ঝাঁপ খুলে বাইরে বেরিয়ে এসে উঠানে দাঁড়াল কাসেম; কী বিজাত বউ যে আইন্যা দিছ বউঠাইন! সব তোমার দোষ, সব তোমার দোষ। এক মুহূর্তও আর ঘরে থাকতে ইচ্ছা হয় না। কাছিমের ছাওটা ঘরের মধ্যে যেন বিষ মাখাইয়া দিছে।
বিশৃঙ্খল পদসঞ্চারে ইলসার দিকে চলে গেল কাসেম।
মাছের চাঙাড়িগুলো উঠানের এক কিনারায় পড়ে রয়েছে; একটা উগ্র আঁশটে গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে বাতাসে।
খানিকটা সময় স্তব্ধ থেকে কুপি জ্বালিয়ে বঁটি নিয়ে বসল জলধরের বউ। সন্ধ্যারাত্রিরে কুমারবাড়ি থেকে অনেকগুলো নতুন হাঁড়ি এনে দিয়েছিল কাসেম। মাছ কেটে কেটে হাঁড়ি ভৰ্ত্তি করে নুন জারিয়ে রাখতে লাগল জলধরের বউ।
পোহাতি রাতে কাসেম ফিরে এল আবার। ব্যস্ত গলায় বলল; বউঠাইন, তোমারে কইতে ভুইল্যা গেছি। লবণ-মাছের চালান পাঠাইতে হইব আইজ সকালেই। শয়তানের ছাওটা গণ্ডগোল কইরা দিছে।
তোমার ব্যস্ত না হইলেও চলব। তোমার মাছ কাইট্যা আমি গুছাইয়া রাখছি। এই লইয়্যা যাও ঠাকুরপো।
লঘু-মৃদু হাসল জলধরের বউ।
অসীম কৃতজ্ঞতায় চোখ দুটো জলোচ্ছাসে ঝাপসা হয়ে গেল কাসেমের।
.
সকাল বেলা বয়রা বাঁশের মাচার ওপর থেকে উঠে বাইরে বেরিয়ে এল ফুলমন। সমস্ত মুখখানায় রক্তের ছোপ ছোপ স্বাক্ষর। কাসেমের হাত-পা ফুলমনের দেহের ওপর প্রলয় নাচ নেচেছে কাল রাত্রে।
ইতিমধ্যে গাঙের ঘাট থেকে গোটা কয়েক ডুব দিয়ে বিনিদ্র রাত্রির সমস্ত ক্লেদ ধুয়ে এসেছে জলধরের বউ; ফুলমনের মুখের ওপর আহত দৃষ্টিটা পড়তেই আর্তনাদ করে উঠল, ঠাকুরপোর রাগ উঠলে আর কাণ্ডজ্ঞেয়ান থাকে না। আয়, আয় বউ, আম তোরে গান্দার পাতা বাইট্যা দেই, মুখে লাগা।
একটা আলাদ গোক্ষুরের ল্যাজে যেন খোঁচা লেগেছে বল্লমের; সাঁ করে ফণা তুলে দাঁড়াল ফুলমন; হারামজাদি, কালামুখী বেউশ্যের আবার পীরিত উলাইয়া উঠছে। আমার লগে কথা কইবি না। তুই যেইখানে থাকবি, আমি সেইখানে নাই।
এই কী সব্বইশ্যা কথা কইস বউ!
গলাটা বিস্ময়ের কান্নায় রুদ্ধবা হয়ে রইল জলধরের বউয়ের।
সত্য কথা! তুই নামবি এই বাড়ি থিকা, না হয় আমিই এখন বাজানের বাড়িতে যামু গিয়া।
আমি গেলে গিয়া তুই খুশি হইস বউ? তোগো কাজিয়া বিবাদ যাইব গিয়া?
চোখের আকাশে যে বর্ষণ এতক্ষণ স্তব্ধ হয়েছিল, এবারে তা ঝরে ঝরে সমস্ত মুখখানা ভাসিয়ে দিল জলধরের বউয়ের!
নিচ্চয়; আমার সোয়ামীর কাঁচা মুড়াটা চিবাইছিস এতদিন, এইবার আমারে এট্ট চিবাইতে দে লো নটীর ছাও।
ফুলমনের গলায় আলাদ গোক্ষুরের ফণাটা ঘন ঘন আন্দোলিত হতে লাগল।
বেশ আমি যাইতে আছি গিয়া। আমার কে আছে–আমারে কে কী কইব? তুই ঘরের বউ, তুই সোয়ামীর ঘর থিকা নাইম্যা গেলে নিন্দা হইব, মাইনষে মোন্দ কইব।
হ হ, তাই যা তুই। মাগি রাঢ়ি বেউশ্যে।
এক সময় সামনের মুলিবাঁশ-ঝোপের ছায়ামেদুর যে পথটা কুমারীর অকলঙ্ক সাঁথির মতো নিরাভরণ রেখায় এঁকে বেঁকে মুন্সী-বাড়ির দিকে চলে গিয়েছে, সেই পথটার বাঁকের অদৃশ্য হয়ে গেল জলধরের বউ।
ঘরের ভেতর এসে ঝাঁপটা প্রচণ্ড শব্দে বন্ধ করে দিল ফুলমন। আর সঙ্গে সঙ্গে কাঁচা বাঁশের জানালার ওপর ভেসে উঠল দুটো কামনামুগ্ধ চোখ।
উচ্ছ্বসিত গলায় ফুলমন বলল; তুই আইছিস্ রুস্তম। কয়টা দিন হারামজাদা জিনের লগে শুইয়্যা আমার ঘুম হয় নাই। বাজানটা যা চশমখোর, ট্যাকার লেইগ্যা সাদি দিল এই বখিলটার লগে।
তোরে কয় দিন দেখি না। তুই একা খবরও দিস না। মাইয়া লোক যখন যেই মরদের গন্ধ পায়, তখন তার কথাই কয়।
অমুন কথা কইস না রুস্তুইম্যা। আমি তেমুন মাগি না। কিন্তু কী রকম, ওই বিধবা মাগিটা অষ্টপহর তাকে তাকে থাকে। শ্যাষে তোর আমার ব্যাপার জাইন্যা ওই মরদার কাছে কইলে, আমার পিঠের বাক্লা তুইল্যা ফেলাইত।
তা হইলে উপায়?
একটা অথৈ আশঙ্কার সমুদ্রে যেন নিরুপায় হয়ে হাবুডুবু খেতে লাগল রুস্তম। ডর নাই, মাগিরে কাইজা কইরা খেদাইছি। এইবার ঘর বান্ধনের ব্যবস্থা করো; আমি আর থাকুম না, এইখানে একদিনও।
ফিক করে আশ্বাসের হাসির প্রশ্রয় ছড়াল ফুলমন।
বেশ, ট্যাকা দে তিন কুড়ি।
নে। ভাঙা কাঠের বাক্স থেকে টাকা বের করে রুস্তমের হাতে ঢেলে দিল ফুলমন; এইবার যা। আবার আসিস রাইতে।
ঘরে তোর কাছে শুইতে দিবি তো?
ইলিশ মাছের রূপালি আঁশের মতো চকচক করতে লাগল রুস্তমের কদর্য চোখ দুটো।
যা ভাগ এখন, আসিস তো রাইতে। মরদটা না থাকলে
ফুলমনের সমস্ত দেহটাকে আর একবার দৃষ্টিভোজ করে চলে গেল রুস্তম।
সূর্যের আকাশ থেকে রাশি রাশি সোনালি রোদের বন্যা এসে পড়েছে ইসা-পারের মাটিতে। সাদা সাদা রেণু ছিটানো মানকচুর অরণ্যে সোতা খালটা পান্নার কণার মতো ঝিলমিল করছে।
আনন্দিত পদক্ষেপে বৃষ্টিকোমল মাটিতে এসে পুলকিত গলায় ডাকল কাসেম, বউঠাইন, অ বউঠাইন
পাকের ঘরে আজ সর্বপ্রথম আবির্ভাব হয়েছে ফুলমনের; ডালের উগ্র সম্বরা দিয়ে বাইরে এসে দাঁড়াল সে। প্রসন্ন হাসির অভ্যর্থনা জানিয়ে বলল; আস ঘরে আস–
দৃষ্টিটা বৃত্তাকারে ঘুরিয়ে এনে অস্থির গলায় কাসেম বলল; বউঠাইন কই? আইজ তার লবণ-ইলিসে এক কুড়ি পাঁচ ট্যাকা লাভ হইচে। কই গেল বউঠাইন? তার লেইগ্যা আর তোমার লেইগ্যা কাপড় আনছি নয়া।
কই দেখি কাপড়? ব্যগ্র কৌতূহলে উঠানের পরিসরে নেমে এল ফুলমন।
