টেবলের ওপর অনেকটা ঝুঁকে মৃণালিনী জিগ্যেস করেন, যেটা কী?
খুবই এমব্যারাসিং। হয়তো আমাদেরও ভুল হতে পারে। কো-ইন্সিডেন্স হওয়া আশ্চর্য নয়।
দয়া করে আপনি বলুন। আমরা কিছু মনে করব না।
দ্বিধান্বিতভাবে পাই বলেন, যেদিন থেকে বরুণ আসছে না, দেখা যাচ্ছে ঠিক সেদিন থেকেই আমাদের পার্সোনেল ডিপার্টমেন্টের একজন অফিসার সুনীতা কুলকার্ণি ছুটি নিয়েছে। তিনদিন আগে তার ছুটি ফুরিয়েছে কিন্তু এখনও জয়েন করেনি। কবে করবে তাও জানায়নি।
মৃণালিনী জিগ্যেস করেন, সুনীতা কুলকার্ণির বয়স কী রকম?
মিস্টার পাই একটু ভেবে বলেন, সাতাশ-আটাশ হবে।
দেখতে কেমন?
কোয়াইট অ্যাট্রাক্টিভ।
মুখ শক্ত হয়ে উঠেছিল মৃণালিনীর। যা তার স্বভাববিরুদ্ধ এবার তাই করে বসেন। উত্তেজনায় চিৎকার করে বলেন, আমি সিওর, ওরা দুজন একসঙ্গেই গেছে।
মিস্টার পাই হতচকিত। বলেন, এ কী বলছেন মিসেস মল্লিক।
মৃণালিনী আগের স্বরেই বলেন, ঠিকই বলছি পাইসাহেব। নিজের ছেলেকে আমি চিনি। মেয়েদের ব্যাপারে তার সুনাম নেই। আপনার অনেকটা সময় নষ্ট করলাম। আচ্ছা চলি, নমস্কার। চলো তাপসী বলতে বলতে উঠে পড়েন।
আচ্ছন্নের মতো বসে ছিল তাপসী। সুনীতা আর বরুণ। সাত দিন ধরে অফিসে আসছে না, এটা জানার সঙ্গে সঙ্গে বুকের ভেতর থেকে অসহ্য কান্না উঠে এসে গলার কাছে যেন ডেলা পাকিয়ে যাচ্ছিল। ধীরে ধীরে সে উঠে দাঁড়ায়।
বাড়ি ফিরে ড্রইং রুমে বেশ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকেন মৃণালিনী। একটু দুরে একটা বেতের মোড়ায় তাপসীও শ্বাসরুদ্ধের মতো বসে ছিল। সে লক্ষ করে মৃণালিনীর মুখ লাল হয়ে উঠেছে। মনে হয় শরীরের সব রক্ত সেখানে গিয়ে জমা হয়েছে। তার ভেতরে যে মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো কিছু চলছে সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না।
একসময় উঠে দাঁড়ান মৃণালিনী। অস্থির পা ফেলে ফেলে ঘরময় ঘুরে বেড়ান। যেন কোনও কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। আধঘণ্টা এভাবে কাটার পর হঠাৎ যেন মনস্থির করে ফেলেন। তাপসীর কাছে এগিয়ে এসে বলেন, বউমা, তোমার কাছে আমার অপরাধের শেষ নেই। বিয়ের আগে তোমার দিকটা চিন্তা করিনি, নিজের স্বার্থই শুধু দেখেছি। এমন লম্পটের সঙ্গে তোমার সঙ্গে তোমার বিয়ে দেওয়া ঠিক হয়নি। স্বগতোক্তির মতো বলেন, ফুলের মতো একটা মেয়ের জীবন একেবারে নষ্ট করে দিলাম। পরক্ষণে তার ওপর কী একটা যেন ভর করে। ক্রুদ্ধ, হিংস্র ভঙ্গিতে বলেন, আমি ওকে ছাড়ব না। অনেক সহ্য করেছি, আর নয়। বউমা, তোমার বিরাট ভবিষ্যৎ পড়ে রয়েছে। সেজন্যে আমাকে কিছু করতেই হবে। আমি যা ডিসিসান নেব, সেটা তোমাকে মানতে হবে।
পাঁচ বছর বিয়ে হয়েছে তাপসীর, কিন্তু মৃণালিনীর এমন ভয়ঙ্কর চেহারা এই প্রথম দেখল। বিহুলের মতো আস্তে মাথা নাড়ে সে।
মৃণালিনী বলেন, সবার আগে দরকার ওদের খুঁজে বার করা। আরে আমার পিসতুতো ভাই সুরজিৎই তো রয়েছে লালবাজারে। মস্ত অফিসার। ওকে একটা ফোন করে জানাই
তাপসী ঝাপসা গলায় বলে, মা, ব্যাপারটা জানাজানি হলে
তাকে থামিয়ে দিয়ে মৃণালিনী বলেন, অনেকদিন চাপা দিয়ে রেখেছি। বহু আগেই স্টেপ নেওয়া উচিত ছিল। মাতৃস্নেহ আমাকে অন্ধ করে রেখেছিল। কিন্তু আর নয়
ড্রইংরুমের একধারে ঘোট টেবলের ওপর টেলিফোনটা থাকে। সেটা তুলে নিয়ে ডায়াল করে লালবাজারে সুরজিৎকে ধরে ফেলেন মৃণালিনী, বাপি, আমি সোনাদি বলছি। তার ডাকনাম সোনা।
ওধার থেকে সুরজিৎ কী বললেন, শোনা গেল না।
মৃণালিনী এবার বরুণ এবং সুনীতা সম্পর্কে সব জানিয়ে বললেন, সাতদিনের ভেতর ওদের খবর চাই। তারপর কথোপকথনটা এইভাবে চলল। কেলেঙ্কারি? তার আর কী বাকি আছে?…হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি কোনও কথা শুনব না!…ওকে একটা শিক্ষা দেওয়া দরকার।…
সুরজিতের গলা শোনা না গেলেও তিনি কী বলছেন আন্দাজ করতে পারছিল তাপসী।
মিনিট দশেক কথা বলে ফোন নামিয়ে রাখেন মৃণালিনী। তারপর তাপসীর দিকে তাকান, বলেন, কোথায় লুকিয়ে থাকবে? পুলিশ না পারে এমন কাজ নেই, ঠিক খুঁজে বার করবে। তারপর আমি দেখব ও কত বড় বদমাস হয়ে উঠছে।
.
পরদিন বিকেলে মিস্টার পাইয়ের ফোন এল। ব্যাপারটা এত অপ্রত্যাশিত যে খুবই অবাক হয়ে গেলেন মৃণালিনী। জিগ্যেস করলেন, কোনও জরুরি খবর আছে পাইসাহেব?
মিস্টার পাই বললেন, হ্যাঁ ম্যাডাম। আপনি আপনার ছেলের সম্পর্কে ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে আছেন। তাই ইনফরমেশনটা দেওয়া দরকার মনে করলাম।
মৃণালিনী উন্মুখ হয়ে রইলেন, কিছু বললেন না।
মিস্টার পাই এবার যা বলেন তা এই রকম। বরুণ এবং সুনীতা তাদের অফিসে আর আসবে না, তারা রেজিগনেশান লেটার পাঠিয়ে দিয়েছে।
মৃণালিনী এতটা ভাবতে পারেননি। একটু চুপ করে থেকে বলেন, ওদের রেজিগনেশান অ্যাকসেপ্টেড হয়েছে?
হয়ে যাবে।
আমি যত দূর জানি আমার ছেলে যে পোস্টে কাজ করত তাতে রেজিগনেশান দিলেই অ্যাকসেপ্টেড হয় না। তার আগে মিনিমান তিন মাসের নোটিশ দিতে হয়।
তা হয়, কিন্তু যে কাজ করবে না ঠিক করেছে তাকে ধরে রাখা তো সম্ভব নয়। আজ হোক কাল হোক ছেড়ে দিতেই হবে। আমরা কোনও রকম তিক্তকা করতে চাই না।
মৃণালিনী বলেন, অফিসের যা নিয়ম তা তো মেনে চলতে হবে। মিস্টার পাই, ওকে সহজে ছাড়বেন না। যা খুশি তাই করবে সেটা কোনও ভাবেই মেনে নেওয়া ঠিক নয়। এতে আপনাদের অফিসে ইনডিসিপ্লিন বেড়ে যাবে।
