একটা তীক্ষ্ণ অপরাধ বোধে ব্রহ্মতালুর মধ্যে রঙ বিঘূর্ণিত হতে লাগল কাসেমের।
ততক্ষণে পাশের নৌকাটা দূরতর ব্যবধান রচনা করতে করতে বিন্দুর মতো মিলিয়ে গিয়েছে মামুদপুরের দিকে।
সামনের গলুইটা থেকে পেছনের গলুইর দিকে একবার তাকাল কাসেম। আর সঙ্গে সঙ্গেই ইন্সর ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া একটা দমকা বাতাসের মতো বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা হু-হুঁ করে উঠল। তিন মাস আগেও ওই গলুইতে হালের বৈঠাটা শক্ত মুঠোয় চেপে ধরে বসত জলধর। তার এই ইলসা মাছ ধরার ভাগীদার সে। আজ সেখানে কাটাল কাঠের বৈঠাটাই আড়কাঠের সঙ্গে বেঁধে ডিঙির দিকনির্দেশ নির্ভুল রাখে কাসেন; আর সামনের গলুইতে বসে ইলসা-জাল বায়।
হালের গলুইতে এসে বলল কাসেম। বৈঠাটা আড়কাঠ থেকে খুলে নিয়ে আকাশের দিকে নজরটা একবার ছড়িয়ে দিল। নলখড়ি স্কুলের মতো মেঘের স্তবক থেকে সন্ধ্যার ঘন ছায়াভাস নেমে এসেছে, বেলা শেষের সূৰ্য্যের ওপর অন্ধকার গুণ্ঠনের যবনিক টেনে দিয়েছে। কেউ। ঢেউ-এর নাগরদোলায় দোল খেতে খেতে ছল-ছল করে ইমামগঞ্জের দিকে এগিয়ে চলেছে কাসেমের একমাল্লাই জেলে-ডিঙিটা।
আচমকা ইলসার অবারিত বাতাসের অশ্রান্ত আকুলতায় জীবনের পাণ্ডুলিপিটা এলোমেলো হয়ে দুবছর আগের একটা অধ্যায় চোখের সামনে স্থির হয়ে দাঁড়াল। পদ্মাপারের মানুষ কাসেম। যাযাবর কোষ ডিঙিটায় ভাসতে ভাসতে কেমন করে যে ইসার পারে জলঘরের চৌচালা ঘরখানায় নোঙর ফেলেছিল–তা একটা অবাস্তব স্বপ্নের মতো অসত্য মনে হয়। এখানে এসেই তার বেবাজিয়া জীবনে প্রথম যতিচিহ্ন, প্রথম জন্মান্তর। তার পর জলধর আর জলধরের বউয়ের মায়ামধুর স্নেহ তার অস্থির পদচারণায় প্রথম বিশ্রান্তির কাছি পরাল। একসঙ্গে তারা খঙ্গাধার ইলসায় বের হত রুপালি ফসলের তল্লাশে। সেই জলধর-সাত দিনের জ্বরে চোখ দুটো পাকা ধানের রঙের মতো হলদে হতে হতে একদিন বিছানার মধ্যে নিথর হয়ে গেল; শরীরের সমস্ত উত্তাপ সরে গিয়ে একটা অর্থময় শীতলতা নেমে এল। সবচেয়ে বড় সত্যটা একটা ভয়ঙ্কর আতঙ্কের মতো জলধরের বউয়ের মর্মবিদারী চিৎকারের মধ্যে পরিষ্কার হয়ে উঠেছিল। জলধরের ওপর মৃত্যুর নিম্মম একটা সমাপ্তি-রেখা টেনে দিয়েছে।
তার কয়েকদিন পর কাসেম বলেছিল ও তোমার কোনও কুটুম-বাটুম আছে বউ-ঠাইন; সেখানে যাইবা?
কোনও কালে আমার কেউ নাই ঠাকুরপো। আমি আর যামু কই? আমারে দুইটা লবণ-ভাত তুমি দিতে পারবা না? সোয়ামীর ভিটা ছাইড়্যা যামু আর কোন আখায়?
জলধরের বউয়ের বিবর্ণ চোখের তারায় সেদিন ছিল একটা অসহায় প্রার্থনা। অমুন কথা কইও না বউ-ঠাইন! আমার গুণাহ লাগে। আমি ভাবতে আছি, আমি মুসলমান, তুমি হিন্দু। মাইনষে কইব কি?
মাইনষের কওনেরে আমি ডরাই না, ঠাকুরপো তোমারে আমি আমার ছোট ভাই-এর লাঘান দেখি।
সেই থেকে জলধরের বউ আর কাসেম পাসাপাশি দুখানা চৌচালা ঘরের প্রতিমুগ্ধ আয়তনে ছড়িয়ে দিয়েছে নিজেদের।
ইতিমধ্যে নৌকাটা ইনামগঞ্জের বন্দরে এসে পড়েছে। দূর থেকে ইসা-মাঝিদের ডিঙিতে লাল লাল ইমলি পাখির মালার মতো রাশি রাশি আলোর লেখা দেখা যাচ্ছে।
.
ইলিস মাছ পাইকারের গাছি নৌকায় তুলে, বউঠাইনের জন্য একখানা থান কাপড় আর তিনপাসারী পানকাইজ ধান কিনে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত্রির পরমায়ু ত্রিযামা পেরিয়ে গেল। চারদিকের আকন্দ-বৈচির ঘুমন্ত অরণ্যবেষ্টনে জোনাকির দীপান্বিতা, আটকিরা-ঝোঁপের অন্তরাল থেকে ব্যাঙ আর ঝিঁঝিদের জলসার অকৃত্রিম ঐক্যতান ভেসে আসছে।
বৃষ্টিস্নিগ্ধ উঠান থেকে কাসেম ডাকল, বউঠাইন, বউঠাইনসঙ্গে সঙ্গেই কাঁচা বাঁশের ঝাঁপ খুলে বাইরে বেরিয়ে এল জলধরের বউ; হাতের কুপির আলো থেকে কনকপদ্মের মতো শিখা বিকীর্ণ হয়েছে তার নিঘুম আঁখিতারায়।
কাসেম বলল, এখনও ঘুমাও নাই বউঠাইন?
না, ঘরের পুরুষ মানুষ রইল বাইরে। আমি মাগি খাইয়া খাইয়া শরীলে (শরীরে) রস কইর্যা বুঝি ঘুমামু? অমুন আহ্বাদের মুখে ছালি পড়ুক। আস, আস খাইবার আস। এত দেরি করলা ক্যান?
ইনামগঞ্জে গেছিলাম। তোমার কাপড় নাই–এই ধরো। এইট্যা কিনতে গেছিলাম। আর এই ট্যাকাগুলা রাখো। আইজ বিস্তর মাছ পড়ছিল জালে। কোমরের গোপন গ্রন্থি থেকে অনেকগুলো কঁচা টাকা আর খানাখানা জলধরের বউয়ের হাতে ঢেলে দিল কাসেম।
তোমারে সেই কথা কইল কে? আমার কাপড় আছে আস্তা দুখান। এমুন কাম আর কইরো না।
বিব্রত গাম্ভীর্যের আবরণ নেমে এল জলধরের বউয়ের মুখের ওপর।
তোমার যে কত আস্তা কাপড় আছে, তা আমার জানা আছে। শিলাই কইর্যা পুরান কাপড়খান পরতে আছ আইজ এক মাস। আমার চৌখ আছে বউঠাইন! আমি অন্ধ না! আমি যা খুশি করুম। অভিমানের নিবিড় রেশ আসন্ন বর্ষণের প্রতীক্ষায় থম থম করতে লাগল কাসেমের গলায়।
এবারে ফিক করে হেসে ফেলল জলধরের বউ; আইচ্ছা, খুব কত্তা-পুরুষ হইছ একেবারে! এইবার থিকা যা খুশি কইর্যো। আমি কিছু কইতে যামু না। এখন খাইতে আস, রাইত পোহাইয়া আইল যে!
হ তাই করুম। তুমি কোনও কথা কইতে পারবা না। আমি না আইন্যা যদি জলধরদাদায় আইজ আইন্যা দিত! একদিন তুমি আমারে ছোট ভাই কইছিলা–মনে নাই? আমার মা-বাপের কথা মনে নাই! আছিলাম এক বেবাজিয়া (বেদে) বহরের মাঝি। তোমার কাছে মার সোহাগ পাইছি পরথম। অমুন কথা আর কইব না।
