সব শুনে ভরোসালাল এবার জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার ঘরে মরদ ছাড়া আর কোঈ নেহী?’
‘নেহী?’
‘হো রামজী’ বলে একটু চুপ করে ভরোসালাল। পরক্ষণে আবার শুরু করে, ‘এবার তুমি চলতে পারবে?
মেয়েটা বলল, ‘পারব।’
‘বোত হোঁশিয়ার হয়ে পা ফেলে চল—‘
খুব সাবধানে চটচটে আঠালো কাদার ভেতর পা টেনে টেনে দু’জন এগুতে থাকে। সেই মধ্যবয়সী লোকটা তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে শাল এবং সিসম গাছটাছের ভেতর উধাও হয়ে গেছে। এখন আর তাদের দেখা যাচ্ছে না। ইচ্ছা করলে লম্বা লম্বা পা ফেলে ভরোসালাল পাহাড়ের খাড়াই বেয়ে অনেক উঁচুতে উঠে যেতে পারে। কিন্তু মেয়েটাকে এ অবস্থায় ফেলে তার পক্ষে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না।
জঙ্গলের জন্তু-জানোয়ার, খ্যাপা কুকুর আর নিজের পেট ছাড়া পৃথিবীর কোনো ব্যাপারেই ভরোসালালের আগ্রহ নেই। তবু মেয়েটার পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে তার অল্পস্বল্প কৌতূহল হতে লাগল। সে বলল, তোমার গাঁও কোথায়?
মেয়েটি বলল, ‘পাঁচ মিল (মাইল) পশ্চিমে, নাম ঝুমরিতালিয়া—।’
‘গাঁও থেকেই এখন আসছ?’
‘হাঁ—’।
‘পাহাড়ের ওপারে কোথায় যাবে?’
‘টেউন ভকিলগঞ্জে—’
‘কোনো রিস্তার (আত্মীয়) বাড়ি?’
‘নেহী।’
‘তব?’
একটু চুপ করে থেকে মেয়েটা বলল, ‘আমি অসপাতাল (হাসপাতাল) যাচ্ছি।’
‘অসপাতাল কেন?’ বলেই ভরোসালালের মনে পড়ল মেয়েটা গর্ভিণী নিশ্চয়ই বাচ্চাটাচ্চা হবার ব্যাপারে হাসপাতালে চলেছে। সঙ্গে সঙ্গে সে আবার বলে উঠল, ‘সমঝ গিয়া, রামজীকা কিরপা—’
মেয়েটা মুখ নিচু করে হাঁটতে লাগল।
কিছুক্ষণ দু’জনই চুপচাপ।
এই শেরমুণ্ডি পাহাড়ের গায়ে নির্দিষ্ট কোনো রাস্তা নেই। ঝোপঝাড় এবং জঙ্গলের মধ্য দিয়ে ফাঁকা জায়গা দেখে দেখে চড়াই বেয়ে ওপরে উঠতে হচ্ছে।
একসময় মেয়েটি জড়ানো গলায় হঠাৎ ডেকে ওঠে, ‘এ আদমী—’।
ভরোসালাল ঘাড় ফিরিয়ে তাকায়, কিছু বলবে?
‘হাঁ একগো বাত—।’
‘বল—।’
তক্ষুনি কিছু বলল না মেয়েটা। খানিকক্ষণ বাদে প্রায় মরীয়া হয়েই সে শুরু করল, ‘আমি অকেলি আওরত, তবিয়তের হালও খুব খারাপ। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পাহাড় বাইতে ডর লাগছে। তুমি আমাকে অকেলি ফেলে রেখে চলে যেও না।’
ভরোসালাল ভালো করে মেয়েটাকে লক্ষ্য করলা তার দুর্বল রক্তহীন শরীর, গর্তে বসে-যাওয়া চোখের কোলে গাঢ় কালি, পেরেকের মাথার মতো ঠেলে-ওঠা কণ্ঠার হাড়, মাংস-ঝরে-যাওয়া। লম্বাটে রোগা মুখ, শির-বার-করা সিকড়ে সিকড়ে হাত, ন-দশ মাসের বাচ্চাওলা স্ফীত পেট, বোতামহীন জামার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা টসটসে স্তন, স্তনের বোঁটার চারপাশে ভুসো কালির ছোপ, ইত্যাদি দেখতে দেখতে কেমন যেন মমতা বোধ করতে লাগল সে বলল, ‘আরে না-না, তোমাকে একলা ফেলে আমি যাচ্ছি না। টেউন ভকিলগঞ্জে আমিও যাচ্ছি। আমার সঙ্গে সঙ্গে তুমি সেই পর্যন্ত যেতে পারবে’।
মেয়েটির মুখচোখ দেখে মনে হল, একটা শক্তসমর্থ সবল পুরুষের ভরসা পেয়ে সে অনেকটা নিশ্চিন্ত হতে পেরেছে।
পাঁক ঠেলে ঠেলে দু’জনে চলেছে তো চলেছেই। আরো খানিকক্ষণ যাবার পর হঠাৎ ভরোসালাল লক্ষ্য করল, মেয়েটার পা ঠিকমতো পড়ছে না, আবার সে টলতে শুরু করেছে। জোরে জোরে শ্বাস পড়ছে তারা এবারও তাকে ধরে ফেলল ভরোসালাল। জিজ্ঞেস করল, ‘কী হল?’
মেয়েটা কাঁপা দুর্বল গলায় বলল, ‘মাথা ঘুরছে।’
হাঁটতে তখলিফ হচ্ছে?’
‘হাঁ।’
‘থোড়েসে জিরিয়ে নাও—’।
ওখানেই একটা পাথর দেখে বসে পড়ে মেয়েটা। কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে উঠতে উঠতে বলে, ‘চল—’কিন্তু পা ফেলতে গিয়ে আবার টলতে শুরু করে।
ভরোসালাল চিন্তিত ভাবে বলল, ‘মালুম হচ্ছে তুমি হেঁটে যেতে পারবে না। পা ফেলতে গেলেই টলছ, মাথায় চক্কর লাগছে। এক কাম করা যাক—’।
মেয়েটি নির্জীব গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘কী? ‘তোমাকে আমি ধরে ধরে নিয়ে যাই। তোমার যা হাল, অকেলি চলতে গেলে পড়ে গিয়ে বিপদ হয়ে যাবে।’
মেয়েটি আস্তে মাথা হেলায়। অর্থাৎ ভরোসালাল ধরে নিয়ে গেলে তার আপত্তি নেই। তা হলে সে বেঁচেই যায়।
ভরসালাল মেয়েটিকে ধরে ফেলল। এক হাতে তার কাঁধ বেড় দিয়ে আস্তে আস্তে আবার ওপরে উঠতে লাগল। খানিকটা যাবার পর সে টের পেল মেয়েটার হাঁটার শক্তি ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে। আর যত ফুরিয়ে আসছে ততই তার শরীরের সব ভার ভরোসালালের হাতের ওপর এসে পড়ছে। কাদাভর্তি পিছল পথে বাচ্চাসমেত একটি গর্ভিণী মেয়ের গোটা দেহের ওজন একটা হাতের ওপর নিয়ে এগুনো সম্ভব না। ভরোসালাল মেয়েটাকে প্রায় সাপটে বুকের ভিতর নিয়ে এল। সেই অবস্থাতেই তাকে নিজের সঙ্গে লেপটে নিয়ে পাহাড় ভাঙতে লাগল আর সমানে বিড় বিড় করতে লাগল, ‘হো রামজী—তেরে কিরপা, তেরে কিরপা—’
এতক্ষণ বৃষ্টির জোর ছিল না, তবে মিহি চিনির দানার মতো সেটা ঝরেই যাচ্ছিল। হঠাৎ আবার তোড়ে নেমে এল বৃষ্টিটা হাওয়া পড়ে গিয়েছিল সেটাও বৃষ্টির মতোই আচমকা উন্মাদ হয়ে পাহাড়ী জঙ্গলের ভেতর দিয়ে সাঁই সাঁই ঘোড়া ছোটাতে শুরু করে দিল।
এদিকে মেয়েটির দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি শেষ হয়ে গেছে। তার কোমরের তলার দিকটা শরীর থেকে আলগা হয়ে যেন ঝুলে পড়ছে। ভরোসালাল দিশেহারা হয়ে পড়ল। গর্ভিণী মেয়েটাকে সে কথা দিয়েছে, শেরমুণ্ডি পাহাড় পার করে দেবো কিন্তু এখন, এই অবস্থায় কিভাবে যে তার এবং তার পেটের বাচ্চাটাকে রক্ষা করবে—ভেবে পাচ্ছে না।
