বউঠাইন কই? কাসেমের গলায় কঠিনতম জিজ্ঞাসা।
রাঢ়ি মাগিরে খেদাইয়া দিছি। নির্লিপ্ত জবাব ভেসে এল ফুলমনের।
খেদাইয়া দিছ! কাসেমের সমস্ত ভঙ্গিমার ঘনীভূত আর্তনাদটা গলা বিদীর্ণ করে বেরিয়ে এল।
খেদাইয়া দিছি। হিঁদু মাগির লগে কোন পীরিত?
তবে আইজ যে লবণ-ইলিশের বায়না লইয়া আইলাম একশো রাইঙ (হাঁড়ি); সেই সব বানাইয়া দিব কে? তুই তো বাদশাজাদি; সূৰ্মা পরতে কাইট্যা যায় বেলা তিন পহর!
তার আমি জানি কী? ওগো বাজান-নিঃবইংশ্যা আমারে দিয়া বলদের লাঘান খাটানের লেইগ্যা সাদি করেছে গো বাজান! তুমি আমারে এই ড্যাকরার লগে দিছিলা সাদি গো বাজান। ফুলমন কাঁসর-পেটানো গলায় বিনাতে শুরু করল।
সামনের সূৰ্য্যদীপিত পটভূমিটা যেন অন্ধকারের অতলতায় নিঃশেষে তলিয়ে যাচ্ছে। চোখ দুটো দুটো হাতের ঢাকনায় আবৃত করে উঠানের ওপর বসে পড়ল কাসেম; খেদাইয়া দিলা–খেদাইয়া দিলা বউঠাইরে
.
একটু পরেই গাব-মাদারের রোদ-ঝলমল ছায়ার জাফরি-কাটা পথটা ধরে মুন্সীদের চেঁকি-ঘরটার কাছে এসে দাঁড়াল কাসেম। চেঁকি-ঘরটার সন্নিহিত একখানা ভাঙা একচালা। অনেক দিনের ঝড়-বর্ষণের শরাঘাতে হেলে রয়েছে এক দিকে; মাটির দেওয়া ঝরে গিয়ে বাঁশের খুঁটির কঙ্কাল আত্মপ্রকাশ করেছে।
ইতিমধ্যে মেঝেটা পরিচ্ছন্ন করে নিকিয়ে নিয়েছে জলধরের বউ। ভাঙা ইটের টুকরো দিয়ে উনুন রচনা করেছে।
কাসেম কান্নাপ্লাবিত গলায় বলল, ঘরে লও বউঠাইন। এইখানে আসছ; মানুষে আমারে মন্দ কইব।
না, ঠাকুরপো! আমি তোমার উপুর গোসা হইয়া আসি নাই। তোমরা সুখে-শান্তিতে ঘর-গৃহস্থী কর; আমি দূর থিকা দেখি।
জলধরের বউয়ের গলায় তীব্র অভিমানের উত্তাপটুকু স্পষ্ট হয়ে ফুটে বেরিয়ে এল।
তুমি যাইবা না তবে? আমি তোমার পর বইল্যা খেদাইয়া দিলা!
নাঃ, আমি গেলেই আবার তোমার সংসারে আগুন লাগব। বউ আমারে চায় না। তুমি ঘরে যাও ঠাকুরপো!
বউরে আমি খেদাইয়া দেই। তবু তুমি লও।
তুমি কেমুনতর সোয়ামী, চন্দ্রসূয্য সাক্ষী কইর্যা যারে সাদি কইর্যা আনলা-তারে খেদাইতে চাও? যাও, বেলা নাইম্যা গেছে। খাইতে যাও। জলধরের বউর গলাটা তীক্ষ্ণ ধমকে উচ্চকিত হয়ে উঠল।
বেশ, কিন্তুক আইজ আবার লবণ-ইলিসের বায়না দিছে। ফুলবিবি তো সুম্মা আর গন্ধ তেল ছাড়া কিছুই ধরে না। আমার কেউ নাই এই দুনিয়ায়–থাকলে কি আর অমুন কইর্যা ফেলাইয়া আইতে পারত? কাসেম ছোরা-কাটা লুঙ্গির প্রান্তে অশ্রুকম্পিত চোখ মুছতে মুছতে সেই বনছায়ার গোরোচনা-আঁকা পথটা দিয়ে ছুটতে ছুটতে অদৃশ্য হয়ে গেল।
ঠাকুরপো!
ডান হাতটা সামনের দিকে প্রসারিত করে চিৎকার করে উঠতে চাইল জলধরের বউ। কিন্তু ভারী পাথরের মতো কান্নার অবরোধ সরিয়ে স্বরটা অত্মপ্রকাশ করতে পারল না।
.
সারাদিন আর উনুনের চিতা জ্বালেনি জলধরের বউ। মুন্সীদের ধান ভেনে একচালা ঘরখানায় এসে নতুন আখাটাকে ভেঙে ফেলল। তার পর উৎসুক-ব্যাকুল চোখ দুটো সতর্কভাবে পথের ওপর স্থির রেখে একটা অতি পরিচিত পদধ্বনি শুনবার জন্য চৌকাঠের ওপর বসে রইল। কিন্তু না, কৃষ্ণা চতুর্দশীর চাঁদটা পার হয়ে এসেছে। ত্রিযামা-পথিক শিয়ালের গলায় অনেকগুলো প্রহর ঘোষিত হয়ে গেল। তার আচ্ছন্নতা ছত্রখান করে মাঝে মঝে ঝরাপাতার ওপর দিয়ে ভাম-খটাসের শোভাযাত্রা চলে গেল। ধড়মড় করে উঠে বসেছে জলধরের বউ।
ততক্ষণে আসন্ন প্রভাতের আবছায়া আলোর ছোপ পড়েছে পুবালি দিয়ে। হাতের পাতা দিয়ে চোখ দুটো ঘষে ঘষে উঠে দাঁড়ালো জলধরের বউ।
কাসেম হয়তো তার তন্দ্রার অবসরেই মখমল-মৃদু পদক্ষেপে এ পথ দিয়ে চলে গিয়েছে; সমস্ত ইন্দ্রিয়গুলো মথিত করে অশ্রুধারা নেমে আসতে চাইল জলধরের বউয়ের।
ইতিমধ্যে কখন যে মুন্সীবাড়ির ছোট কর্তা পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন খেয়াল ছিল না। পাশ ফিরতেই নজরে পড়ল ছোট কত্তার চোখজোড়া তার বিস্ত থানের বাতায়ন দিয়ে শরীরের অনাবৃত চামড়ার ওপর সড়কির আঘাতের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এস্তে কাপড়খানা গুছিয়ে নিয়ে ভীতি-চকিত গলায় জলধরের বউ বলল; আপনে এইখানে ছোট কত্তা?
এই তোমার এট্ট খবর-বাত্তা নিতে আইলাম। এই একচালা ঘরখানে থাকতে ডর লাগে না তো রাইতে?
না। ডরের কী আছে, আমার কী-ই বা আছে?
ছোট কর্তা বৈষ্ণব। সমস্ত শরীরে শ্রীকৃষ্ণের চন্দন-পদচিহ্ন; পাতলা নিমার নীচে তুলসীর মালার আধ্যাত্মিক ঘোষণা; চোখে প্রসন্ন গোপিনীদৃষ্টি। হাতের জপের মালায় উত্তেজনার ঝড়।
আপাততঃ তিনি কৃষ্ণভাবে ভাবিত; না, কইলেই হইল? তোমার যে কী আছে; কী আর নাই, তা কি তুমি জানো সুন্দরী! কত সাপ-খোপ, বদমানুষ আছে। তাগো হাত থিকা বাঁচাইতে হইব না কৃষ্ণের জীবেরে। রায়, নারায়ণ। তোমার কিছু ডর নাই। এই জায়গাটা বেশ নিরালা রাত্রে আইস্যা তোমার লগে কৃষ্ণকথা কওয়া যাইব। নারায়ণ, নারায়ণ রহস্যময় হেসে সামনের হেউলি ঝোপটার আড়াল দিয়ে মিশিয়ে গেলেন ছোট কত্তা, অনেক দূর থেকে তার অমৃতনিঝর কণ্ঠ ভেসে এল কয়েক কলি গানের সঙ্গে–
কৃষ্ণের যতেকে লীলা,
সর্বোত্তম নবলীলা,
নববধু তাহার স্বরূপ…
কানের ওপর একটা শঙ্খচূড় সাপের ছোবল পড়ল যেন। শিউরে উঠল জলধরের বউ।
.
সারারাত ক্ষ্যাপা নদীতে ইস্লা জাল বেয়ে অপরিসীম ক্লান্তির অবসাদে শরীরটা যেন ভেঙে ছত্রখান হয়ে গিয়েছে কাসেমের।
