খুব অল্প বয়সে মৃণালিনীর কাছে এসেছিল অবিনাশ। বাবা-মা, ভাই-বোন তিন কুলে কেউ নেই তার। বিয়ে করেনি। এঁদের কাছে থাকতে থাকতে সংসারের একজন হয়ে গেছে। জড়িয়ে গেছে মৃণালিনীদের সুখ দুঃখ আশা আর নৈরাশ্যের সঙ্গে। রক্তের সম্পর্ক না থাকলে সে মৃণালিনীদের সত্যিকারের হিতাকাঙ্খী।
মৃণালিনী তাপসীকে সোফা দেখিয়ে বলেন, বসো বউমা–
তাপসী বসে না, রুদ্ধশ্বাসে অবিনাশের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মৃণালিনী এবার অবিনাশের উদ্দেশে বলেন, কিছু জানা গেল।
মুখ নামিয়ে অবিনাশ ধীরে ধীরে মাথা নাড়ে, না মা। আজও দাদাবাবু অফিসে আসেননি।
কবে আসবে, ওরা কিছু বললে?
না।
আশ্চর্য!
অবিনাশ চুপ করে থাকে।
মৃণালিনীর চোখে মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ ফুটে উঠতে থাকে। এমনিতে তিনি ধীর, স্থির, সহজে চঞ্চল বা বিচলিত হন না, কিন্তু সাত দিন আগে বরুণ সেই যে অফিসে গিয়েছিল তার পর থেকে তার কোনো খোঁজ নেই। রোজ অবিনাশকে তার অফিসে পাঠানো হচ্ছে কিন্তু অফিসের কেউ জানে না সে কোথায় গেছে। বরুণও বাড়িতে কিছু জানিয়ে যায়নি। এমনকী দূরে কোথাও গিয়ে থাকলে ফোন করে বা চিঠি লিখে খবরও দেয়নি। এই কদিনে একটু একটু করে উৎকণ্ঠা জমা হচ্ছিল মৃণালিনীর মনে। আজ সত্যিই তিনি ভেতরে ভেতরে অত্যন্ত অস্থির হয়ে উঠেছেন। কোথায় যেতে পারে ছেলেটা? তার কি কোনো বিপদ ঘটেছে?
মৃণালিনী হঠাৎ মনস্থির করে ফেলেন। অবিনাশকে দিয়ে হবে না। তিনি নিজেই আজ তাপসীকে সঙ্গে করে বরুণের অফিসে যাবেন। তার ধারণা অবিনাশকে হয়তো ওরা সঠিক খবর দিচ্ছে না।
মৃণালিনী বলেন, বৌমা, তুমি তাড়াতাড়ি স্নানটা সেরে নাও। দুপুরের যাওয়া সেরে আমার সঙ্গে রাজার অফিসে যাবে। বরুণের ডাক নাম রাজা।
তাপসী চকিত হয়ে ওঠে, আমি–আমি যাব!
হ্যাঁ।
কিন্তু অবিনাশদা তো রোজ গিয়ে ঘুরে আসছে। আপনার ছেলের সম্বন্ধে কোনো খবর থাকলে কি ওরা জানাত না?
কিছুক্ষণ চিন্তা করে মৃণালিনী বলেন, কোথায় যেন একটা মিষ্ট্রি রয়েছে। ঠিক বুঝতে পারছি না। একটু থেমে বলেন, মা আর স্ত্রী গেলে গুরুত্বটা ওদের কাছে অনেক বেড়ে যাবে।
তাপসী আর কোনো প্রশ্ন করে না, সোজা নিজের বেডরুমে গিয়ে স্নানের ঘরে ঢুকে যায়।
.
মৃণালিনীদের ছোট্ট পরিবার। একমাত্র ছেলে বরুণ, পুত্রবধু তাপসী আর তিনি নিজে–সব মিলিয়ে তিনজন। অবশ্য অবিনাশকে ধরলে চার।
মৃণালিনী পরমাশ্চর্য একটি মানুষ। প্রবল আত্মসম্মান বোধ তার, সেই সঙ্গে রয়েছে। শক্ত মেরুদণ্ড যা কখনও কোনও কারণেই তাকে নুয়ে পড়তে দেয় না। তার বিবাহিত জীবন অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। বিয়ের সাত বছরের মাথায় যখন তার বয়স মোটে বত্রিশ এবং বরুণের তিন সেই সময় স্বামীকে হারান।
মৃণালিনীর দাদারা ছুটে এসে তাকে নিজেদের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর বাবার বহুদিন আগেই মৃত্যু হয়েছে। ভাইরা মানুষ হিসেবে সহৃদয়, সহানুভূতিশীল। বোনকে তারা পরম মমতায় আগলে রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ছেলেকে নিয়ে অন্যের কাঁধে চিরকার বোঝা হয়ে থাকতে তার মন সায় দেয়নি।
মাত্র বছর তিনেকের মতো দাদাদের কাছে থেকেছেন মৃণালিনী। বিয়ের আগে বি.এ-টা পাশ করেছিলেন। অসাধারণ ছাত্রী তিনি, ইংরেজি অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড। বিয়ে হয়ে যাবার পর নানা কারণে পড়াশোনায় ছেদ পড়ে গিয়েছিল। স্বামীর মৃত্যুর পর শোকের প্রাথমিক বিহ্বলতা কাটিয়ে উঠে সোজা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। এম.এতেও ভালো রেজাল্ট হল। এবারও ফার্স্ট ক্লাস। তিরিশ বছর আগে এখনকার মতো কলেজের চাকরি দুর্লভ ছিল না। ইউনিভার্সিটি থেকে বেরুবার সঙ্গে সঙ্গে নামকরা কলেজে লেকচারশিপ পেয়ে যায় মৃণালিনী। ছমাস পর আলাদা বাড়ি ভাড়া করে ছেলেকে নিয়ে সেখানে চলে গেলেন। দাদারা ভীষণ দুঃখ পেয়েছিলেন। তিনি তাদের বুঝিয়েছেন, আমাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে দাও। তোমরা তো কাছেই রইলে। তেমন বুঝলে আবার তোমাদের কাছে চলে আসব।
এরপর একদিকে কলেজ, আরেকদিকে ছেলেকে মানুষ করা–এর মধ্যেই জীবন কেটে যেতে লাগল। একজন অবিবাহিত, প্রায় সমবয়সি সহকর্মী, সমরেশ সান্যাল তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। মানুষটি ভদ্র সুপুরুষ, সহানুভূতিশীল। কিন্তু মৃত স্বামীর স্মৃতি তাঁর কাছে এমনই মূল্যবান যে দ্বিতীয়বার বিয়ের কথা ভাবতে পারেননি মৃণালিনী। সবিনয়ে সমরেশকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। সেজন্য কোনও রকম তিক্ততা হয়নি। পরে সমরেশ বিয়ে করেছেন। এখনও তাদের যোগাযোগ আছে। দুজনের সম্পর্ক পারস্পরিক প্রীতি ও শ্রদ্ধার।
বরুণ বড় হতে লাগল। ছাত্র হিসেবে সে খুবই মেধাবী। পঁচিশ বছর পূর্ণ হবার আগেই চার্টার্ড অ্যাকাউনটেন্সির সঙ্গে বিজনেস ম্যানেজমেন্টে চোখ ধাঁধানো রেজাল্ট করার পর একটা বিরাট ফার্মে তার চাকরি হয়ে যায় এবং চার-পাঁচ বছরের ভেতর প্রমোশন পেয়ে এখন সে কোম্পানির ফিনান্স ডিপার্টমেন্টের একজন টপ একজিকিউটিভ।
বরুণের সবাই চমৎকার কিন্তু চরিত্রে সংযম বলতে কিছু নেই। সুন্দরী মেয়েদের সম্পর্কে তার প্রচণ্ড দুর্বলতা। কলেজে ভর্তি হবার পর থেকেই এই নিয়ে বারবার নানা স্ক্যান্ডালে সে জড়িয়ে পড়েছে। ফলে টেনসানের শেষ নেই মৃণালিনীর। সবাই আড়ালে বলাবলি করে, অমন শুদ্ধ চরিত্রের মায়ের এ রকম দুশ্চরিত্র ছেলে হয় কী করে?
