্বভাবতই সেন। সেন পদবিটা বাংলা-জয়ী। যেমন বল্লাল সেন, সুকুমার সেন, বনলতা সেন, সুচিত্রা সেন …। দুষ্টু লোকেরা বলে শর্মিলি নয়, এঁটুলি। অরি বিশ্বাসের লেটেস্ট। শর্মিলিও রয়েছে ছবিটায়। তারই সাদা অ্যামবাসেডার-এ অরিজিৎকে শেষ দেখা গিয়েছিল। শর্মিলির শফার, ক্যামেরাম্যান ধীরু ব্যানার্জি এবং অরিজিতের নিজস্ব মেকআপম্যান শিবসাধন সেনাপতি ঠেসেটুসে তাঁকে সাদা অ্যামবাসাডরটায় তুলেছিলেন। অরিজিৎ স্ববশে ছিলেন না।
চোদ্দো পনেরো লাখ খরচ হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। বাংলা ছবির পক্ষে যথেষ্ট। প্রচার দেওয়া হচ্ছে খুব। ডিস্ট্রিবিউটার মুখিয়ে আছে। সবারই ধারণা ছবি পড়তে পাবে না। এমত সময়ে অরিজিৎ সেটে এলেন না। প্রথমেই ফোন করা হল শর্মিলির ফ্ল্যাটে। হয়তো সেখানেই মশগুল হয়ে রয়েছে। আর্টিস্টরা যে যত প্রতিভাশীল হোক না কেন আসলে সব… সামন্ত একটা মধুর গালাগাল উচ্চারণ করল মনে মনে। কিন্তু না, শর্মিলি জানে না। না, সেদিন ওঁকে ওঁর হোটেলের ঘরেই পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। না, উনি শর্মিলির ফ্ল্যাটে যাবার অবস্থায় ছিলেন না।
এবার কোথায়? হোটেলে।
না, সাতাশে অক্টোবর থেকে অরি বিশ্বাসের চাবি ম্যানেজমেন্টের কাছে, ঝুলছে।
আসেননি। না, একবারও না।
অম্বরীষ-এর অফিসে ফোন করা হল।
আপনারা জানেন না, আমরা জানব? অভিমানী উত্তর।
সত্যি সত্যি জানেন না?
মানে? আপনারা কি ভাবেন ওঁকে আমরা কিডন্যাপ করব?
তবে অম্বরীষ থেকে কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধবদের ঠিকানা মিলল। প্রায় সকলেই বললেন, অরি বিশ্বাসের কোনো সংবাদই তাঁরা রাখেন না। একজন রেগে মেগে বললেন, আপনারা, এই আপনারাই চাঁদির জুতো মেরে তাকে আমাদের কাছ থেকে ফুসলিয়ে নিয়েছেন। আবার এত বড়ো আস্পদ্দা যে আমাদের কাছেই তার খোঁজে এসেছেন। পালিয়েছে? খুব ভালো কথা। এমনটাই চাইছিলুম। খোঁজ পেলেও বলব না। পরবর্তী অভিযান আত্রেয়ী ভট্টাচার্যের আস্তানায়। আত্রেয়ী অরিজিতের ভূতপূর্ব স্ত্রী। অনেক চেষ্টা করে তাঁর ঠিকানা জোগাড় হয়েছে। আসলে ব্যাপারটা খুব যাকে বলে ডেলিকেট। আত্রেয়ী দেবীও এক সময়ে বহুদিন অম্বরীষ-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, নাটকে অংশ নিতেন না। উনি ছিলেন শিল্পী। সেট তৈরি করা, আঁকাজোকার কাজ, পাবলিসিটির জন্যে লে-আউট তৈরি করা এইসব দায়িত্বে ছিলেন। অরিজিতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিঁড়ে যাবার পর অম্বরীষকেও উনি ছেড়েছেন। অম্বরীষ-এর ক্ষতির খাতায় উনি দু-নম্বর। আজকাল এক ইনটিরিয়র ডেকোরেটর্স সংস্থায় কাজ করেন। তা, তাঁর অফিসে ফোন করায়, অরিজিতের খবর জিজ্ঞেস করা হচ্ছে শুনে উনি দ্বিতীয় শব্দ উচ্চারণ না করে ফোন নামিয়ে রাখলেন। অগত্যা ওঁর বাড়ি। দু কামরার একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট। উত্তর কলকাতার একটা সরু গলিতে। সামন্তকে উনি চিনতেন না বলেই বোধহয় দরজা খুলে দিয়েছিলেন। অরিজিতের প্রসঙ্গ তুলতেই বললেন, আর কত সরববা?
মানে? আপনি কী বলছেন আমি ঠিক …
বলছি, আর কত সরববা? এই দেখুন, আট বাই দশ দুখানা ঘর কুল্লে, রান্না আর খাওয়া এক জায়গাতেই সারি। বাথরুমটা রান্নার জায়গার একেবারে পাশেই। উত্তর-পশ্চিমের ফ্ল্যাট। শীতকালে কী ঠান্ডা ধারণা করতে পারবেন না। বাবা, মা, ভাই, বোন কেউ নেই। মানে, থেকেও নেই। আর কোথায়? আর কত সরবো?
যদি একটা ধারণাও দিতে পারতেন। একটা আইডিয়া… উনি কোথায় যেতে পারেন।
আইডিয়া? আমার মাথায় অত আইডিয়া আবার খেলে না, বুঝলেন। কী নাম আপনার? সামন্ত? আমি ওই ব্রথেল-ট্রথেল পর্যন্ত জানি। তারপর জাহান্নমের পথে যেতে ঠিক কতগুলো, কতরকম স্টপ আছে, থাকে, আমার জানা নেই। এবার আপনি আসুন। কই উঠুন? কুইক। আমার কাজ আছে।
সামন্ত কপালের ঘাম মুছতে মুছতে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল। বাপরে। কী মহিলা। দিব্যি ঠান্ডা, শান্ত-শিষ্ট মনে হয় দেখলে। এ যেন কোল্ড ড্রিংক-এর বোতল। হাত বোলালে ঠান্ডা। ছিপি খুললেই ফোঁসস।
***
ট্রেনটা আরও স্পিড় নিচ্ছে না কেন? কী হবে এতগুলো চোতা স্টেশনে থেমে? নিদারুণ অধৈর্যে, বিরক্তিতে ষষ্ঠতম সিগারেটটা শেষ না করেই বাইরে ছুড়ে ফেলে দেন অরিজিৎ বিশ্বাস। এক ব্যাটা ভিখিরি লোপ্পা ক্যাচের মতো সেটা লুফে নিল। এটাই একটা অকাট্য প্রমাণ যে যতটা স্পিডে স্টেশন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা ততটা স্পিড নিচ্ছে না গাড়িটা। প্লেনে যাওয়ার জায়গা নয়। গাড়িতে গণ্ডগোল। গ্যারাজে অতএব। একগাদা টাকা দিয়ে ঘটা করে বিদেশি গাড়ি কেনবার মজাটা এবার বোঝো হে বিশ্বেস। অতীন, সর্বেশ্বর, মণীশ সবাই বারণ করেছিল। হো হো করে তাদের কথা উড়িয়ে দিয়েছিলে। দিয়েছিলে তো? ভেবেছিলে গ্রুপ থিয়েটার হল শো-বিজ-এ মিডল ক্লাস। একেবারে মিডল মিডল ক্লাস। বড়ো বড়ো বক্তিমে করো সুযোগ পাবে। ফটাফট হাততালি। হ্যাঁ, তা-ও। রিভিউ?—প্রচুর প্রচুর। কিন্তু লক্ষ্মী কখনও ঝেড়ে কাশবে না, দাদা! ঢাকের দায়ে মনসা বিককিরি। তা সেই গ্রুপ থিয়েটারের ওরা দেশি-বিদেশির তফাত আর কী বুঝবে?
