দত্তগুপ্তরও আর কোনো সাহারা, কোনো মরূদ্যান নেই। ছেলেপিলে ক-টিকে যথেষ্ট উচ্চশিক্ষিত করার জন্য দত্তগুপ্ত সরকারি অর্থ ও সরকারি সুবিধে অকাতরে ব্যয় করেছেন। নাড় খেয়ে-দেয়ে নাড়গোপালরা সব ঘোষণা করলেন-উত্তরমেরু দক্ষিণমেরুতে পর্যন্ত থাকা যায়, কিন্তু এই হিন্দুস্তানের ন্যায় ওঁচা দেশে আর নয়। এঁরা পৃথিবীর বিভিন্ন অভারতীয় নগরে-বন্দরে থানা গেড়েছেন। দত্তগুপ্তর একটি শোফার, তিনটি কাজের লোক, একটি বাড়ি। ঠিকেদার ঘোষদস্তিদারেরও অনুরূপ। তাঁর তিনটি বাড়ি, দুটি কাজের লোক, শোফার নেই, কেননা আর তিনি গাড়ি রাখেন না। এই তিনটি বাড়ি এবং দত্তগুপ্তর বাড়িটিও তিনিই সরকারি ঠিকের টাকা দিয়ে ভারি সুন্দর শক্তপোক্ত করে বানিয়ে নিয়েছিলেন। জমি ছাড়া বাড়িবাবদে খরচ তেমন কিছু হয়নি। বাড়িগুলির মোটা ভাড়া থেকে তাঁর জীবনধারণের অর্থ আসে। তিনি নিরামিষাশী, এখনও নিজের বাজার নিজে করেন,
পত্নী বেঁচে থাকতেও শখের রান্না করতেন। কৃপণও আছেন বেশ। দুটি ঠিকে লোক নিয়ে তাঁর দিব্যি চলে যায়। কথাবার্তায় মিছরি মাখানো, তাঁর নীচের তলার ভাড়াটেরাই অসুখে-বিসুখে তাঁর দেখাশোনা করে। দত্তগুপ্তর ব্যাপারস্যাপার আলাদা। তাঁর মোটা পেনশন আছে, সঞ্চিত অর্থের সুদ, ডিভিডেন্ড ইত্যাদি আছে। উপরন্তু তাঁর ছেলেমেয়েরা মাঝে মধ্যেই তাঁকে পাঁচশো কি হাজার ইউ-এস. ডলার, হাজার দেড়েক অস্ট্রেলিয়ান ডলার, একশো কি দুশো পাউন্ড এই রকমের গিফট পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাঠিয়ে থাকে। তাঁর বাড়ির একতলাটিও একটি ব্যাংককে ভাড়া দেওয়া আছে। তিনি বেশ জমকালোভাবে থাকতে ভালোবাসেন। সপ্তাহে অন্তত তিনদিন শোফার-ড্রিভন ডিলাকস অ্যামবাসাডরে চড়ে হাওয়া খেতে বেরোন, কোনোদিন বাইপাসের দিকে, কোনোদিন ভিকটোরিয়া, কোনোদিন লেক, কোনোদিন আবার নিছক গঙ্গার ধার। বেড়ানোর সময়ে তাঁর সঙ্গী থাকেন ঘোষদস্তিদার। সন্ধেবেলা হলেই তাঁর একান্ত পানের আসর বসে। শ্রেষ্ঠ সরা, অর্থাৎ স্কচ হুইস্কি, তিন কি চার পেগ মেপে খান, সঙ্গে থাকে যথেষ্ট অনুপান সহপান। স্প্রিং চিকেন, মাটন, শাম্মি কাবাব, রসালো রেশমি কাবাব। মুচমুচে ভেটকিফ্রাই, তিববতি মোমো ইত্যাদি ইত্যাদি। এই আসরে ঘনিষ্ঠ পারসিকদের অবারিত দ্বার। কিন্তু তিনজন, খুব জোর চারজন। দত্তগুপ্তর বৈঠকখানায় ঠিক যতজন ধরে। এখানেও স্বভাবতই ঘোষদস্তিদার নিয়মিত অতিথি।
সন্ধের আসরের পরেও ঘোষদস্তিদারকে সহজে ছাড়তে চান না দত্তগুপ্ত। আমলা সময়ের বহু না-বলা কথা তাঁর পেটে এখনও গজগজ করছে। কোন মন্ত্রীর কে কে প্রণয়িণী ছিল, কার কার তলে তলে অন্য পার্টির সঙ্গে যোগসাজশ, কতগুলো ধরকাপড় একেবারেই গট-আপ, কোন সেক্রেটারি ছিলেন গুপ্ত-হোমো, কোন পুলিশকর্তার সঙ্গে কোন রাজনৈতিক নেতার এক গেলাসের ইয়ারি। ইত্যাদি ইত্যাদি। তেত্রিশ বছরের চাকরিজীবনে এ রকম অজস্র সঞ্চয় তাঁর। তার ওপরে একাকিত্ব, নিজের পরিবার এবং পারিবারিক দায়িত্ব ও সমস্যার অভাব, উপরন্তু বার্ধক্যের এক কথা বার বার বলার অভ্যাস। সব মিলিয়ে সন্ধের পানের আসরের পর থেকে তিনি আরও চাঙ্গা এবং গপ্লে হয়ে ওঠেন। কে আর তাঁর ধৈর্যশীল শ্রোতা হবেন দ্বিতীয় বৃদ্ধ ঘোষদস্তিদার ছাড়া? পদলেহনের পুরোনো অভ্যাসটি ঘোষদস্তিদার এখনও ছাড়তে পারেননি। আর পারবেনও না। এক গল্প তিনশো তেত্রিশতম বার শোনার পরও তিনি একই রকম উৎসাহে ঘাড় নেড়ে যান। একই রকম সায় দেন, একই প্রতিক্রিয়া দেখান এবং একইভাবে দত্তগুপ্তর আত্মবিশ্বাস ও অহংকারের তৃপ্তিসাধন করেন।
দত্তগুপ্তর জীবন একেবারেই আড্ডা-নির্ভর ও অকর্মক। কিন্তু ঘোষদস্তিদারের তা নয়। তিনি তাঁর ঠিকেদারি অভ্যাস ছাড়তে পারেননি। কোথাও চেনা-পরিচিত কারও বাড়ি বা ফ্ল্যাট হচ্ছে, সারাই-ঝালাই হবে এমত খবর যদি তিনি পান, তাহলে নানারকম কলাকৌশল করে ব্যাপারটার মধ্যে ঢুকে পড়েন।
চৌধুরী নাকি বাড়ি করছে? এ কি সেই সল্টলেকের পুরনো প্লটটায়? বা বা। এতদিনে সুবুদ্ধির উদয় হয়েছে। তা, কাকে দিয়ে করাচ্ছে? সম্রাট? না তীর্থংকর? মনোতোষ গড়াই? চিনতে পারলুম না তো! ঠিকাছে, ঠিকাছে, ভালো বুঝেছে দিয়েছে। অন্য কিছু না, এইসব আননোন লোক কোথায় কী কমবেশি করে ফেলবে, মশলাপাতি কম দরের দেবে। কত পার্সেন্টেজ রাখবে—এগুলো…..ওই একটু আর কী! সতর্ক থাকা দরকার।
এই জায়গায় দত্তগুপ্ত তাঁর কতৃত্বব্যঞ্জক ভারী গলায় বলবেন, চৌধুরীকে বলো একবার শিবপদকে কনসাল্ট করে নিতে। গড়াইয়ের লোক কী দিচ্ছে না দিচ্ছে, শিবু যদি একবার চেক করে দেয়…
শিবুটি বলাবাহুল্য ঘোষদস্তিদার মশাই।
এইভাবে দুজনের পরিচিতদের লতায়পাতায় যে যেখানে আছে সব জায়গাতেই টোপ ফেলেন শিবপদ ঘোষদস্তিদার। কোনোটা লাগে, কোনোটা লাগে না। অন্য কিছু না, তাঁর এটা হবি, নেশা। নেশার জন্যে মানুষ কত অসাধ্যসাধন করে থাকে, শিবপদ আর এটুকু পারবেন না? টাকাপয়সার পরোয়া তিনি বড়ো একটা করেন না। তবে কাজে নামলে নয়-নয় করেও কিছু পকেটে এসেই যায়, তাই দিয়ে শিবপদ তাঁর বসতবাড়ি, দত্তগুপ্তর বসতবাড়ি, পারলে নিজের অন্যান্য বাড়ি সংস্কার করেন। ভাড়াটেরা খুশি হয়। শিবপদবাবুর মতো ল্যান্ডলর্ড আর হয় না, এঁরা বলাবলি করেন। দত্তগুপ্ত যতবার টাকাপয়সা হিসেব করে দিতে যান, শিবপদ বলেন, ও হবে এখন। আপনার কাজটা আগে হোক! কাজ হয়ে গেলে, দত্তগুপ্তর সম্পূর্ণ সন্তোষ সাধিত হলে তবে একবার সিমেন্ট বালি রং কাঠের ন্যূনতম বিলটি পেশ করেন শিবপদ। কাজেই দত্তগুপ্তর আস্থাভাজন হতেও তাঁর ঘর থেকে খরচ করতে হয় না।
