উরি বাবারে! রোমি চেঁচিয়ে ওঠে, এ ভাই হাম সবকো লওট দেগা তো?
দেখিস বাবা পানি কি অন্দর গোর দিসনি—মনামি হাসবার চেষ্টা করে।
মওত সে ডরনা মৎ—গৌরাঙ্গ গম্ভীর গলায় চাপা গর্জন করে। তার মানে কী? কী বলতে চায় লোকটা। এটা কি ওর ফিলজফি অফ লাইফ। না মৃত্যু সত্যি সত্যিই আশেপাশেই অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য?
আপাতত অথই জল। সবাই নীল বললেও আমরা দেখি সবুজ। একেবারে সবুজ। বঙ্গোপসাগরে এই সবুজ দেখা যায়। তার সঙ্গে নুন গন্ধ থাকে।
যমুনা কখনও নিজে নিজে সাগরে পৌঁছতে পারেনি। তবু সাগরেরই রং মেখেছে। যতই এগোই, রোদ ততই ভিজে যায়, হাওয়া ততই জলে-ভেজা তালপাতার পাখার বীজন।
জলের মাতোয়ালা রক্তের গলিতে ঢুকে যায়। জলের রঙিন পিচকিরি ছেটাতে থাকে, কেমন একটা উল্লাস উঠে আসে নাভিপদ্ম থেকে, সোজা উঠে লক লক করে উল্লাসটা, যার ঝোঁকেই হয়তো অনীশ কাব্যি করে বসে :
হে দিন, সোনালি দিন,
যার জন্যে গভীর দুপুর
সোঁদা মাটি টুপুর-টাপুর
যার জন্যে অছিন-অভিন
তুমি কি দেখেছ সেই সোনার হরিণ?
দেখেছ সে সোনার হরিণ?
স্বর্ণমৃগী তোর সঙ্গে খেলতে চাইবে কেন? রমিতা জলের ওপর গলা তুলে বলল। অনীশ কিন্তু কবিতার শিখর থেকে নামতে পারছে না এখনও। দেখেছ কি, দেখেছ কি, করেই যাচ্ছে, করেই যাচ্ছে। এদিকে অদূর-নীলে সাদার ডট। ঘন ঘন সজল ডট। বুটিদার রেশমি শাড়ি নীল যমুনা। পাখি পাখি পাখি। কী বলে ওদের? মাঝি ভাই? পংখি! পংখি। যাযাবর ম্যাটাডর কনডর, কত দূরের শরীর সব, কত্ত দূরের মন, মেজাজ। শীতে আসে, গ্রীষ্মে যায়। কোথায় যায়? যেখানে তুষার গলে রিমঝিম তৃণ। বালিহাঁস হয়ে নামে আলিপুরে, প্রতি শীতে, ত্রয়োদশীর চাঁদ সাঁকোয়। মরাল হয়ে, শামুক খোল হয়ে ঝুপ ঝুপ, ঝুপল, ঝুমল—করে নামে, নামতে থাকে জলে—জলায়, বিলে-ঝিলে।
শীতই ওদের বসন্ত।
অনীশ এখন অচিন হরিণ থেকে অচিন পাখির প্রসঙ্গে এসে গেছে। সত্যিই সে স্বর্ণমৃগীর জন্য হন্যে না পাখির জন্যে নাকি দুটোই এক, এখন সম্পূর্ণ গুলিয়ে গেছে।
অঙ্কুর বলে উঠল, সরসী! আপনার দিকের পাড়টা খানিকটা মরুভূমির মতো দেখেছেন? কমপ্লিট উইথ উট বালিয়াড়ি অ্যান্ড অল।
সত্যিই পাড়টা দু-তিনটে টাল খেয়ে উঠে গেছে। ঝকঝকে ইস্পাত আকাশের কোলে একটি চিত্রার্পিত উট। লাগাম ধরে সামনে একজন পেছনে আরও তিন। বালির ভাঁজ স্পষ্ট। ভাঁজে পুতুলগাড়ির মতো একটা ল্যান্ডরোভার। চিক করে একটা শব্দ। অর্থাৎ অঙ্কুর ফটো তুলল।
সুদেষ্ণা প্রায় ভেঙিয়ে বলল, তুমি কি কিছুই মনে রাখতে পার না? সবকিছুরই রেকর্ড…।
—রাখতে না ব্রেক করতে? রমিতা চিৎকৃত হাসিতে বলল, ধিক্কার জানিয়ে বিকৃত গলায়।
চিক—আরেকটা।
আমি নড়ে গেছি, আমরা নড়ে… উঠবে না। উঠবে না।
উঠবে, ভেংচি সমেত।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে উটটার সওয়ার নেই কেন?
সত্যিই তো! সওয়ার নেই। গলায় ঝোলা বাইনোকুলারটা তুলে মনামি, সামনে পেছনে লোক, এ তো দেখছি গ্রিসিয়ান আর্ন!
ওটা ইদের উট!
তাই জল পড়ছে চোখ দিয়ে অঙ্কুর।
সুদেষ্ণা ঝুঁকে উঠবে? চোখের জলটা উঠবে?
উঠতে পারে—চোখের জলটা খুব ইম্পর্ট্যান্ট, উটের চোখের…
খোলাখুলি কমিট করতে চাইছে না অঙ্কুর। মনামির ছেলের ছবি তুলেছিল মুখের নালসুদ্ধ। কিন্তু… চোখের জল? উটের চোখের।
পাশ দিয়ে ওদের দ্বিগুণ ভরতি একটা খোলা নৌকা। রোদে জ্বলছে দেহাতি মেয়ে পুরুষ। কেউ কেউ এ নৌকার যাত্রীদের দিকে চেয়ে দাঁত বার করে হাসছে।
হাসিটার মানে কী?—সুদেষ্ণা বিরক্ত, উড়ন্ত ট্রেন দেখে যেমন দুরন্ত ছেলেরা হাত নাড়ে?
শহুরেরা গাঁওয়ার দেখে হাসে। গাঁওয়াররা শহুরে দেখে।
সত্যিকার নাগরিক হলে শহুরেরা হাসে না।
মনে মনে হাসে। ভুরু কুঁচকোয়।
আরও একটা নৌকা ভেসে যায়। ভর-ভরতি। নৌকাডুবি হল বলে। নারকোল, ফুল, ধূপ প্রায় প্রত্যেকের হাতে। ভাবছিল ডুববে না। কেননা ধূপ, ফুল…। এরাও হাসছিল। খুব।
সরল-সরল চাকর-চাকর দেখতে। কে যেন বলল মেয়ে-গলায়। চা
কর খাটতে গিয়ে এই লোকগুলোই গোড়ার দিকে সরল-সরল, খুব খাটে পেটে।
… হাঁ-জি হাঁ-জি কথায় কথায়। উঠতে বসতে মাজি মাইজি। বিনয়ের অবতার একেবারে। কিছুদিন পরেই চুরিচামারি। ছিচকে ছিচকে, তারপরে শেয়ানা সিঁদেল, তারপর ডাকাত দলের দালালগিরি, ভেতর থেকে দরজা খুলে দেওয়া, সুলুক সন্ধান, চপার, হাতুড়ি, মায় ধর্ষণ-টর্ষণ পর্যন্ত…
এখন দেখাচ্ছে খুব নিষ্পাপ।
কে বলল?
নিষ্পাপ না হাতিরমিতা, এসব হদ্দ বোকা, কিন্তু মিটমিটে।
সুদেষ্ণার দিকে চেয়ে কীভাবে হাসছে! এরা চাউনি দিয়েই, হাসি দিয়েই … জঘন্য।
ওদের দলে একটি বৃদ্ধ লোক, বুড়ো হনুমানজির মতো, কাঁধগুলো এখনও কী চওড়া! পাকা গোঁফদাড়িতে মুখ ঝুলে পড়েছে। কিন্তু হাতগুলো লোল নয়, জলের দিকে চেয়ে বিড়বিড় করে কী বকছিল, মনে হল বলছে, গঙ্গা বিটিয়া যমনা বিটিয়া গঙ্গা বিটিয়া যমনা বিটিয়া গঙ্গা যমনা গঙ্গা যমনা গঙ্গা যমনা।
দেখতে দেখতে ঢেউয়ের দোলে হাজার হাঁস ভেসে আসে। খাদ্যসামগ্রী নিয়ে নৌকা যায়। পাঁপর, নিমকি, খাজা।
তিলে খাজা আছে?—মনামি খাবে,
তোর কি মাথা খারাপ?-অঙ্কুর। বইঠা হাতে মাঝি হাঁকে,
পংখিকো খিলাইয়ে মেমসাব, খিলাইয়ে না!
এঃ পাখির খাবার? মনামি হতাশ।
কেন খা না। চিড়িয়াখানার গেটে বাঁদরের ছোলা-বাদাম কিনে তো নিজেই খাস।
