বাড়ির উঠানের ওপর আসতে আসতে মাথার ওপর সূর্যটা তির্যকভাবে লম্বিত হয়ে ঝুলতে লাগল; পায়ের নীচের ছায়াটা হ্রস্বতম হয়ে এসেছে। উঠানের ওপর পা দিয়েই শরীরের সমস্ত রক্ত ফেনিয়ে ব্রহ্মতালুতে গিয়ে আবর্তিত হতে লাগল কাসেমের।
নিরাবৃত বারান্দার ওপর রুস্তমের অন্তরঙ্গ আলিঙ্গনে ধরা রয়েছে ফুলমন। কী সে করতে পারে? হাতরে ধারালো ছেদা-খানা দুজনের গলার ওপ বসিয়ে একেবার সহমরণে পাঠিয়ে দেওয়া ছাড়া পুরুষের মতো বীৰ্য্যবান কাজ আর কী আছে? অথবা নিজের ঘাড়েই চাপিয়ে দেবে নাকি দা-টা? সমস্ত চিন্তা ইন্দ্রিয়কোষগুলো থেকে এক মুহূর্ত বিলুপ্ত হয়ে গেল কাসেমের।
আর বারান্দার ওপর থেকে রুস্তম আর ফুলমন একসঙ্গেই ভূত-দর্শনের পুলকিত শিহরণ অনুভব করল।
কয়েকটা নিষ্ক্রিয় মুহূর্ত রুদ্ধশ্বাস হয়ে রইল তিন জোড়া বজ্রপ্রহত চোখের নিস্পলক আয়নায়।
তারপর পুরুষের পলায়নের স্বাভাবিক প্রেরণায় রুস্তম ফুলমনকে বারান্দার ওপর আছড়ে ফেলে একটা জ্যা-মুক্ত তীরের মতো সাঁ করে বাইরে অরণ্যের বোরখায় মিলিয়ে গেল।
গন্ধসাবান-মাখা ফুরফুরে দেহটা থেকে ধূলোর কণাগুলো ঝেড়ে উঠে বসেছে ফুলমন।
কাসেমের গলাটা ডোরাকাটা বাঘের মতো গর্জন করে উঠল এই প্রথম। ও কে? ও আসে ক্যান?
প্রথমে রক্তধারার মধ্যে ভয়ের একটা আকস্মিক ছায়াপাত ঘটেছিল। এতক্ষণে নিজেদের সামলে নিয়েছিল ফুলমন; ও আসে ক্যান্ ওরে জিগাইও শরীরে তেল থাকলে! তুমি যাও ক্যান ওই রাঢ়ি মাগির বিছানায়?
সাবধান সুমুন্দির ঝি, তোরে আইজ কোতল করুম।
কাসেম হাতের ছো-খানা ছুঁড়ে মারার আগেই তৎপরতার সঙ্গে ঘরে ঢুকে ঝাঁপটা চক্ষের পলকে টেনে দিল ফুলমন। আর সেই কঁপের ওপর দা-খানা এসে আছড়ে পড়ল।
উঠান থেকে আবারও গর্জন করে উঠল কাসেম; তোরে আমি শ্যাষ করুম আইজ; তবে আমি শেখের ছাও। ওই কাছিমের বাচ্চাটারে আইন্যা একলগে তোগো দুইটারে ইসা মাছের লাঘান কুচি কুচি করুম।
ঘরের ভেতর থেকে আনুনাসিক ব্যঙ্গের অপমান ভেসে এল; তোর লাঘান কত ড্যাকরা দেখলাম রে নিঃবইংশ্যা! আমারে কাটব, আয় আগে তোর মাথা লামাইয়া দিই। রুস্তইম্যা তো আসবই, একশ ফির আসব। পারলে তুই তারে বান্ধিস, তবে বুঝুন এক বাপের বেটা তুই!
আহত পৌরুষের দাবদাহে চোখের মণি দুটো ফেটে যেন ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসবে, মনে হল কাসেমের।
অনুপায় আক্রোশে উঠানের দিকে একবার তাকাল সে। কয়েকদিন আগে এক কিনারায় লবণ-ইলিস করার জন্য কয়েক কুড়ি মাছ এনে রেখেছিল কাসেম। নগণ্য অবজ্ঞায় সেগুলো তেমনি পড়ে পড়ে পচছে; একটা উগ্র দুর্গন্ধ বাতাসের মধ্যে সঞ্চারিত হয়ে গিয়েছে। দেখতে দেখতে কয়েক বিন্দু অশ্রু চোখের কোল বেয়ে লবণাক্ত আস্বাদের সঙ্গে ঠোঁটের ওপর এসে পড়ল কাসেমের। আর সঙ্গে সঙ্গেই চেতনার বিধ্বস্ত কোষে কোষে একখানা মুখ টলমল করে ভেসে উঠল। জলধরের বউ। বউঠাইন!
পেশিগুলো কেমন যেন অবসন্ন হয়ে আসছে। শিথিল পদসঞ্চারে বাইরে বেরিয়ে গেল কাসেম।
.
আবার তিন খণ্ড ইট তুলে এনে উনুন পেতে এক পাতিল ভাত ফুটিয়ে নিয়েছে জলধরের বউ।
এখন সন্ধ্যা। আম আর গাবপাতার প্রচ্ছটপটে রাত্রির শিলালিপি; মাঝে মাঝে জোনাকির সবুজ প্রদীপ জ্বলছে মিট মিট করে। টিনের কুপিটা থেকে ধোঁয়ামাখা লাল শিখাটা ছড়িয়ে পড়েছে অষ্টবক্র ঘরখানার আয়তনে।
মনের মধ্য দিয়ে ডুব-সাঁতারের মতো একটা অতঙ্ক পিছলে পিছলে গেল। একটু পরেই আবির্ভাব হবে ছোট কর্তার। এই ভাঙা ঘরের পাল্লাবিহীন আয়তনে অকলঙ্ক চরিত্রের নিরাপত্তা কোথায়? সে কি ফিরে যাবে কাসেমের কাছেই? কিন্তু ফুলমনের জিভ থেকেও গরল ঝরে যে!
আচমকা আত্মমগ্ন ভাবনাটা ছত্রখান হয়ে গেল। শুকনো ঝরা-পাতার ওপর পদধ্বনি। প্রথমে চমকে উঠেছিল জলধরের বউ। ছোট কর্তা নয় তো! নাঃ, টলতে টলতে মাতালের মতো মেঝের ওপর এসে আছড়ে পড়ল কাসেম। সারাদিন পেটের মধ্যে ক্ষুধার বাসুকি ফণা ঝাঁপটিয়েছে; চেতনার পর্দায় ফুলমন আর রুস্তমের বেআইনি আলিঙ্গনের যুগল-মূর্তি বিষের জ্বালা ধরিয়ে দিয়েছে।
দুহাত ধরে কাসেমের নির্জীব দেহটা তুলে বসাল জলধরের বউ; ব্যস্ত গলায় বলল : কী হইচে ভাই, অসুখ ব্যারাম না তো!
না, বউঠাইন!
সারা দিনে খাইছ? কাজিয়া করছ বউর লগে?
জলধরের বউয়ের গলায় অবিরাম প্রশ্নের বিশৃঙ্খলা।
কী বউ যে দিছিলা বউঠাইন! ক্যান তুমি আমার লগে এই শত্রুতা করলা? ক্যান? আমি তোমার কাছে কী দোষ করছিলাম? সেই জবাব নিতে আইছি। দ্যাও জবাব দাও।
কাসেমের দুচোখ বেয়ে প্লাবন নেমে এল।
তোমার জবাব দ্যাওনের আগে আমার জবাব দ্যাও তো আগে। সারাদিনে প্যাটে দানা পড়ছে একটা? সত্য কইবা ঠাকুরপো!
গলার ওপর দিয়ে ইলসার একটা ঢেউ ছল ছল করে বয়ে গেল জলধরের বউ-র। আর মাথাটা গোঁজ করে নিরুত্তর বসে রইল কাসেম। তবে আগে ভাত খাইয়া লও।
হাত দুটো অঞ্জলির মধ্যে মুঠো করে একখানা মাটির সানকির সামনে কাসেমকে বসিয়ে দিল জলধরের বউ। তারপর পাতিল থেকে রাঙা আউশের মোটা মোটা ভাতগুলো ছড়িয়ে দিতে লাগল পাতের ওপর।
বিকেলের দিকে বৃষ্টি হয়েছিল; এখন আমের পাতা থেকে টুপ টুপ করে জলের বিন্দু ঝরছে।
এক গ্রাস সবে মাত্র মুখ তুলেছে কাসেম; আর সঙ্গে সঙ্গেই ঘটে গেল ঘটনাটা।
