হয়তো সেই কারণেই পরদিন সকালে ঝুনু রবীন্দ্রনাথের মাকাল কবিতাটি বিকুনের সামনে এগিয়ে দিয়ে বলেছে, তুই এবার থেকে শুধু এই কবিতাটাই আবৃত্তি করবি, বুঝলি? বলে ঝুনু বেরিয়ে গেছে কোচিং ক্লাসে।
বিকুন যখন সত্যি-সত্যিই সেটা মুখস্থ করে আবৃত্তির চেষ্টা করছিল তখন মা কোথা থেকে এসে ওকে থামিয়েছেন।
প্রায়ই এইরকম সব ব্যাপার হয় বলে বিকুন সবসময় ভাবে, ইশ, আমার যদি সত্যি-সত্যি অনেক-অনেক বুদ্ধি হত! মাঝে-মাঝে ও স্বপ্ন দেখে, চোখের পলকে কঠিন-কঠিন সব অঙ্ক কষে ফেলছে, আর বাবা-মা চোখ ছানাবড়া করে ওর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রয়েছেন।
কদিন পর ঠিক এইরকম অবস্থাই হল পুরন্দরের। সকালবেলা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আয়েশ করে খবরের কাগজ পড়াটা তার রোজকার অভ্যেস। সেদিন কাগজের তিন নম্বর পৃষ্ঠার একটা বিজ্ঞাপনের দিকে চোখ পড়তেই তার চোখ ছানাবড়া, মুখ হাঁ। তিনি ভুল দেখছেন না তো! সাতবার পড়ার পরেও যখন বিজ্ঞাপনটা এতটুকু পালটে গেল না, তখন তিনি বুঝলেন ব্যাপারটা স্বপ্ন নয়, বাস্তব। পাশের টেবিলে চা জুড়িয়ে জল হয়ে যেতে লাগল, কিন্তু পুরন্দরের চোখ বিজ্ঞাপনের দিকে একেবারে গঁদের আঠা দিয়ে সাঁটা।
বিজ্ঞাপনটা এইরকমঃ
বুদ্ধি বিকাশ কেন্দ্র
পরিচালক ড. বিকাশ বর্ধন (বিদেশ প্রত্যাগত)
এই চিকিৎসা কেন্দ্রে ছোট-ছোট ছেলেমেয়েদের আই. কিউ./বুদ্ধি বাড়ানো হয়।
আধঘণ্টায় নিশ্চিত ফল। পরীক্ষা প্রার্থনীয়।
তার নীচে সেই বিদেশ প্রত্যাগত ডাক্তারবাবুর চিকিৎসা কেন্দ্রের ঠিকানা ও ফোন নাম্বার দেওয়া রয়েছে।
ব্যাপারটা মাথায় ঢুকতেই সোমার নাম ধরে হাঁক পাড়লেন পুরন্দর। বিকুনের বুদ্ধিতে শান দেওয়ার এরকম অপূর্ব সুযোগ আর কোথায় পাওয়া যাবে!
সোমা এসে হাজির হতেই পুরন্দর বিজ্ঞাপনটা ওঁকে দেখালেন। তারপর বললেন, আজ আর অফিস যাব না। ঝুনু কলেজে বেরিয়ে গেলে বিকুনকে নিয়ে চলো, আমরা এই সেন্টার থেকে একবার ঘুরে আসি। দেখি না কী হয়!
সোমা ইতস্তত করে বললেন, কত টাকা নেবে কে জানে! তা ছাড়া…ইয়ে..মানে, ঠকাবে না তো?
টাকার চিন্তা তুমি কোরো না। হাত নেড়ে জবাব দিলেন পুরন্দর, আর ঠকালেই হল! বিজ্ঞাপনে তো লিখেছে আধঘণ্টায় নিশ্চিত ফল। ফল না পেলে টাকা দেব কেন।
সুতরাং বিকুনকে সঙ্গে নিয়ে সোমা এবং পুরন্দর কাঁটায়-কাঁটায় ঠিক দশটার সময় বেরিয়ে পড়লেন বিকুনের বুদ্ধিবৃদ্ধি অভিযানে। ট্যাক্সি ধরে আধঘণ্টার মধ্যেই তারা পৌঁছে গেলেন বুদ্ধি বিকাশ কেন্দ্রর ঠিকানায়।
কেন্দ্রের চেহারাটা বেশ আহামরি। কাচের দরজা। তার ওপরে ডক্টর বিকাশ বর্ধনের নাম লেখা। নামের শেষে ডিগ্রি জানাতে ইংরেজি বর্ণমালার প্রায় ছাব্বিশটা হরফই ফুটকি দিয়ে বসানো। আর তার পাশে বিদেশ প্রত্যাগত ব্যাপারটাও জানানো আছে।
চেম্বারে ঢুকে একজন রিসেপশনিস্টের কাছে নাম-ধাম ইত্যাদি বিবরণ লিখে দিলেন পুরন্দর। তারপর সোমা আর বিকুনকে নিয়ে একটা লম্বা সোফায় বসলেন। ঘরে আরও কয়েকজন বাবা মা তাদের ছেলেমেয়েকে নিয়ে অপেক্ষা করছেন। তাঁদের প্রত্যেকের মুখেই কেমন একটা আশঙ্কার ভাব।
রিসেপশনিস্ট মেয়েটি একটা পার্সোনাল কম্পিউটার সামনে নিয়ে বসে ছিল, আর তার কি বোর্ডের বোতাম টেপার ফাঁকে-ফাঁকে পাশে রাখা একটা টেলিফোন তুলে নিয়ে কীসব কথা বলছিল। হঠাৎই ফোন নামিয়ে রেখে সে ডেকে উঠল, মিস্টার নকুল সামন্ত।
ঘরের এককোণে বসে থাকা এক রোগামতন ভদ্রলোক উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আমি।
রিসেপশনিস্ট মেয়েটি ভেতরের দিকে যাওয়ার একটা কাচের দরজা দেখিয়ে বলল, যান, ভেতরে যান ছেলেকে নিয়ে।
নকুল সামন্ত তার স্ত্রী ও ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলেন।
বিকুন এপাশ-ওপাশ তাকিয়ে ঘরটাকে খুঁটিয়ে দেখছিল। তিনটে কী সুন্দর সুন্দর ক্যালেন্ডার। একটাতে পাহাড়ের ছবি, একটায় জঙ্গলের মাঝে হাতির পাল, আর একটাতে হাতে আঁকা নদী আর গাছপালা। এ ছাড়া, আরও একটা বিশাল রঙিন ছবি টাঙানো রয়েছে ঘরে ও মানুষের মগজের ছবি। ছবিতে অনেকগুলো লাল-নীল তিরচিহ্ন আঁকা। তাদের পাশে-পাশে ইংরেজিতে অনেক কথা লেখা।
হঠাৎই ভেতরের দরজা ঠেলে তিনজন বেরিয়ে এল বাইরে। একজন পুরুষ, একজন মহিলা, আর একটি বছর আটেকের মেয়ে। মেয়েটির চোখে হাই পাওয়ারের চশমা। বাইরের দরজার দিকে ওরা হেঁটে যাচ্ছিল। তখনই মেয়েটি হঠাৎ বিরক্তভাবে বলল, বাপি, আমার চশমার ডানদিকের লেন্সের ফোকাল লেংথটা ঠিক নেই–দু-মিলিমিটারের মতো গোলমাল রয়েছে।
পুরন্দর লক্ষ করলেন, বাবা-মা বেশ অবাক হয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন। তারপর দুজনে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে করতে বেরিয়ে গেলেন।
প্রায় ঘণ্টাখানেক পর বিকুনের ডাক পড়ল।
ভেতরের ঘরে ঢুকে তো সোমা আর পুরন্দরের একেবারে তাক লেগে যাওয়ার জোগাড়। বিকুনও বেশ অবাক হয়ে গেল। ও হাঁ করে সবকিছু দেখতে লাগল।
বেশ বড় ঘর। ঘরটা সিনেমা হলের মতো ঠান্ডা। তার একপাশে বিশাল টেবিল সামনে নিয়ে বসে আছেন বেঁটেখাটো একজন টাকমাথা মানুষ। পোশাকে বেশ চেকনাই রয়েছে। গলায় স্টেথো, ঠোঁটের ফাঁকে চুরুট। চুরুটটা নিভে গেলেও ভদ্রলোক বোধহয় সেটা টের পাননি, কারণ মাঝে-মাঝেই ওটাকে নেড়েচেড়ে টান মারছেন। আর তার মুখে সবসময়েই একটা হাসি লেগে রয়েছে।
