গাড়ি থেকে সবাই নেমে দাঁড়ালাম। রোশন গাড়িটা গ্যারেজে ঢুকিয়ে কাঠের দরজা টেনে দিল। তারপর আমরা একসঙ্গে এগোলাম শখানেক মিটার দূরে টলোমলো শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আমাদের টিন-কাঠ দিয়ে তৈরি ডেরার দিকে। যাওয়ার পথে নীরবে টাকার থলেটা আমার হাতে তুলে দিল নয়ন। আমি একবার ওর মুখের দিকে চেয়ে থলেটা নিলাম। অন্য টাকার ব্যাগ দুটো তখন অবনীর হাতে। গাড়ির পেছনের সিট থেকে ও-ই হাতে করে নিয়ে এসেছে।
জং ধরা তালায় জং ধরা চাবি লাগিয়ে একটু কসরত করতেই তালা খুলল। দরজার অবাধ্য কাচকাচ শব্দকে অগ্রাহ্য করে ভেতরে ঢুকলাম। আমাকে অনুসরণ করল অবনী, নয়ন, পরাশর আর রোশনলাল। পকেট থেকে লাইটার বের করে সশব্দে জ্বালালাম। অভ্যন্তরীণ জমাট অন্ধকার পিছু হটল। এগিয়ে গিয়ে বাঁ-দিকের ভাঙা টেবিলে দাঁড় করানো মোমবাতিতে আগুন ধরালাম। ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিলাম লাইটারের আলো।
লাইটার পকেটে রেখে হাতের ইশারা করতেই অবনী এগিয়ে এল আমার কাছে। টাকার থলেটা আমার হাত থেকে বাঁ-হাতে নিয়ে এগিয়ে চলল দরমার বেড়ায় ঢাকা দেওয়ালের ওপিঠে লুকিয়ে থাকা একটা খুপরি-ঘরের দিকে।
আমাদের আস্তানাটা নড়বড়ে হলেও আকারে ছোট নয়। বেড়া কাঠের দেওয়ালে একটা মা কালীর ফটো, একটা ক্যালেন্ডার, আর আছে সিনেমার পুষি-নায়িকাদের গোটাতিনেক চৌম্বকধর্মী ছবি– আঠা দিয়ে দেওয়ালে সাঁটা। আসবাবপত্র বলতে বাঁ-দিকে দাঁড়ানো খোঁড়া টেবিলটা। একটা কাঠের বেঞ্চ। একটা প্রাগৈতিহাসিক বেতের মোড়া। দুটো কালি পড়া হ্যারিকেন। কয়েকটা পুরোনো খবরের কাগজ। একটা ট্রানজিস্টার–এখনও তা থেকে শব্দ-টব্দ বেরোয়। আর একটা জল ভরা কুঁজো– মুখে গেলাস চাপা দেওয়া।
এসব গেল বাইরের ঘরের কথা। এবার আসি খুপরি-ঘরের কথায়। বড় ঘরটার পেছনের অংশে একটা দরমার আড়াল দেওয়া। তার ডান পাশে এক পাল্লার একটা দরজা মতন। সেটা পেরোলেই একটা ছোট ঘর। সেখানে দুটো তক্তপোশে দুটো তেলচিটে বিছানা। একপাশে কাঠের শেফে গোটাকয়েক মালের বোতল, অ্যাসিডের বোতলও রয়েছে দুটো–মাঝে-সাঝে তালা-টালা ভাঙতে-টাঙতে কাজে-টাজে লাগে। তক্তপোশের নীচে আছে একটা পুরোনো জং ধরা ট্রাঙ্ক। তাতে কিছু যন্ত্রপাতি এবং হড়কানো অর্থ-সম্পত্তি রাখা হয়। এখন অবনী ঢুকেছে পেছনের সেই খুপরি ঘরে। টাকার থলে তিনটে রাখতে।
ফেরার সময় নিজের বুদ্ধিতেই মালের দুটো বোতল নিয়ে এল অবনী। সঙ্গে দুটো চিঁড়েভাজার প্যাকেট কখন কিনেছে কে জানে। ততক্ষণে ভাঙা টেবিলের ভাঙা মোমবাতির আলোর আমরা মোড়া, বেঞ্চ ইত্যাদি দখল করে বসেছি। অবনী এসে ধপাস করে বসে পড়ল মেঝেতেই। বোতল দুটো বাড়িয়ে ধরল যথাক্রমে আমার এবং রোশনলালের দিকে। নয়ন নেশায় অভ্যস্ত নয়। ওর নীতিবাগীশ ক্যারেকটারের দশ পাসেন্টের এক পার্সেন্টের উদাহরণ।
কিছুক্ষণ গলা ভেজানোর পর টলোমলো পায়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল অবনী। একটু জড়ানো এবং রূঢ় স্বরে বলল, হেমদা, তালুকদার স্টোর্সের লোকটাকে খুন করে তুমি ভালো করোনি।
পরাশর মৃদু স্বরে বলল, একটা মানুষের জীবনের দাম মাত্র পঁয়ষট্টি টাকা?
লোকটাকে জানে মেরে ফেলার খুব একটা জরুরত ছিল কি? রোশনলালের দ্বিধাগ্রস্ত মনের প্রশ্ন ভেসে এল।
আমি এক ঝাঁকুনি দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। পেছনের ঘরের দিকে এগোতে এগোতে বললাম, নয়ন, এদের অমৃতবাণীগুলো টুকে নিয়ে কাগজে ছেপে দিস।
নয়ন উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমি বাড়ি চললাম। কাল দেখা হবে।
তক্তপোশে শরীর এলিয়ে দিয়ে তখনও শুনতে পাচ্ছি ওরা তিনজন জড়ানো গলায় পরস্পরের মধ্যে আলোচনা করছে। শোনা যাচ্ছে প্রায়-খালি বোতলের ঠুং-ঠাং শব্দ।
অন্ধকারে জেগে রইলাম। একটা কথা স্পষ্ট বুঝলাম, আজকের খুনটাকে ওরা চারজন সহজ মনে নিতে পারছে না। তা হলে কি আমার সাবধান হওয়া উচিত? কিন্তু রিভলভার একমাত্র আমি ছাড়া আর কারও কাছে নেই। অবশ্য একটা জোগাড় করাও তেমন কঠিন কিছু নয়। মনে হয়, এই দধীচি তালুকদার মারা গিয়ে আমার চার বন্ধুকে আজ শত্রু করে দিয়ে গেছে।
অবশেষে বুঝলাম, আমি–হেম বাঁড়ুয্যে–ভয় পেয়েছি।
.
প্রথম দুর্ঘটনাটা ঘটল পরদিন সকালেই।
আমার মানসিক অঙ্কে এত অল্প সময়ের তফাতে এটা আশা করিনি।
সকালে ঘুম ভাঙতেই গত রাতের দধীচি তালুকদার এবং পরবর্তী ঘটনা পরম্পরা আমার মস্তিষ্ককে আচ্ছন্ন করেছে। সুতরাং সেই আড়ষ্ট আচ্ছন্ন ভাবটা কাটাতে বিছানায় উঠে বসে হাত বাড়িয়েছি শেফের দিকে। আধখালি একটা বাংলার বোতল টেনে নিয়েছি। আলগা করে গলায় ঢালতে যাব, নজরে পড়ল খুপরি ঘরের দরজা ঠেলে কেউ ঢুকছে।
স্বাভাবিকভাবেই মনোযোগ কিছুটা বিচ্ছিন্ন হল। চোখের কোণ দিয়ে দরজার ওপর নজর রেখে বোতলটা গলায় উপুড় করে দিয়েছি, চমকে উঠলাম রোশনলালের স্বরে–।
ওস্তাদ!
এবং বিপর্যয়টা তখনই ঘটল, আর সেইসঙ্গে বাঁচাল আমার প্রাণ।
কারণ ততক্ষণে বোতলের তরল, আমার চমকানোর সুযোগে, চলকে পড়েছে আমার বুকে, গলায়, গায়ে। আর তক্ষুনি অসহ্য যন্ত্রণা আমাকে জানিয়ে দিয়েছে, বোতলের যে-তরল আমি গলায় ঢালতে যাচ্ছিলাম, সেটা মদ নয়, ঘন নাইট্রিক অ্যাসিড।
বেশ মনে আছে, এক বীভৎস চিৎকারের সঙ্গে-সঙ্গে বিছানায় আমি লুটিয়ে পড়েছি, আর মুণ্ডহীন ধড়ের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে উঠেছে আমার অ্যাসিডে জ্বলে যাওয়া শরীর। রোশনকে যেন এগিয়ে আসতে দেখেছিলাম বিছানায় কাছে..তারপর আর কিছু মনে নেই…।
