হাত দুটো বিচিত্র ভঙ্গিতে মাথার ওপরে তুলে মিতি এপাশ-ওপাশ দুলছিল। বড়-বড় শ্বাস ফেলতে-ফেলতে ও বাপ্পাদিত্যর নাম ধরে ফিশফিশ করে দুবার ডেকে উঠল।
প্রিয়নাথ চাপা গলায় আদেশের সুরে বললেন, বাপ্পা, পেনসিল নিয়ে রেডি হও।
বাপ্পার হাত যে কাঁপছিল সেটা আমি বেশ টের পাচ্ছিলাম। ও আমার হাত ছেড়ে পেনসিল নিয়ে তৈরি হল। আমি অন্ধকারেই আন্দাজ করে ওর কাঁধ ছুঁয়ে বসে রইলাম।
প্রিয়নাথ পেনসিল-টর্চ জ্বেলে কম্পাস আর থার্মোমিটার দেখলেন। সেখানে কোনও পরিবর্তন নজরে পড়ল না। তিনি উৎকণ্ঠিত গলায় প্রশ্ন করলেন, কেউ কি এসেছেন?
উত্তরে ঐন্দ্রিলা খলখল করে হেসে উঠল।
কাকিমা একটা ভয়ের চিৎকার দিয়ে উঠলেন। টেবিলে খটখট করে কয়েকবার শব্দ হল। আমার বুকের ভেতরে একটা পাগল তখন দুরমুশ পিটছিল।
এমন সময় একটা এরোপ্লেনের শব্দ শোনা গেল।
শৌনকদের বাড়ির ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া প্রতিটি প্লেনের শব্দ ঠিক একইভাবে ক্ষীণ থেকে শুরু হয়ে জোরালো হয়, তারপর গোঁ-গোঁ শব্দটা কমজোরি হয়ে ক্রমে দূরে মিলিয়ে যায়।
কিন্তু এইবারের শব্দটা মাঝপথে থেমে গেল। কেউ যেন গলা টিপে একটা কথা-বলা পুতুলকে থামিয়ে দিল।
ভীষণ অবাক হয়ে গেলাম। প্লেনটা আকাশ থেকে গেল কোথায়! কিন্তু ভাবার আর সময় পেলাম না। কারণ, ঠিক তক্ষুনি ঐন্দ্রিলা পাগলের মতো দিগবিদিক-জ্ঞানশূন্য হয়ে মাথা ঝাঁকাতে লাগল।
সে কী মাথা ঝাঁকানি! যেন একটা মাথা-নাড়া বুড়ো পুতুলের পা ধরে কেউ পাগলের মতো আঁকাচ্ছে।
ওই অবস্থাইে মিতি বাপ্পার নামটা ফিশফিশ করে বলছিল।
বাপ্পা ডুকরে কেঁদে উঠল। কাগজের ওপরে ওর পেনসিল ধরা হাত খসখস শব্দে চলতে লাগল।
আর স্পষ্ট টের পেলাম ঘরের উষ্ণতা কমছে। ভীষণ শীত করছে আমাদের।
প্রিয়নাথ পেনসিল-টর্চ জ্বেলে থার্মোমিটার আর কম্পাস দেখলেন। ঘরের উষ্ণতা প্রায় ১০ ডিগ্রি, আর কম্পাসের কাটাটা বনবন করে ঘুরছে।
প্রিয়নাথ একরকম চিৎকার করেই জিগ্যেস করলেন, কেউ কি এসেছেন?
উত্তরে মিতি আবার খলখল করে হেসে উঠে অদ্ভুত চেরা গলায় বলল, এখনও তুই বুঝিসনি?
পাশের ঘরের টেলিফোনটা হঠাৎই পাগলা-ঘণ্টির মতো বাজতে শুরু করল। এরকম দ্রুত কখনও আমি টেলিফোন বাজতে শুনিনি।
একটা জানলা দড়াম করে খুলে গেল। ঠান্ডা বাতাস সাপের মতো পাক খেয়ে ঢুকে পড়ল ঘরে। তারপর প্রলয়নৃত্য নাচতে শুরু করল।
আমাদের অবাক করে দিয়ে বাতাসের সঙ্গে-সঙ্গে ঢুকে পড়ল অসংখ্য জোনাকি। লক্ষ-লক্ষ কোটি-কোটি জোনাকি। অন্ধকার ঘরে আগুনের ফুলকি হয়ে ওরা আঁক বেঁধে ভেসে বেড়াতে লাগল। ওদের এলোমেলো ভেসে বেড়ানো দেখে বাতাসের স্রোত বোঝা যাচ্ছিল।
তিওয়ারি আর্তনাদের মতো একটা শব্দ করল। তারপর চেঁচিয়ে উঠল, ভাগজোগনি! ভাগজোগনি! জুগনু! জুগনু!
ততক্ষণে ঠান্ডায় আমরা ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করেছি। আর কাকিমা মিতি! মিতি! বলে ডেকে-ডেকে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করেছেন।
মিতি পাগলের মতো মাথা ঝাঁকাচ্ছিল। হঠাৎই ও শক খাওয়া মানুষের মতো ছিটকে পড়ল মেঝেতে। টেলিফোনের ঘন্টি তখনও কিন্তু থামেনি।
প্রিয়নাথ চেঁচিয়ে বললেন, শৌনক, লাইট জ্বেলে দাও। তারপর চেয়ার ছেড়ে উঠে ছুটে গেলেন মোমবাতির কাছে। ওটা তুলে নিয়ে ঐন্দ্রিলার কাছে গেলেন।
ঘরের মধ্যে ঠিক কী যে হচ্ছিল মনে করে বলতে পারব না। শুধু মনে আছে এলোমেলো ভয়ের চিৎকার, কথাবার্তা, আর টেলিফোনের পাগলা-ঘণ্টি।
শৌনক ঘরের আলো জ্বেলে দিয়ে চিৎকার করে বলল, এক মিনিট। সবাই শোনো। এসবে ভয়ের কিছু নেই। এই ব্যাপারটা পুরোটাই সাজানো নাটক।
মুহূর্তে সব চিৎকার-চেঁচামেচি থেমে গেল। শৌনক ফোন ধরার জন্যে এগোতেই ফোনের ঘন্টিও আচমকা চুপ করে গেল।
আমরা সবাই তখন মিতিকে ঘিরে দাঁড়িয়েছি। ও চোখ বুজে মেঝেতে চিত হয়ে পড়ে আছে।
কিন্তু এ কী অদ্ভুত চেহারা হয়েছে মিতির!
ওর সারা মুখে সাদা রং। ঠোঁটজোড়া টুকটুকে লাল। ঠোঁটের বাঁ-দিকে একটা কালো জজুল আঁকা রয়েছে।
প্রিয়নাথ মিতির ওপরে ঝুঁকে পড়ে ওকে নানাভাবে পরীক্ষা করছিলেন। শৌনক ওঁর পাশে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর ঠাট্টার হাসি হেসে বলল, আপনি উঠে পড়ুন। মিতির কিস্যু হয়নি। বাপ্পাকে একটু সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্যে আমি আর মিতি নকল ভূত নামানোর প্ল্যান করেছিলাম। ওর হাতব্যাগে মেকাপের জিনিস ছিল। অন্ধকারে লুকিয়ে মুখে মেখে নিয়েছে। আর জুমেলিয়ার এফেক্ট আনার জন্যে ভুরু আঁকার পেনসিল দিয়ে জডুলটা এঁকে নিয়েছে। কথা শেষ করেই শৌনক হো হো করে হেসে উঠল : তবে সবাই যে এরকম ব্যাপক ভয় পেয়ে যাবে ভাবিনি।
রমেশ তিওয়ারি হতভম্ভ মুখে দাঁড়িয়েছিল। জোনাকিগুলোর দিকে দেখিয়ে আমতা-আমতা করে শৌনককে জিগ্যেস করল, তা হলে এই ভাগজোনিগুলো কোথা থেকে এল?
জোনাকিগুলো তখনও ঘরের ভেতরে উড়ছিল। তবে ঘরের আলোর ওদের অনেক নিষ্প্রভ লাগছিল।
শৌনক থতমত খেয়ে বলল, জানি না
প্রিয়নাথ কপালে হাত চেপে মিতির পাশে উবু হয়ে বসেছিলেন। শৌনকের দিকে ঘুরে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলেন, টেলিফোনটা অমন পাগলের মতো বাজছিল কেন? প্লেনের গর্জনটাই অমন মাঝপথে অমন থেমে গেল কেন? আর ঐন্দ্রিলা যেভাবে মাথা ঝাঁকাচ্ছিল মানুষ কি অমনভাবে মাথা আঁকাতে পারে?
