০১. পাহাড়ী উপত্যকা

পূর্বপার্বতী – প্রফুল্ল রায়
PURBAPARBATI –A Bengali Novel By PRAFULLA Roy Published by Sudhangshu Sekhar Dey, Deys Publishing
প্রথম প্রকাশ : ভাদ্র ১৩৬৪, সেপ্টেম্বর ১৯৫৭, প্রথম দেজ সংস্করণ বৈশাখ ১৩৮৫, এপ্রিল ১৯৭৮ পঞ্চম রাজ সংস্করণ : মাঘ ১৪১৫, জানুয়ারি ২০০৯

.

অগ্রজপ্রতিম শ্ৰীসাগরময় ঘোষ পরম শ্রদ্ধাস্পদে

.

লেখকের কথা

আমি উপন্যাসে ভূমিকার পক্ষপাতী নই। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভূমিকা অপরিহার্য। পূর্বপার্বতী এরকম একটি ক্ষেত্র।

ভারত সীমান্তের নাগা উপজাতির জীবনযাত্রা ভিত্তি করে এই উপন্যাস রচিত হয়েছে।

নাগাদের মধ্যে গোষ্ঠী এবং বংশগত অসংখ্য ভাগ ও ভেদ রয়েছে। নানা ভাষা এবং উপভাষার প্রচলন আছে। সমাজব্যবস্থা, উৎসব এবং ধর্মাচরণের আনুষঙ্গিক রীতিও সর্বত্র এক নয়। তা সত্ত্বেও সামগ্রিকভাবে (স্বল্পসংখ্যক শিক্ষাপ্রাপ্ত ছাড়া) সকল শ্রেণীর নাগার মধ্যে আদিম বন্য চরিত্রের উপাদানগুলি মূলতঃ অভিন্ন। লালসা, প্রতিহিংসা, তীব্র রতিবোধ, হিংস্রতা প্রভৃতি প্রবণতাগুলির প্রকাশভঙ্গিতে তেমন কোনো তফাত নেই।

নাগাভূমি। সংখ্যাতীত পাহাড়মালা, দুর্গম অরণ্য, নদী-জলপ্রপাত ঝরনা-মালভূমি উপত্যকা দিয়ে ঘেরা সীমান্তের এই দেশটি সমতলের বাসিন্দাদের কাছে অপরিসীম বিস্ময়ের বিষয় হয়ে রয়েছে। শ্বাপদসঙ্কুল এই দেশটিতে মানুষের জীবনযাত্রা কিরকম, তাদের সমাজ কোন নীতিতে চলে, কৌলিক ও সামাজিক আচার-আচারণ কেমন–এ সব সম্পর্কে কৌতূহলের অন্ত নেই।

নাগা পাহাড়ের নিসর্গরূপ অপূর্ব। ভয়ঙ্কর এবং সুন্দরের এমন সার্থক স্বচ্ছন্দ মিশ্রণ ভারতের অন্য কোথাও আছে কিনা সন্দেহ।

নাগাদের জাতীয় জীবনের প্রাথমিক ইতিহাস বর্ণাঢ্য। যুথচারী মানুষগুলির গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে, বংশে বংশে সংঘাত, প্রতিহিংসা, নারী ও ভূমি আয়ত্ত করার উত্তেজনায় প্রতিটি মুহূর্ত রোমাঞ্চকর। এদের উৎপত্তি সম্বন্ধে প্রচুর রূপকথা ও উপকথা ছড়িয়ে আছে।

কিন্তু গত কয়েক দশকের ইতিহাস শুধু বর্ণময়ই নয়, বেগবানও। ইংরেজদের অভিযান, খ্রিস্টান মিশনারি, সমতলের বেনিয়া ও সরকারি এবং বেসরকারি কর্মচারীদের দৌলতে ভারতবর্ষের মুক্তি আন্দোলনের খবর আসা, দ্বিতীয় মহাসমর, স্বাধীনতা, ফিজোর অভ্যুত্থান–নাগা পাহাড়ে প্রতি মুহূর্তে উন্মাদনা, নিমেষে নিমেষে দৃশ্যপট পরিবর্তন।

সময়ের চতুর কারসাজি সত্ত্বেও নাগা-মনের মৌলিক বৃত্তিগুলি এখনও বিশেষ বিকৃত হয় নি।

পূর্বপার্বতী জাতিতত্ত্বের গবেষণা নয়; নাগাদের কাম-লালসা-হিংসা, ন্যায়-অন্যায় বোধ এবং জীবনের দ্রুত পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস।

নাগাদের অগণ্য গোষ্ঠীগুলির মধ্যে থেকে একটিকে বেছে নিয়ে তাদের অখণ্ড এবং সমগ্র জীবনবোধকে এই উপন্যাসে রূপ দেওয়া হয়েছে।

সুবৃহৎ আয়তন এবং সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার দিকে লক্ষ্য রেখে গ্রন্থটিকে দু’টি স্বয়ংসম্পূর্ণ পর্বে প্রকাশ করার ব্যবস্থা হয়েছে। বর্তমানে প্রথম পর্বটি প্রকাশিত হল।

শুধু পাদপ্রদীপের জলুসই নয়, নেপথ্যের আয়োজনটুকু পাঠকসমাজকে জানানো প্রয়োজন।

এই গ্রন্থ রচনার প্রথম প্রেরণা দিয়েছিলেন অগ্রজপ্রতিম শ্ৰীসাগরময় ঘোষ। নাগা পাহাড়ে পাঠানো থেকে শুরু করে উপন্যাসটির নামকরণ এবং প্রতিটি ছত্রে তাঁর স্নেহ ও আন্তরিকতার প্রীতিপ্রদ উত্তাপ অনুভব করি। তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক সম্পাদক লেখকের গণ্ডি পেরিয়ে ঘনিষ্ঠতা বিচারের বহু মাপকাঠি ডিঙিয়ে গিয়েছে। আমার সাহিত্যিক জীবনে তার অফুরন্ত উৎসাহের উৎস হয়ে থাকার কথাটি স্মরণ করে ঋণ পরিশোধের দুঃসাহস করব না।

এর পরেই যাঁর নাম করতে হয় তিনি শিলংয়ের শ্ৰীহেমন্তকুমার গুপ্ত। হেমন্তবাবু আমার অশেষ শ্রদ্ধাভাজন। এই একনিষ্ঠ সাংবাদিক ও নির্যাতিত দেশপ্রেমীর কাছে গ্রন্থটির জন্য অজস্র অমূল্য উপকরণ এবং পরামর্শ পেয়েছি। এ প্রসঙ্গে তার পরিবারের প্রতিটি ব্যক্তির সস্নেহ সহৃদয়তা ও শিলংয়ের কয়েকটি আশ্চর্য সুন্দর দিন তাদের মধ্যে কাটাবার কথা মনে রেখে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

আমার পরম শ্রদ্ধাস্পদ সুসাহিত্যিক শ্রীভবানী মুখোপাধ্যায় ও শ্রীনন্দগোপাল সেনগুপ্তের ঋণ এই সূত্রে স্বীকার করি।

লামডিংয়ের শ্রীপ্রাণবল্লভ তালুকদার ও তার পরিবার, ডিমাপুরের শ্রীমহাদেব কাকতি, কোহিমার শ্রীডেকা, শ্রীসেনগুপ্ত, মোককচঙের শ্রীমথুরপ্রসাদ সিংহ, মি.সেমা, মি,আও, মি.গ্ৰীয়ারসন এবং ইম্ফলের শ্ৰথম্বাল সিং, শ্ৰীগিরিধারী ফুকন, শ্রীগোস্বামী ও শ্রীসত্যকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্বিচার সহায়তার কথা উল্লেখযোগ্য।

সেই তিনটি পাহাড়ী সর্দার, যারা দিনের পর দিন, রাতের পর রাত আমাকে তাদের জীবনকথা, রূপকথা, উপকথা এবং অসংখ্য উপাদান যুগিয়ে পূর্বপার্বতী রচনা সম্ভব করেছে তাদের কাছে আমার ঋণ পর্বতপ্রমাণ। এই সঙ্গে সেই নাম-প্রকাশে অনুচ্ছিক দোভাষী বন্ধুটি এবং আবাল্যসুহৃদ শ্ৰীচিন্ময় ভট্টাচার্য ও শ্রীঅর্ধেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সহায়তার কথা স্মরণ করি।

দেশ পত্রিকায় এই গ্রন্থ প্রকাশকালে যেসব সহৃদয় পাঠক-পাঠিকা চিঠি দিয়ে আমার উৎসাহ বর্ধন করেছিলেন, নানা কারণে স্বতন্ত্রভাবে তাদের উত্তর দেওয়া সম্ভব হয় নি। এই সুযোগে মার্জনা চেয়ে তাদের ধন্যবাদ জানাই।

প্রফুল্ল রায়
বাটানগর
২০ ভাদ্র : ১৩৬৪

.

প্রকাশকের নিবেদন

পূর্বপার্বতী প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৭ সালের সেপ্টেম্বরে। প্রকাশক ছিলেন বেঙ্গল পাবলিশার্স। কয়েকটি সংস্করণ নিঃশেষিত হওয়ার পর অন্য একটি প্রকাশন-সংস্থা থেকে এটি বেরোয় এবং আরো কয়েকটি সংস্করণের পর আমরা এই ধ্রুপদী উপন্যাসটি প্রকাশ করি। আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে চারটি মুদ্রণ শেষ হয়েছে। বর্তমানে আগাগোড়া পরিমার্জিত হয়ে সুদৃশ্য রয়াল সাইজে এটির সুমুদ্রিত, শোভন রাজ সংস্করণ প্রকাশিত হল।

একান্ন বছর আগে প্রথম প্রকাশকালে পূর্বপার্বতীর প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন বম্বেপ্রবাসী প্রখ্যাত শিল্পী আশু বন্দ্যোপাধ্যায়। অনেকদিন হল তিনি প্রয়াত। শিল্পীর সম্মানে তার অনবদ্য প্রচ্ছদটি দিয়ে সাজিয়ে পূর্বপার্বতীর রাজ সংস্করণ পাঠককে উপহার দেওয়া হল।

বেঙ্গল পাবলিশার্স-এর সৌজন্যে এটি সম্ভব হয়েছে।

সুধাংশুশেখর দে

.

কাহিনি

১.

পাহাড়ী উপত্যকা। ভেরাপাঙ গাছের ছায়াতল দিয়ে বিশাল একটা চড়াই-এর দিকে উঠে গিয়েছে। ভেরাপাঙ আর জীমবো গাছ। ঘনবদ্ধ। পাহাড়ের তামাভ মাটি থেকে কণা কণা প্রাণ সঞ্চয় করে উদ্দাম হয়ে উঠেছে এই অরণ্য। মাঝে মাঝে সাঙলিয়া লতার ছায়াকুঞ্জ। যেখানেই একটু র পেয়েছে সেখানেই পাথুরে মাটি চৌফালা করে মাথা তুলেছে আখুশি আর খেজাঙের। ঝোঁপ। আতামারী লতা সাপের মতো বেয়ে বেয়ে উঠে গিয়েছে খাসেম গাছের মগডালে।

উদ্দাম বন। কাঁটালতার জটিল বাঁধনে বাঁধনে কুটিল হয়ে রয়েছে। রোদ, বৃষ্টি আর অবারিত বাতাস থেকে স্বাস্থ্য আহরণ করে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছে।

পাহাড়িয়া অরণ্য। ভয়াল আর ভয়ঙ্কর। এতটুকু ফাঁক নেই, এতটুকু রন্ধ্র নেই। শুধু মৃত্যুর মতো আশ্চর্য এক হিমছায়া নিথর হয়ে রয়েছে তার পাঁজরের নিচে। সবুজ আর সবুজ। একটা তরঙ্গিত সবুজ সমুদ্র স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে কোনো পাহাড়ী ডাইনির কুহকে।

ভীষণ এই পাহাড়িয়া বন। তবু মেশিহেঙ ঝোঁপের বাহারি ফুলে এই নিষ্ঠুর বন্যতার মধ্যে কিছুটা স্নেহের আভাস পাওয়া যায়। কিছুটা শান্তি আছে সোনা গাছের নরম নরম মুকুলে।

অনেক দূরে বৃত্তাকারে বাঁক নিয়েছে টিজু নদী। ঘন নীল জল। রাশি রাশি পাথরের বাধাকে কলোল্লাসে মাতিয়ে মাতিয়ে, ফেনার ফুলকি ফুটিয়ে ফুটিয়ে, বাঁকে বাঁকে হারিয়ে গিয়েছে। এখান থেকে নীল হাঁসুলির একটা চকিত ঝিলিকের মতো মনে হয় টিজু নদীকে। এই পাহাড়ী বনের কোথাও কোনো খাড়াই টিলার ওপর থেকে উচ্ছ্বসিত হয়ে নেমেছে জলপ্রপাত। কোথাও বা সাপেথ কুঞ্জের পাশ দিয়ে শব্দহীন ঝরনা রেখার আঁকিবুকি টেনে নিচের দিকে মিলিয়ে গিয়েছে। দূরের ওই টিজু নদীর উচ্ছ্বাস, অজানা প্রপাতের এই কল কল উল্লাস–এগুলিই এই পাহাড়ী বনের হৃৎপিণ্ড হয়ে অহরহ বেজে চলেছে।

শীতের রোদে মধুর আমোদ আছে। সেই রোদই সোনালি আমেজের মতো ছড়িয়ে পড়েছে উপত্যকায়। সবুজ সমুদ্রটা রোদের অকৃপণ সোনা মেখে রূপময় হয়ে উঠেছে।

ওপরে অবারিত আকাশ। তার নীল রঙে আশ্চর্য ক্রুরতা। কোথাও দু-এক টুকরো মেঘের ভ্রুকুটি ভেসে বেড়াচ্ছে। অনেক উঁচুতে পাহাড়ের চড়াইটা ঘিরে এখনও সাদা কুয়াশার একটা চিকন রেখা স্থির হয়ে আছে।

বাঁ দিকে অবিন্যস্ত ওক বন আর আপুফু গাছের জটিল জটলা। হঠাৎ তার মধ্য থেকে যুঁড়ে বেরিয়ে এল দু’টি বন্য মানুষ। ঘন তামাভ গায়ের রং। বিশাল বুকে, অনাবৃত বাহুসন্ধির দিকে থরে থরে পেশীভার উঠে গিয়েছে। স্ফীত নাক, মোটা মোটা ঠোঁট। ওদের ভাসা ভাসা পিঙ্গল চোখের মণিতে আদিম হিংস্রতা। কানের ওপর দিয়ে সারা মাথায় চক্রাকার রেখা টেনে চুল কামানো। খাড়া খাড়া উদ্ধত চুল দু’টি কান আর ঘাড়ের ওপর কিছু কিছু ছড়িয়ে পড়েছে। বিরাট থাবায় দুজনেই মুঠো করে ধরেছে জীমবো পাতার মতো তীক্ষ্ণমুখ বর্শা। মোটা মোটা আঙুলের মাথায় ধারাল নখ। বর্শার লম্বা বাঁশে সেই নখগুলি স্থির হয়ে বসেছে। সারা মুখে দাড়িগোঁফের চিহ্নমাত্র নেই। গাল, চিবুক আর গলা থেকে তাদের নির্মূল করা হয়েছে। কানে। পিতলের গোলাকার গয়না। সারা দেহ অনাবরণ। একজনের কোমরের চারপাশে হাতখানেক চওড়া পী মুঙ কাপড়। গাঢ় কালো রঙের প্রান্তে ঘন লালের আঁকিবুকি। পরিষ্কার কৌমার্যের সংকেত। আর একজনের পরনে জঙগুপি কাপড়, একেবারে জানু পর্যন্ত নেমে এসেছে। ঘন নীল রঙের ওপর চারটে সাদা সাদা দাগ। সাদা দাগের আড়াআড়ি চারটে লাল রেখা আঁকা। বিবাহিতের পরিচয়। সেই সঙ্গে বোঝা যায়, মানুষটা প্রিয়জনদের অনেকগুলো ভোজ দিয়ে জঙগুপি বস্ত্রের সম্মান অধিকার করেছে।

সামনেই একটা বাদামি রঙের বিশাল পাথর। চারপাশে পাংশু ঘাসে পাহাড়ী রুক্ষতা। ঘাসের পাতায় পাতায় রাত্তিরে শিশির ঝরেছিল। সেই শিশিরকণা শুভ্র আর নিটোল মুক্তোর। মতো জমে বরফ হয়ে গিয়েছিল। আবার সূর্যের নতুন উত্তাপে এখন গলে গলে টলটলে জলবিন্দু হয়ে গিয়েছে। রুক্ষ পাহাড়ী ঘাসের ওপর ফাটা ফাটা পায়ের চিহ্ন এঁকে বাদামি পাথরের ওপর এসে দাঁড়াল দুজন।

শীতের হিমাক্ত বাতাস উঠে আসছে টিজুনদীর জলধারা থেকে, সাঁ সাঁ করে ঝাঁপিয়ে পড়ছে ওক আর ভেরাপাঙ গাছের জঙ্গলে। সেদিকে এতটুকু লক্ষ্য নেই পাহাড়ী মানুষ দু’টির। বিন্দুমাত্র মনোযোগ নেই।

দুজনের একবার চোখাচোখি হল।

একজন বলল, কি রে সেঙাই, কোন দিকে যাবি? এদিকে সুবিধে হবে না, মনে হচ্ছে।

সেঙাই এতক্ষণ তার পী মুঙ কাপড়ে একটা শক্ত গিঁট দিয়ে নিচ্ছিল। গম্ভীর গলায় বলল, হু, তাই মনে হচ্ছে। একটা কানা হরিণ পর্যন্ত নজরে আসছে না। এক কাজ করা যাক, ওই টিজু নদীর দিকে চল যাই রেঙকিলান। সম্বর কি চিতাবাঘ পাবই ওদিকে।

একবার চমকে উঠল রেঙকিলান। গলাটা তার কেঁপে কেঁপে উঠল, কিন্তু ওদিকে তো সালুয়ালাঙ বস্তি। আমাদের শত্রুপক্ষ। ওরা দেখলে একেবারে কিমা বানিয়ে ছাড়বে দুজনকে।

দুচোখ ঘৃণায় ভরে উঠল সেঙাই-এর, কেলুরি বস্তির নাম তুই ডুবিয়ে দিবি টিজু নদীতে। বিয়ে করে একটা ছাগী হয়ে গেছিস রেঙকিলান।

কী বললি! রেঙকিলানের দু’টি পিঙ্গল চোখে হত্যা ঝিলিক দিয়ে উঠল, আমি ভীতু হয়ে গিয়েছি! আমি ছাগী বনে গিয়েছি!

হু-হু। ছাগী না, একটা টেফঙ (পাহাড়ী বানর) হয়ে গেছিস। নির্বিকার গলায় বলল সেঙাই, আপোটিয়া (তুই মর)।

খিস্তিটা নিঃশব্দে পরিপাক করল রেঙকিলান, তারপর সেঙাইর দিকে তাকাল। দু’টি চোখ থেকে তার পিঙ্গল আগুন বেরিয়ে আসছে। কিন্তু আশ্চর্য শান্ত গলায় সে বলল, চল, কোন চুলোয় যাবি–

সেঙাই সামনের দিকে বর্শাসমেত হাতখানা প্রসারিত করে দিল, হুই টিজু নদীর দিকে

বেশ। জঙগুপি কাপড়ের গোপন গ্রন্থি থেকে একটা বাঁশের চাচারি বার করল রেঙকিলান। তারপর আড়াআড়ি দু’টি ঠোঁটের মধ্যে রেখে শব্দ করে উঠল। সেই তীক্ষ্ণ শব্দের তরঙ্গ প্রতিধ্বনিত হতে হতে উপত্যকার ওপর দিয়ে খাড়াই প্রান্তরের দিকে মিলিয়ে গেল। একটু পরেই সেই একই শব্দ পাহাড়ের মাথা থেকে বাতাসের ওপর তরঙ্গিত হতে হতে ভেসে এল। রেঙকিলানের শব্দটি সংকেত। পরের শব্দটি উত্তর।

সেঙাই বলল, তা হলে ওঙলেরা ঠিকই এসে গেছে।

হু। আর দেরি করে লাভ নেই। চল। ওরা এখনই দূর পাহাড় ঘুরে এখানে এসে পড়বে।

বাদামি পাথরটার ওপর থেকে দুজনে ভোরপাঙ গাছের নিবিড় অরণ্যে ঢুকল। মাথার ওপর পাতার নিচ্ছেদ ছাদ। রোদ আসার একটুকু ফঁক নেই। নাগা পাহাড়ের এই ঘন বনে সূর্যের প্রবেশ নিষিদ্ধ। নিচে আশ্চর্য হিমাক্ত ছায়া। মাঝে মাঝে বাঘনখের আঁচড়ের মতো ফালি ফালি পথ। চারপাশে কাঁটালতা ঝুলছে। খুগু পাতা দুলছে। আর উদ্দাম হয়ে উঠেছে বুনো কলার বন। ঋতুমতী পৃথিবী এই নাগা পাহাড়ের উপত্যকায় অকৃপণভাবে সুশ্যাম জীবন উপহার দিয়েছে।

পাহাড়ী ঘাস। কোথাও কোমরসমান উঁচু, কোথাও হাঁটু পর্যন্ত। ওক আর জীমবো গাছের ফাঁক দিয়ে এগিয়ে চলেছে সেঙাই আর রেঙকিলান। বার বার কাঁটালতার আঘাত লাগছে। তামার দেহ থেকে রক্তরেখা ফুটে বেরিয়েছে। সেদিকে একবিন্দু হৃক্ষেপ নেই।

মাথার ওপরে আকাশ নেই। শুধু ওক আর ভেরাপাঙ পাতার নীরন্ধ্র ছাদ প্রসারিত হয়ে রয়েছে।

মাঝে মাঝে বুনো মৌমাছির ঝাঁক উড়ে যাচ্ছে। লাফিয়ে লাফিয়ে গাছের আড়ালে মিলিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ী বানরের দল। দূরে দূরে বুনো ঘাসের ওপর মাথা তুলেই আউ পাখিরা অদৃশ্য হচ্ছে। আর দেখা যাচ্ছে লাল রঙের শানিলা পাখিদের। অস্বাভাবিক লম্বা তাদের ধূসর রঙের ঠোঁট। গাছের শাখায় শাখায় ঠোঁট দিয়ে ঠক ঠক শব্দ করছে খারিমা পতঙ্গেরা।

পাহাড়ী বনের বাধা ছিঁড়ে ছিঁড়ে এগিয়ে চলেছে সেঙাই আর রেঙকিলান। কিছুক্ষণ পর পর বাঁশের চাচারিতে তীব্র-তীক্ষ্ণ শব্দ করছে রেঙকিলান। সঙ্গে সঙ্গে আগের মতোই বাতাসে দোল খেতে খেতে ভেসে আসছে তার উত্তর। পাহাড়ের দূর সীমা ধরে তাদের অনুসরণ করে চলেছে ওঙলেরা।

নাগাদের মধ্যে শিকারের একটি প্রথা আছে। শিকারিরা ঘন বনের ভেতর দিয়ে শিকারের সন্ধানে এগিয়ে যাবে। আর দুজন মানুষ বহু দূরে পাহাড়ের প্রান্ত বেয়ে বেয়ে তাদের খাবার নিয়ে অনুসরণ করবে। বাঁশের চাচারিতে শব্দ তুলে দুদলের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করা হয়, এবং উভয় দলের অবস্থিতি বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

আচমকা একটা খুঙগুঙ গাছের মগডাল থেকে একটা পাহাড়ী ময়াল সাপের বাচ্চা আছড়ে এসে পড়ল ঘাসবনের ওপর। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সেঙাই আর রেঙকিলান। একটি মাত্র মুহূর্ত। তারপরেই সেঙাইর বর্শাটা আকাশের দিকে উঠে গেল। সেই হিমছায়ার মধ্যেও ঝকমক করে উঠল খরধার ফলাটা। সেঙাইর ঠিক পাশেই রেঙকিলান। তার চোখেও পিঙ্গল ঝিলিক।

কিন্তু আশ্চর্য! সেঙাই-এর বর্শা আকাশের দিকেই স্থির হয়ে রইল। চোখের পলকে ময়ালের বাচ্চাটা একটা কালো বিদ্যুতের রেখা এঁকে সাপেথ কুঞ্জের আড়ালে পলাতক হল।

প্রথম শিকার। তা-ও ফসকে গেল। সেঙাই তাকাল রেঙকিলানের দিকে। রেঙকিলানর চোখও তার দিকেই নিস্পলক হয়ে রয়েছে। আর দুজনের দৃষ্টিতেই পৃথিবীর সমস্ত সন্দেহ কপিশ দু’টি মণির আকার নিয়ে স্থির হয়ে আছে। সেঙাই ভাবছে, কোনো অনাচার করেনি তো রেঙকিলান কি তার বউ? রেঙকিলান ভাবছে, শিকারে আসার আগে অপবিত্র কোনো কাজ করেছে কি সেঙাই? কলুষিত করেছে দেহমনকে? কেউ কোনো কথা বলল না। দুজনের দৃষ্টিই বিস্ফারিত। শুধু একটি সন্দেহের ঢেউ ফুলে ফুলে উঠছে তাদের মনে। সেই সঙ্গে একটা সর্বনাশা ইঙ্গিত মাথার মধ্যে চমক দিয়ে উঠেছে। তবে কি, তবে কি রিখুস প্রেতাত্মা ময়াল সাপের মূর্তি ধরে এসেছিল!

কয়েকটি মুহূর্ত। তারপর টিজু নদীর দিকে পা বাড়িয়ে দিল সেঙাই। তার পেছন পেছন পূর্বপার্বতী রেঙকিলান। একটি কথাও বলছে না কেউ। সেঙাইও না, রেঙকিনও না। শুধু অজানা জলপ্রপাতের অবিরাম কলকল শব্দ শোনা যাচ্ছে। দুজনে ভাবছে, আজ রাতেই আনিজার নামে মুরগি জবাই করে উৎসর্গ করতে হবে।

একসময় মাথার ওপর ঘন পাতার ছাদ শিথিল হয়ে এল। এবার টুকরো টুকরো আকাশের নীলাভা নজরে আসছে। বাঘনখের আঁচড়ের মতো ফালি ফালি পথে, কোমরসমান পাহাড়ী ঘাসের ওপর জাফরি-কাটা রোদ এসে পড়েছে।

অনেকটা কাছাকাছি এসে পড়েছে দুজনে। এখান থেকে টিজু নদীর খরধারা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। শীতের টিজুতে বর্ষার সেই দুর্বার যৌবন নেই। এখানে সেখানে রাশি রাশি পাথরের কঙ্কাল আত্মপ্রকাশ করেছে। তবু ভৈরব গর্জনে পাথরের চাঁইগুলোর ওপর আছড়ে আছড়ে পড়ছে ঘন নীল জল। আক্রোশের মতো ছিটকে ছিটকে বেরুচ্ছে ফেনার ফুলকি।

বিশাল একটা নিখাঙি গাছের তলা দিয়ে টিজু নদীর কিনারায় চলে এল সেঙাই আর রেঙকিলান। সামনে রোদমাখা উপত্যকাটা নজরে আসছে। টিজু নদীর ঘন নীল দেহে সোনার রেখার মতো এসে পড়েছে শীতের রোদ।

শেষবারের মতো বাঁশের চাচারিতে শব্দ তুলল রেঙকিলান। আর সঙ্গে সঙ্গে ওঙলেদের উত্তরও ভেসে এল।

হঠাৎ খুশিতে একটা আওয়াজ করে উঠল রেঙকিলান, হুই–হুই দ্যাখ। দেখেছিস?

কী? কোথায়? ফিরে তাকাল সেঙাই।

হুস-স-স-স, আস্তে। সেঙাই-এর সরব কৌতূহলের ওপর যতি টানল রেঙকিলান, সম্বর। কানা না কী! হই যে নদীর ওপারে–

এবার সত্যিই দেখতে পেল সেঙাই। একটা মেশিহেঙ ঝোঁপের আবডাল থেকে টিজু নদীর দিকে মাথা বাড়িয়ে দিয়েছে সম্বরটা। চলমান জলের আয়নায় নিজের রূপ দেখতে দেখতে আবিষ্ট হয়ে গিয়েছে প্রাণীটা। বাঁকা বাঁকা শিঙ, শান্ত স্নিগ্ধ দু’টি চোখ। খয়েরি দেহে সাদা সাদা চএ।

সেঙাই বলল, আস্তে। একটা শিকার ফসকেছে। খুব সাবধান। এটাকে মারতেই হবে। দূরের বাঁকটা ঘুরে নদী পার হই চল।

দূরের বাঁকে যাব কেন?

সাধে কি বলি, বিয়ে করে একেবারে ছাগী হয়ে গেছিস। এখান দিয়ে পার হলে দেখতে পাবে না! আমাদের দেখলে তোর বাড়ি ভোজের নেমন্তন্ন নেবার আশায় বসে থাকবে! খুব বাহাদুর। এই বুদ্ধিতে শিকারি হয়েছিস! কণ্ঠ থেকে তাচ্ছিল্য ঝরল সেঙাইর।

হয়েছে, হয়েছে। ফ্যাক ফ্যাক করিস না। চল হুই বাঁকের দিকে। নরম গলায় বলল রেঙকিলান। আর মনে মনে সেঙাই-এর খাসা বুদ্ধির তারিফ করল। সত্যিই তো, এ কথাটা তো তার মগজে উঁকি মারেনি!

বাঁকের মুখ অনেকটা সমতল। টিজুনদী এখানে খানিক শান্ত। কাঁচের মতো স্বচ্ছ জলে নানা রঙের রাশি রাশি পাথর। কোমরসমান স্রোত ডিঙিয়ে ওপারে চলে এল দুজনে। তারপর আখখাকিয়া গাছের আড়াল দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে মেশিহেঙ ঝোঁপটার পাশে এসে দাঁড়াল।

সেঙাই তাকাল রেঙকিলানের দিকে। আর সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত টিজু নদীর উদ্দাম নীল স্রোতকে চমকিত করে মেঘ গর্জন করে উঠল। নদীর আরশিতে শিউরে উঠল সম্বরের মুগ্ধ ছায়া। মেঘ গর্জায়নি, বাঘ ডেকেছে।

চকিত রেঙকিলান বলল, চিতাবাঘ।

হিসহিস করে উঠল সেঙাই, খুব সাবধান।

তারপরেই পলকের মধ্যে ঘটে গেল ঘটনাটা। এক ঝলক বিদ্যুতের মতো সম্বরটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল একটা চিতাবাঘ। সঙ্গে সঙ্গে বর্শাটা আকাশের দিকে তুলে ধরল সেঙাই। তীক্ষ্ণমূর্খ ফলাটায় মৃত্যু ঝিলিক দিয়ে উঠল। পেশীর সমস্ত শক্তি কবজির মধ্যে জড়ো করে বর্শাটা ছুঁড়ে মারল সেঙাই। কিন্তু তার আগেই সম্বরটাকে পিঠের ওপর তুলে মেশিহেঙ ঝোঁপের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে চিতাবাঘটা। আর সেঙাই-এর বর্শাটা সাঁ করে একটা খাটসঙ গাছের গুঁড়িতে গেঁথে গিয়েছে।

তীব্র গতিতে ঘুরে দাঁড়াল সেঙাই, কি রে, বর্শা লাগল না যে চিতাবাঘের গায়ে?

তার আমি কী জানি। লাগাতে পারিসনি, তাই বল।

কাল রাতে বউ-এর কাছে শুয়েছিলি, আর সেই কাপড়ে নিশ্চয়ই উঠে এসেছিস। তা না হলে শিকার ফসকে যাচ্ছে কেন? সেঙাইর দুচোখে কুটিল সন্দেহ, ইজা রামখো!

বাজে কথা। কাল তো আমি মোরাঙে গিয়ে শুয়েছিলাম। এক কাজ করি আয়, চিতাবাঘটা বেশি দূর যেতে পারেনি এখনও। আশেপাশেই আছে। সাবধানে খুঁজে বার করি চল। একটু থামল রেঙকিলান। তারপর আবার বলতে শুরু করল, আমার একটা সন্দেহ হচ্ছে, কাল শুয়োর মারিসনি তো সেঙাই?

কী বললি? গর্জন করে উঠল সেঙাই, নে রিহুগু (তোকে বাঘে খাক)। কাল সারাদিন আমি মোরাঙ থেকে বেরিয়েছি?

শিকারের আগের রাতে নাগারা স্ত্রীর সঙ্গে এক বিছানায় শোয় না। যারা অবিবাহিত, তারা শুয়োর হত্যা করে না। এ রাতটা তাদের কঠোর শুচিতা দিয়ে ঘেরা। শিকারিরা এ রাতে গ্রামের মোরাঙে এসে বিছানা বিছায়। তাদের বিশ্বাস, কলুষিত দেহমন নিয়ে শিকারে বেরুলে অসফল হয়ে ফিরতে হয়। তার ফলে ক্রুদ্ধ বনদেবীর অভিশাপ এসে পড়ে। রিখুস প্রেতাত্মা কুপিত হন। তাদের ওপর। বনদেবীর অভিশাপ আর রিখুস প্রেতাত্মার কোপ বড় ভয়াল। সে অভিশাপ আর কোপ পাহাড়ে পাহাড়ে দাবাগ্নি ছড়িয়ে দেয়। তাতে ছারখার হয়ে যায় সমস্ত নাগা পৃথিবী।

একসময় রেঙকিলান বলল, দেরি করতে হবে না, চল। আবার চিতাটা না ভেগে পড়ে।

চল।

খাটসঙ গাছের গুঁড়ি থেকে বর্শাটাকে টেনে খুলে নিল সেঙাই। কোমরে বাঁশের লম্বা খাপ, তার মধ্যে ফলাটাকে ঢুকিয়ে দিল সে। তারপর মেশিহেঙ ঝোঁপটা পাশে রেখে পাহাড়ী ঘাসের ওপর নিঃশব্দে পা ফেলে এগিয়ে যেতে শুরু করল। সামনে সেঙাই। পেছনে রেঙকিলান। তাদের সমস্ত ইন্দ্রিয় ধনুকের ছিলার মতো প্রখর হয়ে উঠেছে। তাদের ঘ্রাণ কান-দৃষ্টি আর স্নায়ু অতিমাত্রায় সচেতন। সন্দেহজনক একটুমাত্র শব্দে চমকে চমকে উঠছে দুজনে।

হঠাৎ থমকে দাঁড়াল রেঙকিলান। তারপর জঙগুপি কাপড়ের গ্রন্থি থেকে বাঁশের চাচারি বার করে তীক্ষ্ণ শব্দ করে উঠল। সে শব্দটা টিজু নদীর ওপারে বনময় উপত্যকার ওধারে ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু আশ্চর্য! ওঙলেদের উত্তর এবার ভেসে এল না। আবারও শব্দ করল রেঙকিলান। এবারও ওঙলেরা নিরুত্তর।

রেঙকিলান তাকাল সেঙাইর দিকে। দেখল, সেঙাই তারই দিকে তাকিয়ে আছে।

আচমকা রেঙকিলান চিৎকার করে উঠল, আতঙ্কে তার গলাটা থরথর করে কাঁপছে, কী সর্বনাশ! হাঃ–আঃ–আঃ।

চুপ, একেবারে চুপ। আমিও দেখেছি। আয়, হুই আড়ালে লুকোই। রেঙকিলানকে টানতে চানতে একটা কাঁটাময় খেজাঙ ঝোঁপের মধ্যে চলে এল সেঙাই। খেজাঙ পাতার জানালা দিয়ে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। বুকসমান পাহাড়ী ঘাস সরিয়ে ভেরাপাঙ গাছের ফাঁক দিয়ে দুলতে দুলতে এগিয়ে আসছে একদল নাগা। মাথায় হুন্টসিঙ পাখির পালক গোঁজা। দুচোখে আদিম হিংস্রতা তাদের। মুষ্টিবদ্ধ বর্শার ফলাগুলো পাহাড়ী ঘাসের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এসেই আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। এরা সব সালয়ালা গ্রামের মানুষ। সেঙাইদের শত্রুপক্ষ।

খেজাঙের কাটাঝোপে রুদ্ধশ্বাসে উবু হয়ে বসেছে সেঙাই আর রেঙকিলান। তামাভ দেহ ধারাল কাটার আঘাতে আঘাতে ফালা ফালা হয়ে গিয়েছে। চিতাবাঘের সন্ধানে কখন যে একেবারে সালুয়ালা গ্রামের মধ্যে এসে পড়েছে দুজনে, খেয়াল ছিল না। সারা দেহের ওপর। রাশি রাশি সরীসৃপ কিলবিল করছে। এতটুকু নড়ছে না কেউ। হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন পর্যন্ত থেমে গিয়েছে যেন। নিথর হয়ে গিয়েছে দুজনে। শরীরী নিশ্চেতনার মতো দাঁড়িয়ে রইল দু’টি তামাভ পাহাড়ী মানুষ।

খেজাঙ ঝোঁপের কাছাকাছি এসে পড়েছে মানুষগুলো। হাতের মুঠিতে তীক্ষ্ণধার বর্শা। পরনে সকলেরই পী মুঙ কাপড়। কৌমার্যের লক্ষণ। সহসা দাঁড়িয়ে পড়ল মানুষগুলো। তারপর অনাবৃত বুকের ওপর চাপড় মেরে চিৎকার করে উঠল একসঙ্গে, হো-হো-ও-ও-ও–ও–

হো–ও–ও-য়া-য়া-য়া–

সে চিৎকারে পাহাড়ী অরণ্য চমকে উঠল। শিউরে উঠল টিজু নদীর নীল ধারা। আর খেজাঙের ঝোপে দু’টি হৃৎপিণ্ডে তীব্র আতঙ্কে রক্ত ফেনিয়ে ফেনিয়ে উঠতে লাগল। জোরে জোরে নিশ্বাস পড়তে লাগল তাদের।

হো-ও-ও-ও–ও–স্বরগ্রাম আরো তীক্ষ্ণ হচ্ছে, প্রখর হচ্ছে।

এই মানুষগুলোও শিকারে বেরিয়েছে। তাদের চিৎকারে ভয়ার্ত শব্দ করে উড়ে যাচ্ছে খুগু পাখির ঝাঁক, উড়ে যাচ্ছে লোটে আর শানিলা পাখির দল।

এখনও সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে সালুয়ালাঙের মানুষগুলো। মাঝে মাঝে সতর্ক চোখে এদিকে সেদিকে তাকাচ্ছে। আর হঠাৎই সেঙাইর অস্ফুট স্মৃতির মধ্যে দোল খেয়ে উঠল একটা রক্তাক্ত অতীতের কাহিনী। যে অতীতের বর্শা এই সালুয়ালাঙ আর তাদের কেরি গ্রাম দু’টিকে টিজুনদীর দু’পারে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। যে অতীত টিজু নদীর দু’দিকে একটি অনিবার্য শত্রুতার জন্ম দিয়েছে।

.

কিংবদন্তির মতো ব্যাপার। টিজু নদীর দু’পারে সালুয়ালাঙ আর কেলুরি–এই পাহাড়ী জনপদ দু’টির প্রতিটি মানুষের ধমনীতে বিষাক্ত রক্তকণার মতো মিশে রয়েছে সে অতীত। সে অতীতের কাহিনী সেঙাই শুনেছে কেলুরির প্রাচীনতম মানুষটির মুখে। শীর্ণ দুই হাঁটুর ফাঁকে ধূসর মাথাখানা গুঁজে বুড়ো খাপেগা বলেছিল আর মোরাঙের জোয়ান ছেলেরা খাপেগার চারপাশে বৃত্তাকারে ঘন হয়ে বসে শুনেছিল।

বুড়ো খাপেগা কেলুরি গ্রামের সর্দার। আশ্চর্য মনোরম তার গল্প। কথার সঙ্গে উত্তেজনার মদ মিশিয়ে সে মোরাঙের জোয়ান ছেলেদের মাতাল করে তুলেছিল। সেদিন আকাশে ছিল ক্ষয়িত চাঁদ। নাগা পাহাড়ের ছড়ানো উপত্যকায় রহস্যময় জ্যোৎস্না ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই জ্যোৎস্নার সঙ্গে খাপেগার কাহিনী মিশে এক বিচিত্র প্রতিক্রিয়া ঘটে গিয়েছিল সেঙাই-এর চেতনায়। সেই সঙ্গে বোধহয় অন্য সব জোয়ানদেরও।

খাপেগা সর্দার শুরু করেছিল এইভাবে, সেই রাতটা এমনই ছিল সু খুঙতার (ক্ষয়িত চাঁদের) রাত। হু-হু, তা কত বছর আগের ব্যাপার ঠিক মনে নেই। তবে সেদিন আমার চুল এমনি আখুশি পাতার মতো হেজে যায়নি। গায়ে জোর ছিল বাঘের মতো। সেই রাত্তিরে হুই সেঙাই-এর ঠাকুরদা এসে ডাকল আমাকে। তখন এই মোরাঙ ছিল টিজু নদীর কিনারে। রাতে শুয়ে ছিলাম। এদিকে সেদিকে চিতার ডাক। বুনো মোষের ঘোঁতঘোঁতানি। টানাডেনলা পাখির চিৎকার। পেছনের খেজাঙ ঝোঁপ থেকে জেভেথাঙ ফিসফিস করে ডেকেছিল আমাকে।…

রূপকথার মতো অপরূপ সে কাহিনি। খাপেগার গল্প মোটামুটি এইরকম।

টিজু নদীর দু’পাশে ও বন আর ভেরাপাঙের ছায়ায় সেদিন সালুয়ালাঙ কি কেলুরি গ্রামের চিহ্নমাত্র ছিল না। দুইয়ে মিলিয়ে ছিল এক অখণ্ড জনপদ। তার নাম কুরগুলাঙ। টিজু নদীর দুধারে এক উপত্যকা থেকে দূরের পাহাড়চূড়া পর্যন্ত ছিল কুরগুলাঙের বিস্তার।

নদীর এপারে ছিল জোহেরি বংশ। ওপারে পোকরি বংশ। দু’টি বংশই সমাজকে সবগুলো ভোজ খাইয়েছে। নগদা উৎসবে মোষ বলি দিয়েছে। ভালুক উৎসর্গ করেছে টেটসে দেবতার নামে। দুই বংশের প্রাচীনতম মানুষটি গ্রামের পেনেসেঙ্গু (পুরোহিত)। এই দুই বংশের বর্শার প্রতাপে সমস্ত গ্রামের সম্মান নির্বিঘ্ন, মর্যাদা অক্ষুণ্ণ। দুই বংশের মধ্যে একটা আন্তরিকতার সেতু পাতা রয়েছে। সেই সেতু টিজু নদীর দু’টি কিনারাকে যুক্ত করে দিয়েছিল। সেই সেতু টিজু নদীর দু’পারে দু’টি বংশের হৃদয়ে পারাপার হবার অন্তরঙ্গ যোগপথ। জোহেরি আর পোকরি বংশ। দুইয়ে মিলিয়ে এক অখণ্ড সত্তা। একটি বংশ আর-একটি বংশের সম্পূরক। জা কুলি উৎসবের দিনে কি নতুন ফসল তোলার মরশুমে টিজু নদী পার হয়ে আসত পোকরি বংশের। প্রাচীনতম মানুষটি। জোহেরি বংশের প্রবীণ মানুষটির পাশে নিবিড় হয়ে বসে পরামর্শ করত। বাঁশের পানপাত্রে রোহি মধু। কাঠের বাসনে ঝলসানো বনমুরগি আর একমুঠো নুন এবং বড় টঘুটুঘোটাঙ পাতায় কাঁচা তামাক দিয়ে তাকে অভ্যর্থনা করা হত পাহাড়ী প্রথামতো। আবার গ্রামে নতুন মোরাঙ তৈরির দিনে জোহেরি বংশের প্রবীণ মানুষটি নদী পেরিয়ে ওপারে যেত। বাইরের ঘরে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে মনের কপাট খুলে দিত। ফিসফিস গলা। কিন্তু একটিমাত্র স্থির লক্ষ্য। কুরগুলাঙ গ্রামের মোরাঙ যেন দুই বংশের আভিজাত্যে আর মহিমায় উজ্জ্বলতর হয়ে উঠতে পারে। মোরাঙই হল গ্রামের মর্যাদা, গ্রামের প্রতিষ্ঠার স্বাক্ষর। বাঁশের পানপাত্রে তামাটে ঠোঁট ঠেকিয়ে দুজনেই ধূসর মাথা নাড়ত।

আকাশে বিলীয়মান পূর্ণিমার ক্ষয়িত চাঁদ। খাপেগার কণ্ঠ পর্দায় পর্দায় চড়ছিল। আশ্চর্য উত্তেজক এক প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছিল তার কথাগুলো। সুদূর উপত্যকায় ভেরাপাঙের বনকে ভৌতিক মনে হয়েছিল। সেদিন ঘন কুয়াশার স্তর নেমে এসেছিল দূরতম আকাশ থেকে, থরে থরে ঝরছিল পাহাড়ী অরণ্যে। সব মিলিয়ে সেঙাই-এর আধফোঁটা পাহাড়ী মনটা একটু একটু করে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিল।

খাপেগা বলেছিল, হালচাল ভালোই চলছিল। আচমকা যেন পাহাড়ের তলায় ভূমিকম্প। শুরু হল। জোহেরি আর পোকরি–দুই বংশের যে এত পিরিত, সব সেই ভূমিকম্পের দোলায় চুরমার হয়ে গেল। এই যে সেঙাই, ওর ঠাকুরদা ছিল আমার স্যাঙাৎ। তার নাম জেভেথাঙ। সে এই জোহেরি বংশের ছেলে। আর নদীর ওপারে পোকরি বংশের মেয়ে নিতিৎসু। এই দুজনকে নিয়েই ফাটল ধরল দুই বংশে…..।

জোহেরি বংশের ছেলে জেভেথাঙ। মাথার চারপাশ দিয়ে গোল করে নিখুঁত কামানো চুল। কানের লতিতে পিতলের নিয়েঙ গয়না, সেই গয়না থেকে লাল রেশমের গুচ্ছ দোদুল দুলছে। উজ্জ্বল তামাভ দেহে থরে থরে পেশীভার। পরনে ওক ছালের লেঙতা। কড়ির বাজুবন্ধ। ছোট ছোট চোখে নিশ্চিত ঘাতনের ঝিলিক। হাতের থাবায় হাতখানেক লম্বা বর্শার ফলা। আর পোকরি বংশের মেয়ে নিতিৎসু। গলায় ছোট ছোট শঙ্খের মালা। মণিবন্ধে কড়ির কঙ্কণ। ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত। সোনালি স্তনচূড়া। পিঙ্গল চুলের গুচ্ছে টুঘুটুঘোটাঙ ফুল। কোহিমা থেকে তার বাপ এরি কাপড় এনে দিয়েছিল। কোমরের চারপাশ ঘিরে জানুর ওপর পর্যন্ত সেই শৌখিন আবরণ ঝলমল করে।

জেভেথাঙ আর নিতিৎসু। জোহেরি আর পোকরি বংশ। টিজু নদীর এপার আর ওপার। গ্রীষ্মের এক নির্জন দুপুর। মেশিহেঙ ঝোঁপের পাশ দিয়ে নিয়তবাহী এক ঝরনা। নিঃশব্দ। শুধু আশ্চর্য করুণ আর ছলছল এক জলধারা। তার পাশেই জোহেরি আর পোকরি বংশের দুই যৌবন প্রথম মুখোমুখি হল। জেভেথাঙ দেখল নিতিৎসুকে। নিতিৎসুর পিঙ্গল চোখের মণিতেও একটি পরিপূর্ণ পাহাড়ী যৌবনের ছায়া পড়েছে। সে ছায়ার নাম জেভেথাঙ।

আবিষ্ট চোখে তাকিয়ে ছিল জেভেথাঙ। তার বন্য চোখ দু’টিতে মুগ্ধতা আর খুশি ঝিলিক দিয়ে দিয়ে যাচ্ছিল। আর নিতিৎসুর দৃষ্টি একটু একটু করে কঠিন হয়ে উঠছিল।

একসময় গাঢ় গলায় জেভেথাঙ বলেছিল, কী নাম তোর?

নিতিৎসু। নাম বললাম, যা এবার ভাগ।

আজ থেকে তুই আমার আসাহোয়া (বন্ধু) বনে যা।

কী! ময়াল সাপের মতো নির্মম চোখে তাকিয়েছিল নিতিৎসু, জানিস আমি পোকরি বংশের মেয়ে?

আমিও জোহেরি বংশের ছেলে। আমার নাম জেভেথাঙ।

এবার নরম হয়েছিল নিতিৎসু। কোমল গলায় বলেছিল, না, তা হবে না। আমার সোয়ামী ঠিক হয়ে গিয়েছে। হুই নানকোয়া বস্তি, পাহাড়ের হুই উধারে, সেই বস্তির মেজুর বংশের ছেলে রিলোর সঙ্গে আমার বিয়ে হবে। আর কোনো মরদের সঙ্গে আমি বন্ধুত্ব পাতাব না। তা হলে আনিজার গোসা হবে। যা, এবার ভাগ।

ইস, ভাগ বললেই ভাগব! দৃঢ় পদক্ষেপে পাহাড়ের উতরাই বেয়ে নেমে আসতে শুরু করেছিল জেভেথাঙ, আয়, আয়। বিয়ে হলেই হল রিলোর সঙ্গে! আমি থাকতে রিলো কেন? এই কুরগুলাঙে এলে রিলোর মাথা নিয়ে নেব। বর্শা দিয়ে সেই মাথা ছুঁড়ে মোরাঙে ঝোলাব। হু-হু–

সাঁ করে বিদ্যুৎ ঝলকের মতো ঘুরে দাঁড়িয়েছিল নিতিৎসু। ঝরনার পাশেই পড়ে ছিল একটা লোহার মেরিকেতসু (নাগা রমণীর অস্ত্র)। চকিতে তুলে নিয়ে সেটা ছুঁড়ে মেরেছিল জেভেথাঙের দিকে। মেরিকেতসুর আঘাতে কপালটা চৌফালা হয়ে গিয়েছিল জেভেথাঙের। ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল খানিকটা তাজা রক্ত।

আ-উ-উ-উ–আর্তনাদ করে মেশিহেঙ ঝোঁপের ওপর লুটিয়ে পড়েছিল জেভেথাঙ। কপিশ ভুরু দুটো ভিজিয়ে রক্তের ধারা বুকের দিকে নেমে গিয়েছিল তার।

কয়েকটি মুহূর্ত। চেতনাটা কেমন শিথিল হয়ে গিয়েছিল। স্নায়ুর ওপর দিয়ে গুটসুঙ পাখির ডানার মতো একটা কালো পর্দা নেমে এসেছিল। অন্ধকার সরে গেলে লাফিয়ে ওঠে পড়েছিল জেভেথাঙ। এক হাত লম্বা বর্শাটা মুঠোর ওপর তুলে নিয়ে চনমনে চোখে চারিদিকে তাকিয়েছিল। শব্দহীন ঝরনার কিনারায় নিতিৎসু নামে কোনো যুবতীর চিহ্ন নেই। একটা পাহাড়ী বনবিড়াল হয়ে সে যেন অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। খ্যাপা বাঘের মতো গর্জন করে উঠেছে জেভেগাঙ, আচ্ছা, আবার দেখা হবে।

জোহেরি আর পোকরি বংশের যৌবন প্রথম দিনের শুভদৃষ্টি শেষ করেছিল এইভাবে। সেই শুভদৃষ্টি নির্মম স্বাক্ষর এঁকে রেখে গিয়েছিল জেভেথাঙের কপালে। তার স্মৃতিকে অক্ষয় করে রেখেছিল সেই ক্ষতচিহ্ন।

আশ্চর্য রহস্যময় গলায় খাপেগা বলেছিল, রাতে মোরাঙে শুতে এল জেভেথাঙ। তামুনুর (চিকিৎসক) কাছ থেকে কপালে আরেলা পাতার প্রলেপ দিয়ে এসেছে। সকলে চমকে তাকালাম। ব্যাপারখানা কী?

জেভেথাঙ আস্তে আস্তে বলেছিল, একটু বাইরে আয় তত খাপেগা। আচ্ছা থাক, তোরা সবাই শোন।

জেভেথাঙের চারপাশে ঘন হয়ে বসেছিল সকলে।

এই মোরাঙ। গ্রামের সব অবিবাহিত জোয়ান ছেলেদের শোওয়ার ঘর। কুরগুলাঙ গ্রামে দুটো মোরাঙ ছিল। একটা টিজু নদীর ওপারে, আর একটা এপারে।

উত্তেজিত ভঙ্গিতে নিঃশব্দ ঝরনার পাশের সেই ঘটনাটা বলে গিয়েছিল জেভেথাঙ। কটি নিথর মুহূর্ত। তারপরেই মোরাঙ কাঁপিয়ে শোরগোল উঠেছিল। পাহাড়ের উপত্যকায় সে হইচই ক্ষয়িত চাঁদের রাতের হৃৎপিণ্ডকে ফালা ফালা করে দিয়েছিল। আকাশে হয়তো চমকে উঠেছিল মীনপুচ্ছ উল্কারা, শিউরে উঠেছিল সুদূর ছায়াপথের রেখা।

খাপেগা বলেছিল, লাফিয়ে উঠলাম আমি। সারা কুরগুলাঙ বস্তির মধ্যে সবচেয়ে তাগড়া জোয়ান ছিলাম আমিই। সে সব দিন আর নেই। মানুষের মাথা কেটে এই মোরাঙের দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখাই ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় খেলা। সে সব খেলার রেওয়াজ আজকাল উঠে গিয়েছে। বড় আপশোশ হয়। জীর্ণ বুকটা কাঁপিয়ে কাঁপয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এসেছিল প্রাচীন মানুষ খাপেগার, যাক সে কথা। আমার নাম খাপেগা। জানিস তোরা আমার নামের মানে?

সেঙাই বলেছিল, জানি। খাপেগা মানে যে মানুষ দুটো শত্রুর মাথা কেটেছে।

ঠিক তাই। যেতে দে ওকথা। তারপর কী হল বলি। খাপেগা আবার শুরু করেছিল, তখন আমাদের জোয়ান রক্ত। চারদিকে একবার তাকালাম। জেভেথাঙের ফাটা মাথার চারপাশে উবু হয়ে বসেছে নিয়োনো, নড্রিলো, গ্যিহেনি, এমনি অনেকে। আমি বললাম, ঠিক আছে। জেভেথাঙের ফাটা মাথার বদলা পোকরিদের তিনটে মাথা চাই।

কিছুক্ষণ চুপচাপ। তারপরেই মোরাঙ-ফাটানো চিৎকার উঠেছিল। নড্রিলোরা একসঙ্গে গলা মিলিয়েছে, হু—উ—উ—উ–য়া–য়া–আ–আ–পোকরিদের তিন মাথা চাই।

সে চিৎকার টিজু নদীর নীল ধারার ওপারে বনময় পাহাড়ে ধেয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু আশ্চর্য! শান্ত গলায় জেভেগাঙ বলেছিল, তিনটে মাথা নিশ্চয়ই নেব। কিন্তু তার আগে নিতিৎসুকে চাই।

খাপেগা বলেছিল, কী সর্বনাশ, হুই শয়তানীকে নিয়ে কী করবি?

বিয়ে করব।

মোরাঙের নিচে পাহাড়ী পৃথিবীটা যেন আর একবার দুলে উঠেছিল।

আবার খানিকক্ষণ চুপচাপ। তারপরেই সকলের টুকরো টুকরো কথা মিলে একটা জটিল স্বরজাল বোনা হয়েছিল, হু—উ—উ—উ—য়া—আ–আ-হু-হু; হুই শয়তানীকে বর্শা দিয়ে কুঁড়ে নিয়ে আসব। বিয়ে হবে তারপর।

তীব্র, চিৎকার, হু-হু, একটা পেত্নী, নিতিৎসুটা একটা পেত্নী।

নড্রিলো বলেছিল, তোর বাপ এই বস্তির সর্দার। তাকে একবার জানানো দরকার। কী বলিস জেভেথাঙ?

হু-হু। গোল করে কামানো মাথা নেড়ে নেড়ে সায় দিয়েছিল সকলে।

পূর্ববর্তী পরের দিনের সকাল। অগুনতি পাহাড়ের ওধারে, বর্মার চেইনেরও ওপার থেকে সূর্য উঠেছে। তার সোনালি রোদ ঢলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে পাহাড়ী উপত্যকায়।

খাপেগা আর জেভেখাঙ মোরাঙ থেকে বেরিয়ে চলে এসেছিল টিজু নদীর পাড়ে। সরাসরি জেভেখাঙ তাকিয়েছিল খাপেগার দিকে, কি রে, আমি যাব নিতিৎসুদের বস্তিতে?

তুই একটু দাঁড়া। আমি নিতিৎসুর শোওয়ার ঘরখানা দেখে আসি। রাত্তিরে তুই সেই ঘরে যাবি। যদি রাজি না হয়, বর্শা দিয়ে গেঁথে নিয়ে আসব। টিজু নদীতে চমক দিয়ে তীক্ষ্ণ শব্দ করে হেসে উঠেছিল খাপেগা, কি রে, সাহসে কুলোবে তো? না, আমাকেও তোর সঙ্গে নিতিৎসুর ঘরে যেতে হবে রাত্তিরে? আমি গেলে কিন্তু বখরা দিতে হবে।

থাম থাম। মেলা বকর বকর করতে হবে না। যাবি আর আসবি।

একটু পরেই ফিরে এসেছিল খাপেগা। মুখখানা তার ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে। চোখের কোণে ঝিলিক মেরে যাচ্ছে একটা অনিবার্য পূর্বাভাস, এক সর্বনাশা ইঙ্গিত।

একটা খাসেম গাছের আড়াল থেকে রুদ্ধশ্বাসে দৌড়ে এসেছিল জেভেখাঙ, কি রে, কী ব্যাপার? দেখে এসেছিস?

হু। মাথা নেড়েছিল খাপেগা, খুব সাবধান। ওপারের মোরাঙে জোয়ানরা বর্শায় শান দিচ্ছে। আমাকে দেখে কটমট করে তাকাল।

আচ্ছা–

অসহ্য উত্তেজনায় কেঁপে কেঁপে উঠেছিল খাপেগা, মাগী একটা টেফঙের বাচ্চা, একটা পাহাড়ী পেত্নী। সব বলে দিয়েছে নিতিৎসু। আগে থেকে ওরা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু আমাদের মোরাঙের মান রাখতে হবে। নদীর ওপার থেকে মাথা আমাদের চাই-ই। আর আজ রাত্তিরেই নিতিৎসুর শোওয়ার ঘরে তোকে যেতে হবে।

যাব। শরীরের স্নায়ুগুলো ধনুকের ছিলার মতো টান টান হয়ে গিয়েছিল জেভেথাঙের। তীক্ষ্ণ গলায় সে বলেছিল, হু-হু, এপারের মান রাখতেই হবে।

বুড়ো খাপেগা একমুঠো কাঁচা তামাকপাতা মুখে পুরে, খকখক কেশে আবার শুরু করেছিল, এর আগেই জেভেখাঙ বিয়ে করেছে। একটা ছেলে হয়েছে। সেই ছেলেই সেঙাইর বাপ। কিন্তু নিতিৎসুকে দেখে মজে গিয়েছিল জেভেখাঙ। তাই এই বিপত্তি। জানিস তো, পাহাড়ী মানুষ আমরা। হাতের মুঠোয় লম্বা বর্শাটা যার ধরা রয়েছে শক্ত করে, এই পাহাড় আর এই জোয়ান মেয়েমানুষের দুনিয়াদারি তারই। যাক, সেকথা এখন নয়। আসল গল্প শোন–

দুপুরের দিকে নড্রিলো গিয়েছিল জেভেথাঙের বাপের কাছে। তারপর রসিয়ে রসিয়ে নিতিৎসুজেভেথাঙের কাহিনিটা বলে তার মুখের দিকে তাকিয়েছিল, এবার তুই কী করতে বলিস সর্দার?

ভারি তরিবতের লোক জেভেথাঙের বাপ। একটা হুজুগ পেলে আর রক্ষা নেই। বলেছিল, ঠিক আছে, হুই মেয়েই চাই। আর একটা ছেলের বউ আসবে ঘরে। এ বেলাই আমি মেয়ের পণ পাঠিয়ে দিচ্ছি। বিকেলের দিকে জেভেথাঙের পিসি বউ-পণ দেবার জন্যে একশোটা বর্শা, পিতল আর কড়ির শৌখিন গয়না, কোহিমা থেকে কেনা এণ্ডি কাপড় নিয়ে টিজু নদীর ওপারে চলে গিয়েছিল। সঙ্গে চলনদার গেল নড্রিলো আর গ্যিহেনি। জোহেরি আর পোকরি বংশের মধ্যে একটা মনোরম সেতুযযাগের প্রস্তুতি। কিন্তু সন্ধ্যার একটু আগে, বেলাশেষের আকাশ থেকে যখন রাশি রাশি সোনালি কুহক ছড়িয়ে পড়েছে পাহাড়ী উপত্যকায়, ঠিক সেই সময় ফিরে এল জেভেথাঙের পিসি। নড্রিলো আর গ্যিহেনির কাছ থেকে কন্যাপণের বর্শা আর শৌখিন গয়না সব ছিনিয়ে রেখে দিয়েছে টিজু নদীর ওপারের মানুষগুলো। আর নিতিৎসুর জেঠা শাসিয়ে দিয়েছে, এপারের লোক ওপারে গেলে মুণ্ড নিয়ে ফিরে আসতে হবে না। ধারাল নখের তর্জনীটা তুলে সে হিসহিস করে উঠেছিল, খুব সাবধান, নিতিৎসুর সঙ্গে তোদের জেভেথাঙ কথা বলেছে, এই বর্শা আর কাপড়-গয়না রেখে তার দাম নিলাম রামখোর বাচ্চারা। এদিকে আর আসিস না জানের মায়া থাকলে।

সব শুনে গর্জন করে উঠেছিল জেভেথাঙের বাপ। সে গর্জনে শিউরে উঠেছিল কুরগুলাঙ গ্রামের হৃৎপিণ্ড। একটা উদ্দাম তুফানের মতো ছুটে এসেছিল সে মোরাঙে। তারপর বুকের ওপর প্রচণ্ড একটা চাপড় মেরে চিৎকার করে উঠেছিল, ইজাহান্টসা সালো! আ–ও—ও–ওয়া–আ–আ-আ–

পরিচিত সংকেত। ওক বন, ভেরাপাঙের জঙ্গল, মেশিহেঙের ঝোঁপ–পাহাড়ী অরণ্যের দিগদিগন্ত থেকে ঝড়ের মতো ছুটে এসেছিল জোয়ান ছেলেরা। ওই চিৎকারের মধ্যে একটা অনিবার্য ইঙ্গিত রয়েছে। জোয়ানদের ধমনীতে ধমনীতে পাহাড়ী রক্ত দাবাগ্নির মতো জ্বলে উঠেছিল। আদিম অরণ্যের আহ্বান। হত্যা তাদের ডাক দিয়েছে। বর্ষার ফলায় এই হত্যার ঘোষণাকে তারা ছড়িয়ে দেবে টিজু নদীর ওপারে।

জেভেথাঙের বাপের চোখ দুটো যেন দুটুকরো জ্বলন্ত অঙ্গার, শোন জোয়ানের বাচ্চারা, কতকালের বনেদি আমাদের এই জোহেরি বংশ। ওপারের হুই পোকরি বংশ আজ আমাদের অপমান করেছে। এর শোধ তুলতে হবে। মোরাঙ থেকে বর্শা, তীর-ধনুক, কুড়াল বার করে নিয়ে যা।

জোয়ান ছেলেরা এতক্ষণ উৎকর্ণ হয়ে শুনছিল। এবার তাদের চিৎকার উদ্বেল হয়ে উঠল। অনেকগুলো শান্ত শিষ্ট সভ্য দিনের পর এই আদিম আহ্বান তাদের রীতিমতো উত্তেজিত করে তুলেছে। পাহাড়ী বনের হিংস্র আত্মা যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল। জেভেথাঙের বাপের এই ডাক আবার নতুন করে তার ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছে।

জেভেথাঙের বাপ বলেছিল, হু-হু, খাপেগার ওপর সব ভার দিলাম। আজ রাতের মধ্যে পোকরি বংশের তিনটে মাথা চাই। যা মরদের বাচ্চারা। এই মোরাঙের দেওয়াল চিত্তির করব পোকরি বংশের রক্ত দিয়ে। মনে থাকে যেন।

একটু পরেই পঞ্চাশটা জোয়ানের মুঠিতে তীক্ষ্ণধার বর্শা উঠল। বেলাশেষের রোদে ঝকমক করে উঠেছিল ফলাগুলো। একটা রক্তাক্ত প্রতিজ্ঞার আগুন নেচে নেচে যাচ্ছিল জোয়ান। চোখের মণিতে মণিতে।

আ-ও–ও–ও-য়া-আ-আ-আ–টিজু নদীর দিকে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল জোয়ানেরা।

আ-ও–ও–ও-য়া–আ-আ-আ– ওপার থেকেও চিৎকার ভেসে আসছিল। আদিম পৃথিবীর এই আহ্বানে তারাও সাড়া দিয়েছে। তাদের বর্শার ফলায় ফলায়, তাদের তীরের ঝকমকে দ্যুতিতে একই মৃত্যুর শপথ।

একসময় টিজু নদীর দু’পারে মুখোমুখি হয়েছিল জোহেরি আর পোকরি বংশের অগুনতি বর্শা। কোনো কথা নয়। তীর আর ধনুকের মুখে মুখে মর্যাদার লড়াই শুরু হয়ে যাবে।

নাগা যুদ্ধের নিয়ম অনুযায়ী দুই দল দু’পাশের কিছুটা জঙ্গল পরিষ্কার করল। তারপর দু’দিকেই দুটো মশাল জ্বালিয়ে পুঁতল। তারও পর যুদ্ধ আরম্ভের প্রাথমিক রীতি মেনে দুদলই পরস্পরের দিকে ডিম ছুড়ল। এই ডিম ছোঁড়া ভয়ানক অসম্মানের চিহ্ন। টিজু নদীর দু’পারে দুই প্রতিপক্ষ। কারো মাথায় মোষের শিঙের বাহারি মুকুট। হাতের মুঠোয় ভয়াল কুড়ালের মতো দা, কাঁধে বেতের খাঁচায় রাশি রাশি তীর। বুকের সামনে খাসেম গাছের ছাল দিয়ে বানোনো ঢাল। মাথায় মোষের ছালের পেরঙ (শিরস্ত্রাণ), তাতে পিতলের কারুকাজ। তলপেটে গুঙ খেকঙ (লোহার আবরণ) আর বাহুসন্ধি পর্যন্ত বাঘছালের আমেজঙ খেকঙ (ঢাকনা)।

উপত্যকার চড়াই-উতরাই কাঁপিয়ে কাঁপয়ে, দুই দলই হিংস্র চিৎকার করে উঠেছিল।

আ–ও–ও–আ—আ–

হো–ও–ও—ও–আ–আ—আ–

একসময় পাহাড়ের চূড়া থেকে বেলাশেষের রং মুছে গেল। আবছা রহস্য ছড়িয়ে ছড়িয়ে নেমে এসেছিল ক্ষয়িত চাঁদের রাত্রি। আকাশে মিটিমিটি তারা ফুটেছে। অস্ফুট চাঁদের আভাস দেখা দিয়েছে। নদীর দু’পারে শোরগোল উদ্দাম হয়ে উঠেছে। পাহাড়, বনভূমি, সমস্ত কিছু যেন খণ্ড খণ্ড হয়ে যাবে সে চিৎকারে। টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়বে মহাশূন্যে। এই অরণ্য, এই দিনরাত্রির অস্তিত্বে ঘেরা পাহাড়ী পৃথিবী প্রচণ্ড কোলাহলে যেন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

আ-ও–ও–ও-আ-আ-মরদের বাচ্চা হলে এদিকে আয় দেখি।

হো–ও–ও-আ-আ-আ– জানের মায়া থাকলে ঘরের ছা ঘরে যা।

দু’পারে একসময় মশাল জ্বলে উঠেছিল। টিজু নদীর খরধারায় কয়েকটি অগ্নিবিন্দুর প্রতিচ্ছায়া পড়েছিল। কিন্তু দুই গ্রামের একটি মানুষও নদী পার হয়নি। পার হওয়ার নিশ্চিত পরিণতি ঘাড়ের ওপর দুহাত লম্বা একটা কুড়ালের কোপ এসে পড়া। কিংবা জীমবো পাতার মতো বাঁকা বর্শায় হৃৎপিণ্ডটা এ-ফোঁড় ওফোড় হয়ে যাওয়া।

একসময় খাসেম কাঠের ঢালটা তুলে গর্জন করে উঠেছিল খাপেগা, ছাগীর মতো এপারে বসে থাকলে নিতিৎসুকে পাবে নাকি, কি রে জেভেথাঙ? ওপারের কুত্তাগুলো এগিয়ে আসবে না আগে। আমাদেরই হুই পেত্নীটাকে ছিনিয়ে আনতে হবে। জোহেরি বংশের মান খোয়াসনি জেভেথাঙ। সর্দার বলে দিয়েছে, অন্তত তিনটে মাথা চাই পোকরি বংশের।

টিজু নদীর অবিরত গজরানির ওপর গলা তুলে চিৎকার করে উঠেছিল জেভেথাঙ। খাপেগার কথাগুলো থেকে আদিম প্রেরণা পেয়েছে সে, আ-ও–ও–

টিজুনদীর যৌবন বর্ষার সঙ্গে সঙ্গে মুছে গিয়েছে। গ্রীষ্মের টিজুতে রাশি রাশি হাড়ের মতো নানা রঙের পাথর ছুঁড়ে বেরিয়েছিল। চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে একটা পাথরের ওপর লাফিয়ে পড়েছিল জেভেথাঙ। উত্তেজনায় ঢালটা তুলে নিতে ভুলে গিয়েছিল সে। শুধু ডান হাতের মুঠোতে একটা অতিকায় বর্শা মাত্র ধরা ছিল। মশালের পিঙ্গল আলোতে ভয়ঙ্কর হিংস্র হয়ে উঠেছে জেভেথাঙের দৃষ্টি। তামাটে মুখখানা অস্বাভাবিক রক্তাভ দেখাচ্ছিল। আ-ও–ও–ও—আ-আ–

কিন্তু টিজু নদী আর পার হতে হল না জেভেথাকে। আচমকা একটা প্রকাণ্ড বর্শার ফলা উড়ে এসে কণ্ঠায় ফুঁড়ে গিয়েছিল। মশালের পিঙ্গল আলোতে শুধু পাহাড়ী রক্তের একটা তীব্র ফিনকি তীরের মতো বেরিয়ে টিজু নদীর নীল ধারার সঙ্গে মিশে গিয়েছিল।

আ-ও–ও–ও-উ-উ–আর্তনাদ করে আছড়ে পড়েছিল জেভেথাঙ। টিজু নদীর ওপারে নিতিৎসু নামে এক আদিম কামনা তার অধরাই রইল। বর্শার ফলা তার উন্মত্ত আকাঙ্ক্ষা থেকে চিরকালের জন্য একটি বন্য স্বপ্নকে মুছে নিয়ে গিয়েছে।

জেভেথাঙের দেহটা স্রোতে ভাসতে ভাসতে ওপারে গিয়ে ভিড়েছিল। চকিতে একটা কুড়ালের কোপ দিয়ে ওদিকের কে একজন মুণ্ডটা ছিন্ন করে তুলে নিয়েছিল।

তারপর টিজু নদীর ওপারটা আদিম উল্লাসে এবং চিৎকারে প্রমত্ত হয়ে উঠেছিল। জোহেরি বংশের অন্যায় কামনার উপযুক্ত জবাব তারা দিয়েছে।

প্রথমটা ঘটনার আকস্মিকতায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল খাপেগারা। তারপরেই পঞ্চশটা জোয়ান ভৈরব গর্জনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল টিজু নদীর ওপারে। আ-ও–ও–আ-আ-আ–

সেই ক্ষয়িত চাঁদের রাতে গলাটা মন্থর হয়ে গিয়েছিল বুড়ো খাপেগার, তারপর টিজু নদীর নীল জল লাল হয়ে গেল। অনেক রাত্তিরে ওপারের দশটা মাথা নিয়ে মোরাঙে ফিরে এলাম। আমার উরুটা বর্শার ঘায়ে দুফালা হয়ে গিয়েছিল। যাক সে কথা, কিন্তু বড় আপোশ রয়ে গেল। দশটা মাথা আনলাম বটে, কিন্তু পোকরি বংশের একটা মাথাও আনতে পারিনি। আর জোহেরি বংশের আসল মাথাটাই ওরা নিয়ে গিয়েছিল। যে মাথাগুলো এনেছিলাম, সবই ওপারের অন্য বংশের।

মন্থর হতে হতে একসময় থেমে গিয়েছিল খাপেগার কণ্ঠ। তারপর সেঙাই-এর দিকে তাকিয়ে সে বলেছিল, আমাদের দিন তো শেষ। শরীরে সে তাগদ আর নেই। তোর ঠাকুরদা জেভেথাকে ওরা মেরেছে সেঙাই। দশটা অন্য বংশের মাথায় তার দাম ওঠে না। তোর বাপ তো আবার সাহেব সাধুদের ল্যাজ ধরা। তুই এর শোধ তুলিস। হুই পোকরি বংশের তিনটে মাথা আনতেই হবে। সেদিন ওদেরই জিত হয়েছিল। দশটা মাথা আনলেও আমরা হেরে গিয়েছিলাম। সে হারের বদলা এখনও আমাদের নেওয়া হয়নি।

এই হল সেই রক্তাক্ত অতীতের কাহিনী। এই ভয়ঙ্কর অতীত সেদিন টিজু নদীর দু’পারে জোহেরি আর পোকরি বংশকে চিরকালের জন্য বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। বিশাল এক পাহাড়ী ময়ালের মতো টিজু নদীর আঁকাবাঁকা স্রোত। এই স্রোতের ওপর আর কোনোদিনই অন্তরঙ্গতার সেতুবন্ধ হয়নি। সেই সেতুর ওপর দিয়ে দুই বংশের হৃদয়ের দিকে একটি পদক্ষেপও আর হয়নি। শুধু টিজু নদীর দু’পার থেকে একদিন কুরগুলাঙ গ্রাম মুছে গেল। তার প্রেতাত্মার ওপর জন্ম নিল আজকের এই সালুয়ালাঙ আর কেলুরি। নিতিৎসু আর জেভেথাকে নিয়ে টিজুনদীর দু’পারে যে আগুন জ্বলে উঠেছিল, কালের অনিবার্য নিয়মে তার ওপর খানিকটা বিস্মৃতির ভস্ম জমেছে। কিন্তু সে আগুন এখনও নেভেনি। শুধু মাত্র একটি ফুস্কারের প্রয়োজন, যে ফুকারে ধিকিধিকি আগুন দাবানল হয়ে জ্বলে উঠবে।

*

খেজাঙের ঝোঁপ থেকে খানিকটা দূরে সালুয়ালাঙের মানুষগুলো এখনও চিৎকার করছে। কপিশ চোখে তাদের শিকারের সন্ধান। |||

||||||| খেজাঙ ঝোঁপের মধ্যে একটা ক্ষিপ্ত বাঘের মতো এবার শরীরটা ফুলে ফুলে উঠছে সেঙাই এর। ঘন ঘন নিশ্বাস পড়ছে। বুকের কঠিন পেশীগুলো উঠছে, নামছে। তার চেতনার মধ্যে কয়েকদিন আগে শোনা খাপেগার কাহিনীটা বিষের জ্বালা ছড়িয়ে দিচ্ছে। খেজাঙের কাটায় ফালা ফালা হয়ে যাচ্ছে দেহ, সেদিকে এতটুকু ভ্রূক্ষেপ নেই। পায়ের পাতার ওপর দিয়ে পিছলে পিছলে যাচ্ছে সরীসৃপ, সেদিকে একবিন্দু মনোযোগ নেই। শুধু বর্শার বাজুর ওপর হাতের মুঠিটা শক্ত হয়ে বসেছে। আর বর্শার ফলায় যেন প্রতিশোধের দুর্বার স্পৃহা ঝকমক করে উঠছে। দেহমন উত্তেজনায় তরঙ্গিত হচ্ছে সেঙাই-এর। একটু আগে অপরিসীম ভয়ে কুঁকড়ে গিয়েছিল সে। এখন সে ভয় মুছে গিয়েছে। খাপেগার সেই কাহিনী স্মৃতির মধ্য থেকে এক আদিম প্রেরণায় তাকে ভয়ঙ্কর করে তুলেছে। হ্যাঁ, ঠাকুরদার হত্যার প্রতিশোধ সে নেবে। তাকে নিতেই হবে।

আর সেঙাই-এর ঠিক পেছনেই উবু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রেঙকিলান। অস্বাভাবিক আতঙ্কে তার হৃৎপিণ্ডটা যেন ঝিমিয়ে আসছে। শরীরের রক্ত চলাচল থেমে যাচ্ছে। চোখের মণিদুটো এক অব্যক্ত যন্ত্রণায় ছিটকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। মৃত্যু আজ অনিবার্য। অপঘাত আজ নিশ্চিত। সালুয়ালাঙের মানুষগুলো বর্শার মুখে নির্ঘাত তার মুণ্ডুটা গেঁথে নিয়ে যাবে।

রেঙকিলান মিথ্যা কথা বলেছে সেঙাইকে। কাল রাত্রে সে মোরাঙে শুতে যায়নি। বউয়ের সঙ্গে এক শয্যায় শীতের রাত কাটিয়ে সেই কলুষিত দেহমন আর সেই অপবিত্র জঙগুপি কাপড় নিয়েই সে চলে এসেছে শিকারে। শিকারে আসার আগে শুদ্ধাচারের রীতি সে রক্ষা করেনি। সেই পাপে দূরন্ত বেগে ধেয়ে আসছে বনদেবীর অভিশাপ। হৃৎপিণ্ডের স্পন্দনের সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে সে শুনতে পাচ্ছে আনিজার অট্টহাসি। মৃত্যু আজ নিশ্চিত। আর ভাবতে পারছে না রেঙকিলান। সমস্ত দেহের পেশীগুলো তার থরথর কাঁপছে। সমস্ত চেতনাটা আলোড়িত করে একটি চিন্তাই তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। সে চিন্তা মৃত্যুর চিন্তা। তার নিবন্ত দৃষ্টির সামনে যেন নাচতে শুরু করেছে সালুয়ালাঙের মৃত্যুমুখ বর্শাগুলি।

এতক্ষণ একদৃষ্টে লক্ষ করছিল সেঙাই। পাহাড়ী ঘাসের ফাঁক দিয়ে বার বার একটা মাথা বেরিয়ে এসেই আবার অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। এবার মানুষটার মুখ দেখতে পেল সেঙাই। এর আগে টিজু নদীর ওপার থেকে আরো বারকয়েক লোকটাকে দেখেছিল সে। ওঙলে বলেছিল, ওই লোকটার নাম খোনকে। হুই পোকরি বংশের ছেলে।

ঘন ঘাসের আড়ালে খোকের মুখটা ডুবে ছিল। খোকে! রক্তকণাগুলো রাশি রাশি সরীসৃপের মতো কিলবিল করে উঠল সেঙাই-এর শিরায় শিরায়। খোনকে! পোকরি বংশের ছেলে। এই খোকের কোনো পূর্বপুরুষ তার ঠাকুরদাকে হত্যা করেছিল। হঠাৎ কর্তব্য স্থির করে ফেলল সেঙাই। বহুকাল আগে এক ক্ষয়িত চাঁদের রাতে টিজু নদীর নীল ধারায় জোহেরি বংশের অপমান মিশে গিয়েছিল। আজ শীতের দুপুরে খেজাঙের কাটাঝোপে এক উত্তরপুরুষের ধমনীতে বহু বছর পর সেই অপমান যেন জ্বালা ধরিয়ে দিল।

পাহাড়ী ঘাসের বন থেকে খোনকের মাথাটা ফের বেরিয়ে এসেছিল। খোনকের মাথা নয়, যেন পোকরি বংশের উদ্ধত মুকুট, আকাশছোঁয়া চুড়া।

আচমকা রেঙকিলানের পাঁজরায় কনুই দিয়ে একটা খোঁচা দিল সেঙাই। তারপর দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, এই রেঙকিলান, হুই খোনকেকে আমি বর্শা দিয়ে ফুড়ব। তারপর পেছনের খাসেম বন ঘুরে তাকে নিয়ে একেবারে নদীর বাঁকে পালাব। তৈরি হয়ে থাক।

বুকের মধ্যে থেকে একদলা আতঙ্ক কথার রূপ নিয়ে উঠে আসতে চাইল রেঙকিলানের। কিন্তু সে কিছু বলার আগেই ঘটে গেল ঘটনাটা। সেঙাই-এর মুঠি থেকে প্রকাণ্ড বর্শাটা উল্কার মতো ছুটে গিয়েছে। নির্ভুল লক্ষ্য। আকাশফাটানো আর্তনাদ করে ঘাসের বনে লুটিয়ে পড়ল খোনকে, আ-উ-উ-উ-উ-উ-উ–

ঘটনার আকস্মিকতায় একেবারে হতবাক হয়ে গিয়েছিল সালুয়ালাঙের মানুষগুলো। এমনকি খেজাঙ ঝোপে রেঙকিলানও সেই-এর পাশে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে।

বিহূল অবস্থাটা কেটে যাবার পর পাহাড়ী অরণ্য কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠল সালুয়ালাঙের মানুষগুলো। শিকারে আসার আগে তাদের একজন যে এমন শিকার হয়ে যাবে, তা কি তারা ভাবতে পেরেছিল! হো-ও-ও-ও–ও–

চারিদিকে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ছে মানুষগুলো। খোনকেকে শিকার করেছে যে শিকারি, তার সন্ধান চাই। তার মুণ্ডুটা ছিঁড়ে নিয়ে মোরাঙে ঝোলাতে না পারলে সালুয়ালাঙের মর্যাদা চুরমার হয়ে যাবে। পোকরি বংশের সম্মান ধ্বংস হবে।

হো-ও-ও-ও–ও–ভয়ঙ্কর গর্জন ছড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ছে পাহাড়ী উপত্যকার দিকে দিকে। মানুষগুলো হিংস্র চোখে তাকাচ্ছে এদিক সেদিক।

আর খেজাঙ ঝোপে আরেলা পাতার মতো সাদা হয়ে গিয়েছে রেঙকিলানের মুখখানা। প্রবল অপরাধবোধে সমস্ত মন তার অসাড় হয়ে গিয়েছে। শিকারে এসেছে সে অশুচি দেহমন নিয়ে। আর উপায় নেই, আর রেহাই নেই। মৃত্যুর পাত্র ষোলকলায় পূর্ণ হয়েছে তার। ভাবতে ভাবতে একেবারেই নিথর হয়ে গিয়েছে রেঙকিলান।

আচমকা সেঙাই-এর থাবা এসে পড়ল কবজির ওপর। তারপর সেই থাবাটা একটা হালকা পাখির মতো রেঙকিলানের দেহটাকে উড়িয়ে নিয়ে চলল যেন। অস্ফুট চেতনার মধ্যে রেঙকিলান একটু একটু বুঝতে পারছে, পায়ের তলা দিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে ঝোঁপঝাড় আর বুনো ঘাসের বন। মাথার ওপর থেকে সরে সরে যাচ্ছে খাসেম পাতার ছাদ, ভেরাপাঙের নিবিড় ডালপালা। একসময় টিজু নদীর দূর বাঁকে এসে থামল সেঙাই; বজ্রমুঠি আলগা করে ছেড়ে দিল রেঙকিলানকে। কদর্য গালাগালি দিয়ে উঠল, ইজা হান্টসা সালো। একটা কুত্তী হয়ে গেছিস একেবারে।

পাহাড়ী শীতের দুপুরেও দর দর করে ঘাম নেমে আসছে রেঙকিলানের। আশ্চর্য, সে তো ভীরু নয়। বর্শার ফলা হাতের থাবায় ধরা থাকলে রক্তে রক্তে সে-ও তো আদিম অরণ্যের আহ্বান শোনে, হত্যার প্রেরণা পায়। এর আগে অনেকবার সে এসেছে শিকারে। তবে আজ কেন তার হাত-পা এমন শিথিল হয়ে আসছে? বার বার চেতনার দিগন্ত থেকে উঁকি দিচ্ছে একটা ভয়ানক আনিজার মুখ?

সেই অপরাধ। স্ত্রীর সঙ্গে এক বিছানায় শুয়ে অপবিত্র দেহমন নিয়ে শিকারে আসা। পাপবোধটা যেন শ্বাসনালির ওপর চেপে চেপে বসছে রেঙকিলানের। ভয়াতুর চোখে সে তাকাল সেঙাই-এর দিকে।

সেই আবার হুঙ্কার দিয়ে উঠল, তোকে নিয়ে শিকারে আসাই আমার ভুল হয়েছে। সাধে কি বলি, বিয়ে করে একটা ছাগী হয়ে গেছিস।

একটি শব্দও করল না রেঙকিলান। প্রতিবাদের একটি উত্তরও জুগিয়ে এল না তার ঠোঁটে।

টিজু নদীর এই বাঁক থেকে সালুয়ালাঙের মানুষগুলোর চিৎকার ক্ষীণতম একটা রেশের মতো শোনাচ্ছে। আর ভাবনার কোনো কারণই নেই। নিরাপদ ব্যবধানে সরে আসতে পেরেছে তারা। তবু রেঙকিলানের স্নায়ুগুলো থরথর করে কাঁপছে।

দুপুরের ঝকঝকে রোদ এখন ম্যাড়মেড়ে। পশ্চিম পাহাড়ের চূড়াটার ওপর সূর্য স্থির হয়ে রয়েছে। উতরাই-এর দিকে এখনই ছায়া-ছায়া অন্ধকার। উপত্যকার ঢাল বেয়ে রোদের নিস্তেজ রং পাহাড়ী বনের ঝাপসা সবুজের সঙ্গে মিশতে শুরু করেছে।

ঘন ঘন কয়েকটা নিশ্বাস ফেলল সেঙাই। তারপর কিছুক্ষণ জিরিয়ে রেঙকিলানকে নিয়ে টিজু নদী পার হয়ে ওপারে চলে গেল।

.

২.

রোদের মধুর আমেজটুকু গায়ে এসে লাগছে স্নিগ্ধ মমতার মতো। শীতের শুরুতে বিকেল বেলাতেই বাতাস হিমাক্ত হয়ে উঠেছে।

রেঙকিলান আর সেঙাই শ্রান্ত শরীর টানতে টানতে একটা বড় ভেরাপাঙ গাছের ওপর এসে বসল। অনাবৃত দেহে অনেকগুলো রক্তাক্ত আঁচড়ের দাগ ফুটে বেরিয়েছে।

সেঙাই বলল, ‘বড় খিদে পেয়েছে। ওঙলেদের খবরটা জানিয়ে দিতে হবে।’

কোমরের গোপন গ্রন্থি থেকে বাঁশের চাচারি বার করে সেঙাইর হাতে দিল রেঙকিলান। চাচারিটা দুই ঠোঁটের ওপর আড়াআড়ি রেখে তীক্ষ্ণ শব্দ করে উঠল সেঙাই। একটু পরেই সে শব্দের উত্তর ভেসে এল। ওঙলেরা সাড়া দিয়েছে। উৎকর্ণ হয়ে সেঙাই শব্দটার উৎস লক্ষ করতে লাগল। পাহাড় যেখানে একটা খাড়াই বাঁক নিয়ে উত্তর দিকে নেমে গিয়েছে, ঠিক সেখান থেকেই শব্দটা বাতাসে তরঙ্গিত হতে হতে ভেসে আসছে।

সেঙাই বলল, উত্তরের পাহাড়ে রয়েছে ওঙলেরা। সেখানে চল।

চল। উঠে দাঁড়াল রেঙকিলান।

টিজু নদী পেছনে রেখে ঘন বনের মধ্যে দিয়ে দুলতে দুলতে এগিয়ে চলল দুজনে। এক অপরিমেয় খুশিতে মনটা কানায় কানায় ভরে আছে সেঙাই-এর। ওদিকে অস্বাভাবিক আতঙ্কে নির্বাক হয়ে পথ চলছে রেঙকিলান। সামান্য একটু আওয়াজেই চমকে চমকে উঠছে সে। কখন কিভাবে যে আনিজার আবির্ভাব হবে কে বলতে পারে?

চড়াই-এর দিকে উঠতে উঠতে একটা অতিকায় ন্যাড়া পাথরের পাশে এসে থমকে দাঁড়াল সেঙাই। তার পেছনে রেঙকিলান। পাথরের চাইটার ঠিক পাশ দিয়েই একটা শান্ত, শব্দহীন ঝরনা। দু’পাশ থেকে বিশাল বিশাল গাছের নিবিড় ছায়া ঝুঁকে পড়েছে জলধারাটির বুকে। গাছপালার ফাঁক দিয়ে সোনার তারের মতো দুএকটি রোদের রেখা এসে পড়েছে। যেখানে রোদ পড়েছে, জল সেখানে চিকচিক করছে।

হঠাৎ ঝরনার ঠিক পাশে এক অপরূপ পাহাড়ী যুবতাঁকে দেখল সেঙাই। একটি অপূর্ব নারীতনু। ওপরের দিকটা একেবারে অনাবৃত। সোনালি স্তন। তীক্ষ্ণ বৃন্তটি ঘিরে গাঢ় খয়েরি রঙের বৃত্ত। উজ্জ্বল তামাভ দেহ থেকে আলো ঠিকরে বেরুচ্ছে যেন। খাসেম ফুল আর কড়ির অলঙ্কার দিয়ে কেশসজ্জা করা হয়েছে। নাভিমূলের তলা থেকে জানুর ওপর পর্যন্ত লাল রঙের কুমারী কাপড়। চারিদিকে একবার তাকাল মেয়েটি। তারপর একটানে কাপড় খুলে ফেলল। একেবারে নগ্ন সৌন্দর্য। বন্য পাহাড়ের এক মাদক মাধুর্য। সুডৌল ঊরু, নিটোল নিতম্ব, ছোট ছোট পিঙ্গল চোখ। সোনার বাটির মতো যুগল বুকের মাঝখানে শঙ্খের হার। কিছুক্ষণ নিজের দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল মেয়েটি। তারপর ঝরনার পাশে একটা সাদা পাথরের ওপর বসল।

চারপাশে নিবিড় বন। খাড়াই উপত্যকা থেকে বয়ে এসেছে নিঃশব্দ এক ঝরনা। পাহাড়, অরণ্য, নিঝর-এর পটভূমিতে নগ্ন নারীদেহটি বিস্ময়কর মনে হয়। অরণ্যময় এই পাহাড় যেন রমণীয় হয়ে উঠেছে। সেঙাই-এর বন্য মনও আবিষ্ট হয়ে রইল। বনকন্যার এই অনাবৃত দেহ তার মোহিত চেতনা থেকে সমস্ত পৃথিবীকে যেন মুছে নিয়ে গিয়েছে। একটু আগে খোনকেকে বর্শা দিয়ে কুঁড়ে এসেছে সে। হত্যার আদিম উল্লাসে মনটা তার পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। সেই উল্লাসের ওপর অনাবরণ পাহাড়ী কুমারীর রূপ মদের নেশার মতো মিশে অপূর্ব মৌতাত ছড়িয়ে দিল দেহমনে।

টানডেনলা পাখির মতো জল ছিটিয়ে ছিটিয়ে গায়ে দিচ্ছে মেয়েটি। ছপছপ শব্দে গানের ঝঙ্কার শুনতে পাচ্ছে সেঙাই। তার আঠারো বছরের যৌবন। সমস্ত ইন্দ্রিয় যেন আচ্ছন্ন হয়ে আসতে লাগল সেঙাই-এর। তাদের কেলুরি গ্রামে অজস্র কুমারী মেয়ের নগ্ন শরীর সে দেখেছে। কিন্তু এমন করে তার স্নায়ু কোনোদিনই ব্যগ্র হয়ে ওঠেনি। কোনোদিনই তার কামনা এমন ভয়ঙ্কর হয়নি। এ মেয়েটি তার অজানা। একে সে আগে কখনও দেখেনি। তবু এক বিচিত্র উত্তেজনায় দেহটা ছিটকে যেতে চাইছে মেয়েটির কাছে। শিরায় শিরায় রক্তের মাতামাতি উদ্দাম হয়ে উঠেছে। নাকের মধ্যে নিশ্বাস গরম হয়ে উঠছে। টিজু নদীর মতো বুক তরঙ্গিত হচ্ছে। চোখের পিঙ্গল মণি দুটো অপলক হয়ে রয়েছে মেয়েটির দেহের ওপর।

সেঙাইর পাশ থেকে এবার রেঙকিলানও দেখে ফেলেছে, আরে, এ তো মেহেলী।

দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল সেঙাই। তার গলায় অসহ্য কৌতূহল, মেহেলী? সে কে? আমাদের বস্তির মেয়ে তো নয়।

না। ও সালুয়ালাঙ বস্তিতে থাকে। পোকরি বংশের মেয়ে।

পোকরি বংশের মেয়ে!

হু-হু, যে বংশ তোর ঠাকুরদার মাথা কেটে নিয়ে গিয়েছিল।

পোকরি বংশ! আচমকা প্রচণ্ড রাগে সমস্ত দেহটা কেঁপে উঠল সেঙাই-এর। ভুলে গেল মাত্র কয়েক মুহূর্ত আগে তার কামনার প্রতিটি অগ্নিকণা দিয়ে মেয়েটির দেহ ঝলসে ঝলসে সে আস্বাদ নিতে চেয়েছিল।

প্রতিশোধ। সেঙাইর চোখ জ্বলে উঠল। কোনো ক্ষমা নেই, কোনোরকম করুণা নেই। এ তার কর্তব্য। পূর্বপুরুষের প্রতি উত্তরপুরুষের দায়িত্ব। শ্বাপদের মতো হাতের থাবা হিংস্র হয়ে উঠল সেঙাই-এর। তারপর পাহাড়ের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল সে।

এই, কে তুই? কঠিন হল সেঙাইর গলা।

পাহাড়ী ঝরনার পাশে এক রমণীর বিবস্ত্র সৌন্দর্য চমকে উঠল। মাথার অজস্র চুল থেকে কণায় কণায় জল ঝরছে। ছোট ছোট পিঙ্গল চোখে অসহায় দৃষ্টি।

মেয়েটি আশ্চর্য শান্ত গলায় বলল, আমি মেহেলী, পোকরিদের মেয়ে। নদীর ওপারে সালুয়ালাঙ বস্তিতে আমাদের ঘর। আমি রোজ বিকেলে এই ঝরনায় চান করতে আসি। কিন্তু তুই কে?

আমি কে? সেঙাই-এর হাতটা বর্শাসমেত আকাশের দিকে উঠে গেল। আর বর্শার ফলায় নিশ্চিত মৃত্যুর প্রতিচ্ছায়া পড়ল, বর্শা দিয়ে তার জবাব দেব।

মাথার ওপর উদ্যত বর্শা। পলকে উঠে দাঁড়াল মেয়েটা। তারপর আখুশু ঝোঁপ থেকে একমুঠো পাতা ছিঁড়ে সেঙাই-এর দিকে ডান হাতখানা বাড়িয়ে দিয়ে দোলাল। অবশেষে সাদা পাথরের ওপর সেই পাতাগুলো বিছিয়ে বসে পড়ল।

বর্শাসহ হাতখানা নেমে এল সেঙাই-এর। নাগাদের প্রথা অনুযায়ী মেহেলীতার কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করেছে। পাতা নাড়িয়ে তার ওপর বসার পর হত্যা করা রীতিমতো অপরাধ।

পলকহীন তাকিয়ে আছে মেহেলী। তার দু’টি ছোট ছোট চোখে আতঙ্ক আর অসহায়তা।

সেঙাইও তাকিয়ে ছিল। তার চোখে একটা বিরক্ত ভ্রুকুটি ফুটে রয়েছে। থাবার সীমানায় শিকার। অথচ তাকে বিন্দুমাত্র আঘাত হানা এক নিকৃষ্ট পাপাঁচরণ। কোনমতেই তার অনিষ্ট করা চলবে না। পুরোপুরি বশ্যতা স্বীকার করেছে মেহেলী।

লম্বা লম্বা পা ফেলে সামনের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে থমকে দাঁড়াল সেঙাই। মনের মধ্যে অনেক দিন আগে শোনা খাপেগার কাহিনী স্নায়ুতে তড়িৎপ্রবাহ সৃষ্টি করল হঠাৎ। এমনি নিঃশব্দ আর নির্জন এক ঝরনাধারার পাশে বহুকাল আগে মুখোমুখি হয়েছিল নিতিৎসু আর জেভেথাঙ। পোকরি আর জোহেরি বংশ। আশ্চর্য মিল। আশ্চর্য যোগাযোগ। এত বছর পর দুই বংশের উত্তরকাল আবার সেই ঝরনার পারেই মিলিত হয়েছে। সেঙাই আর মেহেলী। টিজু নদীর এপার আর ওপার। অনেক বছর আগে দুই বংশের যে দুই যৌবন এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের যবনিকা তুলে দিয়েছিল, কালের অমোঘ প্রভাবে তারা পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। নতুন কালে মেহেলী আর সেঙাই, দুই বংশের নতুন যৌবন আবার অন্য এক সংগ্রামের নায়ক-নায়িকা হয়ে এল কিনা, কে বলতে পারে।

চারিদিকে একবার সতর্ক চোখে তাকাল সেঙাই। কিছু বিশ্বাস নেই শত্রুপক্ষের কুমারী যৌবনকে। হয়তো আশেপাশে কোথাও লুকিয়ে রেখেছে লোহার মেরিকেতসু কি একখানা তীক্ষ্ণধার থেনি মী (স্ত্রীলোর বর্শা)। একটু অসাবধান হলেই সাঁ করে ছুঁড়ে মারবে। নাঃ, তেমন সন্দেহজনক কিছুই আবিষ্কার করতে পারল না সেঙাই।

রেঙকিলান আসেনি। অতিকায় ন্যাড়া পাথরটার ওপাশ থেকে সে সেঙাই আর মেহেলীর ভাবগতিক লক্ষ করছিল কি করছিল না। এক ভয়াল ভাবনা তাকে আতঙ্কগ্রস্ত করে রেখেছে। আনিজার কবল থেকে অশুচি দেহমন আর ভাবনাটাকে কিছুতেই মুক্ত করতে পারছে না রেঙকিলান। নিজের দেহটাকে অস্বাভাবিক ভারী মনে হচ্ছে তার। বিশাল পাথরটার ওপর শরীর হেলিয়ে দিয়ে নির্জীবের মতো দাঁড়িয়ে আছে সে।

আরো একটু এগিয়ে এসেছে সেঙাই। এবার তার প্রাকুটিটা সরে গেল। তার বদলে এক বিস্মিত কৌতূহল ফুটে বেরিয়েছে, হু-হু, তোর আচ্ছা সাহস তো! হুই বস্তি থেকে রোজ এ বস্তির ঝরনায় আসিস চান করতে! ভয়-ডর নেই একটুও?

চারদিক দেখে আসি। এই ঝরনায় চান করতে আমার বড় ভালো লাগে।

কিন্তু কেউ যদি দেখে ফেলে?

না, কেউ দেখবে না। নিশ্চিন্ত আনন্দে ঝরনার হিমাক্ত জল গায়ে ছিটিয়ে ছিটিয়ে দিতে লাগল মেহেলী।

এই যে আমি দেখে ফেললুম।

তুই তো আমাকে মারলি না। আর কেউ এলে পাতা নেড়ে নেড়ে তার ওপর বসে পড়ব। আমার বাপ বলে দিয়েছে। তা হলে আর কেউ মারবে না। শান্ত মুখে এতটুকু ভাবনার লেশ নেই এখন মেহেলীর। দুই চোখে আর ঠোঁটে মধুর রহস্যের মতো হাসি লেগে রয়েছে শুধু।

জানিস, আমাদের আর তোদের বস্তিতে ভীষণ ঝগড়া!

জানি তো। অপরূপ সরল চোখে তাকাল মেহেলী।

তবু তোর ভয় নেই?

ভয়ের কী আছে? আমি পাহাড়ী মেয়ে না? ঝঙ্কার তুলে হেসে উঠল মেহেলী।

আশ্চর্য মেয়ে! এই নগ্ন সৌন্দর্যের মধ্যে শুধু রূপই নয়, শুধু একটা আদিম আকর্ষণই নয়, আরো কিছুর সন্ধান পেল সেঙাই। একটা বিচিত্র ভাবনার দোলা লাগল অস্ফুট পাহাড়ী যৌবনের চেতনায়। সে ভাবনার স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারবে না সেঙাই। তবু দেহ নয়, শুধু রূপগত নয়, যেন আরো অভিনব কিছু আছে মেহেলীর মধ্যে। ভয়ের লেশ নেই, ভাবনার এতটুকু লক্ষণ নেই, পরম নিশ্চিন্তে সে পার হয়ে এসেছে টিজু নদীর ভয়ঙ্কর সীমানা। এমন মেয়ে নিঃসন্দেহে বিচিত্র, অদ্ভুত। সেঙাইর বন্য পাহাড়ী মন তার অধস্ফুট বুদ্ধি দিয়ে এই মেয়েটিকে ঠিক বুঝতে পারছে না। তবু নেশার মতো এক আলোড়ন জেগেছে শিরায় শিরায়, স্নায়ুতে স্নায়ুতে।

একসময় সেঙাই বলল, তুই চান কর। আমাদের খিদে পেয়েছে। যাচ্ছি।

সত্যি, পেটের মধ্যে খিদের ময়াল ফুঁসছে। ক্লান্ত দু’টি পা রেঙকিলানের দিকে বাড়িয়ে দিল সেঙাই।

.

০৩.

উত্তরের পাহাড়টা যেখানে একটা খাড়াই বাঁক ঘুরে নিচের মালভূমিতে নেমে গিয়েছে ঠিক সেখানে একটা বড় আরেলা ঝোঁপের পাশে বসে আছে ওঙলে আর পিঙলেই। পড়ন্ত বেলার নিবু নিবু আলোর রংটুকু আসন্ন সন্ধ্যা যেন শুষে নিচ্ছে। অন্ধকার নামতে দেরি নেই। পশ্চিম পাহাড়চূড়ার আড়ালে হারিয়ে গিয়েছে দিনান্তের সূর্য। শুধু দূরের আকাশ-ছোঁয়া চূড়াটা ঘিরে এখনও লালচে একটু আভা ছড়িয়ে রয়েছে।

গোটা পাঁচেক ঝরনা, দুটো জলপ্রপাত আর বনময় বিরাট মালভূমিটা ডিঙিয়ে উত্তরের পাহাড়ে চলে এল সেঙাই আর রেঙকিলান।

ওঙলে বড় বড় টঘুটুঘোটাঙ পাতার ওপর কাঁচা চাল, ঝলসানো বাসি মাংস, কাঁচা লঙ্কা আর আদা সাজিয়ে অপেক্ষা করছিল। বাঁশের চোঙায় ভর্তি রয়েছে উত্তেজক পানীয়। হলদে রঙের রোহি মধু।

একটি কথা বলল না সেঙাই। খাবারগুলোর দিকে তাকিয়ে আধফোঁটা উল্লাসের শব্দ করে উঠল মাত্র। তারপর টঘুটুঘোটাঙ পাতার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

থাবায় থাবায় কঁচা চাল মুখে তুলছে সেঙাই। সেই সঙ্গে আদা, কাঁচা লঙ্কা আর খণ্ড খণ্ড মাংস। একসময় খাবার শেষ হয়ে গেল। তারপর বাঁশের বিশাল পানপাত্রটা ঠোঁটের ওপর তুলে নিল সে। একটি মাত্র চুমুক। রোহি মধুর শেষ বিন্দুটি পর্যন্ত শুষে নিয়েছে সে।

খাওয়ার পর্ব শেষ হল। পরিতৃপ্তির একটা ঢেকুর তুলল সেঙাই।

আচমকা ওঙলেদের দৃষ্টি এসে পড়ল রেঙকিলানের দিকে। মোটা মোটা আঙুল দিয়ে টঘুটুঘোটাঙ পাতার খাবারগুলো সে নাড়াচাড়া করছে। মাংস আর রোহি মধুর পাত্র তেমনি পড়ে রয়েছে। কিছুই খায়নি সে। চোখ দুটো অস্বাভাবিক লাল হয়ে উঠেছে রেঙকিলানের। হাত-পা থরথর করে কাঁপছে।

সন্ত্রস্ত গলায় ওঙলো বলল, কি রে রেঙকিলান, কী হয়েছে তোর? খাচ্ছিস না যে, শরীর খারাপ নাকি?

সেঙাইর গলা থেকে বিরক্তি ঝরল, কি জানি কী হয়েছে। বিয়ে করে একটা ছাগী হয়ে গিয়েছে ওটা। ওকে নিয়ে শিকারে গিয়ে ভুলই করে ফেলেছি।

নিরুত্তর রইল রেঙকিলান। শুধু অদ্ভুত ঘোলাটে দৃষ্টিতে সকলের দিকে তাকাতে লাগল। কিছুই যেন শুনতে পাচ্ছে না, কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। কতকগুলো অস্পষ্ট কথা, কতকগুলো আবছা মুখ তার ইন্দ্রিয়ের ওপর দিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। মনের ওপর ক্ষীণ রেখাপাতও হচ্ছে না।

হা হা করে হাসির লহর তুলল সেঙাই, একেবারে বোবা মেরে গেছে রে ছাগীটা। কেলুরি বস্তির মোরাঙের নাম ডোবাবে। থুঃ—থুঃ—থুঃ–একদলা থুতু রেঙকিলানের গায়ে ছিটিয়ে দিল সে।

বিস্মিত ওঙলে বলল, কী হল রে সেঙাই?

কী হয়নি বল? ছাগীটাকে নিয়ে একটা সম্বরের খোঁজে নদীর ওপারে গিয়েছিলাম।

কোথায়! সালুয়ালাঙ বস্তিতে! চিৎকার করে উঠল ওঙলে। আতঙ্কে চোখে দুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসবে যেন তার।

হু-হু। তাতে কী হয়েছে? তুইও দেখি রেঙকিলানের মতো ভীতু মেরে যাচ্ছিস। সেঙাই ভুরু কুঁচকে ধিক্কারের সুরে বলল।

আরে না না, তেমন বংশের ছেলে আমি না। আমিও খোখিকেসারি বংশের ছেলে। আমার জেঠা হল খাপেগা। মুখ সামাল দিয়ে কথা বলবি সেঙাই। গর্জে উঠল ওঙলে। ভীরু! এই অন্যায় অপবাদ তার বন্য পৌরুষকে রীতিমতো আহত করেছে।

ওঙলের দিকে একবার তির্যক চোখে তাকাল সেঙাই। একটা খ্যাপা চিতাবাঘের মতো দুর্বার আর ভয়ঙ্কর ওঙলে। ওকে ঘাঁটানো সুবিধের হবে না। সাঁ করে একটা বর্শা নির্বিকার ছুঁড়ে বসতে পারে সে।

দাঁতে দাঁত ঘষে শব্দ করে উঠল সেঙাই। তারপর চাপা গলায় বলল, আচ্ছা, কেমন মরদ, কাজের সময় দেখা যাবে।

দেখিস।

যেতে দে ও কথা। সেঙাই নিজে থেকেই ব্যাপারটা মিটিয়ে নিল, তারপর যা বলছিলাম। সম্বরটার তল্লাশে তো গেলাম সালুয়ালাঙে। আমি বর্শা দিয়ে ছুঁড়বার আগেই একটা চিতাবাঘ এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল ওটার ঘাড়ে।

তাই বলি, দুপুরবেলা বাঁশের চাচারিতে শব্দ করলাম কত বার। তোদের কোনো সাড়াই নেই। ভাবলাম, ব্যাপার কী? আরেলা ঝোঁপটার পাশ থেকে বলে উঠল পিঙলেই, আবার দুপুর পেরিয়ে যখন বিকেল হল তখন চাচারি বাজালাম। তখনও তোদের সাড়া নেই। আমরা

তো ঘাবড়েই গিয়েছিলাম। ওঙলে আর আমি ঠিক করলাম, তোদের তল্লাশে বেরুব। তারপর ঠিক পড়ন্ত বেলায় বস্তির ছেলেরা যখন গোরু-ছাগল-মোষ নিয়ে ঘরে ফিরছে ঠিক তখন তোদের চারির শব্দ পেলাম।

আরে যেতে দে, যেতে দে ও-সব কথা। একটা কাণ্ড হয়েছে। তা-ই শোন। আমার যা আনন্দ হচ্ছে তা কি আর বলব! দুটো পা ছড়িয়ে বেশ তরিবত করে বসল সেঙাই।

না-না, এখন না। এখন গল্প বললে দেরি হয়ে যাবে। মোরাঙে গিয়ে তোর গল্প শুনব সকলে মিলে। বড় শীত করছে সেঙাই। তা ছাড়া সন্ধ্যা হয়ে আসছে। চড়াই-উৎরাই ডিঙিয়ে, বনবাদাড় ঠেঙিয়ে যেতে যেতে রাত্তিরে খাবার সময় পার হয়ে যাবে। বড় শীত সেঙাই। হি হি করে কাঁপা গলায় বলল ওঙলে।

শীতের সন্ধ্যা। বাতাসে যেন গুঁড়ো গুঁড়ো হিম উড়ছে। মহাশূন্যের অন্ধকার ঘন হয়ে নামতে। শুরু করেছে নাগা পাহাড়ের ওপর।

সেঙাই বলল, তাই ভালো। বড্ড শীত করছে। মোরাঙে ফিরে আগুনের ধারে বসে বসে গল্প বলবখন।

শীতের বাতাসে যেন ধারাল দাঁত বেরিয়েছে। অনাবৃত দেহের ওপর কেটে কেটে বসছে তার নির্মম কামড়। আকাশে একটা একটা করে বিবর্ণ তারা ফুটতে শুরু করেছে। আর মাঝে মাঝে দমকা বাতাস সাঁ সাঁ করে আছড়ে পড়ছে নিবিড় বনের ওপর।

তিনজনে আরেলা ঝোঁপটার পাশ থেকে উঠে দাঁড়াল। একটা নিষ্প্রাণ শিলামূর্তির মতো এখনও স্থির হয়ে বসে রয়েছে রেঙকিলান।

সেঙাই বলল, কি রে, কী হল তোর? বস্তিতে ফিরবি না?

ভাবলেশহীন চোখে তাকাল রেঙকিলান। খানিকক্ষণ তাকিয়েই রইল। তারপর ফিসফিস গলায় বলল, আমি উঠতে পারছি না সেঙাই। শরীরটা বড় ভারী লাগছে। আমাকে টেনে তোল তোরা।

হো হো করে শীতের সন্ধ্যা কাঁপিয়ে, নাগা পাহাড়ের উপত্যকা দুলিয়ে দুলিয়ে হেসে উঠল ওঙলে, সেঙাই আর পিঙলেই। নাঃ, আনিজাতেই পেয়েছে ছাগীটাকে।

আনিজা! আর্তনাদ করে উঠল রেঙকিলান। অদ্ভুত ভয়ে গলা শুকিয়ে উঠছে। বুকের ভেতরটা যেন জ্বলতে জ্বলতে খাক হয়ে যাচ্ছে তার।

রেঙকিলানের আর্তনাদে স্তব্ধ হয়ে গেল তিনজন। সেঙাই, পিঙলেই আর ওঙলে। নিঃশব্দে তারা তিনখানা হাত বাড়িয়ে দিল। তিনটে হাতের আশ্রয়ে নিজেকে সঁপে দিল রেঙকিলান। তারপর খাড়াই পাহাড়ের ঢাল বেয়ে বেয়ে নিচের দিকে নামতে লাগল।

নিচের মালভূমিতে এখন গাঢ় অন্ধকার। সেখানে জটিল বনের আঁকিবুকি। এই মালভূমি পেরিয়ে দক্ষিণের পাহাড়। সেই পাহাড়ের চড়াইতে সেঙাইদের গ্রাম।

এর মধ্যে কুয়াশা পড়তে শুরু করেছে। অবিরাম, অবিশ্রাম। আর এই কুয়াশার স্তরের নিচে হারিয়ে যাচ্ছে নাগা পাহাড়। ক্কচিৎ দুএকটি মিটমিটে তারা নজরে আসে।

বনের মধ্যে চারিদিকে জোড়া জোড়া নীল আগুন ঘুরপাক খাচ্ছে। বাঘের চোখ, ময়ালের দৃষ্টি। কখনও মুমূর্ষ গলায় আর্তনাদ করে উঠছে কোনো নিরীহ হরিণ। নির্ঘাত তার ঘাড়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে কোনো হিংস্র জানোয়ার। টানডেনলা পাখি এই নিবিড় অন্ধকারে, নাগা পাহাড়ের এই ভয়াল শীতের রাত্রে প্রেতকণ্ঠে ককিয়ে উঠছে।

উপত্যকা মাতিয়ে কলোল্লাসে নামছে জলপ্রপাত। গম গম শব্দ বিভীষিকার মতো ছড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ছে।

নীর অন্ধকার। যেন কঠিন হিমস্তূপের মধ্যে দিয়ে পথ কেটে কেটে এগিয়ে চলছে চারটে পাহাড়ী মানুষ। মাঝে মাঝে বাঘ গর্জাচ্ছে। উল্কার মতো সরে সরে যাচ্ছে বুনো সাপ। অনাবৃত শরীরের ওপর উড়ে উড়ে বসছে বিষাক্ত পতঙ্গ। তাদের তীক্ষ্ণ হুলে জ্বলে যাচ্ছে বুক পিঠ, হাত পা।

একসময় মালভূমিটা পার হয়ে এল চারজন। মাঝখানে রেঙকিলান, সামনে সেঙাই, পেছনে ওঙলে আর পিঙলেই।

চাপা গলায় সেঙাই বলল, আরো আগে বস্তিতে ফেরা উচিত ছিল। বড় দেরি হয়ে গেছে।

হু-হু। ওঙলে মাথা নেড়ে সায় দিল।

আবার কিছুক্ষণ চুপচাপ। শুধু পাহাড়ী ঘাসের ওপর দিয়ে চার জোড়া পায়ের সন্ত্রস্ত শব্দ। শোনা যেতে লাগল।

একসময় রেঙকিলান ফিসফিস গলায় বলল, আমার ভয় করছে সেঙাই, বড় ভয় করছে। আরো জোরে আমাকে চেপে ধর।

আগের মতো সেঙাই এবার আর মশকরা করল না। বিন্দুমাত্র ব্যঙ্গ কি ঠাট্টা নয়। চকিত হয়ে সে বলল, কী ব্যাপার রেঙকিলান?

আমি একটা মিছে কথা বলেছিলাম তোকে। অস্ফুট শোনাল রেঙকিলানের কণ্ঠ। অস্বাভাবিক আতঙ্কে গলাটা যেন বুজে আসছে তার।

কী বলেছিলি?

প্রায় স্বগতোক্তি করল রেঙকিলান, সে কথা আমি বলতে পারব না। বললে তোরা আমাকে মেরে ফেলবি।

রেঙকিলানের শেষ কথাগুলো কেউ শুনতে পেল না। ওঙলে না, সেঙাই না, পিঙলেই না। এমন কি রেঙকিলান নিজেই হয়তো শোনেনি। শুধু তার স্নায়ুর তারে তারে এক তীব্র আতঙ্ক তরঙ্গিত হয়ে যাচ্ছে। আনিজা! আনিজা! দূর পাহাড়চূড়া থেকে বনদেবীর অভিশাপ তাকে লক্ষ করে যেন উদ্যত হয়ে রয়েছে।

আচমকা দক্ষিণ পাহাড়ের খাড়া উতরাই থেকে একটা সুতীক্ষ্ণ শব্দ ভেসে এল। শব্দটা ঘন বনের পাতায় পাতায় স্পন্দিত হচ্ছে। উৎকর্ণ হয়ে চারটে পাহাড়ী মানুষ শুনতে লাগল।

চমকে উঠল রেঙকিলান। নাঃ, এতটুকু ভুল নেই। এখন পুরোপুরি নিঃসংশয় সে। এ শব্দে বাতাসের কারসাজি নেই, এ শব্দ একটি মানবীর কণ্ঠ। সে মানবীর নাম সালুনারু। সালুনারু তার বউ। এই মুহূর্তে ওই শব্দের মধ্যে সালুনারুর গলা চিনতে পেরে চকিত হয়ে উঠল রেঙকিলান।

আবার সেই তীক্ষ্ণ অথচ করুণ আওয়াজ ভেসে এল। পাহাড়ী উপত্যকায় উপত্যকায় সে আওয়াজ একটা আর্ত সুরের মতো ছড়িয়ে পড়ল।

সেঙাই বলল, কে যেন ডাকছে—

হু-হু। ও নির্ঘাত সালুনারু। রেঙকিলান বলল।

সকালে শিকারে বেরুবার পর থেকে খানিক আগে পর্যন্ত একেবারে মিইয়ে ছিল রেঙকিলান। তার ধমনীতে রক্ত আবার স্বাভাবিকভাবে বইতে লাগল। সতেজ হল রেঙকিলান। সেঙাইরা আছে পাশে। কিন্তু তাদের বিশ্বাস নেই। কাল রাতের অনাচারের কথা জানামাত্র। তাকে বর্শা দিয়ে চৌফালা করে ফেলবে ওরা। একমাত্র সালুনারু নিরাপদ, তার আশ্রয়ে এতটুকু ভয় নেই। সেই সালুনারুই তাকে পাহাড়ের চড়াই-উতরাইতে ডেকে ডেকে ফিরছে। দেহমন। থেকে গুড়ো গুঁড়ো বরফের মতো সব ভয়, সব আতঙ্ক ঝরে গেল এই ডাকে। পুনর্জীবনে ফিরে এল রেঙকিলান।

সেঙাই বলল, কিরকম একটা শব্দ, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। তবে ওটা মানুষের গলাই। ও কি সালুনারু?

হু-হু, ও সালুনারু। আমি চললাম। তোরা বস্তিতে যা, আমি বউকে নিয়ে ফিরব। রেঙকিলানের গলাটা খুশি খুশি হয়ে উঠেছে।

ভয় করবে না তো, কি রে ছাগী! সেঙাইর গলায় কৌতুক রয়েছে, খুব সোয়ামী হয়েছিস বটে!

যা যা, বেশি ফ্যাক ফ্যাক করতে হবে না। বলতে বলতে একটু যেন সংশয়ই হল রেঙকিলানের, গলাটা সালুনারুর তো? তারপর তীরের মতো ছুটে দক্ষিণ পাহাড়ের খাড়া উতরাই-এর দিকে মিলিয়ে গেল সে।

পেছনে তিনটি বন্য গলায় উৎকট অট্টহাসি বেজে উঠল। ওঙলে, সেঙাই আর পিঙলেই তিনজনেই সারা দেহ দুলিয়ে দুলিয়ে হাসছে।

.

০৪.

আকাশ থেকে শীতের বিকেল তখনও খানিকটা আলো দিচ্ছিল। এই পাহাড়ে, এই উপত্যকায়, এই মালভূমির ওপর রোদের সোনা ছড়াচ্ছিল। নিঃশব্দ ঝরনার পাশে বসে বসে আজকের এই পাহাড়ী পৃথিবীটাকে বড় মধুর লাগছিল মেহেলীর। এই নিবিড় বন, সাপেথ কুঞ্জের পাশ দিয়ে এই নিরুচ্ছাস জলধারা, বিকেলের মায়াবী রোদ–সব যেন আশ্চর্য রূপময় হয়ে উঠেছে।

খানিক আগে তার দিকে বর্শা উঁচিয়ে ধরেছিল সেঙাই, তাদের শত্রুপক্ষের ছেলে। জোহেরি বংশের উদ্ধত যৌবন। তামাভ দেহ, কানে নীয়েঙ গয়না। পিঙ্গল চোখে ভয়াল সৌন্দর্য। সেঙাইর সম্বন্ধে অনেক গল্প শুনেছে লিজোমুর কাছে, পলিঙার কাছে। তাদের ছোট পাহাড়ী জনপদ সালুয়ালাঙের অনেক যুবতী সেঙাইর রূপে মাতাল। দূর থেকে দেখেই মজে গিয়েছে। তারা। তাদের মুখে সেঙাইর গল্প শুনে শুনে কামনায় আর চেতনায় একটা রমণীয় ছবি এঁকেছে মেহেলী। আজ প্রথম সে দেখল শত্রুপক্ষের যৌবনকে–সেঙাইকে। তার কামনার মানুষটিকে।

চারিদিকে একবার চনমনে চোখে তাকাল মেহেলী। আশ্চর্য, সেঙাই নেই। একটু আগে এই নিঝুম ঝরনা, এই নিবিড় বন, এই খাড়াই উপত্যকার পটভূমি থেকে কী এক ভোজবাজিতে যেন মুছে গিয়েছে সে। যে পথ দিয়ে সেঙাই চলে গিয়েছে, সেদিকে অনেক, অনেকক্ষণ আবিষ্ট নজরে তাকিয়ে রইল মেহেলী। তারপর একটা পাহাড়ী ময়ালের মতো ফোঁস ফোঁস করে কয়েকটা নিশ্বাস ফেলল।

বিকেলের রং ঝাপসা হয়ে আসছে। আর একটু পরেই শীতের সন্ধ্যা নামবে এই পাহাড়ে। এবার উঠতে হবে। টিজু নদীর ওপারে তারই জন্য অপেক্ষা করছে পলিঙা আর লিজোমু।

টানডেনলা পাখির মতো আরো কিছুক্ষণ ছিটিয়ে ছিটিয়ে সারা শরীরে জল মাখল মেহেলী। তারপর পাথরের ওপর থেকে লাল লঙের কুমারী কাপড়টা তুলে কোমর থেকে জানু পর্যন্ত ঝুলিয়ে দিল। তারও পর ঝোঁপের কিনার দিয়ে নাচের ভঙ্গিতে টিজু নদীর দিকে পা চালিয়ে দিল।

নদী পেরিয়ে বাঁ দিকের বিশাল উপত্যকায় পলিঙাদের সঙ্গে মুখোমুখি হল মেহেলী। পলিঙা আর লিজোমু পাহাড়ী অরণ্য থেকে অজস্র টঘুটুঘোটাঙ ফুল তুলে এনেছে। আতামারী লতায় বুনে বুনে সেই ফুল দিয়ে ঘাগরা বানিয়ে পরেছে। কানে, চুলে খুশিমতো সেই বাহারি ফুল গুঁজে খুঁজে নিজেদের রূপবতী করে তুলেছে।

পলিঙা বলল, কি লো মেহেলী, তোর চান হল?

হল তো।

রোজ রোজ হুই কেলুরি বস্তির ঝরনায় চান করতে যাস। কী মজা আছে সেখানে? কাউকে লগোয়া পন্য (প্রেমিক) পেয়েছিস নাকি? তেরছা চোখে তাকাল লিজোমু।

মিটিমিটি হাসল মেহেলী, দুচোখের পিঙ্গল মণিতে খুশির আলো জ্বলছে। প্রথমে কিছু বলল সে। একেবারে নিরুত্তর রইল।

হাসলে চলবে না মেহেলী। ওপারে তুই মনটা হারিয়ে ফেলেছিস, মনে হচ্ছে। কিন্তু । সাবধান, ওরা এ বস্তির শত্রুপক্ষ। দেখামাত্র ছুঁড়ে ফেলবে বর্শা দিয়ে।

ফুঁড়বে কেন? পিরিত করবে। রহস্যময় গলায় খিলখিল করে হেসে উঠল মেহেলী।

সন্দিগ্ধ চোখে তাকাল লিজোমু, পিরিত করবে?

করবে লো, করবে। আমার সঙ্গে একদিন ওপারে গিয়ে দেখিস, তোরও একটা লগোয়া পন্যু (প্রেমিক) জুটিয়ে দেব। পাহাড়ী মেয়ে মেহেলী, তার চোখ দুটো আমারী ফলের দানার মতো চকচক করে উঠল, সত্যি বলছি, কেলুরি বস্তির ছোঁড়ারা বড় ভালো।

কেন, আমার লগোয়া পন্য (প্রেমিক) নেই? খোনকে আছে না? তোর দাদা লো, তোর দাদা। তোর দাদাকে আমি পিরিত করি, জানিস না? ফোঁস করে ওঠে লিজোমু।

খোনকেকে পিরিত করিস, তা তো জানি। পাহাড়ী মাগী তুই; মোটে একটা পুরুষকে নিয়ে খুশি থাকতে পারবি? বাঁকা চোখে তাকাল মেহেলী; তারপর আউ পাখির মতো ঘাড় কাত করে খিকখিক শব্দ হেসে উঠল, অনেক পুরুষকে একসঙ্গে মাতিয়ে দিবি, মজাবি। তারপর এক পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখবি। দুবস্তিতে দাঙ্গা বাধাবি, রক্তে লাল হয়ে যাবে পাহাড়। তা। না হলে কী জোয়ান মাগী হলি!

ধাঁ করে একটা লোহার মেরিকেতসু তুলে ধরল লিজোম, মাথা একেবারে ঘেঁচে দেব মাগী। তেমন লগোয় লেন (প্রেমিকা) আমাকে পাসনি মেহেলী। তোর দাদা ছাড়া আর কারো সঙ্গে আমি পিরিত করেছি? এত ছোঁড়া তো আছে আমাদের সালুয়ালাঙ বস্তিতে!

আরে যেতে দে ওসব কথা। আচ্ছা মেহেলী, নদীর ওপারে রোজ রোজ কী জন্যে যাস বল দিকি, শুনি। সত্যি কথা বলবি। শান্ত মেয়ে পলিঙা জানতে চাইল।

হু-হু–একবার ধারাল চোখে লিজোমুর দিকে তাকিয়ে নিল মেহেলী। তারপর বলল, তোরা যার গল্প করিস, আজ তার দেখা পেয়েছি। সেঙাইকে দেখলুম হুই ঝরনাটার পাশে।

বলিস কী! এবার অন্তরঙ্গ হয়ে বসল পলিঙা।

তারপর? লিজোমুও মেরিকেতসুটা এক পাশে রেখে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসল। খানিক আগে যা যা ঘটেছে সব বলল মেহেলী, সত্যি ভাই, দেখেই আমার মন মজে গেছে। ওকে পেতেই হবে। একটা বুদ্ধি দে তোরা।

চকচকে চোখে তাকিয়ে লিজোমু বলল, আচ্ছা, সেঙাই একবার ছুঁয়েও দেখল না তোকে? তোর সোয়াদ একটু চেখেও নিল না?

চেখে দেখলে তো মনের জ্বলুনি কমত। ওকে না পেলে সারা দিনরাত জ্বলে মরব। মনে হচ্ছে, সেঙাইকে জড়িয়ে ধরি, আঁচড়াই, কামড়াই। তোরা বল তো কী করি? ব্যাকুল দু’টি চোখ তুলে তাকাল মেহেলী, আমার সঙ্গে যাবি কাল ঝরনাটার পাশে? কি লো লিজোমু, কি লো পলিঙা-যাবি?

না, যাব না। আমাদের অত সাহস নেই। আচমকা বর্শা ছুড়লে নির্ঘাত মরে যাব। জোয়ান বয়েস, এখন তোর জন্যে মরবার ইচ্ছা নেই। ঘর বাঁধব, পুরুষ চাখব, ছেলেপুলে হবে। এই বয়েসে মরতে সাধ হয় না। নিস্তেজ গলায় বলে উঠল লিজোমু, তবে সেঙাই বড় খাসা পুরুষ–

কী করি বল তো? এখন আমি কী করি? মনের প্রবল অস্থিরতা থেকে মেহেলীর কথাগুলো যেন বেরিয়ে আসতে লাগল।

সহসা পলিঙা বলল, উত্তর পাহাড়ে এক বুড়িডাইনি আছে। সে অনেক ওষুধ জানে, পুরুষ বশ করার অনেক মন্তর তার জানা। তার কাছে চল। সে ঠিক বলে দেবে কী করতে হবে।

তীরের মত উঠে দাঁড়াল মেহেলী, চল, এখুনি যাব।

লিজোমু আর পলিঙাও উঠে পড়ল। লিজোমু বলল, তোরা যা, আমি এখন যেতে পারব না। সারাদিন খোনকের দেখা পাইনি। তার খোঁজে যাব। সেঙাইকে তুই পেলি মেহেলী, বড় তাগড়া জোয়ান সে–

বস্তিতে যা তুই। আমরা উত্তর পাহাড়ে ডাইনি বুড়ির সঙ্গে দেখা করে ফিরব।

সালয়ালা গ্রামের দিকে চলে গেল লিজোমু। আর উত্তর পাহাড়ের নিবিড় বনে-ঘেরা চড়াইর দিকে পা বাড়িয়ে দিল মেহেলী আর পলিঙা। দু’টি পাহাড়ী যুবতী। দু’টি বন্য আপোজি (বান্ধবী)।

.

বাদামি পাথরের মধ্যে ছোট্ট একটি সুড়ঙ্গ। চারপাশে উদ্দাম বন। সুড়ঙ্গের মুখ থেকে স্বচ্ছন্দে প্রবেশের জন্য বন কাটা হয়েছে অনেকটা। জনপদ থেকে অনেক, অনেক দূরে এই সুড়ঙ্গ হল ডাইনি নাকপোলিবার আস্তানা।

সুড়ঙ্গের মুখে এসে থমকে দাঁড়াল পলিঙা আর মেহেলী। বুকের মধ্যে হৃৎপিণ্ড যেন থর থর করে কেঁপে উঠল। তীব্র আতঙ্কে চেতনাটা ছমছম করছে। আকাশ থেকে শীতের অসহ্য সন্ধ্যা নামছে। চুপচাপ দাঁড়িয়েই রইল দুজনে।

সুড়ঙ্গের মুখে কপিশ রঙের আলো এসে পড়েছে ভেতর থেকে। সমস্ত পরিবেশটা আশ্চর্য ভৌতিক। চারপাশে ছায়া কাঁপছে। খাসেম বন আর বুনো কলার পাতা দুলছে। ভীষণ ভয়। করতে লাগল পলিঙা আর মেহেলীর। তারা হয়তো পালিয়েই আসত।

আচমকা সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে একটি কর্কশ কণ্ঠ বেরিয়ে এল, কে? কে ওখানে?

আমরা পিসি। মেহেলী আর পলিঙা এসেছি। কাঁপা, ভীরু গলায় বলল পালিঙা, তোর সঙ্গে দরকার আছে।

ভেতরে আয় শয়তানের বাচ্চারা। সুড়ঙ্গের মধ্যে গলাটা এবার নরম শোনাল।

হামাগুড়ি দিয়ে সুড়ঙ্গপথ ধরে ভেতরে চলে এল মেহেলী আর পলিঙা।

ভেতরটা প্রশস্ত গুহার মতো। তিন দিকে পাথরের দেওয়াল। অমসৃণ মেঝে। আর সামনের দিকে সুড়ঙ্গপথ। মেঝের এদিকে সেদিকে ইতস্তত ছড়ানো গুনু পাতা, মানুষ আর মোষের হাড়। যুচোঙ গুটসুঙ পাখির বাদামি রঙের কঙ্কাল। বাঁশের পাত্র, কাঠের মাচান। পাথরের খাঁজে খাঁজে আগুন জ্বালিয়ে এই ভয়ঙ্কর পাহাড়ী গুহায় খানিকটা উত্তাপ সৃষ্টি করেছে ডাইনি নাকপোলিবা।

এক পাশে একটা পাথরের ওপর বসে ছিল নাকপোলিবা। কাছাকাছি একটা পেন্যু কাঠের মশাল জ্বলছে। স্তিমিত, অথচ স্নিগ্ধ আলোতে রহস্যময় হয়ে উঠেছে গুহাটা। সেই আলো ছড়িয়ে পড়েছে নাকপোলিবার নগ্ন দেহে, ছড়িয়ে পড়েছে কুঞ্চিত মুখের ভাঁজে ভাঁজে, একমাথা রুক্ষ চুলে। সাপের জিভের মতো লিকলিক করছে জটিল চুলগুলো।

নাকপোলিবার বয়স যে কত, তার হিসেব আশেপাশের তিনটে পাহাড়ের এতগুলি গ্রামের প্রাচীনতম মানুষটাও জানে না। সকলেই তাদের ঠাকুরদা কি ঠাকুমার কাছে তার গল্প শুনেছে।

গালের মাংস ঝুলে পড়েছে নাকপোলিবার, কোমরটা বেঁকে গিয়েছে ধনুকের মতো। কিছুক্ষণ দপদপে চোখে মেহেলী আর পলিঙার দিকে তাকিয়ে রইল সে। তারপর দাঁতহীন কালচে মাড়ি বার করে বলল, নির্ঘাত তোরা পিরিতের ওষুধ নিতে এসেছিস?

হু-হু। মেহেলী আর পলিঙা মাথা ঝাঁকাল।

হিসহিস করে উঠল নাকপোলিবা, পুরুষমানুষ বশ করতে পারিস না তো কী পাহাড়ী মাগী হয়েছিস? মরদ মজাতে ওষুধ লাগে! ইজা রামখো।

একটা নিরাপদ ব্যবধান রেখে বসেছে মেহেলী আর পলিঙা। করুণ মুখে মেহেলী বলল, কী করব? আজ যে প্রথম দেখলাম। হুই কেলুরি বস্তির ছেলে সেঙাই, ওকে আমার চাই। আমাকে ওষুধ দে তুই।

কেলুরি বস্তির ছেলে সেঙাই আর তুই কোন বস্তির?

আমি সালুয়ালাঙের মেহেলী।

তোদের দুবস্তিতে তো খুব ঝগড়া। খিক—খিক—খিক–বিচিত্র গলায় হেসে উঠল ডাইনি নাকপোলিবা। তার হাসি এই পাহাড়ী গুহায় অত্যন্ত ভয়ানক শোনাল।

পিরিত তো করলি শত্রুদের জোয়ানের সঙ্গে। তা রোজ দেখা হবে তো? বাদামি একটি করোটিতে হাত বুলোতে বুলোতে বলল ডাইনি নাকপোলিবা। তার চোখ দুটো ধিকিধিকি জ্বলছে।

মেহেলী তাকাল পলিঙার দিকে। মেহেলীর চোখের ইঙ্গিতটুকু বুঝল পলিঙা। সে বলল, যাতে মেহেলীর সঙ্গে সেঙাইর রোজ দেখা হয় সেই ব্যবস্থাটা করে দে। সেই জন্যেই তো এলাম তোর কাছে।

আমার ওষুধে এমনি কাজ হবে না। আমি যে ওষুধ দেব, সেঙাইর গায়ে তা যদি ছোঁয়াতে পারিস, তবেই বশ হবে। তাকে আটক করে আমার কাছে আসবি। বুঝেছিস? রুক্ষ চুলের গোছা দোলাতে দোলাতে সামনের দিকে চলে এল বুড়ি ডাইনি নাকপোলিবা। তারপর হাতখানা মেহেলীর গালের ওপর বিছিয়ে দিল, কি লো পাহাড়ী জোয়ানী, মনটা বড় জ্বালা-পোড়া করছে? আচ্ছা আচ্ছা, আগে তো সেঙাইকে আটক কর, তারপর এমন ওষুধ দেব, তোর গায়ে একেবারে জোঁকের মতো সেঁটে থাকবে সে। আর একটা কথা, ওষুধের দাম আনবি চারটে বর্শা আর দুখুদি (আড়াই সেরের মতো) ধান। খিক–খিক ফের–সেই বিচিত্র হাসিতে এই নিভৃত গুহাটিকে ভয়ঙ্কর করে তুলল ডাইনি নাকপোলিবা।

খানিক পর সালুয়ালা গ্রামে এসে পড়ল মেহেলী আর পলিঙা। দূর থেকেই মোরাঙের চারপাশের উদ্দাম সোরগোল শোনা যাচ্ছে।

আকাশ থেকে শীতরাত্রির ঘন অন্ধকার ছড়িয়ে পড়েছে নিচের অরণ্যে। মেহেলী ভীরু গলায় বলল, কী ব্যাপার লো পলিঙা?

কি জানি, বুঝতে পারছি না।

দ্রুত পা চালিয়ে খোখিকেসারি কেসুঙের কাছাকাছি চলে এল দুজনে। তখন ঘর থেকে একটা মশাল নিয়ে বেরিয়ে আসছে লিজোমু।

মেহেলী বলল, এই লিজোমু, কী হয়েছে লো? এত হল্লা হচ্ছে কেন মোরাঙে?

খোনকেকে বর্শা দিয়ে ফুঁড়েছে। দাদাকে ছুঁড়েছে কে? গলাটা কেঁপে উঠল মেহেলীর।

কে আবার? নির্ঘাত হুই কেলুর বস্তির লোক–যাদের সঙ্গে তোর এত পিরিত। মশালের আলোতে পাহাড়ী মেয়ে লিজোমুর চোখ দুটো জ্বলে উঠল।

শিউরে উঠল মেহেলী, বলিস কী! কে বললে কেলুরি বস্তির লোকেরা দাদাকে ছুঁড়েছে?

তীক্ষ্ণ চোখে মেহেলীর দিকে তাকিয়ে ফুঁসে উঠল লিজোমু, কে আবার বলবে রে শয়তানের বাচ্চা, সদ্দার বলেছে। এ কাজ নির্ঘাত হুই কেলুরি বস্তির রামখোদের। আহে ভু টেলো। দ্যাখ গিয়ে, মোরাঙের ওপাশে বসে আমাদের বস্তির জোয়ানেরা:বর্শা শানাচ্ছে।

কেন?

সদ্দার হুকুম দিয়েছে কেলুরি বস্তির শয়তানগুলোকে বাগে পেলে সাবাড় করতে। হু-হু–

কোনো কথা বলল না মেহেলী। তার পাশে নিরুত্তর দাঁড়িয়ে রইল পলিঙা।

একটু পরেই ডুকরে উঠল লিজোমু, আপোটিয়া! হু-হু, এবার আমার কী হবে? খোনকে যদি হুই বর্শার খোঁচায় সাবাড় হয়ে যায়, তা হলে আমি কোথায় পিরিতের জন্যে মরদ পাব? তুই তো কেলুরি বস্তির সেঙাইকে বাগিয়ে নিলি মেহেলী–

লিজোমুর কান্না একটু একটু করে উত্তাল হয়ে উঠতে লাগল। কান্নার দমকে তার সারা শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে।

লিজোমুর কান্না শুনতে শুনতে একেবারে পাথর হয়ে গেল মেহেলী আর পলিঙা।

০৫. মোরাঙ মানেই গ্রামের প্রতিষ্ঠা

০৫.

এই মোরাঙ। মোরাঙ মানেই গ্রামের প্রতিষ্ঠা, গ্রামের মর্যাদা, গ্রামের কৌলীন্য।

কেলুরি গ্রামে তিনটে মোরাঙ। সেগুলোর মধ্যে এই মোরাঙটাই সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে কুলীন। সামনের দিকে অর্ধবৃত্তের আকারে বাঁশের দরজা। দরজার দুধারে প্রকাণ্ড দুটো মোষের মাথা বর্শার ফলায় গাঁথা রয়েছে। ওপরে সোনালি খড়ের নতুন চাল। চালের দু’পাশে খড়ের গুচ্ছ দুলছে। দেওয়ালে দেওয়ালে অজস্র আঁকিবুকিতে মোষের রক্তের মাঙ্গলিক চিহ্ন। পৃথিবীর আদিমতম শিল্প।

দু’পাশে হাতে তিরিশেক লম্বা পাহাড়ী বাঁশের দেওয়াল। দেওয়ালের গায়ে বর্শায় ফোঁড়া রয়েছে বাঘের মুণ্ডু, সম্বরের লেজ, মানুষের করোটি, হরিণ আর মোষের ছাল।

দরজা দিয়ে ঢুকেই বসার ঘর। তারপরেই চওড়া পথ চলে গিয়েছে শেষ প্রান্ত পর্যন্ত। সে পথের দুধারে সারি সারি বাঁশের মাচান। গ্রামের অবিবাহিত ছেলেদের রাত্রির বিছানা এই মাচানগুলোর ওপর পাতা হয়। মাচানগুলোর নিচে রাশি রাশি বর্শা, তীর-ধনুক, ঢাল, মেরিকেতসু। নানা আকারের, নানা নামের ভয়াল সব অস্ত্রশস্ত্র। শত্রুর বর্শা থেকে গ্রামরক্ষার সুনিপুণ আয়োজন, ত্রুটিহীন বন্দোবস্ত।

মোরাঙের বসার ঘরে একখানা বাদামি পাথরের আসনে বসে রয়েছে বুড়ো খাপেগা। তার পাশে সেঙাই, ওঙলে, পিঙলেই। সামনের দিকে গ্রামের জন-পনেরো মানুষ।

সেঙাইরা শিকারে বেরিয়েছিল সকালবেলা। নিশ্চয়ই তারা বল্লমের মাথায় পাহাড়ী জানোয়ার কুঁড়ে নিয়ে আসবে। সেই আশায় আশায় বিকেল থেকে গ্রামের লোকেরা মোরাঙে জমায়েত হতে শুরু করেছিল। কিন্তু কয়েক খণ্ড মাংসের প্রত্যাশা তাদের নির্মমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

শীতের রাত এই পাহাড়ের ওপর গহন হয়েছে, গম্ভীর হয়েছে। মাংসলোভীরা অনেকেই উঠে চলে গিয়েছে যার যার ঘরের উষ্ণ শয্যায়। কার্পাস তুলোর দড়িপাকানো লেপের তলায় স্ত্রীর বুকের উত্তাপ নিয়ে রাতটাকে মোহময় করে তোলার কামনায় অনেকে ব্যগ্র হয়ে উঠেছিল।

বাকি যারা, তাদের মাংসের চেয়েও বড় নেশা আছে। সে নেশা গল্পের নেশা। সে নেশা খাটসঙ কাঠের অগ্নিকুণ্ড জ্বালিয়ে তার চারপাশে নিবিড় হয়ে বসে আড্ডা জমাবার নেশা। আড্ডা আর গল্পের আমেজে এক অপরূপ মৌতাত খুঁজে পায় পাহাড়ী মানুষেরা। সেই মৌতাত আরেলা ফুরেলা মতো রঙদার হয়ে ওঠে দুএক চুমুক রোহী মধু পেলে।

মা গি কাঠির পাথরে চকমকি ঠুকে আগুন জ্বালিয়েছে বুড়ো খাপেগা। তারপর দুটো পেন্য গাছের ডালে সেই আগুন দিয়ে মশাল তৈরি করেছে। সমস্ত মোরাঙটা আলোয় ভরে গিয়েছে। পেন্যু গাছের শাখায় স্নেহরস আছে। তাই তার আলো উগ্র নয়। সে আলো আশ্চর্য স্নিগ্ধ, আর নরম।

পেন্যু গাছের মশাল দু’টির চারপাশে বৃত্তাকারে বসেছে অনেকগুলো পাহাড়ী মানুষ। সকলের সামনেই বাঁশের চোঙায় রোহি মধু। মাঝে মাঝে তরিবত করে সেই পানপাত্রে চুক চুক করে চুমুক দিচ্ছে কেউ কেউ। মশালের এই মনোরম আলো, মাঝখানে খাটসঙের অগ্নিকুণ্ড থেকে মধুর উত্তাপ আর রোহি মধুর আস্বাদ–সব মিলিয়ে শীতের রাত্রিটা বড় উপভোগ্য হয়ে উঠেছে।

একজন দুজন করে খাওয়ার পালা চুকিয়ে অবিবাহিত ছেলেরা মোরাঙে ফিরে আসতে। শুরু করেছে। বাইরে শীতের রাত্রি নির্মম হয়ে উঠেছে।

বাদামি পাথরের রাজাসন থেকে খাপেগা বলল, আজ রাতে বরফ পড়বে মনে হচ্ছে।

সকলে মাথা নেড়ে সায় দিল, হু-হু, ঠিক।

খাপেগা বলতে লাগল, আজ শিকার করে কিছুই আনলি না যে সেঙাই? মানুষগুলো এতক্ষণ মাংসের আশায় বসে ছিল। এর শোধ কিন্তু ওরা অন্যভাবে তুলবে। বিয়ের পর তোর প্রথম আওশে ভোজে একটার বদলে তিনটে সম্বর বলি দিতে হবে। একটু থামল খাপেগা। তারপর আবার শুরু করল, তোরা আজকালকার ছেলেরা হলি কী? শিকারে বেরিয়ে খালি হাতে ফিরে আসিস! থুঃ-থু-থুঃ।

অপরাধীর মতো মুখ করে সেঙাই বলল, কী করব বল। বর্শা দিয়ে কুঁড়তে পারলাম না একটা জানোয়ারও। চেষ্টা তো কম করিনি। জুতমতো একটা হরিণও যদি বাগে পেতাম! হুই শয়তান রেঙকিলানটার জন্যে যদি শিকার করা যায়! একটা ভীতু কুত্তা কোথাকার!

বুঝেছি, বুঝেছি। থুঃ থুঃ থুঃ–মাঝখানের অগ্নিকুণ্ডটার ওপর কয়েক দলা থুতু ছিটিয়ে দিল বুড়ো খাপেগা, তোদের একালের জোয়ানদের মুরোদ জানতে আর বাকি নেই। শিকারে গিয়ে খালি হাতে ফিরে আসিস। আমাদের কাল হলে মোরাঙে শুধু হাতে ফিরলে সদ্দারই আমাদের বর্শা দিয়ে ফুঁড়ে ফেলত। তাই তো ভাবি, সেসব দিন গেল কোথায়।

স্মৃতির মধ্যে দিয়ে ধূসর অতীতের দিকে একবার তাকাল বুড়ো খাপেগা। সেই অপরূপ দুঃসাহসী জীবনের অধ্যায়। আজও সেই যৌবনের দিনগুলো পরিষ্কার দেখতে পায় খাপেগা। গভীর রাতে অতিকায় বর্শা নিয়ে শত্রুপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া। তারপর ধারাল অস্ত্রের ফলা। দিয়ে মুণ্ডু কেটে মোরাঙে নিয়ে আসা। শত্রুর রক্ত দিয়ে দেওয়ালে চিত্তির করা। নাগা পাহাড়ের সেই আশ্চর্য উত্তেজক দিনগুলি খাপেগার বুকের মধ্যে হাহাশ্বাস করে বেড়ায়। একটা বিরাট দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে।

কিছুক্ষণ চুপচাপ। একসময় খাপেগাই বলতে শুরু করল, মোরাঙের দেওয়ালে কী ঝুলিয়ে রেখেছিস তোরা?

সকলে সমস্বরে বলল, কেন, মোষের মাথা, সম্বরের ছাল, বাঘের মুণ্ডু–

ওয়াক থুঃ-থুঃ-থুঃ–অগ্নিকুণ্ডটার দিকে আবার একদলা থুতু ছুঁড়ে দিল খাপেগা। ঘৃণায় তার জীর্ণ মুখখানা কুঁচকে গিয়েছে। এই মুহূর্তে খাপেগাকে ভারি কদর্য দেখাচ্ছে। অতীতের জন্য ব্যগ্র মমতা আর বর্তমান কালকে অক্ষম ঘৃণা–এই দুইয়ের মাঝে খাপেগা অসহায় নিরালম্বের মতো ঝুলছে। বিস্বাদ গলায় সে বলল, জানিস, আগে আমরা জানোয়ার শিকারে যেতাম না। মানুষ শিকারে যেতাম। তারপর সেই মানুষের মুণ্ডু এই মোরাঙের দেওয়ালে দেওয়ালে বর্শায় গেঁথে রাখতাম। আজ যেখানে তোরা মোষের মুণ্ডু রাখিস, সেখানে আমরা রাখতাম শত্রুর মুণ্ডু।

আজ আমিও মানুষ শিকার করেছি। উত্তেজিত ভঙ্গিতে ঘোষণা করল সেঙাই।

হতেই পারে না। অসম্ভব। হু-হু, তোরা করবি মানুষ শিকার! আরে থুঃ-থু-থুঃ–আবার থুতু ছিটাল খাপেগা, এ আমি বিশ্বাসই করি না।

অতীতের সেই গৌরবময় বীরত্বের সঙ্গে বর্তমান পাল্লা দিচ্ছে। এ অসম্ভব। অসম্ভবই নয় শুধু, একেবারেই অবাস্তব। বুড়ো খাপেগার মুখখানা ভয়ানক হয়ে উঠল। তার নিশ্বাস দ্রুত তালে বইছে। ঘোলাটে চোখের ওপর মশালের আলো প্রতিফলিত হয়ে হিংস্র দেখাচ্ছে। মনে হল, খাপেগা এখন হত্যা পর্যন্ত করতে পারে। বার বার মাথা দুলিয়ে সে বলল, অসম্ভব,

অসম্ভব। এ হতে পারে না।

ইতিমধ্যে রাতের খাওয়া চুকিয়ে সব অবিবাহিত ছেলে মোরাঙে ফিরে এসেছে। তারা এবার আগুনের কুণ্ডটার চারপাশে শোরগোল করে উঠল। এতগুলি জোয়ান গলার সম্মিলিত প্রতিবাদে মোরাঙ উচ্চকিত হয়ে ওঠে, কেন অসম্ভব শুনি।

আচমকা সেই চিৎকারকে থামিয়ে দিয়ে গর্জন করে উঠল সেঙাই, আমার কথাটা আগে শোন সদ্দার। তারপর কথা বলিস।

হু-হু, তোর কথা বল। অনেকগুলো জোয়ান সমস্বরে সায় দিল।

অনিচ্ছার সুরে খাপেগা বলল, বল শুনি।

সেঙাই বলতে শুরু করল, আজ দুপুরে একটা সম্বরের তল্লাশে সালুয়ালাঙ বস্তিতে চলে গিয়েছিলাম। সেখানে বর্শা নিয়ে পোকরি বংশের খোনকেকে ফুঁড়ে এসেছি…।

শিকারে যাওয়ার পর সমস্ত ঘটনা বলে গেল সেঙাই। এমনকি তার কাহিনি থেকে মেহেলীও বাদ গেল না।

মোরাঙ কাঁপিয়ে উল্লসিত শব্দ করে উঠল জোয়ান ছেলেরা, হু-হু, অনেকদিন পর জোহেরি বংশের অপমানের শোধ তুলতে পেরেছি।

হো-ও-ও-ও–ও–শীতের রাত চমকে ওঠে। নাগা পাহাড়ের হৃৎপিণ্ড বুঝি শিউরে উঠতে থাকে সে চিৎকারে। ।

একসময় উল্লাসের রেশ ঝিমিয়ে এল।

এতক্ষণ বাদামি পাথরের ওপর বসে বসে একালের জোয়ান ছেলেদের ভাবগতিক লক্ষ করছিল বুড়ো খাপেগা। মস্ত একটা গুটসুঙ পাখির মতো গলা বাড়িয়ে সেঙাইর কথা শুনছিল

সে। এবার বলল, শত্রুকে মারলি তো বুঝলাম। কিন্তু খোনকের মাথা কোথায়?

মাথা আনতে পারি নি। সালুয়ালাঙের অতগুলো মানুষ। মাথা আনতে গেলে মাথা রেখে আসতে হত। ধীরে ধীরে বলল সেঙাই।

এ গল্প আমি বিশ্বাস করি না রে টেফঙের বাচ্চা। আশ্চর্য হিমাক্ত শোনাল খাপেগার কণ্ঠ। এত শীতল সে-স্বর যে জোয়ান ছেলেরা এক নিমেষে একেবারে মিইয়ে গেল কিছুক্ষণের জন্য।

বিব্রত গলায় সেঙাই বলল, বিশ্বাস না হয় রেঙকিলানকে জিগ্যেস করিস। রেঙকিলান আমার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল।

কোথায় রেঙকিলান? চারিদিকে তাকাতে লাগল বুড়ো খাপেগা।

তার বউর সঙ্গে পাহাড় থেকে বস্তিতে ফিরে এসেছে। সে মোরাঙে আসেনি। খাপেগার পাশ থেকে বলে উঠল ওঙলে।

খাপেগা বলল, বেশ তো, কালকেই জিগ্যেস করব রেঙকিলানকে। অনেক রাত্তির হয়েছে। এখন বোধহয় মাঝরাত পার হয়ে গেছে। যা শয়তানেরা, শুয়ে পড়।

হাতের থাবায় এক মুঠো কাঁচা তামাকপাতা ছিল। সরাসরি মুখের মধ্যে চালান করে উঠে দাঁড়াল খাপেগা। তারপর ফিসফিস করে বলল, এ ব্যাপারটা নিয়ে বেশি চেঁচামেচি করিস না। সায়েবরা আজকাল এদিকে ঘোরাফেরা করছে। সেদিন নাকি সেনুকাঙ বস্তি থেকে মানুষ মারার

জন্যে দুজনকে ধরে নিয়ে গেছে। ওদের কাছে কী সব অস্তর আছে, দূর থেকে তাক করে মানুষ। মারতে পারে। দিনকাল কী যে পড়ল! হতাশায় বিরাট দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল খাপেগার।

অনেকগুলো গোঁয়ার মাথা খাড়া হয়ে উঠল অগ্নিকুণ্ডটার চারপাশে, হুই সব এ গাঁয়ে চলবে, সিধে কথা। আমাদের বস্তিতে সায়েব ঢুকতে দেব না। হু-হু, এদিকে এলে মোরাঙে মাথা রেখে যেতে হবে তাদের।

একজন সরস টিপ্পনী কাটল, কি গো সদ্দার, আমাদের ভীতু বল। এইবার? ভয়টা কাকে ধরেছে শুনি?

মোরাঙ কাঁপিয়ে অনেকগুলো জোয়ানের গলা থেকে অট্টহাসি উঠে আসে।

সাঁ করে ঘুরে দাঁড়াল বুড়ো খাপেগা, ভয় পেয়েছে কে–আমি? কক্ষনো না। খালি সায়েবদের কথাটা মনে করিয়ে দিয়েছিলাম রে টেফঙের বাচ্চারা।

ভারি আপোশ হচ্ছে। অসতর্ক মুহূর্তে কথাটা বেরিয়ে এসে অতীতের পরাজয়কে যেন চিহ্নিত করে গিয়েছে। নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইল খাপেগা।

সারি সারি বাঁশের মাচানে অনেকগুলো বিছানা। একটু পর দড়ির লেপের নিচে মধুর উত্তাপে ডুবে গেল জোয়ানেরা। একটি নিটোল, পরিতৃপ্ত ঘুমের ভেতর রাতটুকু কাটিয়ে দেবার সংকল্পে সকলে নিঝুম হয়ে গিয়েছে।

বাঁশের মাচানের তলায় খাটসঙ কাঠের অগ্নিকুণ্ডগুলো এখন নির্জীব হয়ে এসেছে। বাঁশের বেড়ার ফাঁক দিয়ে শীতরাত্রির হিম সাদা ধোঁয়ার আকারে অবিরাম ঢুকছে। আজ নির্ঘাত বরফ পড়বে বাইরের উপত্যকায়।

দড়ির লেপের ভেতর শরীরটা কুণ্ডলী পাকিয়ে গেল সেঙাইর। এখনও ঘুম আসছে না দুচোখের পাতা ভাসিয়ে দিয়ে। শুধু তন্দ্রার মতো লাগছে। আর সেই তন্দ্রা অপরূপ হল একটি নগ্ন নারীতনুর রূপে। সে তন্দ্রা মধুর হল আজ বিকেলের সেই নিঃশব্দ ঝরনার পাশে অনাবৃত এক আদিম সৌন্দর্যের স্বপ্নে। সে স্বপ্নের নাম–মেহেলী। সালুয়ালা গ্রামের মেয়ে সে; তাদের শত্রুপক্ষ। রোজ এ পারের ঝরনার জলে তার কমনীয় শরীর স্নিগ্ধ করে যায় মেয়েটা।

একবার পাশ ফিরল সেঙাই। বাঁশের মাচানটা মচমচ করে ওঠে। তারপর লেপের মধ্য থেকে কচ্ছপের মত মাথাটা বাড়িয়ে দিল সে। বাঁশের দেওয়ালের ফাঁক দিয়ে হিমের রেখা ঘন হয়ে ঢুকছে। আগুনের কুণ্ডগুলো নিভু নিভু। তার স্তিমিত আলোতে বর্শা-গাঁথা মোষের মুণ্ড আর বাঘের মাথাগুলো রহস্যময় মনে হয়। এক ভৌতিক আতঙ্কে চেতনাটা আচ্ছন্ন হয়ে আসে। এর চেয়ে লেপের মধ্যে উষ্ণ অন্ধকারটুকু অনেক বেশি নিরাপদ, অনেক বেশি আরামের। এই অন্ধকারে স্নায়ুতে একটি নগ্ন নারীতনুর স্বপ্নকে সঞ্চারিত করা যায়। তন্দ্রাটা উপভোগ করে তোলা সম্ভব হয়। অতএব মাথার ওপর দিয়ে লেপটাকে আবার টেনে দিল সেঙাই।

মেহেলী! মেহলেী! মেহেলী! ঘুম আসছে না সেঙাইর। শত্রুপক্ষের মেয়ে সে। সালুয়ালাঙের মেয়ে সে। পোকরি বংশের মেয়ে সে। বন্য রক্ত কেমন যেন উদ্বেল হয়ে ওঠে সেঙাই-এর ধমনীতে। এই পোকরি বংশই তার ঠাকুরদার মাথা কেটে নিয়ে গিয়েছে, তারপর বর্শায় গেঁথে ওদের মোরাঙের সামনে ঝুলিয়ে রেখেছে। সেই বংশের মেয়ে মেহলী। তবু কত তফাত, কত ব্যতিক্রম। এর সঙ্গে যেন নিঃসন্দেহে মিতালি পাতানো চলে। মেহেলীর সঙ্গে বর্শার মুখে মুখে কথা বলতে মন সায় দেয় না। নির্জন ঝরনার পাশে তাকে সহচরী হিসেবে পেতে মন ব্যগ্র হয়ে ওঠে।

আঠারো বছরের যৌবনে অনেক অনাবৃত কুমীরদেহ দেখেছে সেঙাই। অহরহ দেখছে। কিন্তু তার পাহাড়ী মনে এমন দোলা আর লাগেনি। এমন মাতালামি আর জাগেনি।

কঠিন পাথরের ওপর শিলালিপি পড়েছে। সে শিলালিপি মেহেলী। অক্ষয় তার দাগ। গভীর তার রেখা। স্মৃতির মধ্যে, চেতনার মধ্যে, তন্দ্রার মধ্যে মেহেলীর উজ্জ্বল দেহ, সোনালি স্তনচূড়া, নিটোল নিতম্ব, মসৃণ উরু চমক দিয়ে দিয়ে উঠছে সেঙাই-এর। এই বিছানাটা মৃত ময়ালের শীতল আলিঙ্গনের মতো মনে হচ্ছে। বুকের ভেতর নিবিড় করে পেতে ইচ্ছা করছে মেহেলীকে।

হঠাৎ শরীরে তীব্র মোচড় দিয়ে বাঁশের মাচানের ওপর উঠে বসল সেঙাই। তারপর দড়ির লেপটা গায়ে জড়িয়ে অতিকায় একটা বর্শা টেনে নিল মোরাঙের দেওয়াল থেকে। এই মুহূর্তে সালুয়ালাঙ গাঁ থেকে সে কি মেহেলীকে ছিনিয়ে নিয়ে আসতে পারে না তার বিছানায়? পারে

এই হিমাক্ত বিছানাকে রমণীয় নারীদেহের উত্তাপে মধুর করে তুলতে?

হ্যাঁ। এই বর্শার মুখে সব বাধা, সব প্রতিরোধ চুরমার করে মেহেলীকে সে নিয়ে আসবে। মোরাঙের দরজার দিকে ছুটে গেল সেঙাই। বাঁশের দরজাটা খোলার সঙ্গে সঙ্গে নিষ্ঠুর আঘাতের মতো আছড়ে পড়ল পাহাড়ী শীতের বাতাস। সঙ্গে সঙ্গে পাল্লাটা বন্ধ করে দিল সে। মুখের ওপর থেকে গুঁড়ো গুঁড়ো বরফ মুছে নিল সে হাতের পাতা দিয়ে।

বাইরের পাহাড়চূড়ায় বরফ পড়তে শুরু করেছে। কোনো উপায় নেই বেরুবার। বুকের মধ্যে, প্রতিটি রক্তকণার মধ্যে কামনার যে আগুন জ্বলছে, তা দিয়ে নাগা পাহাড়ের শীতরাত্রির হিমকে পরাজিত করে পথ করে নেওয়া যাবে না। আজকের রাতটা সেঙাইর বিপক্ষে। সালুয়ালাঙ আজ আকাশের মতো সুদূর। আর একটি সন্ধ্যাতারার মতো মেহেলী ধরাছোঁয়ার অনেক, অনেক বাইরে। আজকের রাত্রিতে মেহেলীর স্বপ্ন নিয়ে একটি আগ্নেয় কামনার মধ্যে। একটু একটু করে দগ্ধ হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায়ই নেই সেঙাই-এর।

খ্যাপা একটা বাঘের মতো নিরুপায় ক্রোধে ফুলে ফুলে উঠল সেঙাই। তারপর বর্শাটাকে একদিকে ছুঁড়ে ফেলে বাঁশের মাচানটার দিকে পা বাড়িয়ে দিল।

অনেক কাল আগে পোকরি বংশের মেয়ে নিতিৎসুর জন্য কি তারই মতো তার ঠাকুরদা জেভেথাঙের বুকে এমনি আগুন জ্বলেছিল? চেতনার মধ্যে এমনই মাতামাতি শুরু হয়েছিল?

মাচানের ওপর শুয়ে শুয়ে সেঙাই ভাবতে থাকে, যে পাহাড়ী যুবতী তার আঠারো বছরের যৌবনকে এমন অস্থির করে তুলেছে, তার চোখ থেকে রাত্রির ঘুম ছিনিয়ে নিয়েছে, তাকে পেতে হবে। পেতেই হবে।

অস্ফুট মন, অপরিণত ভাবনা। পেশীময় সবল দেহে চিন্তাগুলি শ্লথ গতিতে ক্রিয়া করে। তবু মেহেলীর ভাবনা উল্কাবেগে ক্রিয়া করছে সেঙাইর মনে। আঠারো বছরের বন্য যৌবনের কাছে রাশি রাশি খাদ্য আর নারীদেহের মতো অমোঘ সত্য আর কী আছে?

ঘুম আসছে না। বাইরের উপত্যকায় গুড়ো গুড়ো বরফ ঝরছে আর মোরাঙের মাচানে তুলোর দড়ির লেপ, খড়ের বিছানা আর আগুনের কুণ্ড রয়েছে। একটি নিটোল ঘুমের এত উপকরণ থাকা সত্ত্বেও আজ রাতে সেঙাইর ঘুম আসবে না।

.

০৬.

পাহাড়ী গ্রামটা একটু একটু করে জেগে উঠছে। অনেক উঁচুতে দক্ষিণ পাহাড়ের শীর্ষে। এখনও শুভ্র তুষারের একটা প্রলেপ পড়ে রয়েছে। তার ওপর কুয়াশা ভেঙে ভেঙে সোনালি সূর্যের দু-একটা জ্যোতির্ময় রেখা এসে পড়েছে। চারিদিকে শুধু মালভূমি আর উপত্যকা, আর তরঙ্গিত পাহাড়ের চড়াই-উতরাই। দিগন্ত ঘিরে সাদা কুয়াশার ঘন স্তর স্থির হয়ে রয়েছে। অপরূপ এই নাগা পাহাড়। অদৃশ্য ঢেউয়ের মতো বয়ে যাচ্ছে বাতাস। সে বাতাসে শীতের হিম মিশে ভয়ানক হয়ে উঠেছে। শরীরের অনাবৃত চামড়ার ওপর কেটে কেটে বসে পাহাড়ী শীতের দাঁত। মেরুদণ্ডের মধ্য দিয়ে অসহ্য তুষারধারা নামতে শুরু করে যেন। হৃৎপিণ্ডের ভেতর। সঞ্চারিত হয়ে যায় একটা তীব্র কনকনানি।

কেলুরি গ্রাম জাগছে। শীতের রাতের সুখনিদ্রার পর সোনালি প্রভাতের ডাক এসেছে। কোখাইরা জেগেছে। যাসেমুদের ঘরে ঘরে ঘুম ভাঙার প্রাথমিক প্রস্তুতি। এর মধ্যেই রোদের প্রার্থনায় ঘরের পেছনে বৃত্তাকার পাথরখানার ওপর এসে বসেছে ফানুসা, ওয়াটেপা। শরীরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ করে জড়িয়ে নিয়েছে কার্পাস তুলোর দড়ির লেপ।

এলোমেলো ছড়ানো ঘর। নিচু নিচু। সেগুলোর মাথায় নতুন খড়ের চাল। চারপাশে চেরা বাঁশের দেওয়ালে সাঙলিয়া লতা আর বেতের ছিলার কঠিন বাঁধন। বৃষ্টির ছাট থেকে ঘর বাঁচাবার জন্য চালাটাকে সামনের দিকে প্রসারিত করে রাখা হয়েছে।

পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে, ওপরে-নিচে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত সব ঘর। ঘন অরণ্য ধ্বংস করে। টঘুটুঘোটাঙ ফুলের মতো ফুটে উঠেছে এই নগণ্য পাহাড়ী জনপদ, বন্য মানুষের এই সামান্য উপনিবেশ। গ্রামটি যেন এক টুকরো আদিম কাব্য।

বাড়িগুলোর কোনো প্রত্যক্ষ সীমানা নেই–খেয়াল খুশিমতো যেখানে সেখানে গড়ে উঠেছে।

চারপাশে আবাদের জমি সিঁড়ির মতো ধাপে ধাপে নিচে নেমে গিয়েছে। মাসখানেক আগে ফসল তুলে গোলাঘরে জমা করেছে পাহাড়ীরা। ফসলের জমি তাই এখন রিক্ত, হতশ্রী। শুধু এদিকে সেদিকে এখনও ছড়িয়ে রয়েছে কিছু রাহমু ফল, কিছু পাহাড়ী শসা আর প্রচুর টেরিসা ফল। শীতের মরশুমেও পাহাড়ের প্রাণরস শুষে শুষে উদ্দাম হয়ে উঠেছে বনকলার ঝাড়।

জোহেরি বংশের বাড়িটা পাহাড়ের একটা বড় খাঁজের মধ্যে। গ্রামের মানুষেরা এই বাড়িটাকে বলে জোহেরি কেসুঙ। জোহেরি কেসুঙের ঠিক ওপরেই বিরাট একখানা কপিশ পাথরের চাঙড়। বাঁ দিকে ডালপালাওলা একটা বড় খাসেম গাছ আকাশের দিকে মাথা তুলে দিয়েছে। জোহেরি বংশের বন্য রুচি ফুটে রয়েছে চারপাশের টঘুটুঘোটাঙ আর নানা রঙের আখুশু ফুলে ফুলে। জোহেরি কেসুঙের ওপরে পাহাড়ের উঁচু টিলায় টিলায় জোরি, নিপুরি আর সোচরি বংশের বাড়ি। আর কেলুরি গ্রামের তিন প্রান্তে রয়েছে তিনটে মোরাঙ। ত্রিকোণ গ্রাম–তাই তিনটি কোণে মোরাঙ বসিয়ে গ্রামরক্ষার পাকাপাকি আয়োজন করে রেখেছে কেলুরি গ্রামের মানুষেরা।

কিছুদিন আগে নগদা সু মাসে এদের সবচেয়ে বড় উৎসব নগদা শেষ হয়েছে। সেই উৎসবের ক্লান্তি আর উল্লাসের রেশ এখনও গ্রামখানার স্নায়ুতে স্নায়ুতে জড়িয়ে রয়েছে। আপাতত ফসল তোলার তাগাদা নেই, বীজদানা বোনার ব্যস্ততা নেই। এখন অফুরন্ত অবসর। মধুর আলস্যে দিনগুলো ঢিমে তালে গড়িয়ে গড়িয়ে বয়ে চলেছে এই পাহাড়ী জনপদের ওপর দিয়ে।

অন্য সব বাড়ির মতো জোহেরি কেসুঙেরও ঘুম ভেঙেছে। পেছনে অর্ধবৃত্তাকার পাথরের বেদি। বাইরের দরজা দিয়ে সেই বেদির ওপর এসে বসল বুড়ি বেঙসানু। অনেক বয়স হয়েছে তার। মুখের কুঞ্চন-রেখায় অনিবার্য বার্ধক্য ফুটে বেরিয়েছে। মাথার চুলগুলো শুকনো তামাক পাতার মতো হেজে গিয়েছে। চোখের ওপর পাকা ভ্র দুটো ঝুলে পড়েছে। কানে চাকার মতো বড় বড় পিতলের গয়না; কানের মাঝখান থেকে কেটে নিচে এসে ঝুলছে। হাঁটু পর্যন্ত ময়লা কোন মেনী কাপড়। সারা গায়ে দড়ির লেপ জড়ানো। দুহাতের কবজিতে হরিণের হাড়ের বালা। সমস্ত শরীর থেকে উগ্র আর ভ্যাপসা দুর্গন্ধ উঠে এসে শীতের বাতাসে সঞ্চারিত হয়ে যাচ্ছে।

বেঙসানুর পাশে এসে বসেছে বছর ছয়েকের একটি ছেলে আর বছর তিনেকের একটি মেয়ে। ফাসাও আর নজলি। তার দুই নাতি-নাতনি। বেঙসানু ছেলেমেয়ে দু’টিকে কোলের ভেতর টেনে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসল।

ফাসাও বলল, ঠাকুমা, বড় শীত করছে।

হু-হু, আজ বড় শীত। দাঁড়া, এখুনি রোদ উঠবে।

পাহাড়ের চূড়া ঘিরে যে সাদা কুয়াশার স্তর এতক্ষণ গাঢ় হয়ে ছিল, রোদের অবিরাম রাঘাতে এখন তা ছিঁড়ে ছিঁড়ে যাচ্ছে। দক্ষিণ পাহাড়ের শীর্ষে বরফের যে সাদা স্তরটা জমাট বেঁধেছিল, এবার তা একটু একটু করে মুছে যেতে শুরু করেছে। নিবিড় বনের সবুজ ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে।

এতক্ষণ অবিরাম বকর বকর করছিল ফাসাও। কথার পর কথা। সঙ্গতি নেই, একটার সঙ্গে আর একটার সম্বন্ধ নেই। সব এলোমেলো, পারম্পর্যহীন।

শুকনো পাতার মতো ধুসর মাথাটা শুধু নাড়ছিল বুড়ি বেঙসানু। আর মাঝে মাঝে হাতের তালু থেকে কাঁচা তামাক পাকিয়ে জিভের নিচে গুঁজে গুঁজে দিচ্ছিল।

আচমকা ফাসাও বলল, আচ্ছা ঠাকুমা, সূর্য ওঠে কেন?

হু-হু, বল দিকি ঠাকুমা। জোহেরি কেসুঙের চারপাশে আরো কয়েকটি কৌতূহলী কণ্ঠ শোনা গেল।

ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারিদিকে একবার তাকাল বুড়ি বেঙসানু। গ্রামের কয়েকটি ছেলেমেয়ে এর মধ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। তারা বেঙসানুর চারপাশে এসে নিবিড় হয়ে বসল।

হু-হু, বল দিকি। বাঁ দিকের পাহাড়ের খাঁজে নিয়ানোদের বাড়ি। সেখান থেকেও দু-একটি গলা বেশ সরব হয়ে উঠেছে।

শীতের সকাল। পাহাড়ী দিগন্ত ঘিরে বিলীয়মান কুয়াশার প্রলেপ। শীতার্ত বাতাস। গালগল্পের মজা দিয়ে, অলস কথার মৌতাত মেখে শীতের সকালটাকে রমণীর করে ভোলার ইচ্ছা সকলের চোখেমুখে, হু-হু, বল দিকি বুড়ি।

আরম্ভ কর সেঙাই-এর ঠাকুমা। কলের গলায় সমান আগ্রহ, সমান তাগাদা, সমান ব্যগ্রতা।

আস্তে আস্তে বলতে শুরু করল বুড়ি বেঙসানু, শোন তবে, সে এক কেচ্ছা। আমি শুনেছি আমার মায়ের কাছে। মা শুনেছে তার ঠাকুরদার কাছে। একটু থামল বেঙসানু। তারপর সকলের মুখের ওপর দিয়ে ঘোলাটে দৃষ্টিটাকে চক্রাকারে পাক দিয়ে আনল। তারও পর যেমন করে মন্ত্র দান করা হয়, ঠিক তেমনই গম্ভীর হয়ে এল তার কণ্ঠস্বর, মন দিয়ে শোন সবাই–

বুড়ি বেঙসানুর গল্প শুরু হল, অনেক কাল আগে, সে কত বছর আগের ব্যাপার তা বলতে পারব না। তবে তখন খুব গরম ছিল। এত গরম যে মানুষেরা একেবারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। সূর্য উঠলেই সারা গায়ে জ্বলুনি ধরে, গাছপালা পুড়ে যায়। পাহাড়ের মানুষেরা বলাবলি করলে, নাঃ, এত গরমে একেবারে মরেই যাব। সূর্য আর না উঠলেই বাঁচোয়া। মনের কথা মনে রাখাই ভালো। মুখ ফসকে বেরিয়ে এলেই বিপদ। কিছু লোকজন সে কথা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বললে। আর যায় কোথায়? সূর্য ঠিক ঠিক শুনে ফেলেছে।

কিছু সময়ের বিরতি। একমুঠো কাঁচা তামাকপাতা মুখে পুরে বুড়ি বেঙসানু আবার শুরু করল, প্রথম প্রথম যেন এসব কথা শোনেনি, এমন ভাব দেখালে সূর্য। শেষে মানুষের মুখে মুখে এক কথা বার বার শুনতে শুনতে তার ধৈর্য আর রইল না। তার ভারি গোসা হল। হবার তো কথাই। পাহাড়ী মানুষগুলোকে তা জানিস, একটা কথা পেলে তা নিয়ে ছেলেবুড়োর দিনরাত খালি বকর বকর। যাক সে কথা। তারপর হল কি, একদিন সুর্য তো ছয় পাহাড়ের নিচে ডুবে গেল। তার পরদিন সে আর ওঠে না। চারিদিকে অন্ধকার আর অন্ধকার। শীতে মানুষ মরার উপক্রম। সূর্য হল পুরুষ মানুষ, তার তেজ না থাকলে চলে! চাঁদ ওঠে বটে, কিন্তু সে হল মাগী। তার গরম নেই। পাহাড়ের মানুষ যখন শীতে কাঠ হয়ে গেল, তখন সবার টনক নড়ল। জানিস তো, ছটা আকাশ আছে। সেই ছটা আকাশ পেরিয়ে সূর্য ওধারে কোথায় যেন চলে গেছে। অগত্যা সাধ্যসাধনা শুরু হল। মানুষেরা সূর্যকে আনার জন্যে তোক পাঠালে। সূর্য তার কথা শুনল না। জানোয়াররা পাঠাল তাদের রাজা বাঘকে। সূর্যের রাগ তাতেও পড়ল না। পাখির রাজ্য থেকে গেল সবচেয়ে সুন্দর খুগু পাখি। তবুও মন ভিজল না সূর্যের।

এদিকে পাহাড়ের মানুষগুলো শীতে প্রায় সাবাড় হয়ে এসেছে। কোনো উপায় নেই। তখন এক বুড়ো হুন্টসিঙ পাখি বুদ্ধি বাতলে দিল। সে বললে, সূর্য মুরগিকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। তোমরা সব তাকে গিয়ে ধর। সে তাকে ফিরিয়ে আনতে পারবে।

বেঙসানুর চারপাশের ছেলেময়েরা চোখ বড় বড় করে শুনছে। সকলের চোখেমুখে বিস্ময়ের, ভয়ের, কৌতূহলের সাতরঙা রামধনু খেলে খেলে যাচ্ছে।

বুড়ি বেঙসানু খকখক করে কেশে উঠল একবার। তারপর বিরাট শ্বাস টেনে নিল ফুসফুসের মধ্যে। তারও পর আবার আরম্ভ করল, মুরগি অনেক টালবাহানা করে তো রাজি হল। সে বললে, তাকে লাল রঙের মুকুট দিতে হবে। মানুষ, পাখি আর জানোয়ার সব ফাঁপরে পড়েছে। তাই কী আর করে! মুকুট দিতে হল। সেই থেকে মুরগির মাথায় লাল টুপি হয়েছে। যাক, যা বলছিলাম। রাতারাতি ছয় পাহাড় আর ছয় আকাশ ডিঙিয়ে তো সূর্যের বাড়ি এল মুরগি। একেবারে সেই পাতালে। মাঝ পথে ভামবিড়ালের আস্তানা। তাই ভয়ে ভয়ে, চুপিচুপি পার হতে হয়েছে এতটা পথ।

মুরগি সূর্যের হাতে পায়ে ধরে অনেক অনুনয় করলে। কিন্তু সে বড় গোঁয়ার। শত হলেও পুরুষ মানুষ তো। তার মানে লেগেছে। মুরগি বললে, রোজ ছটা আকাশের দরজা ডিঙিয়ে তোমাকে আমাদের পাহাড়ে যেতে হয়। তুমি যখন আসবে, আর এক একটা দরজা পার হবে, সঙ্গে সঙ্গে আমি চিৎকার করে পাহাড়ের লোকজনকে জানিয়ে দেব। সে চিৎকার শুনে তারা তোমায় পুজো করবে। তাহলে খুশি তো? সূর্য তাতেও রাজি নয়।

অগত্যা মুরগিকে পাহাড়ে ফিরতে হবে। কিন্তু পথে সেই ভামবিড়ালের আস্তানা। বড় ভয় করতে লাগল তার। সে বললে, তুমি তো আমার কোনো অনুরোধই রাখলে না সূর্য। কিন্তু একটা কথা তোমাকে রাখতে হবে। আমি এখন পাহাড়ে ফিরে যাব। ছয় আকাশ আর ছয় পাহাড়ের দরজা ডিঙিয়ে আমাকে যেতে হবে। মাঝখানে এক ভামবিড়ালের আস্তানা আছে। সে আমাকে পেলে মেরে ফেলবে। আমার বড় ভয় করছে। সূর্য বললে, আমাকে কী করতে হবে, বল। মুরগি বললে, যখন ভামবিড়ালটা আমার দিকে তেড়ে আসবে, সঙ্গে সঙ্গে আমি ডেকে উঠব। আর তুমি আমাকে বাঁচাতে যাবে। সূর্য বললে, তাই হবে।

মুরগি সূর্যের সেই পাতালবাড়ি থেকে রওনা দিলে। পথে আসতে আসতে এক খাসা বুদ্ধি খেলে গেল তার মাথায়। আকাশের একটা দরজা ডিঙিয়ে সে মিছিমিছি চেঁচিয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে সূর্য এসে হাজির। মুরগি বললে, তুমি এখানে দাঁড়াও। তোমাকে দেখে ভামবিড়ালটা পালিয়ে গেল। আমি যাই এবার।

এমন করে আকাশের ছটা দরজায় দাঁড়িয়ে ছবার চেঁচিয়ে উঠল মুরগি। সঙ্গে সঙ্গে সূর্যও তার প্রতিজ্ঞামত এসে হাজির। একসময় পাহাড়ের লোকেরা দেখলে ছয় আকাশ ডিঙিয়ে সূর্য এসে উঠেছে পাহাড়ের ওপর। আলোয় ভরে গিয়েছে চারিদিক। শীত পালিয়েছে। সেই থেকে আজও সেই মুরগিটা আকাশে ছবার করে ডেকে ওঠে। ছয় আকাশের দরজায় দাঁড়িয়ে ছবার ডাকে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমরা শুনি। তারপর এ পাহাড়ে সূর্য আসে। বুঝেছিস এবার? বুড়ি বেঙসানুর গল্প শেষ হল।

দূর, সাহেবরা তো অন্য কথা বলে। ওপরের জোরি কেসুঙ থেকে বলে ওঠে সারুয়ামারু। বছর পঁচিশেক বয়স। বছরখানেক আগে বিয়ে করে উঁচু টিলার ওপর নতুন ঘর তুলেছে। সেই ঘরের মধ্য থেকে কথাগুলো যেন ছুঁড়ে মারল সে।

ঘোলাটে চোখদুটো ধক করে জ্বলে উঠল বুড়ি বেঙসানুর, কী, কী বললি?

কী আর বলব। কাঁচা তামাক খাস কিনা, নেশার ঘোরে কী যে বলিস, তার ঠিক নেই। সাহেবরা বলে অমন করে সূর্য ওঠে না। শান্ত গলায় বলল সারুয়ামারু।

অমন করে ওঠে না! গর্জন করে উঠল বেঙসানু। তারপরেই তার মুখ থেকে বৃষ্টির মতো কদর্য গালাগালি বেরুতে লাগল, ইজাহান্টসা সালো। নে রিহুগু–

সারুয়ামারুর ভাঁড়ারেও অফুরন্ত গালাগালি মজুদ আছে। সেও বিচিত্র মুখভঙ্গি করে সে সব একটির পর একটি ছুঁড়তে লাগল, আহে ভু টেলো…

অব্যর্থ লক্ষ্য। দুপক্ষই সমান উত্তেজিত। যারা চারপাশে জমায়েত হয়েছিল তারা সকলেই বেঙসানুর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তাদের সমবেত চিৎকার শীতের সকালটাকে কুৎসিত করে তুলেছে। যারা অত্যন্ত উৎসাহী, ঘর থেকে সাঁ করে তারা খারে বর্শা নিয়ে এসেছে। আকস্মিক একটা খণ্ডযুদ্ধের প্রস্তুতি। এর মধ্যে বিস্ময়ের কিছু নেই, হতবাক হবার কারণ নেই। পাহাড়ী গ্রামে বিন্দুমাত্র মতান্তর নিশ্চিত মৃত্যু ডেকে আনে। বর্শার ফলায় ফলায় সমস্ত ঝগড়াঝাটির অবসান হয়।

উত্তেজনায় বেঙসানু উঠে দাঁড়িয়েছিল, কী সব্বনাশ, শয়তানের জন্যে আনিজার রাগ এসে পড়বে বস্তিতে। সূর্য আর উঠবে না। শীতে সবাইকে মরতে হবে। শয়তানের বাচ্চা কোহিমা মোককচঙ গিয়ে লায়েক হয়ে ফিরেছে! ওরে তোরা সব মুরগি নিয়ে আয়, সূর্যের নামে বলি দিতে হবে। সূর্যের রাগ এই বস্তির ওপরে পড়লে আর উপায় নেই।

রুদ্ধশ্বাসে কথাগুলো বলে চলেছে বুড়ি বেঙসানু। একটানা, ছেদহীন। শুধু কথার পর কথা। চেঁচাতে চেঁচাতে গলার স্বর চিরে চিরে যাচ্ছে। সাহেব অন্য কথা বলেছে! ওরে, তোরা শয়তানের বাচ্চাটাকে বর্শা দিয়ে কুঁড়ে ফেল, সাবাড় কর। বস্তির সব্বনাশ হয়ে যাবে ও থাকলে।

এক অপরিসীম আতঙ্কে হঠাৎ মানুষগুলো অসাড় হয়ে গেল। হাতের থাবার মধ্যে বর্শাগুলো থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছে। এই মুহূর্তে একটা অনিবার্য সর্বনাশ এসে পড়বে। সূর্যটা হয়তো এখনই আবার নেমে যাবে কোন অদৃশ্য পাতালে। এক ফুকারে হয়তো নিবে। যাবে আলো, মুছে যাবে সমস্ত উত্তাপ। হয়তো এখনই নাগা পাহাড়ের নাভিমূল থেকে কেঁপে কেঁপে উঠবে ভূমিকম্পের তরঙ্গ। প্রচণ্ড গর্জনে এই পাহাড়, এই উপত্যকা উৎক্ষিপ্ত হয়ে যাবে। তারপর খণ্ড খণ্ড হয়ে নীহারিকার মতো ছড়িয়ে পড়বে মহাশূন্যে। আলো নেই, উত্তাপ নেই, শুধু নিঃসীম অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারের মধ্যে নিশ্চিত প্রলয়ের প্রহর গুনতে থাকবে এই পাহাড়ের জীবজগৎ। পশু, পাখি, মানুষ–কেউ বাদ যাবে না। কারো নিস্তার নেই সেই অপমৃত্যুর হাত থেকে।

মেরুদণ্ডের মধ্যে শিহরন খেলে যাচ্ছে। মজ্জার ভেতর দিয়ে হিম নামতে শুরু করেছে যেন। পাহাড়ী মানুষগুলো একেবারেই আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছে।

একসময় হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল বেঙসানু, তোরা এখনও দাঁড়িয়ে আছিস? আগে সূর্যের রাগ কমা, মুরগি নিয়ে আয়। তারপর হুই শয়তানের বাচ্চার মুণ্ডু কাটবি। বস্তিতে এমন লোক থাকলে আর বেঁচে থাকতে হবে না।

প্রচণ্ড একটা ঝাঁকুনি লেগে সমস্ত নিষ্ক্রিয়তা ঝরে গেল মানুষগুলোর। অনিবার্য অপঘাতের কবল থেকে বাঁচার একটা ক্ষীণ আভাস তারা দেখতে পেয়েছে। পলকে বর্শা নামিয়ে রেখে তীরের মতো ছুটে গেল সবাই। এই মুহূর্তে এই উপত্যকা আলোড়িত করে, যেখান থেকে হোক মুরগি সংগ্রহ করে আনতে হবে, আনতেই হবে।

জীর্ণ গলাটা ফুলিয়ে তখনও খেউড় গেয়ে চলেছে বেঙসানু। আর সেই একটানা কণ্ঠসাধনায় তার সঙ্গে সুর মিলিয়েছে তার নাতি আর নাতনি, ফাসাও আর নজলি। অবিরাম সেই কণ্ঠে বাজছে, ইজাহান্টসা সালো–

আর ওপরের টিলায় দাঁড়িয়ে নিরুপায় আক্রোশে একটা খ্যাপা অজগরের মতো ফুলছে সারুয়ামারু। আচ্ছা, সময় এলে সেও দেখে নেবে।

সারুয়ামারুর অপরাধই বা কী? মাঝে মাঝে নুন আনতে অগুনতি পাহাড় আর উপত্যকা ডিঙিয়ে তাকে যেতে হয় মোককচঙ। কখনও বা কোহিমায়। সেখানে একদল বিচিত্র মানুষকে সে দেখেছে। বরফের মতো সাদা গায়ের রং। পরনে হুন্টসিঙ পাখির পালকের মতো ধবধবে পোশাক। সে পোশাক একেবারে গলা থেকে পায়ের পাতায় নেমে এসেছে। চোখের মণি কী আশ্চর্য নীল! কী মনোরম তাদের ব্যবহার! তার মতো আরো অনেক পাহাড়ী মানুষ যায় কোহিমায়। মেলুরি থেকে, টিজু নদীর ওপারের সুদূর উপত্যকা থেকে। রেঙমাপানি আর দোইয়াঙ নদীর পরপারে যে ছোট ছোট জনপদ বিক্ষিপ্ত হয়ে রয়েছে, সেখান থেকেও অনেক মানুষ যায় লবণের জন্য।

বিভিন্ন গ্রাম, বিভিন্ন জাতের সব নাগা। তাদের মধ্যে মনান্তর আছে, মতান্তর আছে। ঝগড়াঝাটিরও অন্ত নেই। তবু মোককচঙে কি কোহিমায় লবণের সন্ধানে যখন আসে তখন তারা খুবই শান্ত, অতিমাত্রায় সংযত।

সেই লবণের খোঁজে কোহিমায় এসে এক বিচিত্র পৃথিবীর সন্ধান পেয়েছিল সারুয়ামারু। এক অপূর্ব জীবনের আস্বাদে চমকে উঠেছিল।

বরফের মতো সাদা সব মানুষ। পরনে ধবধবে, ঢোলা আলখাল্লা। রূপকথার দেশের সংবাদ যেন নিয়ে এসেছে। তাদের পাহাড়ী ভাষা কী চমৎকার করেই না বলতে পারে! এমন একজন বরফসাদা মানুষ তাকে কাছে ডেকে নিয়েছিল। তারপর অন্তরঙ্গ গলায় বলেছে, আমি তোমার শত্রু নই। আমি তোমার আসাহোয়া (বন্ধু)। আমাকে ভয় পেও না। এই নাও।

আচমকা বরফসাদা মানুষটা সারুয়ামারুর গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে দিয়েছিল। কচি পাতার মতো রং চাদরটার। শীত ঋতুর দিন। চাদরটা উষ্ণ আমেজের মতো সারা শরীরে লেপটে গিয়েছিল সারুয়ারুমার। চাদরের উত্তাপ প্রচুর আরাম দিচ্ছিল। এমন আচ্ছাদন জীবনে কোনোদিন দেখেনি সারুয়ামারু। তার কোমরের চারপাশে একটা হরিণের ছাল জড়ানো ছিল। তার ওপর কচিপাতা-রং চাদর। ভারি মজা লেগেছিল সারুয়ামারুর।

তবু সংশয় ছিল পাহাড়ী মানুষ সারুয়ামারুর চোখে। শঙ্কিত দৃষ্টিতে এদিক সেদিক তাকাচ্ছিল সে। হাতের মুঠোতে বর্শাটা শক্ত করে ধরা রয়েছে তার।

চারপাশে পাহাড়ী টিলায় ছোট ছোট সব বাড়ি। ঢেউটিনের চাল, প্ল্যাস্টারের দেওয়াল। পাহাড় বেয়ে বেয়ে ময়াল সাপের মতো চড়াই-উতরাই পথ। এই হল কোহিমা শহরের চেহারা। শহরটাকে মনোরম করে তোলার জন্য সর্বত্র ফুলের বাগান।

ডানদিকে লবণের বাজারে রীতিমতো হইচই শুরু হয়েছে তখন। বাঁ দিকে টিনের অসংখ্য ঘর। সেই ঘরগুলোর সামনে বাঁশের মাচা। মাচাগুলোর ওপর বসে রয়েছে অনেকগুলো বরফসাদা মানুষ। সকলেই এক-একজন নাগার সঙ্গে বন্ধুত্ব করে নিচ্ছে। চাদর কি কাপড় জড়িয়ে জড়িয়ে দিচ্ছে তাদের গায়ে।

ইতস্তত ছড়ানো আরো কয়েকজন লোক চোখে পড়ছিল। তাদের গায়ের রং কালো। একই রঙের একই আকারের পোশাকে তাদের দেহ সাজানো রয়েছে। হাতে বিচিত্র ধরনের লাঠি (এর আগে বন্দুক দেখে নি সারুয়ামারু)। সাদা মানুষগুলো মাঝে মাঝে তাদের সঙ্গে কী এক দুর্বোধ্য। ভাষায় কথা বলছিল। বুঝতে পারেনি সারুয়ামারু।

প্রথমে কোনো কথা বলেনি সারুয়ামারু। সাদা মানুষটা মৃদু হেসে জিগ্যেস করেছিল, কেমন লাগছে এই চাদরটা? বেশ আরাম লাগছে তো?

হু-হু। মাথা নেড়েছিল সারুয়ামারু।

এটা তোমাকে দিলাম। খুশি?

লাল লাল অপরিষ্কার দাঁতের পাটি বার করে হেসে উঠেছিল সারুয়ামারু। ভারি খুশি হয়েছে সে।

সাদা মানুষটা আবার জিগ্যেস করেছে, নাম কী তোমার?

আমার নাম সারুয়ামারু।

কোন বস্তিতে থাকো?

কেলুরি বস্তিতে।

বাঃ বাঃ, ভালো। তোমাদের বস্তিতে আমি গেলে সবাই খুশি হবে? দু’টি চোখের নীল মণি সারুয়ামারুর মুখের ওপর স্থির করে জানতে চেয়েছিল সাদা মানুষটা।

এবার সারুয়ামারু বলেছে, আমি কিছু জানি না। আমাদের বস্তির সদ্দার আছে। বস্তিতে ঢুকতে হলে তাকে বলতে হবে। নইলে বর্শা দিয়ে ফুঁড়ে দেবে।

আচ্ছা আচ্ছা, তাই বলে নেব।

কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল সাদা মানুষটা। কী একটা গভীর চিন্তায় তলিয়ে যেতে লাগল সে। তারপর ফের বলে উঠল, আমি ফাদার–বুঝলে? আমাকে ফাদার বলে ডাকবে।

সারুয়ামারু মাথা দুলিয়ে রাজি হয়েছিল।

সাদা সাহেব আবারও বলেছে, সাত সমুদ্র তের নদী পেরিয়ে তোমাদের দেশে এসেছি। অনেক, অনেক দূরে আমার দেশ।

কোহিমার পাহাড়শীর্ষ থেকে ধু ধু দিগন্তের দিকে ডান হাতের তর্জনী বাড়িয়ে দিয়েছিল সাহেব। কত দূরে তার বাড়ি? সারুয়ামারু সে দূরত্বের হদিস পায়নি। শুধু দুটো অবোধ চোখে সাহেবের তর্জনীটার দিকে তাকিয়ে ছিল। ছয় আকাশের দরজা ডিঙিয়ে সন্ধ্যার সময় সূর্যটা যে জগতে চলে যায় বিশ্রামের আশায়, হয়তো সেখান থেকে এসেছে এই বরফ-সাদা মানুষটা। বিস্মিত চোখে তাকিয়েই ছিল বন্য মানুষ সারুয়ামারু।

একসময় সাহেবই ফের বলতে শুরু করেছিল, কোহিমায় কী নিতে এসেছ?

নিমক।

নিমকের বদলে কী দেবে?

সম্বরের ছাল, টেরোন্য জানোয়ারের শিং, বাঘের ছাল।

আমি তোমাকে নিমক দেব। একেবারে মাগনা। কোনো কিছুর সঙ্গে বদল করতে হবে না।

আশাতীত খুশিতে জ্বলে উঠেছে সারুয়ামারুর পিঙ্গল চোখ দুটো। সে বলেছে, আমাদের পাহাড়ে নিমকের বড় অভাব। এক কণা নিমক নেই।

নিমক তোমাকে দেব, কিন্তু তার বদলে তোমাকে একটা কাজ করতে হবে।

কী কাজ? চোখেমুখে সংশয় ফুটে বেরিয়েছে সারুয়ামারুর।

কঠিন কিছু না। সব সময় কপালে, বুকে আর দুহাতের জোড়ের ওপর আঙুল ঠেকাতে হবে। বুক, কপাল আর বাহুসন্ধিতে আঙুল ঠেকিয়ে ক্রস আঁকার প্রক্রিয়াটা শিখিয়ে দিয়েছিল পাদ্রী সাহেব। বলেছিল, পারবে?

রীতিমতো উৎসাহিত হয়ে উঠেছিল সারুয়ামারু, হু-হু, খুব পারব। সঙ্গে সঙ্গে ক্রস আঁকার কাজে লেগে গিয়েছিল সে।

পাদ্রী সাহেব বলেছিল, বুক-হাতে-কপালে আঙুল ঠেকাবে আর বলবে যীশু, যীশু।

যীশু?

হ্যাঁ, যীশু। পারবে তো?

খুব পারব।

এবার হুন্টসিঙ পাখির পালকের মতো ধবধবে মুখখানার ওপর তৃপ্তির আর সাফল্যের হাসি ছড়িয়ে পড়েছিল পাদ্রী সাহেবের। পাশের অন্য একটা সাদা মানুষকে ডেকে দুর্বোধ্য ভাষায় অথচ উল্লাসের সুরে কী যেন বলে উঠেছিল সে। সেদিন তা বুঝে উঠতে পারেনি সারুয়ামারু।

একসময় সম্বরের চামড়ায় নুন ঢেলে দিয়েছিল সাদা মানুষটা। অন্তরঙ্গ গলায় বলেছিল, আজ থেকে আমরা হলাম ফ্রেন্ড, মানে তোমাদের ভাষায় যাকে বলে আসাহোয়া (বন্ধু)। কেমন তো? আবার বলছি, আজ থেকে আমাকে তুমি ফাদার বলে ডাকবে।

গোলাকার কামানো মাথাটা দুলিয়ে সম্মতি দিয়েছিল সারুয়ামারু।

পাদ্রী সাহেব আরো বলেছিল, তুমি যা চাও সব পাবে। নিমক পাবে, কাপড় পাবে, জামা পাবে। তবে যা বলেছি তা করতে হবে। আর তোমাদের বস্তি থেকে সবাইকে সঙ্গে করে আনবে। সদ্দারকে নিয়ে আসবে। সকলকে কাপড় দেব, নিমক দেব।

হু-হু। জোরে মাথা ঝাঁকিয়ে, ঘন ঘন ক্রস এঁকে, তারস্বরে চিৎকার করে উঠেছিল সারুয়ামারু, যীশু, যীশু।

এরপর অনেকবার কোহিমায় এসেছে সারুয়ামারু। পাহাড় আর উপত্যকা পাড়ি দিয়ে পাদ্রী সাহেবের কাছে আসতে আসতে তার মনে হয়েছে, একটা রমণীয় নেশার মতো তাকে আকর্ষণ করছে এই শহরটা। বস্তি থেকে অনেককে বহুবার কোহিমায় নিয়ে এসেছে সারুয়ামারু। এমনকি বেঙসানুর ছেলে সিজিটো পর্যন্ত তার সঙ্গে এসেছে। পাদ্রী সাহেব তাদের নিমক দিয়েছে, কাপড় দিয়েছে, চাদর দিয়েছে। আর সকলের কানে কানে এক আলোকমন্ত্র দান করেছে। তা হল যীশুর নামজপ আর ক্রস আঁকার পবিত্র পদ্ধতি।

বিচিত্র সব কাহিনী বলেছে পাদ্রী সাহেব। বিস্ময়কর সব গল্প। সেই গল্প থেকেই সারুয়ামারু জানতে পেরেছিল, সূর্য ওঠার আসল রহস্যটা কী। দিনরাত্রির নেপথ্যে কোন সত্যটা রয়েছে। একটু আগে সেই সত্য ফাঁস করতে গিয়ে রীতিমতো একটা খণ্ডযুদ্ধ আমন্ত্রণ করে এনেছে সে।

.

ইতিমধ্যে পাহাড়ী মানুষগুলো মুরগি নিয়ে এসেছে। প্রত্যেকের হাতের মুঠিতে একটা করে ধরা রয়েছে।

বেঙসানু বলল, আয় তোরা, বাড়ির সামনের দিকে আয়।

জোহেরি কেসুঙটা একটা নিচু দোচালা ঘর। সামনের দিকে খড়ের চাল অনেকটা প্রসারিত। রোদবৃষ্টির হাত থেকে রক্ষার জন্য এই পদ্ধতিতে নাগাদের ঘর তৈরি করতে হয়। দু’দিকে বাঁশের দেওয়াল। সামনের দিকে গোলাকার বাঁশের দরজা। দরজার দু’পাশে লম্বা দুটো বর্শার মাথায় মোষের মুণ্ডু গেঁথে রাখা হয়েছে। ঘরের সামনের চত্বরে মোষ বলির হাড়িকাঠ। খাটসঙ গাছের কাঠ দিয়ে বানানো। পরিষ্কার বোঝা যায়, বাড়ির মালিকেরা জেসেসি ভোজ দিয়ে সমাজকে আর প্রিয়জনদের সন্তুষ্ট করতে পেরেছে।

মোষবলির হাড়িকাঠের ঠিক পাশেই গোলাকার একটা খয়েরি রঙের পাথর। এ পাথর অতি পবিত্র। এ পাথর ঘরের চারপাশ থেকে দুষ্ট প্রেতাত্মাকে হাজার পাহাড় ফারাকে নির্বাসিত করে রাখে। পাহাড়ী মানুষগুলোর তাই বিশ্বাস। এমন পাথর প্রতিটি বাড়ির সামনে সযত্নে রক্ষিত আছে।

সামনের পাথরটার কাছে এসে দাঁড়াল বুড়ি বেঙসানু। ইতিমধ্যে সমস্ত গ্রামটা এসে একেবারে মৌচাকের মতো জোহেরি কেসুঙে ভনভন করতে শুরু করেছে। প্রায় সকলেই অনাবৃত। দু-একজনের দেহে সামান্য আচ্ছাদন। তাদের নানা প্রশ্ন।

কী ব্যাপার?

কী হয়েছে?

আসলে যারা পরে এসেছে তারা কিছুই জানত না। মুরগি আনতে বলার জন্য তারা রীতিমতো চিন্তিত।

কী আবার হবে? কুৎসিত মুখভঙ্গি করে সমস্ত ঘটনাটা বলে গেল বুড়ি বেঙসানু, এবার সব যা। সূর্যের নামে মুরগি বলি দে। সূর্যকে সন্তুষ্ট কর। তা না হলে বস্তি সাবাড় হয়ে যাবে।

যারা পরে এসেছে তারা মুরগির সন্ধানে দিগ্বিদিকে দৌড়ে গেল। যারা মুরগি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, তাদের দিকে তাকিয়ে বুড়ি বেঙসানু বলল, তোরা দাঁড়িয়ে রইলি কেন? যার যার বাড়ির সামনে গিয়ে সূর্যের নামে বলি দে।

একে একে সবাই চলে গেল।

খানিকটা পর কতকগুলো নিরীহ পাখির গলা থেকে মরণকাতর চিৎকার বাতাসে ভেসে গেল। আর তাদের উষ্ণ রক্তের রং শীতের প্রভাতের লালিমার সঙ্গে মিশে যেতে থাকে। সেই সঙ্গে অনেকগুলো পাহাড়ী কণ্ঠ থেকে এক করুণ আর্তি, এক শঙ্কিত প্রার্থনা উঠে গেল আকাশের দিকে, সূর্য, তুমি এই বলি নিয়ে সন্তুষ্ট হও। এই বস্তির ওপর তোমার রাগ যেন না পড়ে।

আশ্চর্য! সারুয়ামারুও একটা মুরগি বলি দিয়েছে সূর্যের নামে। আর সকলের সঙ্গে একই প্রার্থনায় গলা মিলিয়েছে, সূর্য, তুমি এই বলি নিয়ে…

সূর্যের উদ্দেশে নিরীহ রক্তের উৎসর্গ শেষ হল।

এতক্ষণে দক্ষিণের পাহাড়চূড়া থেকে সাদা তুষারের আস্তরটা একেবারে মুছে গিয়েছে। একটু একটু করে জ্যোতির্ময় হচ্ছে সূর্য। উপত্যকায় তার উত্তাপ ছড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। চারপাশের পাহাড়গুলো আরো স্পষ্ট হচ্ছে। নিবিড় অরণ্য পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। অপরূপ রূপময় এই নাগা পাহাড়। মুহূর্তে মুহূর্তে তার রূপবদলের পালা। শীতের সকালের এই নাগা পাহাড়কে আশ্চর্য কমনীয় মনে হয়। তার সব নিষ্ঠুরতা রাত্রির হিমে মুছে একেবারে নির্মল হয়ে গিয়েছে যেন।

মুরগি বলি দিয়ে সকলে আবার ছুটে এসেছে বেঙসানুর কাছে। তাদের হাতে খারে বর্শার ফলা ঝলকাচ্ছে। একটু আগে একটা খণ্ডযুদ্ধের আভাস পেয়েছিল তারা। সারুয়ামারুকে বর্শায় কুঁড়ে ফেলার জন্য পাহাড়ী মানুষগুলো তুমুল শোরগোল শুরু করল। সে শোরগোল বিস্ফোরণের মতো আকাশের দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল।

হো-ও-ও-ও-য়া-আ-আ—

হো-ও-ও-ওয়া-আ-আ—

বেঙসানু আবার নতুন উদ্যমে গালাগালি দিতে শুরু করেছে।

অফুরন্ত উৎসাহ। তার ভঁড়ারে অশ্রাব্য খিস্তির অন্ত নেই।

ওপরে জোরি কেসুঙে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সারুয়ামারু। যেন নিষ্প্রাণ শিলামূর্তি। শুধু তার চোখদুটো অঙ্গারের মতো জ্বলছে। তার থাবাতেও মস্ত এক বর্শা। এই খণ্ডযুদ্ধের সম্ভাবনা তার ধমনীতেও রক্ত ফেনিয়ে তুলেছে। তার চেতনার মধ্যেও গর্জন করে উঠেছে আদিম হিংস্রতা।

সারুয়ামারুর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তার বউ। নাম জামাতসু। উলঙ্গ তামাটে দেহ। শরীরের মধ্যদেশ অনেকটা স্ফীত হয়েছে। গর্ভধারণের পরিষ্কার ইঙ্গিত ছড়িয়ে রয়েছে চোখের কোলের কালো রেখায়, টসটসে স্তনচূড়ার কৃষ্ণাভায়। একটা লোহার মেরিকেতসু বাগিয়ে স্বামীর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সে।

সারুয়ামারু ও জামাতসু। আদিম মানব আর আদিম মানবী।

জোরি কেসুঙ থেকে মুরগির রক্ত ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরছে জোহেরি কেসুঙের ওপর। একটু আগে সূর্যের নামে নির্বিরোধ প্রাণীটাকে উৎসর্গ করেছিল সারুয়ামারু। সেই মুরগির রক্ত। টকটকে লাল। এখনও গোলাকার পাথরের ওপর আতামারী ফুলের মতো পড়ে রয়েছে নিহত পাখিটা।

হো-ও-ও-ও-য়া-য়া—

জোহেরি কেসুঙে শোরগোলটা আরো উদ্দাম হয়ে উঠছে।

কিছু একটা ঘটে যেত নির্ঘাত। তার আগেই ঘটল ঘটনাটা। বুড়ো খাপেগার সঙ্গে জোহেরি কেসুঙে এল সালুনারু। সালুনারু রেঙকিলানের বউ। তার পেছন পেছন এসেছে সেঙাই, ওঙলে, পিঙলেই। তাদের সঙ্গে তিনটে মোরাঙ থেকে অগুনতি অবিবাহিত জোয়ান এসে জোহেরি কেসুঙের চারপাশে গোল হয়ে ভিড় জমাল।

বুড়ো খাপেগা বলল, এখানে তোরা কেউ রেঙকিলানকে দেখেছিস?

না। অনেকে একসঙ্গে বলে উঠল।

সেঙাই বলল, কী তাজ্জবের ব্যাপার, কাল বাইরের পাহাড় থেকে সালুনারুই তো তাকে ডেকে নিয়ে গেল।

আমি! সালুনারুর গলায় বিস্ময় চমক দিয়ে উঠল। সেই সঙ্গে মিশে রয়েছে এক ধরনের বিচিত্র ভয়ের অনুভূতি, আমি তো কাল সারাদিন ঘর থেকে বার হইনি। আমি আবার কখন গেলাম বাইরের পাহাড়ে!

নির্ঘাত তুই। আমরা তিনজনই তোর গলা শুনেছি। হুঙ্কার দিয়ে ওঠে সেঙাই।

ওঙলে বলল, কাল সন্ধের সময় যখন শিকার থেকে আমরা ফিরছিলাম, তখন হুই দক্ষিণের পাহাড়ে আসতে রেঙকিলানকে ডাকল সালুনারু। পিঙলেই, সেঙাই আর আমি সে ডাক শুনেছি। এর মধ্যে কোনো ভুল নেই।

পিঙলেই বলল, কাল রেঙকিলানের কী যেন হয়েছিল। চাল কি রোহি মধু কিছুই খায়নি। এমন যে সম্বরের মাংস, তাও ছোঁয়নি। আমরাই সব খেয়ে ফেলেছিলাম। আর কী জন্যে জানি খুব ভয় পেয়েছিল সে।

বুড়ো খাপেগা চোখের ওপর ঝুলে-আসা ভ্র দুটোকে টেনে তোলার চেষ্টা করল। তার সন্ত্রস্ত গলায় বলল, এ তো বড় তাজ্জবের ব্যাপার। কেলুরি বস্তি থেকে একটা আস্ত মানুষ একেবারে লোপাট হয়ে যাবে রাতারাতি! আমার মনে হচ্ছে, এ কাজ নির্ঘাত হুই সালুয়ালাঙ বস্তির শয়তানদের। তাই যদি হয়, ওদের ছাড়া হবে না। ঘোলাটে চোখ দুটো জ্বলে উঠতে চাইল খাপেগার। ভাঙাচোরা দাঁতগুলো কড়মড় করে উঠল।

ওঙলে বলল, তা হতে পারে। কাল দুপুরে সেঙাই ওদের খোনকেকে বর্শা দিয়ে কুঁড়ে এসেছিল। রেঙকিলানকে মেরে হয়তো তার শোধ তুলেছে।

আচমকা বুড়ো খাপেগা চিৎকার করে ওঠে। একটা দমকা বাতাসের আঘাতে সে যেন ফিরে গেল অনেকগুলো বছরের নেপথ্যে, তার যৌবনকালের বেপরোয়া দিনগুলোতে। তার চিৎকার এই কেলুরি গ্রামটাকে তটস্থ করে তুলল, হো–ও–ও-আ-আ–

হো-ও-ও-ও-য়া-আ-আ–

জোয়ান ছেলেদের গলায় গলায় খাপেগার চিৎকার তীব্র প্রতিধ্বনি তুলল। এমনকি সারুয়ামারুও সে চিৎকারে নিজের গলা মিলিয়েছে। দলপতির এই আদিম আহ্বানে সব পাহাড়ী মানুষই এক, অভিন্ন। এখানে কোনো বিভেদ নেই, মতান্তর নেই। একই হত্যার প্রতিজ্ঞা দিয়ে সকলে গ্রথিত।

আকাশ ফাটিয়ে গর্জে উঠল খাপেগা, সালুয়ালাঙ বস্তির তিনটে মাথা চাই। এই জোয়ানের বাচ্চারা, তিনদিনের মধ্যে আমাদের বস্তির তিনটে মোরাঙে ওদের তিনটে মাথা ঝোলাতেই হবে।

হো-ও-ও-ও-য়া-আ-আ—

এই নগণ্য পাহাড়ী জনপদ থেকে অজস্র কণ্ঠের হুঙ্কার টিজু নদীর দিকে ধেয়ে গেল।

একটু আগে সারুয়ামারুকে বর্শা দিয়ে গাঁথবার জন্য সকলে উত্তেজিত হয়ে ছিল। এই মুহূর্তে নতুন প্রসঙ্গ এসেছে। নতুন সংগ্রামের নির্দেশ এসেছে সর্দারের কাছ থেকে। সারুয়ামারুর কথা ভুলে গিয়েছে সকলে। এমনকি স্বয়ং সারুয়ামারু পর্যন্ত। জোরি কেসুঙ থেকে এবার সে নির্দ্বিধায় নেমে এসেছে নিচে, জোহেরি কেসুঙের পাষাণ চত্বরে। সকলের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে দিয়েছে সে। এমন একটা ভয়াল মুহূর্তে সেও সবার সঙ্গে একাকার। একই শপথের কঠিন বন্ধনে বাঁধা।

এতক্ষণ বুড়ি বেঙসানু একপাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। একটি কথাও বলেনি। হঠাৎ ভয়ার্ত শব্দ করে উঠল সে, আনিজা! রেজু আনিজা! রাত্তিরে অমন নাম ধরে ডেকে পাহাড়ের খাদে ফেলে দেয় মানুষকে।

আনিজা! চকিত হয়ে সকলে তাকাল বেঙসানুর দিকে।

বুড়ি বেঙসানু। অনেক বছরের অভিজ্ঞতা তার বলিরেখার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে রয়েছে। সুপ্রাচীন একটা খাসেম গাছের মতো সে। তার রুক্ষ চুলে বহু ঝড়তুফানের স্বাক্ষর, তার শিরা স্নায়ু-অস্থি-মজ্জায় অনেক কাহিনী, অনেক ইতিহাস লুকিয়ে রয়েছে।

বুড়ি বেঙসানু ফের বলল, যা শুনলুম, তাতে মনে হচ্ছে সালুয়ালাঙের শত্তুরদের কাজ নয়। ছ, এ নির্ঘাত আনিজার কাজ।

আনিজা!

আনিজা!

এতক্ষণ সালুয়ালাঙ গ্রামখানা থেকে তিনটে মাথা কেটে আনার জন্য যারা তুমুল চিৎকার জুড়ে দিয়েছিল, ওই একটি নামের মাহাত্ম্যে তারা একেবারে কুঁকড়ে গিয়েছে। সকলের মুখেচোখে পাণ্ডুর ছায়া নেমে এসেছে। জীবন্ত পাহাড়ী মানুষগুলো মৃত্যুকে অনুভব করছে যেন। এক মারাত্মক শিহরন যেন রক্তের কণায় কণায় সঞ্চারিত হয়ে যাচ্ছে তাদের। আনিজা!

বুড়ো খাপেগা বুড়ি বেঙসানুর কাছাকাছি অনেকটা সরে এসেছে। ফিসফিস করে সে বলল, তা হলে কী করা যায়? তুই কী করতে বলিস বেঙসানু?

তোরা একবার বাইরের পাহাড়টা দেখে আয়। এখন দিনের বেলা, আনিজার ভয় নেই। যদি পেয়ে যাস, তবে মড়াটাকে দেখে আসবি। খবদ্দার হুঁবি না কেউ। ভালো করে খুঁজবি যা।

নীরবে সকলের ভাবগতিক লক্ষ করছিল সালুনারু। উৎকর্ণ হয়ে এতগুলো মানুষের কথা সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে যেন শুষে নিচ্ছিল। আচমকা পাহাড়ী জনপদের এই নিভৃত খাজে জোহেরি কেসুঙকে কাঁপিয়ে কাঁপয়ে আর্তনাদ করে লুটিয়ে পড়ল সে।

.

কিছুক্ষণ পর দক্ষিণ পাহাড়ের খাড়া উতরাই-এর কাছে এসে পড়েছে কেলুরি গ্রামের মানুষগুলো। অনেক নিচে গভীর খাদ। পাহাড়ের গা বেয়ে বেয়ে, গাছপালা আর ঝোঁপঝাড়ের জটিল জাল বুনে বুনে সেই খাদের দিকে নেমে গিয়েছে উদ্দাম অরণ্য। ভয়াল অন্ধকার স্তব্ধ হয়ে রয়েছে সেখানে।

উতরাই-এর মাথায় দাঁড়িয়ে সেঙাই বলল, কাল এই দিকেই দৌড়ে এসেছিল রেঙকিলান। রাত্রিবেলা এখান থেকেই একটা গলার শব্দ শুনতে পেয়েছিলাম আমরা। রেঙকিলান বলেছিল, সালুনারু ডাকছে।

বুড়ো খাপেগা বলল, তাই তো, এক কাজ কর। হুই খাদের মধ্যে তারা সবাই খুঁজতে শুরু কর। নিশ্চয়ই আশেপাশে কোথায়ও পড়ে আছে রেঙকিলান।

গ্রাম থেকে শুধু পুরুষরাই এসেছিল। সকলের হাতের থাবায় বিরাট বিরাট বর্শা। সেগুলোর ওপর শীতের সকালের রোদ এসে পড়েছে। ঝিকমিকিয়ে উঠছে ফলাগুলো। পুবের পাহাড়ের চূড়া ছুঁয়ে মালভূমি আর উপত্যকার মধ্য দিয়ে দোল খেতে খেতে সোনালি রোদের ঢল নেমে গিয়েছে পশ্চিম পাহাড়ে। সেখান থেকে আছাড় খেয়ে পড়েছে উত্তর আর দক্ষিণের শৈলশিরে।

কী হবে বল তো সদ্দার?

ও সদ্দার, বড় ভয় করছে।

পাথরপেশী জোয়ান। পাহাড়ের চড়াই-উতরাই থেকে, উদ্দাম জলপ্রপাত থেকে, মালভূমি আর উপত্যকার দিগদিগন্ত থেকে তারা স্বাস্থ্য আহরণ করেছে। এই নিবিড় অরণ্য তাদের দুর্বার সাহস দিয়েছে। চিতার গর্জন থেকে, ডোরাদার বাঘের হুঙ্কার থেকে, ময়াল সাপের ক্রুর দৃষ্টি থেকে তারা পলে পলে সংগ্রামের অধিকার অর্জন করেছে। সর্দারের একটিমাত্র নির্দেশে তারা ছিঁড়ে আনতে পারে শত্রুর মুণ্ডু। বর্শা দিয়ে গেঁথে আনতে পারে দাঁতাল শুয়োরের পালকে। ভিন পাহাড়ের মানুষের হৃৎপিণ্ড ছিঁড়ে আঁজলা আঁজলা রক্ত হিংস্র উল্লাসে ছিটিয়ে দিতে পারে মোরাঙে। সেই রক্ত দিয়ে আঁকতে পারে আদিম পৃথিবীর শিল্পলেখা।

সেই সব জোয়ান পুরুষ, সেই সব পাহাড়ী মানুষ। এই মুহূর্তে তারা ভয় পেয়েছে। শঙ্কাতুর কণ্ঠগুলো তাদের ফিসফিস করছে অস্বাভাবিক আতঙ্কে, কী হবে সর্দার!

এমনকি কেলুরি গ্রামের প্রাচীন মানুষ খাপেগা পর্যন্ত ভয় পেয়েছে। সে বলল, আগে তো রেঙকিলানকে খুঁজে বার কর, তারপর বোঝা যাবে।

জোয়ান পুরুষগুলো দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ল। গাছের ডাল ধরে ঝুলতে ঝুলতে অনেকে নেমে গেল গভীর খাদের মধ্যে। আর চড়াইটার মাথায় দাঁড়িয়ে রইল বুড়ো খাপেগা আর সেঙাই।

অনেকটা সময় কেটে গেল। উপত্যকার ওপর রোদের নরম সোনালি রং একটু একটু করে বদলে যেতে লাগল। এখন বনভূমির দিকে দিকে সবুজ আগুনের মতো সেটা লেলিহান হয়ে জ্বলতে শুরু করেছে।

একসময় অতল খাদ থেকে সারুয়ামারুর গলা ভেসে এল। দু’দিকের পাহাড়ে সে স্বর প্রতিধ্বনিত হতে হতে উঠে আসছে ওপরে, সদ্দার, পেয়েছি। এই তো এইখানে রেঙকিলান, একেবারে মরে কাঠ হয়ে আছে।

হো-ও-ও-ও—

গাছ বেয়ে বেয়ে নিচে নামতে লাগল জোয়ান ছেলেরা।

পাহাড়ী উতরাই-এর মাথা থেকে চিৎকার করে উঠল বুড়ো খাপেগা, খাবার, কেউ মড়া ঘূবি না।

পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল সেঙাই। তার দিকে তাকিয়ে খাপেগা বলল, একবার বস্তিতে যা। তোর ঠাকুমা আর সালুনারুকে এক্ষুনি এখানে নিয়ে আসবি। বেঙসানু অনেক কিছু জানে। সে যা বলবে তাই করব। শিগগির যা।

কিছুক্ষণ পর সালুনারু আর বুড়ি বেঙসানুকে সঙ্গে নিয়ে উতরাইয়ে চলে এল সেঙাই। দুজনেই অনাবৃত। রোদ আরো চড়ে উঠছে। প্রকৃতি তাদের উত্তাপ দিচ্ছে। কৃত্রিম আবরণের আর প্রয়োজন নেই।

বুড়ো খাপেগা বলল, রেঙকিলান হুই খাদের মধ্যে মরে পড়ে রয়েছে। এবার কী করতে হবে বেঙসানু?

এ ঠিক আনিজার কাজ। আমি আগেই বলেছিলাম। আমার ছোটবেলায় এই কেলুরি বস্তিতে যখন বউ হয়ে এলাম তখন তিনটে জোয়ানকে রেনজু আনিজা এমন করে সাবাড় করেছিল। হু-হু। বছর খানেক আগে নগুসেরি বংশের বুড়ো হিবুটাক রেঞ্জু আনিজার ডাকে মরেছিল। তোদের মনে নেই? এবার মরল রেঙকিলান। কেন যে আনিজার গোসা হল আমাদের বস্তির ওপর! একটু থামল বেঙসানু। অনেকটা চড়াই-উতরাই উজিয়ে এসেছে সে। শুকনো স্তনের তলায় বুকখানা দ্রুততালে উঠছে, নামছে। ঘন ঘন কয়েকটা নিশ্বাস ফেলে বেঙসানু আবার বলল, রেঞ্জু আনিজা রাত্তিরবেলা মানুষের নাম ধরে ডাকে, তারপর খাদের মধ্যে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়।

আড়ষ্ট চোখে তাকিয়ে ছিল সালুনারু। কিছুই যেন দেখতে পাচ্ছে না সে, কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। চেতনা তার নিথর হয়ে গিয়েছে। ঠোঁট দু’টি থরথর করে কাঁপছে।

বুড়ি বেঙসানু বলতে লাগল, নিশ্চয়ই কিছু অন্যায় করেছিল রেঙকিলান। না হলে রেনজু আনিজার রাগ কেন তার ওপর পড়বে! কী করেছিল? কি লো সালুনারু, তুই জানিস?

বুকের ভেতরটা ধুকধুক করে উঠল সালুনারুর। আচমকা সে বলে ফেলল, কাল শিকারে যাবার আগে রাত্তিরে সে মোরাঙে শুতে যায়নি। আমার কাছেই শুয়েছিল। সকালে সেই কাপড়েই শিকারে চলে গেছে।

হা-আ-আ-আ–

জীর্ণ বুকখানার ওপর প্রচণ্ড একটা চাপড় মেরে আর্তনাদ করে উঠল বুড়ি বেঙসানু, কী সব্বনাশ! তুই মাগী এই বস্তিটাকে শেষ করবি। তোর জন্যে আমরা সব সাবাড় হয়ে যাব। মাগী, জানিস না, শিকারে যাওয়ার আগে সোয়ামীর সঙ্গে শুতে নেই? মাগীর ফুর্তি কত! হা-আ-আ-আ—

সদ্দার, ও সদ্দার–অতল খাদ থেকে জটিল বনের মধ্যে দিয়ে ধাক্কা খেতে খেতে ওপরের দিকে উঠে এল শব্দগুলো। খাদের তলা থেকে সারুয়ামারুরা ডাকাডাকি করছে।

দাঁড়া শয়তানের বাচ্চারা। গর্জে উঠল খাপেগা।

খিস্তির কৌটোর ঢাকনা খুলে গিয়েছে বুড়ি বেঙসানুর। বিধ্বস্ত দাঁতগুলো কড়মড় করে উঠেছে তার। ঘোলাটে চোখ দুটো থেকে দু’টি অগ্নিপিণ্ড যেন ছিটকে আসতে চাইছে সালুনারুর দিকে। সমানে চেঁচিয়ে যাচ্ছে বুড়ি বেঙসানু, ইজা হান্টসা সালো। মাগী শয়তানী!

এতক্ষণ চুপচাপ সব শুনছিল সালুনারু। এবার সে ফোঁস করে উঠল, বুড়ি মাগী, চুপ কর। ইজা রামখো! মরেছে, আমার সোয়ামী মরেছে। তোদের কী?

বলে কী সালুনারু! বিশ্বাসঘাতকতা করছে না তো কান দুটো! রেজু আনিজার কাছে এ তো কদর্য অপরাধ। জঘন্য পাপাঁচরণ। দেহমন অশুচি করে শিকারে গিয়ে যে অন্যায় করেছে। রেঙকিলান, তাতে সমস্ত নাগা পাহাড় রেজুর ক্রোধাগ্নিতে ছারখার হয়ে যাবে না? খাপেগা তাকাল বুড়ি বেঙসানুর দিকে। বুড়ি বেঙসানু নির্নিমেষে সালুনারুর দিকেই তাকিয়ে ছিল। হয়তো ভাবছিল কোত্থেকে পাহাড়ী মেয়ে সালুনারু এতখানি দুঃসাহস সঞ্চয় করল! রেজু আনিজা তার স্বামীকে খাদের মধ্যে ফেলে দিয়ে পাপের শাস্তি দিয়েছে। পাহাড়ের টিলায় টিলায় ঘা খেতে খেতে অতলে গিয়ে তিলে তিলে মরেছে রেঙকিলান। তবু সালুনারু এতখানি তেজ পেল কোত্থেকে?

সালুনারুর গলায় নীল শিরাগুলি ফুলে ফুলে উঠছে। পিঙ্গল চোখ দু’টি ধকধক করছে। আর সমানে গালাগাল দিয়ে চলেছে সে।

আচমকা সেঙাই-এর হাত থেকে বর্শাটা কেড়ে নিল বুড়ো খাপেগা। তারপর বিদ্যুৎ ঝিলিকের মতো আকাশের দিকে উঠে গেল তার হাতখানা। গলাটা চাপা হুঙ্কারে গমগম করে উঠল, এই শয়তানী বস্তিতে থাকলে বস্তি জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে। ওর রক্ত দিয়েই রেজু আনিজার রাগ কমাব।

বর্শাটা আকাশের দিকেই রয়ে গেল। বুড়ো খাপেগা সেটা ছোঁড়ার আগেই পাশের খাসেম ঝোপে লাফিয়ে পড়ল সালুনারু। সেখান থেকে দূরন্ত গতিতে একটি উলঙ্গ নারীদেহ উপত্যকার ঘন বনে অদৃশ্য হয়ে গেল।

চিৎকার করে উঠল বুড়ি বেঙসানু, ধর সেঙাই, শয়তানীকে ধর। বর্শা দিয়ে ফোড়। সাবাড় করে ফেল।

নিশ্চল শিলামূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে সেঙাই। একেবারেই নিস্পন্দ সে। এতটুকু চাঞ্চল্য নেই তার সারা দেহে। নিথর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তাকিয়েই আছে উপত্যকার দিকে। ওই। দিকেই ঘন বনের মধ্যে সালুনারুর নগ্ন দেহটা মিলিয়ে গিয়েছে।

বর্শাটা নামিয়ে বুড়ো খাপেগা হুমকে ওঠে, আচ্ছা মাগী, একবার বস্তিতে এসে দেখিস, টুকরো টুকরো করে কাটব।

খাপেগার ঘোলাটে চোখ দু’টি দপদপ জ্বলতে লাগল।

.

০৭.

আর কয়েকদিন পরেই জা কুলি উৎসব শুরু হবে পাহাড়ী জনপদগুলোতে। তারই প্রস্তুতি চলছে কেলুরি গ্রামে। গানবাজনা হবে, মোষ বলি দিয়ে সারা গ্রামের লোক ভোজ খাবে। খুশিতে, হুল্লোড়ে, রোহি মধুর মৌতাতে, নাচগানের মধুর নেশায় পাহাড়ী মানুষগুলো মাতাল হয়ে যাবে। জা কুলি উৎসবের দিনরাত্রি, প্রতিটি মুহূর্ত এই পাহাড় ঝুঁদ হয়ে থাকবে।

কাল রাতে উত্তরের পাহাড়চূড়া ঘিরে বরফ পড়েছিল। ঘন সবুজ চক্ররেখার ওপর তুষারের সাদা একটা স্তর এখনও স্থির হয়ে রয়েছে। তার ওপর এসে পড়েছে সোনালি রোদ।

মোরাঙের বাঁশের মাচানে শুয়ে শুয়ে উত্তরের পাহাড়চূড়া দেখতে দেখতে সেঙাই-এর মনে আমেজ ঘন হয়। জা কুলি মাসে এখন অখণ্ড অবসর। শুয়ে শুয়ে মধুর আলস্যে দিনগুলো এই পাহাড়ী জনপদের ওপর দিয়ে খুশির মিছিল হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে।

উত্তর পাহাড়ের বরফ দেখতে দেখতে মেহেলীর কথা মনে পড়ে সেঙাই-এর। বুকের ভেতরটা তোলপাড় হয়ে যায়। দ্রুত বাঁশের মাচানের ওপর উঠে বসল সেঙাই। মেহেলী তার বন্য পাহাড়ী মনকে দিনরাত উথলপাথল করছে, তার আধফোঁটা চেতনাকে অস্থির করে দিচ্ছে। বার বার।

ইতিমধ্যে পাশের মাচান থেকে উঠে এসেছে ওঙলে। সারা গায়ে দড়ির লেপ জড়ানো। ওঙলে বলল, কিরে সেঙাই, কী করছিস?

মেহেলীর কথা ভাবছি। সালুয়ালাঙের হুই ছুঁড়িটার জন্যে মনটা কেমন জানি করে।

এর আগেই ওঙলেকে মেহেলীর কথা বলেছে সেঙাই।

হু-হু–বুঝতে পেরেছি। ওঙলের মুখখানা গম্ভীর হল, পিরিতে পড়েছিস। কিন্তু মোরাঙে বসে এসব কথা বলা ঠিক নয়। সদ্দারের কানে গেলে মুশকিলে পড়ব।

ঠিক বলেছিস, কিন্তু হুই শয়তানীর জন্যে মনটা বেসামাল হয়ে গেছে। কী করা যায় বল তো? একটা বুদ্ধি বাতলে দে। আরো দু-তিন দিন গেলাম হুই ঝরনাটার কাছে, কিন্তু ছুঁড়িটা আজকাল আর আসে না। মন ভীষণ খারাপ হয়ে রয়েছে ওঙলে। গলাটা ব্যাজার শোনায় সেঙাই-এর।

চল, এখন বাইরে চল। বাঁশ কাটতে যাব নদীর কিনারে। আর কদিন পরেই জা কুলির গেন্না শুরু হবে। খুলি (বাঁশি) বানানো দরকার।

বাঁশের মাচান থেকে নিচে নামল সেঙাই। দড়ির লেপটা সারা গায়ে ভালো করে জড়িয়ে মোরাঙের বাইরে চলে এল।

সূর্যটা পুবের পাহাড়ের ওপর আরো স্পষ্ট হয়েছে। তার সোনালি আলোতে এখন কমলা রঙের আভাস দেখা দিয়েছে। দূরের কেসুঙে কেসুঙে, পাথরের চত্বরে বসে মেয়েরা লেপ বুনছে, জঙগুপি কাপড়ে রং দিচ্ছে, কেউ কেউ হরিণের ছাল ছাড়াচ্ছে ছুরি দিয়ে।

ইতিমধ্যে আরো কয়েকটি জোয়ান ছেলে বেরিয়ে এসেছে মোরাঙ থেকে। তাদের মধ্যে একজন বলল, কি রে সেঙাই, কোথায় যাচ্ছিস?

একটু ঠাকুমার সঙ্গে দেখা করে আসি।

যা। আমরা নদীর কিনারে বাঁশ কাটতে যাচ্ছি। খুলি (বাঁশি) আর খুঙ (দোতারার মতো বাদ্যযন্ত্র বানাতে হবে। আর তো মোটে কয়েকটা দিন, তার পরেই জা কুলির গেন্না শুরু হবে।

তোরা যা। আমি আর ওঙলে একটু পরে যাচ্ছি। সেঙাই বলল।

হো-ও-ও-ও-আ-আ–

হইহই করতে করতে টিজু নদীর দিকে চলে গেল জোয়ান ছেলেরা। তাদের মুঠিতে বর্শা রয়েছে, ঝকঝকে দা রয়েছে, তীরধনুক রয়েছে।

জোহেরি কেসুঙের দিকে আসতে আসতে ওঙলে বলল, কী ব্যাপার রে সেঙাই? ঘরে যাচ্ছিস যে!

হু-হু। গোলাকার কামানো মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে হাসল সেঙাই। লাল লাল অপরিষ্কার দাঁতগুলো বেরিয়ে পড়ল তার, বল তো ওঙলে, কী জন্যে এলাম?

তা আমি কী করে জানব?

চল, দেখলে বুঝতে পারবি।

এখনই বল, নইলে ভালো লাগছে না আমার। আপোটিয়া। বিন্দু বিন্দু বিরক্তি ঝরে পড়ল ওঙলের কণ্ঠ থেকে, যা বলবি, মন সাফ করে বলবি। তা নয়, পরে জানবি! তুই যেন কেমন ধারা হয়ে যাচ্ছিস সেঙাই!

বুড়ি বেঙসানু বাইরের ঘরে বসে বেতের আখুতসা (চাল রাখার পাত্র) বুনছিল। দু’পাশ থেকে দু’টি কাঁকড়ার দাঁড়ার মতো তাকে চেপে ধরেছে ফাসাও আর নজলি। তার নাতি নাতনি।

সেঙাই আর ওঙলে বাইরের ঘরে চলে এল। সেঙাইদের দেখে কল কল করে উঠল ফাসাও আর নজলি। তারপর ঝাঁপিয়ে পড়ল ওদের ঘাড়ের ওপর।

ফাসাও বলল, দাদা, আমাকে এবার জা কুলি গেন্নার দিনে একটা খুলি (বাঁশি) দিবি?

নজলি বলল, আমাকে কিন্তু খুঙ বানিয়ে দিতে হবে। দিবি তো?

দেব দেব। এবার সরে বোস হুই দিকে।

কাঁধের ওপর থেকে ফাসাওদের ঝেড়ে ফেলল সেঙাই আর ওঙলে।

বুড়ি বেঙসানু বলল, কি রে সেঙাই, তোর পাত্তাই নেই। তোর বাপ সিজিটো শয়তানটা সেই যে কোহিমা গেছে, ঘরে ফেরার আর নাম নেই। ওরে শয়তানের বাচ্চা, ঘরে এক ফোঁটা নিমক নেই। একবার তোকে কোহিমায় যেতে হবে। নইলে নিমক ছাড়া ভাত গিলবি কী করে?

থাম, থাম ঠাকুমা। নিমক আনতে আমি পারব না। চোখেমুখে বিরক্তি ফুটে বেরুল সেঙাইর, হরিণের ছাল, মোষের শিং, বাঘের দাঁত হুই সারুয়ামারুকে দিয়ে দিস। সে নিমক এনে দেবে।

না না, ওর হাতের নিমক খাব না। শয়তানের বাচ্চা সূর্যের নামে যা তা বলেছে সেদিন। বুড়ি বেঙসানু হেজে যাওয়া চুলগুলো ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে বলল, ওকে সেদিন বর্শা দিয়ে কুঁড়লে শান্তি হত। ও হল আস্ত শয়তানের বাচ্চা

বুড়ি বেঙসানুর মুখ থেকে শীতের এই হিমাক্ত সকালে কদর্য গালাগালি বেরিয়ে এল। গর্জন করে উঠল সেঙাই, থাম বলছি বুড়ি মাগী, নইলে গলা টিপে ধরব। আগে খেতে দে। বড় খিদে পেয়েছে।

এখনও থামেনি বুড়ি বেঙসানু। জল তালে সমানে বকবক করে চলেছে। আচমকা বাঁশের দেওয়াল থেকে একটা বর্শা টেনে বার করল সেঙাই, তারপর সমস্ত কেসুঙটাকে কাঁপিয়ে হুমকে উঠল, থামলি, থামলি! নইলে বর্শা দিয়ে তোকে আজ ফালা ফালা করব। থাম শয়তানী।

নিমেষে বুড়ি বেঙসানুর জিভের বাজনা থেমে গেল। দ্রুত শীর্ণ হাতের মুঠি থেকে অসমাপ্ত বেতের আখুতসাখানা নামিয়ে রেখে ভেতর দিকের ঘরে চলে গেল। একটু পরেই একটা কাঠের বাসনে খানিকটা ঝলসানো বুনো মোষের মাংস আর বাঁশের পানপাত্রে খানিকটা রোহি এনে নামিয়ে রাখল সেঙাইদের সামনে। তারপর অস্ফুট গলায় তর্জন করে উঠল, আপোটিয়া, আপোটিয়া (মর-মর)–

পুরোপুরি ঝলসানো নয়, কঁচা কাঁচা সেই অর্ধদগ্ধ মাংস লাল দাঁতের পাটির ফাঁকে ফেলে পরিত্রাহি চিবোতে লাগল সেঙাই আর ওঙলে। মাঝে মাঝে দু-এক চুমুক রোহি মধু গিলে রসনাকে বেশ তরিজুত করে রাখতে লাগল।

মেজাজটা এবার অনেকখানি প্রসন্ন হয়েছে। সেঙাই বলল, তোর সঙ্গে একটা কথা বলতে এলাম ঠাকুমা।

কী কথা রে টেফঙের বাচ্চা? রক্তচোখে তাকাল বুড়ি বেঙসানু।

আমি বিয়ে করব। আমার একটা বউ চাই। না হলে রাত্তিরে মোরাঙে একা একা ঘুম আসে না। বড় বড় গজদাঁতের ফাঁকে একটা মোটা হাড়কে কায়দা করতে করতে বলল সেঙাই।

ইতিমধ্যে আবার বেতের আখুতসাটা হাতের মুঠিতে তুলে নিয়েছে বুড়ি বেঙসানু, বিয়ে করবি, সে তো ভালো কথা। তোর বাপ কোহিমা থেকে আসুক। তারপর তোর শ্বশুরকে টেনেন্যু মিঙ্গেলু (কন্যাগণ) পাঠিয়ে দেব।

আমার বউ কে? শ্বশুর কে?

অনেক ছোটবেলা থেকে তোর বউ ঠিক হয়ে আছে। থেমাকেডিমা বস্তির মেয়ে লেটিনোকটাঙের সঙ্গে তোর বিয়ে হবে। ওদের বংশও বেশ বনেদি। নগুসেরি বংশ। আর তোর শ্বশুরের নাম হল সাঞ্চামবাতা। কি রে, খুশি তো? দু’টি ধূসর চোখের মণিতে কৌতুকের আলো জ্বালিয়ে তাকাল বুড়ি বেঙসানু, বউ এলে আর একা একা থাকতে হবে না। তোর বাপ কোহিমা থেকে ফিরলেই তোর বিয়ে দেব।

আচমকা এই বাইরের ঘরটা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠল সেঙাই, না না, হুই লেনটিনোকটাঙকে আমি বিয়ে করব না। এই বস্তিতে থেমাকেডিমা বস্তির কেউ এলে একেবারে বর্শা দিয়ে কুঁড়ে মারব। খুব সাবধান।

শঙ্কার কয়েকটি রেখা ফুটল বুড়ি বেঙসানুর মুখেচোখে, লেনটিনোকটাঙকে বিয়ে করবি না তো, কাকে বিয়ে করবি?

মেহেলীকে বিয়ে করব।

মেহেলী আবার কে?

ওঙলে বলল, সালুয়ালাঙ বস্তির মেয়ে। ওদের বংশ হল পোকরি।

ধক করে একটা মশালের মতো জ্বলে উঠল বুড়ি বেঙসানু, ও, সেই নিতিৎসুদের বংশ! সেঙাই-এর ঠাকুরদাকে যারা মেরেছে তাদের মেয়ে? কি রে ওঙলে শয়তান?

হু-হু– মাথা নাড়ল ওঙলে।

দেখব কত বড় তাগদ সেঙাই-এর। হুই বংশের মেয়ে কেড়ে আনতে গিয়ে মরেছে আমার সোয়ামী। তার নাতির আবার শখ হয়েছে। নির্ঘাৎ মরবে সেঙাই রামখোটা। বুড়ি বেঙসানু তারস্বর চিৎকারে জোহেরি কেসুঙের সকালটাকে ছত্রখান করে ফেলল।

বর্শার খোঁচা লেগে যেমন করে বুনো মোষ ফুঁসে ওঠে, ঠিক তেমন করেই ফুঁসছিল সেঙাই। লাল লাল দু’পাটি দাঁত তার কড়মড় করে উঠল, তুই দেখিস বুড়ি মাগী, আমি তোর সোয়ামী । জেভেথাঙ না। আমি সেঙাই। হুই পোকরি বংশের মেহেলীকে লড়াই করে এনে আমি বিয়ে করব। হু-হু।

দৌড়ে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এল বুড়ি বেঙসানু। চারিদিকে ঘুরে ঘুরে সে চিৎকার করতে লাগল, এই সারুয়ামারু, এই নড্রিলো, এই গ্যিহেনি, এই ইটিভেন, তোরা সব শোন। টেফঙের বাচ্চা হুই সেঙাই পোকরি বংশের মেয়ে মেহেলীকে কেড়ে এনে বিয়ে করবে। শোন তোরা, শয়তানের মদ্দানির কথাটা শোন।

আশেপাশের কেসুঙ থেকে অর্ধ-উলঙ্গ মেয়েপুরুষের মিছিল নেমে এল জোহেরি কেসুঙে। বুড়ি বেঙসানুর চারপাশে অনেকগুলো কৌতূহলী কণ্ঠস্বর শোনা গেল, কি লো, কী হল আবার? সেঙাইর বিয়ে? বেশ তো।

বিয়ের ভোজে সম্বরের মাংস খাওয়াতে হবে কিন্তু।

ওরে শয়তানের বাচ্চারা, ওরে টেফঙের বাচ্চারা, ভোেজ গিলতে এসেছিস? ভাগ, ভাগ। ইজাহান্টসা সালো। বুড়ি বেঙসানু একটানা চিৎকার করে চলল, ভোজ খাবে সব! খাবি খাবি, হুই সেঙাইর মাংস দিয়ে ভোজ খাবি। ওর ঠাকুরদা নিতিৎসুর জন্যে মরেছে। ও আবার যাবে মেহেলীকে আনতে। হুই পোকরি বংশের মাগী! ঠিক মরবে শয়তানটা। তখন ওর মাংস দিয়ে ওর বিয়ের ভোজ খাস।

আচমকা বাইরের ঘর থেকে একটা বর্শা উল্কাবেগে বেরিয়ে এল। আর এসে গেথে গেল বুড়ি বেঙসানুর কোমরের ওপর। আর্তনাদ করে পাথরের ওপর লুটিয়ে পড়ল সে। খানিকটা লাল টকটকে রক্ত ফিনকি দিয়ে কেসুঙটাকে ভিজিয়ে দিল।

বাইরের ঘরে একটি উত্তেজিত কণ্ঠস্বর গর্জন করে চলল সমানে। সেঙাই চেঁচাচ্ছে, দেখিস বুড়ি শয়তানী, হুই মেহেলীকে আমি বিয়ে করতে পারি কিনা। আমি জেভেথাঙের মতো মাগী না, কুত্তা না। দেখিস–

.

০৮.

শীতের মাঝামাঝি জা কুলি উৎসব শেষ হল ছোট্ট পাহাড়ী গ্রাম কেলুরিতে। এই মাসটাকে পাহাড়ী মানুষেরা বলে জা কুলি সু।

শীতের প্রথম দিকে জমিগুলোকে রিক্ত করে ফসল উঠেছিল। সিঁড়ির মতো ধাপে ধাপে নিচের দিকে নেমে গিয়েছে আবাদের খেত। নীরস পাথরের ওপর যেখানেই একটু মাটি রয়েছে সেখান থেকেই ফসলেরা লক্ষ শিকড় বিস্তার করে প্রাণরস শুষে নেয়। শীতের প্রথম দিকে শস্য উঠে যাবার পর খেতগুলো অনাবৃত আকাশের নিচে পড়ে পড়ে রোদ পোহায়। সূর্যের উত্তাপে সোনালি খড় শুকিয়ে বারুদের মতো হয়ে থাকে। জোয়ারের শস্যহীন গোড়াগুলো তীক্ষ্ণধার হয়ে যায়। জমির ফাটলের মুখ থেকে লকলকিয়ে ওঠে পাহাড়ী ঘাসের অঙ্কুর। উঁকি দেয় বুনো লতার আশ্চর্য সবুজ মাথা।

প্রথম শীতের ফসলবতী জমি মাঘের এই হিমাক্ত দুপুরে অদ্ভুত রকমের হতশ্রী। দিকে দিকে তার শ্মশান-শয্যা যেন বিকীর্ণ হয়ে রয়েছে।

দক্ষিণ পাহাড়ের এই উপত্যকা অনেকটা সমতল। জমিগুলো বিশাল একটা ঢেউ-এর মতো দোল খেয়ে খেয়ে দূরের মালভূমিতে গিয়ে মিশেছে।

সামনের ঘন বন ছুঁড়ে ফসলের খেতে এসে দাঁড়াল অনেকগুলো মানুষ। নারী আর পুরুষ, দুই-ই রয়েছে তাদের মধ্যে। কেউ কেউ একেবারেই উলঙ্গ, আর কারো দেহে খুব অল্প আচ্ছাদন।

সামনের দিকে রয়েছে সেঙাই, ওঙলে, পিঙলেই, এমনি আরো কয়েকজন। সকলের মুঠিতে পেন্য কাঠের জ্বলন্ত মশাল। কেউ কেউ বর্শাও নিয়ে এসেছে। এদিকে সেদিকে ঘুরছে পোষা শুয়োর। গোটাকয়েক বিচিত্র রঙের শিকারি কুকুরও এসেছে সেঙাইদের সঙ্গে।

শীতের আকাশ থেকে নরম রোদ নেমে এসেছে। উপত্যকার ওপর দুপুরটা যেন রোহি মধুর নেশার মতো ঝিম মেরে আছে।

সেঙাই বলল, জা কুলির পরবে এবার তেমন আনন্দ হল না।

সকলেই মাথা নেড়ে নেড়ে সায় দিল।

কানের লতিতে চাকার মতো একজোড়া পেতলের এসে দুল নেড়ে একটি মেয়ে বলল, হু-হু, এবার রেঙকিলানটা নেই। বড় ফুর্তিবাজ ছেলে ছিল সে।

সকলেই সমস্বরে সায় দিল, হু-হু, ঠিক কথা। তির্যক চোখে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে ছিল সেঙাই, কি লো হেজালি, রেঙকিলানের জন্যে দেখি পরান উথলপাথল করছে। তলায় তলায়। পিরিত জমিয়েছিলি নাকি?

হেজালি ফোঁস করে উঠল, আমার অমন মরদের দরকার নেই। একটা মাগী তো ছিল রেঙকিলানের। ঘরে যার বউ ছিল, আমি কেন তার সঙ্গে পিরিত করতে যাব? ওই সব মাগী চাখা মরদে আমার চলবে না। আমার টাটকা জোয়ান নাগর চাই।

টাটকা জোয়ান নাগর তোর জন্যে একেবারে আকাশ থেকে লাফিয়ে নামবে! কুৎসিত ভঙ্গি করে বলল সেঙাই।

হেজালি ফণা তুলল যেন, একটা মানুষ ছিল, তার কথা বলেছি। সে তোর আমার, সকলের ছিল লাগোয়া (খেতের সঙ্গী)। ফের হুই পিরিতের কথা যদি বলবি, বর্শা দিয়ে তোর মুখখানা এফোঁড় ওফোঁড় করে দেব।

কী বললি? হুমকে উঠল সেঙাই।

এবার কোনো উত্তর দিল না হেজালি।

পিঙলেই বলল, থাম তোরা। এদিকে মশাল যে নিবে গেল। আয়, খেতে ফসলের গোড়া পুড়িয়ে সাফ করতে হবে। তারপর জোয়ারের দানা পুঁততে হবে। খামোখা ঝগড়া করছিস কেন?

সকলে খেতের মধ্যে নেমে এল। তারপর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। কুকুরগুলো স্বাধীন আনন্দে উপত্যকার ওপর ছোটাছুটি করে বেড়াতে লাগল। ফসল কেটে নেবার পর ধানের যে গোড়াগুলো রয়েছে তার মধ্যে মুখ গুঁজে খুঁজে শুয়োরগুলো দু-এক কণা শস্যের সন্ধানে হন্যে হয়ে ঘুরতে শুরু করেছে।

বাঁশের টুকরো পুঁতে জমির সীমানা ঠিক করা রয়েছে। যে যার সীমানায় নেমে গিয়েছে। যাদের মশাল নিবে গিয়েছিল তারা আবার সঙ্গীদের মশাল থেকে নতুন করে আগুন ধরিয়ে নিয়েছে।

হো-ও-ও-ও–ও–

খুনোর (আবাদী জমি) দিকে দিকে আগুন জ্বলে উঠল। ধান আর জোয়ারের শস্যহীন অংশগুলো শুকিয়ে শুকিয়ে উন্মুখ হয়ে ছিল। মশালের ছোঁয়ায় সেগুলো দাবানল হয়ে জ্বলে উঠল। ফসলের খেতে মধ্যশীতের এই দুপুরে চিতাশয্যা রচিত হল।

হো-ও-ও-ও–ও–

আকাশের দিকে দিকে উঠে যাচ্ছে পাহাড়ী জোয়ান-জোয়ানীর উল্লসিত শোরগোল। উঠে যাচ্ছে লিকলিকে আগুনের শিখা আর রাশি রাশি ধোঁয়া।

হো-ও-ও-ও–ও—

ক্রমশ কোলাহলটা তীব্র হয়ে উঠছে।

হঠাৎ কে যেন গেয়ে উঠল :

আনা এচাঙচো লোচো
সেনা হামবঙ ইসোনিল

সঙ্গে সঙ্গে উপত্যকার দিকে দিকে তার প্রতিধ্বনি হতে লাগল। অজস্র কণ্ঠে সুর জেগে উঠল। আর সেই ছন্দিত আর সুরেলা সঙ্গীত বাতাসে দোল খেতে খেতে উপত্যকার ওপর দিয়ে মালভূমির দিকে চলে গেল। তারপর সেখান থেকে হালকা আমেজের মতো দক্ষিণ পাহাড়ের চূড়ায় ভেসে গেল।

আনা এচাঙচা লোচো,
রেচিঙ হামবঙ ইসোনিল।
আনা এচাঙচো লোচো,
ইজেম হামবঙ ইসোনিল।

ফসলের জমিটা এখন কালো হয়ে গিয়েছে। ধান আর জোয়ারের শস্যহীন অংশগুলোর ছাই বাতাসে উড়ে উড়ে বেড়াতে শুরু করেছে। শীতের এই দুপুর, এই রোদ, পাহাড়ী জমিতে এই আগুনের উৎসব, আর এই গান–সব মিলিয়ে এক বিচিত্র আবহাওয়ার সৃষ্টি হয়েছে এই উপত্যকায়।

একসময় গান থামল। আগুন নিভল। ঝকঝকে রোদ ম্লান হল। আবাদী জমির দিকে দিকে ক্ষতের মতো ফুটে বেরুল কালো কালো চিহ্ন। আজকের মতো কাজ শেষ হল।

খেত থেকে উঠে সকলে আবার বনের প্রান্তে এসে দাঁড়াল। সকলের মুখে কণা কণা ঘাম ফুটে বেরিয়েছে। দু-একজন প্রতিবেশী একটি গ্রামের নাগাদের দেখাদেখি সারা গায়ে উল্কি এঁকেছিল। বুক-পেট, হাত-পিঠ, কপাল-গাল শরীরের প্রতিটি অংশে আদিম কারুকলা ফুটিয়ে তুলতে বিন্দুমাত্র কসুর করেনি। নানারকম ছবি। নরমুণ্ড, বুনো মোষের মাথা, হাতির দাঁত। মনের আনন্দে শিল্পী তার তুলি বুলিয়ে গিয়েছে। সেই উল্কিগুলোর ওপর দর দর করে ঘাম। নেমে আসছে।

কে একজন বলল, আসছে মাসে ফসল পাহারার জন্যে মাঠে মাঠে থে (জমির ঘর) তৈরি করতে হবে। তারপর ঝুম আবাদের জন্যে জঙ্গল পোড়াতে হবে। এবার খালি কাজ আর কাজ। একেবারে সেই নগদা উৎসব পর্যন্ত আর জিরোবার ফাঁক নেই।

ওঙলে বলল, কাজ তো জনমভোর আছেই। যেতে দে ও-সব কথা। বস্তিতে ফিরবি তো। সব? আজ নাচগানের একটা ব্যবস্থা করলে মন্দ হয় না, কী বলিস সেঙাই?

উৎসাহিত হয়ে উঠল সেঙাই, খুব ভালো হবে। চল বস্তিতে। জোরি কেসুঙে নাচগান হবে আজ। রাজি তো? কি রে সারুয়ামারু, তোর বাড়ির উঠোনে?

সারুয়ামারু ভারি ফুর্তিবাজ। খুশির গলায় সায় দিল সে, নিশ্চয়ই।

হো-ও-ও-ও–ও-সবাই হই হই করে উঠল।

ওঙলে বলল, তোর বাড়ির উঠোনে নাচগান হবে। রোহি মধু আর শুয়োরের মাংস খাওয়াতে হবে কিন্তু।

নিশ্চয়ই খাওয়াব।

হো-ও-ও-ও–

উপত্যকার চাষের জমি থেকে নিবিড় বনের মধ্যে ঢুকল সবাই। নাচগান, তার সঙ্গে বাঁশের পানপাত্র ভরে রোহি মধু আর শুয়োরের মাংস। সকলে হল্লা শুরু করে দিয়েছে। তাদের চিৎকারে সন্ত্রস্ত হয়ে উড়ে যাচ্ছে গুটসুঙ পাখির ঝাঁক। আখুশু ঝোঁপের ফাঁকে ফাঁকে হরিণের শিঙ আর ময়ালের মাথা চকিতে দেখা দিয়েই অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। খারিমা পতঙ্গের দল আতঙ্কে ঠকঠক শব্দ করছে।

পৃথিবীর প্রাণশক্তির আদিম সুশ্যাম প্রকাশ এই নিবিড় অরণ্যে। সেই প্রাণশক্তি এই নাগা পাহাড়ে দুর্দম, দুর্বার। যেখানে একটুকু ফাঁক পেয়েছে সেখানেই এক জৈব প্রেরণায় মাথা তুলেছে শ্যামাভ অঙ্কুর। সেই অঙ্কুরই একটু একটু করে শাখা বিস্তার করেছে, পাতার জিভ দিয়ে রোদবৃষ্টির আসব শুষে শুষে একদিন বনস্পতি হয়ে উঠেছে। তারপর নাগা পাহাড়ের ধমনীর ওপর গুরুভার অস্বস্তির মতো চেপে বসেছে। তার তলায় বিছিয়েছে হিমছায়া। সে ছায়ায় হিংস্র শাপদের অবাধ লীলাভূমি এই ভীষণ অরণ্য। তাদের ওপর প্রভুত্বের অধিকারে এসেছে মানুষ। ভয়ঙ্কর আর এক প্রাণশক্তির প্রকাশ। অতিকায় কুড়ালের ফলায় অরণ্য সংহার করে বানিয়েছে জনপদ। বর্শার মুখে মুখে হিংস্র জন্তুদের নির্মূল করে তার অধিকারের সীমানা প্রসারিত করে চলেছে। দূরে দূরে ছোট ছোট গ্রাম নজরে আসে। নিচু নিচু ঘর, খড়ের চাল, বাঁশের দেওয়াল। মোটা মোটা খাটসঙ গাছের ডালেও অনেক ঘর। এই বন থেকে যতটুকু সুবিধা পাওয়া যায়, সবটুকু আদায় করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি মানুষেরা। মাঝে মাঝে বাঘনখের আঁচড়ের মতো ফালি ফালি পথ। অবিরাম চলতে চলতে পথগুলো আপনা থেকেই তৈরি হয়েছে। এদের পেছনে কোনো সতর্ক অধ্যবসায়ের ইতিহাস নেই।

বনবাদাড় ডলে মুচড়ে দুলতে দুলতে এগিয়ে চলেছে পাহাড়ী মানুষগুলো। চড়াই বেয়ে ওপরের দিকে উঠছে তারা। হাতের মুঠিতে বর্শার ফলাগুলো দোল খেয়ে চলেছে।

হো-ও-ও-ও–ও–

আচমকা দাঁড়িয়ে পড়ল সেঙাই। তার দৃষ্টিটা গিয়ে পড়েছে উত্তর পাহাড়ের চড়াইয়ের দিকে। বিকালের শেষ রোদ ঢলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে সেখানে। হঠাৎ কয়েক দিন আগের একটা বিকেল স্মৃতিতে ফুটে উঠল। সেদিন শিকারে বেরিয়েছিল সে আর রেঙকিলান। সেদিন ওই উত্তর পাহাড়ের এক নিঝুম ঝরনার পাশে এক নগ্ন নারীতনুর রেখায় রেখায় এক অনাস্বাদিত পৃথিবীর আমন্ত্রণ সে পেয়েছিল। টিজু নদী পার হয়ে পোকরি বংশের মেয়ে মেহেলী এসেছিল এপারের ঝরনার জলে ধারাস্নানে। মেহেলী পোকরি বংশের মেয়ে, তাদের শত্রুপক্ষ। তার ঠাকুরদা জেভেথাঙের মুণ্ডু ওরা ছিঁড়ে নিয়ে গিয়েছিল অনেক কাল আগে। বুড়ো খাপেগা মোরাঙে বসে সে গল্প তার কাছে বলেছে। কিন্তু মেহেলী! বিকেলের মায়াবী আলোতে নিঃশব্দ ঝরনার পাশে এক নগ্ন নারীতনু। আদিম মানবী। সেঙাই-এর রক্তে রক্তে কেমন একটা বিভ্রান্তি চমক দিয়ে উঠল। সমস্ত স্নায়ুমণ্ডলীতে কামনা বর্শামুখের মতো ঝিলিক দিল।

সেঙাই-এর দেখাদেখি সকলে দাঁড়িয়ে পড়েছিল।

সেঙাই বলল, তোরা সব বস্তিতে ফিরে যা। আমি উত্তরের পাহাড়ে যাব। বস্তিতে ফিরব। কিছুক্ষণ পর।

নাচগানের কী হবে রে শয়তান? ওঙলের গলায় রীতিমতো বিরক্তি।

তোরা ব্যবস্থা কর। নাচগান শুরু হবার আগেই চলে আসব।

আর দাঁড়াল না সেঙাই। পাহাড়ের গা বেয়ে বেয়ে মালভূমির দিকে তর তর করে নামতে লাগল। উত্তরের পাহাড়ে যেতে অনেকটা সময় লাগবে। কেন যেন তার মনে হচ্ছে, হয়তো মেহেলী এসেছে সেই ঝরনার ধারে।

হো-ও-ও-ও–ও—

পাহাড় আর বন কাঁপিয়ে বাকি সকলে গ্রামের দিকে চলে গেল।

দুলতে দুলতে নিচের মালভূমিতে নেমে এল সেঙাই। একদিকে এক নগ্ন নারীতনু। মেহেলী। আর একদিকে তার ঠাকুরদাকে হত্যা করেছে পোকরি বংশ। প্রতিহিংসা আর কামনা। মৃত্যুমুখ। বর্শা আর রমণীয় নারী–আদিম প্রাণের কাছে দু’টিই সত্য। নির্মম সত্য। ভয়ঙ্কর সত্য। এ দুয়ের মধ্যে দোল খেতে খেতে এগিয়ে চলেছে সেঙাই।

একসময় নিঃশব্দ ঝরনাটার পাশে এসে দাঁড়াল সে। চারিদিকে একবার ভালো করে তাকাল। কিন্তু সেদিনের মতো আজ আর কেউ নেই এখানে। সেদিন মেহেলী ছিল। আদিম মানবীর অনাবরণ রূপ দেখতে দেখতে আবিষ্ট হয়ে গিয়েছিল সেঙাই। বর্শা সে তুলে ধরেছিল সত্যি, কিন্তু তার ফলায় হত্যার কোনো ইচ্ছা হয়তো ছিল না। এক নারীর আত্মসমর্পণ, এই নিয়েই সেদিন তৃপ্ত হয়েছিল সেঙাই। কিন্তু আজ? সেদিন সে কি জানত, বর্শার ফলায় শুধু খোনকেকে শিকার করে আসেনি, সে নিজেও শিকার হয়ে গিয়েছিল। কামনার এক বর্শা দিয়ে তাকে শিকার করে গিয়েছিল মেহেলী। লোহার বর্শা দিয়ে একবার আঘাত করা যায়, দুবার আঘাত করা যায়, কিন্তু মেহেলী তার নগ্ন নারীদেহের রূপ দিয়ে, তার নির্বাক আত্মসমর্পণ দিয়ে অহরহ তার দেহমনকে আঘাত দিয়ে চলেছে। আঘাতে আঘাতে মেহেলী হয়তো বিকল করে দিয়ে গিয়েছে সেঙাই-এর অস্ফুট পাহাড়ী চেতনা।

এখানে কয়েক দিন আগে সেই আশ্চর্য বিকেলে একটা অবাস্তব স্বপ্ন দেখেছিল কি সেঙাই? এই পাহাড়ে, এই বনভূমিতে মেহেলী নামে কি কোনো নারীর অস্তিত্বই ছিল না?

তা হতে পারে না। মেহেলী আছে। আর সবচেয়ে যেটা নির্মম সত্য সেটা সেঙাইর স্নায়ুমণ্ডলীতে ঝড়ের মতো তাণ্ডব শুরু করে দিয়েছে এই মুহূর্তে। মেহেলীকে তার চাই। তার প্রতিটি ইন্দ্রিয় দিয়ে, প্রতিটি উদগ্র রক্তকণা দিয়ে সে আস্বাদ নেবে মেহেলীর রমণীয় দেহের। একটা অবরুদ্ধ গোঙানির মতো আওয়াজ সেঙাই-এর গলা বেয়ে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে, গোঁ-ও–ও–ও–ও–

মুখখানা ভয়ানক হয়ে উঠেছে সেঙাইর। ছোট ছোট পিঙ্গল চোখ দুটো জ্বলতে শুরু করেছে।

মাঝখানে কয়েকটা দিন জা কুলি উৎসব নিয়ে মেতে ছিল তাদের ছোট্ট গ্রাম। অতিরিক্ত উল্লাসে আর রোহি মধুর তীব্র মাদক নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে ছিল সেঙাই। উত্তর পাহাড়ের মেহেলী নামে এক পাহাড়ী যৌবনের কামনা জা কুলি উৎসবের আমোদ আর রেঙকিলানের অপমৃত্যুর নিচে হারিয়ে গিয়েছিল। আজ ফসলকাটা আবাদী জমি পোড়াতে পোড়াতে আবার নতুন করে মেহেলীর কথা মনে পড়েছে তার।

সেই প্রথম দেখার রাতেই মোরাঙ থেকে মেহেলীর সন্ধানে বেরিয়ে যেতে চেয়েছিল সেঙাই। হিমার্ত রাত্রি সেদিন তাকে বাধা দিয়েছে। কিন্তু আজ? আজ কোনো অসুবিধা নেই, প্রকৃতি আজ তার পক্ষে। আর মানুষের বাধা এলে বর্শার মুখে নির্মূল করে সে মেহেলী নামে এক যুবতীর কাছে পৌঁছুবে। পৌঁছুতেই হবে। আদিম পৃথিবী তার রক্তে রক্তে তুফান তুলেছে।

ঘন ঘন নিশ্বাস পড়ছে সেঙাইর। মোটা মোটা ঠোঁট দুটো ফুলে ফুলে উঠতে শুরু করেছে। প্রচণ্ড আবেগে বুকের পেশীগুলো তরঙ্গিত হয়ে যাচ্ছে। চারিদিকে আবার চনমনে চোখে তাকাল সেঙাই, যদি দেখা হয় মেহেলীর সঙ্গে। মেহেলী তো বলেছিল, সে রোজ এই নিরালা ঝরনার জলে স্নান করে যায়। এই ঝরনা তার বড় ভালো লাগে। তবে কেন সে আজ এল না? হতাশায় মনটা ভরে গেল সেঙাইর।

হঠাৎ কী ভেবে আর দাঁড়াল না সে। বর্শাটাকে হাতের থাবায় চেপে ধরে দুলতে দুলতে টিজু নদীর দিকে এগিয়ে গেল।

.

০৯.

সেদিন টিজু নদী পেরিয়ে একটা সম্বরের সন্ধানে সালুয়ালা গ্রামের সীমানায় চলে এসেছিল সেঙাই আর রেঙকিলান। আজ রেঙকিলান নেই সঙ্গে। সে একাই সালুয়ালাঙের কাছাকাছি চলে এল।

এখনও আকাশে বেলাশেষের খানিকটা ঝাপসা রং লেগে আছে। বনের ঘন ছায়ায় সালুয়ালা গ্রামের দু-একজন পাহাড়ী মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে। একবার দেখে ফেললে আর রক্ষা থাকবে না। এখানে বন বেশি নিবিড় নয়। আশেপাশে কোনো নিরাপদ ঝোঁপও নেই। সন্ধ্যার অন্ধকার না নামা পর্যন্ত গ্রামে ঢোকাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। পাহাড়ী জোয়ান সেঙাই অন্তত এটুকু বোঝে। আর যাই হোক, শত্রুদের বর্শায় হৃৎপিণ্ডটা তার চৌফালা হয়ে যাক এমন ইচ্ছা সেঙাই-এর নেই। সালয়ালা গ্রাম তার মুণ্ড নিয়ে নারকীয় উল্লাসে মেতে উঠবে, তার রক্ত দিয়ে মোরাঙের দেওয়ালে দেওয়ালে বীভৎস শিল্পকলা ফুটিয়ে তুলবে–ভাবতেও ইন্দ্রিয়গুলো অসাড় হয়ে এল তার।

চারিদিকে একবার সন্ধানী দৃষ্টিতে তাকাল সেঙাই। সামনেই একটা জীমবো গাছ। ওটার বিশাল গুঁড়ির আড়াল চলে গেল সে। এখান থেকে সালুয়ালাঙ গ্রামখানা পরিষ্কার নজরে আসে। এ গ্রামে এর আগে কোনোদিনই ঢোকেনি সেঙাই।

পোকরি বংশের গ্রাম। তাদের শত্রুপক্ষের আস্তানা। মনে মনে কথাগুলো একবার ভেবে নিল সেঙাই। কিন্তু আজ প্রতিহিংসার কারণে এ গ্রামে আসেনি সেঙাই। আর এক আদিম প্রবৃত্তির ডাকে এসেছে। সে প্রবৃত্তির বাস্তব প্রকাশ একটি নারীদেহে। তার নাম মেহেলী।

চারিদিক ভালো করে দেখে নিয়ে ধীরে ধীরে ঝাকড়া জীমবো গাছটার মগডালে উঠে গেল সেঙাই। সন্ধে পর্যন্ত এখানেই অপেক্ষা করতে হবে।

একসময় পশ্চিম আকাশ থেকে বিবর্ণ বেলাশেষ মুছে গেল। প্রথমে ছায়া ছায়া, পরে গাঢ় অন্ধকার নেমে এল নাগা পাহাড়ে। এবার জীমবো গাছটা থেকে নিচে নেমে এল সেঙাই। সতর্ক পা ফেলে ফেলে স্নায়ুগুলিকে ধনুকের ছিলার মতো প্রখর করে সালুয়ালা গ্রামের প্রান্তে এসে দাঁড়াল।

এধারেই সালুয়ালা গ্রামের বিশাল মোরাঙ। গাঢ় অন্ধকারে বিশেষ কিছুই নজরে আসছে না। আবছা অতিকায় একটা প্রেতের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে মোরাঙটা।

পাহাড়ের নিচু একটা খাঁজ থেকে ওপরে উঠে এল সেঙাই। সঙ্গে সঙ্গে মোরাঙের বাঁ পাশে একটা মশাল নজরে পড়ল। মশালের শিখাটা এদিকেই এগিয়ে আসছে। বুকের মধ্যে এক ঝলক রক্ত যেন ছলাত করে আছড়ে পড়ল সেঙাই-এর। লাফিয়ে আবার পাহাড়ের খাঁজে নেমে গেল সে। তারপর নিশ্বাসরুদ্ধ করে মড়ার মতো পড়ে রইল।

মশালের শিখাটা ঠিক ওপরের টিলাটা ধরে এগিয়ে যেতে লাগল। একবার মাথা তুলল সেঙাই। চোখে পড়ল, খুব কাছে দড়ির লেপ জড়ানো এক নারীমূর্তি। চকিতে তার মুখখানা দেখে চমকে উঠল সে-সালুনারু। রেঙকিনের বউ তবে কি টিজু নদী ডিঙিয়ে সালুয়ালা গ্রামে আশ্রয় নিয়েছে।

রেঙকিলানের মৃতদেহটা যেদিন দক্ষিণ পাহাড়ের অতল খাদে সারুয়ামারু খুঁজে পেয়েছিল, ঠিক সেদিনই বেয়াদপির জন্য আর রেজু আনিজার নামে অপরাধের কারণে খাপেগা তার দিকে বর্শা তুলে ধরেছিল। ঘন বনের মধ্যে লাফিয়ে পড়ে সেদিন প্রাণ বাঁচিয়েছিল সালুনারু। তারপর থেকে কেলুরি গ্রামে আর তাকে কেউ দেখেনি।

সালুনারু আর তার হাতের মশালটা একসময় দূরের কেসুঙগুলোর দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল।

রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে হিম ঝরতে শুরু করেছে। সকালে এবং দুপুরে বাঁশের পানপাত্র পূর্ণ করে বার সাতেক রোহি মধু খেয়েছিল সেঙাই। অত্যন্ত উষ্ণ পানীয়। তবু শরীরের জোড়ে জোড়ে কাঁপুনি ধরে গিয়েছে। দাঁতে দাঁতে হি-হি বাজনা শুরু হয়েছে। এ গ্রামেরই একটা পোষা শুয়োর কখন যেন গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে। জন্তুটার কাঁটাভরা কর্কশ জিভ। সেই জিভ দিয়ে পিঠের ওপরটা চেটে চেটে দিচ্ছে সেঙাই-এর। বর্শার তীক্ষ্ণ ফলা দিয়ে শুয়োরটার পাজরে একটা খোঁচা দিল সেঙাই। কাতর শব্দ করে প্রাণীটা ছুটে পালাল। আর থাবার মধ্যে ভয়াল বর্শাটা চেপে ধরে ওপরের টিলায় উঠে এল সে।

মোরাঙের ঠিক মুখোমুখি একটা বড় ভেরাপাঙ গাছ। তার আড়ালে দেহটাকে যতদূর সম্ভব গুটিয়ে নিয়ে দাঁড়াল সেঙাই। মোরাঙের ভেতর থেকে পে কাঠের মশালের আলো এসে পড়েছে বাইরে। শীতার্ত রাত্রির অন্ধকার বিদীর্ণ করে সে আলো রহস্যময় হয়ে উঠেছে। মোরাঙের দরজার ঠিক ওপরেই বিশাল এক বর্শার মাথায় একটা নরমুণ্ড। আবছা আলো অন্ধকারে বীভৎস দেখাচ্ছে। মুণ্ডটার মাংস ঝরে গিয়েছে, হনু আর কণ্ঠার হাড়ের ওপর আর গলার কাছে কিছু কিছু মাংসের অবশেষ কালো হয়ে ঝুলছে এখনও! চোখের কোটরে মণিদুটো নেই; শুধু বিরাট দুই গর্তে হিমাক্ত রাত্রির অন্ধকার জমা হয়ে রয়েছে।

এই নরমুণ্ড সালুয়ালা গ্রামের বীরত্বের স্মারক। তার পৌরুষের ঘোষণা। শত্রুর মুণ্ড কেটে এনে সালুয়ালাঙ গ্রাম বর্শার ফলায় গেঁথে আকাশের দিকে তুলে ধরেছে, তুলে ধরেছে বিজয়গৌরবে, গর্বিত ঔদ্ধত্যে।

পেশীগুলো আচমকা ঝনঝন করে বেজে উঠল আদিম মানুষ সেঙাইর। হাতের বর্শাটা থাবা থেকে পড়ে গেল পাথরের টিলায়। টং করে একটা ধাতব শব্দ উঠল। এই নরমুণ্ড কি তবে তার ঠাকুরদার? বহুকাল আগে টিজু নদীর খরধারায় পোকরি বংশের বর্শা যাকে নির্মম আঘাতে হত্যা করেছিল? রক্তস্রোতে বিদ্যুৎ বয়ে চলল সেঙাই-এর।

একটা ভয়ঙ্কর মুহূর্ত। তারপরেই বর্শাটা তুলে নিয়ে এক পা, দু পা করে মোরাঙের পাশে এসে দাঁড়াল সেঙাই। এ দিকটা অনেকখানি নিরাপদ। নিচে খাড়া পাহাড়ের ঢাল অতল খাদে নেমে গিয়েছে। চারিদিকে গাঢ় অন্ধকার। শুধু মোরাঙ থেকে বাঁশের দেওয়াল ভেদ করে অগ্নিকুণ্ডের আভা বেরিয়ে আসছে। দেওয়ালের পাশে ওত পেতে দাঁড়াল সেঙাই। তারপর পলকহীন তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল।

মোরাঙের ভেতরটা এবার পরিষ্কার নজরে আসছে। বাঁশের মাচানের ওপর শুয়ে রয়েছে একটি শীর্ণ শরীর। তার চারপাশে অনেকগুলো মানুষ ভিড় করে রয়েছে।

একটা বুড়ো বাঁশের মাচানের মানুষটার ওপর ঝুঁকে পড়ল। অস্পষ্ট আলোয় দেখা যায়, তার কানে পেতলের বিরাট নীয়েঙ গয়না। গলায় ময়াল সাপের হাড়ের মালা। কপালের ওপর তিনটি গাঢ় রক্তের রেখা। গালে অসংখ্য কুঞ্চন। এই গ্রামের সর্দার সে।

বুড়ো মানুষটা চাপা গলায় বলল, কি তামুন্যু (চিকিৎসক), কী মনে হচ্ছে? হু-হু, আমার কিন্তু ভালো ঠেকছে না।

মাচানের আর এক পাশে একটি মানুষ বসে ছিল। সারা দেহ অনাবৃত। বুকের ওপর অসংখ্য উল্কি। গলার চারপাশে মানুষের করোটির মালা। হাতে একখণ্ড বাদামি রঙের হাড়। গম্ভীর গলায় সে বলল, উঁহু, আমারও ভালো ঠেকছে না সদ্দার। ঘায়ে পোকা ধরে গিয়েছে। এই দ্যাখ, কেগোথেনা পাতা বেটে লাগিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু কিছুই হচ্ছে না।

আচমকা ছিলামুক্ত তীরের মতো সাঁ করে মাচানের ওপর উঠে বসল শোয়ানো মানুষটা। মশালের আলোতে তার পিঙ্গল চোখে দুটো কেমন যেন অমানুষিক দেখাচ্ছে। বুকের বাঁ দিকটা বিরাট একটা ফাঁক হয়ে ঝুলে পড়েছে। সেখান থেকে মেটে রঙের এক ডেলা মাংস ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। বোধ হয়, ওটাই মানুষটার হৃৎপিণ্ড। জান্তব গলায় প্রলাপ বকে উঠল মানুষটা, খুন, খুন-খুন করে ফেলব। বর্শা দে…ওরা কে? কে?..হোঃ-হোঃ-হোঃ-ও–ও– ও তীব্র গলায় জান্তব অট্টহাসি হেসে উঠল সে।

মোরাঙের বাইরে দেওয়ালের পাশে চমকে উঠল সেঙাই। বাঁশের মাচানের ওপর উঠে বসে যে মানুষটা প্রলাপ বকছে সে খোনকে। মশালের আলোতে খোনকের কঙ্কালসার দেহটা প্রেতমূর্তির মতো দেখাচ্ছে।

খোনকে মরেনি। সেদিন সেঙাই যে বর্শার ফলা ছুঁড়ে মেরেছিল সেটা তা হলে ব্যর্থ হয়েছে!

মাথাটা টলমল করে দুলে উঠল সেঙাইর। অতল খাদে সে পড়েই যেত, তার আগেই বাঁশের দেওয়ালটা ধরে টাল সামলে নিল।

খোনকেকে লাফিয়ে উঠতে দেখে চারপাশ থেকে জোয়ান ছেলেরা ছত্রভঙ্গ হয়ে সরে দাঁড়াল। সকলেরই চোখেমুখে আতঙ্ক খেলে যাচ্ছে। সালুয়ালা গ্রামের তামুন্যও (চিকিৎসক) রীতিমতো ভয় পেয়েছে। বাঁশের মাচানটা থেকে উঠে সে-ও সরে দাঁড়িয়েছে বেশ একটা নিরাপদ দূরত্বে। তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বুড়ো সর্দার।

কাঁপা কাঁপা গলায় সর্দার বলল, কী ব্যাপার তামুন্যু?

আনিজা! আনিজা! খারাপ আনিজাতে পেয়েছে খোনকেকে।

কী করতে হবে? কাঁপা গলাটা এবার ফিসফিস শোনাচ্ছে সর্দারের।

হু-হু, কাল রাত্তিরে আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম, এমনটি হবে। চটপট একটা শুয়োর বলি দিয়ে রক্ত নিয়ে আয়। টেটসে আনিজার নামে বলি দিবি।

দুটো জোয়ান ছেলে মোরাঙের দরজা দিয়ে শুয়োরের সন্ধানে ছুটে গেল পোকরি কেসুঙে। পোকরি বংশের ছেলে খোনকে। তাদের শুয়োরই উৎসর্গ করা হবে।

এখনও সমানে প্রলাপ বকে চলেছে খোনকে, খুন–খুন–খুন কর! আগুন লাগিয়ে দে। চারদিকে। হো-ও-ও-ও–

অট্টহাসির সঙ্গে মনে হল, বুকের ফাটল দিয়ে হৃৎপিণ্ডটা ছিটকে বেরিয়ে আসবে খোনকের। ভয়ানক দেখাচ্ছে তার বুকের ক্ষতটা।

প্রকাণ্ড মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে আচমকা বাঁশের মাচানটার কাছে চলে এল তামুন্যু। তারপর দু’টি প্রবল থাবায় খোনকের কাধ দুটো ধরে শুইয়ে দিল। তার ওপর একটা বাদামি রঙের চ্যাপ্টা হাড়ে তিনটে ফুঁ দিয়ে বুকে ঠেকাল। চারপাশে একবার চনমন করে তাকিয়ে তামুন্যু তার মুখখানা খোনকের বুকের ওপর রাখল। এবং চুকচুক শব্দ করে ক্ষতমুখ থেকে লালাভ রক্তধারা শুষে নিল। পাহাড়ী চিকিৎসার এক এক বীভৎস পদ্ধতি, এক নারকীয় প্রক্রিয়া।

বাঁশের পাত্রে কিছুটা কেগোথেনা পাতা বাটা ছিল। খোনকের ক্ষতে তার থেকে খানিকটা তুলে মাখিয়ে দিল তামুন্যু। আর বাঁশের মাচানের ওপর নিঃসাড় হয়ে পড়ে রইল খোকে। চোখ দুটো তার অর্ধেক বুজে এসেছে। একটা অদ্ভুত অবসাদ দেহময় ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু ঢিমে তালে নিশ্বাসের সঙ্গে বুকের ক্ষতমুখটা চৌফালা করে মেটে রঙের হৃৎপিণ্ডটা ঠেলে বেরিয়ে পড়তে চাইছে।

শীতের রাত্রি আরো হিমার্ত হয়ে উঠেছে। সেঙাই-এর চামড়ায় সেটা যেন সহস্র দাঁত বসাচ্ছে। যন্ত্রণায় শরীরের জোড়গুলো যেন খুলে খুলে আসতে চাইছে। তবু দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে রইল সে।

একটু পরেই মোরাঙের দরজার দিকে কতকগুলি পে কাঠের মশাল দেখা দিল। সঙ্গে সঙ্গে চেঁচামেচি শুরু হল।

মোরাঙের এই দেওয়ালের দিকটা নিরাপদ। তবু শরীরটাকে যতখানি সঙ্কুচিত করা যায়, তাই করে দেওয়ালের গায়ে লেপটে রইল সেঙাই।

একটু পরেই একটা কাঠের পাত্রে খানিকটা তাজা রক্ত নিয়ে এল সেই জোয়ান দুটো। খানিক আগে পোকরি কেসুঙে শুয়োর বলির খবর দিতে গিয়েছিল তারা। তাদের সঙ্গে আরো কয়েকটি নানা বয়সের পুরুষও মোরাঙে চলে এসেছে।

একজন কাঠের পাত্রটা এগিয়ে দিতে দিতে বলল, এই নে তামুন্যু, রক্ত এনেছি। আনিজার নামে খোকের বাপ শুয়োর বলি দিয়েছে।

মোরাঙের দরজার বাইরে হইচইটা এবার প্রবল হয়ে উঠছে।

বুড়ো সর্দার বলল, দরজার ওধারে কে ওরা?

খোনকের ছোট বোন মেহেলী আর তার মা এসেছে। বস্তি থেকে আরো কয়েকটা মেয়েও এসেছে। তারা সব জটলা করছে।

সেই জোয়ান ছেলেটা বলল, খোনকের খবর জানতে চায়।

মোরাঙে মেয়েদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। তাই তারা দরজা থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে। নাগা পাহাড়ের এই প্রথাকে অসম্মান করে কোনো মেয়ের মোরাঙে ঢোকার উপায় নেই। কোনোভাবেই, কোনো কারণেই এই প্রথা ভাঙা চলবে না। মোরাঙ হল অবিবাহিত জোয়ান ছেলেদের নৈতিক জীবনের পীঠভূমি। নারীর কামনা আর রিপুর তাড়না থেকে অনেক, অনেক দূরে এর নিষ্পাপ অস্তিত্ব। এর পবিত্রতা নারীদেহের আসক্তি দিয়ে কলুষিত করে তোলা রীতিমতো অপরাধ। সে অপরাধের শাস্তি নির্মম, নিষ্ঠুর। অনিবার্য মৃত্যু দিয়ে সে অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। তাই মেহেলীরা ভেতরে ঢোকেনি।

মোরাঙের বাঁশের দেওয়ালে শরীরটা হিমে অসাড় হয়ে আসছে সেঙাই-এর। তারই মধ্যে একটা নাম শুনতে পেয়েছে সে। নামটা তার সমস্ত চেতনার ওপর ছড়িয়ে পড়েছে। সে নাম মেহেলী। এই মেহেলীর কামনাই তাকে শীতের হিমে দক্ষিণ পাহাড় থেকে টিজু নদীর এপারে এই সালুয়ালা গ্রামে টেনে এনেছে। ময়াল সাপ যেমন করে তার নিশ্বাসে নিশ্বাসে ছোট্ট হরিণশিশুকে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে টেনে নিয়ে যায় ঠিক তেমন করেই কি মেহেলী তাকে এই পাহাড়ে নিয়ে এসেছে?

হিম অসহ্য হয়ে উঠেছে। তার দাঁতে দাঁতে শরীরটা যেন ফালা ফালা হয়ে যাবে, মনে হল সেঙাই-এর। এত কাছাকাছি মেহেলী, তবু সামনে যাবার উপায় নেই। ওপাশে গেলেই একটা বর্শার ফলা পাঁজরাটাকে এফোঁড় ওফোঁড় করে ফেলবে। এ একেবারে নিশ্চিত। সেঙাইর মনে। হচ্ছে, মেহেলীর যে সুন্দর নগ্ন শরীরের আকর্ষণে টিজু নদী ডিঙিয়ে এপারে এসেছে সে শরীর যেন কোনো মেয়ের নয়। সেটা একটা সোনালি সাপ, যার স্পর্শে নির্ঘাত মৃত্যু।

শরীরের ডান দিকটা ধরে গিয়েছে সেঙাইর। সেদিকে কোনো সাড় নেই, বোধ নেই। কী করবে ঠিক করে উঠতে পারছে না সে।

হঠাৎই মোরাঙের মধ্যে ঘটে গেল ঘটনাটা। আর চমকে উঠল সে।

বাঁশের মাচানের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল তামুন্য (চিকিৎসক), তার মুঠিতে একটা কাঠের পাত্র। সেই পাত্রে টকটকে তাজা অনেকটা রক্ত। একটু আগেই শুয়োর বলি দিয়ে নিয়ে এসেছিল সেই জোয়ান ছেলে দুটো।

এতক্ষণ বাঁশের মাচানে নিঝুম শুয়ে ছিল খোনকে। আর একটু একটু করে তার চারপাশে ঘন হয়ে আসছিল বুড়ো সর্দার আর মোরাঙের জোয়ান ছেলেরা।

তামুনুর মুখে আত্মপ্রসাদের হাসি ফুটে বেরিয়েছে। রাক্ষসের মতো বিকট শব্দ করে হেসে উঠল সে, হোঃ-ও–ও–ও-, হোঃ-ও–ও–ও-, হোঃ-ও–ও–ও-, দেখলি তো সদ্দার, আনিজার–

তার কথা মাঝপথেই থমকে গেল। ফের মাচানের ওপর উঠে বসেছে খোনকে। মৃত্যুযন্ত্রণায় তার মুখখানা ভয়ানক হয়ে উঠেছে। ছোট ছোট চাপা চোখের ভেতর থেকে পিঙ্গল মণি দুটো ঠিকরে আসছে। আর বুকের সেই বিশাল ফাটলে মেটে রঙের হৃৎপিণ্ডটা নিশ্বাসের সঙ্গে।

অনেকখানি বেরিয়ে এসেছে। অস্বাভাবিক গলায় প্রলাপ বকে উঠল খোকে, খুন-খুন হোঃ হোঃ–আমার বর্শা দে—

আনিজা! হু-হু, সহজে আনিজার রাগ পড়বে না। একটা শুয়োরে চলবে না তার। খোকেকে সে চাইছে। খোনকে এই মোরাঙে থাকলে বস্তিতে মড়ক ধরে যাবে। শিগগির ওকে খাদে ফেলে দে সদ্দার। বাঁশের মাচানের পাশ থেকে সরে গেল তামুন্যু। খোনকে সম্বন্ধে শেষ রায় দিয়ে বিশাল মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে অন্য একটা মাচানে গিয়ে বসল।

জোয়ান ছেলেরা চারপাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

বুড়ো সর্দার বলল, এই যাসিমু, এই ফিরাঙ, তোরা খোকেকে ধরে পেছনের খাদে ফেলে দিয়ে আয়।

মোরাঙের দেওয়ালের পাশে একটা অসাড় দেহে শিহরন খেলে গেল। স্নায়ুগুলো ধনুকের ছিলার মতো টান টান হয়ে উঠল। এখনই খোকেকে নিয়ে জোয়ান ছেলেরা এদিকে আসবে। তারপর ছুঁড়ে ফেলে দেবে খাদের অতলে। কঠিন পাথরের ঘা লেগে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে খোকের দেহ। কিন্তু এ সব ভাবছে না সেঙাই। তার চিন্তা, এখানে এসে তাকে দেখলে জোয়ান ছেলেরা দাঁতাল শুয়োরের মতো ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলবে। সামনের দিকে যাওয়া অসম্ভব। মোরাঙের দরজার কাছে মশাল নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে মেহেলীরা। শত্রুপক্ষের কুমারী যৌবনকে বিন্দুমাত্র ভরসা নেই।

ইতিমধ্যে মোরাঙের ভেতর জোয়ান ছেলেরা খোকেকে কাঁধের ওপর তুলে নিয়েছে। আর ভাবতে পারছে না সেঙাই। অসাড় দেহটাকে কোনোক্রমে টানতে টানতে পাহাড়ের গা বেয়ে খাদের দিকে অনেকটা নেমে গেল সে। চেতনাটা কেমন অসাড় হয়ে আসছে। কিছুই বুঝতে পারছে না সেঙাই। হাতের থাবা দিয়ে পাথরের একটা চাই ধরে আশ্রয় নিয়েছিল। একটু একটু করে থাবাটা শিথিল হয়ে আসছে। পিঠের ওপর, মুখের ওপর কুচি কুচি বরফ জমছে। প্রায় অচেতন দেহটাও যেন চিনচিন করে উঠছে। ভয়ানক একটা অনুভূতি চেতনা আর নিশ্চেতনার মধ্যে দোল খেয়ে যাচ্ছে।

আচমকা ওপর থেকে একটা বিশাল গুরুভার কিছু আছড়ে পড়ল পাশের পাথরের ওপর। ঝপাং করে শব্দ উঠল। সেই সঙ্গে একটা তীব্র আর্তনাদ। আ-উ-উ-উ-। নির্ঘাত খোনকে। পরক্ষণে একেবারেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল অন্ধকার পাহাড়ী খাদটা। শুধু নিবিড় অরণ্যের মধ্য দিয়ে পাক খেতে খেতে একটা মানবদেহ নিচের দিকে নেমে যেতে লাগল।

আর কিছুই শুনতে পেল না সেঙাই। শুধু অস্পষ্টভাবে বুঝতে পারল, তার হাতের মুঠি আরো শিথিল হয়ে আসছে। আর পাথরের অবলম্বনটা একেবারে খসে গিয়েছে। কিন্তু হাত বাড়িয়ে আর একটা কিছু ধরার মতো শক্তি সে হারিয়ে ফেলেছে। সীমাহীন শূন্যতায় তার দেহটা ছিটকে পড়ল। কোথাও কোনো আশ্রয় নেই। চারপাশে অথই অন্ধকার হা হা গ্রাস মেলে রয়েছে। একটু আগে খোনকের দেহটা অতল খাদের দিকে নেমে গিয়েছিল। হয়তো তারই প্রেতাত্মা লম্বা একখানা হাত বাড়িয়ে সেঙাইকে নিচের দিকে টেনে নিয়ে চলেছে।

কোথায় মুছে গেল মেহেলী, কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল টিলায় উপত্যকায় মালভূমি আর চড়াই-উতরাইতে দোল-খাওয়া এই নাগা পাহাড়। সেঙাইর সব সাধ, কামনা আর বাসনা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। কিছুই ভাবতে পারছে না সেঙাই। অস্ফুট বোধ, অপরিণত বন্য মন। সেই বোধ আর মন এখন একেবারেই ক্রিয়া করছে না। তবু সেঙাইর মনে হল, দেহটা তার আশ্চর্য হালকা হয়ে গিয়েছে। শিরায় স্নায়ুতে, ধমনী আর ইন্দ্রিয়ে, বোধ আর বুদ্ধিতে যে প্রাণ বহমান, সে প্রাণ একটু একটু করে স্তব্ধ হয়ে আসছে।

নিরাশ্রয় শূন্যতায় পাক খেতে খেতে খাদের অতলে নামতে লাগল সেঙাই।

১০. ফসলহীন আগাছা পুড়িয়ে

১০.

বিকেলের শুরুতে খেতে খেতে ফসলহীন আগাছা পুড়িয়ে উত্তর পাহাড়ে চলে গিয়েছিল সেঙাই। আর ওঙলেরা ফিরে এসেছিল তাদের ছোট্ট গ্রামটিতে। সকলে মিলে ঠিক করেছিল নাচগানের মাতাল ঘূর্ণিতে আর উল্লাসে আজকের বাকি দিনটা জমিয়ে তুলবে।

একসময় সেই নাচ শুরু হল সারুয়ামারুর ঘরের সামনে, অর্থাৎ জোরি কেসুঙে। সমস্ত গ্রামখানা চারপাশ থেকে এসে জমা হয়েছে সেখানে। পাথুরে মাটির ওপর চক্রাকারে বসে পড়েছে সবাই। তামাটে পাহাড়ী মানুষ। কানে পিতলের নীয়েঙ গয়না। চাপা চাপা ছোট চোখে, চ্যাপ্টা নাকে, গোলাকার কামানো মাথায় আর অনাবৃত দেহে খুশির হিল্লোল বয়ে যাচ্ছে। সারা দেহ ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে, প্রতিটি অঙ্গ দুলিয়ে দুলিয়ে উল্লাস কি ক্রোধ ফুটিয়ে তোলে এই পাহাড়ী মানুষেরা।

মেয়ে আর পুরুষ–সব পাশাপাশি বসেছে। ঘনিষ্ঠ ভঙ্গিতে একজন আর একজনের কাঁধের ওপর হাত তুলে দিয়েছে। আর নাচের তালে তালে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে। উলঙ্গ আকাশের তলায় এই বিচিত্র পাহাড়ী গ্রাম। এই আকাশের মতো, এই পাহাড়ের মতো অকপট তাদের হাসি আর শোকের প্রকাশ।

একপাশে কয়েকটা পালিত শুয়োর আর কুকুর ঘুরঘুর করে বেড়াচ্ছে। আর মাঝে মাঝে খুশির গলায় অস্ফুট জান্তব শব্দ করে উঠছে। তারপরেই হয়তো পাহাড়ী মানুষগুলোর গায়ে এসে গড়াগড়ি দিয়ে পড়ছে। নাচের আসরে জানোয়ার আর মানুষের কোনো প্রভেদ নেই। দুয়েরই উল্লাস প্রকাশের ধারা এক। নাচের ফাঁকে ফাঁকে হল্লা করে উঠছে পাহাড়ী মানুষগুলো, হোঃ–হোঃ—ওঃ—ওঃ–

জোরি কেসুঙের সামনে অর্ধ-গোলাকার পাথরখানার ওপর এসে বসেছে বুড়ো খাপেগা। তার পরনে আরি হু কাপড়। যারা শত্রুপক্ষের দুটো মাথা গেঁথে আনতে পারে বর্শার মুখে, তারাই এই কাপড় পরার গৌরব অর্জন করে। কাপড়খানা ঘোর রক্তবর্ণ, হাঁটুর ওপরে তার প্রান্তটা ঝুলছে। কাপড়ের ওপর চামড়ার ঢাল, বাঘের চোখ, হাতির মাথা, চিতাবাঘ, মোষ, সম্বর আর বর্শা আঁকা রয়েছে।

হো-ও-ও-ও—

বেলাশেষের আকাশের দিকে দিকে মাতাল উল্লাস উঠে যাচ্ছে।

জোয়ান ছেলেরা চারপাশে বসে বসে খুলি (এক ধরনের বাঁশি) বাজিয়ে চলেছে। আর একদিকে প্রকাণ্ড জয়টাকের মতো গোটা কয়েক মেথি কেকোয়েনঘা খুলি বসানো হয়েছে। কয়েকজন মিলে মোটা মোটা মোষের হাড় দিয়ে সেগুলো প্রচণ্ড উৎসাহে পিটিয়ে চলেছে। দ্রাম—দাম—ম–ম–

দক্ষিণ পাহাড়ের দিকে দিকে সেই গম্ভীর শব্দ তরঙ্গিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। কেলুরি গ্রামখানা যেন থরথর করে কাঁপছে সে আওয়াজে।

চারপাশে ঘন হয়ে বসেছে গ্রামের মেয়েপুরুষ। তাদের মাঝখানে রাঙা ধুলো-ভরা জায়গাটায় উদ্দাম নাচ চলছে।

একদিকে ছটি জোয়ান ছেলে, পরস্পরের কাঁধের ওপর হাত দিয়ে দাঁড়ানো যেন একটি পাহাড়ী ছন্দ। আর একপাশে ছটি যুবতী মেয়ে। জোয়ানদের মতো তারাও কাঁধে কাঁধে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাঁটু পর্যন্ত তাদের বিচিত্র রঙের কাপড়ে মানুষের কঙ্কাল, মোষের মাথা আর বর্শা এবং ঢাল আঁকা রয়েছে। দু’টি দলের সকলেরই কোমরের ওপর থেকে উদেহ অনাবৃত।

যুবতীদের কানে পিতলের নীশে দুল। মণিবন্ধে হাতির দাঁতের মোটা মোটা বালা। চুলের ভঁজে ভাঁজে সম্বরের ছোট ছোট শিঙ গোঁজা। কানের পাতায় সাঙলিয়া লতার নীলাভ ফুল। ছেলেদের মাথায় মোষের শিঙের মুকুট। কানে আউ পাখির পালক গোঁজা। গলায় কড়ির মালা।

দুই দলের মাঝখানে তিনটে বাঁশের খুঁটি পোঁতা রয়েছে। সেই খুঁটিগুলোকে চক্রাকারে ঘিরে একবার দুটো দল নাচতে নাচতে মুখোমুখি হচ্ছে। পরস্পরের মাথায় মাথা ঠেকছে। তার পরেই আবার পেছন দিকে পা ছুঁড়ে ছুঁড়ে বিচিত্র ভঙ্গিতে পিছিয়ে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে থামছে। মাত্র একটি মুহূর্ত। আবার সামনের দিকে ঝুঁকে ছন্দিত পা ফেলে ফেলে অন্য দলটির দিকে এগিয়ে যাওয়ার পালা।

দ্রাম—ম্‌–ম্‌–ম্‌–

গম গম শব্দ উঠছে মেথি কেকোয়েনঘু খুলি বাদ্যযন্ত্র থেকে। তার সঙ্গে তাল মিলিয়েছে বাঁশির সুর। আর সেই আবহ বাজনার সঙ্গে পা ফেলে ফেলে নাচ চলেছে। উদ্দাম নাচ, দুর্বার নাচ, অবিরাম নাচ। পায়ের আঘাতে আঘাতে রাঙা ধুলোর মেঘ উড়ছে।

পাহাড়ীদের এই নাচকে বলে ইয়াচুমি কোঘিল নাচ।

হো –ও—ও–ও—

নাচের সঙ্গে সঙ্গে চলছে উচ্চকিত কণ্ঠের হইচই।

বুড়ো খাপেগা ঘন ঘন পাকা মাথাখানা দোলাচ্ছে। হাত নেড়ে নেড়ে তারিফ করছে নাচ আর বাজনার।

জোরি কেসুঙে নাচ হচ্ছে। তাই সারুয়ামারু আর তার বউ জামাতসু বাঁশের পানপাত্রে সকলের সামনে রোহি মধু দিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।

হো-ও-ও-ও–

আকাশে বিবর্ণ বেলাশেষ। দূরের পাহাড়চূড়া আবছা হয়ে আসছে। পশ্চিমের বনশীর্ষ থেকে রোদের রং মুছে গিয়েছে।

মাতাল দেহের মুদ্রাভঙ্গে নেচে চলেছে পাহাড়ী যুবতী। উদ্দাম ছন্দে পা ফেলে ফেলে এগিয়ে আসছে পাহাড়ী জোয়ান। তার সঙ্গে সঙ্গে জলদ তালে বাজছে বাজনা।

খাপেগা খুবই খুশি। মাথা নাড়ছিল সে। আচমকা তার পাশে এসে দাঁড়াল সিজিটো। তার দিকে তাকিয়ে খালোগা বলল, কি রে, কী ব্যাপার? নাচ আর বাজনা বেশ জমেছে। বোস, বোস।

বিরক্ত দৃষ্টিতে আসরটার দিকে তাকিয়ে ছিল সিজিটো। আর অখণ্ড মনোযোগে বুক, কপাল। আর কাঁধের পাশে দুই বাহুসন্ধি ছুঁয়ে ছুঁয়ে ক্রস আঁকছিল। সারা মুখে দাড়ি-গোঁফের লেশ নেই। একটা কঠিন ভ্রুকুটি ফুটে বেরুল সিজিটোর, এসব আমার ভাল লাগে না সদ্দার। তোর সঙ্গে আমার কথা আছে।

কী কথা? পাকা ভুরু দুটো কুঁচকে তাকাল বুড়ো খাপেগা।

একটু দাঁড়া। হুই সারুয়ামারুকে ডেকে আনি আগে।

জোরি কেসুঙের একপাশে দাঁড়িয়ে সারা দেহ বিচিত্র ভঙ্গিমায় বাঁকিয়ে চুরিয়ে এই আদিম নৃত্যকলা উপভোগ করেছিল সারুয়ামারু। সিজিটো তাকে ডাকল, এই সারুয়ামারু, ইদিকে আয়। ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে টেফঙের (বাঁদর) মতো খুব যে নাচছিস!

ঝড়ের মতো একে চিত করে ফেলে, ওর ঘাড়ের ওপর দিয়ে লাফিয়ে ছুটে এল সারুয়ামারু, কি রে সিজিটো, কোহিমা থেকে ফিরলি বুঝি?

হু-হু। সাহেব তোকে যেতে বলেছে।

সমানে ক্রস এঁকে চলেছে সিজিটো। খুশির গলায় সে বলল, এই দ্যাখ, সাহেব আমাকে কী দিয়েছে। গায়ে একটা বড় হরিণের ছাল জড়ানো ছিল সিজিটোর। তার তলা থেকে একটি সাদা ধবধবে জামা বার করে আনল সে। তারপর সকলের দিকে তাকিয়ে আত্মপ্রসাদের হাসি হাসল, হু-হু, তুই গেলে তুইও পেতিস।

ইতিমধ্যে নাচ আর বাজনা থেমে গিয়েছিল। বিচিত্র কৌতূহলে গ্রামের মেয়েপুরুষ, সকলে সিজিটোর চারপাশে নিবিড় হয়ে এল।

পাহাড়ী মানুষগুলোর গলায় এবার বিস্ময়টা সরবে ফেটে পড়ল, এটা কী? এটা কী?

এর আগে তারা কোনোদিন জামা দেখেনি। সভ্যতা থেকে অনেক, অনেক দূরে এই তুচ্ছ পাহাড়ী গ্রামে এই প্রথম জামার আবির্ভাব। এবার আত্মপ্রসাদের হাসিটা সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ল সিজিটোর। প্রচণ্ড শব্দ করে হেসে উঠল সে, হো-ও-ও-ও, হো–ও–ও। এর নাম হল জামা। ফাদার আমাকে দিয়েছে।

এটা দিয়ে কী হয়?

কী আর হয়, গায়ে দেয়। সাদা ধবধবে জামাটা পরে দেখিয়ে দিল সিজিটো, কি রে, কেমন দেখাচ্ছে?

ভালো ভালো, খুব সুন্দর। চারপাশ থেকে পাহাড়ী মানুষগুলো হইচই করে উঠল।

দেখবি, ফাদার আমাকে আরো কত জিনিস দেবে। পায়ের পাতা পর্যন্ত প্যান্ট দেবে, কোট দেবে, আরো অনেক কিছু দেবে। সকলের মুখের ওপর দিয়ে গর্বিত দৃষ্টিটা বুলিয়ে নিয়ে গেল সিজিটো।

প্যান্ট, জামা, কোট বিচিত্র সব শব্দ, অদ্ভুত সব নাম। পাহাড়ীদের কাছে এই নামগুলো একান্তই অজানা। নির্বাক তাকিয়ে থাকে সকলে।

কথা বলছে, আর সঙ্গে সঙ্গে ক্রস এঁকে চলেছে সিজিটো-অবিরাম। আচমকা তার দৃষ্টি এসে পড়ল সারুয়ামারুর ওপর। ভয়ঙ্কর গলায় সে বলল, কি রে, তুই ক্রস করছিস না যে আমার মতো? ফাদার যে বলে দিয়েছিল।

ও-সব আমার ভালো লাগে না। আগে কখনও করিনি। বিব্রত সুরে বলল সারুয়ামারু।

তুই ভারি নিমকহারাম তো। ফাদার তোকে নিমক দিয়েছে, আরো কত কী দিয়েছে। আর তুই বেইমানি করলি! কটমট করে তাকিয়ে রইল সিজিটো।

একেবারে বর্শা দিয়ে ফুঁড়ে ফেলব। নিমকহারামি করে, বেইমানি করে পাহাড়ের ইজ্জত নষ্ট করবে! হাতের মুঠিতে একটা বর্শা তুলে নিল বুড়ো খাপেগা।

হো-ও-ও-ও–

চারপাশ থেকে চিৎকার করে ওঠে মানুষগুলো। সেই প্রচণ্ড চিৎকার ছাপিয়ে সিজিটোর গলা পর্দায় পর্দায় চড়তে লাগল, বুঝলি সদ্দার, আমাদের কেলুরি বস্তির কেউ কোনোদিন কারো সঙ্গে নিমকহারামি করেনি। হুই শয়তান সারুয়ামারু করেছে। ফাদার ওকে নিমক দিয়েছে, কাপড় দিয়েছে। আর তার বদলা সম্বরের ছাল নেয়নি। শুধু সে বলেছিল, কপালে-বুকে কাঁধে আঙুল ঠেকাতে। ফাদার বলে, এর নাম ক্রস আঁকা। সেই ক্রস সারুয়ামারু শয়তানটা আঁকে না।

বর্শার ফলাটা সারুয়ামারুর বুকের কাছে ঠেকিয়ে হুমকে ওঠে বুড়ো খাপেগা, সাহেব যা বলেছিল, তাই কর। নিমক খেয়েছিস, তার কথা রাখবি না? একেবারে জানে মেরে ফেলব। শয়তানের বাচ্চা।

কলের পুতুলের মতো কপাল, বুক আর বাহুসন্ধি ছুঁয়ে ছুঁয়ে ক্রস আঁকতে লাগল সারুয়ামারু। আর বীভৎস গলায় বুড়ো খাপেগা বলল, পাহাড়ী মানুষ কখনও কারো সঙ্গে বেইমানি করে না, নিমকহারামি করে না। কেউ করলে তার জান চলে যাবে বর্শার মুখে।

হো-ও-ও-ও—

আকাশের দিকে দিকে আর একবার উদ্দাম চিৎকার উঠে গেল।

শহরে গিয়েছিলি, সেই গল্প বল। যে মানুষটা তোকে জামা দিয়েছে, তার গল্প বল। চারপাশ থেকে পাহাড়ী মানুষগুলো এবার ঘিরে ধরল সিজিটোকে।

বিচিত্র মানুষ এই সিজিটো। মাঝে মাঝে কত পাহাড় ডিঙিয়ে, কত জলপ্রপাত উজিয়ে, কত মালভূমি আর উপত্যকা পাড়ি দিয়ে সে চলে যায় শহরে-মোককচঙে কি কোহিমায়। অবশ্য আরো অনেকে শহরে যায় এই গ্রাম থেকে। সারুয়ামারু যায়, বুড়ো নড্রিলো যায়। লবণের সন্ধানে অনেককেই যেতে হয়। সারুয়ামারুই সিজিটোকে প্রথম নিয়ে গিয়েছিল শহর কোহিমায়। তারপর থেকে শহর এক বিচিত্র আকর্ষণে তাকে বার বার টেনে নিয়ে গিয়েছে। এই ছোট্ট জনপদে তার তৃষিত কামনা যেন তৃপ্ত হয় না। এই নিবিড় বন, এই টিজু নদী, দক্ষিণ আর উত্তরের তরঙ্গিত উপত্যকা, মাথার ওপর অবারিত আকাশ–এ-সবের মধ্যেই একদিন জন্ম নিয়েছিল সিজিটো। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই সে তার প্রিয়জন, বন্ধুবান্ধব থেকে বিচ্ছিন্ন। তার রক্তে রক্তে অরণ্যের আহ্বান নেই, এই ভয়াল শৈলচূড়ার প্রতি আকর্ষণ নেই। কী যে সে চাইত, তার অস্ফুট বন্য মন তার হদিস পেত না। তারপর একদিন কৈশোরের সীমা ডিঙিয়ে দুর্বার যৌবন এল দেহমনে। পাহাড়ী প্রথা অনুযায়ী বিয়ে হল সেঙাইর মায়ের সঙ্গে।

সিজিটো জানত, তার বাপ জেভেথাকে হত্যা করেছিল টিজু নদীর ওপারের সালুয়ালা গ্রামের মানুষেরা। জেভেথাঙের মুণ্ডু কেটে বিজয় গৌরবে পোকরি বংশ উৎসব করেছিল, এ সংবাদও তার অজানা নয়। তবু তার রক্তে প্রতিহিংসার জ্বালা নেই, প্রতিশোধের আগুন নেই। কেমন যেন নিরুত্তাপ মানুষ সিজিটো। বুড়ো খাপেগা অনেকবার জেভেথাঙের কাহিনি তার কাছে বলেছে। কিন্তু এতটুকু উত্তেজনার চিহ্ন নেই তার মনের কি দেহের কোথাও। কেমন একটা নিস্পৃহ ভাব, একটা শীতল নিরাসক্তি। বিরক্ত হয়ে অবশেষে গর্জন করে উঠেছে বুড়ো খাপেগা, ইজা হান্টসা সালো। এত ভীরু তুই! এই বস্তির নাম তুই ডোবাবি টিজু নদীর জলে। একেবারে মাগীরও অধম। এ বস্তির মাগীরাও বর্শা দিয়ে ফুড়ে শত্রুর মুণ্ডু আনতে পারে। তুই একটা কী!

কোনো প্রতিবাদ করত না সিজিটো। বন-পাহাড়ের মানুষ হয়েও তার রক্তে অরণ্যের হিংসা নেই। চকিত দুটো চোখ তুলে সে উঠে যেত মোরাঙ থেকে।

মাঝে মাঝে একা একা দূরের পাহাড়ে চলে যেত সিজিটো। কোনো নিঃসঙ্গ জলপ্রপাতের কিনারে অন্যমনস্কর মতো বসে থাকত। কখনও বিশাল একটা ভেরাপাঙ গাছের মগডালে উঠে অনেক, অনেক দূরে দৃষ্টি ছড়িয়ে দিত। সুদূর পাহাড়ী দিগন্ত, তার ওপরে নীল আকাশ, তার পরের পৃথিবী আর দৃশ্যমান নয়। সেই অদৃশ্য জগৎ, সেই রহস্যের পৃথিবী প্রতিনিয়ত তাকে হাতছানি দিত। এক দুর্বার আকর্ষণে এই পাহাড়, দূরের ওই আকাশ ডিঙিয়ে তার বিচিত্র পাহাড়ী মন হারিয়ে যেতে চাইত। তাদের ছোট্ট জনপদ কেলুরি, পরিচিত মানুষগুলো, আরো অন্তরঙ্গ করে জানা বন, পাহাড়, উপত্যকা, বনভূমিতে শ্বাপদের সংসার, সব একেবারে অসহ্য হয়ে উঠত সিজিটোর কাছে।

একদিন আকাশের ওপারে সেই রহস্যের পৃথিবীটা দরজা খুলে দিল। সারুয়ামারুই তাকে নিয়ে গিয়েছিল কোহিমায়। পাহাড়ী শহর কোহিমা। অবাক বিস্ময়ে চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছিল সিজিটো। তাদের পরিচিত ছোট ছোট গ্রাম, ধান আর জোয়ারের খেত, শ্যামল মালভূমির বাইরে এমন সুন্দর সাজনো একটা জনপদ থাকতে পারে, তা কি সে জানত? এই শহরেই আর একটা জগৎ তার পাহাড়ী মনের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। সারুয়ামারুই পাদ্রীসাহেবের সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। হুন্টসিঙ পাখির পালকের মতো ধবধবে গায়ের রং সাহেবের। চোখের মণি দুটো কী উজ্জ্বল! কী নীল!

ওই কোহিমা শহর, ওই পাদ্রীসাহেব বার বার সভ্যতা থেকে অনেক দূরের এক বিচিত্র পাহাড়ী মনকে আকর্ষণ করে আনল। অনেক গল্প শুনল সিজিটো। যীশুর কাহিনী, বাইবেলের গল্প। সেসব গল্পের প্রায় সবগুলোই সঙ্গে সঙ্গে ভুলে গেল সে। অনেক জামাকাপড় উপহার পেল। লালচে রঙের পানীয় আর খাবার খেয়ে এসে তার কথা সবিস্তার গ্রামের সকলকে বলল। পাদ্রী সাহেব একটু একটু করে ক্রস আঁকতে শেখাল তাকে। সে অনেক ইতিহাস।

এই কোহিমা পেরিয়ে সে সাহেবের সঙ্গে গিয়েছিল মোককচঙ, মোককচঙ থেকৈ মাও, মাও পেরিয়ে ইম্ফল। সাহেব তাকে আশ্বাস দিয়েছে, ডিমাপুরে নিয়ে যাবে। মস্ত বড় শহর গুয়াহাটিও বাদ যাবে না। সেখান থেকে শিলং।

সুদূর স্বপ্নবৎ শহরের গল্প বলে বলে সে গ্রামের সকলকে হকচকিয়ে দেয়। এই নগণ্য পাহাড়ী গ্রাম, আর ওই ছয় আকাশ ছয় পাহাড়ের ওপারে যে বিচিত্র জগৎ ছড়িয়ে রয়েছে, এই দুইয়ের মধ্যে সিজিটো হল সেতুবন্ধ। সারুয়ামারুই তাকে প্রথম শহরে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সারুয়ামারুর দৌড় কোহিমা পর্যন্ত। সারুয়ামারুকে অনেক পেছনে ফেলে অনেক এগিয়ে গিয়েছে সিজিটো।

কয়েক দিন আগে সে কোহিমা গিয়েছিল। এই মাত্র ফিরে এসেছে। অপূর্ব এক পৃথিবীর সংবাদ সে নিশ্চয়ই নিয়ে এসেছে। নিশ্চয়ই সে সংবাদ রূপকথার মতো মনোরম। গ্রামের মানুষগুলো সিজিটোর গল্প শোনার জন্য আগ্রহে, কৌতূহলে উদগ্রীব হয়ে রয়েছে।

বুড়ো খাপেগা বলল, এবার তো কোহিমা থেকে ফিরলি। সেখানকার গল্প বল সিজিটো। সকলে শুনি।

আকাশে সন্ধ্যার ছায়া গাঢ় হয়ে আসছে। বাতাস হিমাক্ত হয়ে উঠতে শুরু করেছে। সিজিটো বলল, এখুনি রাত নামবে। চল, মোরাঙে গিয়ে বসি।

সারুয়ামারুর বউ জামাতসু এগিয়ে এল সামনে। সে বলল, আমরা মাগীরা তো মোরাঙে ঢুকতে পারব না। এখানে বসেই গল্প বল সেঙাইয়ের বাপ। আমি মশাল জ্বালিয়ে দিচ্ছি। আর হাত-পা সেঁকবার জন্যে কাঠে আগুন ধরাচ্ছি।

সিজিটোকে দেখে চোখ দুটো বিচিত্র আনন্দে ধক ধক জুলছিল জামাতসুর। সিজিটো এসেছে। রক্তকণাগুলো আগুনের বিন্দু হয়ে শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে তার।

জামাতসুর দিকে একবিন্দু হৃক্ষেপ নেই। সিজিটো সমানে বলে চলল, বুঝলি সদ্দার, তোর সঙ্গে একটা কথা আছে।

বুড়ো খাপেগা এই ছায়া-ছায়া অন্ধকারে সিজিটোর মুখের দিকে তাকাল, কী কথা রে সিজিটো?

ফাদার একবার আমাদের বস্তিতে আসতে চায়। তা আমি বললাম, আমাদের সদ্দারের সঙ্গে কথাবার্তা বলে নিই। তারপর আমি খবর দিলে যাবি। আমাদের পাহাড়ী বস্তিতে না বলে কয়ে গেলে শেষে কে কোথা থেকে বর্শা হাঁকড়ে বসবে, তার কি কিছু ঠিক আছে? তোকে তো চেনে না আমাদের বস্তির লোকেরা। হয়তো তোকে শত্রু মনে করতে পারে। গম্ভীর গলায় কথাগুলো বলল সিজিটো।

কিন্তু তোর ফাদার আমাদের বস্তিতে আসবে কী করতে? বুড়ো খাপেগার কপালে অসংখ্য বলিরেখায় সংশয় ফুটে বেরুল।

বস্তির সকলকে ক্রস আঁকা শেখাবে।

আমরা তো কেউ নিমক নিইনি তোর সাহেবের কাছ থেকে। তবে আমাদের ও-সব। শেখাবে কেন? তুই আর সারুয়ামারু নিমক নিয়েছিস, আরো কত কিছু নিয়েছিস, তোরা তোদের ফাদার যা বলবে, তাই করবি। খবদ্দার নিমকহারামি করবি না। আমরা নিমক নিইনি, আমরা কেন ও-সব শিখতে যাব? বুড়ো খাপেগার ভ্র দুটো কাঁকড়া বিছের মতো কুঁচকে এল।

হো-ও-ও-ও—

পাহাড়ী মানুষগুলো চিৎকার করে উঠল।

এই থাম শয়তানের বাচ্চারা। হুঙ্কার দিয়ে উঠল বুড়ো খাপেগা। তারপর আবার সিজিটোর দিকে তাকাল, না না, এই বস্তিতে হুই সব ভিনদেশী মানুষ ঢুকতে পারবে না। আনিজার গোসা এসে পড়বে। তোরা বস্তির বাইরে গিয়ে যা খুশি করিস। কিন্তু বস্তিতে হুই সব চলবে না।

আচমকা কে যেন বলে উঠল, রাত্তির হল, এখনও তো সেঙাই ফিরল না উত্তরের পাহাড় থেকে। ওর কী হল সদ্দার?

নাচ আর বাজনার তুমুল উল্লাসের মধ্যে সেঙাইর কথা খেয়াল ছিল না কারো। তার ওপর কোহিমা থেকে ফিরেছে সিজিটো। সঙ্গে নিয়ে এসেছে অফুরন্ত গল্পের ভাণ্ডার। সুদূর অজানা শহরের গল্প, বরফসাদা সাহেবদের গল্প। সেসবের ভেতর মগ্ন হয়ে গিয়েছিল ছোট্ট পাহাড়ী গ্রাম কেলুরির মানুষগুলো।

আচমকা সবাই চকিত হয়ে উঠল। তাই তো, সেঙাই নেই এই নাচ বাজনার আসরে, এই বিশাল আকাশের নিচে গল্পকথার উল্লসিত কলরবের মধ্যে।

বুড়ো খাপেগা বলল, উত্তর পাহাড়ে কখন গেল সে?

ওঙলে বলল, আমরা সকলে খুনোতে (আবাদী জমি) গিয়েছিলাম দুপুরে। আগাছায় আগুন দিয়ে ফিরবার পথে সেঙই গেল উত্তর পাহাড়ে। সে বলল, তোরা গিয়ে নাচ গান শুরু কর। আমি এখুনি আসছি। তখন বিকেল হয়েছে। গান বাজনার মধ্যে ওর কথা আর খেয়াল ছিল না। তাই তো, এখন কী করব সদ্দার?

কী সর্বনাশ! হুই দিকটা ভালো নয়। টিজু নদী পেরিয়ে হুই সালুয়ালাঙ বস্তির শয়তানেরা মাঝে মাঝে এপারে আসে। ওরা হল আমাদের শত্রু। শিগগির তোরা মশাল নিয়ে একবার যা। দ্যাখ কী হল?

সিজিটো বলল, যেতে হবে না। সেঙাই ঠিক এসে পড়বে।

আকাশ থেকে শীতের রাত এই নাগা পাহাড়ের ওপর গাঢ় অন্ধকার ঢালছে। নিবিড় অন্ধকার। কোথাও এতটুকু ফাঁক নেই।

দাঁতমুখ খিঁচিয়ে সিজিটোর দিকে তাকাল বুড়ো খাপেগা, তুই চুপ কর। সায়েবদের গা চাট গিয়ে।

আচ্ছা আচ্ছা। আমি ঘরে যাই তবে। সামনের দিকে পা বাড়িয়ে দিল সিজিটো।

একসময় গোটাকয়েক মশাল জ্বলে উঠল। তারপর সেই মশালগুলো তীরের ফলার মতো সাঁ সাঁ করে নেমে গেল উপত্যকার দিকে।

হো-ও-ও-ও—

একটা ভয়ঙ্কর পাহাড়ী ঝড় উত্তর পাহাড়ের দিকে ধেয়ে চলল।

.

১১.

সালুয়ালা গ্রামের ওপর জা কুলি মাসের রাত্রি এখন নিথর হয়ে আছে। কেসুঙে কেসুঙে পাহাড়ী মানুষগুলো অসাড়ে ঘুমুচ্ছে। অন্ধকারের সঙ্গে গুঁড়ো গুড়ো বরফের কণা ঝরছে আকাশ থেকে। মোরাঙের মধ্যে পেন্যু কাঠের মশাল এখন নিভে গিয়েছে। অগ্নিকুণ্ড থেকে এতটুকু রক্তাভাসও বেরিয়ে আসছে না বাইরে।

হিমার্ত বাতাস মাঝে মাঝে চাবুকের মতো আছড়ে পড়ছে বনশীর্ষে। এই তুষারঝরা রাতে শুধুই কনকনে বাতাস আর নিবিড় অন্ধকার। পাহাড়ী গ্রামটা শীত ঋতুর ভয়াল রাতের থাবা থেকে পালিয়ে দড়ির লেপের নিচে ডুব দিয়েছে। একটা নিটোল আর মসৃণ ঘুমের অতল স্তরে তলিয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে।

কোথাও শব্দ নেই। নিস্তব্ধ জনপদ। এমনকি শুয়োর আর কুকুরগুলো পর্যন্ত একটু উত্তাপের জন্য পাহাড়ের খাঁজে ঢুকে গিয়েছে। কুণ্ডলী পাকিয়ে হিমাক্ত পাথরের ওপর স্থির হয়ে পড়ে রয়েছে পোষা মোষের দল।

এই সময় অনেক দূরের পোকরি কেসুঙ থেকে একটা মশালের আলো মোরাঙের দিকে। এগিয়ে আসতে লাগল। ক্ষীণ একটু আলোকবিন্দু। চারপাশের জমাট অন্ধকারকে সামান্য সরিয়ে আবছা পথ করে নিতে পেরেছে। মশাল ঘিরে ঝাপসা আলোর বৃত্ত। আর সেই বৃত্ত ঘিরে গুড়ো গুড়ো বরফের কণা উড়ছে।

একটু একটু করে মশালের আলোটা মোরাঙের পেছনে এসে দাঁড়াল। পাশে অতল খাদ। বনের বাঁধনে জটিল হয়ে পাহাড় খাড়া নিচের দিকে নেমে গিয়েছে। মশালের নিস্তেজ আলো খাদের গভীরে পৌঁছুতে পারেনি। চারপাশ থেকে গাঢ় কুয়াশা আলোকবিন্দুটির শ্বাসনলী চেপে ধরেছে যেন। আলো বেশিদুর ছড়িয়ে পড়তে পারছে না।

মশালের দু’পাশে দু’টি নারীমূর্তি। জানু থেকে মাথার ওপর পর্যন্ত দড়ির লেপ দিয়ে জড়ানো। তাদের ভৌতিক ছায়া এসে পড়েছে মোরাঙের দেওয়ালে। ছায়া দুটো কাঁপছে।

মোরাঙের দিকে দুজনে চনমনে চোখে তাকাল। তারপর একজন ভীরু গলায় বলল, খুব সাবধান মেহেলী, ওরা জানতে পারলে একেবারে টুকরো টুকরো করে কাটবে। আমার কিন্তু বড্ড ভয় করছে।

ভয় করলে কেসুঙে ফিরে যা লিজোমু। তুই আমার দাদাকে না পিরিত করতিস! তুই না দাদার পিরিতের মাগী ছিলি! তোর মতো মেয়েকে বর্শা দিয়ে কুঁড়ে মোরাঙে ঝুলিয়ে রাখা দরকার। মেহেলীর চোখ দুটো অন্ধকারেও জ্বলে উঠল।

আশ্চর্য! লিজোমু খেপে উঠল না। শুধু ফিসফিস গলায় বলল, খোকেকে খাদে ফেলে দিয়েছে সদ্দার। সে কি আর বেঁচে আছে?

খাদে ফেলার সময় একপাশে দাঁড়িয়ে আমি দেখেছি। এই ঘন বন। এর মধ্যেই হয়তো কোথাও আটকে আছে দাদা। তুই একটু দাঁড়া, আমি নিচে নেমে দেখে আসি। এখানে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকবি। খবদ্দার, মোরাঙের ওরা যেন টের না পায়। শেষ দিকে গলাটা কেঁপে কেঁপে উঠল মেহেলীর, তুই দেখিস, দাদা মরেনি। ও ঠিক আবার বেঁচে উঠবে। যদ্দিন সেরে না ওঠে, ওকে লুকিয়ে রাখতে হবে গাছের ওপরের ঘরে।

মোরাঙটার দিকে শঙ্কিত চোখে একবার তাকাল লিজোমু, আমার কিন্তু বুক কাঁপছে মেহেলী। আনিজার ভয়ে সদ্দার খোকেকে হুই খাদে ফেলে দিয়েছে। খোকেকে তুলে আনলে যদি আনিজার রাগ এসে পড়ে!

আতঙ্কে হঠাৎ মুখখানা ফ্যাকাসে হয়ে গেল মেহেলীর। তাই তো, এ ব্যাপারটা সে একবারও ভেবে দেখেনি। আনিজা! ওই একটি নামে ধমনীর ওপর রক্ত উথলপাথল হয়ে ওঠে। চেতনা কেমন যেন অসাড় হয়ে যায়। একবার টোক গিলল মেহেলী। পাহাড়কন্যা সে, হাতের মুঠিতে একটা বর্শা ধরা থাকলে শত্রুর হৃৎপিণ্ড এফেঁড় ওফোড় করে দিতে পারে। প্রয়োজন হলে মেরিকেৎসুর একটি আঘাতে গুড়ো গুঁড়ো করে দিতে পারে বুনো বাঘের মাথা। কিন্তু এই আনিজা নামটির মুখোমুখি হয়ে মেহেলী আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। তারপর কোত্থেকে সারা ধমনী মাতিয়ে মাতিয়ে রক্তের উচ্ছ্বাস খেলে গেল। একটা বিচিত্র দুঃসাহস কোত্থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে সব দ্বিধা ভাসিয়ে নিয়ে গেল। সব ভীরুতা মুছে গেল পাহাড়ী মেয়ের চেতনা থেকে।

মেহেলী বলল, দাদা নিশ্চয়ই বেঁচে আছে। এই বনের মধ্যে একটু একটু করে পচে মরবে সে! তুই কি তাই চাস লিজোমু? দেখি না, যদি বাঁচাতে পারি–

কিন্তু আনিজার রাগ? আর সদ্দার জানতে পারলে–বাকিটুকু আর শেষ করতে পারল না লিজোমু। অজানা আশঙ্কায় গলাটা আপনা থেকেই বুজে এল তার।

যা হবার হবে। আমার অত ভয় নেই। আনিজার রাগ হলেও মরব আর সদ্দার জানতে পারলেও বাঁচব না। তুই ওপরে দাঁড়া লিজোমু। আমি খাদে নামছি।

মশালটা বাঁ হাতের থাবায় চেপে ধরে খাড়াই পাহাড়ের গা বেয়ে বেয়ে খাদের দিকে নেমে গেল মেহেলী। আর একটা প্রেমূর্তির মতো মোরাঙের পাশে, তুষারঝরা আকাশের তলায় দাঁড়িয়ে রইল লিজোমু।

পাহাড়ী অরণ্য। গহন আর নীরন্ধ্র। মশালটা নিয়ে সন্তর্পণে পা ফেলে ফেলে নামছে মেহেলী। গাছের ফাঁক দিয়ে, ঝোঁপের পাশ দিয়ে পথ করে করে এগুতে হচ্ছে। দুটো চোখের দৃষ্টিকে মশালের আলোর চেয়েও তীক্ষ্ণতর করে একটি মানবদেহের সন্ধানে চারিদিকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ফেলছে সে। খোনকের দেহের এতটুকু চিহ্ন কোথাও দেখতে পেলেই সে ঝাঁপিয়ে পড়বে। তারপর দু’টি হাত দিয়ে জাপটে ধরে তুলে নিয়ে আসবে। মেহেলীর স্থির বিশ্বাস, খোনকের দেহটা খাদের অতলে গড়িয়ে যায়নি। এই বনের কোথাও, নিশ্চয়ই কোনো শিকড়ে কি গাছের ডালে, কি ঝোঁপের মাথায় আটকে আছে।

হিমঝরা এই বনের মধ্যে শ্বাপদের চিহ্নমাত্র নেই। গুহার সঙ্কীর্ণ বিস্তারের মধ্যে নিজেদের শরীর গুঁজে দিয়ে একটু উত্তাপ সৃষ্টি করছে তারা। বাঘ, চিতা কি বুনো মোষ জা কুলি মাসের এই প্রখর শীতের দাপটে তাদের সহজ বিচরণের রাজ্য থেকে পালিয়ে গিয়েছে।

জানুর তলা থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত অনাবৃত। শীতের রাত শরীরের সেই অংশটুকুর ওপর কেটে কেটে বসছে। পা দুটো যেন পক্ষাঘাতের তাড়নায় অসাড় হয়ে আসতে শুরু করেছে মেহেলীর।

সামনের জীবো গাছটাকে কঠিন বাঁধনে জড়িয়ে ধরেছে একটা কালো রঙের লতা। আচমকা মেহেলীর মশাল কেমন করে যেন সেই লতায় গিয়ে লাগল। সাঁ করে লতাটা সোজা। হয়ে গেল, তারপরেই কালো বিদ্যুতের মতো পাশের একটা ঝোঁপের ওপর আছড়ে পড়ে অদৃশ্য হল। লতা নয়, একটা পাহাড়ী অজগরের বাচ্চা।

থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল মেহেলী। কিছুক্ষণ পর সতর্কভাবে আবার নিচের দিকে পা চালিয়ে দিল সে।

জা কুলি মাসের রাত্রি ক্রমশ ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে! অসহ্য শীতে আঙুলের ডগাগুলো চিনচিন করতে শুরু করেছে। চামড়া চৌচির করে ফিনকি দিয়ে যেন এখুনি রক্ত বেরিয়ে আসবে।

অসহায় চোখে চারিদিকে একবার তাকাল মেহেলী। কোথাও খোকের চিহ্নমাত্র নেই। যেদিকে তাকানো যাক, নিবিড় বন আর গাঢ় অন্ধকার হা হা গ্রাস মেলে রয়েছে। পাহাড়ী মেয়ে মেহেলীর বুকের মধ্যে ভয়ের শিহরন খেলে গেল। সমস্ত দেহটা শিরশির করে উঠল তার।

পাশেই কোনো একটা গুহা থেকে এই অতল খাদ কাঁপিয়ে গর্জন করে উঠল একটা খ্যাপা বাঘ। সেই গর্জনের প্রতিধ্বনি দু’পাশের পাহাড়ে আছাড়ি পিছাড়ি খেতে খেতে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। কোথায় কোন বনচূড়া থেকে প্রেতকণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল এক ঝাক টানডেলা পাখি। পাখি নয়, যেন আনিজার কান্না। বাইরেই কেবল হিম ঝরছে না, অপরিসীম ভয়ে সারা দেহের রক্ত গুড়ো গুঁড়ো বরফ হয়ে ধমনীর ওপর আছাড় খেতে লাগল মেহেলীর। একসময় প্রায় অসাড় শরীর নিয়ে পাহাড়ের একটা খাঁজের মধ্যে বসে পড়ল সে। তার হাতের থাবা থেকে মশালটা ছিটকে পড়ল ঘাসের ওপর।

শুকনো ঘাস। জা কুলি রাত্রির হিমে ভিজে গিয়েছিল। তবে পেন্যু কাঠের মশালের শিখা লেগে জ্বলে উঠল। শীতে আড়ষ্ট দু’টি হাত আর দু’টি পা সেই আগুনের দিকে বাড়িয়ে দিল মেহেলী।

সারা দেহের পেশীতে পেশীতে চেতনা ছিল না তার। একটু একটু করে আগুনের উত্তাপে রক্ত সঞ্চালন শুরু হল। জা কুলির রাত্রির হিমঝরা শীতে আগুনের শিখাটুকুতে মধুর আরাম রয়েছে।

সেই আগুন একটু পরেই নিস্তেজ হয়ে এল। ঊর্ধ্বমুখ শিখা ক্ষীণ হল। আগুনের অল্প অল্প আভা রয়েছে শুধু। আচমকা সেই ক্ষীণ রক্তাভায় সামনের দিকে তাকাতেই সারা দেহে কেমন চমক খেলে গেল মেহেলীর। স্নায়ুগুলো ঝঙ্কার দিয়ে উঠল। সামনের ভেরাপাঙ গাছের ঝাঁকড়া মাথায় একটা মানুষের দেহ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। ঘন পাতার ফাঁক দিয়ে তার হাত বাইরে বেরিয়ে এসেছে। নিশ্চয়ই খোনকে।

পাহাড়ী ঘাসের আগুন নিভে আসছে। বিষণ্ণ রক্তাভা মুছে যেতে শুরু করেছে। হঠাৎ রক্তে প্রখর উত্তেজনা ঝা ঝা করতে শুরু করল মেহেলীর। জা কুলি রাত্রির হিমে শরীরটা অসাড় হয়ে এসেছিল। সে কথা ভুলে গেল মেহেলী। বিদ্যুতের স্পর্শে যেন লাফিয়ে উঠল সে। তারপর পে কাঠের মশালটা ঘাসের আগুনে গুঁজে দিল। কিন্তু নিভন্ত আগুনে মশাল জ্বলে উঠল না।

একপাশে মশালটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিল মেহেলী। তারপর নিরুপায় চোখে একবার এদিকে সেদিকে তাকিয়ে নিল। কিন্তু জা কুলি মাসের এই তুষারঝরা রাত্রি বড় নির্মম, ভীষণ নিষ্ঠুর। এতটুকু আগুন, এতটুকু উত্তাপের আভাসকে টুটি টিপে ধরার জন্য চারিদিকে ওত পেতে রয়েছে সেটা।

নাঃ, মূর্তির মতো এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে না। যেমন করেই হোক, খোনকের কাছে এখুনি পৌঁছুতে হবে মেহেলীকে। পাহাড়ী ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে সামান্য আগুন থেকে যে আলোটুকু বেরুচ্ছে সেটুকু ভরসা করেই মেহেলীর দেহমনে প্রেরণার উচ্ছ্বাস খেলে গেল। সন্তর্পণে পা ফেলে ফেলে সামনের ভেরাপাঙ গাছটার তলায় এসে দাঁড়াল মেহেলী।

প্রায় নিরেট অন্ধকার। ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে যে রক্তাভ আলো রয়েছে তার রেশ এতদূর এসে পৌঁছুতে পারেনি। আন্দাজে আন্দাজে, হাতড়ে হাতড়ে শেষ পর্যন্ত সেই নরদেহটির কাছে উঠে এল মেহেলী। এমনকি তার হাতখানা পর্যন্ত ছুঁতে পারা যাচ্ছে। বিশাল গাছ বেয়ে এই। মগডালে উঠতে হাঁপ ধরে গিয়েছিল মেহেলীর। দ্রুত তালে কয়েকটা নিশ্বাস পড়ল ঘন ঘন। ফুসফুস ভরে বারকয়েক বাতাস টেনে নেবার পর নিজের শরীর থেকে দড়ির লেপখানা খুলে ফেলল মেহেলী। তারপর অসাড় নরদেহটির আগাগোড়া নিবিড় করে জড়িয়ে দিল।

অনাবৃত দেহ। শীতের রাত চারিদিক থেকে নির্মমভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ল মেহেলীর ওপর। মনে হল, দাঁতে দাঁতে, নখে নখে এই হিমঝরা রাত্রি ফালা ফালা করে ছিঁড়ে ফেলবে তাকে। আর অপেক্ষা করা চলবে না। প্রতিটি মুহূর্তে এই রাত তাকে একটু একটু করে গ্রাস করছে।

গাছের মাথা থেকে সেই নিশ্চেতন নরদেহটিকে পিঠের ওপর তুলে নিল মেহেলী। ভারী সবল দেহ। মেরুদণ্ডটা বেঁকে যাবার উপক্রম হল তার। দড়ির লেপের দু’টি প্রান্ত দিয়ে নিজের পেটের সঙ্গে নরদেহটিকে বেঁধে নিল মেহেলী। পাহাড়কন্যা সে। পাথরের মতো কঠিন তার দেহের পেশী। ধীরে ধীরে সতর্কভাবে পা ফেলে ফেলে সরু ডাল থেকে মোটা শাখায়, তারপর বিশাল গুঁড়ি বেয়ে বেয়ে নামতে লাগল মেহেলী।

নিচে নেমে মানুষটাকে নামিয়ে বারকয়েক জোরে জোরে শ্বাস টানল সে। তারপর ঠাণ্ডা নরদেহটিকে আবার পিঠের ওপর তুলে নিল। এবার পাহাড়ের ঢাল বেয়ে বেয়ে খাড়া চড়াইর দিকে উঠতে লাগল সে। পিঠের ওপর অচেতন মানুষটির দেহভারে ধনুকের মতো বেঁকে গিয়েছে মেহেলী। মেরুদণ্ডটা টনটন করছে, যেন দেহ থেকে ছিটকে বেরিয়ে যাবে সেটা। দুহাত দিয়ে সামনের লতাপাতার বাধা সরিয়ে এগুতে লাগল মেহেলী।

হঠাৎ ডান পাখানা পিছলে গেল মেহেলীর। ছিটকে একটা পাহাড়ী গর্তের মধ্যে পড়ে গেল সে। কোমরের ওপর প্রচণ্ড চোট লেগেছে। মনে হচ্ছে, শরীরের নিচের দিকটা ছিঁড়ে বেরিয়ে গিয়েছে। জা কুলি রাত্রির এই চোটের কারণে মজ্জায় মজ্জায় তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা চমক দিয়ে যাচ্ছে তার। তীব্র গলায় আর্তনাদ করে উঠল মেহেলী, আ-উ-উ-উ–

কয়েক মুহূর্ত পর আবার খাড়া হয়ে উঠল মেহেলী। ইতিমধ্যে নরদেহটিকে পিঠ থেকে কাঁধের ওপর তুলে নিয়েছে সে।

নিস্তব্ধ আর নির্জন চড়াই। কাঁধে একটি অচেতন মনুষ্যদেহ ছাড়া আর কোথাও কোনো প্রাণের সাড়া নেই। এই মুহূর্তে কোনো হিংসে শ্বাপদের চোখে খানিকটা নীল আগুন দেখতে পেলেও আশ্বস্ত হতে পারত মেহেলী। কিন্তু এই ভয়াল শীতের রাতে কোনো আরণ্যক প্রাণীর সান্নিধ্য পাওয়া যাবে না কোথাও।

একসময় খাদের অতল থেকে ওপরে উঠে এল মেহেলী। একবার মোরাঙের পাশে দাঁড়িয়ে চারিদিকে সতর্ক দৃষ্টি বুলিয়ে নিল। নাঃ, ভয়ের কারণ নেই। মোরাঙের জোয়ান ছেলেরা দড়ির লেপের নিচে স্বপ্নের মনোরম জাল বুনে চলেছে এখন। সেই জালের কেন্দ্রবিন্দুতে একটি মাত্র মুখ। সে মুখ তাদের লগোয়া লেনদের (প্রেমিকাদের) মুখ।

একবার নিচের দিকে তাকাল মেহেলী। তারপর ফিসফিস গলায় ডাকল, লিজোমু, এই লিজোমু–

কোনো উত্তর নেই।

ফের ডাকল মেহেলী, এই লিজোমু–

খাদের ওপরে এই মোরাঙের কিনারে লিজোমু নামে কোনো নারীর গলা থেকে এবারও উত্তর এল না। নিশ্চয়ই সে এই অসহ্য শীতরাত্রির হিম সহ্য করতে না পেরে পালিয়ে গিয়ে দড়ির লেপের উষ্ণ আরামে এতক্ষণে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে পড়েছে।

আচমকা মোরাঙের মধ্যে মৃদু কলরব শোনা গেল। জেনুর (মধ্যরাত্রি) আগে গ্রামে গ্রামে নাগারা একবার জেগে ওঠে। নাগা পাহাড়ে এ একটা প্রচলিত রীতি।

আর দাঁড়াল না মেহেলী। মোরাঙের কিনার থেকে দ্রুত পাশের টিলার দিকে উঠে গেল সে। এই রাত্রিবেলায় সর্দার তার পিঠে খোনকের দেহটি দেখতে পেলে উপায় থাকবে না। নিদারুণ আতঙ্কে পায়ের পেশীতে পেশীতে দুর্বার বেগ নেমে এল। জা কুলির এই হিমা রাতেও গল গল করে ঘাম ছুটতে শুরু করেছে মেহেলীর।

এক এক করে নগুরি কেসুঙ, কাতারি কেসুঙ, নিপুরি কেসুঙ, পেরিয়ে গ্রামের প্রান্তে চলে এল মেহেলী। চারপাশে ঘন কুয়াশার পর্দা নেমে এসেছে। নানা কেসুঙের ঘরগুলোতে অস্পষ্ট আলো দেখা যায়। মাঝরাতে পাহাড়ী প্রথা অনুযায়ী সমস্ত সালুয়ালাঙ গ্রামখানা ঘুমের অতল স্তর থেকে জেগে উঠেছে। সামান্য কয়েকটি মুহূর্ত। মুঠি মুঠি কাঁচা তামাকপাতা চিবিয়ে কি বাঁশের পানপাত্রে কয়েক চুমুক রোহি মধু খেয়ে স্নায়ুগুলোকে চাঙ্গা করে তুলবে পাহাড়ী মানুষগুলো। তারপর আবার দড়ির লেপের তলায় মসৃণ একখানা ঘুমের মধ্যে ডুবে যাবে।

কখন যে বিশাল খাসেম গাছটার তলায় এসে দাঁড়িয়েছে, খেয়াল ছিল না মেহেলীর। এখন আর অস্বস্তি নেই। অন্তত সূর্য ওঠার আগে পর্যন্ত সে নিশ্চিন্ত। সকালের আলোতে পাহাড়ী মানুষগুলির হিংস্র চোখ খুলবার আগেই সে খোনকেকে লুকিয়ে ফেলতে পারবে।

একটু পর বাঁশের সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে গাছের ওপর উঠে এল মেহেলী। কাঁধে সেই আচেতন নরদেহ। গাছের ডালে ছোট্ট একখানি ঘর। বাঁশের দেওয়ালে লতার বাঁধন আর মাথায় আতামারী পাতার চাল। এই ঘরখানা মেহেলীর। রাতে এখানেই তার নিঃসঙ্গ বিছানা পাতা হয়। কুমারী মেয়ের একক শয্যা পুরুষের কামনা থেকে অনেক, অনেক উঁচুতে যেন উঠে এসেছে।

ধীরে ধীরে মাচানে মানুষটিকে শুইয়ে দিল মেহেলী। তারপর একটা হরিণের ছাল নিজের সারা গায়ে জড়িয়ে মানুষটির দিকে ঝুঁকে পড়ল। পাতার চাল, চারপাশে বাঁশের বেড়া আর সমস্ত দেহে হরিণের ছাল জড়ানো। সব মিলিয়ে একটা উষ্ণ আরামদায়ক পরিমণ্ডল।

মেহেলী ডাকল, দাদা, এই দাদা–

নিরুত্তর পড়ে রইল মানুষটি। একটু চুপ করে রইল মেহেলী, তারপর একখানা হাত সেই লোকটার ঠাণ্ডা শরীরে বিছিয়ে দিল। কিছুক্ষণ পর একটু একটু কঁকানি দিতে লাগল সে। নাঃ, জীবনের কোনো লক্ষণ, চেতনার কোনো আভাসই নেই সেই দেহে। অনেকক্ষণ আগে খোকেকে সেই খাদের মধ্যে ফেলে দিয়েছিল মোরাঙের জোয়ানেরা! জা কুলি রাতের হিমে হিমে একেবারে জমাট বরফ হয়ে গিয়েছে তার দেহ। মানুষটির নাকের কাছে হাত রাখল। মেহেলী। অনেকটা পর পর গরম নিশ্বাসের ক্ষীণ এক একটা ধারা তিরতিরিয়ে পড়ছে হাতের ওপর। এই শ্বাসপতন বুঝিয়ে দিচ্ছে খোনকে বেঁচে আছে। নিশ্চয়ই বেঁচে আছে। সর্বাঙ্গে ঢেউ খেলে গেল মেহেলীর। তার এই দুঃসাহস, আনিজার বিরুদ্ধে এই সক্রিয় প্রতিবাদ তবে ব্যর্থ হয়নি।

ঘরের এক কোণে মাটির পাত্রে একরাশ নিভু নিভু আগুন রয়েছে। হামাগুড়ি দিয়ে পাত্রটার কাছে চলে এল মেহেলী। ওটার ঠিক পাশেই অনেকগুলো বাঁশের চোঙা, রোহি মধুতে কানায় কানায় পূর্ণ। একটা পানপাত্র তুলে ঢকঢক করে আকণ্ঠ গিলে নিল মেহেলী। শরীরটা এবার বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। শীতার্ত ইন্দ্রিয়গুলো সক্রিয় হচ্ছে তার। এখন হিমঝরানো জা কুলির রাতটার সঙ্গে অনেকক্ষণ লড়াই করতে পারবে মেহেলী।

বাঁশের পাটাতন থেকে আগুনের আধারটা তুলে নিল সে। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে আবার সেই মানুষটির কাছে চলে এল। আগুন নিভে এসেছিল, জোরে জোরে কয়েকটা ফুঁ দিল মেহেলী। ওপরের সাদা রঙের ছাই সরে গিয়ে আগুনটা বেরিয়ে এল।

পাটাতনের একপাশে একপিণ্ড কার্পাস তুলো পড়ে ছিল। সেটা তুলে আগুনের পাত্রটার ওপর মেলে ধরল মেহেলী। পরম মমতায় গরম তুলো দিয়ে সেঁক দিতে শুরু করল সে। বার বার। অচেতন দেহে একটু একটু করে প্রাণের সাড়া জাগল যেন, তারপর থরথর করে কেঁপে উঠল সেটা।

হঠাৎই ঘটে গেল ঘটনাটা। সেঁক দিতে দিতে মেহেলীর হাতখানা মানুষটার বুকের কাছে চলে এসেছিল। কিন্তু হাতড়ে হাতড়ে সেই বুকের কোথাও বিশাল ক্ষত খুঁজে পেল না মেহেলী। তবে, তবে এ কে? এ দেহ কার? খাদের অতল অরণ্য থেকে জা কুলি মাসের এই হিমাক্ত। রাত্রিতে কার দেহ বয়ে এনেছে মেহেলী? এ তো খোনকে নয়!

আনিজা! আনিজা! খাসেম গাছের মগডালে কুমারী মেয়ের এই ছোট্ট শোওয়ার ঘর। এই ঘরে কি খোনকের বদলে কোনো প্রেতাত্মার দেহ তুলে আনল মেহেলী? আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠতে চাইল সে, কিন্তু থাবা দিয়ে কে যেন কণ্ঠনলী চেপে ধরেছে। একটা শব্দও বেরিয়ে এল না তার গলা থেকে। অপরিসীম আতঙ্কে একেবারে পাথর হয়ে গিয়েছে যেন মেহেলীর সারাটা দেহ।

প্রচণ্ড আতঙ্ক খেলে গেল দেহমনে। গাছের ওপর এই শূন্যের আশ্রয় থেকে মেহেলী পালিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু প্রাণান্ত চেষ্টাতেও বাঁশের সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়ে দেবার সামর্থ্যটুকুও সে হারিয়ে ফেলেছে। নিপ্রাণের মতো বসেই রইল মেহেলী।

জমাট অন্ধকার। একসময় সামনের নিঃসাড় দেহটা থেকে একটা অস্ফুট কাতরোক্তি শুনতে পেল মেহেলী, আ-উ-উ-উ–

নাঃ, আনিজা নয়। একটি জীবন্ত মানুষ রয়েছে এই ছোট্ট ঘরখানার মধ্যে। খানিকটা সাহস ফিরে এল মেহেলীর স্নায়ুগুলোতে। সাহস নয়, দুঃসাহস। আগুনের পাত্রটা মানুষটির মুখের

কাছে নিয়ে এল মেহেলী। এক অদম্য কৌতূহলে তার নিশ্বাস দ্রুততর হয়ে উঠেছে।

অগ্নিপাত্রটার ওপর ঝুঁকে বারকয়েক জোরে জোরে ফুঁ দিল মেহেলী। আর সেই রক্তাভ আগুনের আভায় মানুষটির মুখখানা দেখে চমকে উঠল সে। খোনকে নয়, এ তো টিজু নদীর ওপারের কেলুরি গ্রামের ছেলে সেঙাই। তাদের শত্রুপক্ষ। বিমূঢ়ের মতো তাকিয়ে রইল মেহেলী। তবে তো খাদের গভীর পাতাল থেকে শত্রুপক্ষের ছেলেকে পিঠের ওপর তুলে নিয়ে এসেছে সে! তারপর পরম মমতায় নিজের বিছানায় শুইয়ে দিয়েছে।

আ-উ-উ-উ– এবার দেহটা নড়তে শুরু করেছে। আর মাঝে মাঝে অস্পষ্ট গলায়। আর্তনাদ করে উঠছে সেঙাই।

সেঙাই! তাদের শত্রুপক্ষের ছেলে। কয়েক দিন আগের একটা মোহময় বিকেল চেতনার মধ্যে দোল খেয়ে উঠল যেন মেহেলীর। সেদিন জোহেরি বংশের দুর্দান্ত যৌবনের মুখোমুখি হয়েছিল সে। একটা বর্শার ফলা তার দিকে তুলে ধরেছিল সেঙাই।

আশ্চর্য! রোজ টিজু নদী ডিঙিয়ে কী এক অদম্য আকর্ষণে ওপারের সেই নিঃশব্দ ঝরনাটার পাশে চলে যেত মেহেলী। টানডো পাখির মতো জল ছিটিয়ে ছিটিয়ে স্নান করতে বড় ভালো লাগত। বিচিত্র যোগাযোগ। সেই ঝরনার পাশেই দেখা হয়েছিল সেঙাইর সঙ্গে। বর্শা তুলে ধরেছিল বটে, কিন্তু সামান্য একটু আত্মসমর্পণ করতে আর তাকে ঘা দেয়নি শত্রুপক্ষের ছেলে। পাহাড়ী জোয়ানের পিঙ্গল দু’টি চোখে বিচিত্র এক ভাষা দেখে তার যৌবন ঝঙ্কার দিয়ে উঠেছিল। সোনালি বুক, নিটাল দেহ, মসৃণ শরীর। বুকের ভেতর শিহরন খেলে গিয়েছিল তার। পাহাড়ী কুমারীর যৌবন জলপ্রপাতের মতো উদ্দাম। সেদিন সেঙাই-এর বর্শার নিচেই নিজেকে সমর্পণ করেনি মেহেলী, ভেবেছিল নিবিড় আলিঙ্গনে জোহেরি বংশের এক খ্যাপা যৌবন যদি তাকে পিষে ফেলত, তা হলে হয়তো সে চরিতার্থ হতে পারত। তার নিজেকে সমর্পণ সার্থক হয়ে উঠত। কিন্তু সেদিন সেঙাই তাকে ছুঁয়েও দেখেনি, নিঃশব্দে চলে গিয়েছিল। তারপর আরো কদিন ঝরনার ধারে সেঙাই-এর খোঁজে গিয়েছে মেহেলী। কিন্তু শত্রুপক্ষের যুবকটিকে আর দেখা যায়নি।

সেদিনের বিকেল ঘিরে তার বন্য কামনার কথা থাক। একটা হিসাব কিছুতেই মিলছে না মেহেলীর। এই অতল খাদের মধ্যে কী করে এসে পড়ল সেঙাই? টিজু নদী ডিঙিয়ে সালুয়ালাঙ গ্রামের খাদে কিসের সন্ধানে এসেছিল সে?

আ-উ-উ-উ–আর্তনাদটা এবার বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

চকিত হয়ে উঠল মেহেলী। হামাগুড়ি দিয়ে রোহি মধু-ভরা একটা বাঁশের পানপাত্র নিয়ে এল। হাতিয়ে হাতিয়ে সেঙাই-এর মুখখানা খুঁজে বার করল। ঠোঁট দুটো দৃঢ়বদ্ধ। ডান হাতের আঙুল দিয়ে সেঙাই-এর মুখটা ফাঁক করে দিল মেহেলী। তারপর বাঁশের পানপাত্র থেকে ফোঁটা ফোঁটা রোহি মধু ঢেলে দিতে লাগল জিভে। প্রথমে চেটে চেটে সেই উষ্ণ পানীয়ের আস্বাদ নিতে লাগল সেঙাই। পরে ঢকঢক করে গিলে পানপাত্রটা শূন্য করে দিল।

মেহেলী ডাকল, এই সেঙাই, এই—

সাড়া নেই। শরীর আবার নিথর হয়ে গিয়েছে। নিরুত্তর পড়ে রইল সেঙাই।

এবার দুহাত দিয়ে আঁকানি দিল মেহেলী। তবু জবাব নেই সেঙাই-এর তরফ থেকে। তেমনই চুপচাপ পড়ে রয়েছে সে।

সমস্ত দেহের রক্তকণাগুলো সরীসৃপের মতো কিলবিল করতে শুরু করেছে মেহেলীর। একটি কঠিনপেশী জোয়ান ছেলে, এই শীতের রাত্রি, সেই জোয়ান ছেলেটিকে আগুনের তাপে উষ্ণ করে তুলেছে সে, রোহি মধুর মৌতাত দিয়ে তার স্নায়ুগুলোকে উত্তেজিত করে তুলতে চেয়েছে। কিন্তু এ কী হল? সেঙাই-এর হিমার্ত দেহের শুশ্রূষা করতে করতে এক বিচিত্র সম্ভাবনা শিরায় শিরায় বিদ্যুতের মতো খেলে গিয়েছে তার। এই কুমারীগৃহ দু’টি পাহাড়ী যৌবনকে নিয়ে সার্থক হয়ে উঠতে পারে। এই নিঃসঙ্গতা মনোরম হয়ে উঠতে পারে। মেহেলী ভুলে গিয়েছে খোকের কথা। তার রক্তে রক্তে আদিম অরণ্য ডাক দিয়েছে।

খ্যাপা বাঘিনীর মতো সেঙাই-এর পাশে বসে ফুলতে লাগল মেহেলী। এই শীতের হিমে আচমকাই যদি শত্রুপক্ষের পুরুষ তার কাছে এসে পড়েছে, কেন সে তার কুমারী জীবনের বাসনাকে অতৃপ্ত রেখে দেবে? বুকের ভেতর মেহেলীর ফুসফুসটা ফুঁসে ফুঁসে উঠছে। প্রচণ্ড উত্তেজনায় কেঁপে উঠছে সারা দেহ।

আচমকা সেঙাই-এর বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল মেহেলী। দু’টি হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল তার দেহটা। মেহেলীর ধারাল নখ কেটে কেটে বসে গেল সেঙাই-এর বুকে পিঠে গলায় ঘাড়ে।

ময়াল সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করে কয়েকটা উত্তপ্ত নিশ্বাস পড়ল সেঙাই-এর বুকে। মেহেলী চাপা গলায় গর্জন করে উঠল, এই সেঙাই, এই

নিথর পড়ে রয়েছে সেঙাই। একবার শুধু অপরিসীম ক্লান্ত গলায় আর্তনাদ করে উঠল সে, আ-উ-উ-উ–

হিস হিস করে উঠল মেহেলী, আমি তোকে খাদ থেকে তুলে আনলাম। আর আমার কথাটা শুনতে পাচ্ছিস না শয়তানের বাচ্চা!

মেহেলীর আলিঙ্গন তীব্র হল, তারপর তীব্রতর। তার শাণিত নখ আর দাঁতগুলো ফালা ফালা করে ছিঁড়ে ফেলতে লাগল সেঙাই-এর দেহ।

আ-উ-উ-উ–

সমস্ত শরীর শিথিল হয়ে গিয়েছে সেঙাই-এর। পাহাড়ী যুবতী মেহেলী তার দেহের সমস্ত উত্তাপ দিয়ে, তার মনের সমস্ত কামনার আগুন দিয়ে, তার বন্য উত্তেজনা দিয়ে আর ধারাল নখ-দাঁতের আঘাত দিয়েও সেঙাইকে মাতিয়ে তুলতে পারল না।

জা কুলি মাসের একটা উত্তেজক রাত মেহেলীর কাছে ব্যর্থ হয়ে গেল। একসময় পাহাড়ের ওপর আলোর অস্পষ্ট আভাস দেখা দিল। ঘন কুয়াশা ভেদ করে সেই আলো এসে পড়েছে খাসেম গাছের এই ছোট্ট ঘরখানায়।

সেঙাই-এর বুকের পাশে সারা রাত শুয়ে ছিল মেহেলী। এবার ধীরে ধীরে মাথা তুলল। প্রথম ভোরের এই অস্পষ্ট আলোতে সেঙাই-এর দিকে তাকিয়ে একটা তীব্র চমক খেলে গেল তার চেতনায়। কী ভয়ানক, কী বীভৎস দেখাচ্ছে সেঙাইকে।

একটু পর আস্তে আস্তে বাঁশের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেম গেল মেহেলী।

.

১২.

দক্ষিণ পাহাড় থেকে এখন কুয়াশা সরে গিয়েছে। উত্তর পাহাড়ের ঘন সবুজ উপত্যকা রোদের আলোতে ঝলমল করছে। কাল রাতে আকাশ থেকে যে অজস্র তুষারকণা ঝরেছিল, সূর্যের উত্তাপে টলটলে জলবিন্দু হয়ে ঘাস বা গাছের পাতায় সেগুলো ঝলমল করছে।

এদিকে পাহাড়ের চড়াইতে এই ছোট্ট পাহাড়ী গ্রাম সালুয়ালাঙ জেগে উঠেছে। কেসুঙে কেসুঙে নানা মানুষের চেঁচামেচিতে, আউ পাখির চিৎকারে, কুকুর আর মোরগগুলোর অবিশ্রান্ত ডাকাডাকিতে উদ্দাম পাহাড়ী জীবনের পরিচয়।

খাসেম গাছের মগডালে একটি নিঃসঙ্গ কুমারী মেয়ের বিছানা। তার ওপর একটু একটু করে চোখ মেলল সেঙাই। পিঙ্গল চোখ এখন লাল। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারছে না সে। অপরিসীম ক্লান্তিতে চোখ দুটো আপনা থেকেই বুজে আসছে। প্রচণ্ড নেশার পর পেশীগুলো যেমন শিথিল হয়ে আসে, ঠিক তেমনই এক অবসাদে দেহের গ্রন্থিগুলো যেন এলোমেলো হয়ে গিয়েছে।

কিছুক্ষণ নির্জীবের মতো পড়ে রইল সেঙাই। তারপর আবার চোখ মেলল। চোখ মেলল, কিন্তু কিছুই যেন দেখতে পাচ্ছে না। তার দৃষ্টির সামনে চারিদিক ঝাপসা ঝাপসা। উপত্যকায় ওই রোদের রং, দক্ষিণ পাহাড়ের সারা গায়ে ওই নিবিড় বন-সব এক তরল ছায়ালোকের আড়ালে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। মাথার রগগুলো ঝনঝন করে ছিঁড়ে পড়ছে সেঙাইর, মজ্জায় মজ্জায় তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা চমক দিয়ে যাচ্ছে।

আরো অনেকটা সময় পার হয়ে গেল।

এবার চারিদিকে একবার চোখ দুটো ঘুরিয়ে আনল সেঙাই। মাটি থেকে অনেক উঁচুতে এই ঘর। নিচে বাঁশের পাটাতন, একপাশে গোটা কয়েক রোহি মধু-ভরা বাঁশের পাত্র, স্থূপাকার কার্পাস তুলোর পাঁজ, হরিণ আর মোষের কঁচা ছাল থেকে উগ্র দুর্গন্ধ–এ ছাড়া ঘরের মধ্যে আর কিছু নেই। অন্য কাউকেও এখানে দেখা যাচ্ছে না।

একসময় নিজের দিকে তাকাল সেঙাই। সারা দেহে রক্ত জমাট বেঁধে রয়েছে। থকথকে রক্ত হিমে জমে যাবার কারণে কালো হয়ে গিয়েছে। কপাল গলা বুক–দেহের প্রতিটি অংশে ফালা ফালা আঘাতের দাগ। কোথাও বা নখ আর দাঁতের অগভীর ক্ষত।

নিজের শরীরের এই বীভৎস আঘাতগুলোর কথা ভাবছে না সেঙাই। তার চেতনার মধ্যে চমক দিয়ে যাচ্ছে কালকের হিমাক্ত রাতটা। অস্পষ্ট কতকগুলি দৃশ্য। সেগুলোর ধারাবাহিকতা নেই, অসংলগ্ন সেই সব দৃশ্যের মিছিল সেঙাই-এর স্নায়ুর ওপর দোল খেতে খেতে এগিয়ে চলেছে।

সালুয়া গ্রাম। সেখানকার মোরাঙ। খোনকের বুকের ক্ষতমুখে মেটে রঙের হৃৎপিণ্ড। তামুন্য। সালুয়ালা গ্রামের সর্দার। মোরাঙের দরজায় মশাল ধরে দাঁড়িয়ে ছিল মেহেলী। একসময় খোনকেকে খাদে ফেলতে এসেছিল এই গ্রামের কয়েকটি জোয়ান ছেলে। তার আগেই খানিকটা নিচের দিকে নেমে একটা বিশাল পাথরের চাই ধরে আশ্রয় নিয়েছিল সেঙাই। তারপর হিম আর হিম। আশুমি সাপের বিষের মতো জা কুলি রাত্রির হিম তার দেহটাকে জর্জরিত করে দিয়েছিল। অবশ হয়ে গিয়েছিল চেতনাটা। একসময় খোনকেকে খাদে ফেলে গিয়েছিল জোয়ান ছেলেরা। খাড়াই পাহাড়ের গা বেয়ে বেয়ে, নিবিড় বনের ফাঁক দিয়ে, গুম গুম শব্দ করতে করতে নেমে গিয়েছিল খোনকের দেহ। তারপরেই আশ্চর্য হিমে হাতের থাবা শিথিল হয়ে গিয়েছিল সেঙাই-এর। অস্পষ্ট চেতনার মধ্যে বুঝতে পারছিল, শূন্যে পাক খেতে খেতে সে নেমে যাচ্ছে। তারপর আর কিছু মনে নেই।

কিন্তু এই মুহূর্তে সেঙাই-এর দুর্বল স্মৃতি কিছুতেই ধরতে পারছে না, কেমন করে এই অচেনা ঘরের মধ্যে সে চলে এল? কে তাকে এই নিঃসঙ্গ বিছানায় শুইয়ে দিয়ে গিয়েছে?

হঠাৎ বাঁ দিকে তাকাল সেঙাই। একটা কাঠের পাত্রে একপিণ্ড ভাত, খানিকটা ঝলসানো মাংস আর বাঁশের পানপাত্রে রোহি মধু রয়েছে। তার চোখ দুটো ধক করে জ্বলে উঠল। মনে পড়ল, কাল দুপুরের পর এক কণা ভাতও পেটে পড়েনি। আর কিছু ভাবার সময় নেই। পেটের মধ্যে খিদের ময়াল এতক্ষণ পাক দিচ্ছিল। অসীম অবসাদের জন্য খিদের বোধটা কেমন যেন ভোতা হয়ে ছিল। এই মুহূর্তে ভাতের পাত্রটা দেখবার সঙ্গে সঙ্গে পেটের সেই ময়ালটা দাপাদাপি শুরু করে দিল।

বুক হিঁচড়ে হিঁচড়ে পাত্রটার কাছে এগিয়ে এল সেঙাই। ভাতের দলার ওপর অনেকগুলো পাহাড়ী পিঁপড়ে জমা হয়েছে। সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই তার। ব্যগ্র একখানা থাবা পাত্রটার দিকে বাড়িয়ে দিল সে। বড় বড় গ্রাসে ভাত আর মাংস শেষ করে ফেলল। একপাশে বাঁশের পানপাত্রটা পড়ে ছিল, সেটা তুলে এক চুমুকে শূন্য করে দিল সেঙাই।

এখন অবসাদ অনেকটা কেটে গিয়েছে ইন্দ্রিয়গুলো থেকে। বেশ সুস্থ মনে হচ্ছে নিজেকে। ভাত, মাংস আর রোহি মধু খাওয়ার পর শরীরটা রীতিমতো চাঙ্গা হয়ে উঠল সেঙাই-এর। এতক্ষণ শুয়ে শুয়ে খাচ্ছিল, এবার বাঁশের পাটাতনের ওপর উঠে বসল।

খানিকটা সময় কেটে গেল। তারপর নিচের দরজার কাছে এসে মুখখানা বকের মতো বাড়িয়ে দিল সেঙাই। অচেনা গ্রাম। টিলার টিলায়, পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে অজানা মানুষের জটলা। যুবতী মেয়েরা সরু বাঁশের ফ্যাফা দিয়ে তুলো পিঁজছে। কেউ কেউ ন দিয়ে দড়ির লেপ বুনছে। আরো দূরে মেয়ে-পুরুষরা একসঙ্গে বেতের ত্রিকোণ আখুতসা (চাল রাখার ঝোড়া) বানাচ্ছে। নারী-পুরুষের যৌথ পরিশ্রমে এই পাহাড়ী গ্রাম দিনের কাজ শুরু দিয়েছে। কেউ কেউ পাথরের ওপর বর্শার ফলা শানিয়ে নিচ্ছে। এখানে প্রতিকূল প্রকৃতি। হিংস্র চিতা কি বুনো মোষ, হিংস্রতর প্রতিবেশী তাদের সঙ্গে বসবাস। অতএব, ধারাল বর্শার চেয়ে গভীর অন্তরঙ্গতা আর কার সঙ্গে সম্ভব? রোদের আলোতে ঝকমক করে উঠছে বর্শার ফলাগুলো।

গাছের ওপর ছোট্ট ঘরখানায় নিশ্চুপ বসে রইল সেঙাই। এখানকার একটি মানুষও তার পরিচিত নয়। এই অজানা গ্রামে এখন নামা নিরাপদ হবে না। ওই বর্শার ফলাগুলো তা হলে চৌফালা করে ফেলবে তাকে। আগে রাত্রি নামুক, তারপর দেখা যাবে। অন্ধকারের আড়াল ছাড়া এখান থেকে পালানো কোনোমতেই সম্ভব নয়। চারপাশে মৃত্যু ওত পেতে রয়েছে। ভাবতেও সেঙাই-এর মেরুদণ্ড বেয়ে হিমধারা নামতে শুরু করল।

বাঁশের মাচানের ওপর ফের শুয়ে পড়ে সেঙাই।

.

অনেকক্ষণ পর দূর থেকে মোষ বলির বাজনা ভেসে আসে। মেথিকেকোয়েনঘা খুলির গম্ভীর শব্দ উপত্যকার ওপর দিয়ে ছড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। দ্রাম-ম-ম-ম-ম। সেই সঙ্গে খুঙের ভয়ঙ্কর আওয়াজ। বাজনার শব্দে নেশা ধরে গেল সেঙাই-এর। বন্দি শ্বাপদের মতো গর্জন করে উঠতে চাইল সে। কিন্তু না, অচেনা গ্রামের মানুষগুলো একবার টের পেলে রক্ষে নেই। অতএব, বুকের মধ্যে নিরুপায় গর্জনটাকে স্তব্ধ করে দিতে হল।

এখন দুপুর। সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘরের মধ্যে আটকে থাকতে হবে তাকে। অসহায় আক্রোশে ফুলতে লাগল সেঙাই।

আচমকা বাঁশের সিঁড়িতে শব্দ হল। আর সেই শব্দটা এই ঘরের দিকে উঠে আসছে। চমকে উঠল সেঙাই, তারপর দ্রুত নিচের ফোকরটার কাছে চলে এল।

বাঁশের সিঁড়িটা সরাসরি পাটাতন ছুঁড়ে ওপরে উঠে এসেছে। সেটা বেয়ে বেয়ে ঘরের মধ্যে চলে এল মেহেলী।

পায়ের শব্দে চমকে উঠেছিল সেঙাই। মেহেলীকে দেখে অপার বিস্ময়ে চোখ দুটো ভরে গেল তার। নির্নিমেষে তাকিয়ে রইল সে।

মেহেলী বলল, কি রে, উঠে পড়েছিস দেখছি–

সেঙ্গাইর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই দপ করে চোখ জ্বলে উঠল মেহেলীর। সাঁ করে ঘরের এক কোণ থেকে লোহার একটা মেরিকেতসু তুলে এনে তাক করল সে।

মাথার ওপর উদ্যত মেরিকেতসু। আর পাহাড়ী মেয়ের দুচোখে নিষ্ঠুর ঝিলিক। অসহায় করুণ হয়ে এল সেঙাই-এর দৃষ্টি। আর্ত গলায় সে বলল, আমাকে মারিস না মেহেলী, কাল রাত্তিরে খাদে পড়ে গিয়েছিলাম। এই দ্যাখ, মাথা-হাত-পা কেটে ফালা ফালা হয়ে গেছে।

উবু হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল মেহেলী। এবার লোহার মেরিকেতসুটা বাঁশের পাটাতনের ওপর নামিয়ে সেঙাই-এর পাশে এসে বসল।

সেঙাই-এর দৃষ্টি থেকে তখনও ভয় আর চমক একেবারে মুছে যায়নি। ফিসফিস গলায় সে বলল, তুই এখানে কী করে এলি মেহেলী!

বাঃ, বেশ বললি তো! আমাদের বস্তিতে আমি থাকব না? হঠাৎ শব্দ করে হেসে উঠল মেহেলী।

আমি এখানে এলাম কী করে?

আমার পিঠে চেপে। খাদের বন থেকে আমি তুলে নিয়ে এসেছি তোকে।

কৃতজ্ঞতায় চোখ দুটো কোমল হয়ে এল সেঙাই-এর। গলাটা কেমন যেন মধুর শোনাচ্ছে তার, তুই না তুলে আনলে আমি মরেই যেতাম মেহেলী। তুই আমাকে বাঁচিয়েছিস। সেঙাই এর দৃষ্টিটা মেহেলীর মুখের ওপর এখনও নিষ্পলক হয়ে রয়েছে।

হাসির প্রপাত এবার উদ্দাম হয়ে উঠল মেহেলীর, বাঁচাবার জন্যে তোকে তুলে আনিনি সেঙাই। ভালো করে মারার জন্যে এনেছি। তুই আমার দাদাকে মেরেছিস। তার শোধ তুলব না? সন্ধের সময় মোরাঙের সামনে তোকে বলি দেওয়া হবে। এখুনি গিয়ে জোয়ান ছেলেদের ডেকে আনছি।

মেহেলী! প্রায় আর্তনাদ করে উঠল সেঙাই।

কী বলছিস? মেহেলীর চোখ কুঁচকে গেল।

সেদিন আমাদের বস্তিতে তুই গিয়েছিলি। আমিও তোকে মারতে পারতাম। কিন্তু মারিনি। আজ আমাকে বাঁচা তুই। কেলুরি গ্রামের পাহাড়ী যৌবনকে বড় অসহায় দেখাচ্ছে এই মুহূর্তে। সেঙাই-এর করুণ অবস্থাটা একটু একটু করে উপভোগ করতে লাগল মেহেলী।

তুই আমার দাদাকে মেরেছিস। তার কী হবে?

তোর দাদা কে? চমকে উঠল সেঙাই।

খোনকে। খোনকেকে ওরা কাল খাদে ফেলে দিয়েছিল আনিজার ভয়ে। দাদাকে খুঁজতে খাদে নেমেছিলাম। অন্ধকারে ভুল হল; দাদার বদলে আমার পিঠে চড়ে তুই এলি। একটু থামল মেহেলী, তারপর বলল, আজ সারা সকাল দাদাকে কত খুঁজে এলাম। খাদের কোথাও তাকে পেলাম না। হয়তো বাঘেরা তাকে খেয়ে ফেলেছে।

মেহেলীর সমস্ত মুখখানা বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। দু’টি কপিশ চোখে কয়েক বিন্দু লবণাক্ত জলের আভাসও ফুটে বেরুল। মাত্র কয়েকটি মুহূর্ত। তারপরেই সে গর্জে উঠল, তুই এই বস্তিতে এসেছিলি কী করতে? মরতে? জানিস সবাই জেনে গেছে, তুই আমার দাদাকে মেরেছিস। আমাদের বস্তির ছোকরারা তোকে পেলে একেবারে কিমা বানিয়ে ছাড়বে।

কে বলেছে আমি খোকেকে মেরেছি? কাঁপা গলায় জিগ্যেস করল সেঙাই। সালুনারু, তোদের বস্তির রেঙকিলানের বউ। সে সব বলে দিয়েছে আমাদের সদ্দারকে। দুর্বল স্মৃতির ওপর কালকের সন্ধ্যাটা ফুটে উঠল সেঙাইর। পাহাড়ের একটা ভাজ থেকে সে দেখেছিল সালুনারুকে। একটা মশাল নিয়ে সে অনেক দূরের কেসুঙগুলোর আড়ালে অদৃশ্য। হয়ে গিয়েছিল।

শিথিল গলায় সেঙাই বলল, সালুনারু তা হলে তোদের বস্তিতে এসে আস্তানা গেড়েছে। আমাদের বস্তি থেকে পালিয়ে এসেছে টেফঙের বাচ্চাটা। সদ্দার ওকে পেলে বর্শা দিয়ে ফুড়ে ফেলবে একেবারে। জানিস, কত বড় শয়তানী হুই সালুনারু!

কী করেছে সালুনারু?

যেদিন তোর দাদা খোনকেকে আমি বর্শা দিয়ে ফুঁড়েছিলুম সেদিন রাত্তিরে রেঙকিলান তো রেজু আনিজার রাগে পাহাড় থেকে পড়ে মরল। এক তাজ্জবের ব্যাপার সেটা। আমি, রেঙকিলান, ওঙলে আর পিঙলেই বস্তিতে ফিরে যাচ্ছি। আচমকা সালুনারুর মতো গলায় কে যেন ডাকল। আর তাই শুনে রেঙকিলান বাইরের পাহাড়ের দিকে চলে গেল।

তারপর? মেহেলীর চোখেমুখে কৌতূহল।

সকালবেলা সালুনারু এল রেঙকিলানের খোঁজে। সে নাকি আগের রাত্তিরে রেঙকিলানকে ডাকেনি বাইরের পাহাড় থেকে। বস্তির জোয়ানরা সকলে মিলে সদ্দারের সঙ্গে খুঁজতে বেরুলাম। তারপর দক্ষিণ পাহাড়ের খাদে নেমে দেখলাম, রেঙকিলান মরে পড়ে রয়েছে।

তারপর কী হল?

কী আবার হবে। আমাদের সর্দারের সঙ্গে ঝগড়া করলে সালুনারু, রেজু আনিজাকে গালাগালি দিলে। তখন সদ্দার যেই বর্শা দিয়ে খুঁড়তে উঠল, সে বনের মধ্যে পালিয়ে গেল।

কী সর্বনাশ! রেজু আনিজাকে গালাগালি দিল সালুনারু! বিস্ময়ে, আতঙ্কে শিউরে উঠল মেহেলী।

দূরের কোনো একটা কেসুঙ থেকে মোষ বলির সেই বাজনাটা ভেসে আসছে। গম্ভীর আর ভয়ঙ্কর শব্দ তরঙ্গিত হয়ে যাচ্ছে এই নগণ্য জনপদটার ওপর দিয়ে।

ওপরে আতামারী পাতার চাল। তার ফাঁক দিয়ে দুপুরের রোদ এসে পড়েছে ঘরখানায়। ঝলমলে রোদ। জা কুলি মাসের সূর্য বড় আরামদায়ক, বড় মনোরম।

হঠাৎ গাছের ওপরে আদিম এই গৃহকোণ নিঝুম হয়ে গেল। এখন আর কেউ কথা বলছে না। সেঙাই তাকাল মেহেলীর দিকে, মেহেলী তারই দিকে অপলক তাকিয়ে রয়েছে। সেঙাই আর মেহেলী। টিজু নদীর এপার আর ওপার। পোকরি আর জোহেরি বংশের দুই বন্য যৌবন। মুখোমুখি হয়েছে। সালুয়ালাঙ আর কেলুরি গ্রামের দুই শত্রুপক্ষ দুজনের সারা দেহে সংকেতময় কোনো আরণ্যক ভাষা সন্ধান করে বেড়াচ্ছে।

মেহেলী একসময় বলল, কাল সারারাত তোর পাশে আমি শুয়ে ছিলাম সেঙাই। আঁচড়েছি, কামড়েছি, তবু তোর সাড়া পাইনি।

কাল কি আমার জ্ঞান ছিল? কত ওপর থেকে পড়ে গিয়েছিলাম। তুই না থাকলে কি আমি বাঁচতাম! এই দ্যাখ, গায়ে চাপ চাপ রক্ত জমে রয়েছে। বস্তিতে ফিরে একবার তামুনুর (চিকিৎসক) কাছে যেতে হবে।

সন্ধের পর আমাদের বস্তির তামুনুর কাছ থেকে ওষুধ এনে দেব তোকে।

কিছুক্ষণ চুপচাপ। তারপর ফের মেহেলী বলল, তুই দাদাকে মারলি কেন বল তো?

আমার ঠাকুরদাকে তোদের বস্তির লোকেরা মেরেছিল। তার শোধ নেব না? দুই চোখ ধক ধক করে জ্বলে উঠল সেঙাইর।

হু-হু। সেই জন্যে বুঝি খোকেকে মারলি? বেশ, শোধবোধ হয়ে গেল।

হু-হু, শোধবোধ হল।

আচ্ছা সেঙাই, আমি শুনেছি তোদের আর আমাদের এই দুটো বস্তি মিলিয়ে একটাই বস্তি ছিল অনেক কাল আগে। তার নাম কুরগুলাঙ। টিজু নদীর দুধারের লোকদের মধ্যে খুব খাতির ছিল, পিরিত ছিল।

আমিও তাই শুনেছি। আমাদের খাপেগা সদ্দার মোরাঙে বসে সেসব গল্প বলেছিল।

মেহেলী বলতে লাগল, তার কণ্ঠ এখন আশ্চর্য কোমল শোনাচ্ছে, আচ্ছা, আমাদের বস্তির লোক তোর ঠাকুরদার মুণ্ডু কেটেছিল। তুইও আমার দাদাকে মারলি। শোধবোধ হয়ে গেল। এবার দুবস্তিতে আবার পিরিত হতে পারে না? বেশ হয় তা হলে। তোদের হুই ঝরনার জলে। চান করতে যেতে আমার এত ভালো লাগে!

পিরীত হলে তো ভালোই হয়। কিন্তু ঠাকুরদার খুনের শোধ আর নিতে পারলাম কই? খোনকের মুণ্ডুটা তো আর কেটে নিয়ে যেতে পারিনি। অথচ তোরা আমার ঠাকুরদার মাথাটা। কেটে এনেছিলি সেদিন। সেঙাইর চোখের দৃষ্টি হিংস্র হয়ে ওঠে। সারা মুখে চাপ চাপ, শুকনো । রক্ত। এই মুহূর্তে অত্যন্ত বীভৎস দেখাচ্ছে তাকে।

ধূসর অতীতের স্মৃতি নিয়ে দু’টি পাহাড়ী যৌবন কখনও কোমল, কখনও ভয়াল, কখনও স্বপ্নাতুর, কখনও আবার নির্মম হয়ে উঠতে লাগল।

আবোল তাবোল কথার তুফান উঠল এক সময়। কোনো পারস্পর্য নেই, সঙ্গতি নেই, সুষ্ঠু ধারাবাহিকতা নেই কথাগুলোর মধ্যে। এক প্রসঙ্গ থেকে অন্য প্রসঙ্গে চকিতে সরে সরে আসতে লাগল সেঙাই আর মেহেলী।

বাইরে মোষ বলির বাজনা উদ্দাম হয়ে উঠেছে। দ্রাম-ম-ম-ম–দ্রাম-ম-ম-ম। চরম মুহূর্ত বোধ হয় উপস্থিত। বিশাল একটা কালো জানোয়ারের দেহ থেকে মাথাটা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। টকটকে তাজা রক্তে লাল হয়ে উঠবে পাহাড়ী গ্রামের মাটি।

মেহেলী বলল, আমাদের এই সালুয়ালাঙ বস্তিতে কেন এসেছিলি, বললি না তো সেঙাই?

তোর খোঁজে। আমাদের ঝরনায় আজকাল আর যাস না কেন? সোজাসুজি তাকাল সেঙাই।

সদ্দার যেতে বারণ করে দিয়েছে।

এই সময় নিচের মাটি থেকে একটি নারীকণ্ঠ ভেসে এল, মেহেলী, এই মেহেলী কী করছিস ঘরে?

বাঁশের পাটাতন কাটা দরজা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দিল মেহেলী, কী আবার করব! যাচ্ছি রে পলিঙা। একটু দাঁড়া। এখুনি যাচ্ছি।

খাসেম গাছটার এলোমেলো শিকড়গুলির কাছে দাঁড়িয়ে আছে একটি কুমারী মেয়ে–পলিঙা। সে বলল, কাটিরি কেসুঙে মোষ বলি হয়েছে। দেখবি আয়। মাংস আনবি তো?

আনব। মুখখানা ঘরের ভেতর টেনে এনে সেঙাই-এর দিকে তাকাল মেহেলী, এখন যাই। সন্ধের সময় খাবার আর রোহি মধু নিয়ে আসব। তামুনুর কাছ থেকে ওষুধও নিয়ে আসব তোর ঘায়ে লাগিয়ে দেবার জন্যে।

সেঙাই বলল, সন্ধের পর আমি চলে যাব। অন্ধকার না নামা পর্যন্ত এখানেই থাকতে হবে। তোদের বস্তির লোকেদের কাছে আমার কথা বলিস না মেহেলী। কাতর আর্তি ফুটল সেঙাই এর গলায়।

অত সহজে যেতে পারবি না এই বস্তি থেকে। হুই খাদ থেকে পিঠে করে বয়ে এনেছি, সারা রাত তুলো গরম করে সেঁক দিয়ে তোকে বাঁচিয়েছি, সে কি এমনি এমনি? যতদিন আমার খুশি, যতদিন আমার আশা না মিটবে ততদিন এই ঘরে আটকে থাকতে হবে তোকে। দাদাকে সাবাড় করেছিস, তার বদলে একটু একটু করে তোকে খুন করব আমি। সারা জীবন তোকে এই ঘরে আটকে রাখব। পাহাড়ী মেয়ে মেহেলী অপরূপ রহস্যময়ী হয়ে উঠল। আউ পাখির মতো একবার ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাল সে। তারপর বাঁশের সিঁড়িটার দিকে পা পাড়িয়ে দিল। নিচে তারই জন্য অপেক্ষা করছে পলিঙা।

কাটিরি কেসুঙে মোষের মাংস আনতে যাবে তারা।

.

১৩.

কাল রাত্তিরে টিজু নদীর কিনারায় অনেকক্ষণ বসে ছিল ওঙলেরা। আকাশের এক কোণে আনিজা উইখু (ছায়াপথ) বিবর্ণ রেখায় ফুটে ছিল। এলোমলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল কয়েকটা নিস্তেজ তারা। আর টিজু নদীর পারে ওঙলেদের পাশে নিবিড় বনের মধ্যে গোটাকয়েক মশাল দপদপ করে জ্বলছিল।

একসময় ওঙলে বলেছিল, কী করা যায় বল দিকি? হুই দিক থেকে তো কোনো আওয়াজ পাচ্ছি না।

হু-হু, তাই তো৷ সবাই মাথা নেড়েছে।

সেঙাই হুই দিকেই যে গিয়েছে, তারই বা ঠিক কী। ওঙলে ফের বলেছিল।

হু-হু, অন্য কোথায় যে যায়নি, তাই বা কে বলবে। দু-একজন ওঙলের কথায় সায় দিয়েছিল।

পিঙলেই কিন্তু জোর দিয়ে বলেছিল, নির্ঘাত হুই দিকেই গিয়েছে। সেঙাই সেই যে মেহেলীর কথা বলত, মনে আছে তোদের? মেহেলী সালুয়ালাঙ বস্তির মেয়ে। তার তল্লাশেই হুই বস্তিতে গিয়েছে সেঙাই। হু-হু।

হু-হু, ওকে খুব পিরিত করে সেঙাই। মেহেলী হল তার পিরিতের মাগী। এবার সরব হয়ে উঠেছিল আর-একটি জোয়ান ছেলে।

কিছুক্ষণ চুপচাপ। পেন্যু কাঠের মশাল একটানা অন্ধকার আর হিমের সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছিল। জা কুলি মাসের রাত্রি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। হিমের দাঁত কেটে বসেছে অনাবৃত দেহগুলোর ওপর। মশালের অগ্নিবিন্দুর চারপাশে সাদা ঘন কুয়াশা ঘনতর হয়েছে।

কে যেন বলেছিল, বড় শীত ওঙলে। আর এখানে বসে থাকা যাবে না। নির্ঘাত মরে যাব।

ওঙলে বলেছিল, তাই তো, সালুয়ালাঙ বস্তিটা মড়ার মতো পড়ে রয়েছে। সেঙাই-এর মাথা বর্শা দিয়ে গেঁথে নিয়ে যেতে পারলে এতক্ষণে হল্লা করে পাহাড় ফাটিয়ে ফেলত হুই শয়তানের বাচ্চারা।

হু-হু– সকলেই গোলাকার কামানো মাথা ঝাঁকিয়েছিল।

ওঙলে আবারও বলতে শুরু করেছিল, এক কাজ করি আয়, আমরা হল্লা শুরু করে দিই। যদি সত্যি সত্যি সেঙাই-এর মাথা ওরা নিয়ে থাকে, ঠিক সাড়া দেবে সালুয়ালাঙের রামখোরা।

হু-হু–

একটু পরেই টিজু নদীর নীল ধারাকে চমকে দিয়ে অনেকগুলো গলায় গর্জন উঠেছিল। সে গর্জনে শিউরে উঠেছিল আকাশের আনিজা উইথু।

হো-ও-ও-ও– য়া–আ—আ—

হো-ও-ও-ও– য়া –আ-আ–

একসময় গর্জনের রেশ থেমে গিয়েছিল। তারপরও অনেকক্ষণ টিজু নদীর কিনারায় উৎকর্ণ হয়ে থেকেছে ওঙলেরা। তাদের এই হুঙ্কারের জবাব ওপারের সালুয়ালা গ্রাম দেয় কিনা তা শোনার জন্য তারা ব্যর্থ হয়ে ছিল।

কিন্তু নাঃ, কেউ পালটা হুঙ্কার দেয়নি। সালুয়ালাঙ বস্তিটা একেবারেই নিঝুম হয়ে ছিল।

ওঙলে বলেছিল, ওপারে সেঙাই যায়নি বলেই মনে হচ্ছে। তবে সে গেল কোথায়? যাবি না কি একবার সালুয়ালাঙ বস্তিতে?

ওঙলের প্রশ্নগুলোর জবাব দেবার আগেই কয়েকটা গলায় উল্লসিত আওয়াজ শোনা গেল, চিতাবাঘ, হুই যে চিতাবাঘ—

জোয়ান মানুষগুলোর কৌতূহল চোখের পিঙ্গল মণিতে এসে ঘন হয়েছিল। সামনে, ঠিক টিজু নদীর মাঝামাঝি একটা কালো পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে জন্তুটা। দুই চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দু পাশের উপত্যকায় কী যেন খুঁজছিল চিতাটা। এই জা কুলি মাসের হিমাক্ত রাত্তিরে কী কারণে সে বেরিয়ে এসেছিল গুহার উষ্ণ আরাম ছেড়ে, কে জানে। মসৃণ একটি ঘুমের অতলে ডুবে যাবার ইচ্ছা তার হয়তো ছিল না।

চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে একবার মৃদু গর্জন করে উঠেছিল চিতাবাঘটা, হো-উ-উ–ম-ম–

ওঙলে এবার বলেছিল, তার গলাটা জা কুলি রাত্রির ভৌতিক অন্ধকারে আশ্চর্য ফিসফিস শুনিয়েছিল, তোরা সব বোস্। আমি আর পিঙলেই যাচ্ছি। বর্শা দিয়ে চিতাটাকে ছুঁড়ে আনব। তারপর মশালের আগুনে ঝলসে খাওয়া যাবে। বড় খিদে পেয়ে গেছে। খবদ্দার, হল্লা করবি কেউ।

ওঙলে আর পিঙলেই নিঃশব্দে পাহাড়ের উতরাই বেয়ে টিজু নদীর দিকে নেমে গিয়েছিল। আর খানিকটা উঁচুতে ঘন খাসেম বনের মধ্যে কয়েকটা রক্তবিন্দুর মতো জ্বলছিল পেন্য কাঠের মশালগুলো। আর সেগুলোকে ঘিরে ঘন হয়ে বসেছিল কেলুরি গ্রামের জোয়ান ছেলেরা। জা কুলি মাসের সেই রাত ক্রমশ ভয়ানক হয়ে উঠতে শুরু করেছিল।

একসময় থমকে দাঁড়িয়েছে পিঙলেই আর ওঙলে। এখান থেকে বর্শার সীমানায় পাওয়া যাচ্ছে চিতাবাঘটাকে।

অস্পষ্ট গলায় ওঙলে বলেছিল, এখানে দাঁড়া পিঙলেই। আমি আগে তাক করি। তারপর তুই বর্শা ছুড়বি।

পরক্ষণে সাঁ করে ওঙলের হাতের মুঠি থেকে উল্কার মতো ছুটে গিয়েছিল বর্শাটা। অব্যর্থ। লক্ষ্য। চিতাটার কোমরের ঠিক ওপরে আধহাত লম্বা ফলাটা গিঁথে গিয়েছিল। টিজু নদীকে শিউরে দিয়ে হুঙ্কার ছেড়েছিল জন্তুটা, হো-উ-উ-উ-ম-ম–

এবার পিঙলেই-এর থাবার বর্শাটা আকাশের দিকে উঠে গিয়েছিল। কিন্তু সেটা ছোঁড়ার আগেই চিতাবাঘের গলার সঙ্গে মিলিয়ে একটি মানবিক কণ্ঠ কানে এসেছে। মৃত্যু যন্ত্রণায় গলার স্বরটা এই বনভূমি আর জা কুলি মাসের এই রহস্যময় রাতকে চৌচির করে আর্তনাদ করে উঠেছিল, আ-উ-উ-উ–

হো-উ-উ-ম-ম–তারপর টিজু নদীর ওপারে উপত্যকার নিবিড় বনভূমিতে চিতাবাঘটা লাফাতে লাফাতে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। তার সঙ্গে সঙ্গে মানবিক গলার আর্তনাদও মিলিয়ে গিয়েছিল।

পিঙলেই-এর হাতের বর্শা স্থির হয়ে ছিল আকাশের দিকে। আর পাথরের মূর্তি হয়ে গিয়েছিল ওঙলে। দুজনে এতটুকু নড়ছিল না। একেবারে স্থির, নিশ্চল। দুজোড়া চোখ শুধু নিষ্পলক টিজু নদীর ওপারে তাকিয়ে ছিল।

হো–উ-উ-ম-ম—

আ–উ—উ–উ–

একটি হিংস্র শ্বাপদের আর একটি মানুষের আর্তনাদ ওপারের উপত্যকায় একসময় ক্ষীণ হতে হতে মিলিয়ে গিয়েছিল।

ভয়ে আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে দুজনে। এবার ওঙলে কাঁপা গলায় বলেছে, টেমি খামকোয়া (বাঘ-মানুষ)। ও নির্ঘাত বাঘ-মানুষ। শিগগির চল। চিতাবাঘ চালান করলে একেবারে সাবাড় হয়ে যাব সবাই। তার গলায় বিভীষিকা ফুটে উঠেছে।

হু-হু–আবছা গলায় দু’টি শব্দ কোনোরকমে বলতে পেরেছে পিঙলেই।

তারপর সমস্ত শরীর থেকে সব নিষ্ক্রিয়তা ঝরে গিয়েছিল ওঙলে আর পিঙলেই-এর। টিজু। নদীর কিনার থেকে ঊর্ধ্বশ্বাসে ওপরের চড়াইতে দৌড়ে চলে এসেছিল দুজনে। পেছন ফিরে আর একবারও তাকায়নি কেউ। বার বার তাদের মনে হয়েছে, ঝাঁকে ঝাকে চিতাবাঘ দিগদিগন্ত থেকে থাবা বাগিয়ে, দাঁত বার করে সাঁ সাঁ করে ছুটে আসছে। আর উপায় নেই, আর রক্ষা নেই। বাঘ-মানুষের ক্রোধে তাদের দুজনের কেউ রেহাই পাবে না। তারা কি জানত, ওই চিতাবাঘের পেছনে একটা বাঘ-মানুষের ভয়ঙ্কর উপস্থিতি রয়েছে!

তীরের মতো ছুটতে ছুটতে পেন্যু কাঠের মশালগুলোর কাছে এসে পড়েছিল ওঙলেরা। জা কুলি মাসের এই হিমঝরা রাতে তাদের গা বেয়ে দরদর করে ঘাম ঝরছিল। বড় বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাঁপাতে শুরু করেছিল ওঙলে আর পিঙলেই।

পেন্যু কাঠের মশালের চারপাশে জোয়ান ছেলেরা অসহ্য শীতে কুঁকড়ে যাচ্ছিল তখন। হিমের কামড় থেকে নিজেদের দেহগুলো বাঁচাবার জন্য সবাই কুণ্ডলী পাকিয়ে যাচ্ছিল। মাঝে মাঝে পরস্পরের গায়ে গা ঘষে উত্তাপ সৃষ্টি করে নিচ্ছিল।

চমকে জোয়ান ছেলেরা তাকিয়েছিল ওঙলে আর পিঙলেই-এর দিকে, কি রে, কী ব্যাপার? চিতাটা কোথায়?

আতঙ্কগ্রস্তের মতো ওঙলে বলেছে, শিগগির উঠে পড়। বাঘ-মানুষ হুই চিতাটার পেছনে রয়েছে। চল, চল।

বাঘ-মানুষ! ভয়ে প্রথমটা কাঠ হয়ে গিয়েছে জোয়ান ছেলেগুলো। পরক্ষণে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। মাটিতে পেন্য কাঠের মশাল পুঁতে রাখা ছিল। পট পট করে সেগুলো তুলে ফেলেছিল তারা।

ওঙলে বলেছিল, বস্তির দিকে পালাই চল। হুই বাঘ-মানুষ যদি বাঘ চালান করে, তাহলে নির্ঘাত সাবাড় হয়ে যাব। চল চল–দৌড়ো, দৌড়ো–

প্রাণ বাঁচানোর তাড়নায় জোয়ান মানুষগুলো মশাল হাতে খাড়া চড়াইয়ের দিকে উঠে গিয়েছিল।

কে যেন বলেছিল, সেঙাইটা কোথায় যে পড়ে রইল! তাকে খুঁজে বার করতে হবে না? সেঙাই-এর কথা সদ্দারকে কী বলবি, কি রে ওঙলে?

থাম শয়তানের বাচ্চা, আগে বাঘ-মানুষের হাত থেকে জান বাঁচা। তারপর সেঙাই-এর কথা ভাবিস।

অন্য একজন বলেছিল, এ নির্ঘাত হুই নানাকোয়া বস্তির মেজিচিজুঙ। পশ্চিম, উত্তর আর দক্ষিণ পাহাড়ের বনে ওর অনেক বাঘ পোষা আছে। রাত্তিরে বাঘ নিয়ে বেরোয় ইদিকে সিদিকে।

বনের মধ্যে দিয়ে চড়াই উতরাই পেরিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে ছুটতে কেলুরি গ্রামের মোরাঙের সামনে চলে এসেছিল ওঙলেরা। রীতিমতো হাঁপাচ্ছে তারা।

মোরাঙের চারপাশে গোল হয়ে ঘিরে বসে ছিল গ্রামের মেয়েপুরুষ। পুরুষদের মধ্যে কেউ কেউ মোরাঙের ভেতর চলে এসেছিল। বিশাল পাথরখানার ওপর দাঁড়িয়ে খ্যাপা মোষের মতো তখন ফোঁসফোঁস করছে বুড়ো খাপেগা, সিজিটোর ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিতে হবে। এত বড় পাপ চলবে না এই বস্তিতে। হু-হু, সিধে কথা।

বুড়ো খাপেগার পাশে একটা বর্শা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সারুয়ামারু। তার চোখ দুটো দপদপ করছিল। সেই মুহূর্তে সে হত্যা পর্যন্ত করতে পারত, সে পারত একটা বাঘের মতো গর্জন করে ঝাঁপিয়ে পড়তে।

ওঙলেরা মোরাঙের মধ্যে ঢুকে জিগ্যেস করেছিল, কী ব্যাপার সদ্দার?

কী আবার? সিজিটো হুই সারুয়ামারুর বউ জামাতসুর ইজ্জত নিয়েছে। শয়তানটাকে জানে মেরে ফেলে দেব একেবারে।

হু-হু। আমি মোরাঙে এসেছিলাম, সেই ফাঁকে হুই শয়তান সিজিটোটা আমার কেসুঙে হাজির হয়েছে। আমি ঘরে ঢুকে হাতেনাতে ধরেছি। তা আমাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে হুই পাহাড়ের দিকে পালিয়ে গেল। একেবারে কলিজা ফেঁড়ে রক্ত নিয়ে আনিজাকে দেব। ইজাহান্টসা সালো–হাতের থাবায় বিশাল বর্শাটায় ঝাঁকানি দিয়ে, রক্তাভ চোখ দুটোকে আরো দপদপে করে হুঙ্কার দিয়ে উঠেছে সারুয়ামারু।

মোরাঙের বাইরে একটানা হইচই চলছিল। ছোট্ট গ্রাম কেলুরির সমস্ত মানুষ সমস্বরে চেঁচাচ্ছিল। সে চিৎকারের ছেদ নেই, বিরতি নেই। ওঙলে জিগ্যেস করেছিল, জামাতসু আর সিজিটো কোথায়?

সারুয়ামারু খ্যাপা গলায় গর্জে উঠেছে, বললাম তো, সিজিটো হুই বাইরের পাহাড়ের দিকে পালিয়েছে। আর জামাতসুকে বর্শা দিয়ে ফুড়ে রেখে দিয়েছি। আহে ভু টেলো। কদর্য গালাগালিতে জা কুলি মাসের রাতটাকে কুৎসিত করে তুলেছে সারুয়ামারু, সিজিটোর ঘরবাড়ি পুড়িয়ে তবে এবার ছাড়ব। রামখোটাকে পেলে বর্শা দিয়ে ছুঁড়ব।

মোরাঙের বাইরে দাঁড়িয়ে সিজিটোর মা বুড়ি বেঙসানুও সমানে ভাঙাচোরা দাঁতগুলোতে কড়মড় আওয়াজ করে বলেছে, ইজা রামখো। আমার আবার জানতে বাকি আছে! হুই সারুয়ামারুর বউ জামাতসু মাগীর কথা বস্তির কে না জানে! শয়তানীর সঙ্গে সব জোয়ানের পিরিত। যত দোষ হল সেঙাইর বাপের! আপোটিয়া।

দৌড়ে মোরাঙের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছিল সারুয়ামারু, চুপ কর বুড়ি মাগী। বেশি বকর বকর করবি তো একেবারে গলা টিপে মেরে ফেলব। সাউঁকিরি করতে হবে না ছেলের হয়ে। মোরাঙের দিকে হুসিও পাখির মতো গলাটা বাড়িয়ে দিয়ে সারুয়ামারু চেঁচিয়ে উঠেছে, সদ্দার, তুই ইদিকে আয়। একবার খালি বল, সিজিটোর ঘরবাড়ি সব জ্বালিয়ে দিই–

কয়েক দিন আগে সূর্য ওঠার রূপকথা নিয়ে সারুয়ামারুর সঙ্গে বুড়ি বেঙসানুর প্রায় একটা খণ্ডযুদ্ধ বাধবার উপক্রম হয়েছিল। সেদিন এই কেলুরি গ্রামের সব মানুষ বর্শা বাগিয়ে বেঙসানুর পাশে দাঁড়িয়েছিল। তারাই আজ আবার সারুয়ামারুর পাশে অন্তরঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাতের থাবায় তাদের জীমবো পাতার মতো ভয়াল বর্শাফলক। আর গলায় প্রবল চিৎকার।

হো-ও-ও-আ—আ–

মশালের আলোতে তাদের ভয়ঙ্কর হিংস্র দেখাচ্ছিল। ভিড়ের ভেতর একজনেরও তর সইছিল না। তারা বলছিল, কই রে সারুয়ামারু, চল তাড়াতাড়ি। সিজিটোর ঘরখানা পুড়িয়ে আসি।

ও সদ্দার, তুই একবার খালি বল। অনেকগুলো গলা উত্তেজনায় ক্রমশ উঁচু পর্দায় চড়ছিল, তুই বললেই আমরা মশাল নিয়ে আসি।

বুড়ো খাপেগা একপাশে দাঁড়িয়ে মানুষগুলোর ভাবগতিক লক্ষ করছিল। এবার সে রায় দিয়েছে। সব গলার কোলাহল ছাপিয়ে তার হুঙ্কার উঠেছে আকাশের দিকে, চুপ কর শয়তানের বাচ্চারা। কানের পর্দা ফাটিয়ে দিচ্ছে সবগুলো মিলে।

বুড়ি বেঙসানুর দিকে তাকিয়ে খাপেগা বলেছে, শোন বেঙসানু, সিজিটো হুই জামাতসুর ইজ্জত নিয়েছে। তার দাম দিতে হবে তোকে। সারুয়ামারু হল জামাতসুর সোয়ামী। দুটো শুয়ার আর সাতটা বর্শা দিয়ে দে সারুয়ামারুকে।

বুনো বানরীর মতো খেঁকিয়ে উঠেছে বুড়ি বেঙসানু, কেন? এত দেব কেন? হুই জোরি বংশের বউর ইজ্জত এত দামি নাকি? বলিস কি রে খাপেগা শয়তান!

খাপেগা আর বুড়ি বেঙসানু যখন কথা বলছিল, চারপাশে মানুষের জটলাটা চুপ করে শুনছিল। ফের তারা তুমুল শোরগোল বাধিয়ে দিয়েছে। সবার ওপর গলা চড়িয়েছিল সারুয়ামারু, ইজ্জতের কথা বলতে তোর লজ্জা হল না বুড়ি মাগী? নো ইহি-আঙশিঙ ইহাঙসা! বস্তির সবাই জানে, তোর সোয়ামী জেভেথাঙের মুণ্ডু কেটে নিয়ে গিয়েছিল সালুয়ালাঙের মানুষগুলো। তার বদলা নিতে পেরেছিস? তবে কোন মুখে ইজ্জতের ফুটানি করছিস লো শয়তানী!

সকলে মাথা ঝাঁকিয়েছে, হু-হু–

এবার মিইয়ে গিয়েছে বুড়ি বেঙসানু। নিস্তেজ গলায় সে বলেছে, আচ্ছা আচ্ছা, হুই দুটো শুয়ার আর সাতটা বর্শা দিয়ে তোর বউটার ইজ্জতের দাম দেব। আমার সোয়ামীর মুণ্ডুর কথা বললি, সেঙাই যে সেদিন খোনকেকে মেরে এল। তাতে বুঝি বদলা নেওয়া হয় না?

খুব বদলা নিয়েছে! তাচ্ছিল্যে ঠোঁট দুটো বেঁকে গেল সারুয়ামারুর, মাথা আনতে পেরেছে সেঙাই? তোদের জোহেরি বংশের মাথা ওরা নিয়েছে। ওদের পোকরি বংশের মাথা যেদিন আনতে পারবি সেদিন মুখ নেড়ে কথা বলবি, তার আগে নয়। হু-হু–

হু-হু– সকলে গোলাকার কামানো মাথা ঝকিয়ে সায় দিয়েছে।

দুটো শুয়োর আর সাতটা বর্শার বদলে সারুয়ামারুর বউ জামাতসুর ইজ্জতের দাম ঠিক করে দিয়েছিল খাপেগা সর্দার। এবার সকলে ছত্রখান হয়ে যে যার কেসুঙের দিকে চলে যেতে শুরু করেছে।

ভিড়ের ভেতর থেকে কে যেন বলে উঠেছিল, আমরা ভাবতাম, সিজিটোটা অন্যরকম। আমাদের সঙ্গে তার হালচাল মেলে না। এখন দেখছি তা নয়।

ঠিক বলেছিস। জা কুলি রাতের অন্ধকারে কে একজন মজাদার ভঙ্গিতে বলেছে, পরের বউর কাছে পিরিত ফুটাবে না তো কেমনতরো পাহাড়ী মানুষ! জরিমানা দেবে, দুটো মাথা ফাটবে মেয়েমানুষের জন্যে, তা নয়, মাঝে মাঝে বস্তি ছেড়ে কোথায় কোনো চুলোয় যে চলে যায় হুই সিজিটো! আজ দেখলাম, নাঃ, যতই দূরদেশে যাক, যতই সাদা মানুষের গল্প বলুক, আসলে ও পাহাড়ীই। পাহাড়ী রক্ত রয়েছে ওর বুকে। শয়তানটা আমাদের থেকে আলাদা হয়ে থাকে। এইবার? হো-হো-হো

হু-হু– আরো কজন সায় দিতে দিতে দূরের কেঙগুলোর দিকে চলে গিয়েছিল, আজকের রাত্তিরটা সিজিটোর গল্প করে কাটানো যাবে বউর সঙ্গে। বড় মজাদার কেচ্ছা।

সিজিটোর একটা নতুন পরিচয় জানতে পেরেছে কেলুরি গ্রামের মানুষগুলো। আর সেই অপূর্ব উত্তেজক পরিচয়টা নানা রঙে, নানা কথায় আর নানা রসে ফেনিয়ে ফাঁপিয়ে সারা রাত ধরে তারা উপভোগ করবে।

প্রায়ই সুদূর পাহাড়চূড়া ডিঙিয়ে, অগুনতি উপত্যকা পেরিয়ে, কত মালভূমি উজিয়ে দূরের শহরে চলে যায় সিজিটো। আশ্চর্য রহস্যময় মানুষ সে। কত বিচিত্র দেশের, কত বিচিত্র মানুষের, কত অনাস্বাদিত খাবারের গল্প বলে। একই গ্রামের মানুষ হয়েও সে যেন আলাদা। এই মুহূর্তে জামাতসুর ইজ্জত নেবার মধ্যে কেলুরি গ্রামের লোকেরা জেনে গিয়েছে সিজিটো তাদেরই মতো। তাদের সঙ্গে সিজিটোর বিশেষ কোনো পার্থক্য নেই। এটুকু আবিষ্কার করে তারা খুব খুশি।

মোরাঙের সামনে থেকে কেলুরি গ্রামের মানুষগুলো যার যার কেসুঙে চলে গিয়েছিল। চারপাশে খানিক আগের হইহল্লা আর নেই।

এবার বুড়ো খাপেগা তাকিয়েছে ওঙলের দিকে। তারপর বলেছে, কি রে, সেঙাই কোথায়? তাকে নিয়ে এসেছিস?

তাকে পেলুম না।

তাকে না নিয়েই চলে এলি তোরা? খাপেগার ঘোলাটে চোখ দুটো ধক করে জ্বলে উঠেছিল, কি রে রামখোর বাচ্চারা?

কী করব, তুই বল তো জেঠা। সেঙাই-এর খোঁজেই তো গেলাম। টিজু নদীর ওপারে চিতাবাঘ নিয়ে বেরিয়েছে টেমি খামকোয়ানু (বাঘ-মানুষ)। প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যে আসতে পেরেছি, তাই যথেষ্ট। ভয়ের সুরে বলেছে ওঙলে। একটু আগের চিতাবাঘ মারতে যাবার কাহিনী, চিতাবাঘের গায়ে বর্শা লাগার পর চিতাবাঘ এবং সেই সঙ্গে একটি মানবিক গলার আর্তনাদ–কিছুই সে বাদ দেয়নি।

হু-হু, বুঝতে পেরেছি। এ হুই নানাকোয়া বস্তির মেজিচিজুঙের কাজ। হুই সালুয়ালাঙ আর নানকোয়া বস্তিতে বড় পিরিত। আচ্ছা দেখা যাক, কী করা যায়–দাঁতে দাঁত ঘষে বলেছে বুড়ো খাপেগা।

আমার মনে হচ্ছে, বুঝলি জেঠা, সেঙাই সালুয়ালাঙের দিকে যায়নি। নদীর পারে দাঁড়িয়ে আমরা কত তড়পালুম। হো হো করে অনেক হল্লা করলুম। তবু সালুয়ালাঙ বস্তির দিক থেকে কোনো সাড়া পেলুম না। ওঙলে বলেছিল।

হু-হু– আশ্চর্য গম্ভীর দেখিয়েছিল বুড়ো খাপেগার দাড়িগোঁফহীন মুখখানা। কী একটা ভাবনার অতল স্তরে সে যেন তলিয়ে গিয়েছে, তাই তো, সেঙাইটা গেল কোথায়?

এতক্ষণ মোরাঙের বাইরে কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল সারুয়ামারু। এইমাত্র সে ফিরে এসে বলেছে, দুটো শুয়োর আর সাতটা বর্শা দিয়ে আমার বউর ইজ্জতের দাম দিলে চলবে না সদ্দার। হুই শয়তান সিজিটো একবার বস্তিতে ঢুকলে হয়, জানে মেরে ফেলব।

দাঁতমুখ খিঁচিয়ে গর্জে উঠেছে বুড়ো খাপেগা, চুপ কর শয়তানের বাচ্চা।

.

কেলুরি বস্তিটা কাল সারা রাত এক মুহূর্তের জন্যও ঘুমোত পারেনি। দু’টি মানুষ ছাড়া সকলে সিজিটোর কেলেঙ্কারি নিয়ে রাতভোর গল্প করেছে। একটা আঁশটে কেচ্ছার গন্ধ পেলেই হল। সেটার ওপর রং চড়িয়ে পাহাড়ী মানুষগুলো ফেনিয়ে তুলতে থাকে।

সবাই সিজিটোকে নিয়ে মেতে ছিল। শুধু বুড়ো খাপেগা তার ব্যাপারে মাথা ঘামায়নি। তার অতন্দ্র চোখে সেঙাই-এর মুখখানা বার বার ভেসে উঠেছে। গেল কোথায় ছেলেটা? এই কেলুরি গ্রামের আর তার স্যাঙাত জেভেথাঙের বংশের সম্মান যে রাখতে পারে, সে হল সেঙাই। ছেলেটার মধ্যে খাপেগা তার নিজের যৌবনকালের প্রতিচ্ছায়া দেখতে পায়। যেমন করে হোক, সেঙাইকে ফিরে পেতেই হবে।

ওদিকে জোরি কেসুঙে বাঁশের মাচানে শুয়ে ধক ধক করে চোখদুটো জ্বলছিল জামাতসুর। আশ্চর্যভাবে তারা ধরা পড়ে গেল কাল। সিজিটো! সিজিটো! সারুয়ামারু যখন কেঙে থাকত না, যখন কোহিমা কি মোককচঙে চলে যেত, সকলের অগোচরে এমনি কতদিন রাতে সে এসেছে তার বিছানায়। দু’টি বাহুর বেষ্টনে তার তামাভ শরীর জড়িয়ে ধরে দূর শহরের গল্প বলেছে। তাকে নিয়ে পালিয়ে যাবার ফন্দি এঁটেছে। একটি মনোরম স্বপ্নের কথা বলে জামাতসুর দুচোখে কোহিমা কি মোককচঙের নেশা এঁকেছে। এ দৃশ্য কেলুরি বস্তির কেউ কোনোদিন দেখেনি। সিজিটো-জামাতসুর নিভৃত জীবনের ইতিহাস সকলের কাছে গোপন ছিল। গ্রামের কেউ তাদের প্রণয়ের কথা জানত না।

সেই সিজিটোই কাল ফিরে এসেছিল কোহিমা থেকে। সারুয়ামারু ঘরে ছিল না। সুযোগ বুঝে সন্ধের পর জোরি কেসুঙে ঢুকেছিল, কই লো জামাতসু–

জামাতসু ডেকেছিল, এই তো। আয় আয়। শয়তানটা ঘরে নেই। মোরাঙের দিকে গেছে। কাল জোরি কেসুঙে নাচ আর বাজনার আসর বসেছিল। তারপরেই খোঁজ পড়েছিল সেঙাই-এর। বুড়ো খাপেগা আর জোয়ান ছেলেদের সঙ্গে মোরাঙের দিকে চলে গিয়েছিল সারুয়ামারু। সেই মানুষই কী কারণে যেন আচমকা ঘরে ফিরেছিল, আর ফিরেই পরস্পরের বাহুবন্দি দু’টি পাহাড়ী নরনারীকে দেখেছিল। সিজিটো আর জামাতসু। বন্য মানুষ। সাঁ করে বাঁশের দেওয়াল থেকে বর্শা নিয়ে ছুঁড়ে মেরেছিল সারুয়ামারু। অব্যর্থ লক্ষ্য। ফলাটা জামাতসুর কবজিতে গেঁথে গিয়েছিল। আর মাচান থেকে লাফিয়ে উল্কার মতো বাইরের পাহাড়ে পালিয়ে গিয়েছিল সিজিটো। সিজিটোর সঙ্গে সঙ্গে কোহিমায় গিয়ে ঘর বাঁধার রমণীয় স্বপ্নটাও বিলীন হয়ে গিয়েছিল জামাতসুর।

কিছুক্ষণ আগে তামুন্যর কাছ থেকে খানিকটা আরেলা পাতা নিয়ে এসে জামাতসুর কবজির ক্ষতে লাগিয়ে দিয়েছে সারুয়ামারু। তারপর বুড়ি বেঙসানুর কাছ থেকে দুটো শুয়োর আর সাতটা বর্শা এনেছে। জামাতসুর ইজ্জতের দাম। ঘরে এসে হুঙ্কার দিয়েছিল সারুয়ামারু, দ্যাখ মাগী, তোর ইজ্জতের দাম আদায় করলাম।

এখন তারই পাশে একটা প্রকাণ্ড মোষের মতো ভোঁসভোঁস করে ঘুমোচ্ছে সারুয়ামারু।

কিন্তু ঘুম আসছে না জামাতসুর। কোন সুদূরে, আকাশের আনিজা উইখুর পরপারে নির্বাসিত হয়েছে তার ঘুম। শুধু দুচোখের মণিতে একটি মুখের প্রতিচ্ছায়া ফুটে উঠেছে। সে ছবি সিজিটোর। সিজিটো এখন কত দূরে? সে কি তার কথাই ভাবছে? তার স্বপ্নই দেখছে?

.

১৪.

কাটিরি কেসুঙে আজ বিরাট ভোজ। আওশে ভোজ। এই ভোজের জন্য একটা প্রকাণ্ড মোষ বলি দেওয়া হয়েছে। কেসুঙের সামনে পাথুরে চত্বরটা রক্তে লাল হয়ে গিয়েছে। বিশাল প্রাণীটার ধড় আর মুণ্ডু আলাদা হয়ে দু’দিকে ছিটকে পড়ে রয়েছে।

পলিঙা এবং মেহেলী চলে এল কাটিরি কেসুঙে। কেসুঙের চারপাশে গ্রামের সব মানুষ পাহাড়ী মৌমাছির মতো ভনভন করছে। এমন একটা ভোজের কারণে সকলে রীতিমতো উল্লসিত। কাটিরি কেসুঙে আজ সমস্ত গ্রামখানার নিমন্ত্রণ। এই বংশের ছেলে বিয়ে করে সালুয়ালাঙ গ্রামটাকে আজ প্রথম ভোজ খাওয়াচ্ছে। প্রথমতো ভোজ দিয়ে দাম্পত্য জীবনের জন্য স্বীকৃতি আর শুভেচ্ছা আদায় করছে সমাজের কাছ থেকে।

বাঁ দিকে রান্নার আয়োজন। বড় বড় মাটির পাত্র। পুরুষানুক্রমে পুড়তে পুড়তে সেগুলো কালো হয়ে গিয়েছে। বিরাট বিরাট কাঠের হাতা। আরেক দিকে অজস্র মানুষের জটলা। তুমুল হইচইতে কাটিরি কেসুঙটা মুখর হয়ে উঠেছে, উত্তাল হয়ে উঠেছে।

এদিকে আসতে আসতে পলিঙা বলল, কি লো মেহেলী, তোর লগোয়া পনকে (প্রেমিক) তো দেখালি না? শুধু গল্পই বললি তার। কেমন দেখতে সেঙাইকে? খাসা চেহারা বুঝি?

চমকে মেহেলী তাকাল পলিঙার দিকে। হ্যাঁ, পলিঙা তার সই, তার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। তার কাছে সেই আশ্চর্য বিকেলে সেঙাইকে প্রথম দেখার পর তার অনেক গল্প করেছে মেহেলী। পাহাড়ী কুমারী তার যৌবনের সমস্ত মাধুর্য দিয়ে সে গল্পে রং চড়িয়েছে। তার মনের মানুষের রূপ দিয়ে একটি চকিত বিভ্রমের সৃষ্টি করেছে পলিঙার চেতনায়।

পলিঙা আবার বলল, এত ভালো তোর পিরিতের মানুষটা! এত সুন্দর! কত কথা বলেছিস তার সম্বন্ধে, একদিনও তো তাকে দেখালি না। দেখালে আমি ভাগিয়ে নেব নাকি?

চারিদিকে একবার চনমনে চোখে তাকিয়ে চাপা গলায় মেহেলী বলল, আজ দেখাব। এখন কাটিরিদের মাংস নিয়ে বাড়ি ফিরব। তারপর যাব ডাইনি নাকপোলিবার কাছে। সেখান থেকে ফিরে তোকে দেখাব সেঙাইকে। খবদ্দার সেঙাই-এর কথা আর কাউকে বলবি না।

পলিঙার মুখচোখে বিস্ময় ফুটে বেরিয়েছে। বিচিত্র আগ্রহে তার চোখ দুটো চকচক করছে। পলিঙা ভরসা দিয়ে বলল, কোথায় সেঙাই? নাকপোলিবা ডাইনির কাছে যাবি কেন? তারপর গলার স্বর অনেকখানি নামিয়ে বলল, সেঙাইকে আটক করে রেখেছিস নাকি?

হু-হু। কাউকে বলিস না। তা হলে সবাই সেঙাইকে খুঁজতে শুরু করবে। সদ্দার জানতে পারলে আমার পিরিতের মরদটাকে একেবারে সাবাড় করে ফেলবে।

পলিঙা ভরসা দিয়ে বলল, না না, তুই আমার সই, তোর ভালোবাসার মানুষকে আমি ধরিয়ে দেব না। জানি সেঙাইরা এই বস্তির শত্তুর। ওকে পেলে সদ্দার নির্ঘাত বর্শা দিয়ে ফুঁড়বে।

কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে পলিঙার দিকে তাকাল মেহেলী, তাকিয়েই রইল। তার চোখের মণি দুটো আশ্চর্য কোমল হয়ে উঠেছে।

একসময় কাটিরি কেসুঙ থেকে আওশে ভোজের মাংস নিয়ে এল মেহেলী আর পলিঙা। এটা এই পাহাড়ী জনপদগুলির রীতি। আওশে ভোজের দিনে প্রতিবেশীদের মোষের মাংস বিতরণ করলে নব দম্পতির জীবন সুখ শান্তিতে ভরে উঠে।

মাংস নিয়ে ফিরতে ফিরতে মেহেলী বলল, তুই তোদের কেসুঙে মাংস রেখে আয়। তারপর আমাদের কেসুঙের পেছনে এসে দাঁড়াবি।

কেন?

কেন আবার, নাকপোলিবা ডাইনিকে দাম দিতে হবে না? তার ওষুধের দাম? সেই যে সেঙাইকে আটকে রেখে চারটে বর্শা আর দুখুদি (আড়াই সের পরিমাণ) ধান নিয়ে যেতে বলেছিল, মনে নেই তোর? খুব মৃদু শোনাচ্ছে মেহেলীর কণ্ঠ, আচ্ছা পলিঙা, নাকপোলিবা ডাইনির ওষুধে কাজ হবে তো?

নিশ্চয়ই হবে। রীতিমতো জোর দিয়ে বলল পলিঙা।

আমার বড় ভয় করে বুড়িটাকে। বলে একটু থামল মেহেলী। তারপর ফের শুরু করল, সেঙাইকে আমার চাই। যেমন করে তোক, ওকে আমার পেতেই হবে। হু-হু। সেঙাইকে যখন আটক করেছি, সারা জনমের মতো ঠিক ধরে রাখব।

কাটিরি কেসুঙে আওশে ভোজের মোষ বলি দেখতে সবাই চলে গিয়েছিল। বাইরের ঘরে এখন কেউ নেই। দ্রুত ভেতর দিকের ঘরগুলো একবার দেখে নিল মেহেলী। নাঃ, তাদের পোকরি কেসুঙ একেবারে ফাঁকা। তার বাবা-মা, এমনকি ছোট ছোট ভাইবোনেরা পর্যন্ত বুনো মোষ বলির মজা দেখতে চলে গিয়েছে। কেউ ফিরে আসেনি। পোকরি কেসুঙ এখন নির্জন।

এমন একটা অপূর্ব সুযোগ তার বরাতে লেখা ছিল তা কি জানত মেহেলী? সন্তর্পণে বাঁশের মাচানের তলা থেকে চারটে বর্শা আর ঝুড়ি থেকে ধান নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা উথলপাথল হচ্ছে। আশঙ্কায় নিশ্বাস দ্রুত তালে উঠছে, নামছে। বাপের মুখোমুখি হলে আর রেহাই থাকবে না। এই বর্শাগুলো দিয়েই তার চামড়া উপড়ে রোদে শুকোতে দেবে, যেমন করে একটা হরিণ কি চিতাবাঘের ছাল শুকোতে দেয়।

শত্রুপক্ষের ছেলে সেঙাই। তার কামনার পুরুষ। প্রতিটি রক্তকণায় সে পেতে চায় সেঙাইকে। তার আদিম আলিঙ্গনের মধ্যে ধরতে চায় সেঙাইকে। এ কথা পলিঙা আর লিজোমু ছাড়া আর কাউকে বলেনি মেহেলী। এ খবর তার বাপ জানে না, তার মা জানে না, ভাইবোনরা জানে না। একে শত্রুপক্ষের যৌবন, আর তার জন্য চারটে বর্শা আর দুখুদি ধানের বদলে ওষুধ আনার মনোবিলাসকে কিছুতেই বরদাস্ত করবে না মেহেলীর বাপ। তাই সকলের অগোচরে নাকপোলিবার ওষুধের দাম হাতিয়ে আনতে হল মেহেলীকে।

পূর্বপার্বতী কেসুঙের পেছন দিকে কথামতো দাঁড়িয়ে আছে পলিঙা। তার সঙ্গে লিজোমুও এসেছে। সতর্কভাবে চারিদিক দেখতে দেখতে পলিঙাদের কাছাকাছি চলে এল মেহেলী। বলল, চল। তিন জনে উত্তরের পাহাড়ে নাকপোলিবার আস্তানার দিকে দ্রুত পা চালিয়ে দিল।

.

বাদামি পাথরের মধ্যে দিয়ে সুড়ঙ্গটা অন্ধকার গুহায় অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। সেটার দু’পাশে উদ্দাম বন। গুহার মধ্যে পাথরের ভাঁজে ভাঁজে আগুন জ্বলছে। আর সেই ভয়াল অন্ধকারে পাথরের আগুনের পাশে দু’টি আগ্নেয় গোলক স্থির হয়ে আছে। এই ধক ধক অগ্নিপিণ্ড দু’টি ডাইনি নাকপোলিবার চোখ।

গ্রাম থেকে অনেক, অনেক দূরে এই ভয়ঙ্কর গুহার অন্ধকারে অতন্দ্র বসে থাকে ডাইনি নাকপোলিবা। কোন অনাদি অনন্ত কাল ধরে সে এখানে আছে, তার হিসেব নেই। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কিভাবে তার কেটে যায়, কেউ জানে না। শুধু এই নির্জন গুহার দু’টি আগ্নেয় গোলক দিবারাত্রি দূর পাহাড়ের দিকে, উপত্যকার দিকে, অনেক দূরের টিজু নদীর দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে। এই অগ্নিপিণ্ড দু’টির নির্বাণ নেই, অবিরাম জ্বলে জ্বলে নিভে যাবার মুহূর্ত কোনোকালে আসবে কিনা, আশেপাশের পাহাড়ী মানুষরা তা জানে না।

এদিকে গ্রামের মানুষরা বড় কেউ আসে না। এখানে নাকপোলিবার ডাইনি নামটা একটা বিভীষিকার মতো রাজত্ব করে। ওই দু’টি আগ্নেয় গোলকের ওপর কোনো মানুষের ছায়া পড়লে নাকি আর উপায় থাকে না। সে মানুষের রক্ত একটু একটু করে বাষ্প হয়ে উড়ে যায়। তারপর একদিন একটি কঙ্কালের আকার নিয়ে কোনো পাহাড়চূড়া থেকে অতল খাদে আছড়ে পড়ে মরে যায় তাজা মানুষটা। তাই ডাইনি নাকপোলিবার দৃষ্টির সীমানা ছাড়িয়ে বহু দূরের পাহাড়ে পাহাড়ে গ্রাম বসানো হয়েছে।

মানুষ আসে না, কিন্তু মাঝে মাঝে আসে যুবক-যুবতীরা। বুকে তাদের বন্য বাসনার জ্বালা। কামনার একটি পুরুষ কি একটি নারীর অভাবে পৃথিবী যখন শূন্য হয়ে যায়, যখন প্রেমিক বা প্রেমিকা ধরা দেয় না, তখন ডাইনি নাকপোলিবার কাছে ছুটে আসে তারা।

ডাইনি নাকপোলিবা। তার হিসাবহীন বয়সের এই জীর্ণ দেহের হাড়ে হাড়ে, চামড়ার কুঞ্চনে কুঞ্চনে, কত মন্ত্র-তন্ত্র। এই গুহার মধ্যে নির্বাসিত থেকে কত আনিজার সঙ্গে যে সে সই পাতিয়েছে, কত প্রেতাত্মার সঙ্গে যে তার অন্তরঙ্গতা!

পাহাড়ী প্রেম আর বন্য মানুষের কামনা যেমন ভীষণ, তেমনই দুর্বার। একবার দেহমনে। যৌবনের জ্বালা ধরলে সাত পাহাড়ের অরণ্যের মধ্য দিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো পাহাড়ী যুবক যুবতীরা চলে আসে নাকপোলিবার গুহায়। বর্শা আর ধানের বিনিময়ে মন্ত্রপড়া গাছের শিকড় নিয়ে যায়। নাকপোলিবার মন্ত্রপড়া শিকড়ের মহিমায় নাকি কামনার মানুষটি একটি পোষা বানরের মতো ধরা দেয়।

জা কুলি মাসের বিকেল। বাইরের উপত্যকায় ঘন রোদ ছড়িয়ে রয়েছে। সোনালি আমেজে মাখামাখি হয়ে রয়েছে বন, পাহাড়, মালভূমি।

আচমকা সুড়ঙ্গের ওপর একটি ছায়া পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে গুহাগর্ভের অগ্নিপিণ্ড দু’টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। কর্কশ গলা ভেসে এল নাকপোলিবার, কে রে শয়তানের বাচ্চা, কে ওখানে?

আমি সালুনারু?

ভেতরে আয়।

হামাগুড়ি দিয়ে গুহার মধ্যে চলে এল সালুনারু। চারপাশে অন্ধকার। যেন আদিম কোনো দুর্নিরীক্ষ্য কাল থেকে রাশি রাশি প্রেত ওত পেতে রয়েছে নাকপোলিবার গুহায়। এই প্রেতগুলির সঙ্গে নাকপোলিবার সর্বক্ষণ বসবাস। বুকের মধ্যে হৃৎপিণ্ডটা ছমছম করে উঠল সালুনারুর।

চারপাশে পাথরের ভাঁজে ভাঁজে পেন্যু কাঠের রক্তাভ আগুন জ্বলছে। আগুন নয়, যেন সেই প্রেতাত্মাদের নিষ্পলক দৃষ্টি।

নাকপোলিবা বলল, কী চাই তোর? ভালোবাসার লোককে বশ করার কায়দা শিখতে এসেছিস? তার দাম এনেছিস তো? চারটে বর্শা, দুখুদি ধান। কি লো পাহাড়ী জোয়ানী?

আতঙ্কে হৃৎপিণ্ডের ওপর রক্ত চলকে চলকে পড়ছিল সালুনারুর। এবার অনেকটা ধাতস্থ হল সে, ভালোবাসার নাগরকে বশ করতে আসিনি তোর কাছে। ডাইনি হতে এসেছি। আমাকে মন্ত্র-তন্ত্র শিখিয়ে দে। আমি ডাইনি হব।

বলে কী মেয়েটা! বয়সের হিসাব নেই নাকপোলিবার, লেখাজোখা নেই অভিজ্ঞতার। এই অসংখ্য বছরের জীবনে পাহাড়ী উপত্যকায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম কত মানুষই না দেখেছে ডাইনি নাকপোলিবা। কুরুগুলাঙ গ্রাম দেখেছে। তারপর সেই গ্রাম ভেঙে রক্তক্ষয়ের মধ্যে কেমন করে গড়ে উঠল এই কেলুরি আর সালুয়ালাঙ জনপদ, তাও দেখেছে। কত ঝড়-তুফান দেখেছে। নাকপোলিবা, পাহাড়ী পৃথিবীর কত জন্ম-মৃত্যু দেখেছে! তার সীমাসংখ্যা নেই। কত যুবক যুবতী এসেছে তাদের ভালোবাসার মানুষটিকে বশ করার মন্ত্র নিতে, সুলুক সন্ধান জানতে। কিন্তু সালুনারুর মতো এমন কথা কেউ কোনোদিন বলেনি। এমন কথা আগে আর কোনদিন শোনেনি ডাইনি নাকপোলিবা।

অগ্নিপিণ্ড দুটো আশ্চর্য বিস্ময়ে সালুনারুর মুখের ওপর স্থির হয়ে রয়েছে। সারা বুকে উল্কি। পৃথিবীর আদিম শিল্প নাকপোলিবার অনাবৃত দেহে যথেচ্ছ রেখায় আঁকা রয়েছে। শীর্ণ দু’টি স্তনের নিচে বুকটা ধুকপুক করে নড়ছে নাকপোলিবার। সে বলল, কী বললি–ডাইনি হবি!

হু-হু—

কেন? তুই কোন বস্তির মেয়ে?

আমি হুই কেলুরি বস্তির মেয়ে। আমাকে ওখানকার সদ্দার ভাগিয়ে দিয়েছে। ডাইনি হয়ে ওদের সবাইকে খতম করব। ক্রুদ্ধ সাপিনীর মতো ফণা তুলল সালুনারু, তুই আমাকে ডাইনি করে দে।

তুই বিয়ে করেছিস? সোয়ামী আছে?

বিয়ে করেছিলাম। সোয়ামীকে রেজু আনিজা মেরে ফেলেছে।

চকিত হয়ে উঠল ডাইনি নাকপোলিবা, রেঞ্জু আনিজা মেরেছে? নাম কি তোর সোয়ামীর?

রেঙকিলান।

রেঙকিলান! রেজু আনিজা! নিদাঁত মাড়ি বার করে প্রেতের মতো হেসে উঠল ডাইনি নাকপোলিবা। তার বীভৎস হাসিটা গুহার দেওয়ালে দেওয়ালে ধাক্কা খেতে খেতে ভীতিকর প্রতিধ্বনি তুলতে লাগল। হাসির দমকে আগুনের গোলক দুটো একবার নিভতে লাগল, আবার জ্বলতে লাগল।

রেঙকিলান! রেজু আনিজা! আমিই তো রেজু আনিজা। তোর সোয়ামীকে আমিই মেরেছি। কী মজার খেলা বল তো। রেঙকিলানের নাম ধরে সেদিন দক্ষিণ পাহাড় থেকে ডাক দিলাম। ব্যস, তারপরেই খাদে পড়ে শয়তানটা একেবারে খতম। আমি এতদিন খালি ভেবেছি, ছোঁড়াটা আবার মরল কিনা। তুই আমাকে বাঁচালি। খেলাটা নতুন ধরেছি কিনা। বেশ ভালোই মনে হচ্ছে। হিঃ হিঃহিঃ–আগের মতোই ফের হেসে উঠল সে।

তুই মেরেছিস আমার সোয়ামীকে? কঁপা গলায় বলল সালুনারু। কেউ শুনল না সে কথা। নাকপোলিবা না, হয়তো সালুনারু নিজেও না। প্রেতাত্মা! বুড়ি নাকপোলিবা শুধু ডাইনিই না, একটা ভয়ানক আনিজা। সে-ই তবে রেঙকিলানকে ডেকে ডেকে বিভ্রান্ত করে খাদের অতলে ফেলে মেরেছে! সালুনারুর মনে হল, একটা প্রচণ্ড উৎক্ষেপে খ্যাপা বাঘিনীর মতো তার দেহটা ঝাঁপিয়ে পড়বে ডাইনি নাকপোলিবার ঘাড়ের ওপর। তারপর ধারাল নখে নখে, দাঁতে দাঁতে টুকরো টুকরো করে ফেলবে তাকে। কিন্তু কিছুই হল না। চারপাশের পাথরের ভাজে ভাঁজে প্রেতদৃষ্টির মতো আগুন, নাকপোলিবার হাসি আর অন্ধকার। এধারে ওধারে কারা যেন হিম নিশ্বাস ফেলছে। চেতনাটা অবশ হয়ে আসতে থাকে সালুনারুর।

নাকপোলিবা বলল, ডাইনি হবি? মন্ত্র শেখার দাম এনেছিস?

আড়ষ্ট গলায় সালুনারু বলল, আমার সোয়ামীর জান নিয়েছিস। হুই জানের দামে আমাকে। ডাইনি করে দে। কেলুরি বস্তিকে আমি সাবাড় করে ছাড়ব।

আচ্ছা, তাই দেব। ডাইনিই বানিয়ে দেব তোকে। কিন্তু এখানে থাকতে হবে। পারবি তো?

বুকটা কেঁপে উঠল সালুনারুর। ভীরু গলায় সে বলল, পারব।

আচমকা সুড়ঙ্গের ওপর আবার তিনটি ছায়া পড়ল।

গুহার মধ্য থেকে তীক্ষ্ণ গলায় চিৎকার করে উঠল নাকপোলিবা, কে? কে ওখানে? ভেতরে আয় শয়তানের বাচ্চারা।

আমরা পিসি। মেহেলী, লিজোমু আর পলিঙা হামাগুড়ি দিয়ে গুহার মধ্যে ঢুকল।

নাকপোলিবা বলল, কী চাই তোদের?

মেহেলী বলল, তোর ওষুধের দাম নিয়ে এসেছি পিসি। ওষুধ দে।

কই, দেখি দেখি–

মেহেলীর হাতের মুঠি থেকে চারটে বর্শা আর দুখুদি ধান ছিনিয়ে নিল ডাইনি নাকপোলিবা। সেগুলো পাথরের খাঁজে লুকিয়ে রাখতে রাখতে বলল, কিসের ওষুধ?

সেদিন আমি আর পলিঙা এসেছিলুম। তোকে বলে গেলুম, সেঙাইকে আমার মনে ধরেছে। ওকে আমার চাই। আমাদের শত্রু ওরা, তাই বশ করতে হবে।

হু-হু, মনে ধরেছে

এপাশ থেকে সালুনার তীব্র গলায় বলে উঠল, সেঙাই? কোন সেঙাই? কেলুরি বস্তির সেঙাই নাকি?

হু-হু–শান্ত গলায় বলল মেহেলী।

সেঙাই না তোর দাদাকে বর্শা দিয়ে কুঁড়েছে? বিস্ময়ে কেঁপে উঠল সালুনারুর গলা।

বর্শা দিয়ে কুঁড়েছে দাদাকে, তাতে আমার কী? সে আমার পিরিতের মানুষ। তাকে আমার চাই। কণ্ঠটা কেমন আবিষ্ট হয়ে এল মেহেলীর।

চুপ কর সব। কত দেখলাম এই বয়েসে। পিরিত হয়েছে, তা সে যত শত্ৰুই হোক, বর্শা দিয়ে ফুড়ে যাক নিজেকে, তবু বিছানায় শুলে তার কথা মনে পড়ে। তাকে না হলে ঘুম আসে না। মন সোয়াস্তি মানে না। কী বলিস লো মেহেলী? বুকের মধ্যে যেন ঘা মেরে যায় জোয়ানেরা। হিঃ হিঃ করে গা-ছমছম হাসি হেসে উঠল ডাইনি নাকপোলিবা।

কিছুক্ষণ বিরতি। সুড়ঙ্গের ওধারে বনময় উপত্যকায় বিকেলের রোদ নিভে আসতে শুরু করেছে। ছায়া ছায়া হয়ে আসছে পাহাড়ী পৃথিবী। গুহার অন্ধকার আরো ঘন হচ্ছে।

একসময় মেহেলী বলল, আমার ওষুধ দে পিসি।

সেঙাইকে আটক করেছিস তো? যে ওষুধ দেব, তার গায়ে না ছোঁয়ালে সে বশ হবে না কিন্তু। একবার ছোঁয়াতে পারলে পোষা বাঁদর বনে যাবে।

হু-হু। সেঙাই শয়তানটাকে আটক করেছি আমার শোবার ঘরে।

শোনামাত্র একটি মুহূর্তও দাঁড়াল না লিজোমু। সুড়ঙ্গপথের মধ্য দিয়ে একটা ছিলামুক্ত তীরের মতো তার নগ্ন দেহটা সাঁ করে বাইরের উপত্যকায় ছিটকে পড়ল।

সেঙাই! খ্যাপা একটা বাঘিনীর মতো লাফিয়ে উঠল সালুনারু। কেলুরি গ্রামের একজনকে অন্তত সে তার থাবার সীমানায় পেয়েছে। কেলুরি গ্রাম! বুড়ো খাপেগা তাকে বর্শা দিয়ে শাসিয়ে দিয়েছে, ও গ্রামে ঢুকলে আর প্রাণ নিয়ে ফিরতে হবে না। দেহের প্রতিটি ইন্দ্রিয় প্রখর হয়ে উঠল সালুনারুর। সে বলল, আমিও যাব একটু সালুয়ালাঙ বস্তিতে। সে-ও আর দাঁড়াল না। সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে তার অনাবৃত দেহ একটা নিক্ষিপ্ত বল্লমের মতো বাইরের অরণ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।

একপাশে নিথর হয়ে বসে সব কিছু দেখল আর শুনল পলিঙা এবং মেহেলী।

ইতিমধ্যে রাশি রাশি বাঁশের চোঙা বার করেছে বুড়ি নাকপোলিবা। পোড়া চুল, পিঁপড়ের মাটি, গুনু পাতা আর আতামারী লতার শিকড় মুঠোতে নিয়ে বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়তে লাগল সে। মাঝে মাঝে একটানা ফুঁ দিয়ে চলল। তারপর মরা মানুষের করোটি আর মোষের হাড় সেগুলোতে ঠেকিয়ে মেহেলীর দিকে জীর্ণ হাতখানা বাড়িয়ে দিল নাকপোলিবা, এগুলো সেঙাইয়ের গায়ে ঠেকাবি। খবদ্দার, ও যেন দেখতে না পায়। দেখবি একটা পোষা বাঁদর হয়ে দিনরাত তোর গায়ের গন্ধ শুকবে সেঙাই।

আবার অট্টহাসি বেজে উঠল নাকপোলিবার নিদাত মুখে। সে হাসি গুহার অন্ধকারে ভয়ানক হয়ে বাজতে লাগল।

 ১৫. ছুটে চলেছে লিজোমু

১৫.

ছিলামুক্ত তীরের মতো ছুটে চলেছে লিজোমু। পায়ের তলা দিয়ে সরে সরে যাচ্ছে চড়াই উতরাই। সরে যাচ্ছে উপত্যকা আর মালভূমি। এক টিলা থেকে আর এক টিলার ওপর দিয়ে এগিয়ে চলেছে সে। পায়ের নিচে ছিটকে যাচ্ছে পাথর, এবড়োখেবড়ো রুক্ষ মাটি, আর অস্ফুট চেতনার ওপর সাঁ সাঁ করে ছুটে ছুটে যাচ্ছে কতকগুলো মুখ, কতকগুলো ভাবনার রেখা। সেঙাই! খোকে! মেহেলী!

খোনকেকে সর্দার ফেলে দিয়েছিল গভীর খাদের ভেতর। খোনকের সঙ্গে সঙ্গে লিজোমুর জীবন থেকে পাহাড়ী পুরুষের প্রেম কি একেবারেই মুছে গিয়েছে? না, না। টিজু নদীর এপার থেকে সে অনেকবার দেখেছে সালুয়ালা গ্রামের যৌবনকে। সেঙাইকে। এক বিচিত্র নেশায় তার আধফোঁটা মনটা সেঙাইর রূপে আবিষ্ট হয়ে ছিল। তা ছাড়া, মেহেলীর কাছে সেঙাই-এর কথা অনেক শুনেছে। তার পাহাড়ী মন বার বার দোল খেয়েছে। কিন্তু সেদিন তার জীবনে ছিল খোকে। লিজোমুর সেঙাইমুখী দেহমন খোকের পিরিতে সোহাগে একটু একটু করে নিভে গিয়েছে। তার অস্ফুট বন্য মনটা আর দু’টি পিঙ্গল চোখ ভরে খোনকে কাল পর্যন্ত বেঁচে ছিল। কিন্তু আজ আর নেই খোকে। খোনকে যদি নাই রইল পৃথিবীতে, তবে কি তার উদ্দাম যৌবন ব্যর্থ হয়ে যাবে? পাহাড়ী কুমারীরা পিরিত করবে, মনের মানুষের সঙ্গে ঘর বাঁধবে, সমাজকে ভোজ খাওয়াবে। আর সে-ই শুধু পুরুষহীন জীবন নিয়ে জ্বলে পুড়ে খাক হবে? না, না। খোকের দাম সে আদায় করবে সেঙাই-এর কাছ থেকে।

সেও পাহাড়ী মেয়ে। প্রয়োজন হলে পুরুষের যৌবনকে অন্যের কামনা থেকে ছিনিয়ে আনতে পারে। তা ছাড়া, সে পুরুষ যদি সেঙাই হয়। মেহেলী তার চোখের সামনে কেলুরি গ্রামের যৌবনকে ভোগ করবে, তা হয় না। তা হতে পারে না। অন্তত খোনকেহীন এই জীবনে লিজোমু তা সহ্য করবে না। খোনকে যদি নাই রইল, পাহাড়ী যৌবনের দাবি কি তবে চরিতার্থ হবে না? খোনকে নেই, কিন্তু তার কামনার আগুন অন্য পুরুষের দেহেও রয়েছে। খানকে নেই, কিন্তু তার ব্যগ্র আলিঙ্গন অন্য কারো দু’টি বাহুর মধ্যে থাকতে পারে। আর সে দেহ, সে বাহু যদি সেঙাই-এর হয়। সালুয়ালা গ্রামের শত্রুপক্ষ সেই পুরুষকে তার চাই।

কখন যে বিশাল খাসেম গাছটার তলায় এসে দাঁড়িয়ে পড়েছিল লিজোমু, খেয়াল ছিল না। চারিদিকে একবার চনমনে চোখে তাকাল। অনেক চড়াই উতরাই, অনেক টিলা উপত্যকা ডিঙিয়ে এসেছে। ঘন ঘন নিশ্বাসে বুকখানা উঠছে, নামছে।

চারপাশে বেলাশেষের রং নিভে আসতে শুরু করেছে। রোদ সরে গিয়েছে দূরের পাহাড়চূড়ায়।

আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না লিজোমু, তরতর করে বাঁশের সিঁড়ি বেয়ে ওপরের ঘরে চলে এল।

পাটাতনের ওপর উবু হয়ে বসে ছিল সেঙাই। চমকে উঠল, কে? কে রে, মেহেলী এসেছিস নাকি?

ময়াল সাপিনীর মতো লিজোমু হিসহিস করে উঠল, কেন? মেহেলী ছাড়া আর কোনো জোয়ান মাগী নেই সালুয়ালাঙ বস্তিতে?

কে তুই?

আমি লিজোমু। কেন তুই আমার পিরীতের মরদটাকে মেরেছিস সেঙাই?

ঘরের মধ্যে আবছা অন্ধকার। আতামারী পাতার চালের ফাঁক দিয়ে বেলাশেষের খানিকটা ঝাপসা রং এসে পড়েছে। কেমন যেন রহস্যময় হয়ে উঠেছে পরিবেশটা।

গলাটা এবার কেঁপে উঠল সেঙাই-এর, কে তোর পিরিতের মরদ?

খোনকে।

খোকে! সেঙাই চেঁচিয়ে উঠল।

হু-হু, খোকে। তুই খোকেকে মেরেছিস। আমার জোয়ান নাগরটা মরেছে, তার দাম দিতে হবে। আবছা অন্ধকারেও লিজোমুর চোখদুটো যেন জ্বলছে।

কী দাম দেব? শিউরে উঠল সেঙাই, আমাকে মারিস না। কাল রাত্তিরে আমি খাদে পড়ে গিয়েছিলাম। খুব লেগেছে। সারা গা কেটেকুটে ফালাফালা হয়ে গেছে।

না, তোকে মারতে আসিনি সেঙাই। খোনকের জানের দাম তুই নিজে। তুই আমার লগোয়া পন্য (প্রেমিক) হ। তোকে আমি চাই। সেঙাই-এর পাশে অন্তরঙ্গ হয়ে বসল লিজোমু।

তোকে আমি চাই না। মেহেলী কোথায়? তামুনুর (চিকিৎসক) কাছ থেকে আমাকে ওষুধ এনে দেবে বলেছিল, এখনও এল না তো? ছিটকে পাটাতনের আর এক পাশে সরে গেল সেঙাই। তরপর ক্রুদ্ধ গলায় বলল, তোকে আমি চাই না। তুই ভাগ।

আমাকে চাস না! বেশ, তা হলে খোকেকে ফেরত দে। আমার তো আর পিরিত করার মরদ নেই। সাপের মাথার মণির মতো লিজোমুর চোখ দুটো দপদপ জ্বলছে, তুই আমার হ। আমাকে তোর সঙ্গে নিয়ে যা তোদের বস্তিতে।

আমি পারব না।

পারবি না? মেহেলীর সঙ্গে পিরিত করতে পারবি, আর আমার সঙ্গে পারবি না! তোকে পারতেই হবে। বলতে বলতে সেঙাই-এর আরো কাছে সরে এল লিজোমু। গাঢ় গলায় বলল,

তুই আমাকে পিরিত করবি কিনা বল?

না।

তবে খোনকেকে মারলি কেন?

আমার ঠাকুরদাকে তোরা অনেক কাল আগে মেরেছিস। তার শোধ তুললাম। তবু আপশোশ রইল। খোনকের মাথাটা আমাদের মোরাঙে নিয়ে যেতে পারলাম না। শেষ দিকে কেমন যেন বিমর্ষ শোনালো সেঙাইর গলাটা।

বেশ, শোধবোধ হল। এবার আমাকে তোর লগোয় লেন (প্রেমিকা) করে নে।

না।

না! আমার সঙ্গে পিরিত করবি না! তা হলে মনে রাখিস সেঙাই শয়তান, আমার চোখের সামনে মেহেলীর সঙ্গে তোর পিরীত জমতে দেব না। তোকে আর তোদর বস্তিতেও ফিরতে হবে না। আমি এখুনি সদ্দারকে ডেকে আনছি। পাটাতনের ফোকর দিয়ে বাঁশের সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়ে দেল লিজোমু।

এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে রইল সেঙাই। আচমকা তার শিরায় শিরায় চমক খেলে গেল যেন। নিষ্ক্রিয়তা দেহমন থেকে ঝরে গেল। সে জানে, লিজোমু যেই তাদের সর্দারকে খবর দেবে, সঙ্গে সঙ্গে এই গাছের চারপাশে তীরধনুক আর বর্শার ফলায় মৃত্যু ছুটে আসবে। নাঃ, কোনোমেতেই লিজোমুকে নামতে দেওয়া হবে না খাসেম গাছের মগডালের এই ছোট ঘরখানা থেকে। সাঁ করে পাটাতন থেকে মেহেলীর একখানা মেরিকেতসু তুলে নিল সেঙাই। তারপর তাক করে ছুঁড়ে মারল।

অব্যর্থ লক্ষ্য। ধারাল অস্ত্রটা লিজোমুর কোমল বুকের ওপরে গেঁথে গেল। ফিনকি দিয়ে টকটকে তাজা রক্ত বাঁশের পাটাতন ভিজিয়ে দিতে লাগল। আর্তনাদ করে ঘরের মধ্যেই লুটিয়ে পড়ল লিজোমু, আ-উ-উ-উ–

ইতিমধ্যে একটা বাঁশের পানপাত্র তুলে নিয়েছে সেঙাই। সেটা দিয়ে লিজোমুর দেহের ওপর একটার পর একটা আঘাত দিয়ে চলল। অবিরাম, বার বার।

খানিক পর লিজোমুর দেহটা একেবারেই নিস্পন্দ হয়ে গেল। এবার থামল সেঙাই। লিজোমুকে এই ঘর থেকে ছেড়ে দিলে তার নিজের মৃত্যু ছিল অনিবার্য।

পাটাতনের ফোকর দিয়ে বাইরের দিকে তাকাল সেঙাই। পাহাড়ী উপত্যকা থেকে দিনের আলো মুছে গিয়েছে। অন্ধকার নেমে আসছে উত্তর পাহাড়ের চূড়ায়। আসন্ন রাত্রির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একটা বিচিত্র চিন্তা খেলে গেল সেঙাই-এর মাথায়।

.

১৬.

জা কুলি মাসের রাত্রি অনেক গম্ভীর হয়েছে। প্রথম প্রহর পার হয়ে গিয়েছে খানিকটা আগে।

হো-ও-ও-ও-আ-আ—

হো-ও-ও-ও-আ-আ–

আচমকা সালুয়ালা গ্রামটা কেঁপে কেঁপে উঠল। অজস্র জোয়ানের গর্জনে শিউরে উঠল হিমাক্ত অন্ধকার।

পেন্যু কাঠের অনেকগুলো মশাল অন্ধকারকে ফালাফালা করে ছুটে আসছে খাসেম গাছটার দিকে। মশালের আলোতে বর্শার ফলাগুলো ঝকমক করে উঠছে। উদ্দাম গতিতে ছুটে আসছে একটা পাহাড়ী ঝড়। জোয়ান মানুষের ঝড়। মাথায় তাদের মোষের শিঙের মুকুট। পরনে মানুষের মুণ্ডু-আঁকা পী মুঙ কাপড়। দুচোখে হত্যার প্রতিজ্ঞা।

একেবারে সামনে রয়েছে সালুনারু আর বুড়ো সর্দার।

সর্দার গর্জে উঠল, কোথায় সেঙাই? কেলুরি বস্তির শয়তান আমাদের খোনকেকে মেরেছে। মুণ্ডু ছিঁড়ে মোরাঙে ঝুলিয়ে রাখবে আজ। ইজা হান্টাসা সালো।

সালুনারু বলল, তবে বুঝব সদ্দার তোর মুরোদ। শুধু কি খোকেকে কুঁড়েছে হুই সেঙাই, মেহেলীর সঙ্গে পিরিতও জমিয়েছে। তার ঘরে রাত কাটাতে এসেছে এ বস্তিতে। গাছের মাথায় মেহেলীর ঘরে আছে টেফঙের বাচ্চাটা।

হো-ও-ও-ও-আ-আ–

শোরগোল উদ্দাম হয়ে উঠেছে। রীতিমতো ধুন্ধুমার। সালুয়ালা গ্রামের জোয়ানেরা কি জানত, জা কুলি মাসের এই রাত্রিটা তাদের জন্য এমন একটা হত্যার সুযোগ নিয়ে আসবে?

হো-ও-ও-ও-আ-আ–

খাসেম গাছটার চারপাশ ঘিরে ধরল জোয়ান ছেলেরা। পাহাড়ী মাটির ভাঁজে মশালগুলো পুঁতে দিল। অন্ধকার যেন চারপাশে জমাট বেঁধে গিয়েছে। আর সেই কঠিন অন্ধকার চিরে চিরে মশালের শিখা জ্বলছে। মশালের আলোগুলির চারিদিক ঘিরে গুঁড়ো গুঁড়ো সাদা বরফ ঝরছে। জা কুলি মাসের অসহ্য হিমাক্ত রাত্রি। কিন্তু আদিম এক হত্যার নেশায় সালুয়ালা গ্রামের জোয়ানেরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এই হিমঝরা রাত্রি তাদের বিন্দুমাত্র বিচলিত করতে পারছে না।

হো-ও-ও-ও-আ-আ—

উত্তেজিত গলায় কে যেন বলল, কি রে সদ্দার, কী করব এবার?

আরো একটা গলা শোনা গেল, আমি কিন্তু সেঙাই-এর মুণ্ডুটা কাটব।

না, আমি, আমি। সর্দারের কাছে সকলেই এক দাবি জানাল; তারস্বরে চিৎকার করতে লাগল।

চুপ কর টেফঙের বাচ্চারা। আহে ভু টেলো। মাথা ঝাঁকিয়ে বুড়ো সর্দার ধমকে ওঠে। বুকের ওপর সাপের হাড়ের মালাটা ঝনঝন করে বেজে উঠল। মাথায় মোষের শিঙের মুকুট দুলতে লাগল। রক্তচোখে জোয়ানগুলোর মুখের দিকে তাকিয়ে বুড়ো সর্দার বলল, কেউ উঠে হুই ঘর থেকে শয়তানের বাচ্চাটাকে ছুঁড়ে নিয়ে আয়।

উত্তেজনায় একজন সিঁড়ির দিকে ছুটে গেল। তার ডান হাতের মাথায় একটা অতিকায় খারে বর্শা। বাঁ হাত দিয়ে সিঁড়ির বাঁশ চেপে ধরল জোয়ানটা। আচমকা পেছন থেকে আর একজন দুহাতে কোমর জড়িয়ে ধরে টেনে নামিয়ে দিল তাকে, কি রে টেফঙ, মরতে যাচ্ছিস নাকি? ওপর থেকে সেঙাই যদি বর্শা হাঁকড়ায়, তখন? •

তাই তো, এই কথাটা আগে ভেবে দেখেনি কেউ। ওপর থেকে সেঙাই যদি বর্শা চালায়, তবে টুপ করে একটা পাকা খাসেম ফলের মতো নিচে পড়ে যাবে। নির্ঘাত মৃত্যু।

বুড়ো সর্দার জ্বলন্ত চোখে খাসেম গাছের মগডালে আতামারী পাতায় ছাওয়া ছোট্ট ঘরখানার দিকে তাকিয়ে রইল।

আচমকা সালুনারু বলল, উঠলে নির্ঘাত বর্শা দিয়ে খুঁড়বে সেঙাই। বর্শা চালাতে ও ভারি ওস্তাদ। তার চেয়ে পুড়িয়ে মার।

হো-ও-ও-ও-আ-আ–

হো-ও-ও-ও-আ-আ–

ছোট্ট সালুয়ালা গ্রামটা পাহাড়ী মানুষগুলোর অনবরত চিৎকারে শিউরে উঠতে লাগল। খাসা বুদ্ধি জুগিয়েছে সালুনারু। সকলে মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে সায় দিল, হুস্থ, সেই ভালো।

বুড়ো সর্দার বলল, কিন্তু আগুন ধরাব কেমন করে?

টেনে টেনে ব্যঙ্গভরা গলায় সালুনারু বলল, এই বুদ্ধিতে সদ্দার হয়েছিস! বাঁশের ডগায় মশাল বেঁধে আগুন লাগিয়ে দে।

চুপ কর শয়তানের বাচ্চা। আমার বুদ্ধি নেই? খেঁকিয়ে উঠল বুড়ো সর্দার, কিন্তু খেকানিটা ভয়ানক শোনল না। মনে মনে সে সালুনারুর খাসা মগজের তারিফ করল। অরপর জোয়ানদের দিকে তাকিয়ে বলল, যা, বাঁশ নিয়ে আয় খানকয়েক।

হো-ও-ও-ও-আ-আ–

খাসেম গাছের চারপাশে যে পাহাড়ী ঝড়টা এতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে ছিল, এবার সেটা উপত্যকার দিকে সাঁ সাঁ করে নেমে গেল।

একটু পরেই খানকয়েক বাঁশ কেটে নিয়ে এল জোয়ানেরা। তারপর সেই বাঁশের ডগায় মশাল বেঁধে বুড়ো সর্দারের দিকে তাকাল।

বুড়ো সর্দার বলল, এবার হুই ঘরে আগুন লাগিয়ে দে।

হোও–ও–ও-আ-আ–

আকাশের দিকে দিকে জোয়ানদের গলা থেকে ভয়ানক চিৎকার উঠল। সঙ্গে সঙ্গে মশালগুলো মেহেলীর ঘরখানার দিকে উঠে গেল।

হো-ও-ও-ও-আ-আ–

আতামারী পাতার চালে আগুন লেগেছে। চারপাশ থেকে লকলকে জিভ মেলে ঘরখানাকে ঘিরে ধরেছে অগ্নিশিখা। ফট ফট শব্দে বাঁশ ফাটছে। লতার বাঁধন ছিঁড়ছে। খড়ের দেওয়াল পুড়ে যাচ্ছে। খাসেম গাছের মগডালে নিষ্ঠুর আগুন, আর সেই সঙ্গে এই আদিম হত্যার উল্লাসে সালুয়ালা গ্রামের অজস্র জোয়ান একটানা চিৎকার করে চলেছে, হো-ও-ও-ও-আ-আ-, হো-ও-ও-ও-আ-আ–

আচমকা এই আগুন আর নিচের এই চিৎকারকে চমকে দিয়ে একটা তীক্ষ্ণ আর্তনাদ শোনা গেল। খাসেম গাছের ডালে জ্বলন্ত ঘরখানা থেকে সেই আর্তনাদ জা কুলি মাসের হিমাক্ত রাত্রিটাকে যেন দুমড়ে মুচড়ে একাকার করে ফেলতে লাগল, আ-উ-উ-উ-আ–

হো-ও–ও–ও-আ-আ—

নিচে পাথুরে মাটিতে জোয়ানেরা চেঁচাচ্ছে। খাসেম গাছের মগডালে এই মৃত্যুকে তারা উপভোগ করছে, লাফাচ্ছে, পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে নাচছে। নাচতে নাচতে সকলে দলা। পাকিয়ে যাচ্ছে।

বীভৎস গলায় বুড়ো সর্দার বলল, শয়তানের বাচ্চাটা মরছে। আমাদের বস্তির জিতই রয়ে গেল। সেঙাইর ঠাকুরদাকে অনেক কাল আগে আমরা মেরেছি। এবার সেঙাইকে মারলাম। হোঃ—হোঃ—হোঃ–

শত্তুর মরল। আজ রাত্তরে কিন্তু ভোজ দিতে হবে সদ্দার। জোয়ান ছেলেরা নতুন করে হল্লা শুরু করে দিল।

দেব, নিশ্চয়ই দেব রে শয়তানের বাচ্চারা। আজ আমাদের কী আনন্দের দিন! সকলের কাছ থেকে একটা করে শুয়োর নিয়ে মোরাঙে খাওয়া হবে।

হোও-ও-ও-আ-আ–

খাসেম গাছের মগডালে আগুন ক্রমশ নিভে আসছে। আতামারী পাতার ছোট্ট ঘরখানা পুড়ে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।

একসময় সকলে খাড়া উপত্যকা বেয়ে চলে যেতে শুরু করল। এই খাসেম গাছের তলা থেকে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে মশালের শিখাগুলো। শুধু ভয়াল শোরগোলের বেশটা এখনও ভেসে আসছে, হো-ও-ও-ও-আ-আ–

একটা বড় সাপেথ ঝোঁপের কিনার থেকে এই আগুন, এই হত্যা আর জোয়ানদের ভয়ঙ্কর উল্লাস দেখছিল পলিঙা আর মেহেলী। খাসেম গাছের মগডালে ওই আগুনের মতোই চোখ দুটো জ্বলছিল তার, কিন্তু কোনো উপায় ছিল না। সামনে এগিয়ে এলে সেঙাইর সঙ্গে তাকেও পুড়ে ছাই হয়ে যেতে হত। সর্দারের ক্রোধ তাকে ক্ষমা করত না।

শুধু মেহেলীর দু’টি নিরুপায় চোখের দৃষ্টি দেখছিল, কেমন করে সেঙাই নামে এক রমণীয় পুরুষ আতামারী পাতার ঘরে পুড়ে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। দেখতে দেখতে একসময় তার হাতের মুঠি থেকে নাকপোলিবার মন্ত্রপড়া ওষুধ ঝুর ঝুর করে ঝরে পড়ল।

মেহেলী তাকাল পলিঙার দিকে। জ্বালাভরা গলায় বলল, দেখলি পলিঙা, কেমন করে সদ্দার পুড়িয়ে মারল সেঙাইকে!

সাপেথ ঝোঁপটার পাশে পাথরের মতো জমাট হয়ে গিয়েছিল পলিঙা। মেহেলীর কথাগুলো তার অবশ দেহটাকে ঝকানি দিয়ে গিয়েছে, হু-হু, এ হুই সালুনারু শয়তানীর কাজ।

চোখদুটো সাপের মণির মতো দপদপ করছে। এদিক সেদিক তাকিয়ে ভয়ানক গলায় গর্জে উঠল মেহেলী, হু-হু। দেখিস, হুই সালুনারুর কলিজা ফেঁড়ে আমি রক্ত খাব। কেলুরি বস্তি থেকে এখানে এসে শয়তানি শুরু করেছে।

একটা আস্ত ডাইনি হুই মাগী। দেখছিস না, কেমন করে এ বস্তির সদ্দারকে হাত করে নিয়েছে।

আমার কেমন যেন লাগছে পলিঙা। হুই সেঙাইটা মরে গেল, ওরা পুড়িয়ে মারল। হুই সদ্দার, হুই সালুনারু, হুই জোয়ান ছোকরারা, কাউকে আমি রেহাই দেব না। আমার পিরিতের মরদকে ওরা পুড়িয়ে মারল পঙিলা; এর বদলা আমি নেব। প্রতিহিংসায় মেহেলীর চোখমুখ উগ্র হয়ে উঠল। প্রতিটি রক্তকণা যেন তার দাউ দাউ করে জ্বলছে। দু’টি পিঙ্গল চোখের মণি চৌচির করে, তামাভ দেহের প্রতিটি ইন্দ্রিয়কে ফালা ফালা করে সেই রক্তের কণিকাগুলো যেন ছিটকে বেরিয়ে আসতে চাইছে।

অনাবৃত দেহ। দুজনের সারা শরীরে সামান্য আচ্ছাদনও নেই। জা কুলি মাসের হিম নির্মম হয়ে উঠেছে। তবু মেহেলী কি পলিঙার এতটুকু সাড় নেই। সেঙাই-এর বীভৎস মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দু’টি পাহাড়ী যুবতী দৈহিক যন্ত্রণার সবরকম বোধের বাইরে চলে গিয়েছে।

মেহেলী ভাবল, এর বদলা তার নিতেই হবে। প্রতিহিংসা ছাড়া তার মনে আর কোনো প্রতিক্রিয়াই নেই এই মুহূর্তে।

হঠাৎ মেহেলী চিৎকার করে উঠল, এখন কী করি বল তো পলিঙা? সেঙাইকে না পেলে শরীরে জ্বলুনি কমবে না আজ। কত আশা করেছিলুম, যাতে সেঙাই না ভাগতে পারে, তার জন্যে ডাইনি নাকপোলিবার কাছ থেকে চারটে বর্শা আর দুখুদি ধান দিয়ে ওষুধ নিয়ে এলাম। সব হুই সালুনারু মাগী নষ্ট করে দিল।

মেহেলীর আরো কাছাকাছি ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়াল পলিঙা। তারপর প্রথামতো তার বুকের ওপর হাতখানা রেখে বলল, কী আর করবি। মোরাঙের একজন জোয়ানকে ধরে লগোয়া পন্যু (প্রেমিক) বানিয়ে নে। সেঙাই যখন নেই তখন আর কী করা যাবে?

না, না। সেঙাই-এর মতো একটা জোয়ানও কি আছে আমাদের বস্তিতে? সব এক একটা ধাড়ী বাঁদর। টেমে নটুঙ। দপদপ করে জ্বলে উঠল মেহেলীর চোখ দুটো।

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ। জা কুলি মাসের কৃষ্ণপক্ষ সমস্ত আকাশের দিকে দিকে নিবিড় অন্ধকার ছড়িয়ে দিয়েছে। এদিকে সেদিকে দু-চারটে তারা মিটমিট করছে।

একসময় মেহেলী বলল, একবার গাছে উঠে আমার ঘরটা দেখব পলি? কাল অত উঁচু থেকে খাদের মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। সেঙাই কিন্তু তখনও মরেনি। আজও তো নাও মরতে পারে।

চল, চল—

দ্রুত পা চালিয়ে খাসেম গাছটার নিচে চলে এল মেহেলী আর পলিঙা।

মেহেলী বলল, তুই এখানে দাঁড়া। আমি দেখে আসি।

বাঁশের সিঁড়িটা খুবই মজবুত। কাঁচা আতামারী লতার কঠিন বাঁধন আগুনে তেমন পোড়েনি। তরতর করে একটা বনবিড়ালের মতো ওপরে উঠে এল মেহেলী।

আতামারী পাতার চাল পুড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। বাঁশের পাটাতনের ওপর স্থূপাকার হয়ে রয়েছে ঘরপোড়া ছাই। আর সেই ছাইয়ের নিচে রক্তাভ আগুন এখনও একবারে নিভে যায়নি। দু হাত দিয়ে রাশি রাশি ছাই আর অঙ্গার সরিয়ে দেহটা খুঁজে বার করল মেহেলী। জ্বলন্ত অঙ্গারের আলোতে বীভৎস দেখাচ্ছে। চামড়া আর মাংস পুড়ে সমস্ত শরীরটা ঘেয়ো ঘেয়ো হয়ে গিয়েছে।

হাতড়াতে হাতড়াতে পোড়া দেহটির বুকে আচমকা ঝলসানো স্তনের আভাস পেল মেহেলী। সঙ্গে সঙ্গে একটা চমক খেলে গেল মেরুদাঁড়ার মধ্যে দিয়ে। সমস্ত ইন্দ্রিয় একসঙ্গে যেন ঝঙ্কার দিয়ে উঠল। এ তো সেঙাই নয়!

খাসেম গাছের মগডালে পাটাতনের ওপর থেকে চিৎকার করে উঠল মেহেলী, এই পলিঙা, ওপরে উঠে আয়। সেঙাই এখানে নেই, একটা মাগী পুড়ে মরেছে। সে যে কে, অন্ধকারে ঠিক বুঝতে পারছি না।

সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে ওপরে উঠে এল পলিঙা। মেহেলীর পাশে নিবিড় হয়ে বসল। চোখমুখ থেকে তার বিস্ময় ঠিকরে বেরুচ্ছে, কী ব্যাপার মেহেলী! সেঙাই মরেনি! বলিস কী?

বলছি ঠিকই। হু-হু, এই দ্যাখ।

অঙ্গারের রক্তাভ আলোতে মেহেলী আর পলিঙা অনেকক্ষণ ঝলসানো নারীদেহটির দিকে তাকিয়ে রইল। একসময় পলিঙা বলল, এ নির্ঘাত লিজোমু! এই দ্যাখ মেহেলী, বাঁ হাতের দুটো আঙুল নেই। আমাদের বস্তিতে লিজোমুরই তো বাঁ হাতের আঙুল দুটো কাটা। তাই না?

হু-হু। ঠিক, ঠিক।

কিন্তু লিজোমু এখানে এসেছিল কেন?

কী জানি!

জা কুলি মাসের রাত্রিতে দু’টি পাহাড়ী যুবতী মুখোমুখি বসে রইল। কথা বলছে না কেউ। একেবারে চুপচাপ।

চারপাশে পোড়া ঘরের স্তূপাকার ছাই। মেহেলী কি পলিঙার অস্ফুট পাহাড়ী মন সমস্ত বিচার দিয়ে, সমস্ত বুদ্ধি দিয়ে কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে পারছে না। কেন, কেন খাসেম গাছের মগডালে এসে একটু একটু করে ঝলসে মরল লিজোমু। মেহেলী কি পলিঙা জানে না, কেমন করে সেঙাই নামে একটা নিষিদ্ধ কামনার দিকে খারিমা পতঙ্গের মতো ঝাঁপিয়ে এসে পড়েছিল লিজোমু। কিন্তু সে কামনা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেল। সে কামনা একটু একটু করে পুড়িয়ে মারল লিজোমুকে।

পলিঙা বলল, সেঙাই নেই তো এখানে?

না, আমি ভালো করে খুঁজে দেখেছি।

সে তবে গেল কোথায়? এক মুহূর্ত চুপচাপ কেটে যাবার পর কী যেন ভেবে নিল পলিঙা, তারপর বলল, সেঙাই নিশ্চয় ভেগেছে। এক কাজ করি আয়, লিজোমুকে আমরা খাদে ফেলে দিই। নইলে সদ্দার কাল সকালে খোঁজ নিলে লিজোমুকে পেয়ে যাবে। তারপর সেঙাই আর তোর ওপর খেপে উঠবে। সদ্দারকে তো জানিস।

ঠিক বলেছিস।

একটু পরেই লিজোমুর পোড়া দেহটা কাঁধের ওপর তুলে নিচে নেমে এল মেহেলী আর পলিঙ। তারপর কয়েকটা টিলা ডিঙিয়ে খাড়াই খাদটার পাশে এসে দাঁড়াল।

মেহেলী বলল, সেদিন সদ্দার দাদাকে খাদে ফেলে মারল। আজ লিজোমুটা পুড়ে মরল। বেঁচে থাকলে ওদের বিয়ে হত।

কথা বলল না পলিঙা। মাথাটা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে সায় দিল।

একটুক্ষণ দুজনেই চুপ।

পলিঙা বলল, এবার লিজোমুকে ফেলে দিই।

একটি মাত্র মুহূর্ত। লিজোমুর ঝলসনো দেহটা শূন্যে পাক খেতে খেতে অতল খাদে মিলিয়ে গেল। একটি দুর্দান্ত পাহাড়ী কামনা জা কুলি রাত্রির অন্ধকারে চিরকালের জন্য মুছে গেল।

.

১৭.

পোকরি কেসুঙের কাছে চলে এসেছে পলিঙা আর মেহেলী।

মেহেলী বলল, লিজোমুর কথা কাউকে বলিস না পলিঙা।

, তেমন সই আমি না। যা, এবার ঘরে যা। আমিও যাই। বড্ড খিদে পেয়েছে। সামনের একটা বড় টিলার দিকে উঠে গেল পলিঙা।

আর ভীরু ভীরু পা ফেলে পোকরি কেসুঙের সীমানার মধ্যে এসে পড়ল মেহেলী। এখান থেকে পরিষ্কার নজরে আসছে, বাইরের ঘরে পেন্যু কাঠের মশাল জ্বালিয়ে মুখোমুখি বসেছে তার বাপ আর তাদের গ্রামের সর্দার। সামনে রোহি মধুর পূর্ণ পানপাত্র। কাঠের বাসনে খানিকটা ঝলসানো মাংস। সর্দার আর তার বাপের বসবার ভঙ্গিটি বড় ঘনিষ্ঠ, বড় অন্তরঙ্গ।

মোষ বলির হাড়িকাঠটা পেছনে রেখে সতর্কভাবে বাঁশের দেওয়ালের পাশে এসে দাঁড়াল মেহেলী। দেহের সমস্ত শক্তিকে কান আর দু’টি চোখের মণিতে জড়ো করে রুদ্ধশ্বাসে শুনতে লাগল।

সর্দার বলল, তোকে একটা শুয়োর দিতে হবে সাঞ্চামখাবা।

মেহেলীর বাপের নাম সাঞ্চামখাবা। তারিয়ে তারিয়ে সে রোহি মধুর পাত্রটাকে শেষ করে আনছিল। এবার মুখ তুলল, কেন? শুয়োর দিতে হবে কেন?

আজ শত্রুর পুড়িয়ে মেরেছি। হুই কেলুরি বস্তির সেঙাইকে শেষ করেছি। মোরাঙে একটা ভোজ হবে না? বুড়ো সর্দার আরো নিবিড় হয়ে বসল। তারপর খাসেম গাছের মগডালে সেঙাইকে পুড়িয়ে মারার আদ্যোপান্ত কাহিনী বেশ রসিয়ে রসিয়ে বলল।

হু-হু, নিশ্চয়ই হবে। কিন্তু সেঙাইটা কে?

হুই কেলুরি বস্তির ছেলে। তোর পিসি নিতিৎসুকে ছিনিয়ে নিতে এসে যে মরেছিল সেই জেভেথাঙের নাতি। কানের নিয়েঙ গয়না দুলিয়ে দুলিয়ে বলল বুড়ো সর্দার।

লাফিয়ে উঠল সাঞ্চামখাবা, বেশ করেছিস সদ্দার। পুড়িয়ে মেরে ঠিক করেছিস। একটা কেন, দুটো শুয়োর দেব আমি।

হু-হু। জানিস, হুই সেঙাই ছোকরা তার মেয়ের পিরিতের জোয়ান ছিল। ফুর্তি করার জন্যে খাসেম গাছের ঘরে তাকে পুষে রেখেছিল তোর মেয়ে। খবর পেয়ে একেবারে জ্যান্ত পুড়িয়ে এলুম। হোঃ-হোঃ-হো পোকরি কেসুঙটাকে কাঁপয়ে বুড়ো সর্দার সারা গা দুলিয়ে হেসে উঠল।

কে? আমার মেয়ে! মেহেলী হুই শত্রুরপক্ষের ছোকরার সঙ্গে পিরিত জমিয়েছে? তার সঙ্গে ফুর্তি করেছে? একেবারে বর্শা দিয়ে ছুঁড়ব মেয়েটাকে। রোহি মধুর মৌতাতে সাঞ্চামখাবার দুচোখ জ্বলে জ্বলে উঠতে লাগল। বলল, মেহেলীকে দেখেছিস সদ্দার?

সাঞ্চামখাবার কথা শুনে বেড়ার ওপাশের দু’টি কান চমকে উঠল। বুকের মধ্যে হৃৎপিণ্ডটা ধকধক করে লাফাতে লাগল মেহেলীর।

বাঁশের পানপাত্রটা একপাশে ছুঁড়ে হুঙ্কার দিল সাঞ্চামখাবা, মেজাজটা ভালো নেই, চারটে বর্শা আর দুখুদি ধান খোয়া গেছে। ভেবেছিলাম ওগুলো দিয়ে অঙ্গামীদের কাছ থেকে আয়োঙ্গে (হার), খারোনজে (এক ধরনের দা) আর অ্যাবেয়া (তলোয়ার জাতীয় অস্ত্র) বদল । করে আনব। আর ইদিকে শয়তানী শত্তুরদের সঙ্গে মজা করেছে!

বুড়ো সর্দার লাল লাল দাঁতগুলো মেলে হাসল। বলল, ধান আর বর্শা মেহেলীই চুরি করেছে। সেঙাইকে বশ করবার জন্যে হুই বর্শা আর ধান বদল করে ডাইনি নাকপোলিবার কাছ থেকে ওষুধ নিয়ে এসেছে।

ডাইনি নাকপোলিবা! কে বলল তোকে? চড়া গলার আওয়াজ এবার ফিসফিস শোনাল সাঞ্চামখাবার।

সালুনারু বলেছে। সে সব দেখেছে, সে-ই তো সেঙাইকে ধরিয়ে দিয়েছে।

সালুনারু! ও, কেলুরি বস্তি থেকে যে মাগীটাকে খেদিয়ে দিয়েছে?

হু-হু।

বাঁশের দেওয়ালের ওপাশে একটি নারীদেহে এই জা কুলি মাসের হিমাক্ত রাত্রিতে ঘাম ঝরতে শুরু করেছে। হৃৎপিণ্ডটা থেমে থেমে আসছে মেহেলীর। বাপ আর সর্দারের কথাগুলো শুনতে শুনতে চেতনাটা কেমন যেন অসাড় হয়ে যাচ্ছে।

বুড়ো সর্দার বলল, এবার মেহেলীকে বিয়ে দিয়ে দে।

হু-হু, তাই দিতে হবে। নানকোয়া বস্তির মেজিচিজুঙের বাপ বউপণ পাঠাবে বলেছে।

মেজিচিজুঙ! সে তো বাঘ-মানুষ। তার সঙ্গে বিয়ে দিবি?

হু-হু। মেহেলীর জন্যে অনেক পণ দেবে। শরদের একটা জোয়ানকে তো মেরেছিস। আরো কত জোয়ান আছে কেলুরি বস্তিতে। যুবতী বয়েস, তাগড়া ছোকরা দেখলে কি আর শত্তুর বলে বাগ মানবে! ঠিক পিরিত জমিয়ে বসবে। সারা শরীর নাচিয়ে হাসতে হাসতে বলে উঠল সাঞ্চামখাবা, যে বয়েসের যে ধরম। অন্য কারুর সঙ্গে মজবার আগেই মেহেলীর বিয়ে দেব। হুই নানকোয়া বস্তির বাঘ-মানুষই সই।

মেজিচিজুঙ! একটা বাঘ-মানুষের সঙ্গে তার বিয়ে দেবে সাঞ্চামখাবা! বুকের ভেতরটা ভয়ে আতঙ্কে ধড়াস করে উঠল মেহেলীর।

হু-হু, ঠিক বলেছিস। আমার মেয়ে হুই লিজোমুটাকেও বিয়ে দিতে হবে এবার। খোনকে বেঁচে থাকলে তার সঙ্গে দিতুম। কী আর করা! আনিজাতে টানল ওটাকে। বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল বুড়ো সর্দার, অনেকক্ষণ এসেছি। এবার শুয়োর দিয়ে দে। মোরাঙের ছোরারা গিলবার জন্যে বসে রয়েছে।

হু-হু, দিচ্ছি। বাইরে চল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সাঞ্চামখাবা, হুই কেলুরি বস্তির সেঙাই শয়তান খোনকেকে মারল। তাকে পুড়িয়ে মেরেছিস। একটা না, দুটো শুয়োর দেব আমি। ছেলেটা বেঁচে থাকলে তোর মেয়ের সঙ্গেই জুড়ে দিতাম।

দেহটাকে যতখানি সম্ভব ছোট করে দেওয়ালের সঙ্গে মিশে রইল মেহেলী।

দুজনে বাইরে বেরিয়ে এল।

বুড়ো সর্দার বলল, তুই মোরাঙে যাবি না?

হু-হু, যাব। দুটো শুয়োর দেব আর মাংস খেতে যাব না! তোর মতলবটা কী বল দিকি সদ্দার? মোষবলির হাড়িকাঠের পাশে এসে একবার দাঁড়াল সাঞ্চামখাবা। তারপর বলল, পথে মেহেলীকে পেলে পাঠিয়ে দিস। শয়তানীটার চামড়া তুলে নেব আজ। আমার চারটে বর্শা, দুখুদি ধান দিয়ে শত্তুরদের জোয়ানকে বশ করার ওষুধ কিনেছে! আহে ভু টেলো।

হু-হু। দেখা হলেই পাঠিয়ে দেব।

সাঞ্চামখাবা ফুঁসতে লাগল, আমাকে না বলেই মেহেলীটা শব্দুরদের ছোঁড়ার সঙ্গে পিরিত জমাল!

হু-হু।

শুনে মেজাজটা বেয়াড়া হয়ে গিয়েছে সদ্দার। হুই জোহেরি বংশের শয়তানগুলোর সাহস দেখে তাজ্জব লাগে। জেভেথাঙটাকে একবার সাবাড় করলাম, তবু আক্কেল নেই। আবার সেঙাই এসেছিল আমাদের পোকরি বংশের মাগীর সঙ্গে পিরিত ফুটোতে! একটু দম নিয়ে সাঞ্চামখাবা বলল, তা শয়তানটাকে পুড়িয়ে বেশ করেছিস।

হু-হু।

খানিকটা সময় চুপচাপ কাটল।

চল, হুই দিকে শুয়োরগুলো রয়েছে। পোকরি কেসুঙের পেছনের অংশে সাঞ্চামখাবা আর বুড়ো সর্দার অদৃশ্য হয়ে গেল।

আর বাঁশের দেওয়ালটার পাশে দাঁড়িয়ে কর্তব্য স্থির করে ফেলল মেহেলী। আজ রাতে বাপের সামনে গিয়ে তাদের বাইরের ঘরে কিছুতেই দাঁড়াতে পারবে না সে। তাহলে নির্ঘাত বর্শা দিয়ে তাকে ছুঁড়ে ফেলবে সাঞ্চামখাবা। জা কুলি মাসের এই রাত্রিটুকুর জন্য সে পলিঙার বিছানায় আশ্রয় নেবে। সে বিছানা নিরাপদ, নির্বিঘ্ন।

.

১৮.

টলে টলে চড়াইটার দিকে উঠতে উঠতে একবার পেছন ফিরল সেঙাই। অনেক, অনেক দূরে টিজু নদীর ওপারে সালুয়ালাঙ গ্রামখানা এখন জা কুলি রাত্রির অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে।

কপালের দু’পাশে রগ দুটো সমানে লাফিয়ে চলেছে। খাদের মধ্যে আছড়ে পড়ে সমস্ত শরীরটা ফালা ফালা হয়ে ছিঁড়ে গিয়েছিল। সারা দেহে চাপ চাপ রক্ত শুকিয়ে কলো হয়ে। রয়েছে। অনেক রক্ত দেহ থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। অবসাদ আর অপরিসীম শ্রান্তিতে পেশীগুলো কুঁকড়ে কুঁকড়ে আসছে সেঙাই-এর। বুকের ভেতরটা খালি করে বড় বড় নিশ্বাস পড়তে লাগল ঘন ঘন।

চেতনাটা কেমন আচ্ছন্ন হয়ে আসছে। একবার হিমাক্ত পাথরের ওপর বসে পড়ল সেঙাই। তার অস্পষ্ট ভাবনার ওপর কতকগুলো ঘটনা জট পাকিয়ে গেল। এই দুটো দিন কেমন যেন অসত্য মনে হয়, কেমন যেন অবাস্তব। খোনকে, খাদের মধ্যে বেহুঁশ হয়ে পড়ে যাওয়া, মেহেলী, খাসেম গাছের মগডালে আতামারী পাতার ঘর, লিজোমু। এদের মধ্যে যেন কোনো যোগ নেই, মিল নেই। সব বিচ্ছিন্ন, গ্রন্থিহীন, শিথিলবদ্ধ। আবার সব মিলিয়ে এক, অখণ্ড। পাহাড়ী মানুষ সেঙাই, তার ঘোলাটে চেতনার মধ্যে এখন তাদের কোনো ধারাবাহিক ছবি ধরতে পারছে না।

শুধু মনে পড়ছে লিজোমুকে। উঃ, আতঙ্কে সমস্ত ইন্দ্রিয় যেন শিউরে ওঠে এখনও। শরীরের সমস্ত শক্তি দু’টি কবজির মধ্যে এনে সে মেরিকেতসুটা ছুঁড়ে মেরেছিল লিজোমুর বুকে। বাঁশের পাটাতনের ওপর আর্তনাদ করে আছড়ে পড়েছিল লিজোমু। তারপর বাঁশের পানপাত্র দিয়ে তার অচেতন দেহটাকে আঘাতের পর আঘাতে অসাড় করে দিয়েছিল সে। সালুয়ালা গ্রামের সর্দারকে তার খবর দেবার সব আশঙ্কাই নির্মূল করে দিয়েছিল।

তারপর আরো খানিকক্ষণ অপেক্ষা করেছিল সেঙাই। যেই উত্তর পাহাড়ের চূড়ায় সন্ধ্যার ধূসর ছায়া পড়তে শুরু হল, ঠিক তখনই বাঁশের সিঁড়িটা বেয়ে তরতর করে নিচে নেমে এসেছিল। তারও পর ঘন বনের আড়ালে আড়ালে চড়াই উতরাই উজিয়ে, উপত্যকা ডিঙিয়ে, টিজু নদীর নীল ধারা পেরিয়ে এইমাত্র এপারে চলে আসতে আসতে একবারও সালুয়ালা গ্রামখানার দিকে তাকায় নি।

মাত্র কিছুক্ষণ আগের ঘটনা। তবু যেন মনে হয়, একটা জন্মান্তর ঘটে গিয়েছে। পাথরের টিলায় বসে ফুসফুস ভরে বারকয়েক বাতাস টেনে নিল সেঙাই। তারপর পাশের একটা মেশিহেঙ ঝোঁপ ধরে উঠে দাঁড়াল।

আচমকা সেঙাই-এর নজরে পড়ল, অনেক, অনেক দূরে সালুয়ালা গ্রামের আকাশ চিরে চিরে আগুন উঠছে। সেই আগুন জা কুলি মাসের হিমাক্ত অন্ধকারে রক্তলেখার মতো ফুটে বেরিয়েছে। সেঙাই জানতেও পারল না, ওই আগুন খাসেম গাছের মগডালে আতামারী পাতার ঘরখানাকে পুড়িয়ে দিচ্ছে। সেই ঘর, যেখানে একটু আগেও সে আটক হয়ে ছিল। সে জানতেও পারল না, সেঙাই নামে এক বন্য পুরুষ কামনায় খারিমা পতঙ্গের মতো যে নারীদেহটি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সে এখন ওই আকাশছোঁয়া আগুনে ঝলসে ঝলসে মরছে।

টিলাটার ওপর থেকে উঠে পড়ল সেঙাই। ফের টলতে টলতে উপত্যকার দিকে নামতে লাগল। এখনও অনেকটা পথ পেরিয়ে যেতে হবে। তারপর পাওয়া যাবে তাদের ছোট্ট গ্রাম কেলুরির সীমানা।

.

হো-ও-ও-ও-আ-আ—

হো-ও-ও-ও-আ-আ–

জা কুলি মাসের রাত্রিটাকে চকিত করে উল্লসিত শোরগোল উঠতে লাগল। কেলুরি গ্রামের মোরাঙের সামনে অনেকগুলো মশাল জ্বলছে। পেন্য কাঠের মশাল। আর সেই মশালগুলোর চারপাশে গোল হয়ে বসেছে জোয়ান ছেলেরা। ঠিক মাঝখানে একটা অগ্নিকুণ্ড জ্বালানো হয়েছে। মোটা মোটা খাসেম কাঠে আগুনের গনগনে রক্তাভা।

একপাশে পড়ে রয়েছে গোটা দুই বুনো মোষ। প্রাণী দু’টির সারা গায়ে তীর আর বর্শায় ফলা ফুটে রয়েছে। লাল হেপোন্যে ফুলের মতো থোকা থোকা তাজা রক্ত ঘন হয়ে রয়েছে। পাহাড়ী মানুষগুলো তীর আর বর্শা দিয়ে বুনো মোষের কুচকুচে কালো দেহে নিষ্ঠুর ছবি এঁকেছে যেন। আজ দুপুরে শিকারে গিয়েছিল জোয়ান ছেলেরা। বর্শা আর তীরের ফলায় বুনো মোষ গেঁথে ফিরেছে একটু আগে।

রাত্রি ঘন হচ্ছে। আগুনের কুণ্ডটার চারপাশে নিবিড় হয়ে বসেছে উলঙ্গ জোয়ানগুলো।

একজন বলল, হু-হু, বুনো মোষ দুটো বড় ভুগিয়েছে। তা হোক, আজ ভোজ বেশ জমবে, কি বলিস তোরা?

উত্তরে সকলে উল্লসিত গলায় চিৎকার করে উঠল, হো-ও-ও-ও-আ-আ-হু-হু, কী মজা!

কে যেন বলল, এবার বর্শা আর তীরগুলো খুলে ফেল মোষ দুটোর গা থেকে। বসে না থেকে হাত লাগা সবাই।

হু-হু– পলকের মধ্যে কয়েকটা জোয়ান ছেলে মোষ দুটোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

ইতিমধ্যে মোরাঙের বাইরের ঘর থেকে বুড়ো খাপেগা বেরিয়ে এসেছে। মোষ দুটোর দিকে তাকিয়ে তার লোলুপ চোখ ঝলকে উঠল, বেশ তাগড়া জানোয়ার রে। মাংসটা খেয়ে জুত হবে মনে হচ্ছে। এই ওঙলে, এই পিঙলেই, এই পিরনাঙ, যা নিমক নিয়ে আয়। হু-হু, মাংসটা তরিবত করে খাওয়া যাবে।

সকলের মাঝখানে তুলোর দড়ির লেপ জড়িয়ে জাঁকিয়ে বসল বুড়ো খাপেগা। আর ওঙলেরা ছুটল লবণের সন্ধানে।

কে যেন বলল, সেঙাইটা নেই। সে থাকলে মজা হত।

হু-হু, তা হত। বুড়ো খাপেগা কানের লতিতে পিতলের নীয়েঙ দুল দোলাল। বলল, সে নির্ঘাত মরেছে। দু’দিন ধরে এত খুঁজলাম, ছোঁড়াটার পাত্তাই নেই। এ নিশ্চয়ই হুই রেজু

আনিজার কাজ। কোথায় কোন খাদে পড়ে মরে রয়েছে যে শয়তানের বাচ্চাটা!

রেনজু আনিজা! রেজু আনিজা! জোয়ান ছেলেদের গলা এবার ফিস ফিস শোনাতে লাগল।

হু-হু, রেঙকিলানকে যে মেরেছে এ নির্ঘাত তারই কাজ। ও নাম আর করিস না। রাত্তিরবেলা বড় ভয় করে। চুপ করে গেল বুড়ো খাপেগা। খানিক পরেই আবার বলতে লাগল, সেঙাই মরেছে, নিশ্চয়ই মরেছে। নইলে এ দু’দিনে ঠিক খুঁজে পেতুম। সালুয়ালা বস্তির শত্তুররা ওকে মারলে চেঁচিয়ে পাহাড়ে ভূমিকম্প বাধিয়ে দিত না।

একটু আগে সালুয়ালাঙ বস্তির লোকেরা খুব চেঁচাচ্ছিল কিন্তু। একটি জোয়ান ছেলে বলল।

যেতে দে, যেতে দে এখন ওসব কথা। আগে তরিবত করে মাংস খাই। তাগড়া মোষের মাংস।

হু-হু। জিভে জল এসে গেল বুড়ো খাপেগার, কাল দেখা যাবে। দরকার হলে সালুয়ালাঙের সবগুলো শয়তানের মাথা ছিঁড়ে আনব না! বড় শীত আজ। অগ্নিকুণ্ডটার দিকে দুখানা শীর্ণ হাত বাড়িয়ে দিল সে। এখন তার উত্তাপ চাই। জা কুলি রাত্রির হিম থেকে বাঁচবার জন্য প্রচুর উত্তাপ।

খানিকটা পরে ওঙলেরা ফিরে এল। কিন্তু কেউ লবণ আনেনি।

বুড়ো খাপেগা বলল, কি রে, নিমক এনেছিস?

না জেঠা, নিমক নেই।

নিমক নেই তো কী দিয়ে মাংস গিলবি? গর্জে উঠল বুড়ো খাপেগা।

সেঙাইর বাপ তো বস্তি ছেড়ে ভেগেছে। তোরা ভাগিয়ে দিয়েছিস। মোককচঙ কি কোহিমা থেকে সে-ই তো নিমক এনে বস্তির সবাইকে দিত। ওঙলে বলল।

হু-হু। সিজিটোটাকে আবার ফিরিয়ে আনতে হবে দেখছি। বুড়ো খাপেগা রক্তচোখে এবার সামনের দিকে তাকাল। তারপর হুঙ্কার দিয়ে উঠল, এই সারুয়ামারু–

বুনো মোষের দেহ থেকে বর্শা আর তীরের ফলাগুলো তুলে ফেলছিল সারুয়ামারু। অন্য কোনো দিকে তার নজর কি কান ছিল না। খাপেগার কথা শুনে ফিরে তাকাল, কী বলছিস রে সদ্দার?

কী আবার বলব! খুব তো শাসিয়েছিলি সিজিটোকে। তোর বউর ইজ্জতের দামও বাগিয়েছিস সিজিটোর মায়ের কাছ থেকে। এখন নিমক দেবে কে? সারা বস্তি নিমক না খেয়ে কি মরবে? লাল লাল দাঁতের সারি বার করে খিঁচিয়ে উঠল বুড়ো খাপেগা।

তা আমি কী করব? সারুয়ামারুর চোখ দুটো যেন ঝিলিক দিয়ে উঠল, আমার বউর ইজ্জত নেবে সিজিটো, তার দাম বাগাব না?

হু-হু, তা তো বাগাবিই। কিন্তু নিমক দিতে হবে তোকে। মোককচঙ কি কোহিমা শহর থেকে সারা বস্তির জন্যে নিমক নিয়ে আসবি কাল। নইলে সিজিটোকে ফিরিয়ে আনবি। এখন আমরা মাংস খাব। তার জন্যে নিমক দিবি। যা, নিমক নিয়ে আয়। বুড়ো খাপেগা হুকুম দিল।

চকিতে উঠে দাঁড়াল সারুয়ামারু, আমার নিমক নেই।

নিমক নেই তো মাংস খাব কী দিয়ে?

কেন? আপুফু ফল দিয়ে খাবি। নিমক না থাকলে টক আপুফু ফলই তো আমরা খাই। তাই নিয়ে আসব?

বড় কষা লাগে ফলগুলো। আজুস্ত্রে (লবণ জলের প্রস্রবণ) থেকে নিমকজল নিয়ে আয় বরং সেই জল দিয়ে মাংস খাব। তবে কাল শহর থেকে নিমক নিয়ে আসতে হবে তোকে। মনে থাকে যেন। পাথরের ওপর আরো জাঁকিয়ে বসল বুড়ো খাপেগা।

সারুয়ামারু একটি জোয়ান ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে নিচের বনভূমির দিকে ছুটল।

ইতিমধ্যে বুনো মোষ দুটোর গা থেকে বর্শা আর তীরের ফলাগুলো উপড়ে নেওয়া হয়েছিল। সকলে মিলে এবার দেহ দুটো অগ্নিকুণ্ডটার মধ্যে ফেলে দিল। বিশাল কুণ্ড। গনগনে আগুন। চারপাশ থেকে মোটা জ্বলন্ত কাঠগুলোকে তুলে মোষ দুটোর ওপর চাপানো হল।

হো-ও-ও-ও-আ-আ–

জোয়ানদের গলা থেকে উল্লসিত হল্লা উঠছে আকাশের দিকে। বিশৃঙ্খল আর হিংস্র শোরগোল, হো-ও-ও-ও-আ-আ–

কে যেন বলল, শুধু শুধু ঝলসাচ্ছিস সদ্দার, কঁচাই মেরে দিলে হত। তর আর সইছে না।

বুড়ো খাপেগা তড়াক করে লাফিয়ে উঠল। তারপর খেঁকিয়ে বলল, কে, কে? শয়তানের বাচ্চা হুই কুকী আর সাঙটামদের মতো অসভ্য হয়ে রয়েছে এখনও! কাঁচাই সব গিলতে চায়।

একেবারে বর্শা দিয়ে কুঁড়ে ফেলব। একটু আগুনে ঝলসে না নিলে সোয়াদ আসে মাংসে?

হো-ও-ও-ও-আ-আ–

খাসেম কাঠের আগুনে ঝলসে যাচ্ছে মহাকায় প্রাণী দুটো। চর্বি জ্বলে, চামড়া পুড়ে, দপদপে ঝলকানি উঠছে।

হো-ও-ও-ও-আ-আ–

লোহা আর বাঁশের বড় বড় ছুরি নিয়ে এসেছে সকলে। সামনে বুনো মোষের দেহ পুড়েপুড়ে উগ্র লোভনীয় গন্ধ ছড়াচ্ছে। জা কুলি মাসের রাত্রি আমোদিত হয়ে উঠেছে। যাদের রসনা বেসামাল হয়ে উঠছে, যারা অতিমাত্রায় লোলুপ হয়েছে, তারা এর মধ্যেই অগ্নিকুণ্ডের ভেতর হাত ঢুকিয়ে দিচ্ছে। তারপর চকিতে একখণ্ড মাংস কেটে নিয়ে আসছে ছুরি দিয়ে। লবণের বদলে ঝরনার লবণ-জল নিয়ে এখনও ফিরে আসেনি সারুয়ামারু আর জোয়ান ছেলেটা। সেদিকে বিন্দুমাত্র প্রক্ষেপ নেই তাদের। পরম তৃপ্তিতে সেই আধপোড়া মাংস লাল লাল দাঁতের ফাঁকে ফেলে চিবোতে শুরু করেছে জোয়ান ছেলেগুলো। আর তারই ফাঁকে ফাঁকে হল্লা করে উঠছে, হো ও–ও–ও-আ—আ–

আচমকা পাহাড়ের ভাজ থেকে গোঙানি ভেসে এল, ও সদ্দার, সদ্দার–আমি এসেছি।

যাদের ধ্যান-জ্ঞান দু’টি পিঙ্গল চোখের মণি হয়ে ঝলসানো বুনো মোষ দুটোর দিকে আটকে ছিল তারা চমকে উঠল।

পাহাড়ের ভাজ থেকে আবারও গোঙানিটা শোনা যেতে লাগল, সদ্দার, ও সদ্দার। আমি সেঙাই। আমাকে একটু ধরে নিয়ে যা; উঠতে পারছি না। শিগগির আয়।

আনিজা! আনিজা! সেঙাই তো মরেছে। পালা, পালা সব। একটা সন্ত্রস্ত কোলাহল উঠল আগুনের কুণ্ডটার চারপাশে। জনকয়েক দৌড়ে মোরাঙের মধ্যে গিয়ে ঢুকল।

চুপ কর শয়তানের বাচ্চারা। কালো পাথরখানা থেকে লাফিয়ে উঠল বুড়ো খাপেগা, এত মানুষের সামনে আনিজারা আসে না। মশাল নিয়ে আমার সঙ্গে আয়।

একটু পরেই পাহাড়ের ভাজ থেকে সেই-এর প্রায়-অচেতন দেহটা তুলে মোরাঙে নিয়ে এল জোয়ান ছেলেরা। এতটা চড়াই উতরাই পার হয়ে আসতে আসতে হিমে সমস্ত শরীর অবশ হয়ে গিয়েছিল সেঙাই-এর। সামনের পাথরের ভাজে এসে লুটিয়ে পড়েছিল সে।

কিছু সময়ের জন্য বুনো মোষের লোভনীয় মাংসের কথা ভুলে থাকতে হল। সেঙাই-এর চারপাশে ঘিরে দাঁড়িয়েছে সকলে। তার কাছে উত্তেজক খবর নিশ্চয়ই কিছু আছে। সে লোেভও কম নয়।

বুড়ো খাপেগা বলল, কি রে, কী ব্যাপার? সারা গায়ে এত রক্ত কেন? কী হয়েছে?

থেমে থেমে দু’টি দিনের সব কাহিনি বলে গেল সেঙাই। কথার ফাঁকে ফাঁকে বার বার থামতে হল। কখনও তার গলা ফিসফিস শোনল, কখনও অত্যন্ত উত্তেজিত। খোকে, মেহেলী, লিজোমু, গভীর খাদ কিছুই বাদ দিল না সে। শেষে হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, কিছুক্ষণ আগে সেই খাসেম গাছের ঘরখানা থেকে তাল বুঝে নেমে এসেছি। বড় খিদে পেয়েছে সদ্দার।

বুড়ো খাপেগা বলল, এই ওঙলে, বুনো মোষের মাংস নিয়ে আয়। এই পিঙলেই, তুই তামুন্যুকে (চিকিৎসক) ডেকে আন। এই পিঙকুটাঙ, তুই রোহি মধু নিয়ে আয়।

মোরাঙের বাইরে ঘন অন্ধকার। ওঙলে, পিঙলেই আর পিঙকুটাঙ তিন দিকে ছুটে গেল।

সেঙাই আবারও বলল, হুই মেহেলী আমাকে বাঁচিয়েছে সদ্দার, ওকে আমি বিয়ে করবই। তুই দেখিস, ওর বাপ আমার সঙ্গে বিয়ে না দিলে লড়াই বাধিয়ে দেব।

হু-হু, বিয়ে করবি। সালুয়ালাঙ বস্তি মেহেলীকে না দিলে ছিনিয়ে নিয়ে আসব। এই তো চাই সেঙাই। তোর ঠাকুরদাকে হুই বস্তি থেকে নিতিৎসুকে এনে দিতে পারিনি। সেদিন আমরা হেরে গিয়েছিলাম, সেদিন জেভেথাঙ মরেছিল। তোর জন্যে হুই মেহেলীকে ছিনিয়ে এনে আমাদের জিততে হবে। যেমন কারেই হোক সালুয়ালাঙ বস্তিকে হারিয়ে দিতে হবে। কেলুরি গ্রামের অতীত কাল এই বুড়ো খাপেগা। তার দুচোখে এক ভয়ানক প্রতিজ্ঞা জ্বলতে লাগল।

অনেক দিন পর সেঙাই-এর মধ্যে তার যৌবনকালকে দেখতে পেয়েছে বুড়ো খাপেগা। সেই রক্তাক্ত অতীতের দিনগুলো আর নিতিৎসু-জেভেগাঙকে নিয়ে দুই গ্রামের লড়াই চেতনার মধ্যে দোল খেয়ে উঠছে। সেঙাই এবং মেহেলীকে নিয়ে একালে আর একটা সংঘাতের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। খাপেগার উল্লাসের দিন বৈকি আজ। একালের ছোকরাদের কাছে সে অতীত কালের ভেলকি দেখিয়ে ছাড়বে।

হঠাৎ কী ভেবে বুড়ো খাপেগা বলল, বুঝলি সেঙাই, তোর বাপ সিজিটো হুই সারুয়ামারুর বউর ইজ্জত নিয়েছে।

ছিলাকাটা ধনুকের মতো মাচানের ওপর উঠে বসল সেঙাই, বর্শা দিয়ে ফুঁড়ে ফেলেছিস বাপটাকে?

না।

তবে কী সদ্দার হয়েছিস! ঘন ঘন নিশ্বাস পড়ল সেঙাই-এর। বুকে বিশাল একখান থাবা চেপে দম নিল সে, পরের বিয়ে করা মাগীর দিকে নজর! আমি হলে সাবাড় করে ফেলতুম। তা সে যেই হোক না। হু-হু।

ইজ্জতের দাম আদায় করেছি তোর ঠাকুমার কাছ থেকে, আর সিজিটো শয়তানটা ভেগেছে।

বাপটা ভেগেছে? বেশ হয়েছে। ইজ্জত্রে দাম আদায় করেছিস? তা হলে তো সব কিছু চুকেই গেছে। উত্তেজনায় উঠে বসেছিল সেঙাই। এবার ক্লান্তিতে মাচানের ওপর এলিয়ে পড়ল।

একসময় সারুয়ামারু আর জোয়ান ছেলেটি লবণ জল নিয়ে মোরাঙে ফিরল। ওঙলে এল বুনো মোষের মাংস নিয়ে, পিঙলেই এল তামুন্যুকে নিয়ে, আর রোহি মধু-ভরা বাঁশের পানপাত্র নিয়ে ফিরল পিঙকুটাঙ।

.

১৯.

দুপুরের দিকে বুড়ো সর্দার লিজোমুকে খুঁজতে বেরুল। সালুয়ালা গ্রামের টিলাগুলো ডিঙিয়ে কেসুঙে কেসুঙে থামতে লাগল।

তোরা কেউ লিজোমুকে দেখেছিস?

কই, না তো। যে মেয়েটি উত্তর দিল সে আবার অখণ্ড মনোযোগে ফাফ্যা দিয়ে দড়ির লেপ বুনতে শুরু করেছে।

একটা বাঁক ঘুরল বুড়ো সর্দার। একপাশে কপিশ রঙের পাথরের ওপর কতকগুলো জোয়ান ছেলের জটলা বসেছে। পিতলের এলস্ (ক্ষুর জাতীয় অস্ত্র দিয়ে গোল করে তাদের মাথা কামিয়ে দিচ্ছে জন দুই ছোকরা। আর একদিকে বড় ভেরাপাঙ গাছের ছায়াতলে নিবিড় হয়ে বসেছে কয়েকটি যুবতী মেয়ে। তাদের সুঠাম অঙ্গশ্রীর ওপর দুপুরের রোদ নেশার মতো জড়িয়ে রয়েছে। টুগু পাতার আঠা আঙুলে মাখিয়ে বাহুসন্ধির কেশ একটি একটি করে নির্মূল করছে তারা। ঠিক তেমনি প্রক্রিয়ায় একটু দূরের কয়েকজন জোয়ান ছেলে তাদের চিকন দাড়ি গোঁফ উপড়ে ফেলছে। এ সব এই পাহাড়ী নারীপুরুষের অবশ্য করণীয় প্রথা।

বুড়ো সর্দার বিশাল ভেরাপাঙ গাছটার নিচে এসে দাঁড়াল, কি রে, তোরা লিজোমুকে দেখেছিস?

না সদ্দার। কাল দুপুরের পর থেকে তাকে আর দেখি নি।

তাই তো, গেল কোথায় শয়তানের বাচ্চাটা! এই দ্যাখ না, আজ সন্ধের সময় জুকুসিমা বস্তি থেকে জানথাঙ আসবে। কী করি বল তো? হতাশ দৃষ্টিতে চারিদিকে তাকাল বুড়ো সর্দার।

এবার সকলে রীতিমত উৎকর্ণ হয়ে বলল, জানথাঙ কে রে সদ্দার?

পিমঙের পিসি।

পিমঙ! সেই যে ছোঁড়ার সঙ্গে কাল সেঙাইকে পোড়াবার আগে লিজোমুর বিয়ে ঠিক করলি?

হু-হু, পিমঙের পিসি বউপণ নিয়ে আসবে। বিয়ের বায়না দিয়ে যাবে আজ। কিন্তু কোথায় গেল যে টেফঙের বাচ্চাটা! এতক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর দস্তুরমত ক্লান্ত হয়ে পড়েছে বুড়ো সর্দার। এবার সে যতটা বিরক্ত হল, তার চেয়ে শঙ্কিত হল অনেক বেশি।

লিজোমুর বিয়ে। ভোজ হবে, ভোজ হবে।

সাদা শুয়োর খাওয়াতে হবে কিন্তু সদ্দার। না বললে শুনব না।

জোয়ান-জোয়ানীরা সকলে মিলে শোরগোল করতে লাগল। সেই হইচই সমস্ত সালুয়ালাঙ গ্রামটাকে যেন মাতিয়ে তুলল।

চুপ কর শয়তানের বাচ্চারা। লিজোমুকে খুঁজে বার কর আগে, তবে তো বিয়ে! গর্জে উঠল বুড়ো সর্দার।

কে যেন বলল, লিজোমু তো মেহেলীর সই। তার কাছে খোঁজ নিলে নিশ্চয়ই লিজোমুকে পাওয়া যাবে।

ঠিক বলেছিস। বুড়ো সর্দার পোকরি কেসুঙের দিকে পা বাড়িয়ে দিল।

আচমকা একটি যুবতী মেয়ে বলল, খোনকের সঙ্গে না লিজোমুর বিয়ে হবার কথা ছিল, কি রে সদ্দার?

ছিল তো। খোনকেকে আনিজাতে মারল। কাল আবার পিমঙের বাপ এসেছিল, সে তার ছেলের সঙ্গে লিজোমুর বিয়ের কথাটা পাড়ল। খোনকে মরেছে, তাই আমিও রাজি হলুম। পিমঙের বাপ আমার স্যাঙাত। আমরা একসঙ্গে কেলুরি বস্তির সঙ্গে লড়াই করেছি। যাক সে কথা। জুকুসিমা বস্তির সঙ্গে আমাদের কতদিনের কুটুম্বিতে। ওরা কত খাতির করে। বলতে বলতে সামনের টিলার দিকে উঠে গেল বুড়ো সর্দার।

বুড়ো সর্দার টিলাটার ওপাশে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল।

একটি যুবতী মেয়ে ঘাড়খানা অপরূপ ভঙ্গিতে বাঁকিয়ে বলল, খোনূকেটা এই সবে মরল, সদ্দারের আর তর সয় না। এর মধ্যেই লিজোমুর বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে!

মেয়ে বেচে কত পণ পাবে বল দিকি! সে খেয়ালটা আছে তোর? খাসেম গাছের ছায়াতলে আর একটি গলা শোনা গেল।

সাসুমেচু! আমাদের সদ্দার একটা আস্ত সাসুমেচু (ভয়ানক লোভী মানুষ)।

পাহাড়ী জোয়ান আর জোয়ানীদের মধ্যে মৃদু একটা গুঞ্জন উঠল।

সবাই চুপ, একেবারে চুপ। সদ্দার শুনতে পেলে সক্কলকে সাবাড় করবে। যুবতী মেয়েটি সতর্ক করে দিল। এরপর কেউ আর একটি কথাও বলল না।

.

খোখিকেসারি কেসুঙ থেকে পোকরি কেসুঙের দিকে আসছিল পলিঙা আর মেহেলী। একখণ্ড বিশাল পাথরের পাশে সর্দারের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল তাদের।

বুড়ো সর্দার বলল, লিজোমুকে দেখেছিস মেহেলী? কি রে বলিঙা, তুই দেখেছিস?

বুকের মধ্যে হৃৎপিণ্ড থমকে গেল মেহেলী আর পলিঙার। চট করে একবার পলিঙা তাকাল মেহেলীর দিকে। মেহেলীও তার দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে রয়েছে। চোখের পলক পড়ছে না। দুজন অনেকক্ষণ তাকিয়েই রইল।

বুড়ো সর্দার আবারও বলল, কি রে, দেখেছিস তোরা? লিজোমু তো তোদের সই। কাল দুপুরের পর থেকে তাকে পাচ্ছি না।

কাঁপা গলায় মেহেলী বলল, কই, আমরা দেখিনি তো।

বড় অসহায় দেখাল বুড়ো সর্দারকে। ঘোলাটে চোখের ঠিক নিচেই বর্শার ফলার মতো ফুঁড়ে বেরিয়েছে হনুদুটো। সারা মুখের রাশি রাশি কুঞ্চনে জরা স্থায়ী ছাপ ফেলেছে। ভাঙা গলায় বুড়ো সর্দার বলল, কী করি বল তো মেহেলী? খুঁজেই পাচ্ছি না। এদিকে ওর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। বাপণ এসে যাবে দু-একদিনের মধ্যে।

বউপণ! প্রায় চেঁচিয়ে উঠল মেহেলী।

হু-হু, কাল সন্ধের সময় এসেছিল পিমঙের বাপ, হুই জুকুসিমা বস্তি থেকে। আমাদের সঙ্গে ওদের খুব খাতির। তোর দাদা খোনকেটা তো মরল। তাই ওদের ছেলে পিমঙের সঙ্গে লিজোমুর বিয়ে ঠিক করলাম। বংশটাও ভালো। লোখেরি বংশ। ফিসফিস গলায় বলতে বলতে একসময় একেবারে থেমে গেল বুড়ো সর্দার।

মেহেলী ভাবছে অন্য কথা। লিজোমুর ঝলসানো বীভৎস দেহটা এখনও যেন পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে সে। না না, সর্দারকে সে কিছুতেই বলতে পারবে না, কেমন করে খাসেম গাছের মগডালে লিজোম একটু একটু করে পুড়ে মরেছে। বুকের মধ্যে ধমনীটা ছিঁড়ে রক্ত উছলে। উছলে পড়ছে, তারপর ফেনিয়ে ফেনিয়ে শিরা-উপশিরার ধারাপথে ছড়িয়ে যাচ্ছে। অসহ্য এক যন্ত্রণায় শরীরের পেশীগুলো যেন অসাড় হয়ে আসতে শুরু করেছে মেহেলীর। টেনেন্য মিঙ্গে লু! বউপণ! না হোক তার দাদা খোনকের সঙ্গে লিজোমুর বিয়ে, তবু তার বিয়ে হত সুদূর পাহাড়ী গ্রাম জুকুসিমায়। সোয়ামীর সোহাগে সোহাগে, পাহাড়ী গ্রামের কোনো বনস্পতির ছায়াতলে একটি সুন্দর গৃহস্থালিতে সার্থক হত লিজোমু। চরিতার্থ হত তার যৌবনের কামনা। কিন্তু সে আজ নেই, ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গিয়েছে। লিজোমু পুড়ে পুড়ে মরেছে। নিজের কামনা আর বন্য বাসনার মধ্যে মেহেলী লিজোমুর মনের ছায়াই তো দেখতে পায়। পাহাড়ী গ্রামে এক সুন্দর গৃহকোণ, এক আদিম আর বলিষ্ঠ পুরুষ। কিছুই পেল না সে। শত হলেও লিজোমু তার সই। তার জন্য প্রাণটা পোড়ে বৈকি মেহেলীর।

বুড়ো সর্দার বলল, কাল সেঙাইকে পোড়ালুম, তারপর সারা রাত মোরাঙে হল্লা হল, মাংস, খাওয়া হল। কেসুঙে আজ ফিরে দেখি, লিজো নেই। তোরা তবে তাকে দেখিসনি?

না। অস্ফুট গলায় বলল মেহেলী। তারপর ছুটে গেল পোকরি কেসুঙের দিকে। সর্দারের মুখোমুখি আর দাঁড়াতে পারছে না সে।

মেহেলীর পিছন পিছন পলিঙাও ছুটতে লাগল।

২০. নাগা পাহাড় থেকে

২০.

নাগা পাহাড় থেকে জা কুলি মাস বিদায় নিল। পেঁজা তুলোর মতো গুড়ো গুড়ো যে তুষার। ঝরত আকাশ থেকে তা একদিন বন্ধ হল। শীত ঋতুর আয়ু প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। এবার কমলা রং রোদের সওয়ার হয়ে আসবে গরমের সকাল, ঝকঝকে রোদের পাখনা মেলে উড়ে যাবে দুপুর, তারপর অপরূপ সোনালি বিকেল পশ্চিমের পাহাড়-চূড়া রাঙিয়ে দেবে।

জা কুলি মাসের পর এখন নসু কেহেঙ মাসের শুরু। দিগন্তে কুয়াশার রেখা ঘন হয়ে জমে না আজকাল। সূক্ষ্ম নীলাভ একটি কুয়াশার স্তর সুখ-সুখ শিহরনের মতো পাহাড়ের চক্ররেখাঁটিকে জড়িয়ে থাকে। কপিশ রঙের পাহাড়ী ঘাসের ফলক থেকে শিশিরের নিটোল কণাগুলি যখন বাষ্প হয়ে উড়ে যায়, ঠিক তখনই আকাশ থেকে কুয়াশার স্তরটা একেবারে অদৃশ্য হয়। ঘন সবুজ বন এই নসু কেহেঙ মাসে ঝলমল করতে থাকে।

জা কুলি মাসের শেষ দিকে সিঁড়িখেতে জোয়ার বোনা হয়েছিল। টিজু নদীর বরফ-গলা জল এনে ছিটিয়ে ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছিল বীজ ফসলের শিকড়ে শিকড়ে। এখন, এই নসু কেহেঙ মাসের সকালে সারা মাঠ ভরে শ্যামল অঙ্কুর মাথা তুলেছে। আগামী ফসলের মাসগুলিতে পাহাড়ী খেতের ঝাপি সোনালি লাবণ্যে ভরে যাবে। শ্যামাভ শস্যের অঙ্কুরে তার গর্ভধারণের ইঙ্গিত।

পুরোপুরি জা কুলি মাসটা, তারপর নসু কেহেঙ মাসের অনেকগুলো দিন, মোরাঙের মাচানে শুয়ে শুয়ে কাটিয়ে দিতে হয়েছে সেঙাইকে। সালুয়ালা গ্রামের অতল খাদে সেদিন অচেতন হয়ে পড়ে যাওয়ার পর সারা দেহ ফালা ফালা হয়ে ছিঁড়ে গিয়েছিল। সেই রক্তাক্ত ক্ষতগুলি টুগু আর আরেলা পাতার প্রলেপে শুকিয়ে গিয়েছে এতকাল পর।

.

আজ প্রথম মোরাঙ ছেড়ে বাইরে এল সেঙাই। সারা দেহ এতদিনের বিশ্রামে সতেজ হয়েছে, সবল হয়েছে। চামড়া টান টান হয়ে নির্ভাজ হয়েছে। আর সেই নির্ভজ চামড়ার ওপর বেশ চেকনাই ফুটে বেরিয়েছে।

মোরাঙের সামনে এই উঁচু পাথরের টিলা থেকে ফসলের সিঁড়িখেত নজরে আসে। ফসল পাহারা দেবার জন্য জমির চারিদিকে অজস্র ঘর তোলা হয়েছে। অনেক উঁচু থেকে সেগুলিকে ছোট ঘোট বিন্দুর মতো মনে হয়।

অনেক আগেই সকাল পেরিয়ে গিয়েছে। দিকে দিকে দুপুরের আভাস ফুটে বেরিয়েছে। শক্ত করে কোমরের কাপড়ে একটা গিঁট দিয়ে নিল সেঙাই।

একপাশে বসে বসে বর্শায় শান দিচ্ছে জোয়ান ছেলেরা। তাদের ভেতর থেকে ওঙলে বলল, কি রে সেঙাই, বেরিয়েছিস মোরাঙ থেকে?

হু-হু, ভালো হয়ে গেছি তত বেরুব না? কদ্দিন আর মোরাঙে শুয়ে থাকব?

আজ সিঁড়িখেতে যাবি নাকি?

যাব। বিষণ্ণ গলায় সেঙাই বলল, এবার বীজ বুনতে পারলাম না। জোয়ার না হলে গরমের দিনগুলো খাব কী, ভাবতে পারছি না।

হু-হু। সকলে মাথা নেড়ে সায় দিল।

কী যে করি! সেঙাইকে বড় অসহায় দেখাল।

তুই পাহাড়ী মরদের নাম ডুবিয়ে দিবি। প্রখর গলায় দক্ষিণ পাহাড়কে কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে এবার হেসে উঠল ওঙলে, বনে মোষ নেই? হরিণ নেই? শুয়োর নেই? সম্বর নেই? বর্শা দিয়ে ফুঁড়ে এনে পুড়িয়ে খাবি।

ঠিক বলেছিস। আরো খানিকটা এগিয়ে ওঙলের পাশে এসে দাঁড়াল সেঙাই। বলল, তবে ফসল না বুনলে কী চলে? ফসলের আনিজার যে তাতে গোসা হয়।

হু-হু।

তোরা কখন সিঁড়িখেতে যাবি?

দুপুর পেরিয়ে গেলে। ওঙলে বলল।

আমাকে ডেকে নিস। আমি এখন একবার কেসুঙে যাব। ঠাকুমার সঙ্গে দেখা করে আসি। হন হন করে জোহেরি কেসুঙের দিকে চলে গেল সেঙাই।

পূর্ববর্তী জোহেরি কেসুঙের পেছন দিকে অর্ধগোলাকার পাথরখানার ওপর বসে ছিল বুড়ি বেঙসানু। তার চোখ দু’টি আকাশের দিকে স্থির হয়ে রয়েছে। আকাশটা আশ্চর্য নীল, আশ্চর্য নির্মল। মহাশূন্যে গুটসুঙ পাখির ঝাঁক সাঁতার কেটে চলেছে।

এমন সময় সেঙাই এল।

ঠাকুমা, এই ঠাকুমা–

কে? সেঙাই এসেছিস–আয়। মোরাঙে মেয়েদের ঢুকতে দেয় না, তাই তোকে দেখতে যাই না। কেমন আছিস? ভালো তো? ঘুরে বসল বুড়ি বেঙসানু।

সেঙাই-এর সাড়া পেয়ে ফাসাও আর নজলি বাইরের ঘর থেকে ছুটে এসেছে। ঝাঁপিয়ে পড়েছে বড় ভাইয়ের ঘাড়ে।

সেঙাই বলল, মা কোথায়?

সে মাগী কি আর এখানে আছে? সে গেছে কোহিমা। তোর বাপের কাছে।

বাপ বস্তিতে আসে নি আর?

আর এল কোথায় শয়তানের বাচ্চাটা! হুই সারুয়ামারুর বউ জামাতসুর ইজ্জত নিলে। তারপর সেই রাতেই তো কোহিমা পালাল। আমি বুড়ি শেষকালে জামাতসুর ইজ্জতের দাম দিলাম শুয়োর আর বর্শা দিয়ে। দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বলে উঠল বেঙসানু, সেই সায়েব না কী, তাদের সঙ্গেই রয়েছে টেফঙের বাচ্চাটা। টেনে নটুঙ!

মা কার সঙ্গে কোহিমা গেল?

সারুয়ামারু কোহিমা গেল দিন সাতেক আগে, তার সঙ্গে রাতের অন্ধকারে ভেগে গিয়েছে শয়তানী। মাগীর তো আবার পুরুষের গায়ের গন্ধ না পেলে মেজাজ বিগড়ে যায়। বেঙসানু নির্বিকার ভঙ্গিতে খেউড় গাইতে শুরু করল, আহে ভু টেলো।

সেঙাইর সতেজ দেহটা অদ্ভুত উত্তেজনায় ফুলে ফুলে উঠতে লাগল। থরে থরে সাজানো পেশীগুলিতে দোলানি শুরু হল, সারুয়ামারু কোথায়? কোহিমা থেকে ফিরেছে?

হু-হু, কাল সন্ধের সময় ফিরেছে বস্তিতে। এবার বিস্বাদ গলায় বেঙসানু বলল, কী খাবি সেঙাই? এবছর তো সিঁড়িখেতে জোয়ারের বীজ বোনা হল না। তুইও মোরাঙের মাচানে শুয়ে শুয়ে ভুগলি, আর হুই টেফঙের বাচ্চা সিজিটোটা কোহিমায় পালিয়ে গেল। সায়েবদের গায়ে যে কী সোয়াদ মাখা আছে, সে-ই জানে। চিন্তিত মুখে বেঙসানু বলতে লাগল, ফসল হল না এবার, খাবি কী সেঙাই?

কী আবার খাব? ললাটে পাখি মারব, হুন্টসিঙ পাখি মারব, মোষ আর হরিণ শিকার করব। শুয়োর গেঁথে আনব। শুধু মাংস খেয়ে কটা মাস কাটিয়ে দেব। যদ্দিন এই বন আর পাহাড় রয়েছে, জানোয়ার আর পাখি রয়েছে, এই দুখানা হাত রয়েছে, বর্শা আর সুচেন্যু রয়েছে, তদ্দিন না খেয়ে মারব নাকি? কী রে ঠাকুমা? সোজাসুজি বেঙসানুর দিকে তাকাল সেঙাই।

সে কথা ঠিক সেঙাই। আমরা পাহাড়ী মানুষ, জন্তু জানোয়ার পেলেই আমাদের পেট চলে যাবে। কিন্তু আমি ভাবছি অন্য কথা।

কী কথা আবার ভাবছিস? সেঙাই-এর কপালের টান টান চামড়ায় কয়েকটা রেখা ফুটে বেরুল। আড়াআড়ি রেখা। রেখার আঁকিবুকি।

বলছিলাম, এক বছর সিঁড়িখেতে বীজফসল পড়ল না। যদি ফসলের আনিজার রাগ এসে পড়ে, তবে তো আমাদের জমিতে আর ফসলই হবে না কোনোদিন। কত কাল আর মাংস খেয়ে কাটাবি?

আরে হবে, হবে। ফসলের আনিজার নামে একটা সম্বর বলি দিলেই হবে। তুই বোস্ ঠাকুমা, আমি একটু সারুয়ামারুকে ডাকি। অর্ধ-গোলাকার পাথরখানার ওপর উঠে দাঁড়াল সেঙাই।

ফাসাও আর নজলিও লাফিয়ে উঠে পড়েছে, এখন কোথাও যেতে হবে না। আমাদের মায়ের কাছে দিয়ে আয়।

মায়ের কাছে যাবে! দেখলি না তোদের ফেলে কোহিমা ভাগল মা আর বাপ। থাম সব। রক্তচোখে তাকাল সেঙাই। তারপর পাথরখানার থেকে নিচে নেমে চিৎকার করে উঠল, এই সারুয়ামারু, সারুয়ামারু–

মাথার ঠিক ওপরেই অতিকায় একটা মস্ত পাথরের চাই। সেটার পাশেই জোরি কেসুঙ। সেখান থেকে একটা বিরক্ত কণ্ঠস্বর তাড়া করে এল, কে? কে ডাকে? কে রে শয়তানের বাচ্চা?

আমি সেঙাই, নিচে আয় সারুয়ামারু।

যাই।

খানিক পরে জোহেরি কেসুঙে চলে এল সারুয়ামারু। তারপর অর্ধ-গোলাকার পাথরখানার ওপর জাঁকিয়ে বসল, কি রে সেঙাই, ভালো হয়ে গেছিস দেখছি।

হু-হু।

এই যে তোর বাপ টাকা পাঠিয়ে দিয়েছে। দক্ষিণের পনেরোটা পাহাড় ডিঙিয়ে মাও-এর রাস্তা। সেখানে পক পক গাড়ি পাবি। তাই চড়ে কোহিমা যাবি। তোর বাপ যেতে বলেছে তোকে। বলতে বলতে হাতের মুঠি থেকে একটি রুপোর মুদ্রা বার করে সেঙাইর দিকে বাড়িয়ে দিল সারুয়ামারু, এই নে।

ঝকঝকে রুপোলি মুদ্রা। রোদ লেগে শুভ্র দ্যুতি ঠিকরে বেরুচ্ছে। অবাক বিস্ময়ে ধাতব বস্তুটির দিকে তাকিয়ে রইল সেঙাই। এ তার অচেনা। এর আগে কোনোদিনই এই গোলাকার মুদ্রাটির সঙ্গে তার পরিচয় হয়নি। বুড়ি বেঙসানুও সেটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে অবাক হয়ে। তার হিসাবহীন বয়সের অভিজ্ঞতায় এমন একটি পদার্থ অজানাই রয়েছে।

সেঙাই তাকাল বেঙসানুর দিকে। এখনও সে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে পারেনি, বস্তুটি স্পর্শ করবে কি, করবে না।

বেঙসানু ভীরু গলায় বলল, এই সারুয়ামারু, এটা ধরলে আনিজার রাগ এসে পড়বে না তো? এটার নাম কী?

এই ছোট্ট পাহাড়ী জনপদ। চারপাশে গহন বন। সেই বনে হিংস্র শ্বাপদের অবাধ সংসার। সেই অরণ্যে নিয়তবাহী প্রস্রবণ, কল্লোলিত জলপ্রপাত তাদের অভিজ্ঞতার সীমানায় এগুলিই সত্যি, এগুলিই গ্রাহ্য। এই পাহাড়ী পৃথিবীর বাইরে তাদের কাছে সমস্ত কিছুই সংশয়ের সীমা দিয়ে ঘেরা, অবিশ্বাস আর সন্দেহে আকীর্ণ। অস্ফুট বোধবুদ্ধি দিয়ে এই পাহাড়ী মানুষগুলি সব কিছু যাচাই করে তবেই গ্রহণ করে। নইলে অপরিচিত কোনো কিছুর মুখোমুখি হতে তারা কুণ্ঠিত হয়, বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।

সমস্ত কেলুরি গ্রামখানাকে চমকে দিয়ে হেসে উঠল সারুয়ামারু, কি বোকা তোরা! এর নাম হল টাকা। এটা ধরলে কিছুতেই আনিজার রাগ হবে না।

আশ্চর্য আকর্ষণ। হাতখানা বাড়িয়ে টাকাটা নিয়ে নিল সেঙাই। ফিসফিস গলায় বলে উঠল, এটা দিয়ে কী হয়?

কী না হয় বল? এটা দিলে সব কিছু পাওয়া যায়। অত্যন্ত বিজ্ঞ বিজ্ঞ দেখাচ্ছে এবার সারুয়ামারুকে, কোহিমা শহরে যখন যাবি তখন দেখবি কী হয় এটা দিয়ে। কালই তুই চলে যা কোহিমা। তোর বাপ তোর জন্যে কাজ ঠিক করে রেখেছে।

কাজ! কিসের কাজ?

বেত কাটার কাজ। নাগিনীমারা যেতে হবে। এবার তো আর সিঁড়িখেতে জোয়ারের বীজ বুনিসনি। ডিমাপুর হয়ে নাগিনীমারা যাবি। আমিও যাব। দোইয়াঙ আর রেঙমাপানির ওধারের বস্তিগুলো থেকেও অনেক পাহাড়ী যাবে।

নাগিনীমারা! ডিমাপুর! বিচিত্র সব নাম, বিচিত্র সব দেশ। এই রুপোলি মুদ্রার মতোই ওই নামগুলো সেঙাই কি বুড়ি বেঙসানুর অজানা। ছয় আকাশ, ছয় পাহাড় ডিঙিয়ে কোথায় কোন সুদূর দিগন্তে ওই নামের দেশগুলো পড়ে রয়েছে সে খবরও তাদের জানা নেই। শুধু এক দুর্নিবার কৌতূহল, এক দুর্বোধ্য আকর্ষণ সেঙাই-এর সমস্ত চেতনাকে আচ্ছন্ন করে তুলল। ডিমাপুর! নাগিনীমারা! কতদূর! কোথায় সেই সব দেশ?

হতবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল সেঙাই। শুধু হাতের পাতায় রুপোলি মুদ্রাটা ঝকঝকে রোদে ঝিকমিক করছে।

সেঙাই আবিষ্ট গলায় বলল, কাজ করে এই টাকা পাওয়া যাবে?

হু-হু, অনেক পাওয়া যাবে। তোর বাপ ফাদারের কাজ করে অনেক টাকা পায়। তুইও পাবি। সারুয়ামারু আলোক দান করে চলল।

ইতিমধ্যে সমস্ত কেলুরি গ্রামখানা জমায়েত হয়েছে জোহেরি কেমুঙে। সারুয়ামারু, বুড়ি বেঙসানু আর সেঙাইর চারপাশে নিবিড় হয়ে দাঁড়িয়েছে সকলে।

ছোট্ট পাহাড়ী জনপদ কেলুরিতে এই প্রথম রুপোর টাকার আর্বিভাব। বিস্ময়ে ভয়ে সব মেয়েপুরুষ সেঙাই-এর মুঠির দিকে তাকিয়ে রয়েছে। একসময় সেঙাইর থাবা থেকে ছোঁ মেরে টাকাটা তুলে নিল একজন। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সন্ধানী দৃষ্টিতে দেখতে লাগল। তার মুঠি থেকে আর একজন ছিনিয়ে নিল। তার মুঠি থেকে অন্য একজন নিল। এই প্রক্রিয়ায় টাকাটা মেয়েপুরুষের জটলায় হাতে হাতে ঘুরতে লাগল। টাকার এই প্রথম আগমনকে বিস্ময় আর কৌতূহল দিয়ে অভ্যর্থনা জানালো কেলুরি গ্রামের মানুষেরা।

একসঙ্গে সকলে বলে উঠল, আমরা টাকা পাব?

হু-হু, পাবি। ফাদারকে নিয়ে আসব বস্তিতে। ফাদার এখানে আসতে চেয়েছে। সে এলে তোরা তাকে টাকার কথা বলবি। সকলের মুখের ওপর দিয়ে দৃষ্টিটাকে পাক খাইয়ে নিয়ে গেল সারুয়ামারু। ফিসফিস গলায় বলল, ফাদার এলে তোরা খুশি হবি তো? কেউ বর্শা দিয়ে খুঁড়বি না?

সকলে মুখ চাওয়াচাওয়ি শুরু করল। একটু ভেবে দ্বিধাভরা গলায় বলল, আমরা কি জানি, সদ্দারকে জিজ্ঞেস কর তুই।

সদ্দার আর সদ্দার! সারুয়ামারুর লাল লাল দাঁতগুলো কড়মড় করে উঠল, সদ্দার তোদের টাকা দেবে? জানিস, টাকা দিলে সব মেলে। দুনিয়ার সব কিছু পাওয়া যায়। নিমক পাওয়া যায়, ধান পাওয়া যায়, গাড়ি চড়া যায়। যা চাস তাই পাবি।

সব পাওয়া যায়! কে যেন বলে উঠল।

মানুষগুলো হতবাক হয়ে গিয়েছে। বলে কী সারুয়ামারু! ওই সাদা সাদা গোলাকার বস্তুগুলির এত মহিমা তা কি তারা জানত!

আচমকা মানুষগুলো হল্লা শুরু করে দিল, হুই তো সদ্দার, হুই তো সদ্দার এসেছে।

জোরি কেসুঙের সামনে কালো একখানা পাথর খাড়া হয়ে উঠে গিয়েছে। সেটা ডিঙিয়ে জোহেরি কেসুঙে চলে এল বুড়ো খাপেগা।

কি রে, কী ব্যাপার? হুল্লা করছিস কেন? আরে সারুয়ামারু যে! এসেছিস কখন? কোহিমার গল্প বল শুনি। এদিক সেদিক তাকাতে লাগল বুড়ো খাপেগা।

চারপাশের মানুষগুলো সমানে চিৎকার করতে লাগল, সদ্দার, টাকা টাকা

টাকা এনেছে সারুয়ামারু। টাকা এনেছে।

কই দেখি–সেঙাই-এর হাত থেকে টাকাটা তুলে বিস্মিত দৃষ্টিতে দেখতে লাগল বুড়ো খাপেগা। বলল, এ দিয়ে কী হয়?

টাকার মহিমা সম্বন্ধে সারুয়ামারু আর-একবার আলোক দান করল। বলল, জানিস সদ্দার, ফাদার আমাদের বস্তিতে আসবে বলেছে। অনেক টাকা দেবে। তুই বললে তাকে নিয়ে আসব।

সন্দিগ্ধ চোখে তাকাল বুড়ো খাপেগা, টাকার বদলা কী দিতে হবে?

কিছুই না। খালি যীশু যীশু বলতে হবে। দুকাঁধে, কপালে আর বুকে আঙুল ঠেকাতে হবে। আনিজার নামে শুয়োর বলি দিতে পারবি না ।

সারুয়ামারুর গলা মাঝপথে থেমে গেল। কেলুরি গ্রামের খাপেগা সর্দার হঠাৎ গর্জন করে উঠল। ঘোলাটে চোখদুটো আগ্নেয় হয়ে উঠেছে, কী বললি শয়তানের বাচ্চা! শুয়োর বলি বন্ধ করতে হবে? একেবারে বর্শা দিয়ে ফুঁড়ে ফেলব না! তোর ফাদার বস্তিতে এলে আর জান নিয়ে ফিরতে হবে না। হুই সব বুকে কপালে কাঁধে আমরা হাত ঠেকাতে পারব না।

সারুয়ামারু চমকে উঠেছে। অপরিসীম ভয়ে মনটা কুঁকড়ে গিয়েছে তার, আচ্ছা, ফাদারকে আসতে বলব না। তুই যখন চাস না তখন কী আর করা।

খবদ্দার, তোর ফাদার যেন এ বস্তিতে না আসে। আমাদের টাকা চাই না।

আচ্ছা।কাঁপা গলায় বলল সারুয়ামারু। কিন্তু তার চোখ দুটো ভয়ানক ক্রুর হয়ে উঠেছে।

টাকা চাই না, টাকা চাই না। পাহাড়ী মানুষগুলো একটানা শোরগোল করতে লাগল, হো-ও-ও-ও-য়া-য়া–

একসময় বুড়ো খাপেগা বলল, নিমক এনেছিস কোহিমা থেকে?

সারুয়ামারু গোলাকার কামানো মাথা ঝাঁকাল, হু, আমার ঘরে আছে। সবাই নিয়ে যাস। এবার নিমকের দর খুব চড়া। মাধোলাল এক খুদি নিমকের বদলা এক খুদি কস্তুরী নিয়েছে কিন্তু।

আচ্ছা, আচ্ছা। এবার কোহিমার গল্প বল সারুয়ামারু। একখানা বাদামি রঙের পাথরের ওপর জাঁকিয়ে বসল বুড়ো খাপেগা। আর জোহেরি কেসুঙের চত্বরে হুটোপাটি করতে করতে বসে পড়ল কেলুরি গ্রামের বাকি মানুষগুলো।

সারুয়ামারু বলল, জানিস সদ্দার, একটা ভারি ভালো মেয়ে বেরিয়েছে কোহিমাতে। আমি তাকে দেখেছি। সে আমাদের পাহাড়েরই মেয়ে।

কী নাম তার?

গাইডিলিও। সুন্দর দেখতে, বড় বড় চোখ। রূপময়ী এক পাহাড়ী নারীর বর্ণনা দিল সারুয়ামারু।

ভালো যে, বুঝলি কী করে?

তার চারপাশে সারা নাগা পাহাড়টা ভিড় জমিয়েছে। সে যাকে ছোঁয় তার রোগ ভালো হয়ে যায়। লোটা নাগারা, সাঙটামরা, সেমারা, কোনিয়াকরা–সব জাতের মানুষই তার ভক্ত হয়েছে।

বলিস কী! সবিস্ময়ে বলল বুড়ো খাপেগা।

সত্যি কথা। একটুও মিথ্যে নয়। সেঙাই-এর বাপ সিজিটোও গাইডিলিওকে দেখেছে। তাকে জিগ্যেস করে দেখিস।

সে ছুঁয়ে দিলে রোগ সেরে যায়! বলিস কী!

হু-হু। সবাই তাকে রানী বলে। জোয়ান মেয়ে, ষোল বছর বয়েস হবে।

আচমকা সেঙাই উঠে দাঁড়াল। বলল, আমি কোহিমা যাব সারুয়ামারু। তুই আমাকে নিয়ে যাবি? রানী গাইডিলিওকে দেখব।

হু-হু, যাবি। তোর বাসভাড়ার টাকা তো দিয়েই দিয়েছে সিজিটো। সারুয়ামারু বলে চলল, কোহিমা কী সুন্দর শহর। এই বস্তি ছেড়ে তোরা তো কোথাও যাবি না। গাড়ি দেখবি–

গাড়ি? সে আবার কী?

রহস্যময় গলায় সারুয়ামারু বলল, আমার সঙ্গে কোহিমা চল আগে। তোকে সব দেখাব। গাড়ি দেখবি, পাকা বাড়ি দেখবি। আরো কত কী দেখবি।

দুপুরের রোদ তীব্র হচ্ছে, তীক্ষ্ণ হচ্ছে। নসু কেহেঙ মাসের এই দুপুরে সিঁড়িখেতে ছোট ছোট বাঁশের ঘর থেকে ফসলের তামাটে অঙ্কুর পাহারা দেয় পাহাড়ী মানুষগুলো। দুষ্ট আনিজার দৃষ্টি থেকে, বুনো মোষের দাপাদাপি থেকে সিঁড়িখেত রক্ষা করতে হয়। সকলে এক এক করে উঠে পড়ল। যাবার আগে সারুয়ামারুর কাছে তারা রানী গাইডিলিওর গল্প শুনল। শুনতে শুনতে বিস্মিত হল। কখনও বা মুগ্ধ। অপরূপ রূপকথার মতো এক কাহিনি, যার নায়িকা গাইডিলিও স্বয়ং। তার ছোঁয়ায় পুনর্জন্ম হয়। তার নির্দেশে জরামৃত্যু ফেরারি হয়। গাইডিলিওর কাহিনি বাদ দিয়েও আর একটা অপূর্ব বস্তু তাদের চেতনাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। সেটা একটা রুপোর মুদ্রা। বুড়ো খাপেগার সঙ্গে সায় দিয়ে তারা যতই সারুয়ামারুর বিপক্ষে চেঁচাক, যতই হল্লা করুক, তবু টাকার কথা ভুলতে পারছে না। রানী গাইডিলিও আর টাকাটা অনেকদিন তাদের বিস্ময় আর আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।

খানিক পরে সকলে জোহেরি কেসুঙ থেকে চলে গেল।

সামনের কালো পাথরখানায় উঠে এল সেঙাই আর সারুয়ামারু। সেঙাই বলল, কোহিমা গেলে টাকা পাব তো? ঠিক বলছিস?

হু-হু, নিশ্চয়ই পাবি। তোকে তো আগেই বলেছি। ঘন ঘন মাথা ঝাঁকাতে লাগল সারুয়ামারু। ফিসফিস করে বলল, দেখলি সদ্দারটা কেমন শয়তান! ফাদারকে কিছুতেই আসতে দেবে না। আচ্ছা, আমিও দেখে নেব। যখন বন্দুক নিয়ে ফাদাররা আসবে তখন কী করে সদ্দার শয়তানটা তাদের ঠেকায়, আমিও দেখব। শেষ কথাগুলো এত আস্তে বলল যে সেঙাই শুনতে পেল না।

সারুয়ামারুর কথাগুলোর দিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই সেঙাই-এর। তার সমস্ত ভাবনাকে ভরে রেখেছে দুটো অভিনব বস্তু। একটি রুপোর টাকা, অপরটি রানী গাইডিলিওর গল্প। অন্যমনস্কের মতো সেঙাই বলল, রানী গাইডিলিওকে দেখাবি তো?

দেখাব। এতক্ষণ বিড় বিড় করছিল সারুয়ামারু, এবার সোজাসুজি তাকাল, তুই কোথায় যাবি সেঙাই? আমি কিন্তু এবার আমাদের কেসুঙে ফিরব। শরীরটা বড় খারাপ লাগছে।

দাঁতমুখ খিঁচিয়ে উঠল সেঙাই, যা যা। আমি সব বুঝি। বউয়ের কাছে না গেলে আরাম হচ্ছে না। শরীর খারাপ, অথচ বউয়ের সঙ্গে ফুর্তি তো থামাচ্ছিস না। কোহিমা থেকে ফিরেই ঘরে ঢুকেছিস। অন্য দিকে তোর মন আছে? তুই একটা আস্ত শয়তান। ভাবলাম, গাইডিলিওর কথা ভালো করে শুনব। তা না

রাত্তিরে মোরাঙে বসে গল্প বলব। তখন শুনিস। আর দাঁড়াল না সারুয়ামারু। লম্বা লম্বা পা ফেলে জোরি কেসুঙের দিকে চলে গেল।

আর কালো পাথরখানার ওপর দাঁড়িয়ে এক নজরে সারুয়ামারুর গমনপথের দিকে তাকিয়ে রইল সেঙাই। গাইডিলিও সম্বন্ধে তার কৌতূহল মেটেনি। তার আগ্রহটা উদগ্র হয়ে রইল।

.

২১.

টেনেন্যু মিঙ্গেলু। বউপণ। সেই বউপণ এসেছে নানকোয়া গ্রাম থেকে। পাঠিয়েছে মেজিচিজুঙের বাপ রাঙসুঙ। দুটো জোয়ান ছেলে এসেছিল রেঙমাপানি নদীর ওপারে মাঝারি আকারের গ্রাম নানকোয়া থেকে। সঙ্গে চারখানা খারে বর্শা। অতিকায়। সেগুলোর গড়নের মধ্যে অতীতের ছাপ রয়েছে, প্রাচীনত্বের সুস্পষ্ট চিহ্ন ফুটে আছে। আর যৌতুক হিসেবে এসেছে কড়ির গয়না, কানের নীয়েঙ দুল, হাতির দাঁতের হার। মোষের শিঙের মুকুট, যার দু’পাশে হরিণের শিঙের বাহার। পেতলের গলাবন্ধ। আটর ফুলের সাজসজ্জা আর সাধারণ গড়নের পঞ্চাশখানা বর্শা।

সকালবেলা জোয়ান ছেলে দুটো এসে পৌঁছেছিল। মেহেলীর বাপ সাঞ্চামখাবা আদর করে, তোয়াজ করে, তাদের নিয়ে বসিয়েছে বাইরের ঘরে। টাটকা চোলাই পীতা মধু দিয়েছে বাঁশের পানপাত্র ভরে, চাকভাঙা সোনালি মধু দিয়েছে। হুন্টসিঙ পাখির মাংস দিয়ে কাবাব বানিয়ে সাজিয়ে দিয়েছে কাঠের বাসনে। জোয়ান ছেলে দুটো বেশ তরিবত করে কাবাব চিবুচ্ছে। তারিয়ে তারিয়ে পীতা মধুর পাত্রে চুমুক দিচ্ছে একজন। আর একজন সোনালি মধু চুক চুক করে জিভ দিয়ে টেনে নিচ্ছে।

সমস্ত সালুয়ালাঙ গ্রামখানা পোকরি কেসূঙটার চারপাশে ভেঙে পড়েছে। সাঞ্চামখাবার বাইরের ঘরে একখানা তিনকোনা পাথরে থেবড়ে বসেছে গ্রামের বুড়ো সর্দার। সালুয়ালাঙ গ্রামের সমস্ত বংশের প্রাচীন মানুষগুলো পাশাপাশি ঘন হয়ে বসেছে। তাদের সামনেও পীতা মধুর ভরা পাত্র, পাখির মাংসের কাবাব।

এখন নসু কেহেঙ মাসের দুপুর। নিঃসীম আকাশটা পুড়ে পুড়ে যাচ্ছে যেন। দুপুর জ্বলছে, কিন্তু এই পাহাড়ী পৃথিবীর রোদে জ্বালা নেই। স্নিগ্ধ মমতায় এই রোদ মনোরম, বড় আমেজ।

বুড়ো সর্দার বলল, তোরা তো সব নানকোয়া বস্তি থেকে এলি, তাই না?

জোয়ান ছেলে দুটো মাথা নাড়ল, হু-হু।

তা টেনেন্য মিঙ্গেলু (বউপণ) ঠিকমতো এনেছিস?

না, সবটা আনিনি। আজ মেয়ের জন্যে খানিকটা বায়না দিয়ে যাব। কাল সন্ধের সময় মেজিচিজুঙের পিসি আসবে। সে-ই টেকোয়েঙ কেজি (ঘটকী)। সে এসে বিয়ের ব্যবস্থা পাকাপাকি করেগেলে বাকি পণ দিয়ে যাব। পাখির মাংসের কাবাবে লুব্ধ কামড় দিয়ে একটা জোয়ান ছেলে বলল।

সহসা বিমর্ষ গলায় বুড়ো সর্দার বলল, আমার মেয়ে লিজোমুটার বিয়ে হয়ে যেত অ্যাদ্দিনে। জুকুসিমা বস্তি থেকে তার জন্যেও তো বউপণ এসেছিল।

হু-হু– কাবাবে লাল লাল দাঁতের কামড় বসাতে বসাতে, কি রোহি মধু গিলতে গিলতে প্রাচীন মানুষগুলো মাথা দোলাতে লাগল, হু-হু, তা হত।

বুড়ো সর্দারের বিষাদ তাদেরও যেন এই মুহূর্তে স্পর্শ করেছে।

নানকোয়া গ্রামের একটা জোয়ান বলল, কী হল তোর মেয়ের, কি রে সদার? ছেলেটার চোখমুখ আগ্রহে ঝকমক করছে।

কী যে হল, কিছুই জানি না। কেলুরি বস্তির সেঙাইকে যেদিন পোড়াই সেদিন থেকেই মেয়েটা নিখোঁজ। বাঘের পেটে গেল, না রেনজু আনিজা খাদে ফেল মারল, নাকি বুনো মোষ শিঙ দিয়ে ফুড়ে সাবাড় করল, জানতেই পারলাম না। হুই কেলুরি বস্তির শত্তুররাই বর্শা দিয়ে ফুঁড়ল কিনা তা-ই বা কে জানে। একটা অসহায় দীর্ঘশ্বাস পড়ল বুড়ো সর্দারের।

খানিকক্ষণ চুপচাপ। সাঞ্চামখাবার এই ছোট বাইরের ঘরটা একেবারে স্তব্ধ হয়ে রইল।

একটু পরে আবার বুড়ো সর্দার বলল, যেতে দে, যেতে দে ওসব। পাহাড়ী মানুষ আমরা। এমন করেই আমাদের জান সাবাড় হয়।

হু-হু। নানাকোয়া গ্রামের জোয়ান দুটো চেঁচামেচি করে সায় দিল।

বুড়ো সর্দার তাকাল সাঞ্চামখাবার দিকে, কি রে, মেহেলীর মামা কই? তাকে খারে বর্শা দেবে ওরা। নইলে যে ছেলেপুলে হবে না মেহেলীর।

সে তো নিমক আনতে মোককচঙ গিয়েছে। নিরুপায় গলায় বলল সাঞ্চামখাবা, তা হলে কী হবে সদ্দার?

কী আবার হবে। সে আসবে কবে?

তার কিছু ঠিক নেই।

তবে তোর নিজের খারে বর্শা দুটো নিয়ে নে।

পাহাড়ী মানুষগুলোর মধ্যে বিয়ের আগে একটি প্রথা আছে। সে প্রথাটি হল, পাত্রপক্ষ থেকে বউপণ হিসেবে দু’টি করে খারে বর্শা মেয়ের বাপ আর বড় মামাকে দিতে হয়। বড় মামা এই খারে বর্শা না পেলে, এদের বিশ্বাস, বিবাহিতা মেয়ের সন্তানের সম্ভাবনা থাকে না। অবশেষে অবৎসা নারী ডাইনি হয়।

হাত বাড়িয়ে দুটো খারে বর্শা নিয়ে নিল সাঞ্চামখাবা। অনেক দিনের পুরনো। বউপণের জন্যই এই বর্শাগুলোর প্রচলন। এগুলোকে শান দেওয়া হয় না, অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা হয় না। পরম আদরে বাঁশের খাপের মধ্যে ভরে রাখা হয়। বিয়ে ছাড়া অন্য সময় এগুলো ছোঁয়া পর্যন্ত হয় না। তাই বর্শার ফলায় লালচে জং ধরে গিয়েছে।

খারে বর্শার ফলা দুটো নিয়ে সাঞ্চামখাবা বলল, তা হলে সদ্দার, মেহেলীর মামার কী হবে?

মোককচঙে কাউকে দিয়ে খবর পাঠা। আর শোন, তোদের একটা কথা বলতে ভুলে গেছিলাম। বুড়ো সর্দার বাইরের দিকে তাকাল।

কেসুঙের সামনে সমস্ত সালুয়ালা গ্রামখানা জটলা পাকাচ্ছে। সর্দারের ডাকে একটা ঠাসবুনট ভিড় দরজার কাছে ঘন হয়ে এল, কি সদ্দার, কী বলছিস?

সেদিন সায়েবরা এসেছিল, মনে আছে?

হু-হু। সায়েবরা কত ভালো! টাকা দিয়েছে। কাপড় দিয়েছে। ভালো ভালো খাবার দিয়েছে। সালুয়ালা গ্রামের মেয়েপুরুষ একসঙ্গে শোরগোল করে উঠল।

যীশু, যীশু। মেরী, মেরী–পাহাড়ী গ্রামটা মেতে উঠতে লাগল।

দিনকয়েক আগে সালুয়ালা গ্রামে দুজন পাদ্রী এসেছিল। তারা পাহাড়ী মানুষগুলোর মধ্যে অনেক টাকা, নানা রঙের নানা আকারের বাহারি কাপড়-জামা বিলিয়ে গিয়েছে। আর সেই সঙ্গে ছড়িয়ে গিয়েছে এক অপূর্ব জ্ঞানের আলো। বেথেলহেমের এক অনির্বাণ নক্ষত্রকে এই ছোট্ট পাহাড়ী জনপদ সালুয়ালাঙের আকাশে চিরস্থায়ী করে রাখার সব রকম বন্দোবস্ত করে। গিয়েছে। কোনো দিকে বিন্দুমাত্র ত্রুটি হয়নি। যীশু! এই নামটিকে আদিম পাহাড়ী মানুষগুলির হাড়ে হাড়ে উৎকীর্ণ করতে চেয়েছে পাদ্রী সাহেবরা। সকলের কানে কানে একটি অমোঘ মন্ত্র দিয়েছে। সে মন্ত্রের নাম যীশু। সকলের আঙুলের ডগায় ক্রস আঁকার কায়দা শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছে।

পাহাড়ী মানুষগুলোর কেউ কেউ দুই বাহুসন্ধি, বুক আর কপাল আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে ক্রস আঁকতে লাগল।

বুড়ো সর্দার বলল, কাল সায়েবের লোক এসেছিল আমাদের বস্তিতে।

কই, আমরা তো জানি না। সকলে তারস্বরে চেঁচামেচি শুরু করে দিল।

তোরা তখন সিঁড়িখেতে গিয়েছিলি।

সায়েবরা আরো টাকা দিয়েছে? সুন্দর সুন্দর কাপড় দিয়ে গেছে আমাদের জন্যে, কি রে সর্দার? বলতে বলতে জনকয়েক ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল।

প্রশ্নগুলো শুনে বুড়ো সর্দারের ঘন ভুরুজোড়া কয়েক মুহূর্ত কঁকড়াবিছার মতো কুঁকড়ে রইল। আচমকা কালকের কথা মনে পড়ল। সকলের অগোচরে পাদ্রীসাহেবের লোকটা তার থাবায় অনেকগুলো রুপোর মুদ্রা গুঁজে দিয়ে গিয়েছিল, আর লাল রঙের একটা কাপড় দিয়েছিল। টাকার মহিমা জানে বৈকি বুড়ো সর্দার। এর আগেও অনেকবার কোহিমা আর মাও শহরে গিয়েছে সে।

পাদ্রীসাহেবের লোক। নামটা ভুলে গিয়েছে বুড়ো সর্দার। তবে মানুষটা তাদেরই মত পাহাড়ী। তাদেরই মতো তার চোখের মণি পিঙ্গল। কিন্তু পরনে সাহেবদের মতো সাদা কাপড়। হুসিঙ পাখির পালকের মতো ধবধবে। কাপড়টার নামও কী যেন বলেছিল লোকটা। সারপ্লিস শব্দটি বেমালুম ভুলে গিয়েছে বুড়ো সর্দার।

সাহেব পাদ্রীর সঙ্গী ছিল। তাদের দেশেরই পাহাড়ী পাদ্রী। বুনো সাহেব। সেই মানুষটা ফিসফিস করে বলেছিল, তোকে একবার কোহিমা যেতে হবে, ফাদার যেতে বলেছে। আরো টাকা পাবি, কাপড় পাবি, নিমক পাবি। লবণ জলের ঝরনার জল আর টক আপুফু ফল গিলে মরতে হবে না। আরো কী কী পাবি, এখন বলছি না।

টাকা! কাপড়! নিমক! শুনতে শুনতে বুড়ো সর্দার বিচলিত হয়ে পড়েছিল। বলা যায়, একেবারে ডগমগ হয়ে উঠেছিল। শব্দ তিনটে বার বার উলটে পালটে অস্ফুট গলায় উচ্চারণ করেছিল সে। জড়িত স্বরে শুধু বলতে পেরেছিল, যাব, নিশ্চয়ই যাব।

ইতিমধ্যে মানুষগুলো আবার অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে, কি রে সদ্দার, বলছিস না কেন? দিয়ে গেছে টাকা? কাপড় দিয়েছে?

একটু চমকে উঠল বুড়ো সর্দার। পাহাড়ী মানুষ। মিথ্যাচার করতে বিবেক ঠিক সায় দিয়েও দিচ্ছে না। তবু মুহূর্তের মধ্যে কর্তব্য স্থির করে ফেলল সে। দাঁতমুখ খিঁচিয়ে চিৎকার করে উঠল, না রে শয়তানের বাচ্চারা। টাকা দিয়ে কী করবি? টাকা দিয়ে কী হয় জানিস? কোহিমা মোককচঙে কোনোদিন গেছিস টেফঙের ছায়েরা?

বুড়ো সর্দার আর মেহেলীর মামা ছাড়া সালুয়ালা গ্রামের অন্য কেউ শহরে যায় নি। টাকা দিয়ে কী নিদারুণ ভোজবাজি, কী অসম্ভব ভেলকি দেখানো যায়, তা তারা কেউ জানে না। শুধু হইচই করে উঠল পাহাড়ী মানুষগুলো, হু-হু, টাকা দিয়ে আবার কী হবে? দেওয়ালের খুঁটি ফুটো করে তার ভেতর রাখব। না হলে সিঁড়িখেতে পুঁতে দেব। সায়েব বলেছিল, টাকা হল আউই ভু (জমির উর্বরতার জন্য ভাগ্য-পাথর)। জমিতে পুঁতে দিলে সার ভালো হবে। জোয়ার ফলবে অনেক। অনেক ধান হবে।

হু-হু। শুকনো তামাকপাতার মতো হেজে যাওয়া মাথাখানা দোলাল বুড়ো সর্দার, সায়েবের লোক এসেছিল। সায়েব আমাকে কোহিমা যেতে বলেছে। টাকাকড়ি কিছু দেয়নি।

আচমকা বাইরের ঘরের সামনে আলোড়ন দেখা দিল। বুনো মোষের মতো জমায়েতটাকে ছত্রখান করে, ধাক্কা মেরে, গুতো দিয়ে, ঝড়ের বেগে একটা জোয়ান ছেলে এগিয়ে এল। রীতিমতো হাঁফাচ্ছে সে, সারা দেহ উত্তেজনায় কাঁপছে। ঘন ঘন নিশ্বাস পড়ছে।

বাইরের চত্বরে চিৎকার শুরু করে দিয়েছে মানুষগুলো। ঠাসবুনন ভিড়ের মধ্যে পথ করে নিতে গিয়ে জোয়ান ছেলেটার ধাক্কায় কেউ পাথরে ছিটকে পড়ে মাথা ফাটিয়ে ফেলেছে। কেউ কেউ আছড়ে পড়েছে মাটির ওপর।

উত্তেজিত গলায় জোয়ানটা বলল, সব্বনাশ হয়ে গেছে সদ্দার—

কী ব্যাপার? কী হয়েছে রে ইমটিটামজাক? বুড়ো সর্দার ভুরু কুঁচকে তাকাল।

টিজু নদীর হুই দিকে সেঙাইকে দেখে এলুম। শিকারে বেরিয়েছে। কেলুরি বস্তির আরো অনেক লোক রয়েছে তার সঙ্গে। সমানে হাঁপিয়ে চলেছে ইমটিটামজাক।

বলিস কী! সকলে চমকে উঠল।

বিস্ময়ের সুরে বুড়ো সর্দার বলল, সে কী! সেদিন তো সেঙাইকে পুড়িয়ে মারলুম!

সেঙাইকে পুড়িয়েছিস! হুই সালুনারু শয়তানী ভুল খবর দিয়েছিল। আহে ভু টেলো। কুৎসিত মুখভঙ্গি করে বলল ইমটিটামজাক।

সালুনারুকে আমি বর্শা দিয়ে ফুড়ব। ওর মুণ্ডু মোরাঙে ঝুলিয়ে রাখব। বর্শা বাগিয়ে লাফিয়ে উঠল বুড়ো সর্দার।

আর ঠিক সেই সময় বাইরের ভিড় থেকে একটা নগ্ন নারীমূর্তি সামনের ঘন জঙ্গলে দৌড়ে পালাল।

সঙ্গে সঙ্গে শোরগোল উঠল, সালুনারু পালাল, পালাল।

টেমে নটুঙ। একটা কদর্য গালাগালি আউড়ে আবার পাথরখানার ওপর বসে পড়ল বুড়ো সর্দার, কেলুরি বস্তির হুই সালুনারু মাগীকে আমাদের বস্তিতে দেখলে টুকরো টুকরো করে কাটব।

হঠাৎ সাঞ্চামখাবা বলল, সেসব পরে হবে। এখন পণ নিয়ে নিই সদ্দার, কী বলিস তুই?

হু-হু। সায় দিল বুড়ো সর্দার। তারপর তাকাল নানকোয়া গ্রামের জোয়ান ছেলে দুটোর দিকে। বলল, তোদের সঙ্গে তো কুটুম্বিতে হচ্ছে। মেহেলীকে বিয়ে করবে তোদের মেজিচিজুঙ।

হু-হু। একসঙ্গে মাথা দোলাল জোয়ান দুটো।

তোরা আমাদের বন্ধু হবি, কুটুম হবি।

হু-হু–

বুঝলি, হুই কেলুরি বস্তিকে শায়েস্তা করতে হবে। ওরা আমাদের শত্রুর। বুড়ো সর্দার বাইরের ঘর থেকে আঙুল বাড়িয়ে দিল টিজু নদীর ওপারে কেলুরি গ্রামের দিকে।

হু-হু–

সর্দার গর্জে উঠল, হুই বস্তি থেকে চর রেখেছে সালুনারুকে। মাগীর মুণ্ডু ছিঁড়ে মোরাঙের সামনে গেঁথে রাখব। একটু দম নিয়ে আবার বলল, তোরা যখন আমাদের বন্ধু, আমাদের সঙ্গে একজোট হবি।

কেন?

কেন আবার। ওদের সঙ্গে যদি লড়াই বাধে, তখন লোকের দরকার হবে। সেই জন্যে আমাদের একজোট হতে হবে।

হু-হু। মাথা ঝকাল জোয়ান দুটো। বলল, আমাদের সদ্দারকে সে কথা বলতে হবে। সে বললে আমরা জান দিতে পারি। না বললে কিন্তু কিছুই করব না।

বুড়ো সর্দার রক্তচোখে তাকাল, আমাদের সঙ্গে মিলে হুই কেলুরি বস্তির সঙ্গে লড়াই না করলে কিন্তু মেহেলীর বিয়ে দেব না তোদের বস্তিতে। সিধে কথা।

উঠে দাঁড়াল বুড়ো সর্দার। তার থাবায় খরধার বর্শার ফলায় দুপুরের রোদ ঝকমক করছে। তাকে ভয়ানক দেখাচ্ছে।

.

২২.

বিকেলের দিকে নানকোয়া গ্রামের ছেলে দুটো চলে গিয়েছে। বুড়ো সর্দার আর সালুয়ালা গ্রামের প্রাচীন মানুষগুলোও পোকরি কেসুঙ থেকে বিদায় নিয়েছে। বাইরের ঘরের সামনে যে ভিড় ছিল, তাও ফাঁকা হয়ে গিয়েছে।

সন্ধ্যা হতে দেরি নেই। পশ্চিম পাহাড়ের চূড়ায় ধূসর ছায়া নেমে আসছে।

বাইরের ঘরে এসে ঢুকল মেহেলী আর পলিঙা। সারাদিন তারা উপত্যকায় ঘুরে ঘুরে শুকনো পাতা আর কাঠ কুড়িয়েছে। খবরটা ওরা আগেই পেয়েছে। গ্রামের অন্য একটি মেয়ে এমন মজাদার সংবাদ বেশ রসিয়ে রসিয়েই ওদের দিয়ে এসেছিল।

বুঝলি মেহেলী, নানকোয়া বস্তি থেকে তোর বিয়ের পণ এসেছে।

বিয়ের পণ কেন? চমকে উঠেছিল মেহেলী।

কেন আবার, তোর যে বিয়ে। বিরাট ভোজ হবে। তোের আর কি, এবার ঘরে মরদ পাবি, আমাদের মতো পাহাড়ে পাহাড়ে ছোঁক ছোঁক করতে হবে না। দীর্ঘশ্বাস পড়েছিল যুবতী মেয়েটির। তারপরেই উৎসাহের সুরে বলেছিল, দ্যাখ গিয়ে, তোদের কেসুঙে বস্তির সব লোক জড়ো হয়েছে।

কথাগুলো যেন কানের ওপর গরম চর্বি ঢেলে দিয়েছিল। আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায়নি মেহেলী। সমস্ত শরীরটা, এই পাহাড়ী বন, অস্ফুট ভাবনা–সব যেন অসহ্য হয়ে উঠেছিল। হঠাৎ সামনের টিলায় উঠে গ্রামের দিকে দৌডুতে শুরু করেছিল। তারপেছন পেছন ছায়ার মতো ছুটেছিল পলিঙা। আর সেই দৌড় পোকরি কেঙের বাইরের ঘরে এসে থেমেছিল।

মাচানের ওপর বসে বেশ তারিয়ে তারিয়ে তখন রোহি মধু খাচ্ছিল সাঞ্চামখাবা। মেহেলীকে দেখে হেসে হেসে বলল, এই মেহেলী, তোর বিয়ের পণ এসেছে। হুই নানকোয়া বস্তির মেজিচিজুঙের সঙ্গে তোর বিয়ে।

মেজিচিজুঙ তো বাঘ-মামুষ। আমি হুই শয়তানকে বিয়ে করব না।

কী বললি? হুমকে উঠল সাঞ্চামখাবা। উত্তেজনায় হাতের পিঠে পুরু ঠোঁট দুটো ঘন ঘন মুছতে লাগল।

কী আবার বলব? আমি মেজিচিজুকে বিয়ে করব না। জেদী গলায় মেহেলী বলল।

ওরে ধাড়ী টেফঙ, ইজা হুবুতা! মুখখানা কদাকার করে বিশ্রী গালাগালটা উচ্চারণ করল সাঞ্চামখাবা–নির্বিবাদে এবং নির্দ্বিধায়, আমি বিয়ের পণ নিয়েছি, আর শয়তানী বিয়ে করবে না? তোর বাপ করবে। তুই তো সেদিনকার ছানা রে রামখোর বাচ্চা।

দাঁতমুখ খিঁচিয়ে মেহেলী বলল, আমি হুই কেলুরি বস্তির সেঙাইকে বিয়ে করব। ও আমার পিরিতের জোয়ান।

কান দুটো বিশ্বাসঘাতকতা করছে না তো! বলে কী মেহেলী! বর্শা দিয়ে জিভখানা উপড়ে ফেলবে নাকি মেয়েটার? সাঞ্চামখাবার চোখ দুটো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল। মুখ ভেঙচে সে বলল, পিরিতের জোয়ান! সেঙাইকে বিয়ে করবি! ইজা রামখো। আজ হরিণের মতো ছাল ছাড়িয়ে ফেলব তোর—

মাচানের ওপাশ থেকে একটা বর্শা টেনে নিল সাঞ্চামখাবা। খরধার ফলা। সেই ফলায় মৃত্যু ঝিলিক দিয়ে উঠল, কিন্তু বর্শা দিয়ে তাক করার আগেই ঘর থেকে বাইরে লাফিয়ে পড়ল মেহেলী, তার পেছনে পলিঙাও।

চারিদিকের বাড়িঘর এবং গাছপালার মাথায় তখনও ফিকে সোনালি রং লেগে আছে। সামনের জঙ্গলে অদৃশ্য হল দু’টি যুবতী।

টিজু নদীর কিনারায় এসে পলিঙা বলল, এবার কী করবি মেহেলী?

কী আর করব, সেঙাইকে খুঁজে বার করতে হবে। কত বার এখানে এসে ঘুরে গেছি। ওর দেখা পাইনি। কী হয়েছে, বুঝতেই পারছি না।

অনেকদিন সেঙাই এদিকে আসে না। বস্তিতে ফিরে আর কোনো জোয়ানীর সঙ্গে পিরিত জমিয়ে বসল না তো? পাহাড়ী জোয়ানের মন বোঝা দায় মেহেলী। যখন যে মাগীর গন্ধ পায়, তখন তার কথাই বলে। তোকে ভুলে গেল না তো সেঙাই? পলিঙর দুচোখে কৌতুক ঝিকমিক করছে।

বুকটা ছাঁত করে উঠল মেহেলীর। তাই তো, পাহাড়ী পুরুষের স্মৃতি। তার স্থায়িত্ব কতখানি? সে তো ঘাসের ফলায় শিশিরের আয়ু। কেলুরি গ্রামেও অনেক কুমারী মেয়ে সুঠাম দেহের রূপ মেলে পুরুষের চোখের সামনে ঘুরে বেড়ায়, বিভ্রম ছড়ায়। সেই পার্বতী যুবতীদের কেউ কি ডাইনি নাকপোলিবার মন্ত্রপড়া শিকড় দিয়ে বশ করল সেঙাইকে?

কাঁপা গলায় মেহেলী বলল, ওপারে গিয়ে একবার দেখে আসি। সেঙাইর কাছে না পালালে বাপ আমাকে ঠিক খুন করে ফেলবে। একেবারে খতম। সর্দারও বস্তিতে টিকতে দেবে না। তুই একটু দাঁড়া এখানে। আমি কিছুতেই মেজিচিজুঙকে বিয়ে করব না।

পলিঙা বলল, সাবধানে যাবি। ওরা কিন্তু আমাদের বস্তির শত্তুর।

টিজু নদী পেরিয়ে সেই নিঃশব্দ ঝরনাটার পাশে এসে দাঁড়াল মেহেলী। কেউ কোথাও নেই। মনে পড়ল, এখানেই তার সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিল সেঙাই-এর। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করল মেহেলী। ঘন বনের ফাঁক দিয়ে যখন জাফরিকাটা বোদ মিলিয়ে গেল, ঠিক তখনই কেলুরি বস্তির দিকে সে পা চালিয়ে দিল।

কর্তব্য স্থির হয়ে গিয়েছে। যেমন করে হোক, সেঙাই-এর সঙ্গে আজ দেখা করতেই হবে। সাঞ্চামখাবার বর্শার খরধার ফলা থেকে, মেজিচিজুঙের বিয়ের বাঁধন থেকে উধ্বশ্বাসে সে পালিয়ে এসেছে সেঙাই-এর আশ্রয়ের আশায়। সেঙাইকে নিয়ে দূর পাহাড়ের উপত্যকায় ঘর বাঁধবে। তার দু’টি বাহুর বেষ্টনীতে মেহেলী এই মুহূর্তে নিরাপদ শান্তি আর স্বস্তি কল্পনা করল। তার জীবনে সেঙাইকে বড় প্রয়োজন, একান্তভাবে সেঙাইকে তার চাই।

খাড়া চড়াই থেকে নিচে নামতে নামতে চেঁচামেচি শুনতে পেল মেহেলী। মানুষের গলা। চট করে সামনের বড় পাথরখানার আড়ালে সে সরে দাঁড়াল।

বাঘনখের আঁচড়ের মতো ফালি ফালি পথের রেখা। সেই পথ ধরে দুলতে দুলতে আসছে একদল মানুষ। তাদের শোরগোলে স্তব্ধ বনভূমি চকিত হয়ে উঠেছে। নিশ্চয়ই এরা কেলুরি গ্রামের লোকজন। বুকের মধ্যে নিশ্বাস আটকে গেল। নিথর হয়ে রইল মেহেলী।

একটা গলা শুনতে পাওয়া গেল, সেঙাইটাকে কোহিমার পথে দিয়ে এলুম সদ্দার। সারুয়ামারুটাও সঙ্গে গেল। কোহিমা থেকে ও ফিরবে তো?

একটা বুড়ো পাহাড়ী, নিশ্চয়ই সে দলপতি, মাথা ঝাঁকাল, হু-হু, ফিরবে। নির্ঘাত ফিরবে। হুই যে গাইডিলিওর কথা বলেছিল সারুয়ামারু, কেমনতরো মেয়ে সে, তাই দেখতেই পাঠালাম। নইলে টাকা দিয়েছে বলে কি সিজিটোর কাছে পাঠাতুম নাকি? শয়তানের বাচ্চা হুই সায়েবরা সারুয়ামারুকে বলে দিয়েছে, আনিজার নামে শুয়োর বলি দিতে দেবে না। আচ্ছা, একবার আমাদের বস্তির দিকে আসে যেন তারা।

কে একজন বলল, সায়েবরা বড় বশ করতে পারে। হুই ডাইনি নাকপোলিবার মতো। সায়েবদের কাছে সিজিটো গেল, সারুয়ামারু গেল-বস্তিতে ফিরে ওরা খালি তাদের কথাই বলে। কী মন্তর যে জানে সায়েবরা! সেঙাইটা কোহিমা থেকে আবার সেরকম না হয়ে ফেরে?

সর্দার মাথা নাড়ল, না না, সেঙাই তেমন ছেলে না।

সেঙাই তবে কোহিমা চলে গিয়েছে! বুকটা ধক করে উঠল মেহেলীর। তা হলে সে এখন কী করবে? কী সে করতে পারে? কোনোক্রমেই নিজেদের বস্তিতে আর ফিরতে পারবে না। সাঞ্চামখাবা তার চামড়া উপড়ে নেবার জন্য বর্শাটাকে নিশ্চয়ই শান দিচ্ছে এখন। আচমকা নিজের অজান্তে তার মুখ থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল কথাগুলো, সেঙাই, সেঙাই কবে

আসবে?

পাহাড়ীগুলো পাথরখানার সামনাসামনি এসে পড়েছিল। মানুষের গলা শুনে থমকে দাঁড়াল, কে? কে?

তাদের থাবায় বর্শার ফলাগুলো ঝকমক করে উঠল।

একজন বলল, হুই, হুই যে। পাথরের ওধারে–

পাথরের আড়াল থেকে ভীরু গলায় গুঙিয়ে উঠল মেহলী, আমাকে মারিস না, আমাকে মারিস না। আমি মেহেলী, তোদের বস্তির সেঙাই-এর লাগোয়া লেন্য (প্রেমিকা)।

নিমেষে মেহেলীকে চার কিনার থেকে ঘিরে ধরল কেলুরি গ্রামের জোয়ান ছেলেরা। ওঙলে, পিঙলেই, পিঙকুটাঙ, এমনি অনেকে। বুড়ো সর্দার খাপেগাও রয়েছে তাদের মধ্যে।

সেঙাই আজ চলে গেল কোহিমায়। সঙ্গে গেল সারুয়ামারু। ওঙলেরা মাও-এর পথে এইমাত্র তাদের তুলে দিয়ে গ্রামে ফিরছে।

বুড়ো খাপেগা অবাক বিস্ময়ে বলল, তুই-ই মেহেলী!

হু-হু, সেঙাই-এর লাগোয়া লেন। আমাকে মারিস না তোরা। করুণ চোখে তাকিয়ে রইল মেহেলী।

হো-ও-ও-ও-য়া-য়া–তুমুল হুলস্থূল বাধিয়ে দিল মানুষগুলো।

বুড়ো খাপেগা হুমকে উঠল, থাম শয়তানের বাচ্চারা। তারপরেই মেহেলীর দিকে কোমল চোখে তাকাল, না, তোকে মারব না।

ওঙলে বলল, জেঠা, ওকে নিয়ে চল আমাদের বস্তিতে। সেঙাই কোহিমা থেকে ফিরলে বিয়ে দিয়ে দেব।

কে যেন বলল, বেশ বাগে পেয়ে গেছি।

খোঁচা-খাওয়া বাঘের মতো গর্জে উঠল বুড়ো খাপেগা, কি, বাগে পেয়ে ওকে ধরে নিয়ে বিয়ে দিতে চাস? লুেরি বস্তির ইজ্জত ডুবতে দেব না। হু-হু, তেমন সদ্দার আমি নই। লড়াই করে হুই সালুয়ালাঙ বস্তি থেকে ওকে ছিনিয়ে আনব। তারপর বিয়ে হবে। আমাদের কলিজায় রক্ত নেই? লড়াই করতে আমরা ডরাই নাকি?

ঘোলাটে চোখ দুটো রক্তাভ হয়ে উঠেছে বুড়ো খাপেগার। বুড়ো খাপেগা, কেলুরি গ্রামের অতীতকাল সে। আদিম বীরত্বের প্রতীক। বন্য আর পাহাড়ী মানুষদের দলনেতা। বুড়ো খাপেগা তাকাল মেহেলীর দিকে। বলল, তুই তোদের বস্তিতে ফিরে যা। তোদের সদ্দারকে বলিস, তোকে আমরা ছিনিয়ে এনে সেঙাই-এর সঙ্গে বিয়ে দেব। সে যেন ঠেকায়। সেঙাই-এর ঠাকুরদাকে তোরা মেরেছিস। তোদের পোকরি বংশের নিতিৎসুকে আনতে গিয়ে সেদিন আমরা হেরে গিয়েছিলাম। এবার তোকে আনতে যাব। যা মেহেলী, চলে যা। লড়াই করে না আনলে পাহাড়ী মেয়েমানুষের দাম থাকে না। বাগে পেয়ে বিয়ে করবে, সে আবার কেমন পুরুষ!

ঠিক ঠিক। হু-হু– জোয়ান ছেলেরা চেঁচাতে লাগল, মেহেলীকে আমরা ছিনিয়ে আনব সদ্দার। তুই চলে যা মেহেলী।

মেহেলী আকুল হয়ে উঠল। করুণ হল চোখমুখ। বলল, আমি আমাদের বস্তিতে আর ফিরব না সদ্দার। তুই আমার ধরমবাপ, আমাকে সালুয়ালাঙে যেতে বলিস না।

কেন? কী হয়েছে তোদের বস্তিতে? বিস্মিত গলায় জিগ্যেস করল বুড়ো খাপেগা।

আমি বস্তিতে ফিরলে আমার বাপ ছাল উপড়ে নেবে।

কেন?

আমার সঙ্গে হুই নানকোয়া বস্তির মেজিচিজুঙের বিয়ে ঠিক করেছে আমার বাপ। আমি সেঙাইকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করব না। তাই পালিয়ে এসেছি। কাতর গলায় বলল মেহেলী।

মেজিচিজুঙ! সে তত বাঘ-মানুষ! কী সব্বনাশ! আতঙ্কে ফিসফিস শোনাল বুড়ো খাপেগার গলা, তার সঙ্গে তোকে জুড়ে দিতে চায়!

হু-হু, অনেক বউপণ পাবে কিনা।

একটা আস্ত সাসুমেচু (ভয়ঙ্কর লোভী মানুষ) তো তোর বাপ।

হু-হু, সেই ভয়েই পালিয়ে এসেছি। তোদের বস্তিতে থাকতে দে সদ্দার। নইলে বাপ আমাকে সাবাড় করে ফেলবে। আমি বাপকে বলে এসেছি, সেঙাইকে ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করব না।

তাই হবে। তুই চল আমাদের বস্তিতে। তোকে ছিনিয়ে নিতে নিশ্চয়ই তোদের বস্তির সদ্দার আর জোয়ানরা আসবে। তখন লড়াই হবে।

হু-হু। জোয়ান ছেলেরা চারপাশ থেকে সায় দিল। তাদের হাতের থাবায় বর্শার ফলাগুলো ঝকমক করে উঠল। আসন্ন লড়াই-এর উত্তেজনায় তাদের মন, অস্ফুট চেতনা আর ভাবনা ভরে গিয়েছে।

চল এবার, রাত্তির হয়ে আসছে। ঢালু উপত্যকার দিকে নামতে নামতে বুড়ো খাপেগা বলল, যাক, বিনা লড়াইতে তো তোকে নিচ্ছি না। দস্তুরমতো লড়াই হবে তোর জন্যে, না কি বলিস মেহেলী?

সকলের সঙ্গে চলতে চলতে মেহেলী বলল, হু-হু–

.

২৩.

পাহাড়ী অজগরের মতো আঁকাবাঁকা রাস্তা। পাথর কাটা মসৃণ সেই পথ। চড়াই-উতরাই পেরিয়ে, বনময় উপত্যকার মধ্য দিয়ে, বিশাল শিলাস্তূপের বাঁকে বাঁকে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। পথের বিস্তার দু’দিকেই। মাও থেকে এক দিকে কত শৈলচূড়া পাড়ি দিয়ে সে পথ ছুটে গিয়েছে মণিপুরের দিকে, উত্তর-পশ্চিম কোণে সেই পথই আবার কোহিমা শহরকে ছুঁয়ে ডিমাপুরের দিকে নেমে গিয়েছে, থেমেছে মণিপুর রোড রেল স্টেশনে।

মাও-এর পথে এসে দাঁড়াল সেঙাই আর সারুয়ামারু।

ডান পাশে পাহাড়ের অতল খাদে দোইয়াঙ নদী গর্জে গর্জে ছুটছে। পাথরে পাথরে আছাড়ি পিছাড়ি খেতে খেতে ফুলকি ছড়াচ্ছে নীল জলের ধারা। খাদের ওপর উঁচু ভিতের ওপর দোকানপসার। টিনের চাল, পাথরের মেঝে। বাঁশের মাচানে নানা সম্ভার কমলালেবু, লবণ, সাকা বিড়ি, কঁচি সিগারেট। আর বিরাট বিরাট সব গুদাম-হরিণের ছাল, সম্বরের শিঙ, কস্তুরী, বাঘের ছাল, চিতার দাঁত, হাতির দাঁত দিয়ে বোঝাই। বাঁ দিকে ধাপে ধাপে পাথর কেটে অনেকটা উঁচুতে গোটা তিনেক মণিপুরী হোটেল। টিনের ঘর। সামনে টিনের পাতে মণিপুরী, ইংরেজি, অসমীয়া আর বাংলা হরফে হোটেলগুলোর নাম লেখা রয়েছে।

বাঁ দিকের লবণ আর কমলার দোকানগুলোতে অদ্ভুত ধরনের কতকগুলো মানুষ বসে রয়েছে। অপার বিস্ময়ে এই দোকানপসার, এই অপরিচিত মানুষ, ইম্ফলের দিকে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া রহস্যময় পথটার দিকে অপলক তাকিয়ে রইল সেঙাই। অদ্ভুত সব মানুষ। (এর আগে সেঙাই কোনোদিন পাথর কাটা পথ দেখেনি। পাহাড়ী মানুষ ছাড়া এই সব সমতলের মানুষ, যেমন বাঙালি, অসমীয়া হিন্দুস্থানীদের দেখেনি। দেখেনি মণিপুরীদের, শিখদের।) তাদের ভাষা দুর্বোধ্য। আগে কোনোদিন এসব ভাষা শোনেনি সেঙাই। কেলুরি গ্রামে সে সুযোগই বা কোথায়?

ফিসফিস গলায় সেঙাই বলল, এরা সব কোন দেশের মানুষ রে সারুয়ামারু? আমাদের মতো তো নয়।

বিজ্ঞের মতো গম্ভীর শব্দ করে হাসল সারুয়ামারু, হু-হু, এরা হল আসান্যু (সমতলের বাসিন্দা)। খবদ্দার, এদের সঙ্গে কোনোদিন মিশবি না সেঙাই।

কেন?

কেন আবার, ফাদার বারণ করে দিয়েছে। এরা খুব খারাপ লোক।

তাই নাকি?

হু-হু। যেন গূঢ় কোনো খবর দিচ্ছে, মুখখানা এমন গম্ভীর দেখাল সারুয়ামারুর, চল না একবার কোহিমাতে, দেখবি ফাদার সব শিখিয়ে পড়িয়ে দেবে। এই আসান্যুদের মধ্যে বাঙালি আছে, অছমিয়া আছে, হিন্দোস্থানী আছে। ফাদার বলে দিয়েছে, ওরা সব শয়তান। সাবধান সেঙাই। কোহিমাতে গিয়ে ওদের পাল্লায় পড়বি না।

হু-হু। মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিল সেঙাই। তারপর ইম্ফলগামী পথটার দিকে তাকাল, ওটা কী রে? সাপের মতো এঁকে বেঁকে পাহাড়ে গিয়ে উঠেছে। কী ওটা?

ওটা পথ। ইম্ফলের দিকে গেছে।

ইম্ফল! সে কোন দেশ? কতদূর? দুচোখে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইল সেঙাই।

অনেক দূর। কিন্তু পক পক গাড়িতে সকালবেলা চড়লে সন্ধের সময় পৌঁছে দেবে।

আমি যাব ইম্ফলে।

যাবি, যাবি। ইম্ফলে যাবি, শিলঙে যাবি, গুয়াহাটি যাবি। আরো কত জায়গায় যাবি। আগে তো কোহিমা চল। সমানে বকর বকর করে চলল সারুয়ামারু। একটু পরে শুধলো, খিদে পেয়েছে সেঙাই?

হু-হু—

চল হুই মণিপুরীদের হোটেলে খেয়ে নিই। ইম্ফল থেকে পক পক গাড়ি আসতে এখনও দেরি আছে। এমন জিনিস খাওয়াব, জন্মে কোনোদিন খাসনি। সেঙাইর হাত ধরে টানতে টানতে ডান দিকের পাথর কাটা সিঁড়ির দিকে টেনে নিয়ে গেল সারুয়ামারু।

তখনও ইম্ফল-গামী পথটার দিকে, সামনের দোকানপসারগুলোর দিকে, সমতলের মানুষগুলোর দিকে তন্ময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে সেঙাই। অপরূপ অদ্ভুত অচেনা এক পৃথিবীর মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে সে। টিজু নদীর কিনারে বনময় উপত্যকায় কেলুরি, সালুয়ালা, নানকোয়া, জুকুমিচা–এই সব ছোট ছোট গ্রামের বাইরে ইম্ফলে যাবার এমন একটা মসৃণ পথ ছিল, এমন সব দুর্বোধ্য ভাষার কলতান ছিল, তা কি জানত সেঙাই? সমতলের মানুষগুলোর দিকে একবার তাকাল সে। কেমন একটা আকর্ষণ বোধ হচ্ছে ওদের সঙ্গে মিশবার, ওদের কথা শুনবার। কিন্তু না, একটু আগেই তাদের সম্বন্ধে মোহভঙ্গ করে দিয়েছে সারুয়ামারু।

পাথর কাটা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এল সেঙাই আর সারুয়ামারু। পাশের একটা ঝরনা থেকে রবারের নল দিয়ে জল আনা হয়েছে। নলের বরফশীতল জল ছড়িয়ে ছড়িয়ে, ছিটিয়ে ছিটিয়ে কালো পাথরের এবড়োখেবড়ো চত্বরটার ওপর ছড়িয়ে পড়ছে। সারুয়ামারু সেই জলে হাত ধুয়ে নিল। সেঙাইকে বলল, মুখটুখ ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে নে সেঙাই। এটা শহর, একটু সভ্য হয়ে চলবি। এ তো আর হুই সদ্দারের কেলুরি বস্তি নয়। হু-হু। মাতব্বরি চালে হাসল সারুয়ামারু।

অতিকায় বর্শাটা একপাশে রেখে সারুয়ামারুর কথামতো জলে হাত-পা মুখটুখ ধুয়ে নিজেকে পরিচ্ছন্ন করে নিল সেঙাই। উর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত। নিচে জানু পর্যন্ত একটি নীল রঙের পী মুঙ কাপড় ঝুলছে।

ঘরের ভেতরে এসে টিনের চেয়ার দেখল সেঙাই, দেখল কাঠের টেবিল। যত দেখছে ততই দু’টি চোখ আর মন বিস্ময়ে ভরে উঠছে। নানা কৌতূহলে ইন্দ্রিয়গুলো আন্দোলিত হচ্ছে। পেতলের থালা আর গেলাস এল। তার ওপর মণিপুরী বামুন ভাত, এরঙ্গু (শুঁটকি মাছের তরকারি) আর সর্ষে পাতার ঝোল জাতীয় খানিকটা দিয়ে গেল। তারপর এল মাগুর মাছ ভাজা।

পরম তৃপ্তিতে সারুয়ামারু সপাসপ ভাতের গ্রাস তুলছে মুখে। আর চুপচাপ ঝকঝকে পেতলের থালা আর গেলাসের দিকে তাকিয়ে রয়েছে সেঙাই।

বিশাল একটা গ্রাস ঠোঁটের কাছে এনে সারুয়ামারু তাকাল সেঙাইর দিকে, কি রে, ভাত খাচ্ছিস না কেন? হুই এরঙ্গু খেয়ে দ্যাখ। বুনো মোষের আধপোড়া মাংসের চেয়ে অনেক ভালো, অনেক সোয়াদ পাবি।

কিন্তু পেতলের এইসব–বাসনগুলোর দিকে আঙুল বাড়িয়ে দিল সেঙাই। বলল, এই পেতল দিয়ে তো আমরা নীশে আর নীয়েঙ দুল বানাই, হার বানাই। এতে খেলে আনিজার গোসা হবে না তো?

আরে না, না। একটা ছাগী তুই। সবেতেই খালি আনিজা। পেতল! থু থু! তোদের হুই কেলুরি বস্তিতেই পেতলের দাম আছে। কোহিমায় গিয়ে দেখবি, ওর কোনো দাম নেই। নে নে, খেয়ে নে। এখুনি আবার পক পক গাড়ি এসে পড়বে।

সারারাত উপত্যকা আর মালভূমি, টিলা আর বন এবং অসংখ্য পাহাড়চূড়া উজিয়ে এসেছে দুজনে। দেহের জোড়ে জোড়ে গাঁটে গাঁটে ক্লান্তি যেন আঠার মতো জড়িয়ে রয়েছে। পেটের মধ্যে খিদের ময়াল পাক দিয়ে উঠছে। আচমকা সেঙাই পেতলের থালাখানায় ঝুঁকে পড়ল। নিমেষে শূন্য হয়ে গেল ভাত-তরকারি-মাছ। মণিপুরী বামুন আরো ভাত ঢালল সেঙাই-এর পাতে। তাও শেষে হল।

একসময় খাওয়ার পালা চুকে গেল। তৃপ্তির একটা বিশাল ঢেকুর তুলল সেঙাই, ভালো ভাত রাঁধে তো এরা। আমাদের ভাত একেবারে গলে গলে একশা হয়ে যায়। বস্তিতে ফিরে এমনি করে ভাত পাকাব এবার। কিন্তু এখানে মাংস নেই, মাংস না হলে কি ভাত খাওয়া যায়?

সারুয়ামারু তার জঙগুপি কাপড়ের ভাজ থেকে একটি টাকা বার করতে করতে বলল, মণিপুরীদের হোটেলে মাংস পাওয়া যায় না।

একটু পরে টাকাটা মণিপুরী মালিকের হাতে দিয়ে কিছু খুচরো ফেরত নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল দুজনে। সেঙাই বলল, টাকা দিলি যে?

বা রে, টাকা দেব না! দাম দিতে হবে না? খেলাম যে, তার দাম। এবার বুঝলি তো টাকা দিলে সব মেলে শহরে। টাকার মহিমা সম্বন্ধে নতুন করে এক প্রস্থ বকর বকর শুরু করল সারুয়ামারু।

হু-হু–মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিল সেঙাই। সে বুঝেছে, টাকার পরমার্থ জলের মতো তার

কিছুক্ষণ চুপচাপ।

সেঙাই আবার বলতে শুরু করল, কোথায় তোর পক পক গাড়ি, এই সারুয়ামারু? কাল সমস্ত রাত হেঁটেছি, বড় ঘুম পাচ্ছে।

হুই হুই–সামনের দিকে আঙুল বাড়িয়ে দিল সারুয়ামারু।

অনেক দূরে পাহাড় কাটা পিচের পথ। আঁকাবাঁকা চড়াই উতরাই। সেই পথের ওপর একটা কালো বিন্দুর মতো দেখাচ্ছে বাসটাকে। বলা যায়, একটা খারিমা পতঙ্গের মতো সাঁ সাঁ করে ছুটে আসছে।

সারুয়ামারু বলল, হুই–হুই হল পঁক পঁক গাড়ি–

অনন্ত বিস্ময়ে চলমান বিন্দুটির দিকে তাকিয়ে রইল সেঙাই। একসময় পাহাড়ী পথের বাঁকে বাসটা অদৃশ্য হল। তারপর আবার পাহাড় আর বনের ফাঁকে ফুটে উঠল। অনেকটা সময় ধরে বার বার দেখা দিয়ে বার বার পথের নানা বাঁকে মিলিয়ে যেতে লাগল বাসটা। তারপর একটু একটু করে স্পষ্ট হতে হতে মাও-এ এসে থামল।

সারুয়ামারু বলল, আয়, গাড়িতে উঠি—

উঠব? আনিজার গোসা লাগবে না তো? ভীরু চোখে সারুয়ামারুর দিকে তাকাল সেঙাই।

আরে দূর! তুই একেবারে বুনো। হুই বুড়ো সদ্দারের কাছে থেকে থেকে একেবারে অসভ্য হয়ে গেছিস। একটা বিরক্ত ভ্রুকুটি ফুটে বেরুল সারুয়ামারুর চোখে, হুই শয়তান সদ্দারটা ওর জন্যে বস্তির মানুষগুলো বুনোই হয়ে রইল।

আহে ভু টেলো। বাসে উঠতে উঠতে খিঁচিয়ে উঠল সেঙাই, খবদ্দার, সদ্দারকে নিয়ে খারাপ কথা বলবি না সারুয়ামারু। একেবারে বর্শা দিয়ে কুঁড়ে ফেলব তা হলে।

একটু দমে গেল সারুয়ামারু। চকিতে সেঙাই-এর দিকে তাকাল। আনকোরা পাহাড়ী মানুষ। শহরের রং দিয়ে, শহরের বাহার দিয়ে, চেকনাই দিয়ে, লোভ আর লালসার উত্তেজনা দিয়ে সেঙাইকে মেজে ঘষে নতুন রূপ দিতে, নতুন ছাঁচে ঢালাই করে নিতে সময় লাগবে। মনে মনে সারুয়ামারু পাদ্রী সাহেবদের কথা ভাবল। ওরা ভোজবাজি জানে। ওদের কথায় বার্তায় ব্যবহারে জাদু আছে। সারুয়ামারু জানে, কেমন করে তার মতো ভয়াল পাহাড়ী মানুষকেও পাদ্রী সাহেবরা তীব্র আকর্ষণে কাছে টেনে নিয়েছে। সেঙাইর মতো একদিন সেও এই শহরের রাস্তায় ছিল একেবারেই নতুন।

একটু হাসল সারুয়ামারু, আচ্ছা আচ্ছা, একবার ফাদারের পাল্লায় নিয়ে ফেলি তোকে। তখন তোর এত ফোঁসফোসানি কোথায় থাকে দেখব।

নসু কেহেঙ মাসের দুপুর। ঝকঝকে রোদে আরাম লাগছে।

একসময় বাস চলতে শুরু করল। চাপা চাপা ছোট চোখ, বুকের ওপর থেকে হাঁটুর তলা পর্যন্ত কাপড় বাঁধা কয়েকটা মেয়ে চারপাশে বসে রয়েছে। পাশে বসেছে একদল পুরুষ। তাদের চোখও তেমনি চাপা আর ছোট।

সারুয়ামারু বলল, এরা সব মণিপুরী। হুই ইম্ফল থেকে আসছে।

হু-হু– মাথা নাড়ল সেঙাই। খানিক আগে সারুয়ামারু তাদের চিনিয়ে দিয়েছিল।

তাদের মতো জনকয়েক নাগাও এদিকে সেদিক ছড়িয়ে বসে রয়েছে।

ক্রমাগত বাঁক ঘুরছে বাস। বাঁ দিকে পাথর কাটা পাহাড় উঠে গিয়েছে অনেক উঁচুতে। সেই পাহাড়ের গায়ে নিবিড় অরণ্য। ডান দিকে দশ কি পনেরো হাত চওড়া পথের পর থেকে নিচের অতল খাদে নেমে গিয়েছে জটিল বন।

হঠাৎ ভয় পেয়ে সেঙাই বলল, খাদে পড়ে যাব—

আরে না, না–

অসহিষ্ণু গলায় চিৎকার করে উঠল সেঙাই, আমি নামব, আমি নামব। নামিয়ে দে আমায়। বাসের পাটাতনের ওপর লাফালাফি শুরু করে দিল সে।

গাড়ির ভেতর তুমুল শোরগোল উঠল। সারুয়ামারু দুহাত দিয়ে জোর করে সেঙাইকে নিচে বসিয়ে দিল। হয়তো আরো কিছু ঘটতে পারত, কিন্তু তার আগেই বমি করে ফেলল সেঙাই। বমির দমকে চোখমুখ লাল হয়ে উঠল তার। সারা দেহে আলোড়ন তুলে গোঙানি বেরুচ্ছে, ওয়াক-ওয়াক-ওয়াক—

বাসের দোলানিতে মাথাটা বনবন করে ঘুরছে। পাশ থেকে একটা মণিপুরী মেয়ে মাথায় ফুঁ দিতে লাগল। সারুয়ামারু জড়িয়ে ধরে রইল সেঙাইকে।

বাসটা পাক খেতে খেতে কোহিমার দিকে এগিয়ে চলেছে। সেই সমানে চেঁচাতে লাগল, আনিজা, আনিজা! বস্তিতে ফিরে একটা মুরগি বলি দিতে হবে।

.

২৪.

দুপুর পেরিয়ে গিয়েছে অনেক আগেই। এখন রোদে কমলা রঙের আমেজ লেগেছে।

বাস থেকে কোহিমার পথে নামল সেঙাই আর সারুয়ামারু। গাড়ির দোলানিতে আর বমি করে করে কাহিল হয়ে পড়েছে সেঙাই। উজ্জ্বল তামাটে মুখখানা শুকিয়ে গিয়েছে। বাসে তোলার জন্য সারুয়ামারুর ওপর ভীষণ রেগে গিয়েছিল সেঙাই। কিন্তু সমতল থেকে অনেক, অনেক উঁচুতে এই আকাশছোঁয়া শৈল নগর দেখতে দেখতে দু’টি পিঙ্গল চোখের মণি আবিষ্ট হয়ে গেল। পাহাড়ী মানুষ সেঙাই। বিস্ময়ে আর আগ্রহে সে একেবারে হতবাক হয়ে গিয়েছে।

বাসটা তাদের নামিয়ে বাঁ দিকের পথ ধরে এখন চলে যাচ্ছে।

সারুয়ামারু বলল, হুই পক পক গাড়ি ছেড়ে দিল। ডিমাপুরে যাবে। সেখানে আর এক রকম গাড়ি আছে। বড় বড় ঘর, অনেক লম্বা। তার নাম রেলগাড়ি।

আঁকাবাঁকা পথ। উঁচুনিচু। চড়াই আর উতরাই-এর ধারে ধারে পাইনের সারি। পথের দু’পাশে সুন্দর সুন্দর বাড়ি। ওপরে ঢেউটিন কি টালির চাল। ইটের দেওয়াল। বাড়ির সীমানা ছোট ছোট গাছ আর লতাকুঞ্জ দিয়ে ঘেরা।

সেঙাই বলল, এখানকার কেসুঙগুলো ভারি সুন্দর।

হু-হু। এ কি আর তোর কেলুরি বস্তির কেসুঙ। এ হল শহর কোহিমা। সারুয়ামারু হাসল। এই শহরের যত মহিমা, যত গৌরব, যত মাধুর্য সব যেন সারুয়ামারুর সেই হাসিতে ফুটে বেরুল। এই শহরের মহিমায় যেন তারও একটা গৌরবময় ভূমিকা রয়েছে।

অনেক পথ, অনেক বাঁক, অনেক বিচিত্র মানুষের জটলা, অনেক দুর্বোধ্য কোলাহল পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত একটা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল সেঙাই আর সারুয়ামারু।

সেঙাই বলল, তোর হুই গাড়ি-আনিজার নামে বস্তিতে ফিরে একটা মুরগি বলি দেব।

চুপ, চুপ।

চুপ কেন রে শয়তানের বাচ্চা? সেঙাইর দুটো ছোট ছোট চোখ জ্বলতে লাগল।

এটা তোর কেলুরি বস্তি নয়। এটা হল কোহিমা শহর। তোর হুই মুরগি বলি দেবার কথা শুনতে পাবে ফাদার। ফিসফিস গলায় বলল সারুয়ামারু, হুই দ্যাখ, হুই যে পুলিশ। ওদের হাতে বন্দুক রয়েছে। এক গুলিতে সাবাড় করে দেবে। অমন কথা আর বলিস না।

সামনের দিকে তাকাল সেঙাই। চোখে পড়ল পরিষ্কার সুদৃশ্য একটি বাড়ি। ওপরে ঢেউটিনের চাল। চারপাশে নানা রঙের অচেনা বাহারি ফুল ফুটে রয়েছে। সামনে নিরপেক্ষভাবে ছাঁটা ঘাসের জমি। সেই ঘাস সবুজ, কোমল আর সতেজ।

দরজার সামনে বিরাট জটলা। পায়ের পাতা পর্যন্ত ঢোলা সাদা কাপড় পরেছে কেউ কেউ। (এর আগে সারপ্লিস দেখেনি সেঙাই)। আচমকা সেঙাইর চোখ দুটো কতকগুলো মানুষের মুখের দিকে আটকে গেল। গায়ের রং ধবধবে সাদা। নীল চোখ। তাদের ঘিরে ধরেছে অনেক পাহাড়ী মানুষ। আর একপাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে আরো কয়েকটা লোক। তাদের সকলের একই রকম পোশাক, হাতে একই রকমের বন্দুক। (একটু আগেই বন্দুকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে সারুয়ামারু)।

সারুয়ামারু বলল, ওরা হলো আসা (সমতলের লোক)। দেখছিস না বন্দুক হাতে রয়েছে। ফাদার বলে, ওরা ভারি শয়তান। আমাদের পাহাড়ী মানুষদের ওরা বড় মারে।

হু-হু–মারলেই হল! বর্শা দিয়ে কুঁড়ে ফেলব না।

চুপ, চুপ–

হঠাৎ ঘাসের জমির ওপাশ থেকে একটা খুশি খুশি কণ্ঠস্বর ভেসে এল, আরে সারুয়ামারু যে। এসো, এসো–

মানুষটা সামনে এসে দাঁড়ল। ধবধবে সাদা রং। তাজ্জব বনে গেল সেঙাই। তাদের ভাষা কী চমৎকারই না রপ্ত করেছে বিস্ময়কর লোকটা।

সারুয়ামারু বলল, গুড নাইট ফাদার—

হা হা করে হেসে উঠল পাদ্রীসাহবে, নাইট কোথায়? এখনও তো বিকেল হতে অনেক দেরি।

থতমত খেয়ে চুপ করে রইল সারুয়ামারু। যে ইংরেজি শব্দ দু’টি সগৌরবে সে সঞ্চয় করে রেখেছিল এবং যার জন্য তার রীতিমতো গর্ব ছিল, তার প্রয়োগে এত বড় ভুল হয়ে যাবে, এ কী জানত সে?

হু-হু, মাথা নাড়ল সারুয়ামারু।

পাদ্রীসাহেব সেঙাইকে দেখিয়ে জিগ্যেস করল, এ কে সারুয়ামারু?

এ হল সঙাই। তোর কাছে যে সিজিটো কাজ করে, তার ছেলে। সেঙাইকে এখানে নিয়ে এলাম ফাদার। সোজাসুজি পাদ্রী সাহেবের দিকে তাকাল সারুয়ামারু।

বাঃ, ভালো ভালো। এসো সেঙাই, এসো।

তিনজনে ঘাসের সবুজ জমিটায় চলে এল। একপাশে কাঠের ক্রস খাড়া হয়ে রয়েছে। ঝকঝকে সাদা রং। মানবপুত্র একদিন ক্রুশবিদ্ধ তার হয়ে পুণ্যশোণিতে এই পাপময় পৃথিবীকে স্নান করিয়েছিলেন। এই ক্রস তারই পবিত্র স্মরণচিহ্ন।

বিকেলের রং আরো ঘন হয়েছে। পশ্চিমের পাহাড়চূড়ায় স্থির হয়ে রয়েছে সূর্যটা। বিকেলের সূর্য, রক্তলাল।

কাঠের একটা বেঞ্চের ওপর জাঁকিয়ে বসেছে সারুয়ামারু। সেঙাইর দিকে তাকিয়ে সে বলল, বোসো সেঙাই।

একপাশে বর্শাটা রাখতে রাখতে সেঙাই বলল, বসব?

হু-হু। এটা তো বসবার জন্যেই। তুই কিছুই জানিস না। এটা কেলুরি বস্তি নয়। হু-হু–এটা কোহিমা শহর। শহরের আদবকায়দা সম্বন্ধে আর একবার জ্ঞান দান করল সারুয়ামারু।

ইতিমধ্যে একখানা চেয়ার এনে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসেছে পাত্রীসাহেব। তার সঙ্গে এসেছে একটা পাহাড়ী চাকর। চাকরটার হাতে নানা ধরনের কাপড় আর অনেক রকমের খাবার। পাদ্রীসাহেব চাকরটার হাত থেকে খাবার আর কাপড়গুলো তুলে নিয়ে সেঙাইর দিকে বাড়িয়ে দিল, এই নাও সেঙাই। এগুলো তোমাকে দিলাম। কাপড় পরবে আর খাবারগুলো খাবে। কেমন?

বেঞ্চের ওপর বসে পড়েছিল সেঙাই। তার একেবারে স্পর্শের সীমানায় অদ্ভুত এক মানুষ। ধবধবে গায়ের রং। চোখের মণি নীল। পাহাড়ী সেঙাই-এর কাছে এই মুহূর্তে এই পাদ্রীসাহেবটি বড় অবিশ্বাস্য মনে হল। মনে হল, বেলাশেষের এই হলুদ রোদে কোহিমা শহরের এই সবুজ ঘাসজমি থেকে পাদ্রীসাহেব এক ভোজবাজিতে যে-কোনো সময় মিলিয়ে যেতে পারে। স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে তাকে।

পাত্রীসাহেব সস্নেহে বলল, নাও সেঙাই। লজ্জা কী?

এবার সারুয়ামারুর দিকে তাকাল সেঙাই। পাদ্রীসাহেবের দেওয়া উপহার নেবে কি নেবে, বুঝে উঠতে পারছে না। সারুয়ামারু প্রেরণা দিতে শুরু করল। উৎসাহ দেবার সুরে বলল, নে, নে সেঙাই। ফাদার ভালোবেসে দিচ্ছে। এমন কাপড় জন্মেও দেখিসনি। এমন খাবার। কোনোদিন খাসনি।

কুণ্ঠিত ভঙ্গিতে একটা হাত বাড়িয়ে কাপড় আর খাবার নিল সেঙাই। তারপর ফিসফিস করে পাত্রী সাহেবকে বলল, সম্বরের ছাল আনিনি, বাঘের দাঁত আনিনি, বর্শা আনিনি। কিছুই তো আনতে দিল না সারুয়ামারু। কী দিয়ে বদল করব?

কিছু দিতে হবে না। সাদা মুখখানার ওপর অপরূপ হাসি ছড়িয়ে পড়ল পাদ্রীসাহেবের। পরম বাৎসল্যে চোখ দুটো তার ভরে গিয়েছে, আমি এগুলো তোমাকে খুশি হয়ে দিলাম। আমাকে ফাদার বলে ডাকবে, বুঝলে?

হু-হু। ডাকবে বৈকি। সেঙাই-এর হয়ে সায় দিল সারুয়ামারু। দস্তুরমতে তৎপর হয়ে উঠেছে সে। বেঞ্চ থেকে উঠে পাদ্রীসাহেবের গা ঘেঁষেঅন্তরঙ্গ হয়ে দাঁড়াল। বলল, একশো বার ডাকবে ফাদার বলে।

সেঙাই বলল, আমার বাপ আর মা কই?

সিজিটো আর তার বউ তো?

হু-হু।

তারা গ্রিফিথ সাহেবের সঙ্গে গুয়াহাটি গিয়েছে। দু-চার দিন বাদে ফিরবে। তুমি এই চার্চে থাকো কয়েকদিন। ওরা ফিরলে দেখা কোরো। এবার পাদ্রীসাহেব তাকাল সারুয়ামারুর দিকে, তারপর তোমাদের বস্তির খবর কী সারুয়ামারু? আমরা যে একবার যাব তোমাদের গ্রামে। সদারকে বলেছ?

সারুয়ামারুর মুখেচোখে বিষাদ ঘনিয়ে এল, বলেছিলাম। কিন্তু সদ্দার রাজি হচ্ছে না একেবারেই।

টাকা দেব অনেক।

তাতেও রাজি নয়। সেঙাইকে জিগ্যেস করে দ্যাখ।

পাদ্রীসাহেবের সারা মুখে হাসির আলো ছড়িয়ে ছিল। অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মতো হাসিটিও যেন তার সঙ্গে জন্ম নিয়েছে। সারুয়ামারুর কথাগুলো শুনতে শুনতে হাসি মুছে গেল। এতক্ষণ বোঝা যায়নি, এবার মনে হল, পাদ্রীসাহেবের সাদা মুখখানা ঘিরে মাকড়সার জালের মতো অজস্র কালো কালো রেখার আঁকিবুকি। যেন কতকগুলো সরীসৃপ কিলবিল করে বেড়াচ্ছে। শান্ত সুন্দর পবিত্র মুখখানার আড়াল থেকে একটা ভয়ঙ্কর মুখ কালো কালো রেখার টানে ফুটে বেরুচ্ছে। একটু আগের স্নিগ্ধ মুখখানার সঙ্গে এ মুখের বিন্দুমাত্র মিল নেই।

গম্ভীর মুখে পাদ্রীসাহেব বলল, হু। তারপর মনে মনে একটা অ-মিশনারিসুলভ গালাগালি আউড়ে সঙ্গে সঙ্গে কপাল-বুক বাহুসন্ধি ছুঁয়ে ক্রস করল। আশ্চর্য সংযম। সে খিস্তিটা জিভ থেকে পিছলে সেঙাইদের কান পর্যন্ত পৌঁছুল না। অবশ্য পৌঁছুলেও বিশেষ কোনো আশঙ্কার হেতু থাকত না। কারণ শব্দগুলো বিশুদ্ধ ইংরেজি। সেঙাইদের কাছে নিতান্তই দুর্বোধ্য।

পাদ্রীসাহেব এবার কটমট করে তাকাল সারুয়ামারুর দিকে, কেন, কী জন্যে তোমাদের বস্তিতে যেতে দেবে না সর্দার?

আমি বললাম, ফাদার মুরগি-শুয়োর বলি দিতে দেবে না। ক্রস আঁকতে হবে, যীশু-মেরী বলতে হবে–তাতে সদ্দার রাজি নয়। আমাকে তো বর্শা নিয়ে তেড়ে উঠেছিল। আর শাসিয়ে দিয়েছিল, তোর ফাদার বস্তিতে এলে জান নিয়ে ফিরতে হবে না। অপরাধী গলায় কথাগুলো বলে চুপ করে গেল সারুয়ামারু।

হু-হু–ঘন ঘন মাথা দোলালো সেঙাই। ভয়ানক উত্তেজিত হয়ে উঠেছে সে। বলল, হু-হু, আমাদের বস্তিতে হুই সব চলবে না। সদ্দার বলে দিয়েছে, সিধে কথা।

তির্যক চোখে একবার সেঙাইকে দেখল পাদ্রীসাহেব। তারপর সারা মুখ থেকে মাকড়সার জালটাকে মুছে ফেলল। কী এক মহিমায় হাসির চেকনাই ফুটিয়ে বলল, আচ্ছা আচ্ছা, সেসব কথা পরে হবে। এখন খাবার খাও। এতটা পথ এসেছ, অনেক কষ্ট হয়েছে। এই সারুয়ামারু, তুমি সেঙাইকে সিজিটোর ঘরে রেখে এসো। তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে।

সেঙাইকে নিয়ে সারুয়ামারু ডান দিকের পাথুরে পথটা ধরল।

বেতের চেয়ারখানায় বসে পাদ্রীসাহেব ভাবতে লাগল। এই পাহাড়ী পৃথিবী। ইনফিডেল আর আইডোলেট্রির দেশ। ঘন অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে পথে কেটে কেটে ক্রিশ্চানিটির আলোকিত রাজপথে এদের তুলে নিয়ে যেতে হবে। সে মিশনারি। অল্পে বিচলিত হলে চলবে না। এই পাদ্রী জীবনের নেপথ্যে যে তার একটি ভয়াল জীবন ছিল, সেই জীবনের ধূসর বাঁকে বাঁকে সব অসংযম, সব বিভ্রান্তি, সব উত্তেজনাকে নির্বাসন দিয়ে আসতে হয়েছে। সন্স অব সিনার্সদের এই পঙ্কিল পৃথিবীতে একটি শ্বেতপদ্ম ফুটিয়ে তুলবে সে, ফুটিয়ে তুলবে একটি ধ্রুবলোক। সেই শ্বেতপদ্মের নাম, সেই ধ্রুবলোকের নাম হল যীশু। নিজের রক্তে পৃথিবীর সব গ্লানি, সব অপরাধ তিনি শোধন করে দিয়ে গিয়েছিলেন।

পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি ভাবল, এত বড় লক্ষ্য নিয়ে যে এখানে এসেছে, তার অন্তত সহজে উত্তেজিত হওয়া চলে না।

একটু আগে বিড় বিড় করে একটা কদর্য গালাগালি উচ্চারণ করেছিল, সেজন্য এখন অনুতাপ হচ্ছে কি? স্নায়ুগুলো পীড়িত হচ্ছে? একটি মাত্র কর্তব্যের প্রেরণায় সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইন্ডিয়ার এই পাহাড়ে এসে উঠেছে। এক গোলার্ধ থেকে একেবারে অন্য এক গোলার্ধে। বেথেলহেমের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে এই দেশের আকাশে স্থির করে রেখে যেতেই এই পাহাড়ে অরণ্যে সে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মানবপুত্রের কল্যাণময় নামকে এদেশের মানুষগুলোর শিরায় শিরায় রক্তকণার মতো ছড়িয়ে না দেওয়া পর্যন্ত তার স্বস্তি নেই।

ভাবনাটা হঠাৎ এলোমেলো হয়ে গেল পাদ্রীসাহেবের। সামনে এসে দাঁড়িয়েছে সারুয়ামারু। পাদ্রীসাহেব বলল, সিজিটোর ঘরে রেখে এসেছ তো সেঙাইকে?

হু-হু।

বোসো। তারপর বল তোমাদের বস্তির খবর কী? অনেকদিন তোমাকে বলেছি। এবার সেখানে আমার যাওয়ার একটা ব্যবস্থা কর। শুধু শুধু রক্তারক্তি হবে, এ আমি চাই না। আমি মিশনারি। অনেক টাকা দেব তোমাদের। যা চাও, সব মিলবে। খালি তোমাদের খ্রিস্টান হতে হবে। একটু থামল পাদ্রীসাহেব। খানিক বাদে ফের বলতে শুরু করল, যাক, এর মধ্যে শুয়োর বলি দাওনি তো? ক্রস এঁকেছ? যীশু-মেরীর নাম জপেছ?

সারুয়ামারু বলল, হু-হু, সব করেছি। তবে লে কেফু মাসে সূর্যের নামে একটা মুরগি বলি দিয়েছিলাম।

নাঃ! সংযমকে আর বাঁধ দিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ধৈর্য প্রশান্তি সহিষ্ণুতা, এগুলোর একটা সীমা আছে। এই পাপাচারী পাহাড়ীগুলোর বিবেক বলে কি আউন্সখানেক পদার্থও নেই! তোতাপাখির মতো সে এই সারুয়ামারুকে পড়িয়েছে। আনিজার নামে কোনো প্রাণীহত্যা করা চলবে না। দু’টি বছর ধরে এই বুনো শয়তানের মনটাকে কত কসরতে, কত যত্নে এই প্যাগান পৃথিবী থেকে বেথেলহেমের দিকে নিয়ে যাবার চেষ্টা করেছে পাদ্রীসাহেব। কিন্তু পাদ্রী হলেও সে মানুষ তো। ছটা রিপুর স্লেভ। চাপা গলায় তর্জন করে উঠল, ডেভিলস, সন্স অব বিচ

পাদ্রীসাহেবের গালাগালির মহিমা আছে। এত আস্তে, মুখের রেখাগুলিকে এতটুকু বিকৃত না করে গালাগালিটা সে উচ্চারণ করে, যাতে মনে হয় বুঝিবা পবিত্র প্যারাবল্ আওড়াচ্ছে।

ঠিক এমন সময় এল আর একজন মিশনারি। তার দিকে তাকিয়ে পাত্রীসাহেব উত্তেজিত হয়ে উঠল, এই যে পিয়ার্সন, দেখ–জাস্ট সী–এত করে বুঝিয়েছি, তবু ঠিক আনিজার নামে একটা মোরগ বলি দিয়ে বসে আছে। এত টাকা খরচ, এত পরিশ্রম জলে যাচ্ছে। এই বুনন পাহাড়ে এক্সাইলড হয়ে থাকার তবে অর্থ কী, একটা লোকও যদি ঠিকমতো ব্যাপটাইজড না হল!

মেজাজটা একেবারে খিঁচড়ে গিয়েছে পাদ্রীসাহেবের। বার বার তার সোনাবাঁধানো গজদাঁতটা আত্মপ্রকাশ করতে লাগল। পাদ্রীসাহেব দুজন কী এক দুর্বোধ্য ভাষায় কথা বলছে, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছে সারুয়ামারু। ওদের ভাবগতিক বিশেষ সুবিধের মনে হচ্ছে না। সারুয়ামারু কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করতে লাগল।

পিয়ার্সন মিটিমিটি হাসছিল। মাত্র কিছুদিন আগে কোহিমা শহরে এসেছে। বছর পঁচিশ বয়স। সোনালি চুল বাতাসে উড়ছে। চোখের ঘন নীল মণিতে মহাসাগরের আভাস। থরে থরে পেশী বুক তার বাহুসন্ধির দিকে উঠে গিয়েছে। সারা দেহের ওপর সাদা সারপ্লিসটা যেন বড় বেমানান, বড় বেখাপ্পা দেখায়। সাড়ে ছ ফিট লম্বা একটা ঋজু দেহ। মেরুদণ্ডটা সরলরেখায় মাথার দিকে উঠে গিয়েছে। কোহিমার পাহাড়ে অরণ্যে, মিশনারির নিরুত্তেজ জীবনের ভূমিকা তার কাছে যেন কৌতুকের অভিনয়মাত্র। মনে হয়, ওই সাদা সারপ্লিসটার মতোই এই জীবনটাকে ঝেড়ে ফেলে আকাশ ফাটিয়ে হো হো করে হেসে উঠতে পারে পিয়ার্সন। ইংলন্ডের কোনো এক ডিউক পরিবারের ছেলে সে। কী এক দুর্বোধ্য খেয়ালে, কী এক দুর্নিবার কৌতুকে মশগুল হয়ে চার্চে চলে গিয়েছিল। কেন্দ্রিজ য়ুনিভার্সিটি থেকে সরাসরি চার্চের অলটার। সেখান থেকে মহাসমুদ্রের একটা উদ্দাম ঢেউয়ের মতো আছড়ে এসে পড়েছে কোহিমার পাহাড়ে।

এখনও সমানে মিটিমিটি হেসে চলেছে পিয়ার্সন।

এবার বিরক্ত গলায় পাদ্রীসাহেব বলল, হোয়াট ডু য়ু মীন–হাসছ কেন? সিরিয়াস ব্যাপারে হাসি ভালো না পিয়ার্সন।

আই অ্যাডমিট মিস্টার ম্যাকেঞ্জি। হাসিটা আঠার মতো এখনও আটকে রয়েছে পিয়ার্সনের পুরু রক্তাভ ঠোঁটে।

ভ্রূ দুটো কাঁকড়াবিছার মতো কুঁকড়ে গেল পাদ্রী ম্যাকেঞ্জির। বলল, তোমাকে অনেকবার বলেছি, আমাকে ফাদার বলে অ্যাড্রেস করবে। এটা চার্চের নিয়ম। বাট সরি টু ওয়ার্ন–তুমি সে নিয়ম মানছ না।

পারডন। আর এমনটি হবে না। হাসিটা এখনও স্থির হয়ে রয়েছে পিয়ার্সনের ঠোঁটে।

ম্যাকেঞ্জি স্থির দৃষ্টিতে পিয়ার্সনের দিকে তাকাল। ভাবখানা, ভবিষ্যতে দেখা যাবে। বলে উঠল, তুমি বিশেষ কাজকর্ম করছ না। প্রিচিঙ-এর জন্যে এত টাকা খরচ হচ্ছে এই পাহাড়ে। তোমার সেদিকে খেয়াল নেই। তুমি খালি পাহাড়-পর্বত আর ফলস্ দেখে বেড়াচ্ছ।

মুগ্ধ গলায় পিয়ার্সন বলল, বাট ইউ মাস্ট অ্যাডমিট, ভারি সুন্দর এই নাগা পাহাড়।

একটা ভ্রুকুটি ফুটে বেরুল ম্যাকেঞ্জির মুখে, ভুলে যেয়ো না পিয়ার্সন, ইউ আর নট আ পোয়েট, বাট আ মিশনারি। কাব্য করার জন্যে এখানে তুমি নিশ্চয়ই আসোনি। এই তো এতদিন এসেছি আমরা, একটা খাঁটি ক্রিশ্চান করতে পেরেছি! ডেটারমিনেশন থাকা উচিত আমাদের।

আক্ষেপ করে একটু থামল ম্যাকেঞ্জি। এই আক্ষেপ আর থামার মধ্যে যেন আত্মদর্শন হল তার। তারপরেই বলতে শুরু করল, তোমার আর কী। ডিউক ফ্যামিলির ছেলে। একটা হুইমের ঝোঁকে এ লাইনে এসে পড়েছ। ভালো না লাগলে ছেড়ে পালাবে। কিন্তু আমরা এসেছি একটা ইন্সপিরেশনের তাড়নায়, একটা ভিসনের প্রেরণায়। ক্রিশ্চানিটির আলো দিয়ে পৃথিবী থেকে প্যাগানদের আর আইডোলেট্রিকে ভাগাতে হবে। আর একটা ডেলুজ আসার আগেই আমাদের কর্তব্য হল পৃথিবীকে শুদ্ধ করে নেওয়া। ইট জি নিদার আ হুইম নর আ গেম অব একসেনট্রিসিটি। এর নাম সাধনা। মানুষকে কুসংস্কার থেকে মুক্তি দিতে হবে। টু রিডিম—

হঠাৎ গম্ভীর হল পিয়ার্সন। থমথমে গলায় বলল, কিন্তু আমার মনে হয় এ প্রিচিঙের কোনো দাম নেই, কোনো প্রয়োজন নেই। নিজেদের ধর্মের মধ্যেই এদের বাড়তে দেওয়া উচিত। তা হলেই যথেষ্ট উপকার করা হবে। আমার তো এই কদিন পাহাড়ে ঘুরে আর এই পাহাড়ীদের দেখে দেখে তাই মনে হল।

কানের ওপর যেন খানিকটা তরল সীসা ঢেলে দিয়েছে কেউ। প্রায় আর্তনাদ করে উঠল ম্যাকেঞ্জি, বলছ কী পিয়ার্সন! আমরা লোকের উপকারই করি। এতটা ফিলানথ্রপি কিন্তু বরদাস্ত করা যায় না। তা ছাড়া, এই মানুষগুলো শয়তানের শিকার হয়ে থাকবে! জানো তো, ব্রিটিশ রাইফেল যেখানে গেছে সেখানেই বাইবেল গিয়ে হাজির হয়েছে। রাইফেল-বাইবেলে মিলন না হলে পৃথিবীজোড়া রাজ্য করা সম্ভব হত আমাদের?

আপনি কী বলছেন ফাদার! আমরা মিশনারি, আমাদের সঙ্গে রাজ্য জয়ের সম্পর্কটা কী! বিস্ময়ে গলাটা যেন চৌচির হয়ে ফেটে পড়ল পিয়ার্সনের।

ঠিক যে দৃষ্টি দিয়ে দেখছ, তার উলটো দিকে থেকে ভাবতে হবে। আমরা আগে ব্রিটিশার, তারপরে মিশনারি। এটা ভুলো না।

থতমত খেল পিয়ার্সন। বলে কী ম্যাকেঞ্জি! সেসব এখন স্বপ্নের মতো মনে হয়। কেস্ট্রিজ য়ুনিভার্সিটির বিশাল চত্বর কাঁপিয়ে যখন তার সাড়ে ছ ফিট দীর্ঘ ঋজু দেহটা হাঁটত তখন মিশনারি জীবন সম্বন্ধে ধারণা অন্যরকম ছিল পিয়ার্সনের। শুদ্ধাচারে মানবপ্রেমে সে জীবন অপরূপ, ক্ষমাসুন্দর। মিশনারির মন, ভাবনা, ধারণা হবে ব্যাপক, উদার এবং পক্ষপাতহীন। মিশনারির পরিচয় হল মিশনারি। আর কিছু নয়। কিন্তু কোহিমার পাহাড়ে এসে মোহভঙ্গ হচ্ছে। পিয়ার্সনের। কাঁচের বাসনের মতো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে তার এতদিনের লালিত মিশনারি জীবনের সংজ্ঞাটা।

কঠিন গলায় পিয়ার্সন বলল, কিন্তু অপরের ধর্মে হাত দেওয়াটা কী ঠিক? সে আর এক ধরনের ইম্পিরিয়ালিজম।

নাঃ! কতক্ষণ আর সংযত হয়ে থাকা সম্ভব! হোক সে মিশনারি। ছয় রিপুর একটি মনের মধ্যে তুমুল হয়ে উঠল। ম্যাকেঞ্জির ভুরু দুটো কুঁচকে গেল। এই মুহূর্তে তার দুচোখে ভয়ানক এক ছায়া দেখল পিয়ার্সন।

মিশনারি! তাদের বাদবিতণ্ডা কিছুই বুঝতে পারছে না সারুয়ামারু। তবু তার মনে হল, বুনো বাঘকে নিরীহ হরিণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার সময় যেমন দেখায় ঠিক তেমনই দেখাচ্ছে। বড় পাদ্রী ম্যাকেঞ্জিকে। দেখতে দেখতে ভয়ে সে আড়ষ্ট হয়ে গেল।

একটু পরে ম্যাকেঞ্জি আর পিয়ার্সনের অজান্তে একপা দু’পা করে সিজিটোর ঘরের দিকে চলে গেল সারুয়ামারু।

তীক্ষ শাসানির গলায় ম্যাকেঞ্জি বলল, সেটা তোমার দেখবার কথা নয় পিয়ার্সন। না পোষালে তোমাকে হোমে পাঠিয়ে দিতে হবে। ইউ আর নো ডাউট, আ ভেরি ডেঞ্জারাস এলিমেন্ট। তোমাকে সাবধান করতে বাধ্য হচ্ছি, এসব ব্যাপার নিয়ে, এ জাতীয় কথা বলে পাহাড়ী মানুষগুলোকে বিষাক্ত কোরো না। এর রি-অ্যাকশন খুব খারাপ। ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের পক্ষেও ক্ষতিকর। তুমি ছেলেমানুষ, এখনও সমঝে চল। আগুন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি কোরো না।

থ্যাঙ্কস। চেষ্টা করব আপনর কথামতো চলতে।

ম্যাকেঞ্জির মনে হল, বিদ্রূপ করে চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো উচ্চারণ করল পিয়ার্সন। মনে হল, একরাশ তাচ্ছিল্য বুলেটের মতো এসে বিঁধল চোখেমুখে।

সামনের গেটে কাঁচ করে শব্দ হল। সেই সঙ্গে একজোড়া ভারী বুটের সদর্প আওয়াজ। এতক্ষণ মুখখানা একটা প্যাচার মতো কুটিল, ভয়ানক আর গম্ভীর হয়ে ছিল। হঠাৎ দম-দেওয়া পুতুলের মতো লাফিয়ে উঠল ম্যাকেঞ্জি। হাসল। বলল, গুড ডে মিস্টার বসওয়েল। আসুন, আসুন।

সাদর অভ্যর্থনায় গদগদ হয়ে উঠল ম্যাকেঞ্জি।

গুড ডে ফাদার। উদ্ধত বুট জোড়া পাথরের ওপর খট খট শব্দ করতে করতে সামনে এসে পড়ল।

মিস্টার বসওয়েলের মুখখানা বিরাট আর ভয়ঙ্কর। উদ্ধত চোয়াল সামনের দিকে ঠেলে বেরিয়ে আছে। দু’টি কপিশ চোখ। ভুরুর রোমশ মাংস চোখ অনেকটা ঢেকে রেখেছে। কপালের অজস্র ক্ষতচিহ্ন মুখটাকে ভীষণ করে তুলেছে। সামনের বেঞ্চখানায় বসতে বসতে বসওয়েল বলল, সাম্প্রতিক খবর ফাদার। সারা ভারতবর্ষে আন্দোলন শুরু হয়েছে। দ্যাট গ্যান্ডি হাফ-নেকেড ম্যান, লোকটা জাদু জানে। একেবারে ভেলকি লাগিয়ে দিয়েছে। ইন্ডিয়ার মাটি থেকে ব্রিটিশ রুল ওভারথ্রো করে ছাড়বে, এমন মতলব। নেটিভগুলো খেপে উঠেছে।

কী সর্বনাশ! চমকে সটান খাড়া হল পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি, এখানকার খবর কী? আপনি তো পুলিশ সুপার। কোনো গণ্ডগোল হবে না তো?

একটু হাসল মিস্টার বসওয়েল। সেই হাসি তার বিশাল মুখখানায় ভয়াল ক্রুরতা ফুটিয়ে তুলল, সেই জন্যেই তো আসা। আমি জানি কেমন করে এই আন্দোলনকে রাইফেলের মুখে উড়িয়ে দিতে হয়। সারা ইন্ডিয়ার অ্যাজিটেশন ঠাণ্ডা করতে চারটে ঘণ্টাও পুরো লাগে না। ওনলি ইন্ডিসক্রিমিনেট ফায়ারিং। যাক, যে কথা বলতে এসেছি ফাদার, আপনার খানিকটা হেল্প চাই–

সার্টেনলি–বলুন—

দেখুন, প্রথম প্রথম রক্তারক্তি আমি চাই না। তবে প্রয়োজন হলে–আমিও ফার্স্ট গ্রেট ওয়ার-ফেরত লোক। ইফ নেসেসিটি কমপেলস–তা হলে এই পাহাড়ীদের দাঁড় করিয়ে ওদের ওপর আমি বেয়োনেট প্র্যাকটিশ করাব। পুলিশ সুপার মিস্টার বসওয়েল প্রথম মহাযুদ্ধ ফেরত ক্যাপ্টেন। মেসোপটেমিয়া আর পানামা ক্যানেলের ওপর অজস্র রক্ত ঝরতে দেখেছে। অন্তত মানুষের প্রাণের জন্য তার মনের কোথায়ও একবিন্দু করুণা কি স্নেহ আছে, এমন একটা অপবাদ কেউ দিতে পারবে না। মানুষের রক্তে রক্তে, মেশিনগান আর অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট গানের গর্জনে প্রথম মহাযুদ্ধ তার মন থেকে স্নেহ মমতা ভালোবাসা দয়া প্রীতি নামে ললিত বৃত্তিগুলিকে বাষ্পের মতো উড়িয়ে দিয়েছে। এই মুহূর্তে একটা রাক্ষসের মতো দেখাচ্ছে বসওয়েলকে। তার মুখখানা ঝুঁকে পড়ল পাদ্রী ম্যাকেঞ্জির কানে, আই অ্যাডমিট ফাদার। ওই হাফ-নেকেড গ্যান্ডির ক্ষমতা আছে। পাহাড়-বন ডিঙিয়ে নন-কো-অপারেশনের ঢেউ এসে পড়েছে এই কোহিমা শহরে। বাট, আই অ্যাম বসওয়েল। ফার্স্ট গ্রেট ওয়ার আমি দেখেছি। ম্যাসাকার, ডেস্ট্রাকশন, আউটরেজ–এগুলোর মধ্যে আমি আনন্দ পাই, আমার স্পোর্টিং স্পিরিটকে খুঁজে পাই। অন্তত আমার কোনো সফটনেস নেই। থাকতে পারে না। দরকার হলে–

কথা শেষ না করেই গর্জে উঠল বসওয়েল।

একপাশে একটা পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে পিয়ার্সন। সেদিকে এতটুকু নজর নেই। আশঙ্কায় থর থর কাঁপছে ম্যাকেঞ্জির গলা, ইয়েস, গ্যান্ডির নাম আমি শুনেছি, লোকটা সত্যি জাদু জানে। কিন্তু এই কোহিমা শহরে হঠাৎ কী হল মিস্টার বসওয়েল?

যা হবার হয়েছে। এই আনসিভিলাইজড ওয়াইল্ড পাহাড়ীগুলো পর্যন্ত কনশাস হয়ে উঠেছে। ওই যে ছুকরি গাইডিলিও, দ্যাট উইচ গ্যান্ডির কথা বলে, স্বাধীনতার কথা বলে পাহাড়ীগুলোকে খেপিয়ে তুলছে। আর একটু ল্যাটিচ্যুড আমি দেব। আর একটু দৌড় আমি দেখব। তার হাতের মোটা রোমশ আঙুলগুলো বাতাসে কী যেন আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করছে। বার বার বিরাট, কঠিন মুঠিটা পাকিয়ে পাকিয়ে আসছে। হয়তো গাইডিলিওর কল্পিত মুণ্ডুটা গুড়ো হয়ে যাচ্ছে তার মুঠির মধ্যে, আমি অবশ্য কড়া নজর রেখেছি, যাতে প্লেনসম্যানরা এখানে এসে এই পাহাড়ীদের তাতিয়ে তুলতে না পারে। কোহিমার ওপাশে ডিমাপুরের দিকে রাস্তায় চেকপোস্ট বসিয়ে দিয়েছি। একটু থেমে বসওয়েল বলল, আপনাকে এটা কাজ করতে হবে ফাদার–

উৎসুক চোখে তাকাল পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি, কী কাজ?

ওই গাইডিলিওর অনেক ফলোয়ার, অনেক ভক্ত। উইচক্র্যাফট দেখিয়ে অনেক লোক দলে জুটিয়ে নিয়েছে শয়তানীটা। যেমন করে গোপন মন্ত্রদান করা হয় ঠিক তেমন ভঙ্গিতেই। ফিসফিস গলায় কথাগুলো বলল মিস্টার বসওয়েল। পাদ্রীর কানে নতুন ধরনের প্যারা আওড়াল, আপনারও তো অনেক ব্যাপটাইজড নাগা আছে।

আছে।

আপনি তাদের দিয়ে রটিয়ে দিন, গাইডিলিও একটা ডাইনি। গ্রামে গ্রামে হেডম্যানদের হাত করে নিতে হবে। যত টাকা দিতে হয় গভর্নমেন্ট কসুর করবে না। এই অ্যাজিটেশন ভেঙে তছনছ করে দিতে হবে। সমতলের বাসিন্দারা এই হিলি বিস্টগুলোর সঙ্গে মিললে আমাদের খুবই ক্ষতি হয়ে যাবে ফাদার। বাট ডোন্ট ফরগেট ইয়োর নিউ ডিউটি, আজ থেকেই গাইডিলিও সম্বন্ধে প্রচার করে দিনও একটা ডাইনি। একটু একটু করে মুখখানা ভয়ানক হয়ে উঠল পুলিশ সুপার বসওয়েলের।

এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল পিয়ার্সন। অস্বাভাবিক তীক্ষ্ণ গলায় এবার সে বলল, সে কী কথা! শী ইজ আ গুড পায়াস গার্ল, আই নো। এ ভারি অন্যায়। ভারি অন্যায়।

কী অন্যায়? বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো ঘুরে বসল বসওয়েল।

হোয়াট ডু ইউ মীন? চোখের মণিদুটো নীল আগুনের বিন্দু হল পাদ্রী ম্যাকঞ্জির।

আমি বলছি একজনের নামে মিথ্যে অ্যাসপার্স করা কি ঠিক? অত্যন্ত শান্ত গলায় পিয়ার্সন বলল।

বসওয়েল হাসল। দু’পাটি কদাকার দাঁত অদ্ভুতভাবে আত্মপ্রকাশ করল। পিয়ার্সনের পিঠে মৃদু একটা চাপড় দিয়ে বলল, ইউ আর টু ইয়াং। আমাদের ধর্মের সঙ্গে রাজ্য বিস্তারের সম্পর্ক আছে ফাদার। সেটা এখন আপনি বুঝতে পারবেন না। ইয়াংম্যান, রক্ত এখন গরম। পুঁথিপড়া বিশ্বপ্রেম মনের মধ্যে টগবগ করছে। আই ক্যান অ্যাসিওর, ওসব ফিলানথ্রপি বেশিদিন থাকবে না। আচ্ছা, গুড ডে। আমাকে আবার গাইডিলিওর ওখানে লোক মোতায়েন করতে হবে।

সতেজ সবুজ ঘাসের জমি পেরিয়ে গেটটার কাছে চলে এসেছে পুলিশ সুপার বসওয়েল। তার পিছু পিছু বড় পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি। বসওয়েল চওড়া কাঁধখানা ঘুরিয়ে বলল, এই ইয়াং মিশনারিকে এখান থেকে সরাতে হবে ফাদার। নইলে আমাদের পক্ষে বড় ক্ষতি হবে।

ইয়েস, একটা শয়তান। এর ওষুধ আমি জানি। নিচের দাঁতগুলোর ওপর ওপরের পাটিটা নির্মমভাবে চেপে বসল পাদ্রী ম্যাকেঞ্জির। আশ্চর্য সংযম। এতটুকু শব্দ হল না। শুধু চাপা। বীভৎস গলায় সে বলল, আপনি কিছু ভাববেন না। সব ব্যবস্থা আমি করব। আমার দেশের, আমার গভর্নমেন্টের ইন্টারেস্ট আগে দেখতে হবে।

ক্যাঁচ করে শব্দ হল লোহার গেটটায়। বাইরে বেরিয়ে গেল বসওয়েল। সবুজ ঘাসের জমিটা থেকে তীক্ষ্ণ ধারাল দৃষ্টিতে ম্যাকেঞ্জির দিকে তাকিয়ে রয়েছে পিয়ার্সন, পলক পড়ছে না। চোখজোড়া যেন জ্বলছে।

২৫. বেলাশেষের বিষণ্ণ রোদ

২৫.

পশ্চিমের পাহাড়চূড়ায় বেলাশেষের বিষণ্ণ রোদ আটকে রয়েছে।

সিজিটোর ঘরে এল সারুয়ামারু। একপাশে বাঁশের একটা মাচান। তার ওপর সেঙাই বসে রয়েছে। এর মধ্যে খাবারগুলো শেষ করে ফেলেছে সে।

ঘরের মধ্যে আবছা অন্ধকার।

সারুয়ামারু বলল, কি রে সেঙাই, সব খাবার গিলেছিস? আমার জন্যে রাখিসনি?

না, সব খেয়ে ফেলেছি। বড্ড খিদে পেয়েছিল।

হু-হু, ঠিক আছে। ফাদারের কাছ থেকে আবার চেয়ে নেব’খন।

সারুয়ামারু বলল, চল, কোহিমা শহর তোকে ঘুরিয়ে আনি। মাধোলাল মাড়োয়ারির দোকান, ভূষণ ফুকনের দোকান-যেখান থেকে আমরা নিমক নিই, সব দেখিয়ে আনব। তোকে। সমস্ত কিছু চিনিয়ে দেব।

এবার উৎসাহিত হয়ে উঠল সেঙাই। মাচান থেকে লাফিয়ে নিচে নামল, সেই যে বলেছিলি, রানী গাইডিলিও বলে কে আছে, তাকে দেখাবি না? তুই বলেছিলি, তার ছোঁয়ায় নাকি সব রোগ সেরে যায়। তামুন্যুর (চিকিৎসক) চেয়েও সে বড়। সদ্দার তাকে দেখে যেতে বলেছে।

হু-হু, নিশ্চয়ই দেখাব। চল, বেরিয়ে পড়ি।

চার্চের সামনে সবুজ ঘাস-জমিটার কাছাকাছি আসতেই পেছন থেকে একটা ডাক ভেসে এল। নির্ঘাত পাত্রীসাহেব। ফিরে তাকাল দুজন।

এই সারুয়ামারু, এই সেঙাই–কোথায় যাচ্ছ তোমরা?

ঘাস-জমির ওধারে বেতের চেয়ারে বসে হোলি বাইবেলের বিশেষ একটা অধ্যায়ে মনটাকে ডুবুরির মতো নামিয়ে দিয়েছিল পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি। সেঙাইদের বেরুতে দেখে মুখ তুলল।

গুটি গুটি সামনে এসে দাঁড়াল সারুয়ামারু। ফিসফিস গলায় বলল, সেঙাইকে একটু শহর দেখাব। হুই মাধোলালের দোকান যেখান থেকে আমরা নিমক নিই, সেই আস্তানাটাও দেখিয়ে দেব। দরকার হলে বস্তি থেকে এসে ও নিমক নিয়ে যাবে।

আর কোথায় যাবে? উৎসুক চোখে তাকাল ম্যাকেঞ্জি।

আর হুই যে রানী গাইডিলিও আছে, তাকে একবার দেখব।

রানী গাইডিলিও! সাপের ছোবল পড়ল যেন ম্যাকেঞ্জির কানে। হাতের বাইবেলখানা সশব্দে বন্ধ করে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল সে, খবরদার, ওদিকে কেউ যাবে না। গাইডিলিও একটা ডাইনি। সর্বনাশ করে ছাড়বে।

ডাইনি! চমকে উঠল সারুয়ামারু। তার মুখেচোখে একটা সন্ত্রস্ত ছায়া পড়ল।

ইতিমধ্যে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সেঙাই। সেও বলল, ডাইনী!

হ্যাঁ—হ্যাঁ–লালচে চুল ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে, কটা চোখের মণি ঘুরিয়ে দু’টি পাহাড়ী মানুষকে যাচাই করতে লাগল ম্যাকেঞ্জি। ডাইনি! দেখতে লাগল, ওই একটি শব্দ কেমন করে তাদের মুখেচোখে কী প্রতিক্রিয়া ফুটিয়ে তুলছে। নিপুণ শিল্পীর মতো কথার তুলিতে, উচ্চারণের ঢংয়ে একটা ভয়ের ছবি আঁকতে লাগল ম্যাকেঞ্জি। বার বার সেঙাই আর সারুয়ামারুর কানের কাছে মুখখানা ঘনিষ্ঠ করে পরম শুভার্থীর মতো বলতে লাগল, খবরদার, জানের মায়া থাকলে গাইডিলিওর কাছে যেয়ো না তোমরা। গাইডিলিও একটা খারাপ আনিজা। বুকের রক্ত শুষে শুষে সাবাড় করে ফেলবে তোমাদের।

কাঁপা গলায় সেঙাই বলল, ডাইনি যখন, নিশ্চয়ই বশীকরণ ওষুধ জানে গাইডিলিও?

হ্যাঁ হ্যাঁ, জানে। খুব সাবধান। দু’টি পাহাড়ী মানুষের মনে গাইডিলিও সম্পর্কে একটা ভয়াবহ ধারণা গড়ে তুলতে লাগল ম্যাকেঞ্জি, এমন বশ করবে, একেবারে পোষা বাঁদর বানিয়ে ছাড়বে।

ভালোই হল। আমাদের পাশের বস্তি সালুয়ালাঙে আমার গোয়া লে আছে। তাকে আমার চাই। তার জন্যে গাইডিলিও ডাইনির কাছ থেকে ওষুধ নিয়ে যাব। আমাদের হুই দিকে ডাইনি নাকপোলিবা রয়েছে। কিন্তু তার কাছে ঘেঁষতে বড় ভয় করে।

একটু থতমত খেল ম্যাকেঞ্জি। পরক্ষণে বিক্ষিপ্ত মনটাকে ঠিকঠাক করে নিল, এ ডাইনি তোমাদের ওই নাকপোলিবার চেয়েও সাআতিক। এর কাছে যেয়ো না। আমি তোমাকে সেই সালুয়ালাঙ বস্তির লগোয়া লেকে এনে দেব। তা হলে খুশি তো?

দিবি তো, দিবি তো, ও সায়েব? গভীর উৎসাহে ম্যাকেঞ্জির পাশে এসে নিবিড় হয়ে দাঁড়াল সেঙাই, তুই যদি এনে দিস তবে আর গাইডিলিওর কাছে যাব না। বলতে বলতে কয়েক মুহূর্তের জন্য ভাবনার মধ্যে তলিয়ে গেল সেঙাই। তারপর কাঁপা, ভীরু গলায় বলল, কিন্তু আমাদের সদ্দার যে গাইডিলিওকে দেখে যেতে বলেছে।

তোমাদের সদ্দার জানে না ও কত বড় শয়তানী। ওই ডাইনি গাইডিলিওর কাছে গেলে একেবারে খতম করে দেবে।

আচমকা বাঁশের গেটে ক্যাচ করে শব্দ হল। চোখ তুলে তাকাল ম্যাকেঞ্জি। তারপর খুশির গলায় অভ্যর্থনা জানালো, আরে এসো, এসো তোমরা।

গেটের ওপাশে অনেক মানুষের জটলা। পাহাড়ী মানুষ। তুমুল হুলস্থুল বাধিয়ে দিয়েছে। মাথায় মোষের শিঙের মুকুট, তাতে আউপাখির পালক গোঁজা। তামাটে দেহে অজস্র উল্কি মানুষের কঙ্কাল, বাঘের চোখ, হাতির দাঁত আঁকা রয়েছে। হাতের থাবায় লম্বা লম্বা বর্শা। সেই বর্শার ফলায় বেলাশেষের রোদ ঝিলিক দিচ্ছে।

ডেলা পাকিয়ে জটলা করতে করতে মানুষগুলো সামনের ঘাসের জমিটায় এসে বসেছে। সেঙাই একবার তাদের দিকে তাকাল। তার দৃষ্টিটা সকলের মুখের ওপর দিয়ে ঘুরে যেতে শুরু করল। নানা জাতের পাহাড়ী নাগা। লোটা, আও, সাঙটাম, কোনিয়াক, সেমা, রেঙমা। বিচিত্র ভাষায় তারা একসঙ্গে চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে। বিচিত্র ভাষা, অদ্ভুত অদ্ভুত উচ্চারণ আর মুখভঙ্গি। হঠাৎ একটি মুখের ওপর এসে দৃষ্টিটা শিউরে উঠল সেঙাইর। হৃৎপিণ্ডের ধকধকানি থেমে আসতে লাগল। ওই মানুষটা নির্ঘাত সালুয়ালাঙ বস্তির সর্দার।

সাঁ করে সারুয়ামারুর পেছনে এসে দাঁড়াল সেঙাই।

সারুয়ামারু বলল, কি রে সেঙাই? কী হল?

হুই দ্যাখ, সালুয়ালাঙ বস্তির সদ্দার এসেছে। তুই দাঁড়া, আমি বাপের ঘর থেকে বর্শাটা নিয়ে আসি।

কেন?

কেন আবার, যদি একটা লড়াই বেধে যায়?

আরে না, না। ফাদার রয়েছে। এখানে লড়াই চলবে না। তা হলে হুই আসান্যুরা (সমতলের মানুষ) বন্দুক হাঁকড়ে মেরে ফেলবে।

ঘাসের জমির মাঝখানে পাহাড়ী মানুষগুলোর কাছে এসে দাঁড়িয়েছে ম্যাকেঞ্জি। মধুর হাসিতে মুখখানা ভরে গিয়েছে তার। ম্যাকেঞ্জির হাসির পেছনে অনেক সাধনা আছে। সারা মুখে যে-কোনো সময় যে-কোনো ভঙ্গির হাসি সে অবলীলায় ফোঁটাতে পারে। সারপ্লিসটা গোছগাছ করতে করতে ম্যাকেঞ্জি বলল, এই যে সর্দারেরা, তোমরা সব এসেছ। ভালোই হল, নইলে খবর পাঠাতে হত। তোমাদের সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে।

হু-হু। মাথা ঝাঁকিয়ে, মোষের শিঙের মুকুট দুলিয়ে সায় দিল পাহাড়ী সর্দারেরা, কী কথা বলবি ফাদার?

ওপাশে এখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে সেঙাই আর সারুয়ামারু। সারুয়ামারু বলল, পাহাড়ী বস্তি থেকে সদ্দারেরা এসেছে। ফাদার ওদের সঙ্গে এখন কথা বলবে। চল, আমরা ভাগি। শহর। দেখে, ভূষণ ফুকন আর মাধোলাল মাড়োয়ারির দোকান দেখে, রাস্তাঘাট বাজার দেখে, ফিরব।

হু-হু, তাই চল—

সকলের আগোচরে লোহার গেটটা পেরিয়ে কোহিমার পথে এসে নামল সেঙাই আর সারুয়ামারু।

আর পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি পাহাড়ী মানুষগুলোর জটলার মাঝখানে বসে পড়ল, একান্ত অন্তরঙ্গ হয়ে।

সর্দারেরা তারস্বরে হল্লা করেছে, ফাদার, আমার বস্তিতে সকলে যীশু-মেরী করে আর কর (স) আঁকে।

আমার বস্তিতেও।

আমার বস্তিতেও।

হল্লাটা একটু একটু করে তুমুল হয়ে উঠতে লাগল।

গুড, ভেরি গুড–প্রসন্নতার একটি চিকন আভা ঝলমল করছে ম্যাকেঞ্জির মুখেচোখে, খুব খুশি হলাম।

একটু আগে সারুয়ামারুর মুরগি বলির কথা শুনে মেজাজটা যে পরিমাণ খিঁচড়ে গিয়েছিল, এই মুহূর্তে এতগুলি গ্রামের এতগুলি পাহাড়ী সর্দারের গলায় যীশু-মেরীর নাম শুনতে শুনতে তার একশো গুণ বেশি আত্মপ্রসাদ অনুভব করল ম্যাকেঞ্জি। তবে তার প্রিচিঙ একেবারে অসফল নয়, ব্যর্থ হয়ে যায় নি তার মিশনারি জীবনের কঠিন শপথ। পাহাড়ী প্রাণের শিলাফলকে যীশু-মেরীর যে নাম বার বার অবিরাম প্রেরণায় লিখতে চেয়েছে ম্যাকেঞ্জি, আজ যেন তার প্রথম সুস্পষ্ট হরফ দেখতে পেল সে। দেখে মুগ্ধ হল। সমস্ত ইন্দ্রিয়গুলির ওপর একটা সুখের শিহরন খেলে গেল প্রৌঢ় ম্যাকেঞ্জির।

এবার আশ্চর্য শান্ত এবং সস্নেহ গলায় ম্যাকেঞ্জি বলল, তোমাদের নিমকের দরকার তো?

হু-হু, সেই জন্যেই তো এলুম ফাদার।

আচ্ছা, আচ্ছা–এবার অনেক নিমক দেব। টাকাও দেব। কিন্তু একটা কাজ করতে হবে তোমাদের।

হো-ও–ও–ও-য়া-আ-আ–ফাদার নিমক দেবে, টাকা দেবে।

সমতল থেকে অনেক, অনেক উঁচুতে কোহিমার এই পাহাড়চূড়ায় একটা উল্লসিত শোরগোল ঝড়ের মতো ভেঙে পড়ল। সে চিৎকারে আকাশের কোনো নিঃসীম শূন্যে বেথেলহেমের একটি উজ্জ্বল ধ্রুবতারা হয়তো বা চমকে উঠল। ঘাসের জমিটার এক কিনারে কাঠের শুভ্র ক্রসে সে কোলাহল থেকে খানিকটা কালিমা ছিটকে গিয়ে লাগল যেন।

ম্যাকেঞ্জি সতর্কভাবে পাহাড়ী মানুষগুলোর মুখের ওপর দিয়ে দৃষ্টিটাকে পাক খাওয়াতে খাওয়াতে চার্চের একটি জানালায় এনে স্থির করল। দেখল, দু’টি শাণিত নীল চোখ মেলে স্থির দাঁড়িয়ে রয়েছে পিয়ার্সন। পলক পড়ছে না। একটা শিলামূর্তি যেন। বাঘের ঘরে ঘোগের আস্তানা। আচ্ছা, তার নামও ম্যাকেঞ্জি। পাদ্রী-জীবনের নেপথ্যে ব্রেটেনব্রুকশায়ারের রাঙা মাটিতে মাটিতে তার অতীতকে রেখে এসেছে সে। সে অতীতের খবর জানা নেই পিয়ার্সনের। সে অতীত মানুষের তাজা রক্তে রক্তে ভীতিকর। আশপাশের পঁচিশটা শায়ার তার নামের দাপটে সেদিন তটস্থ থাকত। একটা ভিলেজ রোগ। একটা ব্যান্ডিট। সেদিন তার নাম করে দূরন্ত ছেলেদের ঘুম পাড়াত মায়েরা। তার নামে ছড়া বেঁধেছিল অজানা গ্রাম্য কবিরা।

ব্যান্ডিট থেকে ধর্মযাজক। আশ্চর্য জন্মান্তর বটে! সেই ব্রেটনব্রুকশায়ারের রাঙা মাটি ঘোড়ার খুরে খুরে ক্ষতবিক্ষত করে, শিকারি নেকড়ের মতো একদল অনুচর নিয়ে ঘুরে বেড়াত একটা ঘৃণিত আউটল। তার ঘোড়ার খুরের শব্দে একটা আসন্ন অপঘাতের আশঙ্কায় শিউরে উঠত পঁচিশটা শায়ারের হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকুনি।

ব্যান্ডিট থেকে মিশনারি।

কী কুৎসিত সে জীবন। নিরীহ মানুষের রক্তে রক্তে, নারীর ইজ্জত শিকারে সে জীবন কী কদাকার! সেদিন কী অব্যর্থ ছিল তার রাইফেলের লক্ষ্য। রিভালভারের ট্রিগারের ওপর তর্জনীটা এতটুকু কাপত না সেদিন।

আউটল থেকে ধর্মযাজক! কত পথ পাড়ি দিয়ে আসতে হয়েছে ম্যাকেঞ্জিকে! সে কাহিনী অন্য সময় বলা যাবে। কিন্তু ব্রেটনব্রুকশায়ারের সেই ভয়ঙ্কর জীবন এখনও তার শিরায় শিরায় বিষাক্ত একটা রক্তকণিকার মতো মিশে রয়েছে। সেই কলুষিত জীবনে ফিরে যেতে চায় না পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি। অজস্র মানুষের ধর্মবোধের ওপর প্রভুত্ব করার মধ্যে এক ধরনের মাদকতা আছে। এমন এক বিচিত্র রকমের নেশা আছে যার আকর্ষণ অতীত জীবনটা সম্বন্ধে অরুচি ধরিয়ে দেয়। কিন্তু পিয়ার্সনটা বড় একগুঁয়ে, বড় জেদী। যদি প্রয়োজন হয়–চার্চের জানালায় একটা বিরক্ত ভ্রুকুটি হেনে বিড়বিড় করে কী যেন বলল ম্যাকেঞ্জি। নিশ্চয়ই হোলি বাইবেলের মহাজন-বাণী আবৃত্তি করল না।

এবার সরাসরি পাহাড়ী মানুষগুলোর দিকে তাকাল ম্যাকেঞ্জি, একটা কাজ করতে হবে তোমাদের, বুঝলে সর্দারেরা। যত টাকা চাও, যত নিমক চাও, দেব। গাইডিলিওর নাম শুনেছ তো?

হু-হু–পাহাড়ী মানুষগুলো মাথা নেড়ে নেড়ে সায় দিল।

ওই গাইডিলিও একটা ডাইনি। তোমাদের বস্তিতে বস্তিতে এই কথাটা রটিয়ে দিতে হবে। যত টাকা চাও, দেব। আরো নিবিড় হয়ে বসল ম্যাকেঞ্জি।

কে ডাইনি? হুই গাইডিলিও? চোঙলি সর্দার সিনামঙ্কো হুঙ্কার দিয়ে উঠল, একথা বললে একেবারে বর্শা দিয়ে ফুঁড়ে ফেলব। আমার ছেলেটাকে অঙ্গামীরা তো সুচেন্যু দিয়ে কুপিয়ে গেল। তামুন্যু বলল, ও আর বাঁচবে না। হুই গাইডিলিওর ছোঁয়ায় সে বেঁচে উঠল। তাকে ডাইনি বলছিস!

হু-হু–আও আর সাঙটাম সর্দারেরা উঠে দাঁড়াল, আমাদের বস্তির অনেক লোক ভালো হয়ে গেছে রানীর ছোঁয়ায়। তাকে ডাইনি বলতে বলছিস!

হো-ও-ও-ও-য়া-য়া–

চিৎকার করে উঠে দাঁড়াল লোটা, কোনিয়াক আর রেঙমা সর্দারেরা, চাই না, চাই না তোর টাকা, তোর নিমক। যে আমাদের বাঁচাল তাকে ডাইনি বলব না।

যীশুর নাম বলব না। মেরীর নাম বলব না।

আর ক্রস আঁকব না।

হো-ও-ও-ও-য়া-য়া–

শোরগোল উদ্দাম হয়ে উঠল, রানী গাইডিলিওর সঙ্গে বেইমানি করতে বলছিস! তুই তো শয়তান আছিস।

তোর কাছে আর আসব না।

নিরুপায় আক্রোশে চোখদুটো ধকধক জ্বলছে ম্যাকেঞ্জির। সে কী জানত, এই হিদেন পাহাড়ীগুলোর মনে যীশু-মেরীর নামে যা গড়ে তুলেছিল, তার নিচে কঠিন ভিত্তি নেই! আবার তার দৃষ্টিটা চার্চের জানালায় একটা মুখের ওপর এসে পড়ল। পিয়ার্সনের মুখে সেই সূক্ষ্ম পর্দার মতো একটি বিদ্রপের হাসিই কি আটকে রয়েছে? সারা দেহের শিরায় শিরায় ব্রেটনব্রুকশায়ারের অতীত জীবন যেন চমক দিয়ে উঠল ম্যাকেঞ্জির। খ্যাপা একটা নেকড়ের মতো গর্জন করে উঠতে যাচ্ছিল ম্যাকেঞ্জি, তার আগেই ঘটে গেল ঘটনাটা। লোহার গেটে কাঁচ করে শব্দ হল।

হো-ও-ও-ও-য়া-য়া-–

চিৎকার করতে করতে কোহিমার পথে নেমে গেল পাহাড়ী সর্দারেরা।

সমস্ত মনটা যেন ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে ম্যাকেঞ্জির। আগ্নেয় চোখের মণিদুটো যেন কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। কিছুই শুনছে না ম্যাকেঞ্জি। সব ঝাপসা হয়ে গিয়েছে। একটা নিরাকার অন্ধকারে তালগোল পাকিয়ে গিয়েছে তার চেতনাটা। জীবনে কোনোদিন এমন অসহায় মনে হয়নি নিজেকে।

একসময় পায়ের কাছ থেকে কয়েকটা গলা বুদ্বুদের মতো ফুটে বেরুল। তাদের মধ্যে কুকী সর্দার আছে, মিজো দলপতি আছে, আর রয়েছে সালুয়া গ্রামের বুড়ো সর্দার। তিনটে পাহাড়ী মানুষ সাপের মতো ক্রুর চোখ মেলে অনুগত কুকুরের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে আছে যেন। ফাদার, আমরা তোর নিমক খেয়েছি। ওদের মতো নিমকহারামি করব না। গাইডিলিওকে ডাইনি বলে আমাদের নিজেদের বস্তিতে আর চারপাশের বস্তিগুলোতে রটিয়ে দেব। তবে অনেক টাকা আর নিমক দিতে হবে।

দেব, নিশ্চয়ই দেব–একটা অবলম্বন পেয়েছে ম্যাকেঞ্জি, একটা আশ্রয়। এই আশ্রয়ের ওপর দাঁড়িয়ে সে ভেলকি দেখিয়ে ছাড়বে, তোমরা যা চাও, তাই দেব। সব পাবে।

আচমকা সালুয়ালা গ্রামের সর্দার বলল, ফাদার, আমাদের বস্তির মেহেলীকে কেরি বস্তির লোকেরা আটক করে রেখেছে। তাকে ফিরে পেতে হবে। হুই বস্তির সেঙাই ওকে বিয়ে করতে চায়। ইদিকে নানকোয়া বস্তি থেকে মেহেলীর জন্য টেনেন্যু মিঙ্গেলু (বউপণ) দিয়েছে। কেলুরি বস্তির লোকেরা আমাদের শত্রুর।

ঠিক আছে। চারিদিকে একবার দ্রুত দেখে নিল ম্যাকেঞ্জি। গেল কোথায় সেঙাই আর সারুয়ামারু? এই তো এখানেই ছিল একটু আগে। তবে কি অন্য পাহাড়ী সর্দারদের সঙ্গে তারাও চার্চের সীমানা পেরিয়ে চলে গিয়েছে? কুটিল একটা সন্দেহে মনটা কালো হয়ে গেল ম্যাকেঞ্জির। দাঁতে দাঁত ঘষে হুমকে উঠল সে, ঠিক আছে। মেহেলীকে তোমাদের বস্তিতে ফিরিয়ে আনব। দরকার হলে কোহিমা শহরের সব বন্দুক নিয়ে কেলুরি বস্তি মাটিতে মিশিয়ে দেব।

সালুয়ালা গ্রামের বুড়ো সর্দারের চোখদুটো উল্লাসে হিংস্রভাবে জ্বলতে লাগল।

.

২৬.

কোহিমা। সমতল থেকে অনেক, অনেক উঁচুতে পাহাড়ী শহর। পাথরের ভাঁজে ভাঁজে, চড়াই-উতরাই-এর ফাঁকে ফাঁকে টালি আর ঢেউটিনের বাড়ি। ময়াল সাপের মতো এঁকেবেঁকে পথের রেখা উঠে গিয়েছে, তার পরেই নিশ্চল ঢেউ-এর মতো নিচের দিকে দোল খেয়ে নেমে এসেছে।

পাথর কাটা আঁকাবাঁকা পথ। পাইন আর ওক বনের আড়ালে আড়ালে, কালো পাথরের টিলায় টিলায় ছোট ছোট বাড়ি দেখতে দেখতে এগিয়ে চলেছে সেঙাই আর সারুয়ামারু। সেঙাই-এর দুচোখে মুগ্ধ বিস্ময়। তার অস্ফুট মন এই কোহিমা শহরটাকে গোগ্রাসে গিলছে। যেন।

একসময় ডিমাপুর যাওয়ার পথটার কাছে এসে দাঁড়াল দুজনে। জায়গাটা মোটামুটি সমতল। সামনের দিকে বনময় চড়াই পাহাড়ের দিকে উঠে গিয়েছে। এপাশে ঠাসবুনন দোকানপসার। ঢেউটিনের চাল, খাটসঙ কাঠের দেওয়াল, নিচে ওক কাঠের পাটাতন।

সারুয়ামারু বলল, ইস, অনেক দোকান বেড়ে গেছে। আগে তো এত ছিল না। আসান্যুরা (সমতলের লোকেরা) সব ঋক বেধে আসছে রে সেঙাই। কোহিমা শহর একবারে ছেয়ে ফেলেছে। দেখছিস?

হু-হু–

আরে সারুয়ামারু যে, এদিকে এসো। এসো আসাহোয়া (বন্ধু)। সামনের একটা দোকান থেকে সাদর ডাক ভেসে এল।

কে? ও মাধোলাল মাড়োয়ারি। চল, চল সেঙাই–সারুয়ামারু সেঙাই-এর একটা হাত চেপে ধরল। পাথর কাটা পথ থেকে নিচে নেমে দুজনে মাধোলালের দোকানের দিকে এগুতে শুরু করল।

ছোট্ট শহর এই কোহিমা। নাগা পাহাড়ের কেন্দ্রবিন্দু। সমতল থেকে বাণিজ্যের পসরা সাজিয়ে এসে বসেছে অসমীয়া, মাড়োয়ারি। এসেছে গুজরাটি আর ভুটিয়া। রকমারি সম্ভার, মনোহারি সামগ্রীতে নানা রঙের বাহার। আশেপাশের পাহাড় থেকে শুকনো মরিচ, আনারস আর পাহাড়ী আপেল নিয়ে খোলা আকাশের নিচে অস্থায়ী বাজার বসিয়েছে কুকীরা। এসেছে মিকিরেরা। মণিপুরীরাও এই বাণিজ্যমেলা থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখেনি।

কাঁচের কঙ্কণ, লবণ, পাটনাই চালের বস্তা নিয়ে রেল স্টেশন মণিপুর রোড থেকে এই কোহিমার বাজারে আসে একটার পর একটা লরি। বাঘের ছাল, হরিণের শিঙ, কস্তুরী, ওক আর পাইন কাঠ, কমলা আর রাশি রাশি বনজ ফল ইত্যাদি নানা পণ্যভারে বোঝাই হয়ে আবার রেল স্টেশনে ফিরে যায়।

দোকানপসারের জটলা পেছনে রেখে মাথোলালের দোকানে এসে বসল সেঙাই আর সারুয়ামারু।

মাধোলাল বলল, কি সারুয়ামারু, তুমি তো আর আজকাল আসো না নিমক নিতে। তোমার বাবা, তোমার ঠাকুরদা, সবাই আমার খদ্দের ছিল। আজকাল এত দোকান হয়েছে। আসানুরা (সমতলের লোকেরা) এসে কোহিমার বাজার ঘেঁকে ধরেছে। কিন্তু আমি যখন এখানে আসি তখন আসাদের একটা দোকানও ছিল না। তোমাদের গোসা হয়েছে নাকি আমার ওপর?

না, না–সারুয়ামারু মাথা ঝাঁকাল।

তবে আসো না কেন? অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে সামনে এসে দাঁড়াল মাধোলাল।

আজকাল হুই ফাদার নিমক দেয়, তাই আর আসি না।

আরে রাম রাম। তাই নাকি? তা নিমকের বদলা কী দাও? আগ্রহে বুড়ো মাধোলাল আরো খানিকটা এগিয়ে এল।

কিছু না, খালি ক্রস আঁকি আর যীশু-মেরীর নাম করি। নির্বিকারভাবে বলে গেল সারুয়ামারু, হুই ফাদার বলেছে, ক্রস আঁকলে আর যীশু-মেরীর নাম করলে কিছুই দিতে হবে না।

হায় রাম–প্রায় আর্তনাদ করে উঠল মাথোলাল, ওই কাম করলে তোমাদের আনিজার গোসা হবে। পাদ্রীসাহেবরা ভারি শয়তান আছে, তোমাদের ধরম নষ্ট করে দিচ্ছে। খাসিয়া। পাহাড়ে যখন ছিলাম তখন দেখেছি, খাসিয়াদের সব খেস্টান করে দিল। এবার তোমাদের। ধরেছে। হায় রাম।

আজমীড় কি মাড়োয়ারের কোনো এক দেহাতে মাথোলালের দেশ, তা আজ আর বিশেষ মনে পড়ে না তার। সূর্য ওঠার আগে আকাশের চক্ররেখায় যেমন এক আস্তর ছায়া-ছায়া রং লেগে থাকে, ঠিক তেমনই একটা অস্পষ্ট স্মৃতি মনের মধ্যে বিবর্ণ হয়ে রয়েছে। জনারের খেত, কপিরং রুক্ষ মাটি, মহিষ চারণের জমি, এছাড়া আর কিছু নয়। দশ বছর বয়সে বাপ ক্ষেত্রীলালের সঙ্গে এই উত্তর-পূর্ব ভারতে এসেছে সে। রেলের চাকার নিচে অদৃশ্য হয়েছে বিহার, তারপর সুশ্যাম বাংলা মুল্লুক, তারও পর আসামের নিঃসীম সমতল পেরিয়ে খাসিয়া পাহাড়। নঙ পো, শিলং, চেরাপুঞ্জি। তারও পর হাফলঙে কিছুদিন থেকে এই কোহিমা। তাও আজ চল্লিশ বছর পার হতে চলল।

অনেক কিছু দেখেছে মাধোলাল। এই চল্লিশ বছরের স্মৃতিতে জমা হয়ে রয়েছে অনেক ঘটনা, অজস্র অভিজ্ঞতা। জীবনের এই চার দশকের প্রতিটি প্রহরের পাতায় পাতায় কত ইতিহাস লেখা রয়েছে মাধোলালের, তার শুকনো হাড়ে হাড়ে কত পাষাণলিপি আঁকা হয়েছে তার হিসেব নেই, সীমা-পরিসীমা নেই। বাপ ক্ষেত্ৰীলাল কোহিমা পাহাড়ে এই তেল-লবণ আলুর দোকান খুলেছিল। বুড়া বাঁশের মাচানের ওপর বসে দুলে দুলে সন্ত তুলসীদাসের রামায়ণ পড়ত। সেও আজ কতদিন পার হয়ে গেল। বাপ মরল একদিন। বছর দুয়েক পর কলকাতা শহর থেকে তাদের মুল্লুকের দেহাতি কিশোরী ফুলপিয়ারিকে শাদি করে আনল মাথোলাল। সেবার.কী হুজুগ আজীব শহর কলকাতায়। মিছিল, সভা, বক্তৃতা। কে এক সুরেন বানারজি না কী যেন, নামটা ঠিক মনে পড়ছে না, মুখে কাঁচা-পাকা দাড়ির জঙ্গল, বাঙালিবাবুর কালিজার জোর আছে, তাগদ আছে রক্তের। তাকে নিয়ে কী মাতামাতি! একটু একটু শুনেছিল মাধালাল, তার চেয়েও কম বুঝেছিল। বাঙালিবাবুরা নাকি সাহেবদের সঙ্গে লড়াই শুরু করেছে। পঁচিশ তিরিশ বছর আগের সেসব ঘটনা মাথোলালের স্মৃতিতে ইতিহাস হয়ে রয়েছে।

শাদি করার পরের বছর পাণ্ডুতে বাড়ি তুলল মাধোলাল। শরমের কথা, তবু সত্যি বৈকি, শাদির প্রথম বছরেই বাচ্চা হল। সেই ছেলে বুধোলাল এখন পঁচিশ বছরের তাজা জোয়ান। বুনো ঘোড়ার মতো উদ্দাম। তার একটা শাদি দিতে হবে। অবশ্য শাদি একরকম ঠিকই হয়ে রয়েছে। রঙ্গিয়ার মেয়ে। নাম বিরজা। অসমিয়া মেয়ে পুত্রবধূ হবে। তাতে আপত্তি নেই মাধোলালের। এত বছর এই উত্তর-পূর্ব ভারতে রয়েছে মাধোলাল। নানা দিক থেকে আত্মীয়তার শিকড়ে বাকড়ে তাকে জড়িয়ে ধরেছে এই আসাম, এই খাসিয়া পাহাড়, এই নাগা মুল্লুক।

আজ দশ বছর ধরে কোহিমা পাহাড়ে স্থির হয়ে বসেছে মাধোলাল। মাঝে মাঝে মণিপুর রোড স্টেশন থেকে রেলে চড়ে পাণ্ডুর বাড়িতে যায়। দু-চার দিন কাটিয়ে আবার ফিরে আসে। কোহিমার দোকানে। সমতল থেকে অনেক উঁচুতে এই পাহাড়ী শহর তাকে শত বাহু দিয়ে যেন বন্দি করে রেখেছে। বুধোলাল অনুযোগ দেয়। এই বুড়ো বয়সে এবার পাণ্ডুর বাড়িতে গিয়ে থাকলেই হয়। যে বয়সের যে ধরম। সামনেই ক্যামাখ্যা মন্দির। সেখানে গিয়ে পরকালের সুরাহা করলেও তো পারে বুড়ো মাধোলাল। আর কটা দিনই বা বাকি আছে পরমায়ুর? পরপারে যাবার সময় হল বলে। ডাক আসতে কতক্ষণ। সব বোঝে মাধোলাল। কিন্তু কোহিমা। যেন পাহাড়ী ডাইনির মতো তাকে কুহকিত করেছে। বিচিত্র তার ইন্দ্রজাল, তার বাহুর বেষ্টনী থেকে মুক্তির বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই।

বুধোলালই আজকাল দোকানের জিনিসপত্র আমদানি করে–আমিনগাঁ থেকে, করিমগঞ্জ থেকে, তিনসুকিয়া কি হাফলঙ থেকে রেলের ওয়াগনে করে। তারপর ডিমাপুর থেকে লরিতে চাপিয়ে এই শহর কোহিমা। আর বুড়ো ক্ষেত্ৰীলাল যেখানে বসে সন্ত তুলসীদাসের রামায়ণ পাঠ করত, যেখান থেকে একটি ভক্তিন সুরের তরঙ্গে এই পাহাড়ী পৃথিবীকে অমৃতময় করে তুলত, ঠিক সেই মাচানটির ওপর বসে বুড়ো মাধোলাল পাহাড়ী মানুষগুলোর সঙ্গে গল্প করে। আজমীড় কী মাড়োয়ারের সেই দেহাতি গ্রামটির আবছা স্মৃতি, রেলের গল্প, পাণ্ডু-আমিনগাঁ কাটিহারের গল্প, খাসিয়া আর গারো পাহাড়ের গল্প। কলকাতায় সাহেবদের সঙ্গে সেই বাঙালিবাবু সুরেন বানারজি না কার যেন সেই লড়াই-এর ইতিহাস। শিলং-চেরাপুঞ্জিতে পাদ্রী সাহেবদের কীর্তিকথা। আরো যে কত কাহিনী তার লেখাজোখা নেই। তার ষাট বছরের বিরাট অতীত জুড়ে আর দেহের প্রতিটি কুঞ্চনে যে রাশি রাশি গল্প, রাশি রাশি কাহিনি পুঞ্জীভূত হয়ে রয়েছে সেই সব গল্প বলে মাধোলাল।

সামনে চুপচাপ বসে রয়েছে সারুয়ামারু। তার পাশে সেঙাই।

মাথোলাল বলতে লাগল, হায়, রাম রাম। এই পাদ্রীগুলো সব ধরমনাশা। নিমকের বদলা ধরম নিয়ে নেয়–

বলিস কী মাথোলাল! আমাদের ধরম নিচ্ছে হুই ফাদার?

হাঁ হাঁ, এ কথা আবার কাউকে বোলো না। তোমার ঠাকুরদা ছিল আমার আসাহোয়া (বন্ধু)। সে আমার দোকান থেকে নিমক নিত। তারপর আসত তোমার বাবা। তারও পর আসতে তুমি। তুমি তো এখন হুই পাদ্রীদের পাল্লায় গিয়ে পড়েছ। তোমাদের তিন পুরুষের সঙ্গে আমাদের কারবার। তাই সত্যি কথা বললুম। সাহেবদের কাছে আবার এসব বোলো না। তা হলে আমার দোকান তুলে দেবে।

এখানকার ভাষা কী চমৎকার আয়ত্ত করেছে মাথোলাল! বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেঙাই।

না না, বলব না। আগে তো ঠিক বুঝিনি। আনিজার নামে শুয়োর বলি দিতে ফাদার বারণ করে। একেবারে বর্শা দিয়ে ফুড়ে ফেলব না! সহজ মানুষ সারুয়ামারু খুঁসে উঠল।

ফিসফিস গলায় মাধোলাল বলল, তোমাদের ওই যে রানী গাইডিলিও আছে তার কাছে জিগ্যেস কোরো। হক কথা বলবে।

না, ওর কাছে যাব না। ও তো ডাইনি। একটা সন্ত্রস্ত ছায়া এসে পড়ল সেঙাই-এর মুখেচোখে। সারুয়ামারুও চকিত হয়ে উঠেছে।

ডাইনি! কে? রানী গাইডিলিও? বিস্ময়ে গলাটা চৌচির হয়ে গেল মাথোলালের, কে বললে এ কথা?

ফাদার বলেছে।

মিছে কথা, ষোল আনা মিছে। এক আজব কাহিনির ওপর থেকে যবনিকা তুলল বুড়ো মাথোলাল, জানো সারুয়ামারু, আমাদের দেশে এক মহারাজ আছেন। তার নাম হল গান্ধিজি। এই সায়েবদের সঙ্গে তার লড়াই বেধেছে। আমার ছেলে বুধোলাল দু’দিন আগে কলকাতা থেকে ফিরেছে। সে সেই লড়াই দেখেছে।

সেঙাই বলল, এই সাহেবেরা কোত্থেকে এল?

ভিনদেশ থেকে। সাত সমুদ্র তেরো নদী ডিঙিয়ে। অনেক, অনেক দূরে সে দেশ। কোহিমা পাহাড় থেকে এক অনির্দেশ্য দিগন্তের দিকে আঙুল বাড়িয়ে দিল মাথোলাল, আমরা তো আসান্যু (সমতলের লোক)। আমাদের দেশ থেকেও অনেক দূরে সায়েবদের দেশ।

সে দেশে তুই গেছিস?

না।

আচমকা সারুয়ামারু বলল, হুই যে বললি লড়াই বেধেছে তা বর্শা দিয়ে, সুচেন্যু দিয়ে, তীর-ধনুক দিয়ে মানুষ খুঁড়ছে তো? মাথা কেটে মোরাঙে ঝোলাচ্ছে? বেশ মজা কিন্তু, আমাদের পাহাড়ে অমন লড়াই অনেকদিন বাধেনি।

তেমন লড়াই নয়। গান্ধিজির লোকেরা সায়েবদের মারে না। সায়েবরাই তাদের মারে। এ দেশ থেকে সায়েবদের ভাগতে বলেছেন গান্ধিজি।

এ কেমন লড়াই! মার খাবে, অথচ মারবে না! তাই কখনও হয়? আমাদের পাহাড়ে লড়াই হলে সায়েবদের ছুঁড়ে ফেলতুম। উত্তেজনায় ঝকমক করছে সেঙাইর চোখ দুটো। পেশীগুলো ফুলে ফুলে উঠছে।

এ লড়াই তোমরা বুঝবে না। এ বড় মজার লড়াই। আমার ছেলেটা বলল, গান্ধিজির লোকেরা মার খেয়ে খেয়ে জিতে যাচ্ছে। একটু চুপচাপ। তারপর আবার শুরু করল মাধোলাল, ওই দেখ, খালি বকেই চলেছি। এর কথা তো কিছু বললে না সারুয়ামারু। এ কে? সেঙাইর দিকে তাকাল মাধোলাল।

এ হল সেঙাই। সিজিটোর ছেলে।

ও, রাম রাম। তারপর শোন, আমাদের দেশে যেমন গান্ধিজি, তোমাদের এই পাহাড়ে তেমনই হল রানী গাইডিলিও। সাহেবদের সেও দেখতে পারে না। তার কথা শুনলে বুঝবে। এই কোহিমাতেই আছে রানী গাইডিলিও। অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাল বুড়ো মাথোলাল।

সেঙাই সারুয়ামারুদের প্রত্যক্ষ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ, সচেতন বোধ আর অনুভূতি এবং অস্ফুট ধারণার বাইরে বিস্ময়কর অনেক কিছু আছে। তার খবর দিয়েছে বুড়ো মাথোলাল।

গান্ধিজির সঙ্গে সাহেবদের লড়াই, রানী গাইডিলিও–এই অদ্ভুত নামগুলি, মাথোলালের অপরূপ সব গল্প তাদের অস্পষ্ট বন্য চেতনাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ী মনে দোলা লেগেছে।

সেঙাই শুধলো, তোদের দেশে সাহেবদের সঙ্গে লড়াইটা বাধল কেন? কী হয়েছিল? ঘরের বউ ছিনিয়ে নিয়েছিল নাকি?–এরা বিদেশি। আমাদের দেশ এসে আমাদের মারবে, আমাদের খাবার কেড়ে নেবে। কতকাল সইব? এই ধর তোমাদের বস্তি, সেখানে কেউ যদি এসে সর্দার হতে চায়, তোমাদের মারতে চায়, তাহলে সইবে?

না, না। একেবারে খতম করে ফেলব। গর্জে উঠল সেঙাই।

সায়েবরা এসেছে বিদেশ থেকে। এসেছিস যখন থাক, তা নয়, সর্দারি করতে শুরু করল। এই দেখ না তোমাদের পাহাড়েও এসেছে। সর্দারি করছে।

সারুয়ামারু বলল, তোরাও তো এসেছিস। তোরাও তো বিদেশি। তোরা আসান্যু।

হায়, রাম রাম–মাপা আধ হাত জিভ কাটল মাধোলাল, আমরা আসা, তা ঠিক কথা। কিন্তু এ দেশটা আমাদের। তোমরা আমরা এক দেশি। আমরা থাকি নিচু জমিতে, তোমরা থাকো পাহাড়ে। দুইয়ে মিলিয়ে গোটা ভারত।

তবে ফাদার যে বলে আসান্যুরা শয়তান, ওরা ভিনদেশি?

সব মিছে। তোমাদের রানী গাইডিলিওকে জিগ্যেস করে দেখো।

কোহিমার আকাশে রাত্রি নামছে। ঝাপসা রঙের কুয়াশা বাতাসে মিশে যাচ্ছে। সামনের পাহাড়চূড়া অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে।

সেঙাই আর সারুয়ামারু উঠে পড়ল। সারুয়ামারু বলল, এখন যাই। সন্ধ্যা পেরিয়ে গেল। বড় শীত করছে।

গ্যাসবাতি ধরাতে ধরাতে মাধোলাল বলল, তোমরা আছ কোথায়?

ফাদারের কাছে।

ও। বিড়বিড় করে অস্ফুট গলায় কী যে বলল মাধোলাল, বোঝা গেল না। একটু পরেই সে সরব হয়ে উঠল, গান্ধিজির কথা, রানী গাইডিলিওর কথা তোমাদের ফাদারকে বোলো না কিন্তু। আর নিমক দরকার হলে আমাদের দোকান থেকে নিয়ে যেয়ো। অন্য সব দোকান থেকে দরে সুবিধে করে দেব।

আচ্ছা।

কোহিমার পথে পা বাড়িয়ে দিল সেঙাই আর সারুয়ামারু।

চলতে চলতে সারুয়ামারু বলল, মজার গল্প বলে মাথোলাল। গান্ধিজির লড়াই, রানী গাইডিলিও। কী সুন্দর গল্প! ভারি ভালো।

হু-হু– মাথা নাড়ল সেঙাই।

গান্ধিজির যুদ্ধ। রানী গাইডিলিও। সেঙাইর বন্য পাহাড়ী মনে কি পাষাণ-লেখা পড়ল? আঁকা হল দুর্বোধ্য কোনো শিলালিপি?

.

২৭.

পাহাড়ী মনের উত্তেজনা। সে তো ঘাসের ওপর শিশিরকণার পরমায়ু। রাত্রিবেলা মাচানে একটা বুনো মোষের মতো ভোস ভোঁস শব্দ করে ঘুমিয়েছে সারুয়ামারু। মসৃণ ঘুমে সে রাতটা কাবার করে দিয়েছে।

কিন্তু অনেকটা সময় পর্যন্ত ঘুমোতে পারেনি সেই। রাত যখন গভীর আর নিবিড় হয়েছিল, ঠিক সেই সময় ঢেউটিনের চালের ফাঁক দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়েছিল সে। মোষের পিঠের মতো ঘন কালো আকাশ। অসংখ্য মিটমিটে তারা। আঁচড়ের মতো ফুটে বেরিয়েছে আবছা ছায়াপথ।

কাল সন্ধ্যায় মাধোলাল কার সঙ্গে যেন সাহেবদের লড়াইর কথা বলছিল, রানী গাইডিলিওর কথা বলছিল। গাইডিলিও নাকি ডাইনি নয়। অথচ ফাদার বলেছে, সে ডাইনি। গ্রাম থেকে আসার সময় বুড়ো খাপেগা বার বার বলে দিয়েছিল, রানী গাইডিলিওর সঙ্গে দেখা করতে। রানী গাইডিলিও আর ডাইনি গাইডিলিও–এই দুই নামের মধ্যে সেঙাই-এর পাহাড়ী মনটা অনেকক্ষণ দোল খেয়েছে। স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি–গাইডিলিওকে দেখতে যাবে, কি যাবে না।

একটার পর একটা ভাবনার ঢেউ চেতনার ওপর দিয়ে সরে গিয়েছে। কাদের যেন লড়াইয়ের কথা বলেছিল মাধোলাল। বর্শা দিয়ে ফুড়ছে না, সুচেন্যু দিয়ে কোপাচ্ছে না, মার খাচ্ছে অথচ মরছে না। আজব দেশ, সব যেন রূপকথা। কোথায় সেই দেশ, কোথায় সেই অদ্ভুত মানুষেরা? সব যেন মিথ্যে মনে হয়। বিভ্রান্তির মতো লাগে। বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না। তাদের এই পাহাড়ী পৃথিবীর বাইরে কোথায় কোন সমতলের দেশ রয়েছে, সেখানে সাহেবদের সঙ্গে লড়াই চলছে, ভাবতেও কেমন লাগে পাহাড়ী জোয়ান সেঙাইর। নাঃ, এই পাহাড়, এই উপত্যকা, এই মালভূমি, এই বন-ঝরনা-জলপ্রপাত আর এই কোহিমা শহরের বাইরে কোথাও কোনো দেশ আছে, কিংবা থাকতে পারে, তা তার ধারণার অতীত। অবিশ্বাসী বুনো মনটা প্রবলভাবে প্রতিবাদ করতে চায়।

একসময় গান্ধিজির যুদ্ধ, রানী গাইডিলিও, বুড়ো মাথোলাল, এই সুন্দর কোহিমা শহরসমস্ত কিছু মন থেকে সরে গেল সেঙাইর। মেহেলীর কথা মনে পড়ল। অনেকদিন আগে এক নিঃশব্দ ঝরনার পাশে তাকে প্রথম দেখেছিল। তারপর সালুয়ালা গ্রামে তাকে শেষবারের মতো দেখে এসেছে। বন্য, আদিম মানুষ। চিন্তাগুলি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ক্রিয়া করে। নিমেষে এক ভাবনা থেকে অন্য ভাবনায় মনটা সরে সরে যায়। সেঙাই ভাবল, মেহেলীকে তার চাই। উন্মাদ ভোগে, তীব্র কামনায় শত্রুপক্ষের মেয়েকে পেতেই হবে। কোহিমা শহরের নিঃসঙ্গ বিছানায় মেহেলীর চিন্তায় বাকি রাতটা উত্তেজিত হয়ে ছিল সেঙাই। প্রায় না ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিয়েছে।

কোহিমার পাহাড় তার জন্য এত সব বিচিত্র ভাবনা সাজিয়ে রেখেছিল, তা কি জানত সেঙাই!

.

২৮.

আকাশে শেষ রাত্রির আবছা অন্ধকার লেগে রয়েছে এখনও। একটা উদাত্ত সুর ভেসে এল চার্চের ভজনালয় থেকে। সেই অপূর্ব সুরের মূৰ্ছনা সমস্ত চেতনাটাকে ভরে দিতে লাগল।

পাশের মাচান থেকে সারুয়ামারু বলল, ছোট ফাদার যীশু-মেরীর গান গাইছে।

গানে কী কথা বলছে রে? সেঙাই জিগ্যেস করল।

ওদের কথা বুঝি না।

ছোট পাদ্রী অর্থাৎ পিয়ার্সন। পরম পিতার কাছে রাত-প্রভাতের প্রার্থনা জানাচ্ছে। তার একটি কথারও অর্থ বোঝে না সেঙাই, পরমার্থও তার কাছে দুয়ে। তবু পিয়ার্সনের সুললিত কণ্ঠে এমন একটা পবিত্রতা রয়েছে যাতে তার মন বিবশ হয়ে যাচ্ছে। একটু আগে মেহেলীর কথা ভাবতে ভাবতে সমস্ত স্নায়ুমণ্ডলী উত্তেজিত হয়ে গিয়েছিল। এখন এই গানের শান্ত মধুর সুরে, বিচিত্র আবেশে সোই-এর অস্ফুট মন ভরে গিয়েছে। মেহেলীর ভাবনা থেকে পিয়ার্সনের এই অদ্ভুত গানটার কত তফাত! এই গানের সঙ্গে মাথোলালের গল্পের একটা আশ্চর্য সঙ্গতি রয়েছে যেন। ঠিক ধরতে পারে না সেঙাই।

একসময় পুবের পাহাড়চূড়া আলো করে সূর্য উঠল। কুয়াশা মুছে গেল। সিজিটোর ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এল সেঙাই আর সারুয়ামারু। আর বেরিয়েই এই সুন্দর সকালে মনটা বিষিয়ে গেল সেঙাই-এর।

সবুজ ঘাসজমির ওপারে বসে রয়েছে বড় পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি। তার পায়ের কাছে এক দল পোষা কুকুরের মতো ঘন হয়ে বসেছে জনকয়েক পাহাড়ী সর্দার। তাদের সারা দেহে বিচিত্র ধরনের পোশাক আর অলঙ্কারের বাহার। মাঝখানে বসেছে সালুয়ালা গ্রামের বুড়ো সর্দার।

বড় পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি মুঠো মুঠো টাকা সর্দারদের হাতে গুঁজে দিচ্ছে। আর ফিসফিস করে কী যেন বলছে। হয়তো বা যীশু-মেরীর কোনো গূঢ় মন্ত্র। আর পাহাড়ী সর্দারদের মুখে কখনও ভীষণ হাসি, কখনও নিষ্ঠুরতা ঝিলিক দিয়ে যাচ্ছে।

বড় পাদ্রী ম্যাকেঞ্জির দৃষ্টি ভয়ানক সজাগ এবং ধূর্ত। সারুয়ামারু আর সেঙাইকে সে ঠিক ঠিক দেখে ফেলল, আরে সেঙাই, এই যে সারুয়ামারু–এখানে এসো।

গুটি গুটি পায়ে ঘাসের জমি পেরিয়ে ম্যাকেঞ্জির কাছে এসে দাঁড়াল দুজনে। সেঙাই-এর কঠোর থাবায় বিরাট বর্শাটা ধরা রয়েছে। দুটো তীক্ষ্ণ, ধারাল এবং নির্মম চোখ মেলে নির্নিমেষে সালয়ালাঙের সর্দারের দিকে তাকিয়ে রয়েছে সেঙাই।

সেঙাই! নামটা শুনে চমকে উঠল সালয়ালাঙের সর্দার। আগে কখনও সে সেঙাইকে দেখেনি। সালুনারুর কথায় সেদিন খাসেম গাছের মগডালে মেহেলীর ছোট্ট ঘরখানায় তাকে পুড়িয়ে এসেছিল। পরে অবশ্য জেনেছিল সেঙাই মরেনি। কোহিমার পাহাড়ে তার জন্য এমন একটা বিপজ্জনক বিস্ময় অপেক্ষা করে ছিল তা কি জানত সে! মুখখানা ভয়ঙ্কর হল তার। প্রখর মুঠিতে বর্শাটা চেপে ধরল।

সেঙাই আর সালুয়ালাঙের সর্দার। দুই প্রতিপক্ষ। তিন পুরুষ ধরে পরস্পরের শত্রু। কোহিমার পাহাড়ে মুখোমুখি হল কেলুরি আর সালুয়ালাঙ। চতুর আর কুটিল হাসিতে পাদ্রী ম্যাকেঞ্জির মুখখানা ভরে গেল।

ম্যাকেঞ্জি বলল, রাত্তিরে কেমন ঘুমোলে তোমরা?

ভালো, ভালল। খুশির গলায় সারুয়ামারু বলল।

ভুরু কুঁচকে বাঁ চোখটা ছোট করে সেঙাই-এর দিকে তাকাল ম্যকেঞ্জি, মেহেলীকে বিয়ে করতে চাও না তুমি?

হু-হু, চাই তো। মেহেলীকে আমি ছিনিয়ে আনব হুই সালুয়ালাঙ বস্তি থেকে।

কী বললি? খুঁসে উঠল সালুয়ালাঙের সর্দার।

ততক্ষণে বর্শাটাকে বাগিয়ে তাক করেছে সেঙাই। তার দুটো পিঙ্গল চোখে হত্যার প্রতিজ্ঞা জ্বলছে, একেবারে শেষ করে ফেলব তোকে। আহে ভু টেলো!

এই এই, কী হচ্ছে! এটা চার্চ! হাঁ হাঁ করে লাফিয়ে উঠল পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি।

খুনোখুনি হলে চার্চের পবিত্র চত্বরে পাহাড়ী রক্তের কলঙ্ক লাগবে! যেশাসের পুণ্যনাম কলুষিত হবে! সারপ্লিসের আড়ালে ম্যাকেঞ্জির দেহটা কেঁপে উঠল। ব্রেটব্রুকশায়ারের সেই আউটল রক্ত নিয়ে মাতামাতির খেলায় প্রেরণা দিতে পারত। সারপ্লিসের খোলস যেদিন দেহে উঠেছে তখন থেকেই অনেকটা নিরুত্তেজ হয়ে পড়েছে ম্যাকেঞ্জি। এখন তাকে অনেক সংযত থাকতে হয়।

সাঁ করে সেঙাই-এর একটি হাত চেপে ধরে টানতে টানতে তাকে সিজিটোর ঘরে রেখে। এল ম্যাকেঞ্জি। বলল, কোনো চিন্তা নেই। মেহেলীকে তোমার সঙ্গে বিয়ে আমি দেব। তবে একটা কাজ করতে হবে তোমাকে।

কী কাজ?

পরে বলব!

বাইরে বেরিয়ে সালুয়ালাঙের সর্দারের কাছে চলে এল ম্যাকেঞ্জি। তাকে নিয়ে অন্য একটি ঘরে ঢুকল।

ম্যাকেঞ্জি বলল, ভেবো না সর্দার, আমি যখন আছি তখন মেহেলীকে তোমরা পাবেই। আরো অনেক টাকা দেব। যে কাজের কথা বললাম মনে আছে তো?

হু-হু, নিমকহারামি আমরা করি না। আমরা পাহাড়ী মানুষটাকা নিয়েছি, বেইমানি করব না।

এই তো চাই। বস্তিতে গিয়ে যে কথা বলেছি তা চাউর করে দাও।

হু-হু, আমরা এবার যাই। কিন্তু তুই দেখিস ফাদার, হুই শয়তানের বাচ্চা সেঙাইটাকে একেবারে খতম করব। বলতে বলতে বাইরের ঘাসবনে নামল সালুয়ালাঙের সর্দার। সেখান থেকে কোহিমার আঁকাবাঁকা পথে।

পরের দিনও সকাল থেকে শেষ বেলা পর্যন্ত কোহিমার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াল সেঙাই আর সারুয়ামারু। চড়াই উতরাইয়ে দোল খাওয়া পথ। দোকানপসার। সমতলের বাসিন্দাদের বাণিজ্যমেলা। ইম্ফল আর ডিমাপুরের দিকে প্রসারিত পথের রেখা। বিচিত্র সব মানুষ, বিচিত্রতর ভাষার হইচই।

কেলুরি গ্রামের এক পাহাড়ী যৌবন প্রথম শহরে এসে একটার পর একটা বিস্ময়ের মুখোমুখি হয়ে মুগ্ধ হয়ে গেল। সারুয়ামারু এই শহরে অনেক বার এসেছে। সে সেঙাইকে উদয়াস্ত চারিদিক ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাতে লাগল।

.

সেদিন সন্ধ্যার একটু আগেই ঘটনাটা ঘটল।

বড় পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি চার্চের একটা কাজের লোককে সেঙাই আর সারুয়ামারুকে ডেকে আনতে বলল।

কোহিমার আকাশে এখনও খানিকটা আবছা আলো লেগে রয়েছে। সবুজ ঘাসের জমিতে বেতের চেয়ারে জাঁকিয়ে বসে আছে ম্যাকেঞ্জি। দু’পাশে দুটো মণিপুরী পুলিশ। হাতে খাড়া রাইফেলের মাথায় বেয়নেটউদ্ধত হয়ে রয়েছে। বিদেশি চার্চের শান্তি এদেশি মানুষের পাহারায় নির্বিঘ্ন। বেথেলহেমের ধ্রুবতারাটি কোহিমার পাহাড়ে সুরক্ষিত রয়েছে রাইফেলের হিংস্রতায়। যেশাস। মানব-পুত্রের স্বপ্ন কি চরিতার্থ হল এই পাহাড়ী টিলার দেশে, এই বনময় শৈলশিখরে? এই রাইফেলের, এই বেয়নেটের পাহারায়? কে জানে?

ইতিমধ্যে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে সেঙাই আর সারুয়ামারু। সারাদিন কোহিমার পথে পথে ঘুরে বেড়িয়েছে দুজনে। তারপর খানিক আগে সিজিটোর ঘরে ফিরে এসেছিল।

ম্যাকেঞ্জির মুখে সস্নেহ হাসি, এই যে সেঙাই, এই যে সারুয়ামারু, এসো, এসো। তারপর শহর কেমন দেখলে সেঙাই?

ভালো, খুব ভালো।

এক মুহূর্ত ভাবনার মধ্যে তলিয়ে রইল ম্যাকেঞ্জি। তারপর বলল, কী চাই তোমার বল দিকি সেঙাই? কটা কাপড়? কত টাকা?

আশেপাশেই কোথায় যেন ছিল পিয়ার্সন। বাঘের মতো এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল, হোয়াটস দিস ফাদার?

কী হল পিয়ার্সন! ঘাড় ঘুরিয়ে বিরক্ত চোখে তাকাল ম্যাকেঞ্জি, এত উত্তেজিত কেন?

এ ভারি অন্যায়। এভাবে লোভ দেখিয়ে ক্রিশ্চিয়ানিটি স্প্রেড করে কী লাভ? সেন্টদের সারমন আছে, লোভরিপুকে প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয়। উত্তেজনায় থরথর কাঁপছে পিয়ার্সন।

প্রায় হুমকে উঠল ম্যাকেঞ্জি, ডোন্ট ইন্টারফেয়ার। কিসে লাভ হবে, বা না হবে, আমি তোমার কাছে জানতে যাব না। লিভ দিস প্লেস অ্যাট ওয়ান্স–

থ্যাঙ্কস। উদ্ধত পা ফেলে সামনের রাস্তায় গিয়ে নামল পিয়ার্সন।

পিয়ার্সনের গমনপথের দিকে আগ্নেয় চোখে তাকিয়ে ছিল ম্যাকেঞ্জি। যখন একটা উতরাই এর আড়ালে পিয়ার্সনের দেহটা অদৃশ্য হয়ে গেল ঠিক সেই সময় দৃষ্টিটাকে সেঙাই-এর মুখের ওপর এনে ফেলল সে। নাঃ, মেজাজটাকে একেবারে তিক্ত করে দিয়ে গেল লোকটা। একটা। ডেভিল। স্কাউন্ড্রেল।

কী এক দুর্বোধ্য ভাষায় কথা বলছিল সাদা মানুষ দুটো। এক বিন্দুও বুঝতে পারছিল না সেঙাই কি সারুয়ামারু। অবাক এবং ভীরু দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল তারা।

ম্যাকেঞ্জি বলল, যে কথা বলছিলাম। বুঝলে সেঙাই, যা চাইবে তাই তোমাকে দেব। কিন্তু একটা কাজ করতে হবে।

কী কাজ?

তেমন কিছু নয়। ওই আসান্যুদের (সমতলের লোক) সঙ্গে মিশবে না। ওরা লোক বড় খারাপ। সারুয়ামারুকে বলে দিয়েছি, তোমার বাবা সিজিটোকেও বলেছি। কি সারুয়ামারু, বলিনি?

হু-হু– ঘন ঘন মাথা ঝাঁকাতে লাগল সারুয়ামারু, কথাটা ঠিক। হুই আসারা ভারি শয়তান। যারা ধুতি পরে তারা একেবারে শয়তানের বাচ্চা।

ঠিক, ঠিক। যা বলে দিয়েছি, তোমার সব মনে রয়েছে, দেখছি। আত্মপ্রসাদের হাসি ফুটল ম্যাকেঞ্জির মুখে, যাক ও-কথা। গাইডিলিওর কাছে যাওনি তো?

না, না।

ভালো করেছ। ও ডাইনি। একেবারে জানে খতম করে ফেলবে। বিস্ময়কর কৌশলে মুখেচোখে আতঙ্কের সব কটি রেখা ফুটিয়ে তুলল ম্যাকেঞ্জি, খবরদার ওর কাছাকাছি ঘেঁষবে না তোমরা।

ডাইনি! কে বললে ডাইনি? তুই মিথ্যে বলছিস। হুই যে মাধোলাল বললে, ও হল রানী। খুব ভালো ও, ডাইনি নয়। সোজাসুজি তাকাল সেঙাই, তুই সব মিথ্যে বলিস। তুই বড় শয়তান। মাধোলাল কত কী বললে রানীর সম্বন্ধে।

মাধোলাল! চমকে উঠল ম্যাকেঞ্জি, মাধোলাল কে?

সারুয়ামারু বলল, হুই যে বড় দোকান আছে ডিমাপুর যাবার পথে, সেই দোকানের মালিক মাধোলাল। কত কথা বললে মাথোলাল। ও তো আসান্যু, ধুতি পরে। অথচ কত ভালো। আমার বন্ধু হুই মাথোলাল। আমার বাবা ওর দোকান থেকে নিমক নিত, আমার ঠাকুরদা

সারুয়ামারুকে থামিয়ে দিল ম্যাকেঞ্জি, থাম থাম। আর কী বললে মাথোলাল? উত্তেজনায় চোখের মণি দুটো যেন ছিটকে বেরিয়ে আসবে ম্যাকেঞ্জির।

এবার সেঙাই বলল, হু-হু, সায়েবদের সঙ্গে কোথায় যেন আসাদের লড়াই হচ্ছে। কার যেন নাম বলল মাধোলাল। কি রে সারুয়ামারু, বল না হুই আসাদের সদ্দারটার নাম। আমার মনে পড়ছে না।

সারুয়ামারু বলল, আসান্যুদের সদ্দারটার নাম গান্ধিজি। মাথোলাল বললে, ওদের মহারাজ যেমন গান্ধিজি, আমাদের তেমনই রানী গাইডিলিও।

গান্ধিজি! কী ভয়ঙ্কর একটি শব্দ! সমতলের দেশ থেকে সব বাধা, সব ব্যবধান পেরিয়ে এই বনময় গিরিচূড়ায় এসে পৌঁছেছে। এই পাহাড়ের টিলায় টিলায়, গুহা আর অরণ্যে, ওই নামটা কী এক ইন্দ্রজালে বাতাসে বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে। গান্ধিজি। নাম নয়, একটা ভয়াল ভোজবাজি। একটা দুর্বোধ্য ভেলকি। এ ভোজবাজির রহস্য অন্তত পাদ্রী ম্যাকেঞ্জির অজানা। নাম নয়, ম্যাকেঞ্জির মনে হল, বিচিত্র এক বিস্ফোরণ। কলকাতা, সবরমতী, মহারাষ্ট্র হিমালয়ের পাদপীঠ থেকে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত বিশাল ভারতবর্ষের হৃৎপিণ্ড ওই একটি নামের মধ্যে উথলপাথল হয়ে যাচ্ছে। ওই একটি নাম দুর্গম নদী, বন-পাহাড়-সমতল অতিক্রম করে এই বুনো মানুষগুলির অস্ফুট চেতনায় কি অক্ষয় শিলালিপির মতো আঁকা হল? যেমন করে হোক, এই পাহাড়ী পৃথিবী থেকে, বন্য মানুষের চেতনা থেকে ওই শব্দটাকে চিরকালের জন্য মুছে দিতে হবে। নইলে উপায় নেই, রেহাই নেই। একটা দুর্বল রন্ধ্র পেলে ওই নামটা দুকুল ভাসিয়ে হু-হু–বন্যা নিয়ে আসবে। কোন অতল তলায় তলিয়ে যাবে এই উত্তুঙ্গ নাগাপাহাড়। অন্তত খবরের কাগজ এবং মাধোলালের মতো শয়তানদের মুখে মুখে সেই ভয়াবহ সংবাদই দেশের শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়ছে। ম্যাকেঞ্জি ভাবল, আজই একবার পুলিশ সুপার মিস্টর বসওয়েলের সঙ্গে দেখা করতে হবে।

এদিকে সেঙাই বলতে শুরু করেছে, তোরা সায়েব। মাধোলাল বলল, তোদের সবাইকে ওদের দেশ থেকে ভাগিয়ে দেবে। আমাদের রানী গাইডিলিও নাকি তোদের সঙ্গে লড়াই করবে।

আশঙ্কার পাত্রটা এবার কানায় কানায় ভরে উঠেছে। রানী গাইডিলিও! লড়াই! বলে কী সেঙাই!

ব্রেটনব্রুকশায়ারের সেই দুর্দান্ত আউটল এবং আজকের পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি জীবনে যেন প্রথম ভয় পেয়েছে। ঝাপসা গলায় সে বলল, সব মিথ্যে। আমাদের সঙ্গে তো লড়াই নয়; আমরা তোমাদের বন্ধু। ওরা, ওই সমতলের বাসিন্দারা বিদেশি।

সেঙাই বলল, মাধোলাল যে বললে, তোরা অন্য দেশ থেকে এসেছিস, তোরা বিদেশি। তোরা এখানে কী করতে এসেছিস?

মাথোলাল! নামটাকে দাঁতের ফাঁকে কড়মড় করে চিবোতে লাগল ম্যাকেঞ্জি। আচ্ছা, ওই হাফ-নেকেড গান্ধির চেলার সঙ্গে পরে দেখা হবে। বিড়বিড় করে কথাগুলো বলে একটা অখ্রিস্টানসুলভ গালাগালি আওড়াল ম্যাকেঞ্জি।

সেঙাই তখনও বলছে, কী করতে এখানে এসেছিস তোরা?

এ জিজ্ঞাসার উত্তর জানা আছে ম্যাকেঞ্জির। কিন্তু সে উত্তর অন্তত এদের কাছে দেওয়া চলবে না। একটি অর্ধনগ্ন পাহাড়ী মানুষের প্রশ্ন যে এত মারাত্মক, এত জটিল, তা কি আগে জানত পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি।

ধীরে ধীরে সুকৌশলে মধুর হাসিতে মুখখানা ভরিয়ে তুলল ম্যাকেঞ্জি। বলল, আচ্ছা সেঙাই, সালুয়ালাঙ বস্তির সঙ্গে তোমাদের খুব ঝগড়া, তাই না?অন্য একটি প্রসঙ্গে সরে গেল সে।

সেঙাই মাথা নাড়ল, হু-হু, ওরা আমাদের শত্রু।

আচমকা চিৎকার করে উঠল সারুয়ামারু, কি রে সেঙাই, মাধোলাল না গান্ধিজির লড়াই আর রানী গাইডিলিওর কথা বলতে বারণ করে দিয়েছিল?

হু-হু– প্রবলবেগে মাথা দোলাতে লাগল সেঙাই। তারপরেই রক্তচোখে তাকাল ম্যাকেঞ্জির দিকে, হুই শয়তানটা সব জেনে নিল। ওর জান একেবারে খতম করে দেব। হুই শয়তানটা আমাদের বেইমান করল।

আমরা বিশ্বাসঘাতী হলাম। বেইমানি করলাম।

হু-হু, আহে ভু টেলো! আমরা পাহাড়ী মানুষ; আমাদের কেউ অন্তত বেইমান বলতে পারে না। হু-হু, আনিজার গোসা এসে পড়বে। সব হুই শয়তান সায়েবটার জন্যে। পাশ থেকে বর্শাটা তুলে নিল সেঙাই। অব্যর্থ লক্ষ্য। সাঁ করে সেটার ফলা কবজিতে গেঁথে গেল পাদ্রী ম্যাকেঞ্জির। এক ঝলক তাজা রক্ত ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে এল। চার্চের চত্বরে মানবপুত্রের পবিত্র নামের ওপর এই পাহাড়ী পৃথিবী খানিকটা রক্তের কলঙ্ক মেখে দিল।

মার্ডার! মার্ডার! অ্যারেস্ট! অ্যারেস্ট–সন অব আ বিচ–আর্তনাদ করে উঠল ম্যাকেঞ্জি।

নিমেষে সেঙাইর ওপর মণিপুরী পুলিশ দুটো ঝাঁপিয়ে পড়ল। একজনের বেয়নেটের আধাআধি ফলা কোমরে গেঁথে গিয়েছে সেঙাইর। রাইফেলের কুঁদো দিয়ে তার মাথায় প্রচণ্ড এক ঘা বসিয়ে দিল অন্য জন।

আউ-উ-উ– চিৎকার করে সবুজ ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ল সেঙাই।

চার্চের দুটো বাড়ির পর আউট-পোস্ট।

ম্যাকেঞ্জি মণিপুরী পুলিশ দুটোর দিকে তাকাল। যন্ত্রণায় তার মুখখানা বিকৃত হয়ে গিয়েছে, শয়তানটাকে আউট-পোস্টে নিয়ে যাও। পাহাড়ী তেজ সব কমে যাবে ঠিকমতো ওষুধ পড়লে।

কবজির ক্ষতের ওপর আঙুল টিপে দাঁড়িয়ে রয়েছে ম্যাকেঞ্জি। আর এক পাশে বোধহীন, ভাবহীন, অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে সারুয়ামারু। ঘটনার আকস্মিকতায় একেবারে বোবা হয়ে গিয়েছে সে।

আবার চেঁচিয়ে উঠল ম্যাকেঞ্জি, নিয়ে যাও, হারি-ই আপ–

প্রায় অচেতন দেহ। সেঙাই-এর হাত ধরে ঘাসবনের ওপর দিয়ে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে চলল পুলিশ দুটো।

আচমকা নিষ্ক্রিয় অবস্থাটা কাটিয়ে উঠল সারুয়ামারু। পুলিশ দুটোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সেঙাইকে ছিনিয়ে নিল সে, ইজা হুবুতা! সেঙাইকে নিয়ে যাবে! একেবারে সাবাড় করে ফেলব।

সেঙাইকে ঘাসবনে ফেলে রেখে ফোঁস ফোঁস করে বারকয়েক নিশ্বাস ফেলল সারুয়ামারু।

মার্ডার, মার্ডার! পুলিশ, পুলিশ! চার্চ থেকে ম্যাকেঞ্জির চিৎকার আউট-পোস্টের দিকে। ধেয়ে গেল।

কয়েকটি মুহূর্ত। কোহিমার পথে ভারী বুটের আওয়াজ শোনা গেল। পাহাড়ী ঝড়ের মতো বাঙালি, বিহারি আর অসমিয়া পুলিশরা চার্চের নিরাপত্তায় ছুটে এসেছে।

সেঙাইকে কাঁধের ওপর তুলে পালিয়ে যায় নি সারুয়ামারু। এতক্ষণ তার চোখে শুধু পিঙ্গল আগুন ধকধক জ্বলেছে। সেঙাই-এর পাশে দাঁড়িয়ে দাঁতমুখ খিঁচিয়ে সমানে খিস্তি করে গিয়েছে সে, আহে ভু টেলো। সব টেফঙের বাচ্চা। সেঙাইকে একবার ছুঁলে সাবাড় করে ফেলব। ফাদার হয়েছে! করস আঁকব না। চাই না কাপড়। মাথোলাল ঠিক বলেছে, তোদের মতো শয়তানের সঙ্গে লড়াই করতে হবে। আমাদের পাহাড়ে এসে আমাদেরই মারবে!

পরশু বিকেলে সেঙাইকে খানকয়েক রঙচঙে বাহারে কাপড় দিয়েছিল পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি। সিজিটোর ঘর থেকে সেগুলো নিয়ে এসে ম্যাকেঞ্জির গায়ের ওপর ছুঁড়ে মারল সারুয়ামারু। প্রবল ঘৃণায় মুখখানা কুঁকড়ে গিয়েছে তার।