বিকুন বেশ ভয়ে-ভয়ে তাকিয়ে রয়েছে বাবার দিকে। বরফ দিয়ে কী করবেন বাবা? মুখ লালচে, থমথমে। বিকুনকে অঙ্ক শেখাতে গিয়ে আজ বোধহয় তার অফিসটাই কামাই হয়ে যাবে!
এর মধ্যে মা-ও এসে হাজির হয়ে গেছেন। আটপৌরে শাড়ি পরে রান্না করছিলেন। হাতে হলুদের রং, মুখে বিনবিন ঘাম। বোঝা যায়, প্রচণ্ড ব্যস্ততার মধ্যেও জরুরি হাঁক শুনে ছুটে এসেছেন।
সোমা বিকুনের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করলেন, কী রে! ও-মা, ও-মা, করে ডাকছিস কেন? এখন আমার মরবার সময় নেই।
ও, রান্নার ছ্যাঁকছোঁক শব্দের জন্য মা তা হলে বরফ আনার ব্যাপারটা শুনতে পাননি! বিকুন ভাবল। আর বাবার সোমা ডাককে বিকুনের ও-মা বলে ভুল করেছেন।
পুরন্দর রাগ-থমথমে গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন, ও ডাকেনি, আমি ডেকেছি। জলদি ফ্রিজ থেকে একটু বরফ দাও–একটা রুমালে জড়িয়ে দিয়ো।
বরফ! বরফ দিয়ে এখন কী করবে? তুমি চান করতে যাবে না? এরপর অফিসে দেরি হয়ে গেলে আবার আমাকে।
পুরন্দর এবার ফেটে পড়লেন, বলছি তো জলদি বরফ নিয়ে এসো, আমার মাথায় দেব। ওকে অঙ্ক শেখাতে গিয়ে আমার মাথাটাই কেমন গোলমাল হয়ে গেছে।
সোমার ভুরু কুঁচকে গেল। বিকুনের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করলেন, কী রে, আবার কী ভুল করলি?
বিকুন ইনিয়ে-বিনিয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ওকে থামিয়ে দিয়ে প্রায় গর্জন করে উঠলেন পুরন্দর, ভুল আবার কী! ওকে নিয়ে আমি আর পারছি না। তোমার ছেলের মাথায় কিস্যু নেই। ও..ও একটা শম্বুক নাড়ুগোপাল!
বিকুন তো একেবারে থ। শম্বুক মানে যে শামুক সেটা ও জানে। কিন্তু শামুক আর নাড়ুগোপালের মধ্যে কোথায় যে মিল তা ওর মাথায় ঢুকছে না। তা ছাড়া, ওই দুটি বস্তুর সঙ্গে বিকুনেরই বা মিল কোথায়!
সোমা জানেন, ভীষণ রেগে গেলে পুরন্দর বিকুনকে তোমার ছেলে বলে অভিযোগ করেন।
তিনি কোনওরকমে ঠান্ডা করতে চেষ্টা করলেন উত্তেজিত পুরন্দরকে, আহা, কী হয়েছে। বলবে তো।
পুরন্দরের কথা থেকে ব্যাপারটা জানা গেল। তিনি সাধারণ একটা আয়-ব্যয়ের অঙ্ক বোঝাতে বসেছিলেন বিকুনকে। তাতে রয়েছে, রামবাবু মাসে ২০০০ টাকা আয় করেন, আর প্রতি মাসে তার ১৬০০ টাকা করে খরচ হয়। তা হলে বছরের শেষে তার সঞ্চয় কত? তা অঙ্ক কষা তো দূরের কথা, বিকুনের বক্তব্য, প্রতি মাসে সমান টাকা খরচ হতে পারে না–বিশেষ করে পুজোর মাসে তো খরচ বেশি হবেই! বাবাকে সে স্পষ্ট জানিয়েছে, তুমিই তো সবসময় একথা বলো।
ব্যস, অঙ্ক উঠেছে মাথায়। বাবা-ছেলেতে লেগেছে তর্ক। পুরন্দর যতই বোঝান, এটা অঙ্ক। বিকুন ততই বলে, না, অঙ্কে ভুল আছে।
বিকুন যে মাথা নীচু করে এবার ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদছে সেটা খেয়াল করেছেন সোমা। তাই পুরন্দরকে বলেছেন, তুমি যাও তো, তাড়াতাড়ি চান করে তৈরি হও। ও-অঙ্ক আমি বুঝিয়ে দেব।
ফোঁস করে প্রায় পাঁচ ফুট লম্বা এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে পুরন্দর উঠে পড়লেন। তিনি যে পড়াশোনায় বরাবরই তুখোড় ছিলেন এটা আর কাউকে বলা যাবে না। সবই নিয়তি।
বিকুনকে নিয়ে মা-বাবার দুশ্চিন্তা কম নয়। কী করে ছেলেটা এমন বোকাসোকা হল! কেন ওর মাথায় একফেঁটা বুদ্ধি নেই? অথচ ওর দিদি ঝুনু লেখাপড়ায় কী দারুণ! মাধ্যমিক পরীক্ষাতে পাঁচটা বিষয়ে লেটার মার্কস পেয়েছিল, তা ছাড়া স্টার তো বটেই। সামনের বছরে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে। সারাদিন শুধু মন দিয়ে পড়ে। মা-বাবা তো ভালো করেই জানেন, ঝুনু সবাইকে খুশি করার মতো রেজাল্ট করবে। আর তারই ছোটভাইয়ের কিনা এই দুরবস্থা!
পড়াশোনা করতে বিকুনের যে খুব একটা খারাপ লাগে তা নয়। কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশি ভালো লাগে গাছপালা, পাখি আর প্রজাপতি দেখতে। সেগুলো দেখে ও যেসব রঙিন ছবি আঁকে তা দেখে বড়দের তাক লেগে যায়। তা ছাড়া, কবিতা আবৃত্তি করতেও বেশ লাগে ওর। পাড়ার দু-একটা ফাংশানে ও কয়েকবার আবৃত্তি করে বেশ প্রশংসাও পেয়েছে। তখন তো বাবা মা দুজনেই ওকে আদর-টাদর করেছিলেন! অথচ অঙ্ক আর বিজ্ঞানের মাথা না খুললে সেই দুজন মানুষই কেমন যেন হয়ে যান। আচ্ছা, সবাই কি সব পারে! কেন যে সবসময় দিদির কথা বলে বিকুনকে সবাই খোঁচা দেয় কে জানে! দিদি মোটেই ছবি আঁকতে পারে না। আর আবৃত্তির ব্যাপারে ওর বিন্দুমাত্রও উৎসাহ নেই।
কিন্তু এটাও তো ঠিক যে, বিকুনকে নিয়ে মাঝেমধ্যেই বাবা-মা বেশ মুশকিলে পড়ে যান। এমনকী অপ্রস্তুতের একশেষও হয়েছেন এক-একবার।
এই তো গত সপ্তাহে সোনামাসিরা বেড়াতে এসেছিলেন বিকুনদের বাড়িতে। সোনামাসি ভীষণ ভালোবাসেন বিকুনকে। সবসময় ওর জন্য কিছু না কিছু নিয়ে আসেন। সেদিন সন্ধেবেলা মাসি মেসো, ওঁদের দুই ছেলেমেয়ে নিশানদাদা আর রীতাদিদি, মা-বাবা, ঝুনু-বিকুন সবাই মিলে খুব হইহুল্লোড়, গল্পগুজব হচ্ছিল। তারই মধ্যে বিকুন ফস্ করে হঠাৎ বলে বসেছে, সোনামাসি, জানো তো, স্কুলে বন্ধুরা আমাকে বুদ্ধুমাস্টার বলে ডাকে।
সোনামাসি অবাক হয়ে জিগ্যেস করেছেন, সে আবার কী নাম!
বিকুন বেশ ডাঁটের মাথায় বলেছে, বুঝলে না, যাদের মাথায় খুব বুদ্ধি– মানে, অনেক বুদ্ধিমানের মোট বুদ্ধির চেয়েও বেশি বুদ্ধি তাদেরকেই বুন্ধুমাস্টার বলে…বন্ধুরা বলেছে।
হাসিঠাট্টার তাল কেটে গেল। সবাই চুপ। তারপর হাসিতে ফেটে পড়েছে নিশান, রীতা আর ঝুনু। বাবা আর সোনামেসো ওদের ধমক দিয়েছেন। বিকুন লক্ষ করেছে, মা-বাবার মুখ কেমন লালচে হয়ে গেছে। একটু পরেই মা ওকে নিয়ে চলে এসেছেন পাশের ঘরে। প্রায় কাঁদতে কাঁদতে বলেছেন, তোর কি কোনওদিন এতটুকু বুদ্ধি হবে না মাথায়!
