সজ্ঞান যখন হলাম তখনও আমি বিছানায় শুয়ে। বুকে-গলায় অপটু হাতের পটি– রোশনলালের প্রাথমিক চিকিৎসার স্বাক্ষর। চেতনা ফিরতেই শোয়া অবস্থা থেকে এক ঝটকায় সোজা হয়ে বসলাম। তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা গ্রাহ্য করলাম না। বাঁ-হাতে বালিশের নীচ থেকে প্যাড জড়ানো রিভলভারটা বের করে নিলাম। টলোমলো পায়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালাম।
আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রোশনলালের চোখে ভয়ের ছায়া কেঁপে উঠল।
আমি অমায়িক স্বরে প্রশ্ন করলাম, রোশন, তুমি আমার ঘরে কেন ঢুকেছ?
এতক্ষণ যেটা খেয়াল করিনি, এবার সেই খবরের কাগজটাই আমার চোখের সামনে তুলে ধরল রোশন। তিননম্বর পৃষ্ঠার এক কোণে দধীচি তালুকদারের অপমৃত্যু-সংবাদ। ও বলল, এই খবরটাই তোমাকে দেখাতে আসছিলাম।
মৃদুস্বরে বললাম, ওরা দেখেছে?
হ্যাঁ, দেখেছে।
লম্বা পা ফেলে দরমার দরজা সরিয়ে বাইরের ঘরে এলাম।
অবনী আর পরাশর ভাড়ে চা আনিয়ে খাচ্ছিল। আচমকা আমাকে মারমুখী ঢঙে ঢুকতে দেখে উঠে দাঁড়াল। রোশনলাল চুপচাপ একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। ওকে লক্ষ করে বললাম, রোশন, কী হয়েছে ওদের খুলে বলো।
ওরা জানে। তোমার চিৎকার শুনে ওরা ঘরে গিয়েছিল। মৃদুস্বরে রোশন উত্তর দিল।
আমি একপলক তাকালাম আমার গায়ে লাগানো কাপড়ের পটির দিকে। তারপর মুখ তুলে জানতে চাইলাম, মালের বোতল আর অ্যাসিডের বোতলের জায়গা পালটির কাজটা কে করেছে?
ওরা চুপ।
চকিতে অবনীর দিকে এক পা এগিয়ে গেলাম। বিদ্যুৎ ঝলকের মতো আমার রিভলভার ধরা বাঁ-হাতের উলটোপিঠ আছড়ে পড়ল ওর ফোলা-ফোলা গালে। ওর মুখটা অবাধ্যভাবে ডানপাশে কয়েক ডিগ্রি ঘুরে স্থির হয়ে রইল। ফরসা গাল ফেটে বেরিয়ে এল রক্তের রেখা। অবনীর দৃষ্টি নিষ্পলক।
কে করেছে, অবনী?
আমি নয়। বিড়বিড় করে ও জবাব দিল।
পরাশর? ঘুরে তাকালাম পরাশরের দিকে।
আমি জানি না।
আমি হাসলাম। রোশন, অবনী, পরাশর মেঝের দিকে তাকিয়ে। হাসতে-হাসতেই বললাম, অতএব তোমরা যখন মিথ্যে কথা বলছ না, তখন ধরে নেওয়া যেতে পারে, আজ সকালে হঠাৎ মাথাখারাপ হয়ে গিয়ে আমি দশবছরের পুরোনো কালীমার্কার নেশা ছেড়ে নাইট্রিক অ্যাসিডের নেশা শুরু করতে গেছি–আর তাতেই এই কেলো…।
আমি জোরে হেসে উঠলাম।
ওদের তিনজনের শরীর হঠাৎ কেঁপে উঠল। ওরা ভয়ের চোখে আমার দিতে তাকাল। কারণ, আমার হাসির শব্দ ছাপিয়ে রিভলভারের সেফটি ক্যাচ খোলার শব্দ ওদের কানে গেছে।
সাজানো দুর্ঘটনা আমি একেবারে পছন্দ করি না। কারণ সাজানো দুর্ঘটনা কাপুরুষের হাতিয়ার। আর, পুরুষের অবলম্বন…।
রিভলভারটা তুলে ধরতেই সদর দরজা সশব্দে খুলে গেল। বিস্মিত নয়নের প্রবেশ এবং প্রশ্ন, কী ব্যাপার, হেম, কী হচ্ছে এসব?
হঠাৎ আমি গভীরভাবে ভাবতে লাগলাম। ক্ষিপ্র চিন্তায় সিদ্ধান্তে পৌঁছে রিভলভার নামিয়ে নিলাম। বললাম, নয়ন, জল ঢেলে পা ধুয়ে আয়। প্রাণ বাঁচানোর জন্যে তোর মেহেরবানি কবুল করে এই তিনটে কুত্তা অন্তত কিছুক্ষণ তোর পা চাটুক।
আর দাঁড়ালাম না। স্থবির হয়ে দাঁড়ানো রোশনের হাত থেকে খবরের কাগজটা টেনে নিয়ে ঢুকে পড়লাম খুপরি ঘরে।
আসন্ন দ্বিতীয় দুর্ঘটনার জন্যে মনকে ধীরে-ধীরে তৈরি করতে লাগলাম।
.
আমার তালিকায় অ-সন্দেহভাজনদের সংখ্যা চিরকালই শুন্য। সুতরাং খবরের কাগজের খবরটা প্রথমে মনোযোগ দিয়ে পড়লামঃ
গতকাল শোভাবাজার মদনমোহনতলা এলাকায় জনৈক দোকানদার কোনও এক আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়। সেইসঙ্গে দোকানের ক্যাশ বাক্সের টাকা অদৃশ্য হয়। পুলিশের সন্দেহ গতরাতের অন্য দুটো ডাকাতির সঙ্গে এ-খুনের সম্পর্ক রয়েছে। তদন্ত চলছে।
অতঃপর শুরু হল আমার বিশ্লেষণ। প্রথমে নয়ন সেনের পালা।
ভেবে দেখলাম, গতকাল রাতে ও খুপরি-ঘরে ঢোকেনি। আজ সকালেও এসেছে দেরিতে। সুতরাং মদের বোতল এবং নাইট্রিক অ্যাসিডের বোতলের জায়গা বদলের কাজটা ওর পক্ষে সম্ভব নয়।
অতএব বাকি রইল অবনী, পরাশর আর রোশনলাল। এদের তিনজনেরই ছিল সমান সুযোগ। তা ছাড়া গত রাতে অবনী আমার সামনেই ও-ঘরে ঢুকে মদের দুটো বোতল বের করে এনেছিল। হয়তো সেই সময়েই..।
চিন্তা করতে গিয়ে দেখলাম, পরাশর আর রোশনলালের পারসোনাল লাইফ সম্পর্কে আমি খুব বেশি কিছু জানি না।
অবনীর বাবা গাড়ি কেনা-বেচার দালালি করত। অবনীই আমাকে জুটিয়ে দিয়েছিল এই ঝরঝরে অস্টিনটা। অবনী বিয়ে করেনি। সংসার ছেড়ে ও আমার সঙ্গে আছে আজ চারবছর। ওর সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ একটা মালের দোকানে।
পরাশর বারতিনেক জেল খাটার পর কেমন করে যেন আমার সঙ্গে ভিড়ে গেল।
সেও প্রায় বছর-তিনেকের কথা। পরাশরের বয়েস অল্প। চোখে-মুখে কেমন একটা একরোখা ভাব রয়েছে। সম্ভবত ওয়াগন-ব্রেকার হিসেবে পুলিশের সঙ্গে ঘন-ঘন প্রতিদ্বন্দ্বিতাই ওর চেহারায় এই অদ্ভুত কাঠিন্য এনে দিয়েছে।
রোশনলাল বয়েসে মাঝামাঝি। এই দুনম্বরী পথে ও আছে অনেকদিন। কিন্তু ওর নার্ভাস প্রকৃতিটা এখনও ওর সঙ্গ ছাড়েনি। গুণের মধ্যে, রোশন ভালো গাড়ি চালায়।
নয়ন বাড়ি ছেড়ে বিয়ে-থা করেছে আজ দশবছর। অনেকদিন টানাপোড়েনের মধ্যে কাটিয়ে অবশেষে ও হাত পেতেছিল আমার কাছে। ক্রমে-ক্রমে একরকম নিরুপায় হয়েই ও আমার সঙ্গে মিশে গেছে। মাঝে-মাঝে তাই দুঃখ করে বলে, আমি মারা গেলে আমার না-খেতে পাওয়া ছেলেমেয়েগুলোকে আর আমার বউটাকে দেখিস।
