তরুণীটি যে সুনীতা তা না বলে দিলেও চলে। একটু আগে লিফটে করে ওপরে আসতে আসতে তাপসী যা ভেবেছিল সে সম্পর্কে আর সংশয় থাকে না। এ যুদ্ধে জেতা অসম্ভব।
এদিকে প্রখর চোখে কয়েক পলক তরুণীটির দিকে তাকিয়ে থাকেন মৃণালিনী। তারপর বলেন, তুমি সুনীতা?
মেয়েটি আস্তে মাথা নাড়ে।
মৃণালিনী বলেন, তুমি কি জানো, আমার ছেলে বরুণ বিবাহিত?
সুনীতা বলে জানি।
তাপসীকে দেখিয়ে মৃণালিনী বলেন, এ হল তার স্ত্রী
সুনীতা একবার তাপসীকে দেখ মুখটা ফিরিয়ে নেয়।
মৃণালিনী বলেন, সব জেনেশুনে একটা সংসার নষ্ট করে দিচ্ছ কেন?
সুনীতা উত্তর দেয় না।
প্রচণ্ড রাগে শরীরের সব রক্ত হঠাৎ মাথায় উঠে আসে মৃণালিনীর। গলার শিরা ছিঁড়ে তিনি চেঁচিয়ে ওঠেন, শেমলেস ডার্টি বিচ—
তাঁকে থামিয়ে দিয়ে জ্বলন্ত চোখে তাকায় সুনীতা। ছুরির মতো ধারালো গলায় বলে, স্টপ। এই ফ্ল্যাটটা আমি ভাড়া নিয়েছি। আমাকে আর একবার গালাগাল দিলে আপনাকে বার করে দেব। আপনাদের পারিবারিক ব্যাপারে যা বলার বরুণকে বলবেন। সে নাবালক শিশু নয়, তাকে আমি ফুসলে নিয়ে আসিনি। বলে অত্যন্ত উদ্ধত ভঙ্গিতে যে ঘরটা থেকে বেরিয়ে এসেছিল, আবার সেখানে ঢুকে যায়।
মৃণালিনীর মুখ লাল হয়ে উঠেছিল। বরুণকে বলেন, এক সেকেন্ডও আমি এই নরকে থাকছি না। প্যাসেজে চলো। সেটা নিশ্চয়ই ওই বজ্জাত মেয়েটা ভাড়া নেয়নি। বাইরে এসে বলেন, তোমার জন্যে একটা নোংরা বেশ্যা আমাকে অপমান করল।
বরুণ মুখ নামিয়ে শুধু বলে, তুমি এখানে এসেছ কেন?
স্থির দৃষ্টিতে ছেলেকে দেখতে দেখতে মৃণালিনী বলেন, খুব অন্যায় করে ফেলেছি। শেষ বারের মতো জিগ্যেস করছি, তুমি কি বাড়ি ফিরবে।
তোমাকে তো তখনই বললাম—
তার মানে ফিরবে না। কিন্তু বউমার কী হবে।
আমি কিছু জানি না। বিয়েটা তুমিই জোর করে দিয়েছিলে।
তোমার একেবারেই মত ছিল না, এই তো? তা হলে এক-দেড় বছর তার সঙ্গে ঘর করলে কী করে?
বরুণ বলে, সেটা তোমার মুখ চেয়ে।
মৃণালিনী বলেন, ও, আচ্ছা! তোমার মতো ইতর, লম্পটের সঙ্গে কথা বলতেও ঘেন্না হচ্ছে। এখন থেকে তাপসীর বা আমার সঙ্গে তোমার কোনও সম্পর্ক থাকবে না। চলো তাপসী।
দুজনে লিফটে করে নীচে নেমে আসনে। ট্যাক্সি ধরে বাড়ির দিকে ফিরতে ফিরতে তাপসীর কাঁধে একটা হাত রেখে নরম গলায় মৃণালিনী বলেন, ভেঙে পড়ো না মা। ওই রকম একটা লম্পটের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলে জীবন নষ্ট হয়ে যায় না। তোমার সামনে বিরাট ভবিষ্যৎ। তোমার জীবন আমি নতুন করে গড়ে দেব।
তাপসী কাঁদছিল। পরম মমতায় তার চোখ মুছিয়ে দেন মৃণালিনী।
দিন দশেক পর একজন পরিচিত লইয়ারকে ডেকে এনে তাপসীকে দিয়ে বরুণের বিরুদ্ধে ডিভোর্সের মামলা শুরু করিয়ে দেন মৃণালিনী। কারণ দুশ্চরিত্র স্বামীর লাম্পট্য। তারপর তাকে বি.টি, পড়বার জন্য কলেজে ভর্তি করে দেন।
আরো দুবছন বাদে পর পর দুটো ঘটনা ঘটে যায়। বি.টি. করার পর একটা নাম করা স্কুলে চাকরি পায় তাপসী। তার মধ্যেই বরুণের সঙ্গে তার বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল।
দ্বিতীয় ঘটনাটি মারাত্মক। হঠাৎ একদিন রাত্রে মাঝারি ধরনের হার্ট অ্যাটাক হয়ে যায় মৃণালিনীর। চারদিন ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে এবং আরো পনেরো দিন নাসিং হোমের কেবিনে থাকার পর বাড়ি ফিরে আসেন ঠিকই কিন্তু খাওয়া-দাওয়া, চলা-ফেরা–সবই ধরা বাঁধা। ডাক্তারের নির্দেশে সারাদিনই ফ্ল্যাটে আটকে থাকতে হয়, বাইরে বেরুবার উপায় নেই। স্কুলে ছুটি নিয়ে সারাক্ষণ তাঁকে আগলে আগলে রাখে তাপসী। রোজ একজন ডাক্তার এসে তাকে দেখে যান।
একদিন মৃণালিনী বললেন, তোমার সঙ্গে আমার একটা দরকারি কথা আছে মা।
আগে তাপসীকে বউমা বলতেন তিনি, কোর্ট থেকে পাকাপাকি বিবাহবিচ্ছেদের পর শুধু তাপসী বলেন কিংবা মা।
উৎসুক চোখে তাকায় তাপসী।
মৃণালিনী বলেন, আমার বয়স পঁয়ষট্টি পেরিয়েছে। কদিন আর বাঁচব! তার ওপর একটা স্ট্রোক হয়ে গেল। ডাক্তাররা বাড়ির ভেতর আটকে দিয়েছে। জীবন অনেকখানি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
তাপসী সন্ত্রন্ত ভঙ্গিতে বলে, এসব বলবেন না মা। আপনি এখনও অনেকদিন বাঁচবেন। আমি ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা বলেছেন তাদের কথামতো চললে কোনও ভয় নেই।
মৃণালিনী হাসেন, বলেন, ডাক্তাররা যাই বলুন, মৃত্যুর ওপর মানুষের হাত নেই। বিশেষ করে আমার যা বয়স তাতে সময় ফুরিয়ে আসছে। তার আগে তোমার ব্যাপারে আমার কিছু করণীয় আছে।
তাপসী বলে, আমার জন্যে যা করেছেন, আমার মা-বাবা বেঁচে থাকলে তা করতে পারত কিনা সন্দেহ। আপনার জন্যে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছি।
মৃণালিনী বলেন, আমাদের যা সোসাইটি তাতে একটি কম বয়সের মেয়ের পক্ষে তা যথেষ্ট নয়। রাজার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে তোমার কয়েকটা বছর আমি নষ্ট করে দিয়েছি। এবার তার ক্ষতিপূরণ করব।
মৃণালিনী ঠিক কী বলতে চান বুঝতে না পেরে তাকিয়ে থাকে তাপসী।
মৃণালিনী বলেন, আমি একটি ছেলেকে জানি, সে আমার এক ছাত্রীর দাদা। হি ইজ আ ব্রিলিয়ান্ট বয়। আমেরিকা থেকে ডক্টরেট করে এসেছে। এখানকার একটা ইউনিভার্সিটিতে পড়ায়। ভেরি অনেস্ট, চরিত্রবান। এখনও বিয়ে করেনি। নাম রজত। এই ছেলেটির সঙ্গে তোমার বিয়ে দেব। আমার বিশ্বাস, এবার তুমি সুখী হবে।
