কান্নার মতো একটা ঘনকম্পিত অনুভূতি তখনও আঠার মতো জড়িয়ে রয়েছে কাসেমের গলায়।
এই মুহূর্তে সেই কান্নাটা সংক্রামিত হয়ে গেল জলধরের বউয়ের গলায়।
আর কইও না ঠাকুরপো! তুমি আমার মার প্যাটের ভাই এক দিকে, আর এক দিকে প্যাটের পোলা। তোমারে এটটু ঠাট্টা করছিলাম। তা-ও বোঝো না!
মাটির সানকিতে রাঙা বোরো চালের ভাত আর ইলিস মাছের সর্ষে-পাতরি সাজিয়ে কাসেমের সুমুখে এগিয়ে দিল জলধরের বউ। দু-এক গ্রাস ভাত মুখে দেবার পরেই জলধরের বউ বলল; একটা কথা কমু ঠাকুরপো?
কও। কদম্বরেণুর মতো গোঁফদাড়িতে আকীর্ণ মুখখানা তুলে ধরল কাসেম।
আমার কথা রাখলে তবে কই কথাটা।
তোমার কথা রাখুম না, এই একটা কথা হইল!
দুর্বিণীত অভিমানে ভাতের সানকি থেকে হাতখানা কোলের ওপর গুটিয়ে আনল কাসেম।
আমি রহিম খোন্দকারের মাইয়াটারে দেখেছি, বড় সোন্দর দেখতে। তোমার পাশে খাসা মানাইব। তোমার হইয়া আমি কথা দিয়া দিছি। পাঁচ কুড়ি টাকা বউ-পণ লাগব।
রুদ্ধশ্বাস আগ্রহে সামনে এগিয়ে এল জলধরের বউ।
না, না বউঠাইন! এখন সাদির ল্যাঠা থাউক। আর অত ট্যাকা দিমু কোথা থিকা বউ-পণের লেইগ্যা?
কাসেমের উদার আকাশের মতো দৃষ্টিতে বিস্ময়ের হালকা হালকা মেঘসঞ্চার।
ট্যাকার লেইগ্যা তোমার ভাবতে হইব না। আমি মুন্সীবাড়ি ভারা ভাইন্যা (ধান ভেনে) টাকার জোগাড় রাখছি। তুমি মত দিলেই হয়। বেরাজি হইও না। আমি একটা টুকটুকা বইন চাই। একলগে কাম করুম, একলগে হাসুম, একলগে গলা জড়াইয়া কান্দুম। জলধরের বউয়ের গলায় আকুলিত প্রার্থনা চকিত হয়ে উঠল।
বউ! তেইশ বছরের রোমাঞ্চিত কেলীতরঙ্গের মধ্য দিয়ে একটা অনাস্বাদিত শিহরণ বয়ে গেল কাসেমের। একটা বেনামি পুলকের অনুভূতিতে ধমনির ওপর রক্তে ঝলক লাগল আচমকা। ইসার নির্ধারিত পটভূমিতে আজ প্রথম সন্ধ্যায় বউর মোহকামনার স্বপ্ন এঁকে দিয়েছিল পাশের নৌকার মাঝি।
নিবিড় গলার নিশ্চুপ স্বরে কাসেম বলল, কোন একা পেতনির বাচ্চারে ধইরা আনবা–তোমার যত কথা বউঠাইন
আচমকা কোথা দিয়ে কী ঘটে গেল। নিরুৎসাহ গলায় জলধরের বউ বলল, না, না, সাদি তোমারে করতেই হইব। তোমারে-আমারে লইয়্যা পাঁচ জনে মন্দ কয়।
কী কইল্যা!
দূরের আকাশ থেকে দুজনের ব্যবধানের ভূমিতে একটা বজ্র এসে বিদীর্ণ হল যেন।
বাকি রাত্রিটুকু সন্নিহিত ঘরের মাচায় বিছানো জীর্ণ শয্যার ওপর বিনিদ্র চোখের প্রহর গুনে চলল কাসেম আর জলধরের বউ।
মাঝরাত থেকে ঝমঝম নূপুর বাজিয়ে বৃষ্টির উর্বশী-নাচ শুরু হয়েছে। ঘরের চালের ফাঁক দিয়ে বর্ষণ-প্লাবিত অন্ধকার আকাশ দেখা যায় এক টুকরো। দরের মাতলা ইলসার গজ্জিত ফোসানি ভেসে আসে। দুজনেই দুজনের নিধুম থাকার পরিষ্কার সংকেত পাচ্ছে।
আচমকা জলধরে বউ বলল, ঠাকুরপো!
কী? একটা গম্ভীর উত্তর ভেসে এল বেড়ার ও-পাশ থেকে। দরজাটা খুইল্যা কাথাখান নাও। বড় জবর কাল (শীত) পড়েছে। শ্যাষে আবার অসুখ-বিসুখ করতে পারে।
ঝাঁপ খুলে কথা হাতে বাইরে বেরিয়ে এল জলধরের বউ। পাশের ঘরের ঝপ খোলার শব্দ ভেসে আসে।
তিমির পিঠের মতো কালো আকাশের ওপর সপাং করে বিদ্যুতের চাবুক চমকাল একবার।
হো হো করে বৃষ্টি-তুফানের আবহ বাজনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে হেসে উঠল কাসেম। আমরা গাঙের পোকা বউঠাইন। এট্ট কালে (শীতে) অসুখ ব্যারাম হইব আমাগো!
তার হাসিটা ইলসার দমকা বাতাসে মুছে গেল সহসা। খানিকটা সময়ের বিরতি-চিহ্ন। দুজনের মাঝখানে খানিকটা অন্ধকার অর্থহীন নীরবতায় স্থির হয়ে রয়েছে।
ফিসফিস গলায় জলধরের বউ বলল, সারা রাইত বিছানায় উসপাস্ করছ। ঘুমাও নাই এক দণ্ড-ক্যান ঠাকুরপো?
আশ্চর্য সংযত গলায় কাসেমের, তুমিও তো ঘুমাও নাই বউঠাইন, কি ভাবতে আছিলা? দাদার কথা?
সহসা কাসেমের সমস্ত শরীরে বর্ষাস্পন্দিত মেঘনার একটা চকিত দোলন লাগল। নীচু হয়ে জলধরের বউর পা দুখানার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল সে; বউঠাইন, সত্য কথা কও। তুমি আমারে সন্দ করো? তবে আমি আইজই যামু গিয়া;
দুখানা হাতের স্নিগ্ধ বেষ্টনে কাসেমকে পায়ের আশ্রয় থেকে টেনে তুলল জলধরের বউ, ছিঃ, অমুন কথা আমার মনেও আসে নাই কোনও দিন, তুমি আমার ছোট ভাই। তবে মাইনষে কয়–তুমি সাদিটা কইর্যা ফেলাও। আমি বউ পণের ট্যাকা দিমু।
ও, এইর লেইগ্যা বুঝি আমারে না জানাইয়া মুন্সীবাড়ি ভারা ভাইন্যা (ধান ভেনে) টাকা কামাইছ? বেশ, তোমার কথা আমি রাখুম। তবে আমার মাথার কিরা আর কখনও দান ভানতে যাইবা না। আমি মরলে পরে যাইও। গাঢ় গলায় পিষ্ট কান্না ছড়িয়ে বলল কাসেম।
অন্ধকারের পটভূমিতে একটা দ্রোণফুলের মতো জলধরের বউয়ের হাসিটা ফিক করে ফুটে উঠল; হইচে, হইচে। এইবার ঘরে গিয়া শোও। এই নাও কাথাখান-মুড়ি দিয়া শুইও।
আর মস্করা কইরো না। কাথা দেওনের নাম কইর্যা নিজের জিদখান বজায় রাখলা। তুমি যা চতুর–এখন আর শুমু না। এইবার নদীতে যাই। আইজ বিস্তর মাছ পড়ব; মনে লয়।
দিকরাত্তিরে কাঁথা দেবার ভূমিকার নেপথ্যালোকে যে অর্থটি আত্মগোপন করে ছিল, তা পরিষ্কার ধরে ফেলেছিল কাসেম।
.
বউ-এর নাম ফুলমন। জলধরের বউ নিজের বেসর, বনফুল আর পৈছা সাজিয়ে দিল তার সারা দেহে। নাচের বিঘূর্ণিত ছন্দে যখন তখন ঘুরপাক খায় সে ঝম ঝম মল বাজিয়ে।
