দুই বুড়োর বোঝাপড়া যাকে বলে যোলো আনার জায়গায় আঠারোআনা। বন্ধুত্বে বেশ আঠা। একদিন দেখা না হলে দুজনেই বিরহের দীর্ঘশ্বাস ফেলতে থাকেন। সেবার শিবপদের হল ভাইরাল ফিভার। তিনদিন দেখা নেই। দ্বিতীয় দিনেই ফোন তুললেন দত্তগুপ্ত।
কী হে শিব, জ্বর কত?
থার্মোমিটার তো বলছে দুই।
দুই জ্বরেই কাবু হয়ে পড়লে?
তা পড়লুম।
বলি খাওয়াদাওয়া বন্ধ নাকি? একটু করে চিকেন স্যুপ খেতে শুরু করো, বোস্টমগিরি কদিন বন্ধ থাক।
ওয়াক উঠবে যে!
নাক টিপে খেয়ে নাও। এসব রোগে ফুডটাই আসল। বুঝলে?
বুঝলুম।
আজকের কাগজটা দেখেছিলে?
এখনও সময় পাইনি।
বলছি শোনেনা। ওই তোমাদের সল্টলেক গো, হেরইনের ডেন ধরা পড়েছে। বাইরে থেকে ধর্মীয় আশ্রম, ভেতরে সব চরসে কুঁদ। মন্ত্রীর ছেলে, পুলিশ কমিশনারের মেয়ে, চিফ সেক্রেটারির বউ—তবে আর বলছি কেন? হাই-টেক ডেন। কত তার কায়দাকানুন, মেম্বারশিপ কার্ড, শাকাহারী রেস্তোরাঁ… ভেতরে এই ব্যাপার। আমাদের টাইমে…
গল্প শুরু হয়ে যাবে। দেড়টি ঘন্টা কাবার করে, তবে ফোন রাখবেন দত্তগুপ্ত।
আর দত্তগুপ্তর অসুখবিসুখ। হয়ই না বলতে গেলে। একবার বাথরুমে পড়ে গিয়ে দেড়মাস শয্যাশায়ী ছিলেন। সে সময়টা শিবপদকে দত্তগুপ্ত ভবনেই আস্তানা গাড়তে হয়েছিল।
ভুবনমোহন দত্তগুপ্তর কাছ থেকেই মঙ্গলদীপ বহুতলের তিনতলার দক্ষিণ পশ্চিমের ফ্ল্যাটটা শেষ অবধি বিক্রি হওয়ার সংবাদটা পেয়েছিলেন শিবপদ।
মঙ্গলদীপ হয়েছে বছর তিনেক। সব ভরতিও হয়ে গেছে। সাউথ-ওয়েস্টটাও হয়েই গিয়েছিল, কিন্তু ক্রেতা তিনকড়ি সান্যালের ওটাতে বাস করার ইচ্ছে ছিল না। সে এটা গেস্টহাউস বানাতে চাইছে খবর পেয়ে ফ্ল্যাটের অন্যান্য বাসিন্দারা রুখে দাঁড়াল। পাড়ার মাতববর ব্যক্তি হিসেবে ভুবনমোহনের সইসাবুদ সমর্থন এসবও তারা জোগাড় করে। সেই থেকেই ফ্ল্যাটটার খোঁজ রাখতেন ভুবনমোহন। তিনকড়ি অবশেষে ওটাকে বিক্রি করে দিয়েছে। কিনেছেন এক মহিলা। এই খরিদ নিয়েও বহু ঝামেলা। মহিলা অবিবাহিত না ডিভোর্সি কেউ জানে না। কিনেছেন, থাকবেন একা একা। এতে ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের একটু খুঁতখুঁতুনি ছিল।
তাঁরা ভুবনমোহনের কাছে দরবার করেন।
একটা মিষ্টি গলা দুদিন অন্তর ভুবনমোহনকে ফোনে ডাকতে থাকে।
হ্যালো, দত্তগুপ্ত বলছি।
আমি ঋতা সেন বলছি, মঙ্গলদ্বীপ-এর তিনতলার সাউথ-ওয়েস্ট ফ্ল্যাটটাতে কি কোনো গোলমাল আছে? মানে ওনারশিপে?
কেন আপনি কাগজপত্র দেখেননি?
না, রেজিস্ট্রি তো এখনও হয়নি কিনা! দেখুন এসব কথা ফোনে হয় না। বাড়িতে আসুন।
সে তো খুব ভালো কথা। আমি আপনাকে বিরক্ত করতে সংকোচ বোধ করছিলুম।
অতএব মহিলা আসেন। বছর চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশের মহিলা। চমৎকার চেহারাটি রেখেছেন। ইনি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভালো চাকরি করেন। ঋতা সেনকে ফ্ল্যাটটি পাইয়ে দিলেন ভুবনমোহন। অর্থাৎ মঙ্গলদ্বীপ-এর বাসিন্দাদের সঙ্গে বৈঠকে বসলেন। বোঝালেন—আপত্তির কোনো প্রয়োজন নেই। একলা মহিলা যাবেনই বা কোথায়! ইত্যাদি ইত্যাদি।
ঋতার স্বভাবতই এখন ভুবনমোহন-নির্ভরতা চক্রবৃদ্ধিহারে বেড়ে যায়। এখনও তিনি ফ্ল্যাটে আসেননি। কিন্তু অফিস ফেরত তিনি প্রায়ই ভুবনমোহনের এখানে টু মেরে যান, সঙ্গে থাকে কোনোদিন নিজের হাতে বেক করা কিছু সুখাদ্য, কিংবা ভালো রেস্তোরাঁ থেকে আনা কিছু
জিভে-জল, একদিন সসংকোচে এক বোতল আইরিশ-ক্রিম নিয়ে হাজির। আপনি লিকিয়র খান তো!
আরো না খাই তো তুমি এনেছ বলে খাব! অত কিন্তু কিন্তু করছ কেন? একটু আধটু খাই বইকি! সারাজীবন খেতে হয়েছে চাকরির খাতিরে, এখন একটু না খেলে কি চলে মা?
তবে ভুবনমোহন শুধু উপহার নিতেই জানেন না, দিতে জানেন বিলক্ষণ। একদিন ঋতা সেনকে তিনি একটি প্যাকেট এগিয়ে দেন।
কী এটা, মেসোমশাই!
এখন, ঋতা তাঁকে মেসোমশাই কেন বলে ভুবনমোহন তা বুঝতে পারেন না।
মাসিটি থাকতেন তো তাঁর মেসো হওয়া সাজত। কিন্তু মাথা নেই অথচ মাথাব্যথা! বাই হোক, মেয়েদের মন আর মেয়েদের জিভ, একবার ভেবে বা না ভেবে যখন জিভের জগায় এনে ফেলেছে তখন আর ফেরানো যাবে না।
ভুবনমোহন বললেন—দ্যাখোই না খুলে।
প্যাকেট খুলতে একটি চমৎকার দক্ষিণী শাড়ি বেরিয়ে পড়ল।
কেমন, পছন্দ হয়?
কার জন্য বলুন।
তোমার জন্যে, আবার কার জন্যে।
সে কী! ও মা! কেন?
কেন মেসোমশাই কি তোমাকে একটা সামান্য উপহার দিতে পায়ে না? এই শাড়িটি পরে তুমি গৃহপ্রবেশ করবে।
বিমর্য হয়ে ঋতা বলল, আর গৃহপ্রবেশ। জানলা দরজার রং নেই। ভেতরে সুষ্ঠু ন্যাড়া প্লাস্টার অফ প্যারিস। বাথরুমে আয়না নেই, ফ্লাশ কাজ করছে না। ছুটি পড়ক, মিস্ত্রি খাটাবার সময় পাই, তারপরে ওসব ভাবা যাবে।
এই কথা! আগে বলোনি কেন? তোমাকে মিস্ত্রি খাটাতে হবে কেন? আমার লোক জানা আছে। নিশ্চিন্তে ফ্ল্যাটের চাবি দিয়ে দাও। গুছিয়ে সব করে দেবে। কিছু ভাবতে হবে না।
হবি তো হ, শিবপদ ঘোষদস্তিদার ধোপদুরস্ত হয়ে ঠিক এমনি শুভক্ষণেই প্রবেশ করলেন।
নাও ঋতা, তোমার মিস্ত্রিমশাইয়ের সঙ্গে পরিচয় করো। ডক্টর শিবপদ ঘোষদস্তিদার।
হঠাৎ খামোখা ডক্টরটা ভুবনমোহন একটা মজার মেজাজেই যোগ করেছিলেন, কিন্তু এতে দুটি কাজ হল। এক শিবপদ কেন কে জানে বেজায় খুশি হয়ে গেলেন,
