আমরা দেখতে দেখতে এসেছি। শুনে এলাম কেমন সাজো সাজো রব চারদিকে। দেখলাম নানান পসরা সাজানো হচ্ছে অস্থায়ী দোকানঘরে। কাঠের জিনিস। পাথরের জিনিস। হাওয়ায় এখনও কেমন মোচ্ছবের গন্ধ।
এই মেলাই তো ছ ছ বছর অন্তর অর্ধকুম্ভে দাঁড়ায়। আধ হাঁড়ি অমৃত। বারো বছর বাদ পূর্ণকুম্ভ। পুরো হাঁড়ি অমৃত। অমৃত লাভের জন্য কী হুড়োহুড়ি। তাই হাওয়ায় দুর্ঘটনার গন্ধও পেতে থাকি। কেমন একটা শীত-শীত। লক্ষ লক্ষ লোক মিলতে আসে, খুঁজতে আসে, পেতে আসে, নানা অর্থের অমৃত। তাই দিতেও হয়। ভাবলেই কেমন ছমছম করে ওঠে গা।
আপাতত যমুনার জল ঠাসাঠাসি নৌকার গায়ে ছোটো ছোটো হাইফেন। ছলাত ছলাত। সবুজ জলীয় আঘ্রাণে মস্ত করে দিচ্ছিল আমাদের। অমৃত এবং মৃত্যুর কথা মনে থাকছিল না। রুক্ষ আকবর ফোর্ট আর টিপি-চাপা দেবতার দল। কড়ির সাজ পরানো রোগা গোরু, উঃ। তার পরেও আমরা রিলিফ চাইব না?
আমরা মানে অঙ্কুর সরসীরঞ্জন।
রমিতা সুদেষ্ণা।
অনীশ মনামি। এবং আমি।
সরসীরঞ্জন এক সময়ে আমাদের মাস্টারমশাই ছিলেন। বেশ উঁচুদরের। সুদেষ্ণার সঙ্গে দীর্ঘদিন ফাটাফাটি প্রেম করে, হঠাৎ কীসের থেকে কী হল রোমিকে বিয়ে করলেন। আগে ওঁকে দুর্দান্ত কিছু ভাবতাম। কিন্তু সেই বিয়ের আসর থেকেই ওঁর মাস্টারমশাইত্ব বেমালুম গায়েব হল। জাত হারালেন, নেহাতই রাম-শ্যাম, যদু-মধু-হরি গোছের, নেহাতই গোলে হরি বোল, নেহাতই ফ্যালিবল মর্টাল বলে ওঁকে মেনে নিই আমরা সেই থেকেই। পাণ্ডিত্য, ফান্ডা ইত্যাদিকে পাত্তা না দিয়ে, অ্যাদ্দিনের অভ্যেস ছেড়ে, সরসী করে ডাকতে থাকি। সরসী! সরসী!
সুদেষ্ণা অবশেষে মাকাল বলে ডাকলেও, হেলা-ফ্যালা করলেও অঙ্কুর চাইছিল বলে অঙ্কুরকেই। সেই সূত্রে ও মাকালী। আমরা মাকালী মাকালী করে খ্যাপাই। ও বেচারির দ্বিতীয় পছন্দ ছিল অনীশ। মুখে কেউ কাউকে না বললেও মনে মনে আমরা জানতাম অনীশ বরাবর মনামিতে আতত। ওর ধারণা মনামিও তাই। ওদের অন্তত মিউচুয়াল হয়েছে। কিন্তু মনামি আসলে অঙ্কুরকে চাইত। ছোটোবেলা থেকে ভাবের সূত্রে। কেমন যেন কাজিনও ওরা। কিন্তু ও তো মাকাল! মাকাল। মাকালকে আর কে শেষ পর্যন্ত চায়!
আমাদের মেজাজ চড়ে যাচ্ছিল। বেলাও চড়ছিল। নেহাত শীত বলেই সইছিল। এ দিকে নৌকাঅলারাও গনগনে চোখে, ঝনঝন করে কথা বলছিল।
থাক পুণ্য করে দরকার নেই—রোমি ঝাঁঝায়, আমাদের পুণ্য না হোক গে, তুমারি যমনামায়ি তুমলোগকো শাঁপ দেগা, শাঁপ। … তর্জনী নাচছিল রমিতার।
তো আইয়ে না মেমসাব। পুন কি সওয়াল হ্যায় তো, পৈসা কি জরুরত নহি। আইয়ে, আপ সব কো মুফত হি ঘুমাউঙ্গা।
মুফত হি, মুফত হি ঘুমা দুঙ্গা, কোরাস গেয়ে ওঠে সবাই। অবশেষে বালিতে বড়ো বড়ো ইয়েতি ছাপ ফেলে, বিশাল বপু আমাদের জেনারেল মানেকশ বঢ়োরস্ক বৃষস্কন্ধ অটোঅলা এগিয়ে আসতে থাকে। হাতের তিন আঙুল তুলে দাঁড়িয়ে থাকে ঘাটের কিনারায়। মুখে কথা নেই। ভিরকুটি। হিন্দুস্তানি চার্চিল আর কী! কেউ যেন বলল।
আইয়ে আইয়ে—একজন সঙ্গে সঙ্গে রাজি। পুরো নৌকা তিনশোয়। মন্দ কী? ছিপছিপে গৌরাঙ্গর পেছন পেছন আমরা হুড়মুড় করে এ নৌকোর আগ-গলুই থেকে ও নৌকার পাছ-গলুই টপকে টপকে ভাসমান ছকে এ ক্কা দোক্কা, তে ক্কা চৌকোটাল খেতে খেতে গৌরাঙ্গ-নৌকার পাটাতনে পৌঁছে যাই।
এইবার শুরু হয় আসল খেলা।
বাঘের খেলা।
কে কার পাশে বসবে না, সেই খেলা।
পরস্পরের প্রতিমার খড় বেরিয়ে গেছে এখন। প্রেম-ট্রেম সব ভোঁতা। তবু… তবু খড়ের কাঠামো এক আদি-অন্তহীন রৌরব। ঘুরে ঘুরে হয়রান সবাই। বেরোতে পারছে না। ছিড়ছে, ভাঙছে, কাটছে। কিংবা কে জানে, এদের সবার বেরোবার ইচ্ছেটাই হয়তো মরে গেছে। ইচ্ছের পেছনে ইচ্ছে থাকে। তার পেছনে আরও ইচ্ছে। এ সব কথা কবুল করাটা দুঃসাহস! ইচ্ছের পেছনে দুঃসাহস থাকা চাই। এই টলোমলো নৌকায় তা আর কারই বা আছে।
ফলত, প্রত্যেকে যেন প্রত্যেকের দিকে পেছন ফিরে বসতে চায়। সে এক অদ্ভুত নেগেটিভ হুড়োহুড়ি। শেষ পর্যন্ত উদ্যোগী হয়ে মুখোমুখি করে দিই ওদের।
কেননা শেষ পর্যন্ত তো আমাদের বাস্তবের মুখোমুখি হতেই হয়।
পউষের দুপুরের রোদে কুকরি ঝলসায়। তেরছা হয়ে রোদ এসে পড়ে একেবারে অঙ্কুরের মুখের ওপর। ও রোদ আড়াল করবার চেষ্টা করে না। ওকে দেখায় ঠিক দোলের দিনের লালচে মঠের মতো, অনেক ফুটকড়াই আর চিনির মুড়কির মাঝখানে লোভনীয়, রসালো, সলিড …।
কিন্তু সুদেষ্ণা মুখ ঝামটে বলল, বাবারে বাবা, পুণ্য করতে যাচ্ছি। তখনও তুমি আমার সামনে বসবে?
আমি কি তবে মূর্তিমান পাপ-টাপ নাকি?
মুখটাকে একটু আড় করে অঙ্কুর ক্যামেরাটা রমিতার দিকে তাক করল। সরসী, এক্স-মাস্টারমশাই, সেই বিয়ের রাতে যাঁর জমানত জব্দ হয়ে গিয়েছিল, রমিতার সঙ্গে যুগদ্ধ ছবি, আগে নিশ্চয় অনেক তুলেছেন, আজ যেন আদপেই তুলতে চাইলেন না। অঙ্কুরের ক্যামেরার দিকে পেছন করে, তিনি জলের দিকে মুখ ফিরিয়ে ঝুঁকে বসে রইলেন। জিজ্ঞেস করাতে বললেন, চশমার কাছে বড্ড রোদ ঝলসায়।
রমিতা আর মনামি দীর্ঘদিনের শত্রু বন্ধু পাশাপাশি হতে অথবা না হতে গিয়ে এবং অনীশ ওদের মুখোমুখি অথবা পিঠোপিঠি হতে গিয়ে নৌকা এমন হেলায়। বিপজ্জনক কৌণিক বিপর্যয় থেকে বাঁচতে সবাই একত্র হয়। হাঁ হাঁ করে ওঠে গৌরাঙ্গ, অ্যায়সা মত কিজিয়ে, মত কিজিয়ে অ্যায়সা।
