মিস্টার পাই রীতিমতো অবাক হয়ে যান। মা হয়েও ছেলের বিরুদ্ধে বলছেন মৃণালিনী। এটা তাঁর কাছে অভাবনীয়। বললেন, কী করতে বলেন আপনি?
মৃণালিনী তীক্ষ্ণ স্বরে এবার বলেন, অফিসিয়াল প্রোসিডিওর যা, স্ট্রিক্টলি তা ফলো করা উচিত। বরুণকে অফিসে ডেকে পাঠান, তিন মাস ওকে আটকে রাখবেন। যেদিন অফিসে আসবে আমাকে জানাবেন। বরুণের হদিশ পাওয়া যাচ্ছে না। অফিসে এলে তাকে ধরবেন, মৃণালিনী সেরকম ইচ্ছা।
মিস্টার পাই বলেন, কিন্তু সেটা বোধহয় সম্ভব হবে না।
কেন?
রেজিগনেশান লেটারের সঙ্গে অ্যাড্রেস দেয়নি বরুণ। ওর সঙ্গে যোগাযোগ করব কী করো?
হঠাৎ খুব হতাশা বোধ করেন মৃণালিনী। বলেন, আচ্ছা, ঠিক আছে। বলে ফোনটা নামিয়ে রাখেন।
.
এরপর চারটে দিন দারুণ অনিশ্চয়তার ভেতর কেটে যায়। সুনীতা আর বরুণ যখন একই দিনে রেজিগনেশান লেটার পাঠিয়েছে তখন এটা পুরোপুরি নিশ্চিত ওরা একসঙ্গেই আছে। কিন্তু কোথায়? কলকাতায়, না বাইরে চলে গেছে? কলকাতায় থাকলে তবু একটু আশা আছে, কিন্তু বাইরে গেলে ধরা ছোঁয়া যাবে কিনা কে জানে।
সারাক্ষণ বুকের ভেতর একটা তীব্র চাপা কষ্ট অনড় হয়ে থাকে তাপসীর। সারা রাত ঘুমোত পারে না। শুধু তাকেই না, বরুণের এই জঘন্য নোংরা আচরণ মৃণালিনীকে আমূল নাড়া দিয়ে গেছে। তাঁর মতো শান্ত গম্ভীর ধৈর্যশীল মানুষ আজকাল সারাক্ষণ ক্ষিপ্ত এবং উত্তেজিত হয়ে থাকেন। দিনে সাত-আটবার লালবাজারে সুরজিৎকে ফোন করেন। কেন এতদিনেও একটা সুশৃঙ্খল পুলিশবাহিনী বরুণ আর তাপসীকে খুঁজে বার করতে পারছে না সেজন্য যথেষ্ট বকাবকিও করেন। সুরজিৎ বোঝান, এক কোটি মানুষের এত বড় মেট্রোপলিসে দুই যুবক যুবতীর হদিশ পাওয়া খুব সহজ ব্যাপারে নয়। পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে কত দিন লুকিয়ে থাকবে? তবে কলকাতায় বাইরে চলে গেলে সমস্যাটা জটিল হয়ে উঠবে। তখন বিশাল দেশের নব্বই কোটি মানুষের ভেতর দুজনকে খুঁজতে হবে। কাজটা অত্যন্ত দুরূহ। তবে আজ হোক কাল হোক ধরা ওরা পড়বেই। ও ব্যাপারে সুরজিৎ শতকরা একশোভাগেরও বেশি নিশ্চিত।
সুরজিৎ যে পুলিশের কর্মক্ষমতা সম্পর্কে বাড়িয়ে কিছু বলেনি সেটা পাঁচদিনের দিন বোঝা গেল। দুপুরবেলা সবে তাপসীদের খাওয়া শেষ হয়েছে সেই সময় লালবাজার থেকে ফোন এল।
ফোনটা তাপসীই ধরেছিল। ওধারে সুরজিতের গলা শোনা যায়, কে, বউমা?
তাপসী বলে, হ্যাঁ, মামা
সোনাদিকে একটু ডাকো তো
মৃণালিনী খাওয়ার পর তার ঘরের ব্যালকনিতে চুপচাপ বসে ছিলেন। তাপসী গিয়ে তাকে ডেকে নিয়ে এল।
মৃণালিনী ফোন তুলে জিগ্যেস করেন, কী ব্যাপার রে বাপি?
সুরজিৎ বলেন, তোমাকে একটা সুখবর দিচ্ছি সোনাদি। রাজা আর ওই মেয়েটা কোথায় আছে জানতে পেরেছি।
মৃণালিনী ফোনের ভেতর প্রায় মুখটা ঢুকিয়ে রুদ্ধশ্বাসে বলেন, কোথায়?
লেকটাউনের একটা হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের ফ্ল্যাটে। এখন বলো ক্যালকাটা পুলিশ একেবারেই অপদার্থ নয় বলে শব্দ করে একটু হাসেন সুরজিৎ।
তার কথায় এবং হাসিতে সূক্ষ্ম খোঁচা ছিল। সেটা লক্ষ করেন না মৃণালিনী। বলেন, ঠিকানাটা দে
ঠিকানা জানাতে জানাতে সুরজিৎ বলেন, ওদের ওপর একজন প্লেন ড্রেসের পুলিশকে নজর রাখতে বলেছি যাতে অন্য কোথাও পালিয়ে যেতে না পারে। এখন কী করব?
তোর কিছু করতে হবে না। যা করার আমিও করছি।
তুমি কি ওখানে যাবে?
নিশ্চয়ই।
কিন্তু
কী?
বেশ শঙ্কিতভাবেই সুরজিৎ বলেন, তোমার না যাওয়াই ভালো। আমি বরং বুঝিয়ে সুঝিয়ে বাড়িতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করি। তুমি গেলে হইচই চেঁচামেচি হবে। লোকজন মজা দেখার জন্যে ভিড় করবে। স্ক্যান্ডালের চুড়ান্ত হবে।
মৃণালিনী বললেন, স্ক্যান্ডালের বাকি কিছু আছে! এখন কিছু লোক জানে, দুদিন পর না হয় সবাই জানবে। সেই কলেজে ঢোকার পর থেকে জ্বালিয়ে আসছে। এবার যা হবার হোক। যে কোনও ইভেনচুয়ালিটির জন্যে আমি তৈরি। সুরজিৎকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে লাইন কেটে দিতে দিতে তাপসীকে বলেন, বউমা, জামাকাপড় পালটে নাও। আমিও শাড়িটা বদলে নিচ্ছি।
ভয়ে ভয়ে তাপসী জিগ্যেস করে, আপনি কি এখনই লেকটাউনে যাবেন।
হ্যাঁ। একা আমি না, তোমাকেও যেতে হবে।
কিন্তু
মৃণালিনী তীক্ষ্ণ চোখে তাপসীকে লক্ষ করতে করতে বলেন, লড়াইটটা আমার একার না, তোমারও। যাও–
আধঘণ্টার ভেতর দুজন বেরিয়ে পড়েন।
.
সুরজিৎ লেকটাউনের যে হাইরাইজের ঠিকানা দিয়েছেন তার নাম অপ্সরা। সেটা খুঁজে বার করতে অসুবিধা হল না।
ট্যাক্সি থেকে নেমে লিফটে করে মৃণালিনীর সঙ্গে সিক্সথ ফ্লোরে উঠতে উঠতে তাপসীর বারবার কেন যেন মনে হচ্ছিল যে যুদ্ধে তারা নেমেছে তাতে হার অনিবার্য। অথৈ নৈরাশ্যে ক্রমশ ডুবে যাচ্ছিল সে।
সিক্সথ ফোরে এসে সাত নম্বর ফ্ল্যাটে কলিং বেল বাজাতেই দরজা খুলে দেয় বরুণ। মৃণালিনীদের দেখে ভয়ে তার মুখ রক্তশূন্য হয়ে যায়। কোনওরকমে সে বলতে পারে, তুমি-তোমরা! এ বাড়ির ঠিকানা কোথায় পেলে!
মুখ শক্ত হয়ে উঠেছিল মৃণালিনীর। কঠোর গলায় বলেন, তা নিয়ে না ভাবলেও চলবে। এক্ষুনি বাড়ি চলো–
এর মধ্যে নিজেকে অনেকটা সামলে নিয়েছে বরুণ। বলে, না। এখন আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব না।
কেন?
বরুণ উত্তর দেয় না।
মৃণালিনী কী বলতে যাচ্ছিলেন, এই সময় ভেতর থেকে একটি তরুণী বেরিয়ে আসে। গায়ের রং পাকা গমের মতো। চোখ ধাঁধিয়ে দেবার মতো তার চেহারা। মেয়েটার চিবুকের খাঁজে, ভেজা ভেজা রক্তাভ ঠোঁটে, ঢুলঢুলু চোখে, ডান গালে মটরদানার মতো একটি তিলে, নিটোল মসৃণ গ্রীবায় এমন এক উগ্র মাদকতা মাখানো রয়েছে যে তার দিকে তাকালে যে কোনও পুরুষের মন অশ্লীল হয়ে ওঠে।
