তা ছাড়া শৌনকদের বাগানবাড়িটাও ছিল চমৎকার। বিশাল গাছ-গাছালির বাগান, আর তার সঙ্গে প্রকাণ্ড মাপের দোতলা বাড়ি। কলকাতার যে-নির্জনতার দেখা পাওয়াই ভার, এখানে তাকে দ্যাখে কে! তাই হারিয়ে যাওয়ার কোনও মানা ছিল না। জোড়ায় জোড়ায় অনেকে হারিয়েও গেছি।
দিনটা আমার স্পষ্ট মনে আছে দুটি কারণে।
সেদিন আমি সুছন্দাকে প্রথম চুমু খেয়েছিলাম।
আর, ফেরার সময় যশোর রোডের ওপর জুমেলিয়া অ্যাকসিডেন্টে মারা যায়।
সেদিন ওর সিগারেট খাওয়ার ঝোঁক চেপেছিল। একে তো পিকনিকে হুল্লোড় করে এক দু-পেগ খেয়ে একটু টিপসি ছিল, তার ওপর জেদি–তাই ফেরার পথে জেদ ধরল এক্ষুনি ওর ক্লাসিক সিগারেট চাই।
আমাদের কারও সঙ্গে ক্লাসিক ছিল না। আমরা অন্য ব্র্যান্ড ওকে দিতে চাইলাম। কিন্তু ওর সেই এক কথা, আমার বাপি ক্লাসিক ছাড়া খায় না–আমারও ওই চাই–রাইট নাউ। সো স্টপ দ্য ব্লাডি বাস।
বাস থামিয়ে জুমেলিয়া একা-একাই নেমে পড়েছিল। রাস্তা পার হয়ে গিয়েছিল একটা পান সিগারেটের দোকানে। তারপর ফেরার সময় একটা ট্রাক ওর সিগারেট খাওয়ার সাধ চিরজীবনের মতো শেষ করে দিল।
জুমেলিয়ার সঙ্গে আমাদের ক্লাসের বাপ্পাদিত্যর ইয়ে আছে। কিন্তু বাপ্পা নিজেও সেদিন একটু আধটু আউট ছিল। তার ওপরে জুমেলিয়া হল বড়লোক বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে–আদুরে এবং জেদি। সুতরাং ওর ভবিতব্য কেউ বদলাতে পারেনি।
নির্জন শীতের রাস্তায় সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আমাদের সাঙ্ঘাতিক এক ধাক্কা দিয়েছিল। আমরা পাথর হয়ে গিয়েছিলাম।
বাপ্পাদিত্য প্রায় দুমাস পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল। তারপর কোনওরকমে সামলে উঠেছে। এখনও ও প্রায়ই আনমনা হয়ে পড়ে, ক্লাসের পড়ায় মনোযোগ দিতে পারে না। সবকিছু ভীষণ ভুলে যায়। অথচ ও পড়াশোনায় দারুণ ছিল। বি. টেক. পার্ট ওয়ান আর পার্ট টু মিলিয়ে ওর র্যাঙ্ক সেকেন্ড। জানি না, ফাইনাল ইয়ারে কীরকম রেজাল্ট করবে।
জুমেলিয়ার থেঁতলানো দেহটা এখনও আমার চোখের সামনে ভাসে। ওর ফরসা সুন্দর মুখটা অটুট ছিল। গাড়ির হেডলাইটের আলোয় ওর মুখ দেখে মনেই হয়নি ও আর নেই। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি। অপলক দু-চোখে অনেক সাধ ও স্বপ্ন। আর ঠোঁটের বাঁদিকে ছোট্ট কালো জডুলটা বরাবরের মতোই সুন্দর। বাপ্পা ওই জঙুলটার জন্যে পাগল ছিল।
আমরা পাঁচজনই সেই পিকনিকে ছিলাম। আমি, বাপ্পা, রমেশ তিওয়ারি, শৌনক, আর ঐন্দ্রিলা।
রমেশের কাণ্ডজ্ঞান বেশ কম। যখন যা মনে হয় হুটহাট করে বলে দেয়। যেমন, এখন। বাপ্পার অবস্থা জেনেশুনেও ও ফস করে জুমেলিয়ার কথা তুলে বসল। তা ছাড়া, আমরা অনেকেই জানি, জুমেলিয়ার ব্যাপারে তিওয়ারির ইন্টারেস্ট ছিল। ভালো করে বাংলা শেখার জন্যে ও আমাকে আড়ালে বহুবার ধরেছে। বলেছে, রঙ্গন, ইয়ার আমাকে দো-তিন বাংলা লাভ ডায়লগ শিখিয়ে দে।
আমি হেসে জানতে চেয়েছি, কেন? কোথায় অ্যাপ্লাই করবি?
জুমেলিয়ার কথা তিওয়ারি আর বলতে পারেনি। কারণ ও জানত, বাপ্পাকে আমরা সবাই ভালোবাসি। এমনকী ঐন্দ্রিলাও বাপ্পাকে মনে-মনে চাইত। পরে শৌনকের সঙ্গে রিলেশান হয়।
তিওয়ারি জুমেলিয়ার কথা বলামাত্রই আমাদের আলোচনার বিষয় পালটে গেল। আলোচনা শুরু হল পিকনিক আর জুমিকে নিয়ে।
আমার খুব অস্বস্তি হচ্ছিল। মনে-মনে চাইছিলাম এ-আলোচনা বন্ধ হোক, কিন্তু তা হয়নি। ধাপে-ধাপে আলোচনা পৌঁছে গেল আত্মা, প্রেতাত্মা, প্ল্যানচেট, সিয়াস, প্রেতচক্ৰ, এইসবের দিকে। তবে প্ল্যানচেট শব্দটা প্রথম কে উচ্চারণ করেছিল তা আমার মনে নেই।
ঐন্দ্রিলা এক চুমুকে চায়ের কাপ শেষ করে বলল, আমার বড়জেঠু ছোটবেলায় খুব প্ল্যানচেট করতেন। নামকরা লোকদের নাকি ডেকে আনতেন। একবার নাথুরাম গড়সে-কে ডেকেছিলেন। তখন অন্ধকার ঘরের মধ্যে গুলির শব্দ শুনেছিলাম।
শৌনক হো-হো করে হেসে উঠে বলল, যত্ত সব লাটাই-ঘুড়ি! আর-একটু তোল্লাই দিলেই বলবি মহাত্মা গান্ধীর হা রাম! কথাটাও তিনি শুনতে পেয়েছিলেন।
ঐন্দ্রিলা রীতিমতো খেপে গিয়ে বলে উঠল, প্ল্যানচেটের তুই কী বুঝবি! তোর কাছে তো সবকিছু ট্যান হয়ে বেরিয়ে যায়।
আমি ওদের শান্ত করার জন্যে বললাম, তোরা যা-ই বল, প্ল্যানচেট ব্যাপারটা বোধহয় একেবারে বোগাস নয়। আমি একজনকে জানি…। ।
বাপ্পা আমাকে বাধা দিল? আমি জুমিকে প্রায়ই স্বপ্নে দেখি। কিছুতেই ওকে ভুলতে পারছি না।
কথা বলতে বলতেই বাপ্পা মাথা নীচু করল, চোখ বুজে চোখের কোণ আঙুলে টিপে ধরল। ওর পিঠটা বারবার কেঁপে উঠতে লাগল। বুঝতে কোনও অসুবিধে হল না যে, বাপ্পা কাঁদছে।
ঐন্দ্রিলা বাপ্পার পিঠে হাত বুলিয়ে দিল, বিষণ্ণ গলায় বলল, অন্য কথা ভাবার চেষ্টা কর। জুমি তো আর নেই। ওর কথা ভেবে শুধু-শুধু কষ্ট পাচ্ছিস।
আমি আর শৌনক বাপ্পাকে বোঝাতে লাগলাম। ওর মনটা বড় নরম আর সাদাসিধে– ঠিক কচি কলাপাতার মতো–অল্পেতেই আঁচড় পড়ে যায়।
অনেকক্ষণ পর বাপ্পা নিজেকে সামলে নিয়ে ভারী গলায় বলল, আমার কপালটাই খারাপ। জুমিকে যদি একটিবার দেখতে পেতাম!
শৌনক আনমনা হয়ে কী যেন ভাবছিল। হঠাৎই ও ক্যান্টিনের বেঞ্চি ছেড়ে উঠে এল বাপ্পার খুব কাছে। তারপর সিরিয়াস গলায় বলল, তোকে একটা কথা জিগ্যেস করব?
