সামনে দাঁড়িয়ে দারোয়ান। তাকে ছোটো টুকরো কাগজে নিজের নাম লিখে দিতে হল। সে সেটাকে চালান করল ভেতরে অন্য হাতে। পাঁচ মিনিট… ছ মিনিট… তারপরেই সেলাম করে দরজা খুলে দিল দারোয়ান। আমি আমাদের সেই পুরোনো চওড়া গলিপথের মধ্যে ঢুকলুম আটচল্লিশ বছর পরে।
মাথাটা এরা ঢেকেছে। জায়গায় জায়গায় কাচের মতো বড়ো বড়ো ফাইবারের চতুর্ভুজ। মধ্য দিনের আলো মৃদুতর হয়ে ঢুকছে গলিটায়। নানারকম কুচো পাথর দিয়ে তলাটা বাঁধানো। লোকটি আমাকে প্রথম দরজা ছাড়িয়ে দ্বিতীয় দরজার দিকে নিয়ে গেল। আমি জানি এটা অন্দরের দরজা। অর্থাৎ বৈঠকখানা, বড়ো জেঠুর ল লাইব্রেরি, হলঘর এগুলো আমার দেখা হবে না। ঢুকি ভেতর মহলের ঢাকা দালানে। সমস্ত একই আছে তবু বদলে গেছে। লাল সিমেন্টের জায়গায় গোলাপি আভার নিষ্কলঙ্ক শ্বেতপাথর। দূরে দূরে একটা করে ছোট্ট কালো রুইতন। সিঁড়িটার ধাপ এখন অনেক নীচু নীচু। আকারটা পালটে গেছে। দুটো মোচড় দিয়ে উঠেছে সিঁড়িটা। একই রকম মার্বেলের। পাশের রেলিং-এর ওপরের পাত ঝকঝকে পেতলের।
এই সিঁড়ির তলায়, সাদা ধবধবে ধুতি আর মেরজাই পরে ততোধিক ধবধবে, প্রায়-গোলাপি মার্বেলের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া গাত্রবর্ণের প্রশান্ত চেহারার এক বৃদ্ধ। একটু মোটা। চুলগুলো যেটুকু আছে ধবধবে, বাকিটুকু টাক।
বললেন, আসেন সুরোঞ্জনবাবু। আমি ভীষ্ম বরজাতিয়া।
হাতজোড়, মুখে প্রশান্ত হাসি। হাসির উলটো পিঠে যেন একটা আশ্চর্য বিষণ্ণ গাম্ভীর্য।
ভীষ্মনাথ না বিশ্বনাথ প্রথমটা আমি বুঝতে পারিনি। পরে খেয়াল হল ভীষ্মর মটা উনি উচ্চারণ করেছিলেন। জীবনে প্রথম শুনলাম এই নাম।
সিঁড়ি বেয়ে উঠি। উনি ওঠেন অবলীলায় ধুতি পরে, আমি উঠি হোঁচট খেতে খেতে ট্রাউজার্স পরে। কেননা আমার পায়ে এখন আটচল্লিশ বছর আগেকার ছন্দ। সিঁড়িটা বদলে যাওয়ায় সেই অভ্যাস ধাক্কা খাচ্ছে। ছন্দভঙ্গ হচ্ছে।
ওপরে উঠি। বেশ কিছু ধবধবে মহিলা ও পুরুষ শান্ত কৌতূহলের দৃষ্টিতে আমাকে দেখেন। কেউই ঠিক যুবা বয়সের নয়। মহিলারা সাদা জমির ওপর লেসের পাড় দেওয়া শাড়ি সামনে আঁচল করে পরেছেন, কোমরে রুপোর চাবির গোছা, পরিষ্কার চুল আঁচড়ে বাঁধা। পুরুষরা পরেছে একই রকমের ধুতি ও মেরজাই।
দোতলায় উঠে আর নিজের বাড়ি চিনতে পারি না। এঁরা বোধহয় ঘরের মাঝের দেওয়ালগুলো ভেঙে একেবারে রিমডেল করে নিয়েছেন সব। ঘরের মধ্যে দিয়ে ঘর তার মধ্যে দিয়ে দালান, তারপরে আবার ঘর… যেন গোলকধাঁধা। কোনোটাই শোবার ঘর না। উঁচু তক্তপোশে গদির বিছানা, পাশে তাকিয়া… সম্ভবত কাজের জন্য। পেতলের পিকদান। ফাইল ক্যাবিনেট। ছোটো টেবিল সেক্রেটারিয়েট টেবিল। এই ভাবেই অবশেষে যে ঘরে এসে পৌঁছেই সেটা বোধহয় এঁদের অন্দরের বসার ঘর। দেয়ালে দেয়ালে পৌরাণিক কাহিনির ছবি সব। ভীষ্মনাথ খুব খাতির করে আমাকে একটি দোলনায় বসালেন। অত্যন্ত অস্বস্তির সঙ্গে বসি। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটি ট্রেতে লম্বা সাদা পাথরের গ্লাসে পানীয় এল। ভীষ্মনাথ একটি গ্লাস আমার হাতে তুলে দিলেন, আর একটি নিজে নিলেন। বললেন, পিজিয়ে, খান।
দরকার ছিল না।–আমি বলি, আমি এ সময়ে…
এখোন আপনার লাঞ্চ টাইম এঁরা জানেন,–আশেপাশে মহিলাদের দিকে তাকিয়ে বললেন তিনি।
মহিলারা নিঃশব্দে নমস্কার করলেন।
আমি কী বলব ভেবে পাই না। এঁরা জানেন মানে কী? মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন হচ্ছে না কি? সর্বনাশ! চিনি না জানি না। আর যাঁর নিবন্ধে আমার আসা সেই জ্যোতির্ময়ী গুহ কোথায়? তাঁকে দেখব এবং দেখা দেব বলেই তো ছুটে এসেছি। যতটা না এই অচেনা মহিলার টানে, তার চেয়েও বেশি রহস্যের টানে। এখনও আমার মনে হচ্ছে একটা রূপকথার মতো কিছুর মধ্যে ঢুকে পড়েছি।
ভীষ্মনাথ যেন আমার মনের কথা পড়তে পারলেন, বললেন, শরবতটা পিয়ে নিন, অনেক দূর থেকে আসা হচ্ছে তো!
কী করি! শরবতটা পিয়েই নিই। ভারি সুন্দর, সুস্বাদু, তবে একটু গুরুপাকও বটে! এই সব হজম করে করেই বোধহয় এঁদের এমন চিকন গোলাপি চেহারা। তা ওঁর থেকে আমার পানের স্পিড ছিল অনেক বেশি, কেননা শরবতের চেয়ে জ্যোতির্ময়ীতেই আমার আগ্রহ বেশি। উনি একবার শান্ত সুরে বললেন, ধীর সে, ধীর সে…।
আমি বলি, উনি কোথায়?
কে? আপনার আন্ট?
না, মানে জ্যোতির্ময়ী গুহ।
হচ্ছে চলুন।
একটা নাতিবৃহৎ ঢাকা দালান পার হতে হল। দু-একজন মহিলা নিঃশব্দে সরে গেলেন। হয়তো কৌতূহল ছিল, কিন্তু আমার অস্বস্তি লাগবে ভেবে। তারপর যে ঘরটাতে ঢুকলুম সেটার আপাদমস্তক আমার চেনা। যদিও তার ছালচামড়া ছাড়িয়ে আইভরি প্লাস্টিক পেইন্ট আর মাৰ্বল, যদিও জানলাগুলোয় রঙের বদলে মেহগনি পালিশ। কিন্তু সেই প্রিয় খড়খড়ি, লম্বা লম্বা গরাদ দেওয়া প্রায় দরজার মতো লম্বা লম্বা জানলা। লম্বালম্বি ভেনিশিয়ান ব্লাইন্ড ঝুলছে সেগুলো থেকে। এখন আড় করা হয়েছে, মেঝেতে তাই আলো ছায়া। সে আলোর আলোও খুব সুন্দর। সে ছায়ার ছায়াও যেন অলৌকিক। এবং বড়ো ঠাকুমার সেই ঘরে, বড়ো ঠাকুমারই উঁচু পালঙ্কের ওপরে সাদা ধবধবে মোটা বিছানায় শুয়ে রয়েছেন একজন। এঁদেরই মতো ধবধবে বৃদ্ধা। তাঁর অনেক বয়স। শুষ্ক কুঞ্চিত দেহ, ছোটো করে ছাঁটা সামান্য রুপোলি চুল। তা সত্ত্বেও আমার চিনতে কোনো অসুবিধে হল না ইনি আমার নিজস্ব, একেবারে বাবার সহোদরা পিসিমা যিনি আমার বারো বছর বয়সে মারা গেছেন। বিস্ময়ের ধাক্কায় প্রথমটা কথা বলতে পারিনি, তারপর কোথা থেকে যে আমার মধ্যে থেকে পিসিমার বারো বছরের পুরো উঠে এল আমি জানি না। চারপাশের সমস্ত অপরিচিত লোক, অপরিচিত পরিবেশ, আমার বয়স, পিসিমার বয়স সব বিস্মৃত হয়ে আমি পালঙ্কের দিকে প্রায় ছুটে গেলুম, দু-হাত বাড়িয়ে বললুম, পিসিমা। আমার চোখ টনটন করছিল।
