ছোটকা ঝামেলার কথা মোটেই উড়িয়ে দিতে পারল না। কারণ, রোবটটা ওর নিজের হাতে তৈরি। তা ছাড়া রোবট কখনও মিথ্যে কথা বলে না। অবশ্য কোনও ঘটনার ভুল ব্যাখ্যা করাটা রোবটের পক্ষে অসম্ভব নয়।
ছোটকা দোকানের চারদিকে তীক্ষ্ণ নজর বুলিয়ে নিল।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত দোকানটায় জামাকাপড়ের যেমন স্টক তেমনই খদ্দেরের ভিড়ে একেবারে গিজগিজ করছে। প্রচুর সেল্সম্যান ও সেক্সগার্ল এদিক-ওদিক নানান কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে। স্টিরিও স্পিকারে গমগম করে মিউজিক বাজছে। দোকানের বিশাল বিশাল দেওয়ালে নানা রঙের ইলেকট্রনিক রোলিং ডিসপ্লে। তাতে নামি কোম্পানির জামা-প্যান্টের বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে পুজোর স্পেশাল ডিসকাউন্টের ঘোষণা পর্যন্ত রয়েছে। দোকানের দরজার পাশে এক কোণ ঘেঁষে দশ বাই দশ মাপের একটা কাচের ঘর। সেখানে তিনটে কম্পিউটার নিয়ে ক্যাশিয়ারবাবুরা রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে।
ওই ভিড়ের মধ্যেই ছোটকা ঝামেলাকে একপাশে ডেকে নিল। তারপর চাপা গলায় বলল, ঝামেলা, ঝটপট বলো, কোথায় তুমি চোর দেখলে।
ঝামেলা বলল, আমার সঙ্গে ওদিকটায় চলো, মেয়েটাকে দেখাইয়া দিতেছি। আমার পু…পু…
ছোটকা ঝামেলার মাথায় এক চাটি মারতেই ও বলল, পু…পুঞ্জাক্ষিকে ফাঁকি দেওয়া বড়ই
ছোটকা ঝালা-পালাকে বলল, তোরা এই কাউন্টারেই থাক–জামা-প্যান্ট পছন্দ কর–আমি এক্ষুনি আসছি…।
ঝালা-পালাকে আর কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়েই ছোটকা ঝামেলাকে সঙ্গে নিয়ে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল।
ভিড় ঠেলে একটা কোণের দিকে পৌঁছেই ঝামেলা ছোটকাকে ইশারায় থামতে বলল। তারপর ফিসফিসে গলায় বলল, তোমার পশ্চাৎদিকে তিরিশ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে কেয়ারফুলি তাকাও। হলুদ টপ এবং কালো স্কার্ট পরা ফরসা মেয়েটিকে লক্ষ করিতেছ? উনিই হলেন শ্রীমতী তস্কর।
ঝামেলার কথা মতো ধীরে-ধীরে পিছনে ফিরল ছোটকা। তারপর মোটামুটি তিরিশ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে নজরটা ঘোরাতেই মেয়েটিকে দেখতে পেল।
মেয়েটির গড়ন সুন্দর ছিপছিপে। বয়েস বড়জোর ষোলো কি সতেরো হবে। ওর হাতে একটা ছোট মাপের সাইডব্যাগ। ব্যাগটার রং নীল আর কালোয় তৈরি দাবার ছক–তবে বেশ মলিন। বিশেষ করে মেয়েটির চেহারা ও পোশাকের সঙ্গে একেবারেই বেমানান।
ঝালাপালা কিন্তু ছোটকার পিছু ছাড়তে চায়নি। বিশেষ করে ঝামেলার তস্কর দর্শন রহস্য ওদের কৌতূহলী করে তুলল।
সুতরাং ভিড়ের ফাঁকফোকর দিয়ে যমজ জুটি সামান্য চেষ্টাতেই পৌঁছে গেল ছোটকার কাছে। দোকানের বেশ কয়েকজন ক্রেতা অবিকল একই চেহারার একই পোশাক পরা দুই ভাইকে বারবার অবাক নজরে দেখেছিল। কিন্তু ঝালাপালার সেদিকে কোনও খেয়াল ছিল না। ওরা শুধু ঝামেলাকে দেখছিল।
ঝালা-পালাকে দেখে ছোটকা শাসনের সুরে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই ঝামেলা ওর শক্ত হাতে ছোটকার পেটে চোরা চিমটি কাটল, আর একইসঙ্গে মিহি গলায় বলল, লুক! লুক! অপহরণ করছে।
ছোটকা এবং ঝালাপালা তিনজনেই স্পষ্ট দেখতে পেল ব্যাপারটা।
প্রমাণ মাপের একটা জিন্সের প্যান্ট কাউন্টার থেকে তুলে নিয়ে ছোট সাইডব্যাগটার মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে লাগল মেয়েটি। এবং ওদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে প্যান্টটা অনায়াসেই ঢুকে গেল ব্যাগের ভেতরে।
বড়সড়ো ব্যাগ বা ঝোলা নিয়ে দোকানে ঢোকা নিষেধ। তাই দরজার কাছেই রয়েছে ব্যাগ জমা দেওয়ার কাউন্টার। কিন্তু পার্স বা ছোট সাইডব্যাগ জমা রাখার কোনও দরকার নেই। সেগুলো সঙ্গে নিয়ে সবাই ঢুকতে পারে দোকানের ভেতরে–যেমন এই মেয়েটি ঢুকেছে।
পার্স বা ছোট সাইডব্যাগে জামাকাপড় লুকিয়ে ফেলা সম্ভব নয়। সে কথা মাথায় রেখেই দোকানের নিরাপত্তাকর্মীরা মেয়েটিকে ওই ছোট ব্যাগসমেত দোকানে ঢুকতে দিয়েছে। কিন্তু ছোটকারা চোখের সামনে যে-ঘটনা দেখল তা একেবারেই অবিশ্বাস্য।
ছোটকা কিছু একটা মন্তব্য করতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই ঝামেলা বলে উঠল, এইরূপ জামাকাপড় প্রচুর লইয়াছে এবং ওই ব্যাগের ভেতরেই সব ঠেসে ঢুকিয়ে দিয়েছে।
ঝালাপালা প্রায় একসঙ্গে মিলিয়ে মিশিয়ে বলল, ছোটকা, ঝামেলার সার্কিটে মনে হয় বেশ বড় রকমের গোলমাল হয়েছে। তাই ও উলটোপালটা দেখছে আর ভুলভাল বকছে। ওইটুকু ব্যাগে কখনও এত জামাকাপড় ঢোকে!
ঝামেলা রেগে গিয়ে বলল, তোমরা কী করে বুঝিবে! বানর থেকে মানুষ হওয়ার পর সেই কোন আদিমকালে পড়ে রয়েছ! যদি আমাদের মতো রোবট হতে তা হলে বুঝিতে!
ঝামেলার বিশ্বাস, মানুষ থেকে বহু বিবর্তনের পর এসেছে রোবট। তাই ও মাঝে-মাঝেই ঝালা-পালাকে আদিমযুগের মানুষ বলে খোঁটা দেয়।
হঠাৎই ছোটকা ঠোঁটে আঙুল তুলে ওদের চুপ করতে ইশারা করল। তারপর চাপা গলায় বলল, ওই দ্যাখ মেয়েটা আবার চুরি করছে!
তারপর ওদের চোখের সামনেই রীতিমতো অলৌকিক ঘটনা ঘটতে লাগল।
মেয়েটি বেশ কয়েকটি জামাকাপড় সেলসম্যান-সেক্সগার্লদের চোখ এড়িয়ে পটাপট ঢুকিয়ে ফেলল ওর ব্যাগে।
ছোটকা আপনমনেই বলল, মেয়েটা ক্লেপটোম্যানিয়াক নয় তো?
চন্দ্রকান্ত অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, ক্লেপটোম্যানিয়াক মানে?
ইন্দ্রকান্তও বলে উঠল, সেটা আবার কী?
ছোটকা বলল, ক্লেপটোম্যানিয়া মানে হল চুরি করার অসুখ। মেয়েটার সেরকম কোনও অসুখ নেই তো!
ঝামেলা বলল, ব্যাপার বড়ই বিপত্তারিণী।
