ঘুমিয়ে পড়লি নাকি কে সুরো? পিসিমা খুব অল্প অল্প করে খাচ্ছিলেন। থেমে থেমে। এবার জিজ্ঞেস করলেন। সেবাকারিণী মহিলা দুটি স্মিতমুখে আমার দিকে চেয়ে আছেন।
বলি, না, তোমার খাবার সময়ে কথা বলতে চাইছিলুম না। তোমার তো আবার…
তোর মনে আছে?–পিসিমার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। খাবার সময়ে কথা বলে ফেললে পিসিমার আর খাওয়া হত না। মায়ের তাই কঠোর নির্দেশ ছিল দিনে রাতে কোনো সময়েই যেন আমরা পিসিমার খাবার সময়ে ঘুরঘুর না করি।
আমার দাদারা দিদিরা কেউ কি বেঁচে আছে? হ্যাঁ রে?
না পিসিমা।
সুজু কী করছে?
কী বলব? বলি—ও তো আমেরিকায়।
তাই বল, আর নীলি?
নীলি মানে নীলাঞ্জনা, আমার বোন। নামগুলি পিসিমারই দেওয়া।
তোমার নীলি এখন ঠাকুমা দিদিমা হয়ে গেছে পিসিমা।
নিদন্ত মুখে বড়ো তৃপ্তির হাসি হাসলেন উনি। বললেন, সে হয়তো তুইও হয়েছিস! কিন্তু আমার কাছে তোরা সেই নীলি, সেই সুরো, সেই সুজু… দিনরাত খুনসুটি করছে আর সালিশির জন্যে রান্নাঘরে ভিড় করছে। বউদির কাছে বকুনিও তো কম খেতিস না।
যা বলেছ!
আরও কিছুক্ষণ পুরোনো দিনের গল্প হল। তারপর শুশ্রুষাকারিণী মহিলারা বললেন, এবার মায়ির বিশ্রামের সময় হল।
খাওয়ার সময়ে ওঁরা পিসিমাকে উঠিয়ে বসিয়েছিলেন। আমি প্রণাম করি, পিসিমা, আজ তাহলে আসি!
আয়, খেদহীন প্রসন্নতার হাসি হাসলেন।
ভীষ্মনাথ বরজাতিয়া আর তাঁর অন্তঃপুরের মহিলারা কোথায় ছিলেন জানি না, একে একে আবির্ভুত হলেন সবাই। ভীষ্ম আমার হাত দুটি ধরে বললেন, বহোৎ বহোৎ সুক্রিয়া ভাইসাব, আপনাকে কোত্তোদিন কোতো রাত ফোন করে বিরক্ত করেছি। কিন্তু দেখছেন তো ভুল কিছু বোলেনি। আসেন।
দালানে দু ধারে মহিলারা দাঁড়িয়ে যেন আমার বিদায় জানাচ্ছেন। ভীষ্মনাথ আমার পাশে যেন কৃতজ্ঞতার প্রতিমূর্তি। সংকোচে বলি, আমার কিছুদিন সময় দিন ভাইসাব। ব্যবস্থাদি করে…
সোময়? বেবস্থা?—উনি ঈষৎ অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালেন। সিঁড়ি এসে গেছে। উনি থেমে গেছেন। আমি বলি, পিসিমাকে নিয়ে যাবার একটা…
মুখ থেকে বিস্ময় সরে যায়। উনি বলেন, আন্টজি কুথাও যাচ্ছেন না ভাইসাব। উনি যেতেও চান না। আপনাকে বললাম কিনা জুতির্ময়ী দেবী এ বাড়ির আতমা। আতমা তখনই দেহ ছাড়ে… যোখন… হাতজোড় করে বললেন—সোময় এসে যায়। আপনাকে দেখতে চেয়েছিলেন, দেখলেন, বাস।
আমার ভেতরটা স্তব্ধ হয়ে আছে। আমি সিঁড়ি বেয়ে নামতে থাকি। নীচের দালানেও কিছু মহিলা, কিন্তু ভদ্রলোক। কেউ কোনো কথা বলেন না, শুধু একটা সৌজন্যের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকেন, নমস্তে করেন। দরজার কাছে এসে বলি, আপনাদের ফোন নম্বরটা? ভীষ্মনাথ হাসলেন, কথা বললেন না।
মাঝে মাঝে দেখে যাবো পিসিমাকে।
উনি ডাইনে বাঁয়ে আস্তে আস্তে মাথা নাড়লেন।
বিপুল কিন্তু নম্র চেহারার এক ভদ্রমহিলাও দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর দিকে চেয়ে নিবেদন করি, মাঝে মাঝে, ধরুন, মাসে একবার।
উনি কথা বললেন না। মুখের ভাবে কেমন একটা শেষ কথা বলার সংকল্প। ডাইনে বাঁয়ে মাথা নাড়লেন।
বেরিয়ে আসি। পেছনে সূর্যমহলের ফটক বন্ধ হয়ে যায়। দারোয়ান কেঠো ভঙ্গিতে সেলাম ঠোকে। আমি ফেরার রাস্তা ধরি। আমির আলি অ্যাভেনিউ-তে এসে বেকবাগান-হাওড়া মিনি। সিট পাই পেছনে, হাওড়া পৌঁছেই, ব্যান্ডেল লোকাল ধরি। সামনে একজন সিগারেট ফুঁকতে থাকেন, আশেপাশে ভিড় বাড়তে থাকে। সত্যিই তো আমার কী অধিকার… বরজাতিয়াদের ফোন নাম্বার গাইডে থাকলে খুঁজে বার করাই যায়… কিন্তু সত্যি, যিনি নিরুদ্দিষ্ট হলে খুঁজে বার করতে
পেরে মৃত্যুর কথা রটনা করে দিয়েছি… ফেরিওয়ালারা ওঠে, মার্কামারা ডাক–চুপচাপ বসে থেকে টুকটাক চালান দাদারা…চাটনি লজেন্স…এর মধ্যে আছে আমলা হরীতকী জোয়ান…বিটনুন, …বড়োরা রটালেন আমরাও বিশ্বাস করে নিলুম জ্বলজ্যান্ত মানুষটা…ঝালমোড়ি, ঝালমোড়ি, কেষ্টদার বিখ্যাত ঝালমোড়ি। ঝাল পাবেন, মুড়িও পাবেন। মজা ফাউ, মজা ফাউ… দু মলাটের মাঝখানে দেড়শো জোক দাদা…দেড়শো… এক ছেলে তার মাকে বলছে, মা, বাবা এবার ইলেকশনে দাঁড়াচ্ছে! মা বলছে দূর, তোর বাবা আমার সামনেই দাঁড়াতে পারে না… দেড়শো জোক… সোসায়টিতে বলুন—লেডিদের কদর পাবেন… পিসিমার দিন ঘনিয়ে এসেছে…ওঁরা কি মৃত্যুসংবাদটাও? চারদিকে এত মানুষ এত কোলাহল এত ঘামের গন্ধ, এত রং, ধুলো, লম্বা গোল চৌকো তেকোনা কতরকম মুখ… কিন্তু সবই কেমন অবাস্তব লাগে। যেন স্বপ্ন দেখছি। এক্ষুনি স্বপ্ন ভেঙে যাবে, সত্যিকারের বাস্তবে জেগে উঠব——গোলাপি ঘর, সাদা সাদা প্রৌঢ় প্রৌঢ়া, পালঙ্কের ওপর কিংবদন্তি বৃদ্ধা যিনি নাকি বাড়ি বিক্রির শকে মারা গিয়েছিলেন। নববুই বছরের জ্যোতির্ময়ী গুহ, আমার নিজস্ব পিসিমা যাঁর নাম-পদবি কিছু আমি জানতুমই না।
তীর্থযাত্রার চম্পূ
ওরা কিছুতেই যাবে না এবং আমরা প্রবল চেঁচামেচি করছিলাম। দৃশ্য, যমুনার ঘাট। ওরা মানে মাঝিরা, প্রয়াগগামী নৌকার মাঝিরা। মাথায় ফেট্টিবাঁধা এবং না বাঁধা জোরালো চেহারার প্রচুর মাঝি। ভালো ছইওলা মজবুত নৌকাগুলো সাতশো আটশো দরও হাঁকছিল, অথচ গলা নিখাদে চড়িয়ে সুদেষ্ণা বলল, ও আর অঙ্কুর জাস্ট ছদিন আগেই … দুশো আরও কিছু উটকো যাত্রী অবশ্য ছিল, কিন্তু পঁয়তাল্লিশ দুগুণে নব্বইয়েই ঘুরে এসেছে। আসল কথা ওরাই এসেছে প্রথম। ওদেরই নেশা বেশি। পায়ের তলায় সরষে। এসেই সম্মেলনের ইকড়ি মিকড়ি না শুনে ওরা বেরিয়ে পড়েছে। সব সময়েই যেন পরস্পরের থেকে পালাতে চেয়ে ওরা দিগদর্শনে মাতোয়ারা হয়। কাঁধে ক্যামেরা, চোখে বাইনোকুলার। কোমরে জিনস। তখন ডিমান্ড ছিল কম। কিছু দেহাতি যাত্রী ছাড়া তেমন শাঁসালো কেউ ছিল না। এখন সম্মেলনও শেষ। হাজারখানেক অতিরিক্ত লোক এখন ওদের খদ্দের। এ দিকে মাঘী মেলার সময়ও হয়ে এল। এখানকার সবচেয়ে বড়ো মেলা। বিখ্যাত। যমুনার দিকে আসতে আসতে বিস্তীর্ণ সব জায়গায় তাঁবু খাটানো হচ্ছে
