লম্পট ছেলেদের শোধরাবার জন্য সবাই যে মুষ্টিযোগ প্রয়োগ করে মৃণালিনীও তাই করলেন। প্রথমে অনেক বুঝিয়েছেন কিন্তু তাতে কাজ না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তার বিয়ে দিলেন। নিজেই তাপসীকে পছন্দ করেছিলেন। বাপ-মা-মরা মেয়ে। নম্র, ভদ্র, বিনয়ী। ইতিহাসে অনার্স নিয়ে গ্র্যাজুয়েট। দূর সম্পর্কের এক মামার বাড়িতে সে অল্প বয়স থেকে মানুষ হয়েছে। মামা এবং মামি মানুষ ভালো, খুবই সহৃদয়। নিজেদের ছেলেমেয়েদের থেকে কোনওদিন তাপসীকে আলাদা করে দেখেননি।
ছেলের স্বভাব কেমন, বিয়ের আগেই তাপসীকে জানিয়ে দিয়েছিলেন মৃণালিনী। কিছুই গোপন করেননি। তার দুহাত ধরে বলেছিলেন, আমি পারিনি। আমার বিশ্বাস তুমি পারবে। রাজাকে শোধরাবার দায়িত্ব তোমাকে দিলাম। স্ত্রী হিসেবে এটা তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিয়ের পর কিছু দিন স্বভাবটা পাল্টাতে শুরু করেছিল বরুণের। আগে অফিসের পর প্রায়ই বান্ধবী জুটিয়ে কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়াত। সেটা এবার বন্ধ হল। অফিস ছুটি হলে নিয়মিত বাড়ি আসতে লাগল বরুণ। স্ত্রীকে নিয়ে প্রায়ই নাইট শোয়ে সিনেমায়, নইলে কোথাও বেড়াতে যেত। আসলে নতুন একটা তরুণীকে নিবিড় করে পাওয়ার মধ্যে তীব্র মাদকটা থাকে।
কিন্তু দু-এক বছর কাটতে না কাটতেই নেশা কেটে যায় বরুণের। আবার তার সম্বন্ধে কিছু কিছু স্ক্যান্ডাল কানে আসতে থাকে তাপসী আর মৃণালিনীর। ছুটির পর বাড়িতে ফেরাটা তার অনিয়মিত হয়ে ওঠে। মাঝে মাঝে এক-দুদিন ফেরেও না। অবশ্য রাতের দিকে ফোন করে জানিয়ে দেয়, এক বন্ধু তাদের বাড়ি ধরে নিয়ে এসেছে, ফেরা সম্ভব হবে না।
মৃণালিনী ছেলের হাড়ের ভেতর পর্যন্ত জানেন। তাঁর মুখ গম্ভীর হয়ে ওঠে। প্রচণ্ড উৎকণ্ঠা তাকে গ্রাস করতে থাকে। অবশ্য বাইরে থেকে তা দেখে বোঝার উপায় নেই।
তাপসীও এত দিনে স্বামীকে চিনে ফেলেছে। মৃণালিনীর কথামতো বরুণকে শোধরানোর অনেক চেষ্টা করেছে। প্রচুর কান্নাকাটি করেছে সে, প্যাসিভ রেজিস্ট্যান্স হিসেবে দিনের পর দিন উপোস দিয়ে থেকেছে কিন্তু তাকে ফেরানো যায় নি।
আগে মাঝে মাঝে দু-একদিন রাতে বাড়ি আসেনি বরুণ। এখন তো পুরো সাতদিন কাটতে চলল, তার খোঁজ নেই।
.
কোনও রকমে স্নান-খাওয়া চুকিয়ে মৃণালিনীর সঙ্গে বেরিয়ে পড়ে তাপসী। বড় রাস্তা তাদের বাড়ি থেকে তিন মিনিটের পথ। সেখানে আসতেই একটা ফাঁকা ট্যাক্সি পাওয়া গেল।
বরুণের অফিস ক্যামাক স্ট্রিটে, একটা বোলতলা হাইরাইজের সেভেন্থ এইটথ নাইথ আর টেথ, মোট চারটে ফ্লোর জুড়ে। অফিস বিল্ডিংয়ের সামনে এসে ট্যাক্সি থেকে নেমে সারি সারি লিফট বক্সগুলোর দিকে চলে যায় দুজনে। সবগুলো লিফটের সামনেই লম্বা লাইন। যে লাইনটা অন্যগুলোর তুলনায় ছোট তার পেছনে দাঁড়িয়ে পড়ে তারা।
মিনিট দশেক বাদে লিফটে ঢোকার সুযোগ পাওয়া যায়। আগে একবারই মাত্র মৃণালিনী বরুণের অফিসে এসেছিলেন। তাপসী কখনও আসেনি। ঝিঁঝির ডাকের মতো একটানা আওয়াজ করে লিফট যত ওপরে উঠতে থাকে ততই বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডের উত্থানপতনের গতি বেড়ে যায়। অজানা এক শঙ্কা তাকে যেন চারদিক থেকে ঘিরে ধরে।
সেভনথ ফ্লোরে ঢুকলেই বরুণদের অফিস ম্যাগনাম ইন্টারন্যাশনাল-এর রিসেপসান। সেখানে দারুণ স্মার্ট চেহারার একটি তরুণী সারা গা থেকে উগ্র সেন্টের গন্ধ বিতরণ করছিল। তার বাদামি রঙের ফাঁপানো চুল, কঁধ পর্যন্ত ছাঁটা, ভুরু প্লাক-করা, ম্যানিকিওর করা নখে এবং ঠোঁটে চড়া রং।
মাপা যান্ত্রিক হেসে তরুণী ইংরেজিতে জিগ্যেস করে, আপনাদের জন্যে কী করতে পারি?
বোকা যাচ্ছিল মেয়েটি বাঙালি। বিশুদ্ধ বাংলায় মৃণালিনী বলেন, আমি ফিনান্স ডিপার্টমেন্টের একজিকিটিভ বরুণ মল্লিক সম্পর্কে কিছু জানতে চাই।
তিনি অফিসে আসেননি। এবার তরুণী বাংলাতেই উত্তর দেয়।
জানি। আমি তার মা। আর এ হল বরুণের স্ত্রী– তাপসীকে দেখাতে দেখাতে মৃণালিনী বলেন, সাতদিন ধরে তার খোঁজে লোক পাঠাচ্ছি। রোজ বাড়ি গিয়ে সে জানাচ্ছে বরুণ অফিসে আসেনি।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, রিসেপসনিস্ট বলে, একজন মিডল-এজেড লোক কদিন ধরে মিঃ মল্লিকের খোঁজে আসছে। আজও এসেছিল।
সাতদিন আগে সে অফিসে এসেছিল। তারপর আর বাড়ি ফেরেনি। কোথায় যেতে পারে বলে আপনাদের ধারণা? অফিস কি কোনও প্রয়োজনে তাকে কলকাতার বাইরে পাঠিয়েছে?
আমি বলতে পারব না।
কার পক্ষে বলা সম্ভব?
আপনি ফিনান্স ডিপার্টমেন্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট মিস্টার পাইয়ের সঙ্গে দেখা করে কথা বলুন।
ঠিক আছে। কীভাবে তার সঙ্গে দেখা করব?
একটু ওয়েট করুন। আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
ইন্টারকমে কথা বলে তরুণীটি মৃণালিনীদের জানায় নাইথ ফ্লোরে মিস্টার পাইয়ের চেম্বার। তিনি তার ঘরেই আছেন, মৃণালিনীদের জন্য অপেক্ষা করছেন।
মিস্টার পাইয়ের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। অত্যন্ত ভদ্র এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। বরুণের ব্যাপরে তাকে বেশ উৎকণ্ঠিতই দেখা গেল। বললেন, বরুণ আমাদের কোম্পানির অ্যাসেট। কেন যে সাতদিন ধরে আসছে না, বুঝতে পারছি না। আজকের দিনটা দেখে কাল আপনাদের বাড়িতে যোগাযোগ করতাম। একটু থেমে গলা নামিয়ে এবার বলেন, একটা ইনফরমেসন আপনাদের দিতে পারি যেটা বলতে বলতে চুপ করে যান।
