আমি জানি, ওই ঘরটার পরেই আছে লম্বা বারান্দা। আর তার পাশেই কাদের যেন বিশাল বাগান। সেই বাগানে গাছ আর আগাছা সমান দাপটে রাজত্ব করে।
সুছন্দার সঙ্গে কথা বলতে বলতে আমি খোলা জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলাম। অন্ধকারে জোনাকি পোকার আলো চোখে পড়ছিল। আর কেন জানি না, জুমেলিয়ার কথা খুব মনে পড়ছিল।
বালবের আলোয় দেওয়ালে আমার ছায়া নড়ছিল। সেই বিচিত্র ছায়ার দিকে তাকিয়ে আমার মন হঠাৎই বলে উঠল, আজ রাতে জুমির সঙ্গে দেখা হবে।
.
অন্ধকারে, হাতে হাত ধরে আমরা জুমেলিয়ার জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। একটা টেবিলকে ঘিরে আমরা ছজন চুপচাপ বসেছিলাম, আর প্রিয়নাথের নির্দেশ মতো জুমেলিয়ার কথা ভাবছিলাম।
ঘরের সব জানলা-দরজা বন্ধ। এক কোণে একটা কাঠের বাক্সের আড়ালে একটা বড় মোমবাতি জ্বলছে। মোমবাতির আলো দেওয়ালে পড়ে আবছা একটা আলোর আভা তৈরি করেছে। আলোটা যাতে মলিন হয় সেজন্যে প্রিয়নাথ আড়ালের ব্যবস্থা করেছেন। আমাদের সামনে টেবিলে একটা ডিজিটাল থার্মোমিটার আর কম্পাস রয়েছে। মাঝে-মাঝে পেনসিল-টর্চ জ্বেলে প্রিয়নাথ সে-দুটোর রিডিং দেখছেন। প্রিয়নাথের পাশেই বসেছে বাপ্পাদিত্য–ওর সামনে একটা বড় সাদা কাগজ আর পেনসিল।
প্রিয়নাথ ফিসফিস করে বললেন, বাপ্পা, আমি বললেই তুমি পেনসিলটা হাতে তুলে নেবে, আলতো করে ধরে রাখবে কাগজের ওপরে–যাতে ইচ্ছাশক্তি দিয়ে কেউ তোমাকে দিয়ে কিছু লিখিয়ে নিতে পারে।
বাপ্পা চাপা গলায় বলল, ঠিক আছে। কিন্তু পেনসিল ধরতে গেলে তো আমাকে রঙ্গনের হাত ছেড়ে দিতে হবে!
ছেড়ে দেবে। প্রিয়নাথ তারপর আমাকে উদ্দেশ করে বললেন, রঙ্গন, তুমি তখন বাপ্পাকে টাচ করে থাকবে।
বাপ্পার ডানপাশ থেকে আমি জবাব দিলাম, ও.কে.।
ব্যস, আর কোনও কথা নয়।
শৌনক জিগ্যেস করল, আমিও কি কাগজ-পেনসিল নেব?
প্রিয়নাথ সিদ্ধান্তের সুরে বললেন, না। একটু থেমে তারপর ও আমি নাম ধরে না ডাকলে কেউ সাড়া দিয়ো না। মিসেস ঘোষ, আপনিও না।
আবার সব চুপচাপ।
একটা ব্যাপার আমার অদ্ভুত লাগছে। যে-শৌনক কখনও ভূত-প্রেতে বিশ্বাস করে না, সবসময় প্ল্যানচেট ইত্যাদি নিয়ে রঙ্গ-ব্যঙ্গ করে, সে যেন এই প্ল্যানচেটের ব্যাপারে এসে থেকেই অতি-আগ্রহ দেখাচ্ছে। আর বারবার বলছে, আমাদের মিশন সাকসেসফুল হবেই।
ঐন্দ্রিলা আমাদের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে বসে নেই। কারণ, ও মিডিয়াম হয়েছে। প্রিয়নাথ ওকেই মিডিয়াম বেছে নিয়েছেন। কাকিমা এ-ব্যাপারে সামান্য খুঁতখুঁত করলেও শৌনক আর ঐন্দ্রিলার উৎসাহের কাছে তার অনিচ্ছা ভেসে গেছে। তা ছাড়া প্রিয়নাথ বলেছেন, আমাদের মধ্যে ঐন্দ্রিলাই সবচেয়ে ভালো মিডিয়াম হবে কারণ, ও জুমেলিয়ার সমবয়েসি মেয়ে।
ঘরের সবচেয়ে গাঢ় অন্ধকার অংশে মিতি স্থির হয়ে বসে আছে। ওকে দেখতে না পেলেও ওকে আমরা অনুভব করতে পারছি। ওর হাত দুটো সাদা সুতো দিয়ে বেঁধে দিয়েছেন প্রিয়নাথ। বাঁধার সময় তিওয়ারি বলেছে, এ কাচ্চে ধাগে তো স্যার টান মারলেই ছিঁড়ে যাবে!
প্রিয়নাথ উত্তরে বলেছেন, ঐন্দ্রিলা তো আর নিজে নিজে সুতো ছিঁড়বে না। যাকে আমরা ডাকছি সে যদি চায় তবেই সুতো ছিঁড়বে।
আমরা চুপচাপ অপেক্ষা করতে লাগলাম। শুধু আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শোনা যেতে লাগল। আর মাঝে-মাঝে এরোপ্লেনের শব্দ। তবে বুকের ভেতর একটা ঢিপঢিপ শব্দও যেন টের পাচ্ছিলাম।
হঠাৎই জোরে শ্বাস ফেলার মতো ফোঁস করে একটা শব্দ হল। আর তারপরই আমাদের টেবিলটা সামান্য নড়ে উঠল।
প্রিয়নাথ সঙ্গে সঙ্গে পেনসিল-টর্চ জ্বেলে কম্পাস ও থার্মোমিটার দেখলেন। আমিও সেদিকে চোখ রাখলাম। কম্পাসের কাটা উত্তর দিকে মুখ করে স্থির হয়ে আছে, আর থার্মোমিটারে উষ্ণতা ১৯.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস-প্রেতচক্রে বসার আগে যা ছিল প্রায় তাই।
প্রিয়নাথ জোয়ারদার বলেছিলেন, কোনও প্রেতাত্মার উপস্থিতিতে কম্পাসের কাটা যে-কোনও দিকে মুখ করে অস্থিরভাবে ছটফট করতে থাকে। অনেক সময় বনবন করে পাক খায়। আর উষ্ণতা নামতে থাকে নীচের দিকে।
ফলে আমি একটু স্বস্তি পেলাম।
প্রিয়নাথ চাপা অথচ স্পষ্ট গলায় প্রশ্ন করলেন, কেউ কি এসেছেন?
কোনও উত্তর পাওয়া গেল না। তবে মনে হল যেন, আচমকা শ্বাস টানার একটা শব্দ পেলাম। তারপর সব চুপচাপ।
বাপ্পা বোধহয় টেনশান আর সইতে পারছিল না। প্রিয়নাথের নিষেধ না মেনে ও ফিসফিস স্বরে প্রশ্ন করল, কে, জুমি?
আমাদের পাথর করে দিয়ে ফিশফিশ করে কেউ জবাব দিল, হ্যাঁ।
শব্দটা একটানা সুরে দীর্ঘশ্বাসের মতো বেরিয়ে এল। যেন বিশাল কোনও বেলুন থেকে ধীরে-ধীরে বাতাস বেরিয়ে যাচ্ছে।
প্রিয়নাথ উত্তেজিতভাবে ধমক দিয়ে বললেন, বাপ্পা, কী হচ্ছে। তারপর অন্ধকার লক্ষ করে আবার প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন, কেউ কি এসেছেন?
কোনও উত্তর পাওয়া গেল না।
কিন্তু পরক্ষণেই যা দেখলাম তাতে আমার চেতনায় কেউ যেন ভারী একটা হাতুড়ি দিয়ে নিষ্ঠুরভাবে আঘাত করল।
মিতি কখন যেন ওর চেয়ার ছেড়ে উঠে এসেছে। মোমবাতির আলোর সামান্য আভায় ওকে আবছাভাবে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এ কোন মিতি!
ও কালচে রঙের একটা চুড়িদার পরেছিল–সেটা এখন ভৌতিক আলখাল্লার মতো লাগছে। ওর মুখে মূকাভিনেতাদের মতো সাদা রং মাখা। কেউ কি রং মাখিয়েছে, নাকি ভয়ে ফ্যকাসে হয়ে ওর মুখের এই চেহারা দাঁড়িয়েছে। ওর মুখের সাদা রঙের জন্যেই ওর ঠোঁটের বাঁ দিকে একটা কালো জজুল নজরে পড়ল–ঠিক জুমেলিয়ার মতো। কিন্তু মিতির মুখে তো কোনও জডুল নেই! হঠাৎ করে এ-জডুল এল কোথা থেকে!
