আরক্ত চোখ দুটো তুলে চারিদিকে একবার তাকাল কাসেম। পচা মাছের দুর্গন্ধ, উঠানের আবর্জনা, কাকের মুখে মুখে চলে-আসা মাছের কাটা আর থমথম নির্জনতায় আগামী গোরস্থানের ভয়াবহ ইঙ্গিত!
বিক্ষত স্নায়ুগুলোর মধ্যে কালকের রাত্রিটাকে একবার ধরবার চেষ্টা করল কাসেম। একটা আতঙ্কময় দুঃস্বপ্নের মতো সেটা বারবার ছিটকে ছিটকে যাচ্ছে চেতনা থেকে।
উঠানের ওপর এসে দাঁড়াল মুন্সীদের ছোকরা গোমস্তা গোকুল, কাসেম ভাই, তোমার বউঠাইনে একবার যাইতে কইছে–
যাও, যাও। আমার বউঠাইন আবার কে? হিন্দু কখনও মুসলমানের আপন হয়? যাও, যাও
হাঁটু দুটোর অবরোধে মুখখানা আবার গোপন করল কাসেম। একটা বন্দী কান্নার আবেগ ঢেউ-এর মতো কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল সমস্ত দেহের ওপর।
গোকুল বলল, বেশ না আস, না আসবা। বউঠাইনে দুইটা ট্যাকা চাইছে। নৌকার ভাড়া লাগব। কেরায়া ভাড়া কইরা দিছি; পদ্মার পারে তার কোন মাসিবাড়ি যাইব না কী?
চকিত হয়ে উঠে দাঁড়াল কাসেম, কোনও চুলায় তার কোনও কুটুম আছে বইল্যা তো জানি না। কই সে?
খালের ঘাটে কেরায়া নৌকায় রইছে।
চিৎকার করে উঠল কাসেম। আমারে আগে কও নাই ক্যান, কেরায়া করণের আগে আমারে একবার খবর দিতে পারো নাই? দ্যাখতাম, কেমুন যাইতে পারে আমারে ফেলাইয়া। চলো, চলো। ইসার কাইতানের মতো হু-হুঁ করে খালের ঘাটে ছুটে এল কাসেম। কেরায়া নৌকার ছই-এর গুণ্ঠন থেকে জলধরের বউয়ের সাদা থানে আঁচল দেখা যায়।
নৌকার গলুইটা চেপে ধরল কাসেম। বিউঠাইন–গলা থেকে ভারী কান্না বেরুল তার।
না, ঠাকুরপো। আমার লেইগ্যা তোমার কষ্টের শ্যাষ নাই। বদনামের শ্যাষ নাই। কাইল আমার লেইগ্যাই মাইর খাইলা। আমারে দুইটা ট্যাকা দ্যাও। আমি যাই গিয়া।
জলধরের বউয়ের গলাটাও ঘনমন্থর।
তুমি আমারে ফেলাইয়া যাইতে পারবা?
বউ রইছে। তারে লইয়া সুখে ঘর করো ঠাকুরপো! রাজা হইও। একাট উত্তরঙ্গ কান্নার উৎক্ষেপকে দমন করে নিল জলধরের বউ।
জানো বউঠাইন, ওই কাছিমের ছাওটা কাইল একজনের লগে ট্যাকাপয়সা বেবাক লইয়্যা ভাগছে। এইর পরেও তুমি আমারে ছাইড়া যাইবা? অশ্রুঝরা চোখের করুণার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কাসেম।
ঘরের বউ পরপুরুষের লগে ভাগছে! ছই-এর অন্তরাল থেকে একটা চমকিত কণ্ঠ ভেসে এল।
হ, ভালোই হইছে। আপদটা ভাগছে। না হইলে কী তোমারে পাইতাম ফিরা? ঘরে মাছ পচতে আছে। একেবারে গোরস্থানের মতো হইয়া গেছে সব। আস, ঘরে চলো। এখন তুমি না থাকলে, আমি মইরাই যামু। বর্ষার ইসার মতো দুচোখ বেয়ে বন্যা নামল কাসেমের।
এতক্ষণ রোধ করে রাখবার পরে জলধরের বউয়ের কান্নাও সমস্ত বাঁধ ভাসিয়ে হু-হুঁ করে নেমে এল ছই-এর ভেতর।
মাঝি ব্যস্ত গলায় বলল, বেলা হইয়া গেল দুফার, এখন নৌকা না ছাড়লে, রাইত ভোর হইয়া যাইব পদ্মার পারে যাইতে।
রোদন আর পুলক-জড়ানো অপূর্ব অনুভূতির গলায় কাসেম বলল, তোমার আর রাইত ভোর করতে লাগব না মাঝি! বউঠাইনের যাওয়া হইব না। আমারে ফেলাইয়া কি বউঠাইন যাইতে পারি?
মানুষ
ঠিক দুপুরবেলা শেরমুণ্ডি পাহাড়ের কাছাকাছি আসতেই হুড়মুড় করে বৃষ্টিটা নেমে গেল।
সেই ভোরে—আকাশ তখন ঝাপসা, রোদ ওঠেনি, বাঁশের লাঠির ডগায় রঙ-বেরঙের তালি মারা ঝুলিটা বেঁধে এবং ঝুলিসুদ্ধ লাঠিটা কাঁধে ফেলে বেরিয়ে পড়েছিল ভরোসালালা সে আসছে রাজপুত ঠাকুর রঘুনাথ সিং-এর তালুক হেকমপুর থেকে, আপাতত যাবে শেরমুণ্ডি পাহাড়ের ওপারে টাউন ভকিলগঞ্জে.
ভোরে ভরোসালাল যখন হেকমপুর থেকে বেরোয় তখন আকাশের চেহারা দেখে টের পাওয়া যায়নি দুপুরের মধ্যেই চারদিক ভেঙেচুরে এভাবে বৃষ্টি নেমে যাবে। খুব নিরীহ চেহারার দু-চার টুকরো ভবঘুরে মেঘ মাথার ওপর বাতাসের ধাক্কায় ধাক্কায় এদিক-সেদিক ভেসে বেড়াচ্ছিল। তারপর বেলা একটু বাড়লে চাঁদির থালার মতো সূর্যটা আকাশের গড়ানে গা বেয়ে উঠে এসেছিল। গলানো রূপোর মতো ঝকঝকে রোদে মাঠ-ঘাট-বন-জঙ্গল ভেসে যাচ্ছিল তখন কিন্তু এই রোদ আর কতক্ষণ! বেলা আরেকটু চড়বার সঙ্গে সঙ্গে এক ছুঁতে বাতি নিভে যাবার মতো আচমকা চারদিকে অন্ধকার নেমে এসেছিল মকাইয়ের খেত, যবের খেত, আখের খেত, নানারকম ঝোপঝাড় আর হতচ্ছাড়া চেহারার দু-একটা গ্রাম পেরিয়ে আসতে আসতে ভরোসালালের অজান্তে কখন যে ভারী ভারী চাংড়া চাংড়া জলবাহী মেঘে আকাশ ছেয়ে গিয়েছিল, টের পাওয়া যায়নি ভরোসালাল চমকে উঠেছিল মেঘের ডাকে, সেই সঙ্গে তার চোখে পড়েছিল আকাশটা আড়াআড়ি চিরে বিদ্যুৎ ছুটে যাচ্ছে।
মাথার ওপরে মেঘ আর বিদ্যুৎচমক নিয়ে জোরে জোরে পা চালিয়ে দিয়েছিল ভরোসালালা আজ যেমন করেই হোক, তাকে শেরমুণ্ডি পাহাড়ের ওপারে ভকিলগঞ্জে পৌঁছতেই হবে।
হাঁটতে হাঁটতে ঘাড় ফিরিয়ে বার বার পেছন দিকটা দেখে নিচ্ছিল ভরোসালালা হঠাৎ একসময় অনেক, অনেক দূরে আকাশ যেখানে পিঠ বাঁকিয়ে দিগন্তে নেমেছে সেখানটায় বৃষ্টি নেমে গিয়েছিল। জল নামতে দেখে দৌড়তেই শুরু করেছিল ভরোসালাল কিন্তু বৃষ্টিটা নাছোড়বান্দা হয়ে তার পিছু নিয়েছে। শেষ পর্যন্ত শেরমুণ্ডি পাহাড়ের তলায় এসে তাকে ধরেই ফেলেছে।
বেশ কোমর বেঁধেই নেমেছে বৃষ্টিটা। তার সঙ্গে হাত মিলিয়েছে উল্টোপাল্টা ঝড়ো হাওয়া। এই ঝড়বৃষ্টি ঘাড়ে নিয়ে সামনের খাড়া পাহাড়ে যাওয়া সম্ভব নয়। ভরোসালাল এদিক-সেদিক তাকাতে লাগল। এই মুহূর্তে মাথা বাঁচাবার জন্য কোথাও একটু দাঁড়ানো দরকার। হঠাৎ সে। দেখতে পেল, খানিকটা দূরে একটা ঝাঁকড়া-মাথা পিপুল গাছের তলায় দশ-বারোটা দেহাতী লোক দাঁড়িয়ে আছে, তাদের মধ্যে একটা মেয়েও রয়েছে।
