কবুতরের বুকের মতো নরম ঠোঁট দুটিতে পানের রক্তরাগ। সেই পানরাঙানো ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে মধুর ঝরাবার যে প্রত্যাশা ছিল জলধরের বউর, তার বদলে ফিনকি দিয়ে কালনাগিনীর বিষ বেরিয়ে এল এখানে আসার ষোলটা প্রহর পেরিয়ে যাবার পরই।
পাইকারের নৌকায় মাছ দিয়ে দশটা কাঁচা টাকা মিলেছিল; সেই টাকাটা জলধরের বউর হাতে যেই মাত্র অনেক দিনের মসৃণ অভ্যাসে গুঁজে দিল কাসেম; ঠিক তখনই চোখের মণিদুটো ভুরু-ধনু পার করে আসমানে তুলে ভুজঙ্গপ্রয়াত ছন্দে ঝঙ্কার দিয়ে উঠল; আগো আমার বাজান! কোন নিঃবইংশ্যার লগে আমার সাদি দিছিলা গো বাজান! ড্যাকরা হিন্দু বিধবা মাগির লগে মববৎ করে গো বাজান
বয়রা বাঁশের মাচায় একটা শরাহত ভাল্লুকের মতো গড়াতে লাগল ফুলমন।
কাসেম আর জলধরের বউ বদগ্ধ দৃষ্টিতে পরস্পরের দিকে নিস্পলক তাকিয়ে রইল।
এক সময় রুদ্ধবাক গলায় বলল জলধরের বউ, এইবার থিকা বউর হাতেই ট্যাকা দিও ঠাকুরপো। সত্য কথাই তো আমি রাঢ়ি মাগি, অলক্ষী। বউ মানুষ–ঘরের লক্ষ্মী। তার হাতেই দিও ঠাকুরপো।
শান্তিনিবিড় পৃথিবীর যে আকাশটাকে রামধনুর স্বপ্নমায়ার রঙে রঙে প্লাবিত করে দেবার কোমল বাসনা ছিল তাদের; সেই আকাশে প্রথম কালবৈশাখীর সঞ্চারে একটা অনিবার্য অশুভের সংকেত সূচিত হচ্ছে। সে কালবৈশাখী ফুলমন।
জলধরের বউ ঘরের ভেতর এসে কাঁচা বাঁশের ঝপ টেনে দিল; আর কাসেম ইলসার দিকে আবার ক্লান্তমন্থর শরীরটাকে বয়ে বয়ে নিয়ে গেল। বড় বিস্বাদ, বড় অপ্রত্যাশিত ঠেকছে আজকের এই সকালটা। প্রসন্ন রোদের সোনা আচমকা মেঘের ছায়াপাতে যেন বিবর্ণ হয়ে গিয়েছে।
বর্ষার বীতবর্ষণ আকাশের মতো থমথম করে কয়েকটা দিন পেরিয়ে গেল। সন্ধ্যার সময় তিন চাঙাড়ি ইলিস মাছ এনে উঠানে নামাল কাসেম, তারপর ডাক দেয়, অ বউঠাইন, অ বউ-তোমরা সব বাইরে আস।
ত্রস্ত পদক্ষেপে বাইরে বেরিয়ে এল জলধরের বউ। ফুলমন সস্তা দামের আয়নার সামনে সমস্ত মুখখানা অমানবিক ভঙ্গিতে দুলিয়ে দুলিয়ে সূৰ্মার সতর্ক রেখা আঁকছিল চোখের কোলে। কাসেমের ডাকটা কানের গুহাপথে প্রবেশ করবার সঙ্গে সঙ্গে কুৎসিত গলায় চিৎকার করে উঠল : ক্যা, হইচে কী ড্যাকরার? পিরীতের নাগরীই তো রইছে। তার কানে কইলেই হইব। ফুলমনের উন্মনা ভূঁইচাপার মতো অকলঙ্ক মুখখানার মধ্যে এমন একখানা ক্ষুর-শাণিত জিভের অস্তিত্ব কোথায় ছিল, সাদির আগে কাসেম কী জলধরের বউ কেউ তা আবিষ্কার করতে পারেনি। কাসেম বলল : বউঠাই, এইগুলান দিয়া লবণ-ইলিশ কইর্যা কইলকাতায় চালান দিলে ভালো কারবার হইব; পয়সাও আসব ভালোই। তুমি আর বউ মাছ কাইট্যা লবণ মাখাইয়া রাখো। নিথর গলায় জলধরের বউ বলল বউ পোলাপান মানুষ; আমিই একলা কাইট্যা লবণ দিয়ে মাইখ্যা রাখুম! তুমি হাতমুখ ধুইয়্যা ভাত খাইবা আস ঠাকুরপো!
একটু সময় নীরবতার যতিচিহ্নের মতো কেটে গেল। তারপর কাসেম প্রখর অভিযোগের গলায় বলল কী বউই আইন্যা দিছিলা বউঠাইন! আমি তখন কত বার না করলাম–এইবার ঠেলা সামলাও।
চুপ করো, বউ আবার শুনতে পাইব। পোলাপান মানুষ–ওরে এট্ট সোহাগ-আহাদ কইরো।
রাত্রিবেলা শুয়ে শুয়ে ফুলমনকে নিবিড় আলিঙ্গনের বেষ্টনে জড়িয়ে বুকের কাছে টেনে নিয়ে এল কাসেম। অতিকায় একটা কালো মাছের মতো প্রচণ্ড ঝটকায় বিছানার আর এক প্রান্তে সরে গেল ফুলমন। সামনের ইসা থেকে সারেঙ্গীর সুরের মতো ঢেউ-এর বাজনা ভেসে আসছে সোঁ সোঁ করে, হিজল-সুপারীর পাতায় পাতায় বাতাসের অশ্রান্ত মৰ্ম্মর। কাসেম আকুলিত গলায় বলল : অমুন করে না বউ, বউঠানাই আমাগো কত ভালোবাসে। বেবাজিয়া নৌকার মাঝি আছিলাম আমি। পদ্মার ওই দূর দ্যাশ থিকা ইসায় আইলাম। জলধর দাদায় আশ্রয় দিল–বউঠাইন মায়ের লাঘান বুকে নিল। অমুন কথা বউঠাইনরে কইস না।
বুকে নিল! সোহাক কইর্যা নাগরেরে বুকে নিল। ওঃ, সেইর লেইগ্যা বুঝি টাকা আইন্যা ওর হাতে দিস ড্যাকরা। ওর হাতে মধু আছে, ওর হাতে ভাতে মধু আছে। যা, যা ওর ঘরে যা–দ্যাখ গিয়া তোর গায়ের গোন্ধ না পাইলে আবার সারা রাইত ঘুম আসব না।
খিক খিক করে সারা দেহ-মন্থন-করা জিনলোকের হাসি হেসে উঠল ফুলমন।
বিস্রস্ত গলায় কাসেম বলল, চুপ চুপ! বউঠাইনে আবার শুনতে পাইব।
শুনতে পাইব, তো আমার কী? শোননের লেইগ্যই তো কই।
এইবার চুপ না করলে কবুতরের লাঘান গলাটা ছিড়া ফেলমু-হারামজাদি কাছিমের ছাও শুওর।
কাসেমের গলাটা একটা ভয়ানক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিল।
চুপ করুম কার ডর! নিঃবইংশ্যা, ড্যাকরা, আল্লার অরুচি-ওগো বাজান! তোমার মনে এই আছিল! টাকার লেইগ্যা এই ছিনালের বাচ্চার লগে দিছিলা আমার সাদি গো বাজান!
বিনিয়ে বিনিয়ে আনুনাসিক গলায় সুর-লয়ে কান্নার ঢেউ ছড়াতে লাগল ফুলমন।
অনেকটা সময় দাঁতের ওপর দাঁত চাপিয়ে নির্মম সংযমে নিজের উত্তেজনাটাকে বাঁধ দিয়ে রাখল কাসেম; তারপর এক সময় ফুলমনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। অনেক দিনের অসহ্য আর বন্দী ক্রোধটা কিল-চড় আর অবিশ্রাম লাথির মধ্যে মুক্তি পেয়ে আছড়ে পড়তে লাগল ফুলমনের সারা দেহে।
ফুলমনের কথাগুলো শুনতে শুনতে পাশের ঘরে বিধ্বস্ত অনুভূতি নিয়ে নিশ্চুপ পড়ে ছিল জলধরের বউ। এবার সে দানা-পাওয়া গলায় চিৎকার করে উঠল; কী করো কী করো ঠাকুরপো! মাইয়া মানুষের গায়ে হাত তুলতে সরম লাগে না?
