তোর বরাদ্দ আমি খেয়ে নিয়েছি? কখন?
এঃ এসব পুরোনো জোক, এখন কেউ হাসবে না।
অঙ্কুর হাঁসেদের দিকে ক্যামেরা তাক করছে। মনামি কিনেছে তিলে খাজা, সুদেষ্ণা পাঁপর টুকরো করে ছুড়ে দিচ্ছে শূন্যে। পাখিগুলো ঝাঁপ দিচ্ছে।
রোমি চেঁচায়, আমাকে দে, আমাকে… আমিও খাওয়াব।
ছাই রঙের সিল্ক লাগানো ডানায় ভরন্ত, নিটোল, কেমন একটা আভাযুক্ত সাদা যেন ফ্রস্টেড ঝালর একেকটা বড়ো বড়ো।
মনামি বলল, উঃ আমারগুলো একেবারে খাচ্ছে না। রমিতা আমার থেকে ধার নিল, অথচ ওরগুলোই …
বলতে বলতে সে বিপজ্জনক ঝুঁকে খোলামকুচি খেলার মতো খাজার টুকরো ছুড়ে দিল। ছুড়ে দেবার অভিঘাতে নৌকা হেলছে। প্রচণ্ড হেলছে। রোমিকে জড়িয়ে মনামি, মনামিটা… সরসী চেঁচাচ্ছে। আতঙ্কে সাদা হয়ে গেছে পণ্ডিতি চোখ।
নৌকা সোজা হয়ে যায় আবার।
গৌরাঙ্গ এখন মাঝদুপুরের রোদে সোনার গৌরাঙ্গ, এইসা মত করো মেমসাব এইসা মত।
নারকোল বাড়িয়ে ধরে ভাসমান দোকান, নারিয়ল লে যাইয়ে মাজি, সঙ্গমপে পূজা চঢ়াইয়ে।
গৌরাঙ্গ দু-হাতে বইঠা চালায়। দু-হাতের পেশি ফুলে ফুলে ওঠে আর তালে তালে সে বলে চলে, বিটিয়াকো কুছ দেনে পড়েগা মেমসাব, লিজিয়ে, নরিয়ল লিজিয়ে, মিঠাই লিজিয়ে মু মিঠা কর দিজিয়ে বিটিয়াকো। বিটিয়া দুবলি হো জায়েগি।
সরসী চোখ থেকে চশমা নামিয়ে বলল, আরে বাবা, সব লোগ নারিয়ল, মিঠাই, রুপেয় পানি মে ডালেগা তো পানি বহোত গন্ধা হো যায়েগা। নদীকি তন্দুস্তিকে লিয়ে পূজা উজা চঢ়ানা বন্দ করো ভাই। নদীকো বুরা হোগা।
চুপ করে বইঠা বায় মাঝি, মুখে প্রত্যাখ্যানের রেখাভঙ্গ। সরসীর কথাকে ও পাত্তা দেয় না আদৌ।
ওই যে ওই যে দেখো সবাই… সংগম… সংগম… সংগম দেখি।
যমুনার নীলচে সবুজ গঙ্গার গৈরিক ধারার পাশাপাশি চলেছে। নীল সোনালি।
যমুনে! তুমি কি সেই যমুনে! অঙ্কুর হাঁকে।
উতরোল কোলাহল জলে জলে, মানুষে মানুষে, কোমর জলে দাঁড়িয়ে মাথায় জল ঢালছে নারী-পুরুষ।
পানি কমর তক হোগা, যাইয়ে না মেমসাব। আস্নান কিজিয়ে।
সরসী নীচু হয়ে একমুঠো জল তুলে আমাদের মাথার ওপর ছিটিয়েছে।
ওম শান্তিহি, শান্তিহি, শান্তিহি।
সুদেষ্ণা গান ধরে :
ওরে নীল যমুনার জল
বল রে মোরে বল
কোথায় ঘনশ্যাম…
মাঝি গানে কান না দিয়ে বলে, সঙ্গম তিরথ হ্যায়, হঁহাপে আস্নান সে পুন হোগা, পুন। শান্তি মিলেগি।
ওং শান্তিহি, শান্তিহি, শান্তিহি, অঙ্কুর নিবিষ্টচিত্তে ফোটো তুলে যাচ্ছে।
দূরে মিলিয়ে গেছে ফ্রস্টেড পাখিদের ঝটাপটি। গঙ্গার দিকের পাড়ে একটা শাড়ি রোদে মেলে দু-কোণ থেকে দু-খুঁট ধরে চলেছে গোটা পরিবার। মা বাবা, ছাগলছানা, ছেলে, হাওয়ায় ফটাফট উড়ছে শাড়ি।
আমার কৃষ্ণ ঘনো ও-ও শ শ্যাম
ও পারে নিয়ে চলো না মাঝিভাই—
রমিতা অনুনয় করে। গ্রাহ্য করে না মাঝি। কখন নৌকো ঘুরিয়েছে বুঝতেই পারিনি।
সরসী সান্ত্বনা দেয়… তোমরা সংগম অব্দি আসবে বলেছ, তার বেশি ঘোরাতে ওর বয়েই গেছে, ঠিক যতটার কড়ার ততটাই… যে কোনো যাত্রাই কড়ার অনুযায়ী হয়।
আহা হা হা, একটুও ফাউ পাওয়া যাবে না—এতই কৃপণ?
কৃপণ বলো কৃপণ, কড়ার বলো কড়ার, প্রোগ্রামিংও বলতে পারো…
অঙ্কুর বলল, পাওয়া কি আর যায়নি কিছু? সব আমার ক্যামেরার ধরা আছে।
কী? সুদেষ্ণা জিজ্ঞেস করে, নীল? আর সিল্ক-মসৃণ? আর কলনা?
তীরের কাছাকাছি দিয়ে চলেছে নৌকা, পাড়ের খাঁজে সাপের খোলস। চান করতে নেমেছে বেশ কিছু লোক। হঠাৎ দেখি জল নেই, চারদিকে খালি মোষ আর মোষ আর মোষ। মোষেদের পিঠের ওপর দিয়েই নৌকা চলেছে। এ আর জলের নদী নয়। মোষের নদী।
এ কী? এ কী? মোষ অতি ভয়ঙ্কর জীব!
এক্ষুনি নৌকা উলটে দেবে।
তুমি গৌরাঙ্গ বাবাজি বেশ সাঁতরে পালাবে… না?
চেনা লোককে মোষ তো কিছু বলবে না!
আমাদের একেবারে কুঁড়ে ফেলবে।
আমরা কেউই কি সাঁতার জানি না?
জানি।
কিন্তু সে শৌখিন সাঁতারে এ মোষসংকুল যমুনা পার হওয়া যায় না।
বইঠা বাইতে বাইতে ক্লান্ত স্বরে সে বলল, মওত সে ডরো মত, ডরো মত।
খোলা নদীতে এসে পড়েছে নৌকা। অদূরে ফেলে-আসা তীরভূমি। মানেকশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে। সিগারেট খাওয়া বিপজ্জনক। মওত সে ডরো মত।
সুদেষ্ণা জলের দিকে মুখ, মরিয়ার মতো বলে উঠল–
মানুষের দলা তীর্থে তীর্থে। তার মধ্যে তোকে খুঁজে ফিরি রুপোর মানুষ।
আনত মধ্যাহ্নে জলের মধ্যে দেখি তোর বিম্ব। কফিখানার খয়েরি ধোঁয়া
থেকে চুল্লুর গেলাসে ফাটা বালব, রকবাজির গড়পার থেকে
লোকনাথোৎসবের পঞ্চাননতলা। যুব-ক্রীড়ার তাতা বালি থেকে সেলিমপুরের
ব্রিজ, গলি… সব ঘুরতে ঘুরতে—শেষ পর্যন্ত নীল গেরুয়ার সঙ্গমে, দূর থেকে
তোকে দেখেও হারিয়ে ফেলেছি।
এটা কি কবিতা? অনীশ বলল।
আর কেউ কিছু বলল না।
কিছু না।
দুই বুড়ো
দুই বুড়ো। একজন ছিয়াত্তর, একজন ঊনআশি। ঊনআশি সরকারি আমলা। ভূতপূর্ব। ছিয়াত্তর সরকারি কনট্রাকটর। ভূতপূর্ব। সরকারি কনট্রাকটর বলে তো কিছু সত্যি-সত্যি হয় না। তবে কোনো সময়ে সেটা হরেদরে হয়ে গিয়েছিল যে যোগসাজশে তারই ফলে আজ প্রাক্তন এম. এসসিপি.এইচ.ডি.-র সঙ্গে প্রায় এপাশ-ওপাশ একদা-ঠিকেদার দাবা খেলেন। দাবাতে যখন মাথা খেলে না তখন চাইনিজ চেকার, চাইনিজ চেকারেও যখন সুবিধে হয় না তখন লুডো। আমলা একদিন ভূতপূর্ব হয়ে যাবেন, সেটা জানা কথা। কিন্তু ঠিকেদার? বাঘ যেমন নরমাংসের স্বাদ পেলে চিরকালের জন্যে নরখাদক হয়ে যায়, ঠিকেদারও তেমন। ঠিকেদারির নিগঢ় রসের সন্ধান পেলে আর রিটায়ার করে না, আমরণ ঠিকেদারি করে যায়। তব ইনি রিটায়ার করতে বাধ্য হলেন কেননা আমলা মহোদয় রিটায়ার করার সঙ্গে সঙ্গে রসের ফোয়ারাটি শুকিয়ে গেল। এখন কথায় কথায় মেজো সেজো অফিসার, কেরানিকুল, যে-যেখানে আছে ইনস্পেকশনের জুজু দেখায়, বিল আটকে দেয়। এতজনকে খুশি করতে হলে কি আর পড়তা পোষায়? সুতরাং সাম্রাজ্য ত্যাগ করে সরকারি ঠিকেদার মশাই বানপ্রস্থে গেলেন। সম্রাটপুত্ররা কেউ যোগ্য উত্তরাধিকারী হয়নি। সব এটা-সেটা চাকরিতে পেশায় ঢুকে গেল। কাজেই সাম্রাজ্যও আর রইল না। গোবি মরুভূমি হয়ে গেল। এই গোবি মরুভূমিতে একমাত্র সাহারা হলেন দত্তগুপ্ত। অর্থাৎ ভুবনমোহন দত্তগুপ্ত, প্রাক্তন আই.এ.এস।
