ঘরের পৈঠার কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন ছোট কর্তা। তাঁর চোখ দুটো তুলসী-বনের বাঘের মতো জ্বলছে ধক ধক করে। ঝকঝকে ছুরির ফলার মতো দাঁতগুলো বিকাশ করে চতুষ্পদের ভঙ্গিতে খিঁচিয়ে উঠল ছোট কর্তা, তাই কই নাগরখান কে? শ্যাষে শেখের হাতে ইজ্জৎ দ্যাও হিন্দুর বউ হইয়া! এই সব পাপ কাম এইখানে এই কৃষ্ণের রাজত্বে চলবে না। কলি কাল পড়েছে বইল্যা যা খুশি করবা মনে ভাইবো না।
কি কন আপনে? কাসেম আমার ছোট ভাই।
জলধরের বউয়ের গলায় ব্যাকুল আবেদন।
ছোট ভাই রাইতে আইস্যা বিছানায় থাকে বুঝি! দিনে খবর লয় না! আচমকা চিৎকার করে উঠলেন ছোট কর্তা। হরি, যুগেশ হরেন, সব লাঠি লইয়া আস-গেরামে পাপ রাখুম না। নারায়ণ, নারায়ণ-চক্ষের নিমেষে আটকিরার জঙ্গল দলিত করে লাঠি বল্লম নিয়ে শিকারের উত্তেজনায় ছুটে এল যোগেশরা।
ছোট কর্তা বৈষ্ণবীয় নির্দেশ দান করলেন, কিছু মনে কইরো না জলধরের বউ, সব কৃষ্ণের ইচ্ছা, যুগেশ
মুহূর্তে দুখানা লাঠি শূন্যে আন্দোলিত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল কাসেমের ওপর। চড়াৎ করে খুলিটা ফেটে খানিকটা রক্ত চলকে এসে পড়ল সাদা সাদা ভাতের ওপর।
ও বাজান!
কপালের ওপর হাতখানা চাপা দিয়ে সাকিটার ওপর আছড়ে পড়ল কাসেম।
হায় ভগবান! তোমার মনে এই আছিল–সারাদিনের না-খাওয়া মানুষ জলধরের বউয়ের বুকফাটা আর্তনাদটা কুণ্ডলিত হয়ে আকাশের দিকে উঠে গেল। মুচ্ছিত হয়ে মেঝের ওপর লুটিয়ে পড়ল জলধরের বউ।
কৃষ্ণের ইচ্ছায় এইমাত্র যে কর্মটি হল সেই রক্তাক্ত বীরকীর্তির দিকে তাকিয়ে একবার প্রসন্ন গলায় নাম-কীর্তন করলেন ছোট কর্তা। নারায়ণ, নারায়ণ–
এত আনন্দের মধ্যেও একা অমসৃণ ভাবনা ময়না কাটার মতো চেতনায় খচখচ করতে লাগল। যবনের সঙ্গে কী করে পীরিত হল মাগিটার? সবই তার ইচ্ছা। মনে মনে ছোট কর্তা একবার জপ করে নিলেন; কৃষ্ণ পদে রাখ রে মন, সব জনমের ধন।
দিগ্বিজয় সমাপ্ত করে বাহিনী নিয়ে একটু পরেই অদৃশ্য হয়ে গেলেন ছোট কর্তা।
.
চেতনা একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি কাসেমের, কপাল ফেটে ভিরমি লেগেছিল। ছোট কর্তারা বীর কর্ম সমাপ্ত করে চলে যাবার পরই উঠে বসল কাসেম। পাশে মূৰ্ছিত হয়ে পড়ে রয়েছে জলধরের বউ। কাসেম ডাকল, বউঠাইন, বউঠাইন
কিন্তু জলধরের বউর দেহটা স্থির নিস্পন্দ। কুপির লালাভ আলোতে চোখের মণি দুটো নিথর হয়ে রয়েছে। এক পাশে ভাতের হাঁড়িটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে রয়েছে–চার দিকে রাশি রাশি ভাত ইতস্ততঃ ছড়ানো।
একটা নতুন পাতিল থেকে জল নিয়ে জলধরে বউর মুখে ঝাঁপটা দিতে লাগল কাসেম।
এক সময় বিস্ফারিত চোখের মণি দুটো নড়ে উঠল জলধরের বউর; গলার ধু ধু স্পন্দনে জীবনের মৃদু লক্ষণ, ঠাকুরপো।
তোমার মনে এই আছিল বউঠাইন, তোমার মনে এই আছিল–
জলধরের বউর শিয়র থেকে উঠে আম-সুপারীর গহন অরণ্যপথ ধরে ছুটতে শুরু করল কাসেম।
ঠাকুরপো-ঠাকুরপো–আমি কিছুই জানতাম না এইর
একটা করুণ আর্তনাদ যেন কাসেমের পদধ্বনি অনুসরণ করতে করতে একটা অপুর্ব মিনতির রেশ নিয়ে গড়িয়ে আসতে লাগল পেছন দিক থেকে।
সারাটা রাত ইলসার পার দিয়ে শ্মশান-কবর ডিঙিয়ে গতচেতন মাতালের মতো ঘুরপাক খেয়ে বেড়াল কাসেম। রাশি রাশি রক্ত মালতীর মতো আলো জ্বালিয়ে ইলিস-ডিঙিগুলো রুপালি ফসলের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েছে। কিন্তু আজ আর ইসার জলতরঙ্গ তাকে হাতছানি দিল না। একটা নির্জন বিবরে জীবনের ক্ষতক্লেদ লেহন করবার জন্য নিরিবিলি অবসর খুঁজেছে সে; কিন্তু শরীরের সমস্ত রক্ত মাথার মধ্যে জমা হয়ে বিঘূর্ণিত হচ্ছে। আর সেই রক্তকেন্দ্র থেকে উল্কাপিণ্ডের মতো ছিটকে ছিটকে পড়ছে কতকগুলো মুখ-ফুলমন, বউঠাইন, মুন্সীদের ছোটকর্তা-দিবা-রাত্তিরে কাঁটালতা, ঝোপ-জঙ্গল আছাড় খেতে খেতে অবসন্ন চরণসঞ্চারে বাড়ির উঠানে পা দিল কাসেম; তার পর মৃত গলায় ডাকল, বউ, অ বউ-দুয়ার খোল।
দরজার পাল্লা খোলা রয়েছে। সেদিকে তাকিয়ে বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা কেমন যেন চমকে উঠল কাসেমের।
একটা বিরাট লাফে উঠান থেকে ঘরের মধ্যে এসে পড়ল কাসেম। মাচার ওপর জীর্ণ বিছানায় কেউ নেই।
চেতনার মধ্যে একটা বিদ্যুতের চমক বয়ে গেল যেন। এস্তে ভাঙা কাঠের বাক্সটার কাছে চলে এল কাসেম। ডালাটা খুলবার সঙ্গে সঙ্গেই মুখের সমস্ত রক্ত সরে বিবর্ণ হয়ে গেল। কয়েক কুড়ি টাকা এনে রেখেছিল কাসেম, তার মধ্যে একটি অচল কড়িও অবশিষ্ট নেই।
সেখান থেকে একটা অগ্নিমুখী হাউইর মতো সরে এল পশ্চিমের বাঁশের খুঁটিটার দিকে। ফুকর করে করে কয়েক কুড়ি কাঁচা টাকা রেখেছিল, বাঁশ খুঁটিটা দুখণ্ড হয়ে পড়ে রয়েছে।
ফুলমনের সঙ্গে সেই অপরিচিত লোকটার অশোভন আলিঙ্গনের অর্থটা এতক্ষণে স্বচ্ছ আয়নায় মতো পরিস্কার হয়ে এসেছে কাসেমের কাছে। ফুলমন পালিয়ে গিয়েছে। ঘরের অভিশপ্ত পরিবেষ্টন থেকে বাইরের বারান্দায় এসে বসল কাসেম। শরীরের জোড়গুলো যেন শিথিল হয়ে আসছে। দুটো হাতের আবরণে মুখটা ঢেকে একটা বজ্ৰপ্ৰহত মানুষের মতো বসে রইল কাসেম। উঠান থেকে কয়েক দিন আগে এনে রাখা পচা ইলিশ মাছের তীক্ষ্ণ দুর্গন্ধটা বাতাসে বাতাসে বিষ ছড়াতে লাগল।
এক সময় পুবের ক্রান্তিরেখায় সূর্য সঞ্চারিত হল। রোদের একটা সোনালি রেখা এসে স্থির হয়ে জ্বলছে কাসেমের কপালের রক্তচিহ্নে।
