আর দুই ঋতা সেন শ্রদ্ধায় আপ্লুত হয়ে গেল।
সে কী? উনি মানে… আমি তো কিছুই… অত সংকোচের কারণ নেই। শিবপদ একজন শখের ইনটিরিয়ার ডিজাইনার। তুমি ওর সাহায্য নাও। তোমার উঁচ সুতো থেকে খাট আলমারি পর্যন্ত সব ব্যবস্থা ওই করে দেবে।…।
ঘোষদস্তিদারের জালে মাছ পড়ল। অনেক দিন পর।
ঘষ ঘষ ঘষ ঘষ,—চলল ঘষামাজা, নারকোল দড়ি, শিরীষ কাগজ, পাথর, অ্যাসিড, প্লাম্বার, ইলেকট্রিশিয়ান, মোজেইকের মিস্ত্রি, ঝালমিস্ত্রি, রঙের মিস্ত্রি, ছুতোর … কাজ কি একটা। মাসখানেকের মাথায় ঋতা সেনের ফ্ল্যাট ঝকঝক করতে লাগল। শুধু রং পালিশই নয়। সেখানকার যেটি সেখানে সেটি ফিট করে দিয়েছেন শিবপদ। গৃহপ্রবেশ হয়ে গেল।
সন্ধেবেলা। দৈনিক আসরে শিবু অনুপস্থিত। রাত দশটা নাগাদ ফোন যায়।
কী হল শিবু। আজ যে বড়ো এলে না।
আর বলবেন না, কতকগুলো লাইটের শেড কিনতে এজরা স্ট্রিটে গিয়েছিলুম। ফেরার পথে মহামিছিল। তিনটি ঘন্টা বসে বসে বাড়িই ফিরেছি সাড়ে আটটা।
শেড কার? ঋতার বাড়ির?
আজ্ঞে।
এখনও শেষ হয়নি?
এই খুচখাচ।
দ্বিতীয় দিন উপস্থিত হন শিবপদ। আসরে আজ ভালো বোতল বেরিয়েছে। খাঁটি ভদকা। সঙ্গে বড়ো বড়ো চিংড়ি মাছ ভাজা, ব্যাটারে ডুবিয়ে বেশ মুচমুচ করে।
বাঃ মাছগুলো তো জববর।
ঋতা দিয়ে গেল খানিক আগে। প্রায়ই দিচ্ছে—উদাস গলায় বলেন ভুবনমোহন।
বারণ করি, শোনে না। তা দিক। দিতে যদি তার ভালো লাগে। ও… তোমার তো আবার চলবে না… অমৃতে অরুচি। মনেও ছাই থাকে না। ওরে অ রামহরি শিবুবাবুর জন্যে কী ভেজেছিস দিয়ে যা না।
কদিন বাদ দিয়ে শিবপদবাবু খুরখুর করে ঢুকছেন।
কী হল ছক পাডুন!
ভুবনমোহন মুখ গোঁজ করে বসে আছেন।
গোঁসা কেন? আরে এই নিন। আমি পাড়ছি। বলুন কী নেবেন? সাদা?
দ্যাখো শিবু ইচ্ছেমতো আসবে-যাবে ওভাবে গেমের কনাটিনুয়িটি থাকে না।
কী করব বলুন, একা মহিলা, একটা ভার নিয়েছি। না তো করতে পারি না।
কেন? কী হল?
ওই আজকাল উঠেছে না। ফেং শুই।
সে আবার কী?
আর বলেন কেন? এদিকে বাস্তু শাস্ত্র, ওদিকে ফেং শুই। আজ মিস্তিরি ডেকে নর্থের দেয়াল থেকে সাউথ দেয়ালে আলমারি সরাই। পশ্চিমে নাকি বাথরুম চলবে না। আরে সারা বাড়িতে পশ্চিমে পর পর টয়লেট। তো কী করি, কোন ম্যাঙ্গো লেনের ঠিকানা, রিপন লেনের ঠিকানা, খুঁজে খুঁজে এক আলুওয়ালিয়া বাস্তু বিশেষজ্ঞ আর চ্যাং সায়েব ফেং শুই এক্সপার্ট এদের কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়া, জিনিস কেনা, লাগানো, ক-দিন দাদা এই করেছি। বাড়ি যাবার সময় পাইনি।
বলো কী? মঙ্গলদীপেই ছিলে নাকি?
না, তা আর কী করে থাকি! ঘোষদস্তিদার হাসেন। সারাদিন মিস সেনকে নিয়ে ঘোরা…
খাওয়াদাওয়া কোথায় করলে?
চমৎকার চমৎকার মাদ্রাজি, গুজরাটি শাকাহারী রেস্তোরাঁ খুলেছে ওদিকে, চলুন একদিন আপনাকে নিয়ে যাব।
আমাকে নিয়ে কি আর শাকাহারী ভালো লাগবে শিব!
খোঁটা দিচ্ছেন! হঠাৎ কেমন খিচিয়ে ওঠেন শিবপদ। যেন ভেতর থেকে কে একটা কী একটা দাঁতে নখে বেরিয়ে আসতে চাইছে।–নিজে যখন মৌজ করে চিংড়ি ভাজা খান! শিব খ্যাঁক করে বলেন।
তুমি তু-তুমি… তো-তোমার এত বড়ো সাহস! ভুবনমোহন রেগে তোতলাতে থাকেন।
শিবপদ অবশ্য ক্ষমা চান। আবার আসর বসে। গেলাস চলে। দাবার ছক পড়ে। লুডোর কাটাকাটি হয়। কিন্তু আবার একদিন খিচিয়ে ওঠেন, না শিবপদ নয়, ভুবনমোহন। তিনিও অবশ্য ক্ষমা চান। এরপর বোতল খোলে, চাট আসে, দাবার দান পড়ে। কিন্তু আবার একদিন খিঁচ, এবার শিবপদ।
এইভাবেই একদিন দুই বুড়োর মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে যায়।
নকশা
শুনেছিস? অরি বিশ্বাস বেপাত্তা—সুদেব সরকার বলল সমীরকে, এখনও পাবলিক জানে না।
বলিস কি? এ তো অবিশ্বাস্য খবর? ফার্স্ট পেজের অ্যাঙ্কর-এ যাবে।
হ্যাঁ। সে ডিটেলস বার করতে পারলে। খুঁজে আনতে পারলে তো আর দেখতে হচ্ছে না। এখন ব্যাপারটা খুন, না অ্যাবডাকশন, না স্বেচ্ছা-পলায়ন … সেটা সার্কামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্স থেকে বার করতে হবে। একটু টিকটিকিগিরি আর কি।
সমীর বলল, এই সেদিন নতুন ছবির মহরত হল অত ঘটাপটা করে, অত খানাপিনা নাচা-গানা। এত উল্লাসের কেন্দ্রীয় কারণই তো অরি বিশ্বাস।
আবার কি? কত দিন থেকে জাল পেতেছে বল তো। এতদিনে ধরা পড়ল। ধাড়ি কাতলা। আগের ছবিগুলোর দুটোই তো পাবলিক গপাগপ খেল। প্রথমটা একটু বেশি নাটুকে হয়ে গেছিল, তা-ও।
এবারেরটা জানিস তো? অরিজিৎ-প্রতিভার বিভিন্ন দিকের দর্পণ বিশেষ।
কী রকম?
আরে আমি তো প্রেস-কার্ডে গিয়েছিলাম। পরিচালক সামন্তই বলল, এবার উনি পঁচিশ বছরে সা-জোয়ান ছোকরা থেকে বাহাত্তুরে বুড়ো পর্যন্ত সাজছেন। লিডার। অরিজিতের অ্যাকটিং, অরিজিতের মেকআপ-এর উপরই ছবিটা দাঁড়িয়ে আছে।
সমীর বলল, হতেই পারে। স্টেজের উপর তো চাষাভুসো সাজলে মনে হয় এই বুঝি দেহাত থেকে ধরে নিয়ে এল। আবার আঁতেল হয়ে নামলে মনে হয় আরে, এই তো সেদিন ইনিই কফিহাউসের লর্ডস-এ বসে যুক্তি-তর্ক-গপ্পো কেঁদেছিলেন। আচ্ছা সুদেব, ওঁর অম্বরীষ-এর কী হবে? বা হচ্ছে?
চলছে। একেবারে তো ছেড়ে দেননি। টিমটা গড়ে ছিলেন প্রাণ দিয়ে। কাজেই চলছে। ওঁর নামেই এখন পয়সাগুলো উঠে আসছে সব। তবে ওরা একটু মিইয়ে গেছে। আমার ভাইয়ের বন্ধু আছে তো ওখানে। বলছিল টিম-ওয়ার্ক খুব ভালো কথা। কিন্তু সেটা করাতে ব্যক্তিত্ব লাগে। জ্ঞান, ভালোবাসা এবং ক্রোধও লাগে। সেসব অরিজিৎ বিশ্বাসের মতো আর কারও নেই। সত্যি, ওই রকম চলা-বলা-গলা পালটাতে আর কাউকে দেখলাম না। এক কেয়া চক্রবর্তী পেরেছিল ভালোমানুষ
