তাপসী হকচকিয়ে যায়। দুহাতে মুখ ঢেকে জোরে জোরে প্রবল বেগে মাথা নাড়তে নাড়তে বলে, না, না, এ হতে পারে না। আমি আপনাকে ছেড়ে কোথাও যাব না।
কোথাও যেতে হবে না আপাতত। রজতের সঙ্গে আমার কথা হয়ে গেছে। রেজিস্ট্রিটা হয়ে থাক। তারপর দেখা যাবে।
তাপসী কিছুতেই রাজি হয় না। সমানে কাঁদতে থাকে। তাকে কাছে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে মৃণালিনী অনেকক্ষণ বোঝন, আমার কিছু হলে কে দেখবে তোমাকে? মেয়েরা যতই স্বাবলম্বী হোক, তাদের একজন রক্ষাকর্তা দরকার।
একসময় কান্না থামে তাপসীর। মাথা নীচু করে ঝাপসা গলায় জিগ্যেস করে, আপনি তো বিয়ের কথা বলছেন। আমার সব কথা কি ওরা জানে?
জানে। আমি কিছুই লুকোইনি।
তাপসী আর কোনও প্রশ্ন করে না।
.
আরো মাস তিনেক বাদে ম্যারেজ রেজিস্ট্রারকে বাড়িতে ডাকিয়ে রজতের সঙ্গে তাপসীর বিয়ে দেন মৃণালিনী। এখনকার মতো রেজিস্ট্রি হয়ে রইল। পরে আত্মীয়-স্বজন বন্ধুবান্ধবদের নেমন্তন্ন করে বড় হল-এ অনুষ্ঠান করা হবে।
বিয়ের মাসখানেক পর সজ্ঞানে, সুস্থ মস্তিষ্কে উইল করে ফেলেন মৃণালিনী। তার মৃত্যু হলে এই ফ্ল্যাট এবং তার জমানো সমস্ত অর্থ পাবে তাপসী।
অনেক বাধা দিতে চেষ্টা করেছিল তাপসী। মৃণালিনী শোনেননি।
এই মানুষটিকে বরুণের সঙ্গে বিয়ের পর খানিকটা চিনতে পেরেছিল তাপসী। তারপর বিবাহবিচ্ছেদ, রজতের সঙ্গে দ্বিতীয়বার বিবাহ এবং উইলের মধ্য দিয়ে সেই চেনাটা যেন সম্পূর্ণ হয়। জীবনে মৃণালিনীর মতো মানুষ আছে আর কখনও দেখেনি তাপসী।
পদ্মার ইলিস
ইলসা। খড়্গের মতো ধারালো জলতরঙ্গ। ঘোলা জলের ঢেউ খল-খল করে বাজে আচক্রবাল বিস্তারে। গম্ভীর রাত্রে আচমকা মনে হয় জিনলোকের সুপ্তিশয্যা থেকে কোটি কোটি প্রেতাত্মা জেগে উঠে মাতলা হাসি হাসতে হাসতে পারের জেলে কৃষাণের জীবন্ত জনপদগুলোকে অপমৃত্যুর ভয় দেখাচ্ছে। ধমনির ওপর এক ঝলক রক্ত চলকে ওঠে আতঙ্কে।
সেই ইলসা। ঢেউয়ের মুকুটে চড়িয়ে একমাল্লাই ই-ডিঙিগুলোকে বেপরোয়া উল্লাসে ছুঁয়ে দেয় মেঘের সামিয়ানা-টাঙানো আকাশে, তার পরেই মোচার ভোলার মতো টেনে নিয়ে আসে নিজের খরধারায়।
ইলসা-ডিঙিটার সামনের গলুই-এ বসে তিরিশ হাত জলের অতল গর্ভে কাসেম ছড়িয়ে দিয়েছে জালটা। হাতের সতর্ক মুঠোতে দড়ির খোট ধরা রয়েছে। তিরিশ হাত জলের অতলান্তে একটি অনিবার্য সংকেত; দড়িটায় স্পর্শ করেছে ইত্সার রুপালি ফসল। আর সঙ্গে সঙ্গেই মসৃণ নিয়মে দড়িটাকে টেনে দেবে কাসেম। জালের মুখ বন্ধ হয়ে যাবে ইসার গভীর পাতালে। তিরিশ হাত জলের অতলে, স্বাধীন বিচরণের সাম্রাজ্য থেকে বন্দি হয়ে কাসেমের ডিঙিতে উঠে আকাশ-প্রণাম করবে চাঁদের মতো রূপালি ইলিস। জালের খোট-ধরা মুঠোতে সমস্ত ইন্দ্রিয়গুলোকে কেন্দ্রিত করে বসে আছে কাসেম।
টিপটিপ করে ইলসেগুঁড়ি ঝরে খই-এর মতো ফুটে উঠছে নদীতে। আকাশের পটভূমিতে অপরাজিতার মতো স্তবকে স্তবকে মেঘ জমেছে। শেষ ক্ষেপটা নৌকার ওপর তুলে ডোবার নীচে প্রসন্ন চোখে তাকাল কাসেম। নাঃ, বিশ কুড়ির মতো ইলিস পড়েছে আজ। পাইকারের নৌকায় তুলে দিলে তিরিশ-চল্লিশটা টাকা আজ মিলবেই। জালটা গুটিয়ে পাটাতনের নীচে রেখে দিল কাসেম। আজ আর মাছ ধরবে না। তার পর গু-গুন্ করে একটি আবিষ্ট নেশার গান ধরল পুলকিত গলায়–
ওগো, আমার আহ্লাদের স্বামী,
শ্বশুর বাড়ি যাইতে চাই কো নাইয়র দিবা নি?
এই ধর গো তুমি আমার চাবির ছোরানি।
তুমি আমার ট্যাকাপয়সা সিকি দোয়ানি।
ওগো, আমার আহ্লাদের স্বামী।
গানের রেশটা উজানি ঢেউ ছুঁয়ে ছুঁয়ে ছড়িয়ে পড়ল দুরতর ক্রান্তিরেখার দিকে।
সঙ্গে সঙ্গেই কাছের ইলসা-ডিঙিটা থেকে একটা উদ্দাম রসিকতা ভেসে এল; কে রে কাসমা না কি? একটা বউর লেইগ্যা মনটা বুঝি ফাকুর ফুকুর করে?
নিভন্ত গলায় কাসেম বলল; আমি কি সোয়ামীর গান গাই না কি? আমি গাই বউর বুকের পোড়ানির গান।
হ, হ, আমরা বেবাকই বুঝি। তুই যা শয়তান! বউর নাম কইর্যা তুই নিজের বুকের পোড়ানি কমাইস।
গানের সুর থামিয়ে দিয়ে চুপচাপ বসে রইল কাসেম। দূরের নৌকা থেকে আবারও সেই উদ্দাম গলাটা ভেসে এল; কি রে ঘরে যাবি না? আইজ কোন গঞ্জের পাইকাররে মাছ দিবি?
ইনামগঞ্জের।
ক্যান অতখানি গাঙ পাড়ি দেওনের কোন কাম? যে মেঘ জমছে, ডরে বুকের লৌ (রক্ত) পানি হইয়া যায়। এই মামুদপুরে মাছ বেইচ্যা ঘরে গিয়া কাথা মুড়ি দিয়া ঘুম লাগা। গাঙ্গের গতিক আইজ ভালো না কিন্তুক।
অন্তরঙ্গ গলায় সতর্ক করে দিল পাশের নৌকার ইঙ্গ-মাঝি।
না, না, ইনামগঞ্জ থিকা বউঠাইনের লেইগ্যা একখান থান কাপর নিতে লাগব। মামুদপুরে থান পাওয়া যায় না। সেই লেইগ্যা যাওন।
ওঃ, সেই হিন্দু বিধবা মাগিটা! মাথাটা বুঝি চাবাইয়া খাইছে তোর! পেতনিটারে খেদাইয়া একটা বউ ঘরে আন।
পয়গম্বরের গলায় হাবশি উচ্চারণের মতো উদাত্ত ভঙ্গিতে একটা পবিত্র পরামর্শ ভেসে এল।
অমুন কথা মুখে আনাও গুণাহ। কাসেমের গলায় নির্বাপিত প্রত্যুত্তর।
তবে গোরে যা হারামজাদা জিন। ভাগীদার মইরা গেছে, তার বউরে তা বইল্যা পুষতে হইব–এই কথা কোন কোরানে লিখা আছে? তুই কি তার লগে নিকাহ বসবি?
ছিঃ ছিঃ, কি যে কও ফরিদ চাচা!
