ক্ষীণকণ্ঠে উনি বললেন, চিনতে পেরেছিস তাহলে?
তুমি কী করে—এখানে… আমার… আমি কোনো কথা কোনো অনুভূতিকেই রূপ দিতে পারি না।
ভেবেছিলি মরে নিশ্চিন্দি হয়ে গেছি, না রে? …
আমি কিছু বলতে পারি না।
ভীষ্ম বরজাতিয়া কেমন একরকম দুঃখের হাসি হেসে বললেন, ভাইয়া, আপনাকে একটা কাহানি সুনাই। এই যে দেখছেন সুরিয়মহল, জানেন একসময়ে এ ছিল করচৌধুরীদের হাতে। তাঁরা এটা বেচে দ্যান সেনগুপ্তদের। সেনগুপ্তরা এসে শুনতে পান এ বাড়িতে আতমা আছে, তো তাঁরা মাস ছয়েক পরেই বাড়িটা বেচে দ্যান আমাদের, বরজাতিয়াদের। সোস্তায় পেয়ে যাই।
আমি বরজাতিয়াদের বোড়ো ভাই, আতমা ভয় করি না। সুনা ছিল ছায়া দেখা যায় এ বাড়িতে, রাতের বেলা ঘোরে, দীপ জ্বালে, আবার নিভায়। আমি খুঁজতে খুঁজতে এই ভাঙা বাড়ির গুদাম ঘরে পুরোনো কাঠ, টিন, বোরাউরা, আরও কোতো জঞ্জালের মধ্যে উনাকে খুঁজে পাই। কাঁদতে কাঁদতে আমাকে বললেন, ভাইজি, এ আমার বাস্তুভিটা, বাপ-পিতামহ, আমি, আমার ভাইবোনেরা, ভাইপো-ভাইঝিরা সোব এখানে জন্ম নিয়েছি, কোলোজন মারা গেছেন, এখানে আমার বিয়ে হল, বেওয়া হয়ে দুই বছরের মধ্যে এখানেই ফিরে এলাম। কোলোজনকে মানুষ করেছি, ভাইপো-ভাইঝিদের, বোনপো-বোনঝিদের, এঁদের সোংসার সামহাল দিয়েছি, এই ভিটা বই কিছু জানি না, চিনি না। ওরা সব বেচেবুচে দিল, আমাকেও তো তাহলে বেচেই দিল, না কী? তাই আমি এখানে মাটি কামড়ে রয়েছি। আপনাদেরও সোংসার সামলাবো, আমাকে… দাসী রাখুন। ভাইয়া পুরা ছয় মাস উনি এখানে লুকিয়ে ছিলেন। গুদাম ঘরে চাল-ডাল-আলু-কেরোসিন লুকিয়ে রাখতেন। খিড়কির দরজার ডুপ্লিকেট চাবি ওঁর কাছে ছিল। সাঁঝ ঘন হলে কনও কনও দিন ঘরে ঘরে ঘুরতেন, ছাদে যেতেন, কখনও কখুনও বাইরে ভি। ভাইসাব আমি তোখন বুঝে নিলুম কি ইনিই এ সূরিয়মহলের সুরিয়। তাই আমরা ওঁকে আদর করে রেখেছি। এতদিন ওঁরই কাছে বাংলা শিখলাম, কোতো কী জানলাম। কিন্তু কুনও দিন উনি ভাই-বহেন, ভাঞ্জা-ভাঞ্জি কারু খোঁজ তো কোরেননি। আজ এতদিন পর উনার নব্বই পার হল উনি সুরোঞ্জন করচৌধুরীর তালাশ করছেন… তাই…
পিসিমার শুকনো হাতে আমি হাত বুলিয়ে দিতে থাকি, চোখ দিয়ে জল ঝরছে, উনি দ্বিগুণ মমতায় আমার গায়ে হাত বুলিয়ে দ্যান। হাতগুলো এতকাল পরেও সেই একই রকম তুলতুলে, সুখস্পর্শ আছে।
ওরা তোদের বুঝিয়েছিল আমি মরে গেছি। না রে?
নব্বই বছরের পিসিমার কণ্ঠ ক্ষীণ হলেও আশ্চর্য স্পষ্ট।
আমি কিছু বলি না। ভেতরে ভেতরে একটা কষ্ট, একটা ক্ষোভ জমা হতে থাকে।
আর কী-ই বা বলবে বল! যাবার সময়ে আমাকে খুঁজে পেল না। অনেক খোঁজাখুঁজি করেছে রে সুরো। কেলেঙ্কারির ভয়ে খালি থানাপুলিশ, ছবিছাবাটাই করেনি। তারপর মানুষের আর কী বলবার থাকে বল!
হঠাৎ দেখি ভারে ভারে খাবার আসছে। কয়েকজন নীরব মহিলা নিশ্ৰুপে একটা টেবিল বসিয়ে দিয়ে গেলেন, ভীষ্মনাথ একটা চেয়ারে। খাটের দিকে মুখ ফেরানো চেয়ারের।
ভীষ্ম বললেন, দুপুর হল। লাঞ্চের সময়। খেয়ে নিন ভাইয়া, আপনার আন্টজি এসব বলে বলে করিয়েছেন। মছলি-গোস্ত এ সব তো আমাদের ঘোরে ঢোকে না। একটু কষ্ট হোবে আপনার।
আমি একবার আপত্তি পর্যন্ত করতে পারলুম না। একজন হাতে জল ঢেলে দিলেন। হাত ধুয়ে যা পারি খেয়ে নিলুম। কতদিন আগেকার রান্না সব! অপূর্ব স্বাদ ছিল পিসিমার রান্নার। এখন নিজের জিভের স্বাদকুঁড়ি বোদা হয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও বুঝি নিখুঁত রেসিপি দিয়ে তৈরি হয়েছে এ সব। অনেক রকম। এঁরা কি জানতেন, পিসিমা কি জানতেন আমি আজই আসব? আশ্চর্য! আমি মিষ্টি খেতে পারতুম না, তাই পিসিমা রসে দেবার আগে আমার জন্য খাবার-দাবার তুলে রাখতেন। আজও দেখি সেই রসে না দেওয়া খাজা।
আমার খাওয়ার পর দুজন মহিলা দেখলুম পিসিমাকে খাওয়াতে এলেন। দুধ মিষ্টি এই সব খাদ্য। আর তখনই বুঝতে পারলুম পিসিমা চলচ্ছক্তিরহিত। ভাবতে থাকি, ভাবতে থাকি। কীভাবে ওঁকে, আমরা নিজের পিসিমাকে এই পরাশ্রয় থেকে নিয়ে যাব। গাড়িতে হবে না। অ্যাম্বুলেন্স চাই। সে না হয় হল। কিন্তু আমাদের চন্দননগরের বাড়িতে শোবার ঘর মাত্র দুটো। একটাতে আমরা থাকি। আরেকটাতে বাবা থাকতেন নাতিকে নিয়ে। এখন বাবা চলে গেছেন। নাতিরই ঘর হয়ে গেছে সেটা। বন্ধু-বান্ধব নিয়ে আড্ডা বসে, স্টিরিও চলে, ধূমপানও চলে। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। সে এলেই শোবার অসুবিধা হয়। আমাকে নীচের বৈঠকখানায় নেমে যেতে হয়। ছেলেরও বছর আঠাশ বয়স হল। চাকরিবাকরি করছে। বিয়ে দিলেই হয়। এর মধ্যে কোথায় এই চলচ্ছক্তিহীন বৃদ্ধাকে নিয়ে তুলব? কিন্তু এসব ভেবে তো লাভ নেই। নিয়ে আমাকে যেতেই হবে। এতদিন পরে মুতা পিসিমার পুনরুজ্জীবন ও পুনরাবির্ভাবে আমার স্ত্রীর মনের অবস্থাই বা কী হবে ভাবতেও ভয় পাচ্ছি। এঁকে তো সেবাযত্নও করতে হবে, শয্যাশায়ী যখন। মনে মনে দ্রুত একটা হিসেব কষে নিই। দুবেলা দুজন আয়া রাখলে দৈনিক 120 টাকা, শুধু নাইটে রাখলে 60 টাকা মিনিমাম। আর যদি তুতিয়ে পাতিয়ে সারা দিনের জন্য কাউকে রাখা যায়। মাসে এতগুলো টাকা আসবে কোত্থেকে? এটাই বড়ো খরচ। তা নয় তো উনি কী-ই খান আর কী-ই বা পরেন। ছেলের কাছ থেকে আমি কিছু চাই না, সে নিজে থেকে যা দেয়, দেয়। আমার অবসরোত্তর পাওনাগন্ডার অঙ্ক নেহাত খারাপ নয়, কিন্তু সরকার সুদ কমিয়ে দেওয়ার জন্য অন্য পেনশনারদের মতো আমিও মুশকিলে পড়েছি। একটা এফ. ডি. ভাঙাতেই হবে। আমরা দুজন না হয় বৈঠকখানাতেই শোব। বাইরে গ্রিল ঘেরা যে বারান্দাটুকু আছে ওখানেই অতিথি আপ্যায়ন…
