আমি পকেট থেকে কটা টাকা আর কিছু খুচরো পয়সা বের করে প্রথম লোকটার হাত তুলে দিলাম। কাঁপা গলায় ভুলোদাকে বললাম, ভুলোদা, যা দেওয়ার দিয়ে দাও।
দ্বিতীয় লোকটা তখন রিভলভার ঠেকিয়ে ধরেছে ভুলোদার বুকে? জলদি!
সেই মুহূর্তেই ভুলোদা এক অদ্ভুত কাণ্ড করল। রিভলভার ধরা লোকটার নাকে সপাটে বসিয়ে দিল এক বিরাশি সিক্কার ঘুসি। লোকটা ব্যায়াম করা হাতের ঘুসি খেয়ে ছিটকে পড়ল মাটিতে। আর ভুলোদা সঙ্গে-সঙ্গে, বাবান, কুইক। বলে দে ছুট। চমক ভেঙে আমিও ছুটতে লাগলাম ভুলোদার পেছনে। মুখ ফিরিয়ে দেখি, প্রথম গুন্ডাটা ছুটে পালাচ্ছে। দুনম্বরটা বোধহয় তখনও সেন্সলেস হয়ে পড়ে আছে।
ছুটতে ছুটতে খেয়াল হওয়ায় হঠাৎ ভুলোদা চিৎকার শুরু করে দিল, পুলিশ! পুলিশ!
আমিও তার দেখাদেখি চিৎকার শুরু করলাম। তারপর দু-চারজন মানুষের সাড়া পেতেই আমরা থেমে পড়লাম। আরও লোক জড়ো হতে লাগল। নাইট ডিউটির দুজন পুলিশ কনস্টেবলও হাজির হল সেখানে।
সবাই মিলে যখন অকুস্থলে হাজির হলাম, তখনও গুন্ডাবাবাজি অজ্ঞান। টর্চের আলোয় দেখলাম তার নাক দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছে। রিভলভারটা পড়ে আছে পাশেই। আমাদের নামধাম লিখে নিয়ে বলা হল পরদিন থানায় দেখা করতে।
পরদিন একেবারে হুলুস্থুল কাণ্ড! সারা পাড়ায় রটে গেল, ভুলো ডাকাত ধরেছে। একেবারে যে-সে ডাকাত নয়, রিভলভার-ধরা সাঙ্ঘাতিক ডাকাত। থানার অফিসারও ভুলোদাকে পিঠ চাপড়ে বারবার বাহবা দিলেন। বললেন, ওই কুখ্যাত ফেরারি গুন্ডাটিকে তারা বেশ কিছুদিন ধরেই খুঁজছিলেন।
থানা থেকে বাড়ি ফেরার পথে ভুলোদাকে আমি বললাম, ভুলোদা, তোমার এত সাহস! ছ-ছটা তাজা কার্তুজ ভরা রিভলভারওলা লোকটাকে তুমি এক ঘুসিতে শুইয়ে দিলে! তোমার কি প্রাণের ভয় নেই!
ভুলোদা উদাস মুখে বলল, ভয় কি আর নেই রে, বাবান। আসলে তুই যখন বললি, ভুলোদা, যা দেওয়ার দিয়ে দাও, আমি ভাবলাম তুই বোধহয় গুন্ডাগুলোকে ধোলাই দেওয়ার কথা বলছিস। ব্যস, দিলাম একখানা হুক সামনেরটাকে বসিয়ে। তখন কি আর রিভলভারের কথা আমার মনে আছে রে! সে তো একদম ভুলেই গেছি!
ভূতনাথের ডায়েরি : অন্ধকারে, হাতে হাত রেখে
আমার নাম প্রিয়নাথ জোয়ারদার। বিজ্ঞান যেখানে শেষ সেইখান থেকে আমার কৌতূহল ও আগ্রহের শুরু। ছোটবেলা থেকেই ভূতে আমার ভীষণ ভয়। অশরীরী, অলৌকিক, ভূত, প্রেত, পিশাচ আমাকে ভীষণ ভয় পাইয়ে দিত। আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবের কাছে যখনই এ-জাতীয় কোনও কাহিনি শুনতাম তখনই খুব ভয় পেতাম। পরে, বড় হয়ে, কাঠমাণ্ডুর এক সন্ন্যাসীর পরামর্শে আমি ভুত-প্রেতের ভয় কাটানোর জন্য অভিনব এক পথ ধরি : ভূত-প্রেতের খোঁজ করে বেড়াননা।
সুতরাং সেই পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর বয়েস থেকেই আমার ভুতচর্চার কাজ শুরু হয়েছে। আজ, এই পরিণত বয়েসে এসেও সে-কাজ থামেনি। এই তিন যুগ সময়ে কখন যেন আমার নাম প্রিয়নাথ এর বদলে ভুতনাথ হয়ে গেছে। সমবয়েসি বা গুরুজনরা সামনেই ভুতনাথ বলে ডাকেন। আর, ছোট যারা, তারা সাধারণত বলে আড়ালে। তাতে আমি কিছু মনে করি না। বরং বেশ মজা পাই।
প্রায় পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ বছর ধরে ভুত-প্রেত, অশরীরী-অলৌকিক নিয়ে আমার কম অভিজ্ঞতা হল না। তা ছাড়া ভুত-প্রেতের বহু কাহিনিও আমি শুনেছি। সেইসব অভিজ্ঞতা ও কাহিনি আমি যত্ন করে লিখে রেখেছি বারোটা মোটা মোটা বাঁধানো খাতায়–অনেকটা ডায়েরির মতন। মাঝে মাঝে সেই খাতাগুলোর পাতা উলটে স্মৃতিচারণ করি।
সম্প্রতি আমার আলাপ হয় এক কলমচির সঙ্গে আলাপ করে জানলাম, তিনি নাকি বানিয়ে বানিয়ে ভুতের গল্প লেখেন। তখন আমি হেসে আমার খাতাগুলোর কথা তাঁকে বলি। শুনে তাঁর উৎসাহ দ্যাখে কে! আমার মিনমিনে ওজর-আপত্তি অগ্রাহ্য করে তিনি খাতাগুলো নিয়ে যান। যাওয়ার আগে বলে গেলেন, ডায়েরির লেখাগুলো ঘষে-মেজে কল্পনার প্রলেপ দিয়ে সামান্য রদবদল করে একে-একে আমি লিখব। আপনার কোনও আপত্তি শুনব না।
ভদ্রলোক আমার চেয়ে বয়েসে অনেক ছোট। তাই একরকম স্নেহের বশেই তাঁকে আমি অনুমতি দিয়েছি। আমার ডায়েরির পৃষ্ঠায় কাহিনিগুলোকে বন্দি না রেখে সকলের সামনে প্রকাশ করলে ক্ষতি কী!
.
ভূতনাথের ডায়েরি : অন্ধকারে, হাতে হাত রেখে
প্ল্যানচেট শব্দটা প্রথম কে উচ্চারণ করেছিল জানি না, তবে তাকে আমি দোষ দিতে চাই না। কারণ সে-রাতে শেষ পর্যন্ত যা হয়েছিল তার জন্যে আমরা কেউই দায়ী ছিলাম না। দায়ী ছিল একমাত্র নিয়তি।
ঘটনার শুরু সায়েন্স কলেজের ক্যান্টিনের আড্ডা থেকে।
পি-কে-সি-র ক্লাস কেটে আমরা পাঁচজন চায়ের কাপ সামনে রেখে টাইটানিক নিয়ে তুমুল তর্ক করছিলাম। বিষয় ছিল কেট উইনস্লেট বেশি সুন্দর দেখতে, না মাধুরী দীক্ষিত।
হঠাৎই রমেশ তিওয়ারি বলে উঠল, পরশু আমি জুমেলিয়াকে স্বপ্নে দেখেছি।
আমাদের আড্ডা ঝুপ করে থেমে গেল। সবাই চুপ।
কারণ জুমেলিয়া তিনমাস আগে অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছে।
ও আমাদের সঙ্গেই পড়ত। মাস তিনেক আগে আমরা, মানে বি. টেক, থার্ড ইয়ারের স্টুডেন্টরা, শৌনকদের মাইকেলনগরের বাগানবাড়িতে পিকনিক করতে গিয়েছিলাম। দলে আমরা মোট সতেরোজন ছিলাম। পিকনিকটা ছিল একেবারেই আমাদের নিজেদের ব্যাপারফলে কোনও স্যার-ট্যার সঙ্গে যাননি। শীতের ছুটির দিনটা আমাদের দারুণ কেটেছিল।
