ওটা তো ফেঁসে গেছে।
ও আমি মেরামত করে নেব। ফিকর মাত্ কর।
সুকুমারের মুখ দেখে মনে হল, যোশেফকে কিছু টাকা দেবার কথা ভাবছেন কিন্তু সে কথা বলতে তাঁর সাহস হল না।
হাতজোড় করে ওদের তিনজনকে, বিশেষ করে সুলতানাকে বললাম, যাচ্ছি–
সুলতানা বলল, বেটা, তোদের ভালো করে খাওয়াতে পারলাম না। আমাদের লেড়কা লেড়কি নেই। কভি কভি দো-চার রোজ এসে তোরা থাকলে আমাদের দিল খুশ হয়ে যাবে। আসবি তো?
আসব। আস্তে মাথা নাড়লাম। কিন্তু টুগাপুরে আর কখনও যাওয়া হয়নি।
গাড়িতে উঠে পড়েছিলাম। সুকুমার পাল স্টার্ট দিলেন। জিপ চলতে শুরু করল। তিনটি মানুষ পাহাড়ি পথের ধারে দাঁড়িয়ে রইল। আমি ঘাড় ফিরিয়ে শুধু সুলতানার দিকে তাকিয়ে থাকি। ওই পাঠান মহিলাটি সুন্দরী নয়, তাকে দেখলে আঁতকে ওঠার কথা। কিন্তু মায়ায় মমতায় স্নেহে সহানুভূতিতে পৃথিবীর সেরা সেরা সম্রাজ্ঞীরা তার পায়ের নখের যোগ্য নয়।
সুলতানার মতো জননীদের ভারতবর্ষের নানা জায়গায় আমি দেখেছি। বম্বের (এখনকার মুম্বই) চওল-এ, দণ্ডকারণ্যের কেশকাল পাহাড়ে, কোঙ্কন উপকূলের জেলেপাড়ায়, বিহারের অস্ফুটুলিতে ইত্যাদি ইত্যাদি। তাদের কথা পরে কখনও বলা যাবে।
জননী
দক্ষিণ কলকাতার নিরিবিলি এলাকায় এই দশতলা হাইরাইজ বাড়িটার নাম আকাশ দীপ। এর প্রতিটি ফ্লোরে তিনটি করে হাজার স্কোয়ার ফিটের ফ্ল্যাট, বেসমেন্টে গ্যারাজ। সব মিলিয়ে তিরিশটি ফ্ল্যাটের তিরিশ জন স্বত্বধিকারী কো-অপারেটিভ করে এই বাড়িটা বানিয়েছে।
জায়গাটা শুধু নিরিবিলিই নয়, বড় রাস্তা থেকে একটু দূরে থাকার কারণে গাড়ি টাড়ির উৎপাত কম। পরিবেশ দূষণ বলতে যা বোঝায় তা থেকে অঞ্চলটা অনেকখানি মুক্ত। চারপাশে আরো কটা হাইরাইজ থাকলেও এখনও এখানে প্রচুর গাছপালা আর পাখি চোখে পড়ে। অগুনতি মানুষের ভিড়ে, তুমুল হইচইতে এয়ার-হর্নের কানফাটানো আওয়াজে, পোড়া গ্যাসোলিনের ধোঁয়ায় যখন এই শহরের দম বন্ধ হয়ে আসছে তখন তারই এক ধারে এমন একটা ঘন সবুজে ঢাকা, শান্ত, নিঝাট পাড়া থাকতে পারে, তা যেন ভাবাই যায় না।
আকাশ দীপ-এর বাসিন্দাদের সবাই শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত, কেউ অধ্যাপক, কেউ মাল্টিন্যাশানাল কোম্পানির টপ একজিকিউটিভ, কেউ ডাক্তার, কেউ ব্যাঙ্ক ম্যানেজার, কেউ স্টেট বা সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের অফিসার ইত্যাদি।
এই বাড়িরই থার্ড ফ্লোরের একটি ফ্ল্যাটের কোণের দিকের একটি ঘরে জানালার ধার ঘেঁষে চুপচাপ বসে ছিল তাপসী। অত্যন্ত সুশ্রী চেহারা। বয়স সাতাশ-আটাশ। পোশাক বা সাজসজ্জার দিকে কোনওরকম নজর নেই তার। পরনের শাড়িটা আধময়লা, চুল উষ্কখুষ্ক, কপালে বাসি সিঁদুরের আবছা দাগ। সারা মুখ জুড়ে গাঢ় বিষণ্ণতা।
রাস্তার দিকে তাপসীর মুখ ফেরানো। এখন দুপুর। খানিকক্ষণ আগে ইলেকট্রনিক দেওয়াল ঘড়িতে সেতারের ঝঙ্কার তুলে বারোটা বেজেছে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই অবিনাশের ফেরার কথা, তার জন্যই অপেক্ষা করছে তাপসী। শুধু আজই না, সাতদিন ধরে এখানে, এই সময়টা, ঠিক এইভাবে বসে থাকছে সে। এ কদিন অবিনাশ যে খবর নিয়ে এসেছে তা খুবই হতাশাজনক। আজ এসে কী বলবে কে জানে।
তাপসী যেখানে বসে আছে সেখান থেকে পাশের ঘরের ব্যালকনির একটা অংশ চোখে পড়ে। ওখানে একটা বেতের সোফায় বসে আছেন মৃণালিনী। বয়স বাষট্টি-তেষট্টি। তার ফর্সা মুখের একাংশ, সাদা এবং কালোয় মেশানো চুল, খাড়া নাক, মেটালের চশমা ইত্যাদি মিলিয়ে যে প্রোফাইলটা দেখা যায় তাতে মনে হয় মহিলা খুবই ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। তপসী জানে তার মতো মৃণালিনীও অবিনাশের জন্য অপেক্ষা করছেন। আসলে অবিনাশকে তিনিই কদিন ধরে একটা খবরের জন্য বরুণের অফিসে পাঠাচ্ছেন, যার সঙ্গে এই পরিবারের ভবিষ্যৎ এবং তাপসীর মরণবাঁচন জড়িয়ে আছে।
ঘড়িতে যখন একটা বাজল সেই সময় দেখা গেল সামনের রাস্তা দিয়ে অবিনাশ আকাশ দীপ-এর মেন গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েছে। তিন চার মিনিটের ভেতর সে লিফটে করে ওপরে উঠে আসবে।
তাপসী টের পেল তার হৃৎপিণ্ডে এলোপাথাড়ি ঢাক পেটানোর মতো আওয়াজ হচ্ছে। তারই মধ্যে লক্ষ করল, ওধারের ব্যালকনিতে মৃণালিনী নেই। নিশ্চয়ই অবিনাশকে দরজা খুলে দেবার জন্য উঠে গেছেন।
তাপসী একবার ভাবে, উঠে পড়বে কিন্তু পরক্ষণে টের পেল পা দুটো পেরেক ঠুকে কেউ যেন মেঝেতে আটকে দিয়েছে। একটা অজানা চাপা আশঙ্কা তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরতে থাকে। যদি আজও বরুণের খবর পাওয়া না গিয়ে থাকে?
আচ্ছন্নের মতো বসে থাকতে থাকতে একসময় দরজা খোলার শব্দ কানে তাপসীর। তারপরই মৃণালিনী ডাকেন, বউমা, এখানে এসো
কোনও রকমে নিজেকে টেনে তোলে তাপসী। তারপর এলোমেলো পা ফেলে দরজার দিকে এগিয়ে যায়।
এই ফ্ল্যাটে সবসুদ্ধ তিনটে বেড রুম। এ ছাড়া কিচেন, স্টোর, ডাইনিং-কাম ড্রইং রুম। সবগুলোই চমৎকার সাজানো গোছানো।
ড্রইং রুমে আসতে চোখ পড়ে মৃণালিনী একটা সোফায় বসে আছেন। অবিনাশ বসেনি, একটু দুরে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
অবিনাশের বয়স চুয়াল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ। তামাটে রং চৌকো মুখ, মাথার মাঝখানে সিঁথি। পেটানো স্বাস্থ্য তার। চেহারায় বুদ্ধির ছাপ আছে। পরনে ধুতি এবং ভোরা-কাটা হাফ-হাতা পাঞ্জাবি। সে এ বাড়ির কাজের লোক।
