ঠিক করি, আর দেরি নয়। পরদিন সম্ভব হল না। কিন্তু তার পরদিনই কলকাতাগামী লোকালে চড়ে বসলুম। কে এই জ্যোতির্ময়ী গুহ? কোন ঠাকুর্দার বংশের? নাকি পিসতুতো, মাসতুতো, মামাতো! এঁদের সবার কবেই বিয়ে থা হয়ে গেছে, কত দুরে এখন তাঁদের ফ্যামিলি! বৎসরান্তে একবারও দেখা হয় না, মনেও পড়ে না। এক পিসিমার যখন বিয়ে হয় তখন আমার স্কুলে ফাইনাল ইয়ার। দমদম থেকে কদমতলায় তাঁদের বাড়ি যেতে যেতেই দিন কাবার। বেলাবেলি ফিরে আসা হয়েছিল।
ভেতর ভেতর একটা প্রবল উত্তেজনা হচ্ছে। পিসিমা বলে নয়, গুরুসদয় বলে। যতদূর মনে পড়ে কোনো সেনগুপ্তরা বাড়িটা কিনেছিলেন। খুব না হলেও বেশ ধনী। অত বড়ো পাঁচ কাঠার ওপর তিনতলা বাড়ি, তার ওপর তিন চার কাঠার বাগান, কিনতে তো পেরেছিলেন! না সারিয়ে ও বাড়িতে আর থাকাও যেত না। বাবার মুখেই শুনেছি—আগেকার দিনের সব পঙ্খের দেয়াল। তাতে বড়ো বড়ো জায়গা ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল, কড়িকাঠে ঘুণ, যখন তখন চুনবালির চাঙড় খসে পড়ত। ছাদ লিক করা শত চেষ্টাতেও বন্ধ করা যায়নি। মেঝেতে জায়গায় জায়গায় বড়ো ফাটল। জ্যাঠা বলতেন, মেটিরিয়াল ভালো দ্যায়নি আর কি! ঠাকুরদা তাড়াহুড়ো করে বন্ধুর ছেলেকে দিয়ে করালেন। দেখলেন না শুনলেন না
ট্রেনের ফাঁকা কামরায় বসে আকাশপাতাল ভাবি। সেনগুপ্ত তো বাঙালিই হয়। বড়োজোর পূর্ববঙ্গ। কারু না কারুর আন্ট তো বটেই…। পরিষ্কার অবাঙালি টান ও উচ্চারণ। যেসব বিহারি, উত্তরপ্রদেশীয়, পাঞ্জাবিরা দীর্ঘদিন পশ্চিমবঙ্গে বাস করতে করতে ভাষাটাকে গলায় তুলে নিয়েছেন, কিন্তু মিড় গমক রপ্ত হয়নি তাঁদেরই মতো। তবে বাড়িটা আবার হাত বদল হয়ে গেল? অতখানি জায়গা। বহুতল উঠতেই পারে। ভাবতে বুকের ভেতরটা কেমন টনটন করে উঠল! অভিমানেই হয়তো, এই এতদিনেও ও দিকে যাইনি। সেই বিশাল বিশাল উঁচু সিলিংয়ের ঘর, লম্বা ডাঁটির পাখা, চুন বালি খসা দেয়াল, লাল সবুজ পেটেন্ট স্টোনের মেঝেতে জায়গায় জায়গায় ফাটল, চওড়া দালান, বিরাট খাবার টেবিল, তার ওপর গামছার নেট টাঙিয়ে আমরা পিংপং খেলতুম! গাড়ি বারান্দার ধারগুলোয় কত গাছ! বারোমেসে ফুল, মরশুমি ফুল… কে যে যত্ন করত আজও জানি না। আমার চন্দননগরের বাড়ির টবে সেসব ফুল কিছুতেই ফোঁটাতে পারিনি। সপ্তমুখী জবা কুঁড়ি হয়ে হয়েই ঝরে যায়। জুইয়ের লতাটাই ফনফন করে বাড়ছে, দু চারটে ফুল ফুটতে না ফুটতেই শেষ। আমার স্ত্রী বলে, দূর, তার চেয়ে তুমি নয়নতারা আর বোম ফুল লাগাও। বলব কি! তাও আমার ভাগ্যে থাকে না। থাকবে কী করে? শিখিনি তো কী করে রাখতে হয়। চারা পুঁতে দু-চারদিন একটু দেখাশোনা করেই খালাস।
গুরুসদয়ের সেই চুন বালি খসা বালির মেজাজই আলাদা। যেন ইংরেজ বিতাড়িত ওয়াজেদ আলি শাহ মেটিয়াবুরুজে এসে উঠেছেন। আমাদের কখনও মনে হয়নি বাড়িটা বাসের অযোগ্য হয়ে গেছে। বড়োরাই এসব ভাবতেন। দালানের বাঁকে, বারান্দার কোণে, ছাদের পাঁচিলে, এ কাকার খাটের তলায়, ও ঠাকুমার আলমারির পেছনে আমাদের জন্যে কত যে হেমেন্দ্রকুমার রায়, ঘনাদা, শার্লক হোমস, জিম করবেট ওত পেতে থাকত! সিলিং থেকে দেয়ালের খসা ছালচামড়ার ছোপছাপে, মেঝের ফাটলে আমাদের জন্যে রহস্য ঝুলে থাকত, স্বপ্ন উঁচিয়ে থাকত! সেই গুরুসদয় ফ্ল্যাটবাড়ি? কৃপণ বারান্দা, কৃপণতর রান্নাঘর, বাথরুম, হয়তো আজকালকার কেতার ড্রয়িং ডাইনিং একত্রে করতে গিয়ে ঘরগুলো দশ বাই দশ। তারপরেই একটু আশা জাগে ওখানে রইস লোকেরাই থাকবেন। তাঁদের অন্তত ষোলো বাই ষোলো চাই। বারান্দার কৃপণতাও তাঁদের পছন্দ হবার কথা নয়। সে ক্ষেত্রে তাঁরা বারান্দায় বসে সান্ধ্য চুমুকগুলো দেবেন কী করে? রান্নাঘরে অত গ্যাজেটসই বা ধরবে কেন?
এই সব ছাইপাঁশের সঙ্গে সঙ্গে তুতো ভাইবোনেদের ছোটোবেলাকার মুখ মনে পড়ে। স্মৃতিতে সবাই সার দিয়ে দাঁড়ায়। এই দেখছি, এই উধাও, যেন ভোজবাজি। আমাদের এখনকার বয়সের চেয়ে অনেক ছোটো মা বাবা কাকা কাকিমা জ্যাঠা জেঠিমাদেরও দেখতে পাই। পিসিমার মুখ মনে পড়ে। এখন ভেবে দেখতে গেলে এঁরা অনেকেই যুবক যুবতিই ছিলেন। কিন্তু আমরা সবসময় তাঁদের বড়ো অর্থাৎ বয়স্ক ভেবে এসেছি। এখন আমরা বুড়ো হতে ভয় পাই, কিন্তু তখন ঠাকুরদার শুকনো গাল, ঠাকুরমার ফোকলা হাসি—এসব কী ভালো লাগত! অদ্ভুত!
ট্যাক্সি ড্রাইভারকে থামতে বলি। অন্তত বছর কুড়ি এদিকে আসিনি। সব কেমন বদলে গেছে। অত চওড়া রাস্তাটাকে সরু লাগছে। একটা বিরাট ভ্যাটের ওপর চারপাশে জঞ্জালের স্থূপ। দুর্গন্ধ ঢিবির ওপরে কুকুর বেড়ালের মোচ্ছ। এবার আমাকে নেমে খুঁজতে হবে। ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে সুতরাং হাঁটতে থাকি। এবং হঠাৎ-ই চোখে পড়ে যায় গুরুসদয় দত্ত রোড। চিনতে পারিনি, তবু চিনেছিলাম। এ যে কী রকম অনুভূতি আমি বলে বোঝাতে পারব না। সেই একই গাড়ি বারান্দা। কিন্তু এখন বাহারি গ্রীলে ঢাকা সবটা। ওপরে লাল মতো দেখতে ঢালু ছাদ। সদর দরজা আগাগোড়া ঝকঝকে পালিশ। সেই বাড়ি কিন্তু পুরো সাদা ধবধবে, স্নো হোয়াইটের দেশ থেকে বুঝি উঠে এসেছে। নিয়মিত এ বাড়ির রং ফেরানো হয় নিশ্চয়, এতটুকু বৃষ্টির শ্যাওলা পর্যন্ত নেই। আগাগোড়া রইস, শুধু রইসই নয়, আরও কিছু। কোথা থেকে যে নেমে এসেছে? স্বর্গ থেকে? না স্বপ্ন থেকে?
