কিন্তু উত্তর না দিলে কী হবে, পাশের লোকটা ঘ্যানঘেনে বৃষ্টির মতো সমানে বকে যাচ্ছে।
কতক্ষণ পিপুল গাছটার তলায় দাঁড়িয়েছিল, খেয়াল নেই ভরোসালালের। হঠাৎ একসময় বৃষ্টির তোড় কমে এল, সেই সঙ্গে ঝড়ের দাপটও। তবে আকাশ ভারী হয়ে আছে। যে কোনো মুহূর্তে প্রবল বেগে আবার শুরু হয়ে যেতে পারে।
সেই লোকটা কানের পাশ থেকে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, ‘বারিষ ধরে এসেছে। এই মওকায় পাহাড় পেরুতে হবে।’ বলেই সঙ্গীদের উদ্দেশে জোরে জোরে হাঁকল, ‘অ্যাই ছোকরারা—চল চল, জোরসে পা চালা’—সবাইকে তাড়িয়ে নিয়ে সে পাহাড়ের দিকে চলল।
দলটা আগে আগে চলেছে। তাদের পেছনে রয়েছে সেই মেয়েটা ভরোসালাল এই সুযোগটা ছাড়ল না। মেয়েটার পেছন পেছন সে-ও হাঁটতে লাগল। বৃষ্টির জোর নতুন করে বাড়বার আগেই সে-ও শেরমুণ্ডি পাহাড় পেরিয়ে যেতে চায়।
দিন কয়েক আগে ঠাকুর রঘুনাথ শিং শিকারে যাবে—এই খবরটা পেয়ে হেকমপুর তালুকে ছুটে গিয়েছিল ভরোসালাল। পুরো চারটে দিন রঘুনাথ সিংয়ের সঙ্গে জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে টিন পিটিয়ে মোট দশটা টাকা আর তিন কিলো মাইললা মজুরি হিসেবে পেয়েছে। সেই টাকাটা তার কোমরে গোঁজা রয়েছে, আর মাইলোগুলো তার চিত্রবিচিত্র ঝুলিটায়।
হেকমপুরে থাকতে থাকতেই সে খবর পেয়েছিল, পূর্ণিয়া টাউনে দু-চার দিনের মধ্যে খ্যাপা কুকুর মারা হবে। তাই রঘুনাথ সিংয়ের শিকার শেষ হতে না হতেই সে বেরিয়ে পড়েছে। শেরমুণ্ডি পাহাড় ডিঙিয়ে ওপারে টাউন ভকিলগঞ্জে আজকের রাতটা কাটাবে ভরোসালাল। তারপর কাল সকালে উঠে চলে যাবে সগরিগলি ঘাটে, সেখানে নদী পেরিয়ে পূর্ণিয়া টাউনের দিকে হাঁটা শুরু করবে।
যাই হোক, এই শেরমুণ্ডি পাহাড়টা ভয়ানক রকমের খাড়া তার সারা গায়ে ঘন অরণ্যা শাল আর মহুয়ার গাছই এখানে বেশি করে চোখে পড়ে। অবশ্য আমলকী, দেবদারু, কেঁদ আর ট্যারাবাঁকা চেহারার অগুনতি সিসম গাছও চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে। এছাড়া আছে নানা ধরনের ঝোপঝাড়, সাবুই ঘাস এবং আগাছার জঙ্গল।
জঙ্গলের ভেতর দিয়ে আঁকাবাঁকা পায়ে চলার রাস্তা উঠে গেছে। সেই রাস্তা এই মুহূর্তে অত্যন্ত বিপজ্জনক। কেননা যদিও এটা একটা পাহাড়, তবু হাজার হাজার বছরের ঝড়বৃষ্টিতে পাথর ক্ষয়ে ক্ষয়ে এর গায়ের ওপর চামড়ার মতো মাটির একটা স্তর জমেছে। বৃষ্টিতে সেই মাটি গলা মাংসর মতো থকথকে হয়ে আছে।
খুব সাবধানে পা ফেলে ফেলে ওরা পাহাড় বাইছিলা বৃষ্টির জোর কমে এলেও অল্প অল্প পড়েই যাচ্ছে। হাওয়ার দাপটও আগের মতো নেই। দু-ধারের ঝোপ-ঝাড় থেকে ঝিঝিদের একটানা চিৎকার উঠে আসছিলা গাছের মাথায় সরু-মোটা, নানা বিচিত্র সুরে পাখিরা একটানা ডেকে যাচ্ছে। কোথায় যেন সাপেদের পেট টেনে টেনে চলার শব্দ হচ্ছে।
সেই মধ্যবয়সী লোকটা মাঝে মাঝেই তার সঙ্গীদের উদ্দেশে হেঁকে উঠছিল, ‘জলদি পা চালা। হো রামজী, দুফার পার হয়ে গেল!
চারিদিকের নানারকম শব্দ বা মধ্যবয়সী লোকটার হাঁকাহাঁকি শুনেও যেনে শুনতে পাচ্ছিল না ভরোসালাল। দূরমনস্কর মতো খাড়াই পাহাড় ভাঙছিল সো নেহাত বৃষ্টিটা হঠাৎ এসে গেছে। নইলে তাড়াহুড়ো করে ওপারে যাবার খুব একটা দরকার তার নেই। কারণ আজকের দিনটা তার বিশ্রামা টাউন ভকিলগঞ্জে একবার পৌঁছতে পারলে ধীরে সুস্থে হাত-পা ছড়িয়ে দিনের বাকি অংশটা সে কাটিয়ে দেবে। তারপর কাল থেকে আবার নতুন কাজের ধান্দা শুরু হবে। কিন্তু কালকের কথা কাল।
খানিকক্ষণ পাহাড় বাওয়ার পর হঠাৎ কাতর গোঙানির মতো একটা আওয়াজ কানে আসতে চমকে উঠল ভরোসালাল। সামনের দিকে তাকাতেই দেখতে পেল সেই গর্ভিণী মেয়েটা পাহাড়ে ওঠার ক্লান্তিতে ভয়ানক হাঁপাচ্ছে। তার মুখটা খুলে অনেকখানি হাঁ হয়ে গেছে। তার ফাঁক দিয়ে থেকে থেকে গোঙানিটা বেরিয়ে আসছিল হাঁপানির দাপটে মেয়েটার বুক তোলপাড় হয়ে যাচ্ছিল। চোখের তারা দুটো মরা মাছের চোখের মতো, মনে হচ্ছিল সে-দুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসবে।
প্রায় টলছিল মেয়েটা তার মধ্যেই হাতখানেক গভীর থকথকে কাদার ভেতর এলোপাথাড়ি পা ফেলতে চেষ্টা করছিল। কিন্তু পারছিল না। সে হয়তো ঘাড়-মুখ গুঁজে হুড়মুড় করে পড়েই যেত, তার আগেই পেছন থেকে হাত বাড়িয়ে ধরে ফেলল ভরোসালাল। বলল, ‘কেয়া, তুমহারা তবিয়ত আচ্ছা নেহী?
খুব নির্জীব গলায় মেয়েটা উত্তর দিল, নেহী—’। ভরোসালাল কি বলতে যাচ্ছিল, হঠাৎ তার চোখে পড়ল সেই মাঝবয়সী লোকটা দামড়া মোষের মতো জোয়ান ছোকরাগুলোকে নিয়ে ঝোপ-ঝাড় ঠেলে অনেকদূর এগিয়ে গেছে। সে এবার অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে পড়ল, ‘আরে তোমার সাথবালারা (সঙ্গীরা) বহোত দূর চলে গেল যে!’
মেয়েটা বলল, ‘আমি ওদের সাথে আসি নি।’
ভয়নক চমকে ওঠে ভরোসালাল, ‘মতলব (মানে)?’
‘আমি অকেলিই এসেছি।’
‘হো রামজী, শরীরের এই হাল নিয়ে তুমি অকেলিই বেরিয়ে পড়েছ!’
‘কী করব?’
‘কেন, তোমার মরদ কোথায়?’
মেয়েটা ভরোসালালের প্রকাণ্ড চওড়া বুকের ওপর শরীরের ভার রেখে খানিকটা সামলে নিয়েছিল। এবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সে বলল, ‘সে আসতে পারল না’
ভরোসালাল জিজ্ঞেস করল, ‘কেন?’
‘মহাজনের খেতিবাড়িতে সে বেগার দিতে গেছে।‘
‘বেগার?
‘হাঁ—’ মেয়েটা এবার যা বলে, সংক্ষেপে এইরকম চার সাল আগে তাদের দেহাতের মহাজন বিষুণ আহীরের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার নিয়েছিল তার মরদা টাকাটা আর শোধ করা যায়নি কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা লোকটার, তার সিন্দুক সোনাচাঁদি আর জহরতের পাহাড় আর জমিজমা খেতিবাড়ির তো লেখাজোখা নেই। তাদের দেহাতে যেখানে যে জমিতে পা দেওয়া যাক না, সেটাই বিষুণ আহীরের। এত জমি, এত টাকা-পয়সা থাকলে কী হবে, লোকটা আস্ত কসাই। এই মেয়েটার মরদের সামান্য ক’টা টাকা উসুল করার জন্য বিষুণ তাকে বছরের পর বছর বেগার খাটিয়ে চলেছে। বছরে দু মাস মেয়েটার মরদকে বিষুণ আহীরের খেতিবাড়িতে বেগার দিতে হয়। সুদে আসলে বিষুণের টাকাটা ফুলেফেঁপে এমনই হয়ে দাঁড়িয়েছে যাতে দশ বছর বেগার দিলেও নাকি ওটা শোধ হবে না। এইরকম যখন অবস্থা তখন মেয়েটির মরদ তার সঙ্গে আসে কী করে?
