বোঝা যাচ্ছে, বৃষ্টির জন্যই ওরা ওখানে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। গাছতলায় মাথা গুঁজে জলের ছাঁট থেকে নিজেদের যতটা বাঁচানো যায়। ভরোসালাল দৌড়ে সেখানে চলে গেল।
ভরোসালালের বয়স পঞ্চাশ-বাহান্না শরীরের কাঠামো দারুণ মজবুত চওড়া ছড়ানো কাঁধ তার, এবড়ো-খেবড়ো পাথরের মতো প্রকাণ্ড বুক, হাতদুটো জানু ছাড়িয়ে কয়েক আঙুল নেমে গেছে। গায়ের চামড়া পোড়া ঝামার মতো, সাত জন্মে সেখানে তেল পড়ে না। ফলে বারোমাস খসখসে কর্কশ গা থেকে খই উড়তে থাকে। চৌকো মুখে খামচা খামচা দাড়ি তার, থ্যাবড়া থুতনি। চেহারা যেমনই হোক, চোখদুটো কিন্তু আশ্চর্য মায়াবী যেমনি সরল তেমনি নিষ্পাপ।
ভরোসালালের পরনে হাঁটু পর্যন্ত খাটো টেনি আর ফতুয়ার মতো লাল কামিজ। একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে তার ঘাড়ের অনেকখানি মাংস শুকিয়ে ডেলা পাকিয়ে প্রায় ঝুলে আছে। বাঘের থাবা খেয়ে ঘাড়টার অবস্থা এই রকম
ভরোসালাল একজন ‘বীটার’। এ অঞ্চলে যাকে জঙ্গল-হাঁকোয়া বলে সে তা-ই। তার কাজ হল বনে-জঙ্গলে টিন পিটিয়ে আর চেঁচিয়ে তাড়া করে করে বাঘ ভাল্লুক কিংবা অন্য জন্তু-জানোয়ারকে শিকারীদের বন্দুকের মুখে নিয়ে যাওয়া। বছর তিনেক আগে রক্সেলে এক শিকারীর জন্য টিন পেটাতে গিয়ে বাঘের থাবায় ঘাড়ের মাংস ওইভাবে ঝুলে গেছে। ‘বীটারের কাজ ছাড়া আরো একটা কাজ করে থাকে ভরোসালাল। চারিদিকে যত ছোটখাটো শহর আছে, সেসব জায়গায় মিউনিসিপ্যালিটিগুলো মাঝে মাঝে রাস্তার বেওয়ারিশ খ্যাপা কুকুর ধরে মেরে ফেলে। এই কুকুর ধরা আর মারার কাজটিও করে থাকে সে।
বীটারের কাজ কিংবা কুকুর মারার দায়িত্ব কেউ তাকে ডেকে দেয় না। ভরোসালাল নিজে থেকেই খোঁজ-খবর নিয়ে শিকারীদের বাড়ি বাড়ি কিংবা মিউনিসিপ্যালিটিগুলোর দরজায় দরজায় হানা দেয়। এটাই তার জীবিকা। খুবই নিষ্ঠুর হয়তো, কিন্তু স্রেফ পেটের জন্য এসব করতে হয় তাকে।
এদিকে বৃষ্টির জোর আরো বেড়েছে। আকাশের যা অবস্থা তাতে জল কখন ধরবে তার ঠিক ঠিকানা নেই। ঝাঁকড়া-মাথা পিপুল গাছের তলায় দেহাতী মানুষগুলোর সঙ্গে গা-ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়েও কি রেহাই আছে! ডালপালা আর পাতার ফাঁক দিয়ে ঝরঝর জল পড়ে গা-মাথা ভিজিয়ে দিচ্ছে। তবে খোলা জায়গায় দাঁড়ালে চোখের পলকে চান হয়ে যাবে। সেই তুলনায় এখানে ভেজাটা কম হচ্ছে, এই আর কি।
অন্যমনস্কর মতো তাকিয়ে তাকিয়ে বৃষ্টির ভাবগতিক দেখছিল ভরোসালাল। হঠাৎ পাশের লোকটা বলে উঠল, ‘বহোত ভারী বারিষ (বৃষ্টি)!
ভরোসালাল ঘাড় ফেরাল। দেখল—লোকটা মধ্যবয়সী, মাথায় পাগড়ী, ভাঙাচোরা চেহারা। সে বলল, ‘হাঁ–’।
লোকটা এবার বলল, মালুম হচ্ছে এ বারিষ জলদি রুখবে না। ‘ তার ভাষা হিন্দি এবং বাংলায় মেশানো। খুব সম্ভব বিহার-বাংলার সীমান্তে কোন অঞ্চলে তার বাড়ি।
ভরোসালাল বলল, ‘হাঁ–’।
মধ্যবয়সী লোকটা এবার তার সঙ্গীদের দেখিয়ে বলল, ‘দুফারে হামলোককো টেউন ভকিলগঞ্জে যাবার বাত ছিল। লেকিন কী করে যাই?
বোঝা যাচ্ছে, এরাও শেরমুণ্ডি পাহাড় পেরিয়ে ওপারে যাবে। ভরোসালাল কৌতূহলহীন চোখে লোকটার সঙ্গীগুলোকে একবার দেখে নিল। তারা অবশ্য এই লোকটার মতো মাঝবয়সী না, দামড়া মোষের মতো তারা একেকটা তাগড়া জোয়ান। তাদের দেখতে দেখতে সেই মেয়েটার দিকে নজর পড়ে গেল ভরোসালালেরা দলটার মধ্যে সে একা—একমাত্র মেয়ে।
জীবন বা মানুষ সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা খুবই কম ভরোসালালেরা জোয়ান বয়সের শুরু থেকে বনের হিংস্র জন্তু-জানোয়ার আর খ্যাপা কুকুরের পেছনে ছুটে ছুটে এতগুলো বছর কেটে গেছে। তার। তবু সে বুঝতে পারল মেয়েটা গর্ভিণী। দু-চার দিনের মধ্যে তার বাচ্চাটাচ্চা হবে।
পাশের লোকটা প্রচণ্ড বক বক করতে পারে। এবার সে যা বলল সংক্ষেপে এইরকম বৃষ্টিতে ভিজে পাহাড়ী রাস্তার হাল খুবই বুরা (খারাপ হয়ে গেছে। এখন সেখানে উঠতে যাওয়া বোকামি,
পা পিছলে পড়ে গেলে আর দেখতে হবে না—নির্ঘাত খতম হয়ে যেতে হবে মেয়েটির দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে ভরোসালাল বলল, হাঁ—’।
লোকটা এবার বলল, ‘লেকিন দুফারের ভেতর ভকিলগঞ্জে হাজির হতে না পারলে কামটা ছুটে যেতে পারে?’ তাকে খুবই চিন্তিত দেখাল।
‘কিসের কাম?’
‘ভকিলগঞ্জে নদীর কিনারে বাঁধ বানানো হবে। আমরা মাটি কাটার কামে যাচ্ছি। দেরি হয়ে গেলে গরমিন অফসর (গভর্নমেন্ট অফিসার) যদি ভাগিয়ে দ্যায়—’।
‘রামজী কিরপা করলে ভাগাবে না।’ বলতে বলতে আবার মেয়েটির দিকে তাকাল ভরোসালাল। পৃথিবীর কোন কিছু সম্বন্ধেই বিশেষ কৌতূহল নেই তারা নিজের পেটের জন্য বনে-জঙ্গলে বা লোকালয়ে সর্বক্ষণ তাকে এত ব্যস্ত থাকতে হয় যে অন্য দিকে চোখ তুলে তাকাবার সময় পর্যন্ত পায় না যদিও বা পায়, খুবই আগ্রহশূন্যভাবে এই পৃথিবী আর পৃথিবীর মানুষকে দেখে থাকে। তবু আবছাভাবে ভরোসালাল ভাবল, ওই মেয়েটির পেটে অন্তত ন-দশ মাসের বাচ্চা রয়েছে। এ অবস্থায় সে-ও কি মাটি কাটতে চলেছে? জেনানাদের এ সময়টা কোনো ভারী কাজ করা ঠিক না ভাবল বটে, তবে কিছু বলল না।
সেই লোকটা ঘাড়ের পাশ থেকে বলে উঠল, রামজী কি কিরপা করবে?
ভরোসালাল এবার আর উত্তর দিল না। অন্যমনস্কের মতো মুখ ফিরিয়ে মেঘের ভারে নেমে আসা ঝাপসা আকাশ দেখতে লাগল।
